Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২৬ জুন, ২০১৯ , ১২ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.2/5 (26 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-০৬-২০১২

জ্যোতি বসুর ৯৮ তম জন্মদিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য

দীপক রায়


জ্যোতি বসুর ৯৮ তম জন্মদিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য
ভারতীয় উপমহাদেশের বরেন্য বামপন্থী রাজনীতিবিদ জ্যোতি বসুর ৮ জুলাই ৯৮ তম জন্মদিন। সারা পৃথিবীতে কোন একটি নির্বাচিত সরকারে একনাগাড়ে বহু বছর শাসন করার কৃতিত্ত্ব আর কোন রাজনীতিকের নেই। এমন এই মানুষটি ছিলেন বাঙ্গালী। দেশে বিদেশে এমন কোন বাঙ্গালী নেই যিনি জ্যোতি বসুর নাম শোনেননি। তার জন্মদিনকে স্মরণ করে এই সংক্ষিপ্ত লেখার অবতারনা।
১৯১৪ সালে কলকাতায় তার জন্ম হয়েছিল। ছাত্রাবস্থায় উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে তিনি কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হএছিলেন। ১৯৪০ সালে ভারতে ফিরে এসে প্রথমে আইন ব্যবসাতে যুক্ত হলেও অচিরেই সেই পেশা ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে। সেই সময় ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের জনক ছিলেন প্রবাদপতিম নেতা মুজফফর আহমেদ। তার সাথে যুক্ত হয়ে তিনি বামপন্থী আন্দোলনকে নিয়ে গেলেন একটি বিশেষ জায়গায়। ১৯৪৬ সালে তিনি অবিভক্ত বঙ্গপ্রদেশের আইনসভায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত হন। অসংখ্যবার ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের দায়ে তিনি গ্রেফতার বরন ও আত্মগোপনে বাধ্য হন। এরপরে দেশভাগের পরেও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ড. বিধানচন্দ্র রায়ের মুখ্যমন্ত্রীত্বের সময় তিনি হন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিরোধী দলনেতা। এই সময় ভারত সরকার তার দলকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করলে তিনি আবারো গ্রেফতার হন। ১৯৬৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বিভাজনের পর তিনি যোগ দেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) দলে। যার সংক্ষিপ্ত নাম সিপিআই(এম)। তবে দল ভাগ হলেও সমস্ত বামপন্থী দলকে নিয়ে তিনি একসাথে লড়াই আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হলে তিনি হন উপমুখ্যমন্ত্রী। এরপর ১৯৭৭ সালের ২১ জুন শপথ নেন পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। ১৯৯৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম বিবেচিত হলেও, তিনি পার্টির সিদ্ধান্তে সেই পদ প্রত্যাখ্যান করেন। টানা ২৩ বছর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাতে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করে অবসর নেন জ্যোতি বসু। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জ্যোতি বসুর শাসনকাল নানা সাফল্যের খতিয়ানে ভারতে একটা নজির।
তিনি ছিলেন অবিসংবাদী জননেতা। নিজের দল, বামফ্রন্ট ও রাজনীতির বাইরেও এক বিশিষ্ট সম্মানের অধিকারী। তার বাবা ডা: নিশিকান্ত বসু ও মা হেমলতা বসুর তৃতীয় সন্তান জ্যোতি বসুর সাথে অধুনা বাংলাদেশের নাড়ির টান রয়েছে। ঢাকার অদুরে বারদি গ্রামে রয়েছে তার মাতামহের বাড়ী। একসময়  ছেলেবেলাও কেটেছে তার বারদিতে। কারন বসু পরিবারের আদিনিবাসও ছিল ব্রিটিশ বাংলা প্রদেশের ঢাকা জেলার (অধুনা বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার) বারদী গ্রামে।
জ্যোতি বসু ১৯২০ সালে কলকাতার ধর্মতলার মেয়েদের স্কুল লোরেটোতে প্রথম ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর ১৯২৫ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল থেকে সিনিয়র কেমব্রিজ বা নবম শ্রেণি পাস করেন। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। গ্র্যাজুয়েশন সম্পূর্ণ করার পর ১৯৩৫ সালে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার্থে তিনি বিদেশে যান। সেখান থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। লন্ডনে থাকাকালীন সেখানকার ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে গড়ে ওঠা লন্ডন মজলিশের তিনি ছিলেন প্রথম সম্পাদক। ইংল্যান্ডে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে তার সখ্যতা বাড়ে। বিশিষ্ট কমিউনিস্ট দার্শনিক ও লেখক রজনী পাম দত্ত কর্তৃক কমিউনিস্ট মতাদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন জ্যোতি বসু। বলা যেতে পারে লন্ডনে আইন পড়তে গিয়েই রাজনীতিতে তাঁর দীক্ষা হয়। ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনে আইন পড়তে পড়তেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, আইন ব্যবসা নয়, কমিউনিস্ট রাজনীতিই হবে তার জীবনের ব্রত। তখন বিশ্বে ফ্যাসীবাদী অভ্যূত্থান শুরু হয়েছে। লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে হ্যারল্ড লাস্কির বক্তৃতা শুনতে শুনতে তিনি উদ্দীপ্ত হয়ে পড়লেন। কার্ল মার্কসের দাস ক্যাপিটাল এবং এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো পড়ে মেতে উঠলেন রাজনীতিতে।
সেই সময় জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে আইন পড়তে গিয়েছিলেন মার্কসবাদে দীক্ষিত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা ভূপেশ গুপ্ত। ভূপেশ গুপ্ত এবং স্নেহাংশু আচার্যের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপিত হলো কমিউনিস্ট পার্টি অব গ্রেট বিটেনের। রজনী পাম দত্ত, বেন ব্রাডলি, হ্যারি পলিট প্রমুখ কমিউনিস্ট নেতাদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য তাঁকে উজ্জীবিত করল। জ্যোতি বসু সিদ্ধান্ত নেন, ভারতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ১৯৪০ সালে জ্যোতি বসু দেশে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়ে যান। আর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন রেল শ্রমিকদের নেতা হিসাবে। স্বাধীনতার পূর্বে দেশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, তেভাগা আন্দোলন ও বঙ্গবিভাগ নিয়ে আইনসভায় বিভিন্ন আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন তিনি। স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলন, বন্দীমুক্তি, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত আন্দোলনের পুরোভাগে থাকেন জ্যোতি বসু। এই সময় একাধিকবার বিভিন্ন কারণে কারারুদ্ধও হতে হয় বসু সহ তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় কমিউনিস্ট নেতাদের।
রাজ্যের ক্ষমতায় এসে জ্যোতি বসু পাটশিল্প, কয়লাশিল্প ইত্যাদির রাষ্ট্রায়াত্ত্বকরণ এবং জমিদারি প্রথার উচ্ছেদের ঘোষনা করেন। জমিদারি প্রথার উচ্ছেদের পাশাপাশি ভূমিহীনদের মধ্যে জমিবণ্টন নিয়ে তার উদ্যোগ ভারতের ইতিহাসে চিরদিন লেখা থাকবে। তার সরকারের ৩৬ দফা কর্মসূচীর অবদান পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে চিরঋনী করে রেখেছে। মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে দেশ শাসনের দর্শন ব্যক্ত করে তিনি বলেছিলেন, "আমরা রাইটার্স বিল্ডিং থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করব না, আমরা আমাদের কর্মসূচী রূপায়ণ করব মাঠ আর কারখানা থেকে, জণগণের সহায়তা নিয়ে, কারণ এরাই আমাদের ক্ষমতার উৎস।"  ২০০০ সালের ২৮ জুলাই সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক চলাকালীন হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন জ্যোতি বসু। চিকিৎসার পর সুস্থ্য হয়ে উঠে ১৫ আগস্ট নিজেই জানান ১৫ সেপ্টেম্বরের পর অবসর নিতে চলেছেন তিনি। তবে পার্টির চাপে অবসরের তারিখ নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। ৩ নভেম্বর শেষ বারের মতো পশ্চিমবঙ্গ এর রাজ্য সচিবালয় মহাকরণে আসেন বসু। ৫ নভেম্বর রাজারহাট নিউটাউনে একটি আবাসিক ভবনের অনুষ্ঠানে যান। সেটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ সরকারি অনুষ্ঠান। একটানা ৮৫৪০ দিন মুখ্যমন্ত্রীত্বের দায়িত্বভার পরিচালনার পর ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে বিদায় সংবর্ধনা সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নেন জ্যোতি বসু। সেই বছর ২৩ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করতে চাইলে তিনি তা গ্রহণে অসম্মত হন। এরপরে ২০০৭ সালের ১৭ মার্চ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় জ্যোতি বসুকে সাম্মানিক ডি. লিট. সম্মান প্রদান করে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হলে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি তাকে বিধাননগরের আমরি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সতের দিনের দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় সময় সকাল ১১ টা ৪৭ মিনিটে জ্যোতি বসুর জীবনাবসান হয়। তাঁর দেহের সৎকার হয় নি, তিনি দেহ দান করে গেছেন মেডিক্যাল কলেজের গবেষণায়। তার শেষযাত্রায় ভারতের সব দল তো বটেই, পৃথিবীর নানা দেশের রাষ্ট্রনেতারা উপস্থিত থেকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, জ্যোতি বসুর কোন বিকল্প হয়না। তিনি কমিউনিস্ট নেতা, জননেতা, রাষ্ট্রনেতাও বটে।
জ্যোতি বসু ভারতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন সন্দেহ নেই। তার জন্যেই ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জলচুক্তি হয়েছিল। বাংলাদেশের যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষকে আশ্রয় দেবার ক্ষেত্রেও তার অবদান চিরস্মরনীয় থাকবে। অতি সম্প্রতি তার দল কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে সরে গেলেও এখনো একক দল হিসাবে সবচেয়ে বেশী ভোট পেয়েছে তারা। এখনো ত্রিপুরা রাজ্যের ক্ষমতায় আছে তার দল। আর এই কৃতিত্তের জন্যে দলের যে মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশী, তার নাম অবশ্যই জ্যোতি বসু। তার জন্মদিনে তার প্রতি রইল শ্রদ্ধার্ঘ্য।

পশ্চিমবঙ্গ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে