Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০ , ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (42 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-১৩-২০১২

প্রণব সত্য, মুজিবকন্যা কি পারবেন

পীর হাবিবুর রহমান


প্রণব সত্য, মুজিবকন্যা কি পারবেন
দেশের রাজনীতিতে যখন ইলিয়াস আলী নিখোঁজ রহস্য নিয়ে বিরোধী দল আন্দোলনমুখর, প্রতিবাদের ঝড়, পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদ অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরের পোস্টমর্টেম নিয়ে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণের চায়ের টেবিলে তুফান তখন ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের জরিপে দেখা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। হিলারি ক্লিনটন ও প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাদের বৈঠকের পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ যতটা না রাজনীতিতে চমক সৃষ্টি করেছে তার চেয়ে বেশি কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে দেখা দিয়েছে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মোজেনার বাসভবনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্যার ফজলে হাসান আবেদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি। এ বৈঠকে দেশবরেণ্য দুই ব্যক্তি আগামী জাতীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে মত দেওয়ায় বিরোধী দল যেমন উল্লসিত তেমনি সরকারের মন্ত্রী-নেতাদের বক্তব্যে চরম অসন্তোষের নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে। রাজনীতিতে নতুন হিসাব, জল্পনা-কল্পনাই ঠাঁই পায়নি, তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে। শাসক আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী-নেতারা ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে পর্যন্ত আক্রমণাত্দক ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন। তারা ভুলে গেছেন, গ্রামীণ ব্যাংকের স্বপ্নদ্রষ্টা ড. ইউনূসের উচ্চতা পশ্চিমা দুনিয়ায় কতটা উঁচুতে। ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে এ দেশের মিডিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক খবর কম প্রকাশ হয়নি। কিন্তু মানুষ তার নোবেল প্রাপ্তিতে উল্লসিত হয়েছে। দেশের একজন সন্তানের নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে দেশবাসী গৌরবের অংশীদার হয়েছে। অর্থমন্ত্রী থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর বক্তব্য দেশের মানুষকে ব্যথিত করেছে। ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে বিদেশিরা প্রশ্ন তোলেননি। প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারিত্ব বহন করা আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীরা। এটা নিঃসন্দেহে বেদনার বিষয়। এমনকি সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনীতিতে এককালের চরম মুজিব বিদ্বেষী জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দল সাম্যবাদী দল, যার কোনো ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার পদে জয়লাভের লোক নেই, নির্বাচনী এলাকা নেই, সেই সর্বহারা রাজনীতির দিলীপ বড়ুয়ার ড. ইউনূস এবং স্যার ফজলে হাসান আবেদকে তত্ত্বাবধায়ক চাইলে রাজনীতিতে আসার আমন্ত্রণ জানানোর তামাশা মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। কোথাও কোথাও হাসির খোরাকও জুগিয়েছে। দেশের নাগরিক হিসেবে চলমান রাজনীতির চিত্র দেখে যে কেউ যে কোনো ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন চাইতেই পারে। এতে সরকার পক্ষ তাদের আমলে নিলে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু আক্রোশে জ্বলে উঠবে কেন? তাই তো প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, কত বড় বেকুবের দেশে আছি আমরা! এ যে মানুষের মনের কথা।

২. হিলারি ক্লিনটন রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সব দলের সংলাপের ওপর জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে বিদেশিদের ভূমিকা রাখার সুযোগ আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোই দুই যুগ আগে করে দিয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা পালনকারী পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দুনিয়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পরামর্শ দিতেই পারে। জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে বা আত্দমর্যাদার প্রশ্নে যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে গ্লানিকর হয় তাহলে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই আলোচনা ও সমঝোতার পথে উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মিটমাট করে ফেললে তারা কথা বলার সুযোগ পাবেন না। এক্ষেত্রে সরকারকে উদার উদ্যোগী হতে হবে। বিরোধী দলকে অব্যাহত বিরোধিতার ধারা বদলে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। ওয়েস্টমিনিস্টার ধাঁচের গণতন্ত্রে সরকার শুধু শাসনের পথে হাঁটবে আর বিরোধী দল শুধু বিরোধিতার ধারায় চলবে, তা হতে পারে না। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ হবে না, তা হতে পারে না। সংসদ অকার্যকর রেখে সংসদ বর্জন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজপথের সহিংস প্রতিহিংসার নেতিবাচক অর্থনৈতিক উন্নয়নবিরোধী কর্মসূচি ছেড়ে বিরোধী দলকে যেমন সংসদে যেতে হবে, সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে সমালোচনায় মুখর হতে হবে, তেমনি সরকারকেও সহিষ্ণু হতে হবে। উদার গণতন্ত্রীর ভূমিকা নিতে হবে।বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারত ঐতিহাসিকভাবে আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু। স্বাধীনতার পর থেকে ভারত হেঁটেছে উদার গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পথে। পাকিস্তান হেঁটেছিল সাম্প্রদায়িকতা ও অগণতান্ত্রিক শাসনের পথে। ভারত আজ দুনিয়ার বুকে মাথা উঁচু করা চতুর্থ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। জঙ্গিবাদে ক্ষতবিক্ষত পাকিস্তান এক ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিকূল বৈরী স্রোতের বিরুদ্ধে জনগণের অব্যাহত সংগ্রামে বাংলাদেশ হাঁটছে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক পথে। আঘাত নানা সময়ে এলেও পথহারা হয়নি বাংলাদেশ ও তার জনগণ। বাংলাদেশের বন্ধু ভারতের বরেণ্য রাজনীতিবিদ অভিজ্ঞ অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিও বলেছেন, গণতান্ত্রিক সমাজে সংলাপের বিকল্প নেই। সংলাপ এবং সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় পেঁৗছার পরামর্শই তিনি দিয়েছেন। আগেরবার প্রণব মুখার্জি ঢাকায় এলে বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা হয়নি। এবার দেখা হয়েছে। খালেদা জিয়াকে তিনি ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রণব মুখার্জি বলেছেন, ভারত একক কোনো দল বা গোষ্ঠীর সঙ্গে নয়, সব দলের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়তে চায়। বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায়। তিস্তা চুক্তি নিয়ে তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে বলেছেন, এ ব্যাপারে ভারতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। ঐক্য গড়ে তোলা হলেই চুক্তি হবে। ভারতের প্রভাবশালী মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি সত্য কথাটিই বলেছেন। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গেই বন্ধুত্ব রাখতে চায়। গান্ধী পরিবারের সঙ্গে মুজিব পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতেই পারে। সেটি ঐতিহাসিক সত্য। শেখ হাসিনা সরকার আগের শাসনামলে যখন গঙ্গা চুক্তি করেছিলেন তখন দিলি্লর ক্ষমতায় কংগ্রেস ছিল না। দেব গৌড়ার কোয়ালিশন সরকার ছিল। সে দিনও সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। রিপাবলিক বা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে নয়। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে করে। লেবার বা রক্ষণশীলদের সঙ্গে নয়।

পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের বন্ধুত্ব। সরকারের সাফল্য ও দায়িত্বশীলতায় বন্ধুত্ব উষ্ণ হয়, দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতায় সম্পর্কের অবনতি বা টানাপড়েন হয়। প্রণব মুখার্জির বক্তব্যে কারও উল্লসিত বা ব্যথিত হওয়ার বিষয় নয়। ভারতে ফেডারেল শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। দিলি্ল তিস্তা চুক্তি করতে গেলে পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রের নেত্রী মমতা ব্যানার্জি তিস্তায় জল নেই বলে আপত্তি তুলেছেন। তিনি স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচিত নেতা হিসেবে তার পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থ মাথায় নিয়ে বাগড়া দিয়েছেন। দিলি্ল যখন বলছে মমতার বাগড়ায় মনমোহনের সফরে চুক্তি হচ্ছে না তখন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চুক্তি হবে বলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা দুর্বল করে দেন। এখনো তিনি ও উপদেষ্টা একই পথে হাঁটছেন, যা দিলি্ল বলছে না। আর চুক্তি করে যদি পানি পাওয়া না যায় সেই চুক্তি অসার। সেটি মানুষ চাইছে না। পানির জন্য চুক্তি। তাই মমতার বক্তব্যের পথে পানির প্রকৃত চিত্র জেনে উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে চুক্তি না হলে তা ভবিষ্যতে উভয়পক্ষের সম্পর্কের উষ্ণতা হ্রাস করবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রণব মুখার্জি রবীন্দ্রনাথের জন্য এসেছিলেন। ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণের ২০ কোটি ডলার অনুদান দিয়ে গেছেন। এক দিনের সফরের প্রাপ্তি কম নয়। আমাদের মন্ত্রীদের আরও দায়িত্বশীল কথাবার্তা ও ভূমিকা দেশবাসীর বড় বেশি প্রত্যাশা। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার এক সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জাতির বহু সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্দদানের মহৎ ব্যাপারটি। আত্দমর্যাদাশীল জাতি তার মহান নেতা শেখ মুজিবকে হারিয়েছে অনেক আগে। বারবার হোঁচট খেয়েছে গণতন্ত্র। তাও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও দুর্বলতার কারণে। জনগণ বারবার বুক বাঁধে আর উঠে দাঁড়ায় বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এক সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে বলেই প্রভাবশালী দুনিয়ার দৃষ্টি ও আগ্রহ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার শরীরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মহান নেতার রক্ত বইছে বলেই একবার বলেছিলেন, গরিবের সুন্দরী বউ সবার ভাবী হয়। এবারও সেই রকমই একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন। সর্বত্র নানা জল্পনা-কল্পনারও কমতি নেই। গুজবেও ভাসে ঢাকা, কান দেয় নানা মহল। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগের অবসানের পর বিশ্বায়নের এই যুগে বৈরিতা নয়, বন্ধুত্বের উষ্ণ হাত বাড়িয়ে গভীর কূটনৈতিক সম্পর্কের পথে হাত ধরাধরি করে উন্নয়নের পথে হাঁটছে দুনিয়া। অঞ্চলভিত্তিক ঐক্য জোরদার হচ্ছে। পদ্মা সেতু ইস্যুর পর পশ্চিমাদের সাহায্যের দুয়ার সংকুচিত হচ্ছে এমন ধারণা অভিজ্ঞ মহলের। তবুও শেখ হাসিনা বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের উষ্ণতা নিয়ে এই অঞ্চলকে এগিয়ে নেওয়াই নয়, বাংলাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছেন। যখন দুনিয়াব্যাপী বলা হচ্ছে, পানি নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনার কথা, তখন আমরা এক হিমালয়ের পাদদেশের পানি নিয়েই এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে চাহিদা পূরণের স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছি। ভারত এ ক্ষেত্রে একটি বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে উদার দৃষ্টি নিয়ে হাত বাড়াবে সেটি এ দেশের মানুষের প্রত্যাশা।

৩. সুমহান মুক্তিযুদ্ধে বন্ধুপ্রতিম ভারতের অবদানের কথা এবং তার সঙ্গে উষ্ণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখার তাগিদ ভুলে গিয়ে দক্ষিণপন্থিদের খপ্পরে পড়ে দেশ শাসনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিএনপি ও তার নেতৃত্ব ভারতবিরোধী রাজনীতির জিকির কম করেনি। প্রণব মুখার্জি বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার পর বিএনপির নেতারা বেজায় উল্লসিত। যেন হিলারি ক্লিনটন তাদের জন্য বর নিয়ে এসেছিলেন। আর প্রণব মুখার্জির সাক্ষাৎ যেন ঘরের লক্ষ্মী হয়ে দেখা দিয়েছে। কিন্তু বিএনপিকে ভুললে চলবে না হিলারি এবং প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের জনগণের মনের কথাই বলেছেন। এই দেশের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। হিলারি বলেছেন, গন্তব্যে পেঁৗছতে হলে সবাইকে এক নৌকায় চড়তে হবে। হরতালের মতো অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনা কর্মসূচি না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। মানে সংঘাতের পথে হাঁটবেন, গণতন্ত্রকে নির্বিঘ্নে চলতে দেবেন না, এমনটি হবে না। এটি এ দেশের মানুষও বিশ্বাস করে। সিভিল সোসাইটি গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবেই কাজ করে, সরকার যাতে ক্ষমতার দম্ভে ফ্যাসিস্ট না হয়ে ওঠে। বিরোধী দল যেন দায়িত্বহীন না হয়ে পড়ে। এ দেশেও তাই। তাই বলে যারা সুশীল বা সিভিল সোসাইটির সরকারের স্বপ্ন দেখেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করেন। গণতন্ত্রের পথেই উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন মানুষের প্রত্যাশা। এখানে সরকার ও বিরোধী দলকেই নয়, ছোট ছোট দলগুলোকেও এক নৌকায় তুলে গন্তব্যে পেঁৗছার কথা বলেছেন হিলারি। এ দেশের মানুষও বারবার জাতীয় ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যের কথাই বলে আসছেন। ২১ বছরের গণতন্ত্রে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই হতাশা থেকে, বেদনা থেকে জনগণ বারবার বলে আসছে, এরশাদ জমানাই ভালো ছিল। মানুষের এই বেদনার ভাষা কোনো সরকারই আমলে নেয়নি। তবুও মানুষ চায় গণতন্ত্রের অব্যাহত যাত্রা। ওয়ান-ইলেভেন দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে এলেও সেটিও ব্যর্থতার পথে বিদায় নিয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের শিক্ষা রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজের জন্য সুখকর হয়নি। তাই মানুষ বলে, সেখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে রাজনীতিবিদদের। বিএনপির বিগত শাসনামলটি অভিশপ্ত ছিল দেশবাসীর জন্য। সীমাহীন দুর্নীতি-লুটপাটের মহোৎসব, প্রশাসনসহ সর্বত্র দলবাজির আগ্রাসন, জঙ্গিবাদ ও মাফিয়া চক্রের উত্থান, অকার্যকর সংসদ, বিরোধী দলের ওপর চরম দমন নির্যাতন, প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রীদের হত্যা, বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ও তা নিয়ে জজমিয়া নাটক, সারা দেশে গ্রেনেড ও বোমা হামলার ঘটনা জনগণের বুকই ভেঙে দেয়নি, দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে আসা বিএনপির তরীও ডুবিয়েছিল। দুনিয়াজুড়ে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের বদনাম কুড়িয়েছিল। বিএনপি এখন সরকারের নানা ব্যর্থতার পথে ক্ষমতায় ফিরে আসার স্বপ্নে বিভোর। বিভিন্ন স্থানীয় ও উপ-নির্বাচনে জনমতের প্রাথমিক আভাস পাওয়া গেলেও এ দলটি ফের ক্ষমতায় এলে মানুষের স্বপ্ন কতটা পূরণ হবে সেই প্রশ্ন জনতার চোখে রয়েই গেছে। গণতন্ত্রের পথে ২১ বছরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি একে অন্যের বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই প্রশ্নের মীমাংসা করে জনগণের আস্থা কি আজকের বিএনপি নেতৃত্ব অর্জন করতে পেরেছে যে, তারা ক্ষমতায় এলে সংসদ অকার্যকর হবে না? প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রে দলীয়করণ ও দুর্নীতির অশুভ ছায়া দেখা যাবে না? প্রতিহিংসার আগুনে শাসকদল হিসেবে বিএনপি প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করবে না? নির্যাতন চালাবে না? পাক্কা সুশাসন দেবে? দেশ, আইন, বিধিবিধান ও সংবিধান অনুযায়ী চলবে? এই গ্যারান্টি কিভাবে দেবেন আজকের বিএনপি নেতৃত্ব? যারা হাওয়া ভবনকে ডুবিয়েছিল, যারা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে রেড ব্লকে বন্দী রেখে তার শাসনামলকে কলঙ্কিত করে আখের গুছিয়েছিল তারা তো আজ হয় পলাতক, না হয় ধরাছোঁয়ার বাইরে। দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী যারা এখনো দমন, নির্যাতনের মুখে তারা পর্যন্ত দেখল না বিএনপি নেতৃত্ব সেই শাসনামলের খলনায়ক বা দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে! সরকার বদল হলে মানুষের ভাগ্য বদল হবে এমন বিশ্বাস কি মানুষকে খালেদা জিয়ার বিএনপি দিতে পারছে? সন্ত্রাসবাদকে সহায়তা দিয়ে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন ঘটাবে না সেই গ্যারান্টি বা কোথায়? যারা জাতির জনকের হত্যার রজনীতে কেক কাটার উৎসব করে শোকার্ত জনগণের মনে আঘাত করে তারা জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি গড়ে তুলতে পারবে? বিএনপি নেতৃত্বকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি এই প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে।

৪. এশিয়ার রাষ্ট্রনায়কদের ওপরে গত বছরের ৫ এপ্রিল থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ, ১০০ জনের মধ্যে ৭৭ জন বাংলাদেশের মানুষ মনে করেন শেখ হাসিনা সঠিক পথে চলছেন। প্রকাশিত জরিপটি তার এবং তার দলের জন্য আনন্দদায়ক হলেও আজকের বাস্তবতায় এ প্রশ্নের মুখোমুখি তাকে হতেই হবে যে, তার জনপ্রিয়তা ও তার সরকারের জনপ্রিয়তা অভিন্ন কিনা? পাশাপাশি তার দলের জনপ্রিয়তা তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আছে কিনা? মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা '৯৬ শাসনামলে পারমাণবিক শক্তির মহড়ায় লিপ্ত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ করার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে গিয়ে পশ্চিমাদের দৃষ্টি কেড়েছিলেন। সেবার তার শাসনামল অনেক উত্তম হলেও ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফল ছিল নাটকীয়। যা তার দল ও সমর্থকদের কাছে ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। সেবার শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সাধারণ আইনে করেছিলেন। এবার তিন-চতুর্থাংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেছেন। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে এবং নারীর ক্ষমতায়নে তার দুই শাসনামলের ভূমিকা দুনিয়াজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ টানাপোড়েনের শীতল সম্পর্ককে উষ্ণ করে বন্ধুত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। দেখতে দেখতে তার পাঁচ বছরের শাসনামলের সাড়ে তিন বছর চলে যাচ্ছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব ও নারীর ক্ষমতায়নে তার ভূমিকা হিলারির কণ্ঠেও প্রশংসিত হয়েছে। এবার তার সরকার ড. ইউনূস ইস্যুতে পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনে পড়েছে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন আসছে না। অন্যান্য খাতে পশ্চিমা সাহায্য আসবে এমন সম্ভাবনাও দূরের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত গুম-খুন সরকারের ভাবমূর্তি দেশ-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শেয়ার কেলেঙ্কারির নায়কদের কারণে ৩২ লাখ রিক্ত-নিঃস্ব বিনিয়োগকারীর বুকভরা ক্রন্দন সরকারের জনপ্রিয়তায় কতটা অাঁচড় বসিয়েছে তাও এখন প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এই মুহূর্তে জরিপের ফলাফলে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনাকে অন্ধ আত্দবিশ্বাসে বসে না থেকে মানুষের ভাষা শোনা জরুরি। তিনি বারবার বলেছেন, তার হারানোর কিছু নেই। মৃত্যুভয় নেই। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও কল্যাণের জন্য তিনি জীবন দিতেও প্রস্তুত।

ফের ক্ষমতায় এসে তার অসম্পূর্ণ কাজ বাস্তবায়ন করতে হলে তার সামনে প্রশ্ন_ রাজনৈতিক সমঝোতায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে হাঁটতে তিনি কী উদ্যোগ নিচ্ছেন? তার সরকারের মন্ত্রীরা যারা অতিকথনে বিতর্কের ঢেউ তুলছেন দফায় দফায় তারা তার দলের জন্য মানুষের আস্থা অর্জন করছেন না হারাচ্ছেন? দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে যাদের নাম সরকারের ভেতরে-বাইরে বা সরকারি ছায়ায় আলোচিত হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন? সারা দেশে যে সব মন্ত্রী-এমপি সিন্ডিকেট করে দল ও মানুষ বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন তারা আগামী নির্বাচনের জন্য কতটা সুফল বয়ে আনবেন? যে দলীয়করণ বিএনপির জন্য শুভ হয়নি সেই দলীয়করণ শাসক আওয়ামী লীগের জন্য কতটা সুখকর? রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও নির্বাচনী লড়াইয়ে আজকের আওয়ামী লীগ সংগঠনটি কতটা উপযোগী? দলের ওপর কমিউনিস্ট বা বামপন্থিদের প্রভাব আওয়ামী লীগকে ধূসর না চিরসবুজ করেছে? মহাজোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ ও তার কর্মীরা শাসক দলের ওপর কতটা সন্তুষ্ট? দলের ভেতরে-বাইরে অনাদর, অবহেলা, অভিমানে যে সব মুজিব অন্তঃপ্রাণ রাজনৈতিক ব্যক্তি বা ছোট ছোট দলের বড় বড় নেতা রয়েছেন ঐক্যের যাত্রাপথে তাদের নৌকায় তুলে ভোটের হাওয়া জোরদার করা কি সম্ভব? শেখ হাসিনা শুধু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সরকার প্রধানই নন, তিনি মুজিবকন্যাও। আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক মাহাথির মোহাম্মদ ঢাকায় মুজিবকন্যা শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, 'আপনার প্রথম পাঁচ বছরের শাসনামল আমার পাঁচ বছরের চেয়ে অনেক উত্তম ছিল। কিন্তু আমি দুর্নীতির কণ্ঠরোধ করেছি, নেতৃত্বের পরিবর্তন আনলেও নীতির পরিবর্তন হতে দেইনি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করে সাফল্য এনেছি।' মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা চাইলে পারবেন। এখনো দেড় বছর সময় বাকি। দুর্নীতির কণ্ঠ শক্ত হাতে চেপে ধরে যাদের কপালে দুর্নীতির কলঙ্ক তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে হতাশ জনগণকে জাগিয়ে তুলতে। সরকারের ছায়ায় থাকা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দুখিনী বাংলার নেতা শেখ মুজিবের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। উদার গণতন্ত্রীর ভূমিকায় আবিভর্ূত হয়ে বিরোধী দলকে আলোচনার টেবিলে ডেকে আস্থা অর্জনের। মুজিবকন্যাই পারেন তোষামোদকারীদের হটিয়ে মুজিব অন্তঃপ্রাণ গ্রহণযোগ্য নেতা-কর্মীদের নিয়ে তার সংগঠনকে ঘুরে দাঁড় করাতে। তিনিই পারেন তার জোটের বাইরে থাকা মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন মুজিব অনুসারী ছোট ছোট দলকে মহাজোটে টানতে। মুজিবকন্যা কি পারবেন?

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে