Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯ , ৪ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (26 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-১০-২০১২

সাইকেল যাত্রাঃ দু'বছর পরে ফিরে দেখা অনুভূতি

দীপক রায়


সাইকেল যাত্রাঃ দু'বছর পরে ফিরে দেখা অনুভূতি
ছেলেবেলায় দাদু-ঠাকুরমা আর বাবা-মায়ের কাছে শুনেছি বাংলাদেশের কথা। সে আমার স্বপ্নের পিতৃভূমি, মাতৃভূমি অবশ্যই ভারতবর্ষ। ছেলেবেলায় না ছিল টিভি, না ছিল ইন্টারনেট- ফলে বাংলাদেশকে কোনভাবেই দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু মনের কোথাও যেন থেকে গিয়েছিল বাংলাদেশ দেখার ইচ্ছেটা। দু'বছর আগে সুকান্ত ভট্টাচার্যের সংগঠন ‘কিশোর বাহিনী’ আর ‘বাংলাদেশ সুকান্ত সংসদ’ আয়োজিত ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সাইকেল যাত্রা’ আমাকে সেই ইচ্ছেটা পুরন করে দেওয়ায় বাংলাদেশকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম। দু'বছর পরে আবারো সেই যাত্রার অনুভুতি, অভিজ্ঞতা, আনন্দ, বেদনার কিছুটা পাঠকের সাথে ভাগ করে নিতেই এই নিবন্ধের অবতারনা।
আমাদের এই কর্মসূচির পরিকল্পনা চলেছিল বেশ কয়েকমাস ধরে। দুই দেশের সুকান্ত অনুরাগীরাই এই কর্মসূচিকে সফল করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। আর সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল দুই দেশের কিছু সামাজিক সংগঠন, সাংবাদিক, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল এবং অবশ্যই আপামর সাধারন মানুষ। এই ধরনের একটি কর্মসূচি কতটা সফল হবে বা কি সমস্যা হতে পারে, সেই বিষয়ে আমাদের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু সুকান্তের প্রতি তীব্র আকর্ষণ আর বাংলাদেশ দেখার অদম্য ইচ্ছাকে পুজি করেই আমরা বিভিন্ন পেশার ৩৫ জন যুবক শুধুমাত্র সাইকেলকে সঙ্গী করে পাড়ি দিয়েছিলাম দুই দেশের মৈত্রীর লক্ষ্যে। আমরা তখন একেবারেই জানতাম না, কোথায় খাব, কোথায় থাকব, কিভাবে শেষ করব।
আমাদের যাত্রার শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা সুকান্তের ভাইপো বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আমাদের হাতে ভারতের পতাকা তুলে দিয়ে মৈত্রীর বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার কথা বলে আমাদের ইচ্ছা শক্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমরা সমস্ত পথে জনতার সম্বর্ধনা নিতে নিতে চললাম বাংলাদেশের দিকে। যখন জানলাম, এই ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম, তখন আনন্দে ভেসে গিয়েছিল আমাদের হৃদয়। কিন্তু বেনাপোল বর্ডারে অসংখ্য সাংবাদিক, সাধারন মানুষ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের ও সামাজিক সংগঠনের কাছে যে বিপুল আতিথেয়তা পেয়েছিলাম, সেটা কখনো ভোলার নয়। আমাদের এই যাত্রাপথে এমন কোন রাজনৈতিক দল ছিল না, যারা আমাদের সম্বর্ধনা দেয়নি। আর স্থানীয় ক্লাব সংগঠন, সাধারন মানুষ যেভাবে করতালি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ফুল, আহার দিয়ে আমাদের বরন করে নিয়েছিলেন, তেমন আপ্যায়ন আমাদের যাত্রীরা কেউই কোনদিন পাননি, একথা নিঃসংকোচে বলতে পারি।
এভাবেই আমরা প্রচণ্ড গরম আর বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে মধ্যে পার হয়ে গিয়েছি গদখালি, ঝিকরগাছা, শারশা, নতুনহাট হয়ে যশোর শহরে। সেখানে যশোরবাসীর নাগরিক সম্বর্ধনার কথাই বা ভুলি করে? এরপরে যশোর ছাড়িয়ে আমরা গিয়েছিলাম ভুলাবেড়িয়া গ্রামে। গ্রামের মহিলাদের দারুন আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। গেলাম এগারখানের একটি গ্রাম ডঃ অমল সেনের স্মৃতিধন্য বাঁকরিতে। সেখানে হাজার হাজার মানুষের সাথে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটেছিল আমাদের। তারপরে গিয়েছি তুলারামপুর হয়ে নড়াইল শহরে। নড়াইলবাসী আমাদের সাথে মেতে উঠেছিলেন গানে, কবিতায় আর নৃত্যের ছন্দে। আমরা ধন্য হয়েছিলাম শিল্পী এম.এস.সুলতানের আর্ট গ্যালারী দেখে। নড়াইলের জেলা প্রশাসকের ঘরে সমস্ত দলের নেতৃত্বরা আমাদের উপহারে ভরিয়ে দিলেন। এরপর নদী পেরিয়ে আমরা গিয়েছি লোহাগড়া হাইস্কুলে। সেখানেও হাজার মানুষের উপস্থিতিতে হয়েছে আমাদের যৌথ মৈত্রীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পরেরদিন আবারো যথারীতি নদী পেরিয়ে পথচলা। আমরা যে কিভাবে দিনের পর দিন সাইকেল চালাচ্ছি, আবার এত অনুষ্ঠান করছি- কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। আসলে আমাদের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গিয়েছিল সুকান্ত সংসদের আয়োজন দেখে আর বাংলাদেশের মানুষের ভালবাসা পেয়ে। আমরা গেলাম রামদিয়া। ওখানে আরও বেশি মানুষ। হিন্দু-মুসলমান সবাই আমাদের সাথে যেভাবে কোলাকুলি করলেন, আমরা কেঁদে ফেলেছিলাম কেউ কেউ। সেখানে বিদায় নিয়ে গেলাম গোপালগঞ্জে খেলাঘর আর উদিচির কার্যালয়ে। ওদের বাচ্চাদের গান আর নাচ কোনদিন ভোলা যাবে না। আরও কিছুটা পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গেলাম বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থলে। অনেকটা সময় ধরে এক রক্তাক্ত ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ্য করলাম। সেখানে শ্রদ্ধা জানিয়ে পাড়ি দিলাম ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে। হ্যাঁ, সাইকেলেই। পাঠকেরা ভাবতে পারেন, এভাবে এতটা পথ কিভাবে যাওয়া সম্ভব! আসলে আমাদের এই যাত্রাপথে বাংলাদেশের মানুষের এত প্রাণঢালা আতিথেয়তা আমাদের সব ক্লান্তি দূর করে দিয়েছিল।
ফরিদপুরে আমাদের আবেগটা ছিল একটু বেশি। ওখানেই তো সুকান্তের পৈতৃক বাসভুমি। ওখানে বাংলাদেশ সরকার ৬৪ লাখ টাকা খরচ করে সুন্দর করে সাজিয়েছে সুকান্তের সেই বাড়ি। আমরা গেলাম সেখানে। রীতিমত বাজনা আর নাচ গানের মধ্যে দিয়ে স্থানীয় ক্লাব, লাইব্রেরি, প্রশাসন আমাদের বরন করে নিল। অনেক অনুষ্ঠান করলাম আমরাও। পেলাম উপহার, আমরাও দিলাম। সেখানে রাত্রিবাস করে এবারের গন্তব্য আরও দূরে- ঢাকা। পথে আবার পেরতে হল নদী। সেও এক অসাধারন অভিজ্ঞতা। আর এতসব আয়োজন যে সুকান্ত সংসদ, বাংলাদেশ প্রশাসন আগে থেকে করে রেখেছে, আমরা আগে থেকে সেটা জানতেও পারিনি। গেলাম মদনপুরে ন্যাপের কার্যালয়ে। সেখান থেকে গেলাম উপমহাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের অবিসংবাদী নেতা জ্যোতি বসুর বারদি গ্রামের বাড়িতে। অনেক রাত পর্যন্ত সেখানে হল আমাদের স্মরণ অনুষ্ঠান। তবে আমাদের পথচলা শেষ হল না। আমরা পৌঁছলাম ঢাকায়। বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বরন করে নিল। আমরা থাকলাম সেখানে। ঢাকায় আমাদের ব্যস্ততার শেষ ছিল না। একটুও ঘোরার সময় পাইনি। প্রথমেই গেলাম জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের সমাধিতে। সেখানে শ্রদ্ধার্পণের পরে আমরা সম্মানিত করলাম কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনকে। আমাদের অভিনন্দন জানাল ‘গ্রিনবেল্ট’ ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস ফেডারেশনের শ্রমিকেরা। গেলাম ‘অপরাজেয় বাংলা’র নিচে। সেখানে তখন হইহই রইরই কাণ্ড। কে নেই সেখানে? মঞ্চে তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডাঃ দিপু মনি, সাংসদ রাশেদ খান মেনন, ফজলে হোক বাদশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ.আ.ম.স. সিদ্দিকি, গায়ক ফকির, ভারতীয় হাইকমিশনার সঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রমুখরা। আর দর্শক আসনে বসে আছেন ঢাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা কর্মী থেকে ছাত্রছাত্রী, সাধারন মানুষ। শুরু হল জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের গান। অতিথিদের বক্তব্যে দীর্ঘ সময় ধরে অনুষ্ঠানে বারেবারেই ঘুরেফিরে এলো সুকান্ত, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধু, নজরুল, জ্যোতি বসুর কথা। সুকান্ত সংসদের কর্ণধার আনয়ারুল করিম রাজুর কণ্ঠে ধ্বনিত হল বঙ্গবিভাগের যন্ত্রণার কথা। আমাদের কিশোর বাহিনীর কর্ণধার পীযূষ ধর গাইলেন সুকান্তের মহাজীবনের গান। সাইকেল যাত্রার কাণ্ডারি সাংবাদিক রক্তিম দাস বক্তব্যে জানালেন মৈত্রীর আহ্বান। অনুষ্ঠানের শেষে রোপিত হল একটি দেবদারু গাছ, মৈত্রীর স্মারক হিসাবে। সুকান্ত গবেষক মহঃ শহিদুল্লাহ সুমনের চিত্র প্রদর্শনী দেখে আমরা গেলাম মধুর রেস্তোরাঁতে। তারপরে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ জানিয়ে আমরা গেলাম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। সেখানেও আমরা পেলাম প্রাণঢালা ভালবাসা। সাইকেলগুলি তুলে দেওয়া হল সুকান্ত সংসদের হাতে। এরপর রাতে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির আহ্বানে আমরা গিয়েছিলাম ‘হোটেল-৭১’ এর অনুষ্ঠানে। পরদিন সকালে হল রাখিবন্ধন উৎসব। আমরা বাসে উঠলাম ফেরার জন্য। ফিরতে মন চাইছিল না। সবাই কেঁদে ফেলেছিলাম সেদিন। দীর্ঘ পথ বাসে পাড়ি দিয়ে ফিরে এলাম নিজের দেশে। অবাক হয়েছিলাম, শেষ মুহূর্তেও দেখি বেনাপোল সীমান্তে আমাদের বিদায় জানাতে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন সমাজসেবী, অধ্যাপক, সাংস্কৃতিক কর্মী। আর এর ভিতর দিয়েই আমাদের শেষ হয়েছিল ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সাইকেল যাত্রা।
আবার হয়তো বাংলাদেশে যাব, কিন্তু সেই সাইকেল যাত্রার স্মৃতি কখনো ভোলবার নয়। ভোলবার নয় বাংলাদেশের মানুষের আবেগ, আতিথেয়তা আর ভালবাসা। কিছু মানুষের চক্রান্তে যে বিভাজন হয়েছিল এই বঙ্গের, সেই বিভাজন কখনোই ভেঙ্গে দিতে পারেনি বাঙ্গালিকে। এই মৈত্রী থাকুক অনন্তকাল। দূর হোক দুই দেশের সমস্ত অপশক্তি। দুই দেশের বাঙ্গালী জাতিই এগিয়ে চলুক মৈত্রীর বানী নিয়ে।সমস্ত বিভেদ ভুলে সীমান্ত সমস্যা, ছিটমহল সমস্যা, নদীর জলবন্টন সমস্যা, ট্রানজিট সমস্যা, বানিজ্যিক সমস্যার সমাধান হোক। রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুলের দুই বাংলা মৈত্রীর লক্ষ্যে এগিয়ে চলুক। মৈত্রী সাইকেল যাত্রার দু'বছর পরে দুই দেশের সাধারন মানুষের দাবী এটাই।

পশ্চিমবঙ্গ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে