Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০ , ২০ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (66 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-২৫-২০১২

নুহাশ পল্লী শান্তিনিকেতন বা শেকসপিয়র সিটি হবে

পীর হাবিবুর রহমান


নুহাশ পল্লী শান্তিনিকেতন বা শেকসপিয়র সিটি হবে
বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ হুমায়ূন আহমেদের সমাধি ঘিরে নুহাশ পল্লী একদিন কবিগুরু রবিঠাকুরের শান্তিনিকেতন বা শেকসপিয়র সিটি হয়ে উঠবে। তার নুহাশ পল্লীর আয়তন ও সৌন্দর্য বাড়তে থাকবে। গোটা বাংলাদেশ যেভাবে সজল নয়নে দেশবরেণ্য লেখক হুমায়ূন আহমেদকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এ দেশে এমন ঘটনা বিরল। বড় ছেলেকে হারিয়ে মা আয়েশা ফয়েজ কফিনে মাথা ঠুকে কেঁদেছেন। প্রেমিক স্বামীকে হারিয়ে অকাল-বৈধব্যের বেদনা নিয়ে মেহের আফরোজ শাওন মাতম করেছেন। সব অভিমান ভুলে গিয়ে শিলা-নোভারা শ্রাবণধারার মতো অঝোরে কেঁদেছেন। বাবার আম্মা ডাক শুনতে ডুকরে কেঁদেছে মন। পিতাহারা সন্তান নুহাশের নির্বাক মুখ মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। ভাইহারা ভাইয়ের বেদনার্ত মুখ, বোনের শাড়িরঁ আঁচলে তুলে নেওয়া অশ্রু বা নিষাদ-নিনিতের ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি সবই দেখা গেছে। কিন্তু যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক নেই, স্বার্থের বাঁধন নেই, বন্ধুত্বের বন্ধন নেই; সেই লাখো লাখো গুণমুগ্ধ ভক্ত, পাঠক শহীদ মিনার, জাতীয় ঈদগার জানাজা, বৃষ্টিভেজা দাফন পর্বে যেভাবে অশ্রুসিক্ত হয়েছেন, ক্রন্দন করেছেন- তাদের ভালোবাসার চেয়ে বড় প্রাপ্তি একজন লেখকের জীবনে আর কী হতে পারে? ক্যান্সারের কাছে হেরে অকালমৃত্যু না হলে এই স্বপ্নবান, বর্ণাঢ্য চরিত্রের লেখক দেশ ও মানুষকে আরও অনেক দিতে পারতেন।

তাই বলে ৬৪ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি কম দেননি দেশ ও মানুষকে। বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। গল্প, উপন্যাস লিখে এক বিশাল পাঠকের মিছিল তৈরি করে গেছেন। নতুন প্রজন্মকেই নয়, গৃহবধূদের টেনে এনেছেন বইয়ের দিকে। একসময় তার নাটক মানেই ছিল সন্ধ্যার পর মফস্বলের নিরিবিলি শহর মানুষশূন্য হয়ে পড়া। নাটক, চলচ্চিত্র নির্মাণই নয়, তার লিখে যাওয়া গান আর সৃষ্টিশীল লেখকজীবন তাকে অমরত্ব দেবে। জগদ্বিখ্যাত মানুষের জীবন বর্ণময় ও ঘটনাবহুল হয়। হুমায়ূন আহমেদের জীবনও তা-ই হয়েছে। যারা একসময় বলতেন হুমায়ূনের লেখার সাহিত্যমূল্য নেই, লজ্জা-গ্লানিতে ডুবে তারা দেখেছেন এই বরেণ্য লেখকের কফিন ঘিরে গোটা বাংলাদেশ দাঁড়িয়েছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেছেন, হুমায়ূন শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ওপার বাংলার লেখক-পাঠক বড় মুখে কথা বলেছেন।

মমতা ব্যানার্জিও শোকাহত হয়েছেন। শুধু পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়া হীনমন্যতা দেখিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য ও সৃষ্টিশীল জীবনের পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও ভবিষ্যতে লেখালেখি ও গবেষণা হবে। ৬১ বছরের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৩১ বছরের ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর প্রেমে পড়েছিলেন কিংবা বউদি কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে সখ্য নিয়ে তার গুণমুগ্ধ ভক্তরাই লেখালেখি করেন। কাজী নজরুল ইসলামের ফজিলাতুন্নেসার জন্য যে অন্তহীন প্রেম ও তৃষ্ণা এখনো তার ভক্ত-গবেষকদের ভাবায়, তা সাহিত্যেরই অংশ। হুমায়ূন আহমেদ এখন আর কেবল একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান নন যে তার অনেক কিছু ধামাচাপার মধ্যে আড়াল করা হবে। তার ডায়রি থাকলে সামনে তা প্রকাশ হবে; তার ব্যক্তি ও লেখক জীবন নিয়ে গবেষণা হবে; গুলতেকিনের সঙ্গে প্রেম, বিবাহ ও বিচ্ছেদ যেমন সামনে লেখালেখি ও গবেষণাতে উঠে আসবে, তেমনি মধ্যবয়সী লেখকের সঙ্গে বালিকা শাওনের গভীর প্রেম, বিয়ে ও তার কাছেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করার ঘটনাবহুল জীবন বাদ পড়বে না। গুলতেকিন হুমায়ূনের জীবনের প্রথম প্রেম ও দীর্ঘজীবনে জড়িয়ে থাকা সুখ-দুঃখের সাথী। কেন তারা দাম্পত্য জীবন রক্ষা করতে পারেননি, বিচ্ছেদের পরিণতি কি উভয়ের জন্য সুখকর ছিল? সবকিছুই একদিন গবেষণায়, লেখায় উঠে আসবে। হুমায়ূন আহমেদের দাফন কোথায় হবে এ নিয়ে সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত বিভক্ত পরিবারের টানাপোড়েন লাখো ভক্তকে নির্ঘুম রাখেনি, হুমায়ূনভক্ত প্রধানমন্ত্রীকেও উদ্বিগ্ন করেছিল। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানকের মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত নুহাশ পল্লীতে দাফনের সিদ্ধান্তই সঠিক হয়েছে। তার ভক্তরাও চেয়েছেন নুহাশ পল্লীতেই প্রিয় লেখকের দাফন সম্পন্ন হোক। নুহাশ পল্লী ও হুমায়ূন আহমেদ গত এক যুগে প্রায় একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন। আর এর সঙ্গে তার হাত ধরেই মায়ার বাঁধনে জড়ান শাওন। শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান বা বনানী কবরস্থানে দাফন হলে তার সমাধি ঘিরে এমন সৃষ্টিশীল কর্মোদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ ছিল না, যার সঙ্গে আবেগ ও ভালোবাসা জড়িয়ে থাকবে। নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় হুমায়ূনের সমাধি ঘিরে শাওন একদিন হুমায়ূনের নাতিদের পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের 'কবর' কবিতার মতো দেখিয়ে বলতে পারবেন- 'এইখানে তোর দাদুর কবর লিচু গাছের তলে, ৩০ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে...'।

শাওন হুমায়ূনকে দাফন করার আগেও বলেছেন, পরেও বলেছেন- হুমায়ূন নুহাশ পল্লী ঘিরে শান্তিনিকেতনের মতো ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন এবং সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। শাওন বলেছেন, নুহাশ পল্লী হবে সবার। ট্রাস্ট এটা পরিচালনা করবে। জানা যায়, সালেহ চৌধুরী দুই বছর আগে এক আড্ডায় হুমায়ূনকে বলেছিলেন প্রতিষ্ঠান রাখতে হলে লোক দরকার। তোমার সংসার বিভক্ত। ট্রাস্ট করে যাও। তোমার ও তোমার মায়ের কবর এখানে রাখ। নুহাশ পল্লীর আয়ে হুমায়ূনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলত। হুমায়ূন তখন কবরের কথা না বললেও ট্রাস্ট গঠনে আগ্রহ দেখালে সালেহ চৌধুরী একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে বলেন। মেহের আফরোজ শাওন দুটো অবুঝ সন্তান নিয়ে এই স্বপ্ন পূরণের পথে অবিচল থাকতে পারবেন বলে মন বলছে। তিনি অবিচল থাকলে হুমায়ূনভক্ত বাংলাদেশের মানুষ আমরা পাশে থাকব। নোভা-শিলা-বিপাশা-নুহাশ-নিষাদ-নিনিতের মধ্যে কে উত্তরাধিকারিত্বের যোগ্যতা বহন করবেন, তা সময়ই বলবে। একদিন হুমায়ূনের নুহাশ পল্লীর শ্যামল ছায়াপথে দেশ-বিদেশ থেকে কত পর্যটক আসবে তার হিসাব রাখার জন্য আলাদা স্টাফ দায়িত্ব পালন করবেন। নুহাশ পল্লী ঘিরে আশপাশ এলাকা মিলিয়ে গড়ে উঠতে পারে শেকসপিয়র সিটির মতো হুমায়ূন সিটি। হুমায়ূন শেষ বেলায় হাসপাতাল থেকে যেসব লেখা লিখেছেন সেখানে তার প্রথম স্ত্রী গুলতেকিনের গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান নুহাশ-নোভা-বিপাশা-শিলাদের জন্য গভীর স্নেহ ও অন্তহীন হাহাকার ফুটে উঠেছে। তেমনি তার খেলার সঙ্গী ছেলে নিষাদ ও নিনিতের জন্য মায়া ঝরেছে। হুমায়ূন পরিবারের সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে গুলতেকিন ও শাওনের সন্তানদের শরীরে হুমায়ূন আহমেদের রক্ত বইছে। ছয় সন্তানের জন্যই তার ভালোবাসার কমতি ছিল না। স্বামী হারানোর বেদনায় শাওনের মাতম, বাবার লাশের পাশে শিলার যে আহাজারি, কফিনে নুহাশের মাথা ঠুকে কান্না তখনই সার্থক হবে যখন তারা সব মান-অভিমান ভুলে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্ন পূরণের জন্য একযোগে কাজ করবেন, নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব না কষে এবং তাদের পরিবারের মুরবি্বরা হুমায়ূনের সন্তানদের মাঝখানে কোনো দেয়াল তুলবেন না। প্রেমে যেমন দুই পক্ষের ভূমিকা থাকে, বিচ্ছেদেও থাকে সমান দায়। হুমায়ূন একজন মানুষ ছিলেন, রক্ত-মাংসের মানুষ। তারও আবেগ ছিল, তারও ভালোবাসা ছিল, তারও মানবিক মন ছিল। মেহের আফরোজ শাওনেরও ভবিষ্যৎ অনেক সুন্দর ও নিরাপদ হতে পারত। একজন বড় লেখক বা সৃষ্টিশীল মানুষের গুণে মুগ্ধ হয়ে উঠতি বয়সে প্রেমে পড়ে ঘর বেঁধে কত দিনই বা সংসার করলেন! অকালেই বৈধব্যের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদের সন্তানদের জন্য যে আকুতি তা দেখে তার পরিবারের বড়রা কি পারতেন না বিপাশা-নুহাশ-নোভা-শিলাদের কিছুটা দিন তাদের প্রিয় বাবার সানি্নধ্যে রাখতে? আজ শিলার কান্না, নুহাশের অসহায় মুখ আমাদের যখন ব্যথিত করে, তখন তাদের কষ্টের মাত্রা কত তা বোঝাই যায়। বিলেতের স্টাটফোর্ড সিটি এখন শেকসপিয়র সিটি হিসেবেই পরিচিত। বিলেতের উত্তরে এ ছোট্ট ঝকঝকে শহরে রোজ দুনিয়ার নানা দেশ থেকে পর্যটকেরা আসেন। জগদ্বিখ্যাত এ নাট্যকার-সাহিত্যিকের বাড়িঘর, লেখার টেবিল এমনকি তার সমাধি দেখতে ছুটছে মানুষ। আমাদের নুহাশ পল্লীর আয়তন বাড়তে বাড়তে একদিন এমনই হবে যেদিন আমরা না থাকলেও এখানে বিশ্ববিদ্যালয় হবে। নাটক, চলচ্চিত্রের ওপর অনাগত প্রজন্ম উচ্চশিক্ষা ও পেশাদারিত্ব অর্জন করবে। মেহের আফরোজ শাওন গত ১০টি মাস হুমায়ূনকে বাঁচাতে কম যুদ্ধ করেননি। তার যে একাগ্রতা ও দৃঢ়তা দেখা যাচ্ছে তাতে হুমায়ূনের স্বপ্ন পূরণে তিনি নিশ্চয়ই কাজ করতে পারবেন। আর হুমায়ূনভক্তরা চাইলে একটি আধুনিক ক্যান্সার হাসপাতাল করা কোনো দুঃস্বপ্ন নয়। দেশের গরিব জনগোষ্ঠীর কত পরিবার রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে যায় এই চিকিৎসার মুখোমুখি হয়ে। হুমায়ূন আহমেদের ছায়ায় ছায়ায় থেকে ছোট ছোট অভিনেতা-অভিনেত্রী তারকা খ্যাতি পেয়েছেন। অনেক অভিনেতা সুপারস্টার হয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে পায়ে পায়ে অনেক প্রকাশককে দেখেছি। তার বই প্রকাশ করে মুনাফা লুটেছেন অনেকে। কিন্তু ক্যান্সার ধরা পড়ার প্রথম দিন থেকে দাফন পর্যন্ত অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম যেভাবে হুমায়ূন আহমেদের পাশে থেকেছেন, তখন মনে হয় রক্তের সম্পর্কের চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মার সম্পর্ক বড় হয়ে ওঠে। মরহুম রাজনীতিবিদ বরেণ্য পার্লামেন্টারিয়ান মিজানুর রহমান চৌধুরী বলতেন, আত্মীয়তা হলো শবযাত্রা ও বরযাত্রায়। অনেকের জীবনেই তা ঘটে। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কবে কখন প্রথম পরিচয় তা এখন মনে নেই।

তবে ছেলেবেলার বন্ধু হুমায়ূনের গানের জলসার মধ্যমণি সেলিম চৌধুরীর সুবাদে '৯০-উত্তর সময়ের শুরুতে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল। হুমায়ূন যেদিন একুশে পদক পান তার পর দিন সকাল ৭টায় অভিনন্দন জানাতে হাতিরপুলের ফ্ল্যাটে হাজির হলে তাকে ডাইনিং টেবিলে লেখালেখিতে মগ্ন পাই। বাড়ির সবাই ঘুমে। তিনি নিজে চা পান করছিলেন, আমার জন্যও চা এনে দিলেন। সাতসকালে উঠেই তিনি লেখালেখি করতেন। তার ও আমার একটা জায়গায় মিল ছিল সেটি হলো আমরা ভাটির দেশের মানুষ। বাউল গান, ভাটির গান, জল-জোছনা আড্ডা আমাদের নিবিড়ভাবে টানত। সার্কুলার রোডে তখন আমি থাকতাম। আরেক দিন তার হাতিরপুলের বাসায়ই ইফতার টেবিলে তিনি দোকানের কেনা হালিম তুলে দিতে দিতে বলেছিলেন, এটা যদি খেতে চাও তাহলে নানাজির বাসায় খেও। পাশেই বসা ছিলেন অগ্রজ সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী। সালেহ চৌধুরীর স্ত্রীর তৈরি হালিম দারুণ। সালেহ চৌধুরীকে হুমায়ূন আহমেদ কেন নানা ডাকতেন তার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সেদিন। বলেছিলেন, জগন্নাথ কলেজের শিক্ষক নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তার নানা। বয়সে সালেহ চৌধুরীর অনেক ছোট হলেও একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করার সুবাদে গভীর অন্তরঙ্গতা। আর সে কারণেই সালেহ চৌধুরী তার নানাজি। সালেহ চৌধুরী নিজে যেমন ভালো দাবা খেলেন, তেমনি তার ছেলেরা ভালো ক্রিকেটার ছিলেন। সুনামগঞ্জে আমাদের টিম ফ্যান্টমের হয়ে তারা খেলেছেন। আমি ও তুহিন এক রমজানে সালেহ চৌধুরীর শঙ্করের বাসভবনে ইফতারে শরিক হয়েছিলাম শুধু ভাবীর হাতের হালিম খাওয়ার লোভে। হুমায়ূন আহমেদ ঠিকই বলেছিলেন, ভাবীর হাতের হালিমের তুলনা নেই। একসময় আমার স্বভাব ছিল পরিচিত স্বজনদের কাছে যখন তখন ঢুঁ মারা। হুমায়ূন যখন ধানমন্ডির 'গুলতেকিন' বাড়িখানি তৈরি করেন তখন অভিনেতা শিক্ষক মোজাম্মেল হক তদারকি করতেন। হুমায়ূন মাঝেমধ্যে বসে কাজ দেখতেন। আমিও ঢুঁ মারতাম। এ বাড়ি তৈরি হওয়ার পর ছাদে একবার সারারাত সেলিমদের সঙ্গে হুমায়ূনের আড্ডা ও গানের জলসা উপভোগ করে ভোরের সূর্য দেখে বাড়ি ফিরেছিলাম। অনেক নামকরা অভিনয়শিল্পী সে রাতে সেখানে ছিলেন। হাছন উৎসবে শীতের রাতে উপবন ট্রেনে '৯৪ সালে গিয়েছিলাম গল্প করতে করতে। যখন বলছিলাম, রাতের বজরায় হাছন রাজা হাওরে ভাসতেন গায়িকার দল নিয়ে, তখন সুরা, সাকি, বাদ্য-বাজনা সব থাকত। সারারাত হাছন রাজার গানের দলের নারীরা নেচে-গেয়ে তার মন ভরিয়ে দিতেন। গল্পের আসরে হুমায়ূন কথা বলতেন দারুণ রসবোধ নিয়ে।

ভাবখানা_ খুব সিরিয়াস বলছেন। তিনি বললেন, আহারে আগের দিনের কবি সাধকরা কতই না সুখে জীবন কাটিয়েছেন! আর একালে কেউ কিছু করতে গেলেই মিডিয়া পিছু নেয়। আমরা সার্কিট হাউস থেকে দুপুরের খাওয়া সেরে বিকালের উৎসবমঞ্চে যাওয়ার আগে পুরনো সার্কিট হাউসের বারান্দায় চা পান করতে করতে গোধূলিলগ্নে সুরমার ওপারেই যেন ফুটে ওঠা মেঘালয় পাহাড়ের দৃশ্য দেখে অভিভূত হই। সেদিন হাজার হাজার মানুষের ঢল নামা উৎসবমঞ্চে আমার উপস্থাপনা অতিথি হুমায়ূনকে মুগ্ধ করেছিল। সেই উৎসবের আয়োজক শহরের নন্দিত পুরুষ কবি মমিনুল মউজদিনও অকালে চলে গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। হুমায়ূনের আড্ডার আসরের আয়োজন করতেন দৌড়ঝাঁপ করে মিনহাজুর রহমান ও তার সহকারী পরিচালক মনির হোসেন জীবন। একবার মাজারপ্রীতি নিয়ে তিনি বলেছিলেন, তিনি অভিভূত, মুগ্ধ হন এই ভেবে যে ইসলাম প্রচারের জন্য হজরত শাহজালাল (রহ.), হজরত শাহ মখদুম (রহ.) ও খাজা মাইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) বিবাহ পর্যন্ত করেননি! তাদের এ ত্যাগ কত বড় ভাবাই যায় না! তার কথার মধ্যে আঞ্চলিক টান মধুর লাগত। বসার ক্ষেত্রে ভাটি অঞ্চলের বা মফস্বলের মুরবি্বদের মতো বৈঠকী ঢঙে পা গুটিয়ে বসাটি ছিল স্বতন্ত্র। সেটা চেয়ারেই হোক, আর মেঝেতেই হোক। তার নিয়মিত ছায়াসঙ্গী কেউ কেউ হলেও অসংখ্য সুহৃদ তার সানি্নধ্য পেয়েছেন। তার সানি্নধ্য যারা পেয়েছেন খণ্ড খণ্ড স্মৃতি তাদের তাড়া করে ফিরবে। কখনোসখনো আবেগাপ্লুত হবেন তারা। যে কোনো মৃত্যু বেদনার হলেও আমরা মরণশীল। দুই দিন পরে হলেও হুমায়ূন আহমেদকে চলে যেতেই হতো। তার জীবন সার্থক এবং ধন্য। এক জীবনে তিনি অনেক কিছু করেছেন। ৬৪ বছরে বাংলা সাহিত্যের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বিদায় নিয়েছেন। তিনি যেমন দিয়ে গেছেন, তার দেশ ও মানুষ তেমনি তাকে দিতে কার্পণ্য করেনি। এমনকি তার ভক্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিৎসার সুবিধার জন্য তাকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের উপদেষ্টা করেছিলেন। দেশের যে মানুষ কোনো দিন তাকে দেখেনি, তার সঙ্গে কথা বলেনি সেই অতি সাধারণ মানুষও তার জন্য দোয়া করেছে, মৃত্যুতে অশ্রুসিক্ত হয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে। মানুষের এমন ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা ক'জনের ভাগ্যে জোটে। দিনে দিনে হুমায়ূন তার কর্মের জন্য তার সমাধি ও নুহাশ পল্লী ঘিরে শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রনাথের মতো, স্টাটফোর্ডের শেকসপিয়রের মতো আরও উজ্জ্বল ও বর্ণময় হয়ে উঠবেন। বাংলাদেশের মানুষের গৌরব ও ভালোবাসার ঠিকানা হয়ে উঠবে নুহাশ পল্লী। হুমায়ূনের স্নেহময়ী মা এবং সন্তানদের জন্য গভীর সহানুভূতি আর ভালোবাসা। মেহের আফরোজ শাওনের জন্য শুভ কামনা।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে