Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২৬ জুন, ২০১৯ , ১২ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.5/5 (136 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-১৬-২০১৬

আবুধাবিতে বিজয়া দশমী ও সিঁদুর খেলা

নিমাই সরকার


আবুধাবিতে বিজয়া দশমী ও সিঁদুর খেলা
দুর্গা মন্দিরে পূজারিরা

আবুধাবি, ১৬ অক্টোবর- দুর্গা দেবী পিত্রালয়ে এলেন। আবার চলেও গেলেন কৈলাসে। কৈলাস বা স্বর্গই তাঁর ধাম। ভালোই কেটেছে এবার। পুত্র-কন্যা নিয়ে নিষ্কণ্টক একটি সময় পার করেছেন। অন্তত বাংলাদেশের মানুষের মনে যে উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ আর শঙ্কা কাজ করছিল, তা আর ধোপে টেকেনি। এটা প্রমাণিত আজ, রাষ্ট্র বা সরকার চাইলে নিরাপত্তার শতভাগও নিশ্চিত করা সম্ভব। দেবী এবার সন্তুষ্ট। তবে তাঁর বিদায়বেলায় একটু কান্না, একটু অশ্রু, একটু আবেগ এসব তো থাকবেই।

দেবীর বিদায়কালে এই আবুধাবির হিন্দু নারীরা নিজেকে সিঁদুর রঙে রাঙিয়েছিলেন। সিঁদুর মঙ্গলের প্রতীক। ভক্তরা দুর্গার সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে সে সিঁদুর নেন নিজের কপালে। দেবীকে ধান, দুর্বা, ধূপ, দীপ, স্বর্ণ, রুপা ও মুদ্রা উৎসর্গ করে তাঁরা আসেন নিজেদের বলয়ে।


বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বাংলার পূজারি নারীরা

সীতাকে নিয়ে রাম-রাবণের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে জয়লাভের মানসে রামচন্দ্র দেবী দুর্গার পূজা করেন। আগে বসন্তকালে আয়োজন করা হতো দুর্গাপূজার। কিন্তু ব্রহ্মার পরামর্শে রাম শরৎকালে দুর্গার বোধন চণ্ডীপাঠ ও মগ পূজার আয়োজন করেন। প্রেক্ষাপটটি তৈরি হয় ভিন্ন একটি বিবেচনায়। রাবণ ছিলেন শিবভক্ত। শিব তাঁকে রক্ষা করতেন। তাই ব্রহ্মা রামকে পরামর্শ দিলেন শিবের স্ত্রী দুর্গাকে পূজা করে তাঁকে তুষ্ট করতে। তাতে রামের পক্ষে রাবণ বধ সহজসাধ্য হবে। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে রাম পূজার বিষয়টি মাথায় নেন। তারপর সন্ধ্যায় বোধন আমন্ত্রণ ও অধিবাস করেন। এরই ধারাবাহিকতায় চলে মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও সন্ধি পূজা। কিন্তু তারপরও দুর্গার আবির্ভাব ঘটে না। এমন অবস্থায় রাম ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে মহানবমী পূজার পরিকল্পনা করেন। হনুমান তাঁকে ১০৮টি পদ্ম জোগাড় করে দেন। দুর্গা রামকে পরীক্ষা করার জন্য একটি পদ্ম লুকিয়ে রাখেন। এই একটি পদ্ম না পেয়ে রাম পদ্মের বদলে নিজের একটি চোখ উপড়ে দুর্গাকে নিবেদন করতে যান। তখনই দুর্গা আবির্ভূত হন। রামকে দেবী দেন কাঙ্ক্ষিত বর। ফলে রাম রাবণকে যুদ্ধে পরাস্ত করেন। সেই জয়ের উদ্‌যাপন বিজয়া দশমী। একই দিনে দেবীরও বিদায় তাঁর পিত্রালয় থেকে।


নৈবেদ্য হাতে চারজন নারী

ওই দিন সকালেই সাড়া পড়ে যায়। তবে সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়াটির শুরু আগের রাত থেকেই। এপার বাংলার কথাই বলছি। ফোনেই সব ঠিকঠাক। কীভাবে কখন তারা এক হবেন। প্রয়োজনীয় উপাদানই বা কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আদিল নামের সম্ভার থেকে আসে ধূপ-দীপ, কেএম ট্রেডিং থেকে রেকাবি আর চাপ্পানভোগ থেকে মিষ্টি। নিউ মেডিকেল সেন্টারের সামনের খোলা জায়গা থেকে সংগ্রহ করেন দুর্বা। তারা প্রাণের অর্ঘ্য সাজান।

তাঁরা একপর্যায়ে এলেন পূজা মন্দিরে। এক জায়গায় হলেন চার ছায়া সখী। উল্কা সরকার, বকুল রানি, সুবর্ণা পাল ও সোনালি পাল। তাঁরা সিঁদুর রাঙা অনুষ্ঠানের তরুণী মা। বাঁধা বন্ধনহীন। তাঁদের প্রাণে প্রাণে স্পন্দন। করেন নৈবেদ্য নিবেদন। চমৎকার! কায়মনোবাক্যে সে সময়কার উচ্চারণ, সুখের হোক সবার জীবন। কাকলি সেন শর্মা। পুরো সপ্তাহ জুড়ে দুর্গা মন্দিরে। ক্লান্তি তাঁর মুখে। এরই মধ্যে সিঁদুর রাঙিয়েছেন গালে, কপালে। বিরাম নেই, নেচেছেন আরও তরুণীর সঙ্গে। মিলেছেন প্রাণের মেলায়। ধীরা মুখার্জি ও রুমকি দত্ত মেতে ওঠেন মূলপর্বে। দাঁড়ান প্রিয় বান্ধবীদের নিয়ে। পুষ্পার্ঘ্য হাতে এপার বাংলার সঙ্গে মিলেছেন ওপার বাংলার সদস্যদের মাঝে।

ইন্দ্রানী চক্রবর্তী বললেন, যেন নিজ দেশে আছি। সত্যিইতো তাই। প্রবাদে বলে এমন একটি সময়ের সওয়ার হওয়া ভাগ্যেরই ব্যাপার, বললেন বিমান চক্রবর্তী। প্রদীপ সেন শর্মা আয়োজকদের একজন। সেখানে আছেন কলকাতার শুভাশীষ চট্টোপাধ্যায় ও অয়ন চক্রবর্তী। আছেন এপার বাংলার প্রতিনিধি প্রণব বল ও কিশোর কুমার। আমি মতবিনিময় করি। স্বাগতিক ঔদার্যে অকৃত্রিম বন্ধনে আবদ্ধ হই আমরা।

পৃথ্বীনাথ মুখার্জি। ছবি প্রিয় মানুষ। বললেন, শিল্পীদের এ ছবিগুলো গোটা আয়োজনকে অনুপম করে তুলেছে। আমিও মনে করি নাই। মৌসুমি মুখার্জির অবদান দুর্গা দেবীর মূর্তিতে। মেটাল শিটের ওপর অ্যাক্রিলিক পেইন্টের প্রক্ষেপ। কত বর্ণাঢ্য করেই না দেবীকে নির্মাণ করেছেন।


চার বন্ধু

এক নারী সিঁদুর রাঙাচ্ছেন আরেকজনকে। বৈশালী সরকার, ঝুমা বিশ্বাস, ছন্দা ভাদুড়ি সাংহাই ও সায়ন্তিকা ডোনা নাচছেন প্রাণ খুলে। একপর্যায়ে পুরোহিত হয়েছেন ঢাকী। তমাল চট্টোপাধ্যায় ঢাকের বাদ্যে দেবীর বিদায়ী দ্যোতনা তুলছেন। ভিন্ন দৃশ্যে তখন এপার বাংলার নারীরা দাঁড়িয়ে আনন্দধামে। কথা হয় নীতা ঘোষের সঙ্গে। তিনি ছবিতলা সাজিয়ে তুলছেন। সংগঠিত করেছেন তরুণী শিল্পীদের। বললেন, বড় আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছেন তাঁরা। সোনালি হালদার, টুটুন নন্দী ও সোমা ধাপ তাঁদের ছবি ব্যাখ্যা করলেন। এ পর্বের প্রতিপাদ্য বিষয় সমসাময়িক দেবী দুর্গা। তাঁরা যাঁর যাঁর মেধায় দেবীকে এনেছেন তুলির আঁচড়ে।

সিঁদুরে সিঁদুরময় আজ চরাচর। সিঁদুর মঙ্গলের প্রতীক, সেটাই বললেন গার্গি চক্রবর্তী। তিনি তখন তার মাকে ধরে। কাঁধে ব্যাগ সুম্মিতা দাঁড়িয়ে। অর্পিতা খাটুয়ার যেন অন্য দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। আনন্দে ভাসিয়েছেন পুরো সময়। সুরমা সরকার একাই এক শ। সিঁদুর রাঙা অবস্থায় এবার এলেন মাইক্রোফোনের সামনে। নাতিদীর্ঘ বক্তব্য রাখলেন। সে কথায় তারুণ্যের বিচ্ছুরণ। সামনে তখন বৃহৎ নারীর জমায়েত। সেখানে উজ্জ্বল উপস্থিতি অদিতি হাজরার।


বাংলাদেশে পূজারি নারীরা

বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। এ যেন দেশে দেশে নয়। নয় শহরে শহরে। মনে হয় মুখোমুখি কথা হয় একজনের সঙ্গে আরেকজনের। টরন্টো থেকে শুভেচ্ছা জানান সুব্রত কুমার দাস। আমি তাঁর কল্যাণ কামনা করি। ওখান থেকে স্বাগতা দেবী পাঠালেন রসগোল্লার ঢিপি। পাতিলের পর পাতিল। এ রসগোল্লা রসে আসে না তবে তারপরও দেখে জিবে জল আসে। বিপ্লব কর্মকার; তারও মিষ্টি। অপূর্ব! মনে হয় তারই সহধর্মিণী অর্পিতাসহ হিন্দু আশ্রম থেকে বের হলেন কেবল।

রণজিৎ বিশ্বাস আছেন সিঙ্গাপুর। বিশাল এক হল। বিভিন্ন ইভেন্টে সস্ত্রীক অংশগ্রহণ তাঁর। ঢাক বাজাচ্ছেন। এইই তার শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের মাধ্যম বুঝি! অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা থেকে মিতা দে তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করলেন। দুনিয়ার সব শিশুর জন্য তাঁর এ পোস্ট। বিপ্লব দাস এলেন এ বছরে। একই দেশের ভিক্টোরিয়া শহর থেকে শুভেচ্ছা জানান শিপ্রা রানি পোদ্দার। নিজের নয় শুধু, সহযাত্রীদের ছবিও দিলেন। বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান ঢাকা থেকে সুমাইয়া ইসলাম। তিনি বলেন, তাঁর শ্রমজীবী কন্যারা দুর্গার মতো যুদ্ধ করবে অধিকার আদায়ে। আমি বলি সুমাইয়া নিজেই এ সময়ের দুর্গা দেবী। এরই মধ্যে ঢাকা থেকে আরেক ফোন। আমারই ভাইপো কানাই সরকার শুরু করলেন। হাত ঘুরে সে ফোন গেল বউমা কৃষ্ণার হাতে। তারপর তার দুই সন্তান তৃণা আর তূর্যর কাছে। তৃণা ফার্মেসিতে পড়ছে। অনার্স শেষ হওয়ার পথে। মাস্টার্স করতে চায় বিশ্বখ্যাত জায়গায়। ফোনের এ প্রান্তের সবার সঙ্গে কথা হলো। আমরা জানালাম প্রাণঢালা ভালোবাসা।

এই দশমীতে ছোটরা বড়দের কাছে যান আশীর্বাদ নিতে। বড়রা ধান-দুর্বা দেন মাথায়। আমাদের ছোটবেলায় বাতাসা খেতাম প্রচুর। সে কী মজা! মিষ্টিমুখ করেন সবাই। সমবয়সীরা কোলাকুলি করেন। এখানেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তারা প্রিয়জনদের ডেকে আনেন বাসায়। সেখানে প্রাণের কথা হয় মিষ্টিমুখে।


সিঁদুর খেলা

দেশের পূজা দেখার জন্য কলকাতা থেকে দর্শনার্থী এসেছেন। কুমিল্লায় দেখলাম ইসলাম ধর্মীরা পূজা মন্দির পাহারা দিচ্ছেন। এ এক বড় সাফল্য দেশের। এখানেও সেই সৌহার্দ্যটুকু সজীব ও সতেজ। তবে সে জন্য আছে টানাপোড়েন। ড. হাবিব উল হক খন্দকারের উদ্বেগ, ক্লাস শেষে পূজা প্রাঙ্গণে শামিল হতে পারবেন তো! ড. রায়হান জামিলের বেলায়ও একই কথা। কখন এলে পূজার পাশাপাশি ব্যাপক দর্শনার্থীর সঙ্গে দেখা হবে। আমি অনুষ্ঠান আয়োজনের কেউ নই। তারপরও দায়িত্ব নিয়েছি স্বাগত জানাতে। বলেছি যখন পারেন আসুন। এখানে পূজার ছুটি নেই। সে কারণে যে যার মতো করে মিলিয়ে নেন এ কর্মসূচি। প্রাণের আকর্ষণ বলে না কথা।

আসি বিদায়ী অনুষ্ঠানে। উলুধ্বনি দেন নারীরা। শঙ্খ কাঁসর বাজে। ঢাকের বাদ্য তোলে নান্দনিক দ্যোতনা। অনন্য এক অনুভূতির সঞ্চার হয়ে মনে। দেবী দুর্গা বিদায় নেন। ভক্তরা প্রার্থনা করেন। হে গৌরী! তুমি আবার আসবে উল্কার সঙ্গে ছুটে। পুত্র-কন্যা নিয়ে। আসবে এই সুবর্ণ গ্রামে। তুমি সোনালি আভায় ভরে দেবে চরাচর। শিউলি, পদ্ম, বকুলের পল্লিতে। ধীরে বহে মেঘনার ছেলে। আমরা যেন এক চিলতে বাংলাদেশেই আছি!

দেবী চলছেন—চলছেন—কৈলাসের দিকে। নারীদের, তরুণী মায়েদের অশ্রু গড়াচ্ছে চোখে। আঁচলে মুখ মুছছেন তাঁরা। পরক্ষণেই আবার মুখের হাসিটি চিকচিক করছে। ফের বছর পাওয়ার আশায়।

এফ/২১:২০/১৬ অক্টোবর

আরব আমীরাত

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে