Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯ , ৪ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 4.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-১৯-২০১২

ঈদ ছুটিতে বাংলার পথে

ঈদ ছুটিতে বাংলার পথে
বাংলার অপরূপ রূপে বিমুগ্ধ প্রিয় কবি জীবনানন্দ বলেছিলেন, বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর । আধুনিক উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতা মানুষকে দিয়েছে বেগ। কর্মব্যস্ত জীবনের চাপে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষ ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে অনেকেই চিরচেনা দেশের সীমানা পেরিয়ে নির্মল আনন্দ আর অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে যাচ্ছে বিদেশ। কিন্তু প্রিয় স্বদেশের সমুদ্রের নীল জল, নিশ্চুপ পাহাড়, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের রহস্যঘেরা সবুজ অরণ্য, সবুজ-শ্যামলে ছেয়ে যাওয়া স্নিগ্ধ চা বাগানের নির্জন সৌন্দর্য, হিজল-তমালে ঘেরা হাওর, ভাটিয়ালি জারি সারি গানে উদাস করা নদ-নদী আর ঝরনাধারা দেখার জন্য কার না হৃদয়ে জেগে উঠে কোমল আবেগ। দেশের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি অনুসন্ধানে একবার ঘুরে আসতে পারেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রাম, পুণ্যভূমি সিলেট, দিগন্তপ্রসারী প্রান্তরের দেশ উত্তরবঙ্গসহ জীবনান্দের ধানসিঁড়ি ও সোনালি ডানার চিলের আখ্যান দক্ষিণাঞ্চল।
বিচিত্র সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্রগ্রাম
বারো আউলিয়া, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী নায়ক মাস্টার দা সূর্য সেন, আর মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথায় সমৃদ্ধ বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিধাতা অকৃপণ হাতে আপন শৈল্পিক তুলিতে সাজিয়েছেন। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ধর্মীয় সম্প্রীতির নজির একে দিয়েছে অনন্য এক সৌন্দর্যের মহিমা। চট্টগ্রামে গেলে ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকরা যেসব জায়গা ঘুরে দেখতে পারেন তার মধ্যে অন্যতম হলো চন্দ্রনাথ পাহাড়, বারো আউলিয়ার মাজার, বায়োজিদ বোস্তামীর মাজার, রাণী রাসমণি বিচ, ফয়স লেক, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, পারকি সৈকত, বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত, সন্দ্বীপ। চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম আকর্ষণ ফয়স লেক। ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে রেলকর্মীদের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য পাহাড় কেটে তৈরি করা হয় এ লেক। কৃত্রিম এ লেককে যে কেউ প্রথম দর্শনে শান্ত ছোট নদী ভেবে ভুল করে বসতে পারেন। পাহাড়ের বুক চিরে পানির এমন শান্তধারার টলমল ধারা, ঝিরিঝিরি বাতাসে ঢেউ খেলা যে কাউকে মুগ্ধ করবে অনায়সে। লেকের কটেজে রয়েছে থাকার ব্যবস্থা। পাহাড় কোলে অবস্থান করে উপভোগ করতে পারেন রাতের সৌন্দর্য। এছাড়া চট্টগ্রামে বেড়ানোর মতো জায়গার মধ্যে অন্যতম চন্দ্রনাথ পাহাড়। হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে তীর্থস্থানের মতো এ পাহাড়ে উঠতে চোখে পড়বে শংকর মঠ, ভৈরব ধর্মশালা, শ্মশান, রামকৃষ্ণ সেবা আশ্রম। শহর থেকে মানুষের শহর থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত। ২ কিলোমিটারের এ সমুদ্র সৈকতে আছড়ে পড়ে সমুদ্রের ঢেউ। কথা সাহিত্যিক হরিশংকর জলদাসের গল্প উপন্যাসের অনেক আখ্যান রচিত হয়েছে এ সৈকতের জেলেপাড়ার জীবনকে কেন্দ্র করে। শহর থেকে নিরাপদ দূরত্বের এ সৈকতে যে কোন সময় অনায়সে ঘুরে আসা যায় কম সময়ে কম খরচে।
সমুদ্র বিলাসে কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন
কক্সবাজার বললেই কল্পনার সেলুলয়েডে ভেসে উঠে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন, দিগন্তপ্রসারী জলের আহ্বান। ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এ সৈকত পর্যটন শিল্পে পৃথিবীর বুকে আমাদের অহঙ্কার। সমুদ্রের বুকে সূর্যাস্তের দৃশ্য বড়ই মনোরম। একবার সমুদ্রে গেলে সমুদ্র বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। কক্সবাজারের হিমছড়ি ও ইনানি সৈকতে সমুদ্রের ভয়াল সুন্দর রূপ পর্যটককে মাতাল করবেই। টেকনাফের নাফ নদী দিয়ে যখন মিয়ানমারের কোল ঘেঁষে সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে জাহাজ ছাড়ে তখন কেবলই মনে পড়বে চিরচেনা পৃথিবীর বাইরে এক স্বর্গীয় ভুবনের গল্পের কথা। নদী ছেড়ে সমুদ্রে জাহাজ পড়লে চোখ জুড়াবে নীল জলের হাতছানিতে। তিন ঘন্টার সমুদ্র যাত্রা শেষে প্রবাল পাথর আর নারিকেলের সারি সারি বাগান দেখে শান্ত স্নিগ্ধ সেন্টমার্টিন দ্বীপকে মনে হবে রাজসিক কল্পনার কোন ভুবন। সেন্টমার্টিন থেকে জেলে নৌকায় করে সর্বশেষ প্রান্ত ছেড়া দ্বীপে পৌছে বালিয়াড়ি, নীল জল, সীমাহীন জলের বিস্তার ভাবুক মানুষের কল্পনার জগতে নীরবে জলরাশির বিশাল ঢেউয়ের মতো নাড়া দেবেই। চিরচেনা চিন্তার জগতে আলোড়ন তুলবেই। আনমনা হয়ে এমন অসম্ভব সুন্দর যে আজও উপভোগ করেনি সে কোনদিন জানবে পৃথিবী রূপে রসে কত সমৃদ্ধ। সেন্টমার্টিনে রয়েছে লেখক হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি ‘সমুদ্র বিলাস’। সাগর পাড়ের এমন সৌন্দর্যের মায়াময় জগত ছেড়ে যাত্রীবাহী জাহাজ যখন নীলজল ভেঙে ক্রমেই চিরচেনা লোকালয়ে ফেরে তখন কেবলি মনে পড়বে মৌসুমী ভৌমিকের গাওয়া গান, ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউয়ে চেপে নীলজল দিগন্ত ছুয়ে এসেছ। আমি শুনেছি সেদিন তুমি নোনাবালি তীর ঘেঁষে বহুদূর বহুদূর হেঁটে এসেছ। আবার যখন তুমি সমুদ্রস্নানে যাবে আমাকেও সাথে নিও। নেবে তো আমায়?’
পার্বত্য চট্টগ্রাম
বান্দরবান: প্রকৃতির মধ্যে দুর্গম ও কঠিন সৌন্দর্যের নাম বান্দরবান। এ জেলার নামকরণের রয়েছে মজার ইতিহাস। বান্দরবান শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি ঝরনা। সেই ঝরনার লবণাক্ত পানি পান করার জন্য বানরের দল সারিবদ্ধভাবে হাতে হাত ধরে শঙ্খ (সাঙ্গু) নদী পার হতো। নদী পার হওয়ার সেই দৃশ্যকে বাঁধের মতো লাগতো। এই বাঁধকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বন বলা হয়। বানর আর বন/বাঁধ থেকে এক সময় এর নাম দাঁড়ায় বান্দরবান। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত কেওক্রাডং ও তাজিনডং। এ পর্বত দু’টির উচ্চতার বিতর্ক এখনো অমীমাংসিত। শহর থেকে রুমা বাজার হয়ে যেতে হয় এ দুই পাহাড়ের সর্বোচ্চ পীঠদেশে। কষ্টসাধ্য বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়। তবে রহস্য ও রোমাঞ্চে ভরা জীবনের গল্প তৈরি করা এ যাত্রাপথ স্মরণীয় হয়ে থাকবে অনেক দিন। বান্দরবান থেকে ৫৪ কিলোমিটার দূরের নীলগিরি রিসোর্টে সাদা মেঘপুঞ্জের সান্নিধ্যে করা যেতে পারে বসবাস। জোছনা প্লাবিত রাত হলে মুগ্ধ হয়ে আবৃত্তি করতে ইচ্ছে করবেই,‘জেগে উঠে হৃদয়ের আবেগ/পাহাড়ের মতো অই মেঘ সঙ্গে লয়ে আসে/ মাঝরাতে কিংবা শেষ রাতে আকাশে/’
এছাড়াও বান্দরবানের ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি না বগা লেক, জাদিপাই, শঙ্খ নদী, চিম্বুক পাহাড়, লামা, নাইখংছড়ি ঘুরে আসেন। মারমা সংখ্যাধিক্য এ জেলায় মুরং, ত্রিপুরা, বম, তঞ্চঙ্গা, চাকমা, খুমি, লুসাই, পাংখো জাতিগোষ্ঠীর মানুষজন রয়েছে।   
রাঙামাটি: রাঙামাটির কথা মনে পড়লেই আপন মনে হৃদয় কোণে বেজে উঠে রবী ঠাকুরের গান, গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ আমার মন ভুলায় রে...  রবীন্দ্রনাথ কখনও ওদিকে পা মাড়াননি। তবে তার গানের সুরের মতো করে রাঙামাটির মাটি রঙিন না হলেও লালচে মাটির এ জেলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য মন রাঙিয়ে দেবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের একমাত্র রিকশাবিহীন এ শহরে আছে থাকার সুব্যবস্থা। কাপ্তাই লেকে পাহাড়ের চারপাশে নৌকায় চড়ে ঘোরাঘুরি, ঝুলন্ত ব্রিজ দেখা আর শুভলং ঝরনার যাত্রা পথের দু’ধারের অবিরাম সৌন্দর্যের হাতছানির কোন তুলনা হয় না। শহরের উত্তর-পশ্চিম কোণে গড়ে ওঠা শুভলং-এর পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরণা দেখে মনে হয় এ যেন ভালবাসার অঝোর ধারা, বৃষ্টি। এছাড়াও রাঙামাটিতে পেদাটিংটিং, রাজবাড়ি, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট, বাঘাইছড়ি, রিজার্ভ বাজার, নানিয়ার চরের বুড়ির ঘাটে অবস্থিত বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফের সমাধিস্থল ঘুরে আসতে পারেন।
খাগড়াছড়ি: দুই দিকে স্বদেশের সীমানা আর উত্তর-পশ্চিম কোণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য বেষ্টিত মায়াবি রহস্যে ঘেরা জেলা খাগড়াছড়ি। পাহাড়, নদী, অরণ্য, বন্য উদ্ভিদ, লতা, গুল্ম, ফুল সবই আছে। উপজাতিদের সংখ্যাধিক্য ও মাচাং টাইপ ঘরের নির্বিবাদ জীবন, পাহাড়ের ঢালে কিংবা খাজে জুম চাষ সংগ্রামী জীবনের প্রতিনিধিত্ব করে। চান্দের গাড়িতে করে ভীষণ দুর্গম চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সাজেক ঘুরে আসার স্মৃতি মনের মুকুরে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে অনেকদিন। লুসাই সম্প্রদায় অধুষ্যিত আদিবাসিদের সংগ্রামী জীবনযাপন, নিঝুমবন, উদ্ধত পাহাড়, চোখ জুড়ানো সবুজের আধিপত্য যে কার মনকে আকুল করবেই। খাগড়াছড়িতে এছাড়াও রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাম্বলীদের তীর্থস্থান আর্য বনবিহার বৌদ্ধমন্দির, আলুটিলা, মানিকছড়ি, রামগড়, শান্তিপুর অরণ্য কুটির।
ভূ-প্রকৃতির লীলাভূমি সিলেট
হযরত শাহজালাল ও শাহপরানসহ ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতিধন্য কর্মভূমি, শ্রীচৈতন্যের পিতৃভূমি, মরমি গায়ক হাসন রাজা, বাউল সম্রাট আবদুল করিমের স্মৃতিবিজড়িত ভূ-প্রকৃতির বিচিত্র লীলাভূমি বৃহত্তর সিলেট। এখানে রয়েছে চা বাগানের শৈল্পিক সবুজ পাহাড়, মেঘালয়ের পাদদেশে জাফলং, তামাবিল ও পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলের অনাবিল সৌন্দর্য, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকি, টাঙ্গুয়া, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের শীতলধারা। একসময় বাংলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ১৯১৯ সালের সিলেট ভ্রমণে এসে সিলেটের রূপ দেখে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বাংলার প্রান্তসীমা হতে নির্বাসিতা তুমি/ সুন্দরী শ্রীভূমি।’
রবীন্দ্র যুগের সে শ্রীভূমি এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এ এলাকায় দেশের যে কোন জায়গা থেকে রয়েছে আধুনিক উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা বাস, ট্রেন, বিমান। সিলেট শহরের প্রবেশ পথে তৎকালীন আসামের গভর্নর মাইকেল কিনের নামে লোহার তৈরি ঐতিহাসিক কিন ব্রিজ ও একসময়ের পৃথিমপাশার বিখ্যাত জমিদার আলী আমজাদের নামে নির্মিত লাল ঘড়ি পর্যটককে স্বাগত জানাবে। সিলেট শহরের মধ্যে অবস্থিত শাহজালাল ও শাহপরানের মাজারসহ, বাংলাদেশের প্রথম চা বাগান মালনিছড়া ও লাক্কাতুরার সৌন্দর্য যে কাউকে মোহিত করবে। ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত টিলাঘেরা এমসি কলেজ, শাবিপ্রবি’র ক্যাম্পাস একবার ঘুরে আসা যায়। এছাড়া মূল আকর্ষণ তামাবিল, জাফলং ও মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল। সারি সারি বারকি নাও। জাফলং পৌছানোর পূর্বে সীমান্তে মেঘালয় প্রদেশের বিশাল পাহাড়ের হাতছানি যে কারও মনকে চরম পুলকিত করবে। জাফলং ভ্রমণে পথিমধ্যে প্রাচীন জনপদ জৈন্তা রাজবাড়ি পুরাকীর্তি ইতিহাস অনিসন্ধিৎসু মনকে জাগাবে বিস্মৃত সমৃদ্ধ ইতিহাস সন্ধানে। মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি চা বাগান। শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের নয়ন জুড়ানো রূপ দেখে বিমোহিত হওয়ার একশ’ একটি কারণ রয়েছে। শ্রীমঙ্গলে রয়েছে দেশের একমাত্র চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, চা জাদুঘর, সাত রঙের নীল কণ্ঠ চা এখানে পাওয়া যায়। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখাতে রয়েছে দেশের একমাত্র বৃহৎ প্রাকৃতিক জলপ্রপাত মাধবকুন্ড। নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মার শৈশব-কৈশোরের অনেক স্মৃতি বিজড়িত পাথরিয়া পাহাড়ে। সে পাহাড়ের বুক চিরে সৃষ্ট এ জলপ্রপাতের উচ্চতা ১৬২ ফুট। এ ঝরপ্রপাতকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একটি ইকোপার্ক। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে রয়েছে ফুল পাখির কলকালিতে মুখর মাধবপুর লেক।
হাওর রাজ্য সুনামগঞ্জ
হাওর বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল, বিস্তীর্ণ জলরাশির সীমাহীন প্রান্তরের ছবি। সে জলরাশির বিচিত্র রূপ। কখনো নিপাট, নীরব, নৈঃশব্দ ভরা সূর্যাস্তের সোনালি আভার রঙে ঢেউ খেলে যাওয়া, কখনও রুদ্র-রোষে জেগে ওঠা আফালের (ঢেউয়ের) বিরামহীন হুংকার। ব্যতিক্রম এমন সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে যেতে হবে হাওরের দেশ সুনামগঞ্জে। সুনামগঞ্জ শহরে সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত লক্ষণশ্রীতে রয়েছে মরমী গায়ক হাছন রাজার বাড়ি। হাওরের উদাসী রূপে মুগ্ধ হয়েই দিরাই উপজেলার উজানধলে বসে অসংখ্য গান লিখেছেন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম। রাধারমনের বাড়িও এ জেলায়। সুনামগঞ্জে ভ্রমণে পছন্দে শীর্ষে থাকতে পারে লক্ষ্য টাঙ্গুয়ার হাওর। তাহিরপুর ধর্মপাশা উপজেলার উত্তর পশ্চিম সীমান্তে বিস্তৃত ৫১টি বিল নিয়ে এ হাওরের অবস্থান। বৈচিত্র্যময় জলজ উদ্ভিদ, প্রকৃতি, ধান, মাছ ও অতিথি পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে বিখ্যাত এ হাওর। হাওরের অবারিত জলে ভেসে থাকা দৃষ্টিনন্দন হিজল করচের সারি আর অতিথি পাখিদের কলকাকলির মুখরতা যে কাউকে দেবে ভ্রমণের ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সীমান্তের কোল ঘেঁষে তাহিরপুরের যাদুকাটা নদীতে নৌকা ভ্রমণ বাড়তি আনন্দ যোগ করবে।
রহস্যেঘেরা সুন্দরবন
ভয়ংকর সুন্দর প্রাণী বাঘ ও মায়াবি হরিণের বন সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে পরিচিত। বিচিত্র জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এ বন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় অবস্থিত। সুন্দরবনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীর, পশ্চিমে হাঁড়িয়াভাঙা, রায়মঙ্গল ও কালিন্দি নদী উত্তরে ছোট নদী খাল, জনপদ ও পূর্বে ধলেশ্বরী নদী। ১৯৯৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর ইউনেস্কো সুন্দরবনকে পৃথিবীর ৫২২তম বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। কটকা, কচিখালি ও হিরণপয়েন্ট থেকে এ বনের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণ ছিল। জানা যায়, ১৮২৮ সালে বৃটিশ সরকার সুন্দরবনের স্বত্বাধিকার অর্জন করে। এলটি হজেম নামে এক ব্রিটিশ ১৮২৯ সালে এ প্রথম এ বনে জরিপকার্য পরিচালনা করে। একসময় এ বন জমিদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৮৭৮ সালে সমগ্র সুন্দরবনকে কর্তৃপক্ষ সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করে। ১৮৭৯ সালে সমগ্র সুন্দরবনের দায়িত্ব বন বিভাগকে দেয়া হয়। সুন্দরবনে বাঘ ছাড়া আর চিত্রল হরিণ ছাড়াও রয়েছে অসংখ্য বানর, শূকর, গুঁইসাপ, অজগরসহ বিপুল পশুপাখির অভয়ারণ্য এ বন।
সংস্কৃতির তীর্থভূমি কুমিল্লা
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রতœসম্পদে সমৃদ্ধ প্রাচীন সমতটের অঞ্চল কুমিল্লা। বৌদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম তীর্থভূমি ময়নামতি। ধারণা করা হয় প্রাচীন বাংলার রাজা মানিকচন্দ্রের প্রিয়তমা স্ত্রী ময়নামতির নাম অনুসারে এ স্থানের নামকরণ করা হয়েছে। ময়নামতি জাদুঘরে রাখা হয়েছে ইতিহাসের অনেক দুর্লভ সাক্ষী ব্রোঞ্জের তৈরি বৌদ্ধ মূর্তি, রুপার মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলকচিত্র, প্রাচীন পত্রলিপি, শিলালিপি, শিবলিঙ্গ, তৈজসপত্রসহ আর নানা কিছু। কুমিল্লা শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে ছোটখাট অসংখ্য টিলার সমষ্টি লালমাই পাহাড়। পঁচিশ হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা এ পাহাড়ে অনেক বড় বড় গাছের পাশাপাশি কাঠাল গাছের আধিক্য চোখে পড়ে। আলো-আঁধারির খেলা করা এ বনে এসে মনে পড়লেও পড়তে পারে জীবনানন্দের কবিতা, ‘চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড় পাতাটির নিচে বসে আছে ভোরের  দোয়েল পাখি- চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ/ জাম-বট-কাঠালের-হিজলের-অশ্বথের করে আছে চুপ।’
কুমিল্লায় এছাড়াও দেখার মতো জায়গা আনন্দ বিহার, কোটবাড়ী সংলগ্ন শালবন বিহার, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, সতের রতœ মন্দির, কোটিলা মুড়া অন্যতম।
পুণ্ড্রনগরী বগুড়া
ইতিহাসের পাঠ্য বই খুললে যেসব শাসনামলের  নামগুলো ভেসে উঠে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, মোগল অন্যতম। বগুড়া অঞ্চলে জড়িয়ে আছে সেসব দোর্দণ্ড প্রতাপের শাসকদের শাসনামলের স্মৃতিচিহ্নের অবশিষ্টাংশ। বগুড়া থেকে অনতিদূরে কালের কল্লোলে হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের মতো এক সময়ের স্রোতস্বিনী করতোয়া নদীর শীর্ণ তীরে দেখা পাওয়া যায় অনেক বিশাল পরিমাপের দুর্গ, মন্দির, শীলাদেবীর ঘাট, গোবিন্দভিটা, বাসু বিহার, পরশুরামের প্রাসাদ, খোদার পাথর। এই অঞ্চল ঘুরে আসা মানে ইতিহাসের টাইম মেশিনে করে হারিয়ে যাওয়াকালে একবার নিজেকে ঘুরিয়ে আনা। প্রত্যক্ষ করা গুপ্ত থেকে সুলতানি আমলের গৌরবোজ্জ্বল কীর্তি।
বেহুলা-লখিন্দরের বাসর
ঘরের কাহিনী শোনেনি এরকম মানুষজন খুঁজে পাওয়া বেশ ভার। গোকুল গ্রামে অবস্থিত এ রহস্যময়ী প্রাচীন স্থাপনার অনেক কিছুই এখনও অজানা। ছোট ছোট খোপের তৈরি এসব  ঘরের স্থাপনা বেশ দুর্বোধ্য  সেন যুগেরও অনেক আগের মধ্যযুগে রচিত মনসামঙ্গল কাব্যে বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী বিধৃত রয়েছে।  

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে