Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০ , ২৩ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.2/5 (52 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-২৬-২০১২

গণতন্ত্র মানে ভোটের লড়াই নয়

পীর হাবিবুর রহমান


গণতন্ত্র মানে ভোটের লড়াই নয়
গণতন্ত্র মানেই কি নির্বাচন? একবাক্যে সবাই না বলবেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার বদলের মাধ্যম হলো নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমে জনরায় নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি দল সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তার মানে গণতন্ত্রের একটি ধাপ নির্বাচন, যেখানে মানুষ যাকে খুশি তাকে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম চেতনা ছিল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত রাষ্ট্র। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে '৭২ সালে সংবিধান রচনা করে মানুষের অধিকার ও ক্ষমতার গ্যারান্টি দিয়েছিল। এমন গণতান্ত্রিক সংবিধান সদ্য ভূমিষ্ঠ জাতির জীবনে ছিল এক ঐতিহাসিক প্রাপ্তি। '৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির জনককে পরিবার-পরিজনসহ হত্যার মাধ্যমে সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার হরণ করা হয়। তার আগে '৭৫ সালের জানুয়ারিতে আজীবন গণতন্ত্রের সংগ্রামে উঠে আসা আওয়ামী লীগ নামের দলটি ও তার নেতা আপাদমস্তক গণতন্ত্রের প্রতীক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দুনিয়া কাঁপানো নেতা শেখ মুজিবকে সামনে রেখে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে মস্কোর প্রেসক্রিপশনে এবং সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির ব্যর্থ কুশীলব বামপন্থিদের আগ্রাসনে সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর জাতির জীবনে নেমে আসা ফৌজি শাসন ও কালো অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি হয়ে এ দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ ফের আওয়ামী লীগ নামের দলটির নেতৃত্বেই অধিকার আদায় ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে শামিল হয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে একদিকে আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর দুর্নীতিগ্রস্ত আদর্শহীন উচ্চাভিলাষী, উন্নাসিক নেতা-কর্মীর চরম বাড়াবাড়ি, আদর্শচ্যুত বামপন্থিদের কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা ছেড়ে শাসকের হেরেমে আশ্রয় নিয়ে নজিরবিহীন মোসাহেবি, উগ্র হটকারী জাসদ নামের সদ্য ভূমিষ্ঠ দলটির রোমান্টিক স্লোগাননির্ভর রাজনীতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের মতো পাগলা কর্মসূচি, গণমানুষের মন জয় করার পথ ছেড়ে অস্ত্রনির্ভর আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির পথে হাঁটা, সর্বহারার রাজনীতির নামে চরম নাশকতা, হত্যা, লুণ্ঠনের অতিবিপ্লবী তৎপরতা, চীনা বামদের গণতন্ত্রবিরোধী কার্যক্রম স্বাধীন বাংলাদেশকে প্রথম নেতৃত্বশূন্য করে মুজিব হত্যার পথে সেনাশাসনের জন্য রাজনীতির দখিনা দুয়ার খুলে দেয়। সিরিজ সেনাশাসন ও তাদের প্রতিষ্ঠিত দলীয় শাসনের নামে গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করে স্বৈরতন্ত্রের শাসনকালের অবসান ঘটে '৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে। ছাত্র-জনতার সঙ্গে পেশাজীবী, শ্রমজীবী মানুষের বহু রক্তের বিনিময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হলেও ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ কেবল তাদের ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছে। এ অধিকার ফিরে পেতে কত শহীদের রক্ত আন্দোলনের বাঁকে বাঁকে রাজপথ রক্তাক্ত করেছে, তা যেন গণতন্ত্রের নেতা-নেত্রীরা গত ২২ বছরে বেমালুম ভুলে গেছেন। সেলিম, দেলোয়ার, দীপালি সাহা, তাজুল, রাউফুন বসুনিয়া, শাহজাহান সিরাজ, নুর হোসেন, ডা. মিলন এভাবে বলতে থাকলে যত শহীদের নাম উঠে আসে হিসাবের খাতায়, তাদের রক্ত দিনে দিনে ব্যর্থ হলে দায়টা কাদের? লোকসানের দায় যেন শহীদদের পরিবারকেই নিতে হয়েছে। দেশ শাসনে যারা বার বার গণরায় নিয়ে এসেছেন, তারা শত শহীদের আত্দদানের মূল্য কি দিয়েছেন? সেদিন গণতন্ত্রের সংগ্রামে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি আমজনতার সঙ্গে দেশের ছাত্রসমাজ গৌরবের মুকুট পরেছিল। সেনাশাসকদের জমানায় ছাত্ররাজনীতি বর্ণময় উজ্জ্বল হলেও গণতন্ত্রের ২২ বছরে ছাত্ররাজনীতির মর্যাদা আজ কোথায়? কোন অন্ধকার তলানিতে ঠেকেছে আজ পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর ও আশির দশকের ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় উত্তরাধিকারিত্ব?

সেনাশাসকদের ছায়ায় ছাত্ররাজনীতিতে অস্ত্রের আগ্রাসন আসছে বলে ছাত্রসমাজই বার বার গর্জে উঠেছিল। কিন্তু ২২ বছরের গণতন্ত্রের জমানায় নেতা-নেত্রীদের ছায়ায় কেমন করে ছাত্ররাজনীতি টেন্ডারবাজি, দলাদলি, খুনখারাবি, মাস্তানি, চাঁদাবাজি এমনকি ধর্ষণের সেঞ্চুরি করে মূল্যবোধহীন পথে হেঁটে হেঁটে হারায় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারিত্ব? সেনাশাসন আমলে ডাকসু, রাকসু, চাকসু, জাকসু, বাকসু, ইউকসুসহ সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতি বর্ণময় উজ্জ্বল হয়েছে। ছাত্ররাজনীতি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে মর্যাদার আসন পেয়েছে। জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতিতে মেধাবী তরুণ নেতৃত্ব উঠে আসার সুযোগ পেয়েছে। ২২ বছর গণতন্ত্রের নেতা-নেত্রীরা তাদের খেয়ালি মনের কারণেই হোক, অথবা রাজনীতি থেকে আত্দমর্যাদাসম্পন্ন কর্মীদের আসার পথ রুদ্ধ করে খেয়ালখুশিমতো ব্যবসায়ী, আমলা, ঠিকাদার, আজ্ঞাবহ মোসাহেবদের হাতে দলীয় পদ-পদবি ও পার্লামেন্টের আসন তুলে দেওয়ার জন্যই হোক ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে ছাত্ররাজনীতির ভেতর দিয়ে গণমুখী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর আগমন রাজনীতিতে ঠেকিয়ে দিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যেন কাজ করেছে। আজকে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা ছাত্রসংসদের চাঁদা নিয়মিত পরিশোধ করলেও নির্বাচন কী জিনিস তা জানে না। ছাত্রসংসদ তাদের মননশীলতা ও মেধার বিকাশে কী ভূমিকা রাখতে পারে, ছাত্রদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার প্রশ্নে কত উচ্চকণ্ঠে দরকষাকষি করতে পারে, তা জানে না। গোটা দেশের ছাত্রদের সামনে ছাত্ররাজনীতিকে নেতিবাচক বিষয় বলে গত ২২ বছরে পরিচিত করানো হয়েছে। বয়স ৪০ পার হয়ে গেছে, তবুও ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে বিদায় দেওয়া হয় না। একেকটি ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্তশূন্য, প্রাণহীন সংগঠনে পরিণত। কলেজগুলোতে নিয়মিত ছাত্ররা ছাত্ররাজনীতি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে। ২২ বছরে গণতন্ত্রের নেতা-নেত্রীরা পাল্লা দিয়ে প্রশাসনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত দলীয়করণের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা করেছেন। দেশের সব বিবেকবান রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সিভিল সোসাইটি ও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মানুষের ভাষা গত ২২ বছরে কী সরকার, কী বিরোধী দল কেউ আমলে নেয়নি। সুমহান মুক্তিযুদ্ধেই নয়, এ দেশের গণতন্ত্রের সংগ্রামেও সব শ্রেণীপেশার মানুষ জীবন দিয়েছে। গণতন্ত্রের ২২ বছরে সংবিধানকে যার যার মতো সংশোধন করা হলেও গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে লালন করা হয়নি। কী সেনাশাসক, কী গণতান্ত্রিক শাসক একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করেছেন। তবুও সংবিধান জনগণের মালিকানা বহাল রাখলেও মানুষের অধিকার খর্ব করেই তারা দেশ শাসন করছেন।

পাঁচ বছর বিএনপির লাথি খেয়ে মানুষ এখন তৈরি হয় পরের পাঁচ বছর আওয়ামী লীগের লাথি খাওয়ার জন্য। আওয়ামী লীগের লাথি খেয়ে মানুষ ফুটবলের মতো গড়িয়ে যায় বিএনপির ঘরে। বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি দাঁড়াতে না পারার ব্যর্থতায় দুই দল যেন জনগণকে রাজনীতির ময়দানে ফুটবল বানিয়ে ছেড়েছে। দুই দল তাই ইচ্ছামতো জনগণ নিয়ে খেলছে। ভোটের লড়াইয়ে জনগণও কখনো ত্যক্ত-বিরক্ত-অসন্তোষ নিয়ে বিএনপিকে, আবার কখনো আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতায় এসে কে কার চেয়ে বেশি বেশি দলবাজি, লুণ্ঠনে মত্ত হবেন তার প্রতিযোগিতাই করছেন। দেশের ব্যবসাবাণিজ্য, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের হালহকিকত কোন পর্যায়ে তা দেখার প্রয়োজন তাদের নেই। ক্ষমতায় আসামাত্র সব ক্ষেত্রে একেকটি সিন্ডিকেট সরকারকে ঘিরে ফেলে ফায়দা নেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠরা উপেক্ষিত হয়। শেয়ার কেলেঙ্কারিতে সাধারণ মানুষ রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে ঘরে ফেরে। আত্দহননের পথ নেয়। সরকার তবু কেলেঙ্কারির নায়কদের ধরে না। একদল এলে প্রশাসনে আরেক দল ওএসডি হয়ে যায়। তবু কেউ শিক্ষা নেয় না।

জনগণের ঘাম ঝরা ট্যাঙ্রে টাকায় দেশ শাসনে শাসকরা মানুষ দেখেন না দলবাজ দেখেন। একুশের গ্রেনেড হামলার মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে যায়। কিবরিয়ার মতো মানুষের লাশ পড়ে, তবু ক্ষমতা চিরস্থায়ী ভেবে অন্ধ শাসকরা বিচার করেন না। ১০ ট্রাক অস্ত্রসহ কত কিছু ধরা পড়ে। তবু তাদের দণ্ড দেওয়া হয় না। মাঝখানে রাজনীতিতে অবিশ্বাস আর প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন দেশপ্রেমিক চৌকস সেনাকর্মকর্তার জীবন নিভে যায়। মানুষ হত্যাকারীদের বিচার চায়। বিচারের বিলম্বের কারণ বোঝে না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করে ট্রেড ইউনিয়নের ছায়ায় সরকারি কর্মচারীরা বিত্ত-বৈভবের প্রাসাদ গড়ে, তাদের কেউ স্পর্শ করে না। ক্ষমতায় এসে জাতির সম্মুখে একদল লুটেরা মন্ত্রী-এমপি ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গরা বিশাল অর্থ সম্পদের মালিক হন রাতারাতি। যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ, সেখানে তাদের কেউ কেউ কলকারখানার মালিক বনে যান। তাদের জন্য সব সরকারেই সাত খুন মাফ।

দেশের গার্মেন্ট শিল্প পুলসিরাতের রাস্তা অতিক্রম করছে। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মাথাব্যথা নেই। রেমিট্যান্স ও কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রম অর্থনীতিকে বিশ্বমন্দার কবল থেকে রক্ষা করলেও শ্রমবাজার ছোট হয়ে আসছে। এ নিয়েও তাদের উদ্বেগ নেই। জনসংখ্যার বিস্ফোরণ রোধে সরকার ও বিরোধী দলের চিন্তা নেই। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারত্বের আগ্রাসন থেকে তরুণদের রক্ষা করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে, কলকারখানা গড়ে তুলতে স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সংকট গোছাতে পরিকল্পনা নেই। গণতন্ত্র মানেই ক্ষমতায় যাওয়ার ভোটের লড়াই নয়। গণতন্ত্র মানেই ক্ষমতায় গিয়ে বিরোধী দল দমন নয়। গণতন্ত্র মানেই সংসদ অকার্যকর রাখা নয়। গণতন্ত্র মানেই সংসদে দাঁড়িয়ে অশ্লীল কটূক্তি নয়। গণতন্ত্র মানেই বিরোধী দলে থাকতে সংসদ বর্জন নয়। গণতন্ত্র মানেই দলীয়করণ দুর্নীতির মহোৎসব নয়। গণতন্ত্র মানেই শাসকের ছায়ায় বাস করা মোসাহেব, দলকানা ও সুবিধাবাদীদের অর্থ রুজির ব্যবস্থা করা নয়। গণতন্ত্র মানেই মানুষের অধিকার। গণতন্ত্র মানেই পরমত সহিষ্ণুতা। গণতন্ত্র মানেই সরকার ও বিরোধী দল মিলে মহান সংসদে আলাপ-আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। গণতন্ত্র মানেই ব্যক্তির শাসন নয়- সমষ্টির শাসন। গণতন্ত্র মানেই যৌথ নেতৃত্বের বিষয়। বিরোধী দল ও মানুষকে আস্থায় নিয়ে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণই গণতন্ত্র। গণতন্ত্র মানেই দুর্নীতির বরপুত্রদের ছায়া দেওয়া নয়। মায়া দেওয়া নয়। গণতন্ত্র মানেই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর শাসন। গণতন্ত্র মানেই দলবাজ প্রশাসন নয়। পেশাদারিত্ব ও মেধার জয়জয়কার। গণতন্ত্র মানে আদর্শ ও নীতিবোধের পতাকাকে ঊধের্্ব তুলে ধরে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা। ব্যক্তি বা দলের স্বার্থ রক্ষা নয়। গণতন্ত্র মানেই মানুষের ওপর জুলুম ও প্রাণহানি নয়। গণতন্ত্র মানেই আইন সবার জন্য সমান। গণতন্ত্র মানেই গুম-খুন নয়। গণতন্ত্র মানেই আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার। গণতন্ত্র মানেই জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের উত্থান নয়। গণতন্ত্র মানেই জঙ্গিবাদের পতন। গণতন্ত্র মানেই দক্ষিণপন্থিদের উত্থান নয়। দক্ষিণপন্থিদের পরাজয়। গণতন্ত্র মানেই অসাম্প্রদায়িক শাসন। সাম্প্রদায়িকতার নির্বাসন। গণতন্ত্র মানেই মানুষের অধিকার হরণ নয়, অমর্যাদা নয়, অসম্মান নয়। গণতন্ত্র মানেই মানুষের মর্যাদা ও সম্মান। গণতন্ত্র মানেই পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ নয়। গণতন্ত্র মানেই বন্ধু বন্ধু খেলা। গণতন্ত্র মানেই অরাজনৈতিক, অশালীন ভাষা নয়। গণতন্ত্র মানেই রাজনৈতিক শিষ্টাচার। কথা ও আচরণে তার প্রকাশ। যুক্তিনির্ভর ভাষণ, বিতর্ক। অতীতমুখিতাই নয়, গণতন্ত্র মানেই আধুনিকতা, বন্ধ্যত্বের কালো অাঁধার ভেদ করে উন্নয়নের পথ হেঁটে লক্ষ্য অর্জন। গণতন্ত্র মানেই শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস নয়, শান্তির সুবাতাস। গণতন্ত্র মানেই মানবিকতার পথে মানবাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র মানেই পুলিশি নয়, কল্যাণকর রাষ্ট্রের পথে হাঁটা।

গত ২২ বছরে ক্ষমতার পালা বদলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রতিযোগিতামূলকভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে। সুশাসন নির্বাসিত হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির ক্ষমতায় অাঁকড়ে থাকার প্রবণতা ও একগুঁয়েমির কারণে রাজনীতি সহিংস রূপ নিয়ে ব্যাপক জনসমর্থনের মধ্য দিয়ে জাতির জীবনে এসেছিল ওয়ান-ইলেভেন। ওয়ান-ইলেভেনের শিক্ষা শেষ পর্যন্ত রাজনীতি, অর্থনীতি, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে কারও জন্যই সুখকর হয়নি। '৯৬ সালের বিএনপির একদলীয় ভোটারবিহীন নির্বাচনও তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি। সম্প্রতি নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসতে না আসতেই ফের রাজনৈতিক বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যেতে নারাজ। পশ্চিমারা এক কথায় বলছেন, সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। আওয়ামী লীগ সরকার পরিষ্কার বলে দিয়েছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, তাদের সরকারকে অন্তর্বর্তী সরকার বলে দাবি করে তাদের অধীনেই নির্বাচন হবে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। তারা নির্বাচন নিরপেক্ষ করার আশ্বাস দিলেও বিএনপি এক আনা বিশ্বাস আনতে নারাজ। বিএনপি চায় আন্দোলনের পথে হেঁটে দাবি আদায় করে ভোটের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে। আওয়ামী লীগ চায় বিএনপি না এলে তাদের নেতাদের মামলার ফাঁদে ফেলে আন্দোলন দমনের পথে এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ জোট শরিকদের আলাদা করে দিয়ে হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠান।

সব শ্রেণীপেশার মানুষ আসন্ন রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায়। বিএনপির মতো দু-দুবার ক্ষমতায় আসা বৃহৎ দলকে বাইরে রেখে নির্বাচনের পথ হাঁটা অতীত অভিজ্ঞতায় আদৌ সুখকর ও সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সব মহলে প্রশ্ন রয়েছে। তবুও সরকার ও বিরোধী দল যার যার পথে হাঁটছে। কিন্তু দুই পক্ষ গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতায় থাকা ও যাওয়ার জন্য ভোটের লড়াইকে প্রাধান্য দিলেও রক্তে অর্জিত গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায়, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করার মতো কোনো কর্মসূচি যেমন দিতে পারছে না তেমনি মানুষের আস্থা অর্জনও করতে পারছে না। যেন দুই দল বুঝছে না গণতন্ত্র মানেই ভোটের লড়াই নয়। গণতন্ত্র মানেই ভোটে বিজয়ী হয়ে দেশ শাসন করার সুযোগ পাওয়া নয়।

লেখক নির্বাহী সম্পাদক : বাংলাদেশ প্রতিদিন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে