Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (123 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-০৬-২০১২

আমার ভাবনায় কবিগুরু তাসরীনা শিখা


	আমার ভাবনায় কবিগুরু
	তাসরীনা শিখা

আমি বরাবরের মত আজও শেষের সারিতে দাঁড়িয়ে আছি। সবার যখন সব কথা শেষ তখন আমার শুরু। আজ বাইশে শ্রাবন। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  মৃত্যু বাষিকী। কবি গুরুকে নিয়ে কিছু লিখবো এ ভাবনাটা আমার অনেক আগেই আসা উচিত ছিল। তা এলো আজ সন্ধ্যায়। আমি মন ভরে,  কান পেতে  যখন শুনছিলাম  রবীন্দ্রনাথের গান ।  কিন্তু আমিও যে আমার ক্ষুদ্র ক্ষমতায়, ক্ষুদ্র জ্ঞানে কিছু  প্রকাশ করতে এবং পেছনের সারি হলেও দাঁড়াতে পারি সে চিন্তাটাও আসলো কবি গুরুর মৃত্যু দিনে তাঁর গান শুনতে শুনতে। গুন গুন করে তাঁর উদ্দেশ্য তাঁর গানই গাইলাম “চরন ধরিতে দিয়ো গো আমারে, নিয়ো না নিয়ো না সরায়ে”। গানটি শেষ করে, আমি যতটুকুই জানি ততটুকুই লিখতে বড্ড ইচ্ছে হলো।  সত্যি কথা বলতে কি, আমি রবীন্দ্রনাথকে আমার হৃদয়ে নিয়েই চলি।

রবীন্দ্রনাথকে চিনতে শিখেছি সে ছোট বেলায়  যখন মায়ের সাথে মাথা নেড়ে নেড়ে বলেছি, “আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে।”   তারপর আরেকটু যখন বড় হয়েছি তখন বাবার সাথে সুর মিলিয়ে গেয়েছি ,“বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এলো বান, শিব ঠাকুরের বিয়ে হলো তিন কন্যা দান।” ত্রাপর  জীবনের বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথ এসেছে আমার প্রানে বিভিন্ন ভাবে। যখন কোন অজানা ব্যথায় কাতর হয়েছি তখন চোখ বন্ধ করে ‘যদি জানতেম আমার কিসেরও ব্যথা তোমায় জানাতাম’ নিজের মনে গেয়ে গেয়ে সান্তনা খুঁজেছি। রবীন্দ্রনাথ কখনো এসেছে আমার হৃদয়ে ‘সখী ভালবাসা কারে কয়’, কখনো এসেছে ‘আমার পরানো যাহা চায় তুমি তাই’, আবার কখনো এসেছে ‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু’  এভাবে নানা গানে নানা অভিব্যক্তিতে। প্রতিটি দিন, প্রতিটি পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথের গানে আমি খুঁজেছি আমার প্রেম,আমার আবেগ, আমার বিরহ, আমার ক্লান্ত মনের সান্তনা।  যখন আনন্দে মেতে উঠেছি, নিজের মনে কতবার গেয়ে উঠেছি, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ুরের মত নাচেরে’। গ্রামের পথ দিয়ে চলতে চলতে কতবার যে ভাই বোনরা চিৎকার করে করে গেয়েছি ‘গ্রাম ছাড়া ঔ রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায়রে’।

রবীন্দ্রনাথের গান কবিতা বিভিন্ন ঋতুতে এসেছে বিভিন্ন  রূপে, বিভিন্ন আবেগে। মানুষের জীবনের এমন কোন অনভুতি, আবেগ সুখ দঃখ নেই যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখে যাননি। রবীন্দ্রনাথ বিরাজ করছেন আমাদের অন্তরে, বাহিরে সর্বত্র।

আমাকে যদি কেউ বলে,সাগরের গভীরতা কিংবা আকাশের অসীমতা নির্ণয় কর, আমি কি বলবো? আমার পক্ষে কি সম্ভব তা নির্ণয় করা? আজকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখতে বসে আমার ভেতর সে ধরনের একটি অনুভ’তি কাজ করছে । এই লেখার স্বল্প পরিসরে আমি কি করে রবীন্দ্রনাথকে তুলে ধরবো?

১৮৬১ সালের ৬ই মে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথের জন্ম। বাবা দেবন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মা সারদা দেবীর ১৪ জন  সন্তানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ৯ম সন্তান। তাঁর  জীবন কেটেছে স্কুল শাসনের বাইরে। বহু স্কুল পরিবর্তনের পর রবীন্দ্রনাথ যখন কোন স্কুলে টিকতে পারলেন না তখন রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরমা পরিবারের সবাইকে নিয়ে সভা করেন। কি করা যায় রবীকে নিয়ে, তখন পরিবারর সবার সিদ্ধান্তে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো রবীন্দ্রনাথ বাড়ীতেই পড়াশুনা করবেন। তাঁর জন্য বাড়ীতে আসবে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক। একটা প্রকান্ড অট্রালিকার কোনের এক ঘরে নিজেকে বন্ধী রেখে তিনি চালিয়ে যান তাঁর  সাহিত্য চর্চা । তাঁর রচিত জীবন স্মৃতি, ছেলেবেলা ইত্যাদি গ্রন্থে তিনি এই বন্দীত্বের বিস্তারিত বিবরন দান করেছেন। নিজের ভাষায় তিনি নিজেকে বলেছেন কুনো, একলা, একঘরে, সমাজের নিয়ন্ত্রনের অতীত, স্কুল শাসনের বাইরে। তাঁর দিন কেটেছে শহরের মধ্যে। কিনÍু শহর বাসীর মধ্যে ঘুরে বেড়াবার যে স্বাধীনতা থাকে তাঁর তা ছিল না।

কর্মক্ষেএে রবীন্দ্রনাথ বহুজনের সংস্পর্শে এসেছিলেন। বিশেষত ১৯১৩ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভের পর তিনি যখন খ্যাতির উত্তঙ্গে আরোহন করেন, তখন পরিচিত, ভক্ত, অনুরাগীর ও বন্ধুর সংখ্যা অগনিত ভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও স¦গুন মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠর্ত্ াঅভাব তাঁকে ব্যথিত করেছে । পরিনত বয়সে তাই তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, “জন্ম কাল থেকে আমাকে একখানা নির্জন নিঃসঙ্গতার ভেলার মধ্যে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। তীরে দেখতে পারছি লোকালয়ের আলো, জনতার কোলাহল, ক্ষনে ক্ষনে ঘাটেও নামতে হয়েছে, কিন্তু কোথাও জমিয়ে বসতে পারিনি। রশি যতবার ডাঙার খোঁটায় বেঁধেছি টান মেরে ছিড়ে দিয়েছে”। বাইরের পৃথিবীর জন্যে , বিপুল সুদূরের জন্য, তাঁর মনে ছিল সীমাহীন ব্যকুলতা। রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ পয়ষষ্টি বছর ধরে সাহিত্য সাধনার কালে তিনি মোট গান রচনা করেছেন ২২৩০টি। তার মাঝে রয়েছে, প্রেম, পূজা, প্রকৃতি ও স্বদেশ পর্যায়ের গান। পরবর্তী সময়ে তাঁর অনেক কবিতাও গানে পরিনত হয়। সতের বছর থেকে উনিশ বছর বয়সে তিনি প্রচুর প্রেমের গান রচনা করেন। তার মধ্যে,“সখী ভাবনা কাহারে বলে, সখী যাতনা কাহারে বলে”,“ ভালবেসে যদি সুখ নাহি”।  এ সম¯ত গানের মাঝে তিনি প্রেমের বিভিন্ন ধারাকে তুলে ধরেছেন। মাত্র উনিশ বছর বয়েসে তিনি ‘মায়ার খেলা’ গীত নাট্যটি রচনা করেন। মায়ার খেলা গীতি নাট্যতে “না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আখিঁর জলে”। এটিও একটি ব্যর্থ প্রেমের গান। মাত্র সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের প্রথম কবিতা গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ১৮৯৩ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত তিনি সাতটি কবিতার বই লেখেন । তার মধ্যে সোনারতরী এবং ক্ষনিকা বই দুটোও রয়েছে। এই সাতটি বই প্রকাশের পর তাঁকে বলা হতো বাঙ্গালী শেলী। ১৯০১ সালে তিনি বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯২১ সালে তা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিনত হয়। বিচিত্র ধরনের রচনার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বলোকের সৌন্দয্য, শিশুর প্রতি ভালবাসা,ঔপনিষদিক পরম অরুপ ও ঈশ্বরের উপস্থিতি প্রকাশ করেছেন এবং পশ্চিমের কাছে  এদেশ ও মানুষকে উপস্থাপন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মরমী কাব্য গীতাঞ্জলী প্রকাশের পর ইউরোপ ও আমেরিকায় তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কবি ইয়েটস গীতাঞ্জলী কাব্যটির ভুমিকা লিখে তা প্রকাশ করেন। গীতাঞ্জলী লিখে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেন। নোবেল পুরষ্কারের টাকা দিয়ে তিনি তার বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন ,যার নাম “শাšিত নিকেতন”। কলকাতা থেকে নব্বই মাইল দূরে। তাঁর বিভিন্ন গানে ও কবিতায়ও স্বদেশ প্রেম সুদৃঢ় ভাবে জেগে আছে। ১৯১৯ সালে জালীয়ানওয়ালাবাগের হত্যা কান্ডের পরে বৃটিশদের দেয়া ‘নাইট’ উপাধী তিনি প্রত্যাখান করেন। তারপর তিনি রচনা করেন “চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ সেথা শির”এবং   “যদি তোর ডাক শুনে কেই না আসে তবে একলা চলরে।”

১৮৮৩ সালে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করেন মৃণালীনি দেবী রায়চৌধুরীকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৌদি কাদম্বিনী দেবী যাকে তিনি নতুন বৌঠান বলে ডাকতেন। তিনি ছিলেন তাঁর কবিতা ও গানের একনিষ্ঠ শ্রোতা ও সাথী। নতুন বৌঠানকে সামনে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনেক কবিতা ও গান রচনা করেছেন। রচনা শেষে তিনি তাঁর বৌঠান কাদম্বিনী দেবীকে তা পড়ে শুনাতেন। ১৮৮৪ সালে ১৯শে এপ্রিল মাত্র পচিঁশ বছর বয়সে কাদম্বিনী আতœহত্যা করেন। বৌদি কাদম্বিনীর মৃত্যুও পর তিনি রচনা করেন “আমার প্রানের পরে চলে গেল কে বসšেতর বাতাস গুলির মত”এই গানটি। রবীন্দ্রনাথ যখন কবিতা ও গান লিখেছেন সে গান ও কবিতা মাতিয়ে দিয়েছে এপার বাংলা ও ওপার বাংলার মানুষকে। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাতের প্রভাব স্বাধীনতা লাভে অনুপ্রণিত করেছে এবং তাঁর রোমান্টিকতা, দেশের ভালবাসায় জাগ্রত থাকার গান গুলো এখনো বাংলাদেশের মানুষের মনোলোকে ¯া’য়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত । রবীন্দ্রনাথের প্রভাব দুই বাংলায় তার জীবদ্দশাতেই বিপুল ছিল। কিন্তু রবীনন্দ্রনাথ নিজেকে কখনো গুরুদেব মনে করেননি। কিন্তু বাঙ্গালীর মন রবীন্দ্রনাথকে সপ্ত পুরুষ ও গুরুদেব বানিয়ে তোলে। ইংল্যান্ডে জন্মালে রবীন্দ্রনাথ কখনো গুরুদেব হতেন না, হতেন মহৎ ‘চারন’ কবি।

১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ইহলোক ত্যাগ করেন ৮০ বছর বয়সে, পেছনে রেখে যান তার হাজারো গান ও কবিতা ও অসংখ্য  রচনা যা বাঙ্গালী জাতিকে বাঙলা সাহিত্যকে চিরজীবিত রাখবে। যতদিন পৃথিবীতে বাঙালী বেঁেচ থাকবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথ থাকবে তাদের প্রানে, অ¯িততে, মননে ও সাহিত্যে। তিনি মৃত্যুকে অতিক্রম করেছেন জীবনের মধ্যে দিয়ে।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে