Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ , ৩০ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (29 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-২২-২০১১

বিষবৃক্ষ

মীজান রহমান


বিষবৃক্ষ
ক্যানাডার পূর্বাঞ্চলে বলতে গেলে দুটোই ঋতু---শীতকাল আর মেরামতকাল। Winter and Costruction. দুয়ের মাঝখানে একটা নাতিদীর্ঘ ঋতু আছে অবশ্য---সেটাকে বলা হয় খানাখন্দের ঋতু---Season of potholes. আমাদের অটোয়া শহরটিকে লোকে ঠাট্টা করে বলে ক্যানাডার pothole capital. শীতকালে আপনার গাড়ি ব্ল্যাক আইসের ফাঁদে পড়ে পথিপার্শ্বের গর্তে ঢুকে যাবে, আর মেরামতের ঋতুতে আপনার পুরো দিনটাই নষ্ট হবে ডিটুর খুঁজে খুঁজে। অর্থাৎ এখানে গাড়ি চালিয়ে আরাম নেই। তবু চালাতে হয়, যেমন আমি চালিয়েছি প্রায় পঞ্চাশ বছর। পঞ্চাশ বছরে আমার মাথার চুল পড়ে গেছে, চোখ গেছে, দাঁত গেছে, কান গেছে, বাইপাস সার্জারি হয়েছে একবার, শরীরে রক্তচলাচলের অবস্থাও খুব ভাল নয়, এখন হিতাহিত জ্ঞানটিও হারাবার দশা। সবই এই গাড়ির কারণে হয়ত নয়, তবে গাড়ি একটি পরোক্ষ কারণ সেটা মানতেই হবে।
  ঢাকার কথা ধরুণ। আগে, মানে পুরাকালে যখন ভদ্রলোকদের হাতে বাড়তি পয়সাকড়ি তেমন ছিল না, সাদা-কালো-লাল-নীল কোনরকম পয়সাই না, তখন রাস্তায় গাড়ি দেখা যেত কচিৎ কদাচিৎ। স্কুলে পড়াকালে আমার একটা বাতিক ছিল ঢাকার প্রাইভেট গাড়িগুলোর প্লেট নম্বর মুখস্থ করে রাখা। ফলে কোন্ সাহেব বা তাঁর পরিবার গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছেন সেটা প্রায় সময়ই বলে দিতে পারতাম। আমি যে সময়টার কথা বলছি সেসময় ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল চার লক্ষ। এখন সেটা দাঁড়িয়েছে এক কোটির ওপর। এখন যার গাড়ি নেই তাকে ভদ্রলোক বলে গণ্য করা হয় না। এখন মানুষের বৈধ আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনও সম্পর্ক নেই, ফলে ঢাকা শহর এখন গাড়ির অরণ্য। এ অবস্থায় একমাত্র বদ্ধ পাগল ছাড়া কেউ প্লেট নম্বর গোণার চেষ্টা করবে না। সেকালে, ঢাকা শহরে কেউ হার্ট এটাকে মারা গেছে এমন অদ্ভূত কথা কখনো শোনা যেতনা---হার্টে আবার এটাক করবে কে বা কেন? এ হল বড়লোকের ব্যাধি---গরিব হার্টের রোগে মরে না, মরে পেটের  ক্ষুধায় আর কলেরা-বসন্তে। সেসময় ডায়েবেটিস হয়েছে কারো, শুনতে পেলে আমরা দল বেঁধে তাকে দেখতে যেতাম, এমনই বিরল ছিল সেটা। বার্ডেমের প্রতিষ্ঠাতা তখনো কলেজের ছাত্র। তার সঙ্গে আজকের দৃশ্যটি মিলিয়ে দেখুন। ডায়েবেটিস নেই এমন ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা ঢাকা শহরে কোথায় পাবেন জানিনা। আর হার্ট এটাক? সেটা তো ঘরে ঘরে। পয়সাওয়ালা ভদ্রলোক হওয়া মানেই হার্ট এটাকের ঝুঁকিতে পড়া। কথাটা উল্টোভাবেও বলা যায়---যার হার্ট এটাক হয়েছে, অন্তত একবার, এবং ব্যাংকক-সিঙ্গাপুর-কোলকাতা গিয়ে বুক কেটে সেটা সারানো হয়েছে, তাকেই বলা হয় মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক। অর্থাৎ তিনি সমাজের উচ্চতর পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ওটা একধরণের স্ট্যাটাস সিম্বল। আমাদের গোটা কালচারটাই তো স্ট্যাটাসের ওপর দাঁড়ানো। স্ট্যাটাস না হোক সিম্বলটা অবশ্যই চাই।
  অবশ্য ভদ্রলোক মানেই হৃদরুগী তা আমি বলছি না---এটা প্রবাবিলিটির ব্যাপার। তবে ভদ্রলোক মানে যে ফ্যামিলি রুমের আরামকেদারাতে স্থায়ী অবস্থান এবং চারচাকাবিশিষ্ট বাষ্পশকট তাতে কোন সন্দেহ নেই। বর্তমান জগতে গাড়িবিহীন ভদ্রলোক কল্পনাই করা যায় না। এযুগের বিশ্বায়িত পৃথিবীর সর্বত্রই গাড়ির হিড়িক, কারণ লেখাপড়াজানা মধ্যবিত্তদের প্রথম চাহিদাই গাড়ি---গাড়ি ছাড়া গতি নেই, গতি ছাড়া লেখাপড়া বৃথা, এই হল এযুগের মানসিকতা। উত্তর আমেরিকাতে যার গাড়ি নেই সে অচল, তার মত অভাগা কেউ নয়। গোটা মহাদেশটাই গড়ে উঠেছে ?বাড়ি বাড়ি গাড়ি আছে? এই ধারণার ভিত্তিতে। খুব বড় মাপের শহর না হলে আপনি যেখানে যান সেখানেই গাড়ির প্রয়োজন হবে---অন্যথায় আপনার একমাত্র ভরসা কোনও দ্বিচক্রবিশিষ্ট যান, যেমন আপনার নিজের দু?টি পা, নতুবা সাইকেল। আমি যখন প্রথম আসি ক্যানাডাতে তখন ঠিক এই অবস্থাটির সম্মুখিন হতে হয়েছিল। শহরটির নাম ফ্রেডারিকটন। নাম শোনেননি বুঝি? তাহলে শুনুন। এটা কোন অজপাড়াগাঁয়ের নাম নয়, রীতিমত একটি প্রাদেশিক রাজধানী---নিউ ব্রান্সুইক প্রদেশ। ১৯৬২ সালে, ক্যানাডাতে আসার প্রথম বছর, গোটা প্রদেশটির লোকসংখ্যা ছিল ৬ লক্ষ। ভুল বলিনি, ছয় লক্ষ। আর ফ্রেডারিকটন? সর্বসাকল্যে ২০ হাজার!  শহরে পা দিয়ে আমরা স্বামীস্ত্রী পরস্পরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। এ কেমনতরো শহররে বাবা যেখানে সাবওয়ে নাই, বাস নাই, ট্যাক্সি পেতেও পুলিশের সাহায্য নিতে হয়? বাধ্য হয়ে গাড়ি কিনতে হল তড়িঘড়ি করে, ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে অবশ্য (সেকালে ব্যাংক ম্যানেজার বলতে গেলে বাড়িতে এসে হাতেপায়ে ধরে টাকা ধার দিয়ে যেতেন)। গাড়ি কেনার পর সমস্যা দাঁড়ালো---চালাতে জানি না। ঢাকায় থাকাকালে অন্যের গাড়ির নম্বর মুখস্ত করেই সাধ মেটাতে হয়েছিল গরিবের ছেলের, নিজের কোনদিন গাড়ি কেনার মুরোদ হবে কল্পনা করিনি। ছাত্রজীবনে মাইলদুয়েক রাস্তা হেঁটে ক্লাস করতে যেতাম কার্জন হলে, অধ্যাপক হবার পর রিক্সা। বিয়ের সময় পরের গাড়ি ধার করে কনের বাড়ি গিয়েছিলাম---সেজন্যে গিন্নির খোঁটা খেতে হয়েছিল দীর্ঘকাল। সুতরাং ফ্রেডারিকটনে গিয়ে বাঙ্গাল ছেলের কি দুর্দশা হয়েছিল বুঝতেই পারছেন। আমার অংকের ক্লাসের এক গাধা ছাত্রের সঙ্গে চুক্তি করা হলঃ সে আমাকে বিনি পয়সায় গাড়ি চালানো শেখাবে, আমি ওকে বিনি পয়সায় অংক শেখাবো। ভদ্রলোকের চুক্তি। দুজনই গাধা ছাত্র----সে অংকের, আমি ড্রাইভিঙ্গের। ওকে আমি ঘোড়া বানাতে পারিনি, তবে টায়ে টায়ে পাসের নম্বর সে পেয়েছিল। আমি প্রথম চেষ্টায় ফেল মারলাম। দ্বিতীয়বার রোডটেস্ট দিতে গিয়ে ছাত্রের গাড়ির টার্ণ সিগনেল ভেঙ্গে ফেললাম---নার্ভাস হলে যা হয়। পরীক্ষক মশায় দয়াপরবশ হয়ে আমাকে পাস করিয়ে দিলেন, সম্ভবত তিনি তৃতীয়বার আমার গাড়িতে চড়ার ঝুঁকি নিতে চাননি। লাইসেন্স পেয়ে মহাখুশিতে সস্ত্রীক বেরিয়ে গেলাম হাইওয়েতে ওকে চমক লাগিয়ে দেব বলে। অল্পদূর গিয়েই কোথা থেকে একটা গাছ এসে হুড়মুড় করে পড়ে সামনে---যেন দোষটা আমার নয়, গাছের। সেগাড়ি সারাতে বেশ খেসারত দিতে হয়েছিল।
  যাই হোক সেই থেকে আমি ভদ্রলোক---গেঁয়ো ছেলে্র গায়ে শহুরে ছা্প পড়ল। প্রথম বছরই সারা মহাদেশব্যাপী নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ালাম। মনের আনন্দে, গতির আনন্দে। বাষ্পশকটের নেশাটিতে আমিও আক্রান্ত হয়ে গেলাম। এদেশে গাড়ি ছাড়া কেউ আছে কিনা সন্দেহ---পথের ভিখিরিও রাস্তার ধারে গাড়ি পার্ক করে ভিক্ষার থলে নিয়ে বসে। দিনমজুরেরা গাড়ি করে কাজে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জায়গায় নিম্ন মধ্যবিত্ত হল সেই অভাগা ব্যক্তি যার একটির বেশি গাড়ি কেনার মুরোদ নেই, এবং একই গাড়ি দশবারো বছর ধরে চালায়। ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রিমন্ট অঞ্চলে গিয়ে দেখি, নতুন মধ্যবিত্ত এলাকা মানেই হল যেখানে টু-কার-গ্যারাজ ছাড়া কোনও বাড়ি নেই। সাধারণত বাড়িগুলোতে তিনটে গ্যারাজ---স্বামী, স্ত্রী, কলেজগামী ছেলে বা মেয়ে---প্রত্যেকেরই তো আলাদা আলাদা জীবন, সুতরাং গাড়িও থাকতে হবে আলাদা।
  আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বহুবিধ আবিষ্কারের মত বাষ্পশকটও মূলত শ্বেতাঙ্গদের দান। তাই বলে ভাববেন না যেন যে এই গাড়ির হিড়িক, বাড়ি বাড়ি মাথাপিছু একটি, অন্তত একটি, গাড়ি না হলে কারুরই জীবন চলবে না, এটা শুধু শ্বেতাঙ্গ জাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মোটেও না। মায়াবিনী ?মহান আমেরিকান স্বপ্ন?টি প্রাণে ধারণ করে যে?ই আসে এদেশে সে?ই যেন সেই একই স্বপ্ন আর একই প্রত্যাশার মোহজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে দুতিনবছরের মধ্যে। বিত্ত আর বৈভবের দুর্ভেদ্য জাল থেকে কারো মুক্তি নেই। আমার আরো চাই, আরো চাই। আরো বড় বাড়ি, আরো দামি গাড়ি, আরো দামি আসবাব। ক্যালিফোর্নিয়াতে আমার স্বদেশী ভাইবোনদের মাঝে এই বস্তুলিপ্সার উগ্র রূপ আমি নিজের চোখে দেখেছি। তাদের বাড়িতেও একাধিক গাড়ির গ্যারাজ। আমার আপন ঔরসজাত সন্তান, যাকে ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালেও আমি গাড়ি দিইনি, এমনকি অংকের ক্যালকুলেটারও কিনে দিতে চাইনি নিজের সহজাত গণনাশক্তি খর্ব হয়ে যেতে পারে বলে, সেই ছেলের বাড়িতেও এখন দু?টি গাড়ি। হয়ত বাবামায়ের ?কিপটেমি?র সমুচিত প্রতিশোধ নিয়েছে। অবশ্য এটা উল্লেখ না করলে অন্যায় হয়ে যাবে ওর ওপর যে ওর সমসাময়িক অন্যান্য প্রকৌশলীর তুলনায় বাবুর অবস্থাটি তেমন বাড়ন্ত নয়। ওর মাত্র দুটো গাড়ি, ওদের কমপক্ষে তিনটে। ওর বাড়ি এত প্রকাণ্ড নয় যে ঘরে ঘরে ইন্টারকম বসাতে হবে, বা সেলফোন-আইফোন ছাড়া একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা দুষ্কর। তবে আশার বিষয় যে এখন বৌমাও চাকরিতে যোগ দিয়েছে। অনুমান করছি যে নাতিটি যখন ষোল পার হবে তখন জোর চাপ শুরু হয়ে যাবে তৃতীয় গাড়ি কেনার। অর্থাৎ তৃতীয় গ্যরাজবিশিষ্ট বৃহত্তর বাড়ি দরকার হবে। তারপর যখন নাতনিটিও সেই একই বয়সে উপনীত হবে তখন কে জানে কোথায় গতি তা্দের। ভাবতেই আমার মাথা ঘুরে যায়। এমনিতেই আমি হিমশিম খাই যতবার ছেলের বাড়ি বেড়াতে যাই। ওরা যে পাড়াতে থাকে সেটাকে ওরা এক্সলুসিভ বলে ভাবতে ভালোবাসে--- উঁচু পাহাড়ের গায়ে দেয়াল-পরিবেষ্টিত জায়গাতে তৈরি করা হয়েছে বলেই হয়ত। ক্যালিফোর্নিয়াতে আজকাল কেউ সমতলে থাকতে চায় না----সমতলে থাকে সমতলের মানুষ, সাধারণ, ছেলেমেয়েদের ভালো ভালো প্রাইভেট স্কুলে পাঠানোর সাধ্য যাদের নেই, যারা দি্ন আনে দিন খায়, সরকারি ভাতার ওপর যাদের সংসার চলে, এবং যাদের ছেলেমেয়েতে সারাবাড়ি কিলবিল করে। এই এক্সক্লুসিভ শব্দটার প্রতি আমার স্বদেশী ভাইবোনদের দারুণ দুর্বলতা। সাধারণত আমরা এটাকে এক্সক্লুসিভ না বলে বলি ?পশ?। আমরা বাড়ি বানাই পশ পাড়াতে, সন্তান পাঠাই পশ স্কুলে (আইভি লীগ কথাটি আমরা, অর্থাৎ থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির ইমিগ্র্যান্ট সম্প্রদায়, যতটা জোর দিয়ে এবং যতটা গর্বের সঙ্গে ব্যবহার করি ততটা আমার শ্বতাঙ্গ বন্ধুবান্ধদের মধ্যে দেখিনি), ছুটি কাটাই এক্সক্লুসিভ দ্বীপপুঞ্জের নিরিবিলি বালুতটে, ট্রিপে গেলে আমরা থাকি এক্সক্লুসিভ হোটেলে। আমরা হলাম পশপ্রিয় জাতি। আমরা মানে কেবল বাংলাদেশী তা নয়, ভারত চীন ব্রেজিল এদের মত মহা মহা দেশেও একই দৃশ্য। আমার ছেলে যখন পাসটাস করে চাকরিতে সদ্য ঢোকে তখন তার বাড়িতে অত জৌলুশ ছিল না। মোটামুটি সাদামাঠা। সেসময় ওদের পাড়াতে বেশির ভাগ প্রতিবেশীই ছিল সাদাচামড়া। অর্হাৎ সাধারণ ছাপোষা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবার। করুণাময়ের কৃপাতে এখন তাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে---তারা অন্যান্য সচ্ছল ইমিগ্র্যান্টদের মত উচ্চ মধ্যবিত্ত, এক্সক্লুসিভ এলাকায় বাড়ি কিনতে পেরেছে। এই পাড়াতে আমি এখন কোনও সাদাচামড়া দেখিনা, অধিকাংশই চীন, লাওয়স, ভিয়েতনাম, আর কোরিয়া থেকে আসা---দুচারজন ভারতীয়, একজন বাংলাদশী (আমার পুত্রসন্তান)---সাদাচামড়া শুধু একজন পুরোম এলাকাটির মালিক। ক্যালিফোর্নিয়ায় শ্বেতাঙ্গজাতি এখন সংখ্যালঘুর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। রাস্তাঘাটের গাড়িঘোড়াতে ভালো করে তাকালেই বোঝা যায় শতকরা কতভাগ আমাদের পূর্বাঞ্চল থেকে আগত।
  জীবনযাত্রার মানবৃদ্ধির সঙ্গে সুখস্বাচ্ছন্দ্যের একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে সেটা আমি নির্দ্বিধায় মেনে নিচ্ছি, কিন্তু আজকের যুগে সেই মান এবং সেই সুখস্বাচ্ছন্দ্যের প্রধান, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একমাত্র, বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোগবিলাসের দ্রব্যসম্ভার ও আলস্যবিহারের প্রাচুর্যময় পরিবেশ---সেখানেই আমার কিঞ্চিত অস্বস্তি, কারণ আমার বিশ্বাস এই প্রাচুর্যের মূঢ় অন্বেষাতেই অলক্ষ্যে দানা বেঁধে উঠছে মানবসভ্যতার এক অভিনব সংকট। ছোটবেলায় আমরা জানতাম, এবং স্বচক্ষে তার প্রমাণও পেয়েছি, যে মানুষের আকাট দারিদ্র্য তাকে ?মহান? তো করেই না, বরং তাকে দেহে-মনে পঙ্গু করে দেয়, তাকে নিঃস্ব করে ফেলে সর্বতোভাবে। এখন, নতুন শতাব্দীর প্রযুক্তিতাড়িত আলোঝলমলে বিশ্বমঞ্চের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আমাদের অনেকেরই প্রতীতি জন্মাতে শুরু করেছে যে মানুষ পঙ্গু এবং নিঃস্ব হতে পারে আরো একটি উপায়ে---উৎকট প্রাচুর্য। অশ্লীল প্রাচুর্যও আমি বলি মাঝে মাঝে। সব পেতে গিয়ে মানুষ আজ ব্যক্তিগতভাবে যত সাফল্যই অর্জন করুক সমষ্টিগতভাবে তার প্রায় সব হারানোর অবস্থা---এবং সেটা আমরা জেনেও না জানার ভান করে থাকছি। আজকে পৃথিবীজোড়া প্রায় প্রতিটি দেশের একই মন্ত্রঃ উন্নয়ন, উন্নয়ন। পশ্চিম বলছেঃ আমাদের আরো চাই, আরো চাই। তার জন্যে তারা ঋণের সমুদ্রে ডুবে মরতেও রাজী। পূর্ব আর উত্তর-দক্ষিণ সমস্বরে বলছেঃ আমরা পশ্চিমের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাই---আমরা কি তাদের চেয়ে কোনও অংশে কম? পশ্চিমের বাড়ি বাড়ি গাড়ি আছে, আমাদেরও থাকা চাই। দশবারো বছর আগেও শুনতাম চীনের সাংহাই-বেইজিংএ অধিকাংশ মানুষ সাইকেলে করে চলাচল করে। আজকের নবার্জিত ধনসম্পদ তাদের চাহিদার জগতেও স্ফীতি সঞ্চার করেছে---সাইকেল নয়, আজকে তাদের গাড়ি কেনার সামর্থ্য হয়েছে। আজকে তাদের পায়ে গতির নেশা এসেছে---গতি চাই, আরো গতি। পশ্চিমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাদের ভূলোক-দ্যুলোক দখল করা চাই। ভারতেরও সেই একই জল্পনা। তারা নতুন গাড়িও বানিয়েছে। সেই গাড়ির জন্যে সারা দেশব্যাপী জোর আয়োজন লেগে গেছে নতুন সড়ক তৈরির। সেই সড়ক দিয়ে তীব্রবেগে গাড়ি চালিয়ে তারা পশ্চিমের পড়শী হয়ে  যাবে। পিছিয়ে নেই তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশও। দেশের অনেক মানুষ না খেয়ে মরছে? মরুক। রুগী মরছে বিনা চিৎকিসায়? মরুক। তবুও তাদের পায়ের তলাতে গতির চাকা বসাতে হবে---পশ্চিমের মত তাদেরও থাকতে হবে বাড়ি-গাড়ি-খাটপালঙ্ক।
  একসময় ঢাকার রাস্তায় পায়ে হেঁটে সারা শহর চষে বেড়ানো ছিল এক বিপুল আনন্দের বিষয়। আজকে ঢাকার মধ্যবিত্তরা পায়ে হাঁটা প্রায় ভুলেই গেছে। হাঁটবার জায়গাই বা কোথায়। রাস্তাঘাট তো সব বড়লোকদের গাড়ির দখলে। আজকের তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের যানজট সমস্যা পশ্চিম বিশ্বকে ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে গেছে। এই জটের প্রধান কারণ গাড়ির সমুদ্র, যেদিকে তাকান সেদিকেই গাড়ি আর গাড়ি---ছোট গাড়ি, বড় গাড়ি, বিশাল গাড়ি। দেশ যত গরিব রাস্তাঘাটে গাড়ির সংখ্যা যেন সেই অনুপাতেই তত বেশি। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার।
  এই যে নির্বোধ অন্ধ কাফেলা উর্ধশ্বাসে ছুটে চলেছে কোন্ অলীক ভুবনের সন্ধানে, এর শেষ কোথায়, সেকথা ভাববার সময়ও যেন নেই কারো। এযুগের মানুষ ছোটার নেশাতে ছুটছে। একটু যদি দম নিয়ে ভাবতে বসত কেউ তাহলে সে শিউরে উঠত নিজেরই আসন্ন সর্বনাশের অনিবার্য দৃশ্য দেখে। এ যেন কোনও উত্তুঙ্গ গিরির উচ্চাভিলাসী আরোহীর গিরিপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তার পাতালযাত্রার অতলান্ত খন্দের দিকে তাকানো। সেই গিরিদ্বার থেকে প্রত্যাবর্তনের পথটি তো সে নিজেই ধ্বংস করে দিয়েছে।
  আমেরিকাকে পৃথিবীর সর্বোন্নত দেশ বলে গণ্য করে প্রায় প্রতিটি মানুষ---এমনকি আমেরিকাকে যারা প্রাণ দিয়ে ঘৃণা করে তারাও। সেকারণেই তো একে ধ্বংস করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে তালিবান আর আলকায়দারা। অথচ এই অত্যুন্নত দেশেও আজকে শতকরা ৪০ ভাগ নদীর পানি পানযোগ্য নয়, মৎসশিকার এমনকি সাঁতার করতে যাওয়াটাও নিরাপদ নয়, এতটাই দূষিত হয়ে গেছে সেগুলো। আমেরিকার শতকরা ৪৬ ভাগ হ্রদেরও তথৈবচ অবস্থা---খালিচোখে চাইতে গেলে তার মনোরম দৃশ্য দেখে হয়ত আপনার প্রাণ জুড়িয়ে যাবে, কিন্তু সেই জল মুখে দেবার উপায় নেই, তাতে স্নান করবার উপায় নেই, বর্শিছিপ নিয়ে কূলে বসে মনের আনন্দে মাছ ধরার উপায় নেই। আমেরিকার জলাশয়গুলোতে মাছেরা মরে যাচ্ছে প্রতিদিন। প্রতিবছর আনুমানিক ১.২ ট্রিলিয়ন টন আনকোরা কাচা মল নিক্ষেপ করা হচ্ছে এদেশের নদীনালা খালবিলে। ক্যানাডার অবস্থাও প্রায় একইরকম। তৃতীয় বিশ্বের চেহারাটি কিরকম হতে পারে কল্পনা করার চেষ্টা করুণ। দেশগুলো বলতে গেলে একেকটি প্রকাণ্ড মলাশয়তে পরিণত হবার উপক্রম। বড়লোকদের ঘরে ঘরে টয়লেট, আপামর দরিদ্রের টয়লেট হল প্রকৃতির অপার করুণাপ্রাপ্ত উন্মুক্ত ভূপৃষ্ঠ আর মাঠপ্রান্তর। মজার ব্যাপার যে গরিবের মল মাটির সঙ্গে মিশে যায়, কিন্তু বড়লোকের মল মাটির সঙ্গে মেশে না, নদীর জলেতে মেশে। ছোটবেলার অনেক আনন্দময় স্মৃতির মাঝে একটি ছিল নদীর পারে হাঁটুজলে নেমে কোষে করে মনের সুখে পানি খাওয়া। আজকের ছেলেমেয়েদের কাছে সেসব কথা রূপকথার আজগুবি গল্পের মত মনে হবে। ওরা হেসে বলবেঃ ছিঃ নদীর পানি তো পায়খানার রঙ, সে পানি আবার খায় নাকি লোকে। তাই তো, নদীর পানি কেউ খায় নাকি! আমার প্রাণের দেশ, আ মরি বাংলাদেশ, ছোটবেলায় স্কুলে পড়েছি নদীমাতৃক আমার সোনার বাংলা, সেই মাতৃসম নদীর জলে আজ বিষ ছাড়া আর কিছু উৎপন্ন হয়না। আজকে ঢাকায় যারা বেড়াতে যায় বাইরে থেকে তারা বাক্সবোঝাই পানির বোতল নিয়ে যায়, আর নিয়ে যায় গাদা গাদা ইমোডিন বড়ি, যাতে দৈবাৎ কলের পানি পেটে চলে গেলে সেটা সারাবার উপায় থাকে। নিজের দেশে গিয়ে পরদেশের জল পান করার মত লজ্জা কেমন করে সইছি আমরা জানিনা। পৃথিবীর প্রতিটি উন্নয়নকামী দেশের মত আমাদের দেশটিও একই সর্বনাশের পথে ক্ষিপ্রবেগে এগিয়ে চলেছে। বেশি দূর হয়ত নয় সে দিন যেদিন মানুষ পানির অভাবে তিলে তিলে মরতে শুরু করবে। এই তো দুদিন আ্গেই টিভিতে দেখলাম। বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্ন্যয়নের দ্রুততম যাত্রী চীনদেশে নিদারুণ জলসংকট দেখা দিয়েছে। তার প্রধান কারণ জীবনযাত্রার দ্রুত মানবৃদ্ধি, এবং তার সাথে সীমাহীন জনস্ফীতি, যার ফলে  চীনের সর্বমোট জলসম্পদ কিছুতেই তাল রেখে চলতে পারছে না সেই স্ফীতির সঙ্গে। দ্রুত উন্নয়নের কারণে একদিকে চাহিদা অনেক গুণে বেড়ে গেছে, অপরদিকে বায়ুসূষণ আর জলদূষণ হয়ে চলেছে অব্যাহত গতিতে। চীন সরকার এখন রীতিমত উদ্বিগ্ন। চারদিকে খাল কেটে জলের ধারা বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে। ইয়াংসিসহ বড় বড় নদীগুলোর প্রস্থ বাড়াবার আয়োজন হচ্ছে। কিন্তু এসব করেও শেষ রক্ষা হবে কিনা সন্দেহ। ভারতের অবস্থা তো আরো শোচনীয়---ওদের লোকসংখ্যা একেবারে  নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে---অচিরেই তারা চীনের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। তখন কি হবে ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।
  এ তো গেল পানিসংকটের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। এবার আসা যাক সব অনিষ্টের গোড়ার অনিষ্টতে---গাড়ি। আমাদের অনেকেরই হয়ত জানা নেই যে এক গ্যালন গ্যাসোলিনে ৫.৩ পাউণ্ড অঙ্গার থাকে। গাড়ি চলার সময় এই বিপুল পরিমাণ অংগারের প্রায় প্রতিটি কণাই কার্বন ডায়ক্সাইডে পরিণত হয়ে বায়ুমণ্ডলে উদ্গীর্ণ হয়। আনুমানিক হিসেবে একেকটি আমেরিকান গাড়ি প্রতি বছর ১.৫ টন কার্বন দান করে যাচ্ছে আমাদের পরিবেশকে। আশ্চর্য যে আমেরিকান জাতি এখন পর্যন্ত কিছুতেই মানতে রাজি নয় যে তাদের সীমাহীন বায়ুদূষণের কারণে মানবজাতির বাস্তব্য পরিবেশটি কতখানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। দুঃখের বিষয় যে আমাদের হতদরিদ্র দেশ, বাংলাদেশ, সেখানকার অবস্থা অবর্ণনীয়রকম শোচনীয়। শীতকালে ঢাকার বায়ুসেবন মানে ফুসুফুসের ভেতর অনেকখানি বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ঢোকানো। মাঝে মাঝে দেশে গিয়ে নীল আকাশ খুঁজি। কিন্তু নীল আকাশ কোথায়? ছাইরঙ্গের একটা বিসাল সামিয়ানার মত অনে ওপরের দিকে তাকালে। গাছগাছারি আর লতাপাতার সবুজ রংটি যেন চিরতরেই মুছে গেল।
  এই হল আমাদের ভদ্রসমাজের গাড়িপ্রীতির পরিণাম। ভেবে দেখুন ঢাকার রাস্তায় কত লক্ষ গাড়ি-ট্রাক-এসইউভি চলাচল করে রোজ, এবং কত শত শত টন কার্বন ডায়ক্সাইড তারা ফুঁ দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে বাইরে, আপনার আর আমার নাক বরাবর। এ অবস্থা কতদিন চলবে বলে মনে হয় আপনার? ঢাকা তো বাসযোগ্যতার বাইরে প্রায় চলেই গেছে। সেখানে পানি খাওয়া যায় না, শ্বাস নেওয়া যায় না, মাছ খাওয়া যায় না, ওষুধপত্রে ভেজাল, নদীনালা দুর্গন্ধময়, রাস্তাঘাট বিপজ্জনক, জনসংখ্যা এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে মানুষ অচিরেই একে অন্যের ঘাড়ের ওপর চাদর পেতে ঘুমাবে।
 এ পৃথিবীর ভবিষ্যত কি?

অটোয়া,
২১শে জুলাই,?১১
মুক্তিসন ৪০

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে