Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৯ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.4/5 (66 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-২৯-২০১৬

সৈয়দ শামসুল হকের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

শামীম রেজা


সৈয়দ শামসুল হকের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার
শামীম রেজাকে দেওয়া সৈয়দ শামসুল হকের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

বিশ্বসাহিত্যের নানাবিধ প্রসঙ্গ নিয়ে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে কথা বলেছেন কবি শামীম রেজা। এই আলাপচারিতায় উঠে এসেছে বাংলা সাহিত্য-সহ বিশ্বসাহিত্যের নানা বিষয়। বিশেষত, বাংলা কথাসাহিত্য, নাটক, অনুবাদ সাহিত্য ও চিত্রকলা নিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের মতামত প্রণিধানযোগ্য। এই সাক্ষাৎকারটি লন্ডনভিত্তিক একটি ইংরেজি ম্যাগাজিনের জন্য নেওয়া হয়েছিল।

শামীম রেজা : সাহিত্যে সকল শাখায় এমন কি চিত্রকলার বিভিন্ন শাখায় আপনার সৃজন কর্ম আছে, সেই জায়গা থেকে বললে রবীন্দ্র উত্তরকালে সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় আপনার অবাধ বিচরণ, যা অন্য কোনও বাংলাদেশি লেখকের মধ্যে আমরা দেখতে পাই না, বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় বাংলা সাহিত্যের কবিতা, গল্প, উপন্যাসকে কোন জায়গা থেকে বিচার করতে চান?

সৈয়দ শামসুল হক : খুব সংক্ষেপে যদি বলি কবিতায় বিশ্বমান আমাদের রচনায় পাওয়া যাবে। নাটকেও পাওয়া যাবে। গল্প-উপন্যাস অপেক্ষাকৃত দুর্বল। ছোটগল্পে হয়তো সামান্য দু‘চারটে ব্যতিক্রম ছাড়া।

শামীম রেজা : এই মানটা নিরুপণ মানে আমরা অনুবাদের মাধ্যমেই করবো, আমাদের তো সেই রকম মানের অনুবাদ হয় নাই, বাংলাদেশের সাহিত্যের কথা বলছি মানে বাংলা সাহিত্যের কথা বলছি...। বাংলা সাহিত্যে বিশ্বমানের বেশ কিছু উপন্যাস রচিত হয়েছে; বাংলা মানে এপার বাংলা-ওপার বাংলা, আপনার মত কি?

সৈয়দ শামসুল হক : অনুবাদ হয় নাই, হবার দরকার কী, আমরা তো পড়তে পারছি, আমরা তো বুঝতে পারছি যে, উপন্যাস কোথায় গিয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকায়, লাতিন আমেরিকায়, জাপানে উপন্যাস কোথায় গিয়েছে; সেই তুলনায় আমাদের কথাসাহিত্য একটু পিছিয়ে আছে। বিদেশিদের বোঝার দরকার কী, আমি নিজে বুঝবো আগে, তারপর তো তারা বুঝবে। তবে কী জানো, ভালো কিছুই হলেই সন্দেহ হয় যে বাইরে থেকে এসেছে। কেউ কেউ বলেছিলেন যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ আলব্যেয়ার কামুর ‘প্লেগ’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা। নবনীতা দেবসেন প্রবন্ধে লিখে দেখিয়েছেন, তথ্য যাচাই করে দেখিয়েছেন- প্লেগের প্রকাশকাল ১৯৪৭, পুতুল নাচের ইতিকথা ১৯৩৬। অর্থাৎ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মাত্র ১১ বছর পূর্বে এমন বিশ্বমানের উপন্যাস লিখেছেন, যার অনুবাদ হয়নি তখনও, যথার্থ মূল্যায়ন পাননি তিনি। বাংলা সাহিত্যের সুবিশাল ঐতিহ্যের কথা বাদ রেখে বাংলাদেশের সাহিত্যে যার বয়স ১৯৪৮ সালের দেশ বিভাগের পরে, মাত্র ৬৭ বছরে মানসম্পন্ন উপন্যাস লেখা কম হয়েছে। তরুণদের মধ্যে আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।

শামীম রেজা : আমাদের আপনি যে কবিতার মানের কথা বললেন এবং নাটকের মানের কথা বললেন, ধরা যাক, আপনার নাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় যদি মঞ্চস্থ হয় অন্য ভাষায়, সেটা স্প্যানিশ হতে পারে, ফরাসিতে হতে পারে, সেখানে আমি যে আবেদনটা পাচ্ছি, প্রথম আবেদন আমি আমার ভাষায়, সেই আবেদনটাকে কী আমরা ঐ ভাষায় একই রকমভাবে পাবো?

সৈয়দ শামসুল হক : ভাষার একটা সীমাবদ্ধতা আছে এবং কখনোই পূর্ণ মাত্রায় এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় গেলে মূল আবেদনটা পাওয়া যায় না। এটার একটা কমতি থেকেই যায়। তারপরও বিদেশি নাটক কী আমরা সবটাই বুঝি, আমরা এই সবটাই বলছি শেক্সপিয়রের নাটকের ভাষার সঙ্গে আমাদের এতো ভালো সম্পর্ক বা বসবাস; কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে, বাংলাদেশে, আমি বলতে পারি এমন একজনও নাই যে বলতে পারবে শেক্সপিয়রের নাটকে পুরোটাই তার মর্মে গিয়ে পৌঁছেছে। You have to born into a language, এটার একটা ব্যাপার আছে। আমি প্রতি বছর ইংল্যান্ডে যাই এবং ইংল্যান্ডের নিসর্গ, মানুষ, অপরাহ্ণ, মধ্যরাত কত স্বাভাবিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি, কিন্তু কতটা বুঝতে পারি। এটা একটা...। তখন অনেক লেখা, কবিতা, আমার কাছে নতুনভাবে মনে হয়েছে যে এটা আমি মিস করেছি। এটা তো আমি দেশে বসে পাইনি। এমনকি সরাসরি ইংরেজি অনুবাদও পাইনি। তো সেই ধরনের একটা দূরত্ব তো থেকেই যায়। আমি মনে করি যে কোনও ভালো কাজের উত্তরাধিকার পৃথিবীর সকল মানুষ।

শামীম রেজা : আপনি বলছিলেন ভাষার সীমাবদ্ধতা, অনুবাদের সীমাবদ্ধতার কথা। তবু আমরা বিভিন্ন ভাষার অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের রস আস্বাদন করি। কারণ একজনের পক্ষে এত এত ভাষা শিখে সাহিত্যের রসাস্বাদন সম্ভব নয়। রবার্ট ফ্রস্টের একটা উক্তি আছে, কবিতার অনুবাদে মূলের মহিমার ন্যূনায়ন ঘটে, অনুবাদকে তাই বলা যায় বিশ্বাসঘাতক। কবি ফ্রস্টের আগেও অনেকে বলেছেন, অনুবাদকালে মূলের যে অংশ বাদ পড়ে যায় অবধারিতভাবে, সঞ্চারিত হতেই পারে না, সেইখানেই থাকে সত্যিকার কবিতা। আপনি কোন মাত্রা দিয়ে বাংলা কবিতাকে, বিশ্বকবিতার সাথে তুলনা করেছেন, আপনার পরানের গহীন ভিতর অনূদিত হলে মূলের অধিকাংশ হারিয়ে যাবে...।

সৈয়দ শামসুল হক : আমার শুধু এই কবিতার বই কেন, আমার যে কোনও কবিতা বা বই আমি মনে করি যে অনুবাদ হলে বিশ্ব পাঠক মহলে সমাদ্রিত হবে। তবে ভাষার সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখে, সবটাইতো আর আসবে না। এরপরেও স্পর্শ করা যায়। ছায়া দেখলেও অনেক সময় উচ্চতাকে বোঝা যায়।

শামীম রেজা : কারো কারো মতে, বাংলা ভাষায় এখনো কাজের ভাষা হয়ে ওঠেনি। যেমন, বিজ্ঞান, দর্শন, মানে চিকিৎসায় নিজেদের পরিভাষা তৈরি হয়নি কিন্তু সাহিত্যের মান...।

সৈয়দ শামসুল হক : এটা বাজে কথা, এটা বলছে তারাই যারা মানে বাংলা ভাষাকে পেছনে ঠেলে দিতে চায়।

শামীম রেজা : বাংলা ভাষা বা সাহিত্য মোটেও দুর্বল নয়, কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। আপনি এত বছর ধরে লিখছেন, যার লেখক জীবন বাংলাদেশের সমবয়সই। দেশ বিভাগ থেকে শুরু করে আপনার লেখার মধ্যে ঢুকেছি। এখানে কেন পামুকের মতো বা ইসমাইল কাদেরের মতো, কিংবা তাইব সালের মতো, স্যামবেন ওসমানের মতো যারা তুর্কি, কেউ নাইজেরিয়ান, কেউ আফ্রিকান...।

সৈয়দ শামসুল হক : I am not go there at all. আমার কাজ লিখে যাওয়া। একজন লেখক যেটা ভাষায় লেখে, এবং যে ভাষায় লেখে, সেই ভাষাভাষী মানুষের জন্য লেখে; The whole world is not my focus এবং কেউ যদি অনুবাদ নাও করে থাকে সেটা তাদের দায়। Not my misses. ওসমান স্যামবেন তো ফরাসি ভাষায় লিখতো। আফ্রিকার অনেক বড় লেখক তারা হয়তো ফরাসি, নয়তো বা অন্য ভাষার। পামুকের সুবিধা হচ্ছে, পামুকের সেখানে অনুবাদক আছে। আমার এখানে অনুবাদক গড়ে ওঠেনি। সে দায়িত্ব আমার না। I can`t biologocaly produced, or translated আমার কাজ লেখা, আমার ভাষায় লেখা। আমার ভাষাভাষী মানুষের জন্য লেখা এবং My soul focus is on my mine.

শামীম রেজা : আমি যদি বলি যে, আপনি আপনার লেখায় অনুবাদকদের টানতে পারেননি, সেই সমমানের অনুবাদক তৈরি হয়নি বাংলাদেশে...।

সৈয়দ শামসুল হক : সেটা তোমাদের মতামত, আমার মতামত না। I am not bother.

শামীম রেজা : সেটা কিন্তু আমাদের বাংলায় না, আপনি একা না, মানে বাংলা সাহিত্যে বা বাংলাদেশের সাহিত্যে কাউকেই টানতে পারেনি।

সৈয়দ শামসুল হক : আমি মনে করি এটা আমার concern নয়। The lose is not mine. I am not writing for the world community. I am writing for my language, lives language.

শামীম রেজা : আপনি তো সে কথাটাই আপনার লেখায় বলেন, যে আমার ব্যক্তিগত সত্ত্বাটা সেটা যখন সর্বজনীন সত্ত্বায় পৌঁছে যায়, তখন আপনার অনুভূতি সকলের অনুভূতিতে একই অনুরণন তোলে?

সৈয়দ শামসুল হক : Lose তো তাদের। Not mine, not at all, যারা পড়বে না তারা আমাদের সম্পর্কে জানবে না, এইতো।

শামীম রেজা : আরেকটা ব্যাপার, যেমন এটা নিয়ে খুব কথাও হয়, আপনি যাদের উত্তরাধিকার বহন করছেন বাংলা সাহিত্যে কিংবা বিশ্বসাহিত্যে তাদের সম্পর্কে একটু শুনতে চাই...।

সৈয়দ শামসুল হক : সবাই আমার Great masters all over the world; যে Language এ আমি,I was born, আমি দ্বিতীয় যে Language ইংরেজি ভাষা তার মাধ্যমে, অনুবাদের মাধ্যমে, যেখানে যা ভালো লেগেছে, সকল Great masters এর কাছে আমি ঋণী।

শামীম রেজা : তলস্তয় এত কঠিন ছিল যে আমার ভালো লাগে নাই- বোর্হেস ইন্টারভিউতে বলেছেন, এমনকি রবীন্দ্রনাথের ভালো লাগেনি তলস্তয়।

সৈয়দ শামসুল হক : আমার সেরকম না। আমি যতটা পেরেছি বা দেখেছি পড়েছি। তলস্তয়ও পড়েছি। আমি এখন চার ঘন্টা লিখলে, চার ঘন্টা পড়ি। আমি যতটা সময় লিখি ততটা সময় পড়ি। আমি মনে করি মানুষের অভিজ্ঞতা দু রকমের- পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাটা আমার জীবন, দেখা, আমার যাপিত জীবন আর পরোক্ষ অভিজ্ঞতাটা হল শোনা অথবা পড়া। তো পড়ার চেষ্টা করেছি। ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে যাদের পেয়েছি, এত বিস্তর পুরো এক জীবনের অর্ধেকের বেশি সময়টাইতো পড়েছি।

শামীম রেজা : এ কথা থেকে একটু মনে হল যে, মার্কেস এবং ফুয়েন্তেস দুইজনে মিলে লাতিন আমেরিকায় ফিল্ম ইন্সটিটিউট তৈরি করেছিলেন প্রথম। আপনি তো গিয়েছিলেন বোম্বে। ফিল্মের স্বপ্ন দেখা, ফিল্ম নিয়ে এমন চিন্তা ভাবনা হয় নাই যে আপনি একটা ফিল্ম ইন্সটিটিউট করবেন যা বাংলাদেশে অতীব প্রয়োজনীয়?

সৈয়দ শামসুল হক : না। তাহলে তো অনেক কিছুই করতে হতো। তাহলো তো এদেশের জনপ্রিয় যেটা, রাজনীতি; সেটা করা সম্ভব নয়। না, সেটা নয়, লেখাটাই আমার একমাত্র কাজ এবং যেটা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যেটা একা মানুষের কাজ এবং একটি সময়ের ভেতরে আমাকে করতে হয়। আমি নিঃসঙ্গ মানুষ। আমি বন্ধুহীন মানুষ।

শামীম রেজা : ব্যক্তিগত সত্ত্বার সঙ্গে আপনার যে নিঃসঙ্গতার কথা বলেন, কিন্তু আপনার তো ভালো অনেক বন্ধু ছিলেন বা ছিল অনেকেই...।

সৈয়দ শামসুল হক : আমার কাজটা যা হচ্ছে একটা মানুষের। আমি নিঃসঙ্গ, আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে বইও লিখেছি- তিন পয়সার জ্যোৎস্না। আমার সময়ে যারাই আছেন- শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আলাউদ্দীন আল আজাদ; বেড়ে উঠেছি একসঙ্গে। নিঃসঙ্গতা হচ্ছে আমার কাজের। আমার টেবিলে আমি একা। তোমরা যখন আড্ডা দিচ্ছো, আমি তখন ঘাম ঝরাচ্ছি শূন্য খাতার পাতায়।

শামীম রেজা : এরকম আড্ডা দেননি আপনি?

সৈয়দ শামসুল হক : আমাকে কেউ বলতে পারবে না যে আমি আড্ডায় একেবারে মগ্ন। আমি গেছি বিভিন্ন জায়গায়, যারা আড্ডা দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে বসেছি। কিন্তু আমি মানুষ হিসেবে একা এবং আমি মনে করি যে আমি এই স্বাতন্ত্র্য থেকে উপকৃত হয়েছি, ক্ষতি হয়নি। আমি প্রচুর সময় পেয়েছি পড়বার, জানবার, বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হবার। আমাদের এখানে নিয়মিত যা লেখা বের হয় আমি তা নিয়মিত পাঠ করার চেষ্টা করি। কারণ আমাকে জানতে হয়, কারা কী ভাবছে। তাদের কলম থেকে কী অক্ষর বের হচ্ছে। কারণ, আমি একা মানুষের কাজ বলছি, কিন্তু সাহিত্য যখন বের হয় তা কিন্তু একা মানুষের কাজ থাকে না। এর ভিতরে আমি একা। এইটা কিন্তু বুঝতে হবে। আমি সবসময়ই একটা ঘোর, যার মধ্যে দেখবে কারো সঙ্গে আমার ঝগড়া নেই, কারো সঙ্গে আমার বিশেষ কোনও প্রেমও নেই।

শামীম রেজা : যেহেতু প্রেমের কথাই আসল, অনেকেই বলে যে, লেখালেখিতে অভিজ্ঞতা অনিবার্য। যে অভিজ্ঞতা মানব মানবীর সম্পর্ক- প্রেম, আপনি তো দু‘টো কথাই বললেন যে, এক- পড়ার জ্ঞান আরেকটা অভিজ্ঞতার জ্ঞান। আপনার জীবনে এমন কোনও ঘটনা আছে, যে ঘটনা আপনাকে রাতের পর রাত, দিনের পর দিন লিখতে বাধ্য করেছে? এরকম কোনও ঘটনা...।

সৈয়দ শামসুল হক : Life itself. কারণ আমি মনে করি যে, অত্যন্ত নাটকীয় সময়ে আমি জন্ম নিয়েছি। আমার জন্মের পরপরই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। আমার যখন প্রথম কৈশোর তখন দেশভাগ। আবার কৈশোর থেকে যখন যৌবনে পা রাখছি তখন ভাষা আন্দোলন। যৌবনটা যখন বেশ জমে উঠেছে তখন সামরিক শাসন। কী বলব? তারপরে আমি হিন্দুপ্রধান জায়গায় জন্মেছি, মুসলিম ঘরে জন্মেছি, ব্রিটিশ আমলে জন্মেছি। So, I had all the access. To these... great... you see... কাজেই আমি মনে করি যে, সবদিক থেকেই এটা আমকে লেখালেখিতে সাহায্য করেছে। আর মানব মানবীর প্রেমও তো সবার জীবনেই আসে, এবং আমার জীবনের দুটি ঘটনা- একটা হচ্ছে দেশভাগ আরেকটা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। এই দুটি বিশাল মাপের ঘটনা আমাকে তৈরি করে দিয়েছে।

শামীম রেজা : এখন উপন্যাসের মধ্যেই যাই, আপনার মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই অনেক উপন্যাস; তার মধ্যে দ্বিতীয় দিনের কাহিনী-ই বলি, ত্রয়ীর কথাই বলি। দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’র মধ্যে যে দম বন্ধ করা জায়গা যেখানে ডায়লগ নাই, আমাদেরও দম বন্ধ করে পড়তে হয়েছে- এই ফর্মটাই কি বেছে নিয়েছেন আপনার সময়টাকে বোঝানোর জন্যে?

সৈয়দ শামসুল হক : তাই, যে কোনও ফর্মই তো তৈরি হয় তোমরা, তুমি কীভাবে পৌঁছতে চাও, কী জিনিসটায় পৌঁছতে চাও; সেটি এবং ঐ উপন্যাসের একটি রিপোটিং-এর মতো করে লেখা হয়েছে। ওখানে দেখবে কোন সংলাপ নেই, এবং নিজের ভেতরের কোন ভাবনাকে প্রকাশ করা হয়নি এবং কিছু এক্সটা বর্ণনা করা। কিন্তু আমি চেয়েছি যে, এমন একটাভাবে লিখব যাতে লোকে তার ভেতর দিয়ে ভাবতে ভাবতে ভাবনাগুলোকে নিজের ভেতর আবিষ্কার করে।

শামীম রেজা : এই লেখাগুলো যখন অনূদিত হবে তখন যে জাতিসত্ত্বার মানুষগুলোর রাজনীতি ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকেও তো পাঠকের জানতে হবে। যদিও প্রত্যেকা মানুষের মধ্যে অভিন্ন প্রেম-বিপ্লব-বিদ্রোহের অনুভূতি থাকে। তো যখন এক ভাষা থেকে অনূদিত হয়ে অন্য ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছবে, তখন তাদেরও কি আমাদের সমাজ বাস্তবতা সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা থাকতে হবে?

সৈয়দ শামসুল হক : এটা অনুবাদ করে দেখতে হবে, এবং যারা করবে, তাদের কাছে জেনে দেখতে হবে। তবে যেকোন মানের গল্প-উপন্যাসের একটা তো দেশ-মানুষ এবং সেই দেশ-মানুষ আলাদা কিছু না। তাদের একটা পটভূমি আছে, ইতিহাস, ঐতিহ্য আছে। এ সম্পর্কে ধারণা না থাকলে কিন্তু এটা বোঝা যাবে না। কিছু কিছু ধারণা থাকতেই হবে। আমার উপন্যাস-গল্পের অনুবাদ যে মানুষের কাছেই পৌঁছাক না কেন, তাদের কিছুটা তো জানতে হবে যে আমার দেশটা কী, আমার ইতিহাস কী, আমার সাংস্কৃতিক প্রতীক কীÑতাদের বুঝতে হবে। এটা না বুঝলে তো আমাদের গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক বোঝা সম্ভব হবে না।

শামীম রেজা : আমি আপনার কাছে জানতে চাই যে, আপনার প্রিয় উপন্যাস বা আপনার কোন লেখাটি প্রিয়?

সৈয়দ শামসুল হক : এটা আমার পক্ষে বলা ঠিক হবে না। আমি আমার লেখা দ্বিতীয়বার ফিরে পড়ি নাই আজ পর্যন্ত। লেখা হয়ে গেলে তা মনে হয় পাঠকের।This is a sadness যে এতদিন আমার ছিল আজ তা পাঠকের বা সকলের। আমার লেখা পড়ে আমারটা বলা খুব মুশকিল। সাধারণত যেটা কাজ করে যে, আমি সব লেখাই আমার একটা দৃষ্টিভঙ্গি এই যে, ঠিক যেরকমটি চেয়েছিলাম সেরকম বুঝি হয়নি বা পারিনি। এজন্য আমাকে আবার অন্যরকমভাবে শুরু করতে হবে। আবার ভাবনায় যা আছে তা তো লেখা যায় না সবসময়। আমি একটি জিনিসে বিশ্বাস করি No one has written their masterpiece. No one, not even শেক্সপীয়র, তলস্তয়, কেউ লিখতে পারেনি। কারণ তাদের মাথার ভেতরে যা ছিল তার প্রতিচ্ছবি বা ছায়াটুকু আমরা পড়েছি। আর তারা সবটুকু দিতে বা লিখতে পারেনি।

শামীম রেজা : শেষ প্রশ্ন, আপনি চিত্রকলার অনেক শাখায় কাজ করেছেন, প্রদর্শনী কবে করবেন?

সৈয়দ শামসুল হক : হ্যাঁ, অনেক ছবি এঁকেছি, যা নিতান্তই সখে, অবসর সময় কাটানোর জন্য আড্ডা দিয়ে নয়। আড্ডা দিয়েছি আমার স্টুডিওর ছবির ক্যানভাসে। আমার আশিতম জন্মবার্ষিকীতে প্রদর্শনী করবো। ভালো থেকো। 

এফ/১০:২০/২৯ সেপ্টেম্বর 

সাক্ষাতকার

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে