Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ৬ জুন, ২০২০ , ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-২৮-২০১২

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাড়া পাচ্ছে না বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাড়া পাচ্ছে না বাংলাদেশ
রোহিঙ্গারা ইস্যুতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও কার্যত তেমন সাড়া মিলছে না। এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহল  এখনো দ্বিধাবিভক্ত।
মিয়ানমার সরকারেরই রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নেওয়া উচিৎ বলে মনে করছে অনেকে। আবার প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করছে অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিপাকে রয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা এমন মন্তব্যই করেছেন।
তিনি বলেছেন, “মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান তাদেরই করা উচিৎ। সেদেশের নাগরিকদের রক্ষার দায়িত্বও তাদের। এ ব্যাপারে মিয়ানমার ব্যর্থ হলে সেখানকার সরকারকেই আন্তর্জাতিক মহলের চাপ দেয়া উচিৎ, বাংলাদেশকে নয়। কিন্তু এ সহজ সত্যটি অনেকে বুঝতে ভুল করছে।”
গত জুনে আরকান (বর্তমান রাখাইন) রাজ্যে জাতিগত সহিংসতার মধ্যে খুন, ধর্ষণ ও উৎখাতসহ ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয় রোহিঙ্গারা। সেসময় তারা নৌকায় করে দলে দলে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে।
কিন্তু বাংলাদেশ নিজের আর্থিক অস্বচ্ছলতা এবং আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচনা করে তাদের ফিরিয়ে দেয়। সেসময় বাংলাদেশ সরকারের এ নীতিকে নিষ্ঠুর ও অমানবিক বলে মন্তব্য করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (ইউএনএইচসিআর)।
মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গারা যাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে পারে এ জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ারও আহ্বান জানায় আন্তর্জাতিক এ মানবাধিকার এ সংস্থাটি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, মধ্য জুন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিতে আসা অন্তত এক হাজার ৩শ’ রোহিঙ্গাকে জোর করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অথচ এ রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠনসহ ভয়াবহ জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে পালাতে বাধ্য হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ পাওয়া তিনটি আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাকে আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য কাজ করার সুযোগ দেওয়ারও অনুরোধ জানায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ওই তিনটি দাতব্য সংগঠন ওষুধ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার নামে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ ছেড়ে এ দেশে আশ্রয় নিতে উৎসাহ জুগিয়ে আসছিল।
এদিকে, ওআইসির মহাসচিব সংস্থাটির নির্বাহী কমিটির বৈঠকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সরকারের ছত্রছায়ায় পরিচালিত গণহত্যা, অবিচার ও নির্মূল অভিযান বন্ধের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর দমন অভিযান মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করতে জেনেভার হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলকে অনুরোধ করারও প্রস্তাব করেন তিনি।
এখন তার এ প্রস্তাব পাস হলে মিয়ানমার সরকারের ওপর সৃষ্টি হবে। কারণ, মিয়ানমার সরকারের মদদে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দেশটির কর্তাব্যক্তিদের হয়তো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
এছাড়া সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
কিন্তু এসব বিষয়ে মিয়ানমার সরকার যে তেমন পাত্তা দেয়নি তার প্রমাণ মেলে প্রেসিডেন্ট থেইন সিনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, “রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন অথবা জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) পরিচালিত আশ্রয় শিবিরে পাঠানোই রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান।”
মিয়ানমার প্রেসিডেন্টের এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনএইচসিআর’র প্রধান অ্যান্টনিও গার্টার রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে বলেন, “রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন বা দায়িত্ব নেওয়া ইউএনএইচসিআর’র দায়িত্ব নয়।”
সুতরাং সব পক্ষের মত ও অবস্থান বিবেচনায় ভাগ্যে কী আছে তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে রোহিঙ্গারা। আর সেই সঙ্গে ক্রমাগত নির্যাতন আর অনিশ্চিয়তা তাদের মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে বাধ্য করছে। ফলে নতুন করে দলে দলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ। অবশ্য এমনিতেই গড়ে প্রায় প্রতিদিন মিয়ানমার সীমান্তে ২/১ জন অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে আটক করছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।
এদিকে মুসিলম রাষ্ট্রগুলোর সংগঠন ওআইসি তাদের আসন্ন বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর পরিচালিত নৃশংস নির্যাতনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে। নির্যাতনের শিকার লোকদের সহযোগিতা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার  বিষয়টি ওআইসি সম্মেলনে স্থান পাবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে মিয়ানমার। বাংলাদেশও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। বর্তমানে কক্সবাজার ও এর আশেপাশের এলাকায় পূর্বের অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। তাই নতুন করে আর শরণার্থীর অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়।
এছাড়া, বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের জাসিংঘ শরণার্থী সনদে স্বাক্ষর করেনি তাই এর ১৯৬৭ সালের প্রটোকলের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের গ্রহন করতে বাংলাদেশ সরকার বাধ্য নয় বলে উল্লেখ করেন ওই কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলের বিভিন্ন মতকে বিভক্তি না বলে তাদের মানবাধিকার রক্ষার প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সিআর আবরার।
তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে আমরা আইনগতভাবে বাধ্য। যাদের নিজ দেশে স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ, জীবন সঙ্কাপূর্ণ এবং নির্যাতিত তাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাই যথেষ্ট। এছাড়া, জাতিসংঘ শরণার্থী সনদে স্বাক্ষর না করলেও অন্য প্রায় চারটি চুক্তিতে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। যেমন- আইসিসিপিআর, নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও শিশু অধিকারের কনভেনশন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণা অনুচ্ছেদ ১৪-এ স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রত্যেকেরই আশ্রয় খোঁজার অধিকার রয়েছে এবং নির্যাতনের সময় অন্য দেশে আশ্রয় পাওয়ার দাবি রাখে। সেদিক থেকে আমরা নীতিগতভাবেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাধ্য, এমনকি আইনগতভাবেও বাধ্য। তাই বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ করতে না দেওয়ার নীতি থেকে সরে আসা উচিৎ।”
রোহিঙ্গা মুসলমানদের সেটলার ও বাঙালি আখ্যায়িত করে আরাকান রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা মুসলমানরা নাফ নদী দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ অব্যাহত রেখেছে। মূলত টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে উখিয়ার বালুখালী পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বহু সংখ্যক রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। আবার অনুপ্রবেশকালে বিজিবি’র হাতে ধরা পড়ার পর ফিরিয়ে দেওয়া রোহিঙ্গারা ঘুরেফিরে অন্য পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সর্বপ্রথম অনুপ্রবেশ ঘটে ১৯৭৮ সালে। এরপর দ্বিতীয় দফায় রোহিঙ্গারা আসে ১৯৯১-৯২ সালে। এর পরের চার বছর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।
১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর প্রত্যাবাসন শুরু হয়। ২০০৫ সালের পর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এ প্রত্যাবাসন বন্ধ হয়ে যায়। ২০১২’তে মিয়ানমার প্রেসিডেন্টের সফরের মধ্য দিয়ে এ প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুই দেশের সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পারায় মিয়ানমার সরকার প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর বার বার পিছিয়ে দিচ্ছে বলে দেশের কূটনৈতিক মহল জানিয়েছে।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে