Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ , ১১ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (39 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-০৬-২০১২

বুদ্ধপূর্ণিমা ও বুদ্ধবাণীর তাৎপর্য

দিলীপ কুমার বড়ুয়া


বুদ্ধপূর্ণিমা ও বুদ্ধবাণীর তাৎপর্য
আজ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা। জন্ম, বুদ্ধত্বলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ (মৃত্যু)—বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক মহামানব গৌতম বুদ্ধের জীবনে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল। তাই বৈশাখী পূর্ণিমাকে বুদ্ধপূর্ণিমাও বলা হয়। বিশ্ব বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কাছে দিনটির আবেদন অনন্যসাধারণ।
সিদ্ধার্থ গৌতম ছিলেন রাজপুত্র। সর্বজীবের মঙ্গল ও দুঃখ থেকে মুক্তির পথ অন্বেষণের জন্য পরিবার-পরিজন, রাজপ্রাসাদের বিলাসী জীবন, স্ত্রী-পুত্র, পিতা-মাতা ও রাজসিংহাসনের মায়া ত্যাগ করে তিনি পথে নেমেছিলেন। সুদীর্ঘ ছয় বছর কঠোর সাধনায় লাভ করেন বোধি, খ্যাত হন বুদ্ধ নামে। আবিষ্কার করেন চার আর্য সত্য: জগতে দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখের নিরোধ আছে এবং দুঃখ নিরোধের উপায় আছে। দুঃখ নিরোধের উপায় হিসেবে তিনি নির্দেশ করেন আটটি অঙ্গসমন্বিত পথ আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ: সৎ দৃষ্টি, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ ব্যবহার, সৎ জীবিকা, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ চিন্তা এবং সাধু ধ্যানে চিত্তকে নিবিষ্ট করা। এ পথই শান্তির পথ। এ ছাড়া তিনি আবিষ্কার করেন জন্ম, মৃত্যু ও দুঃখের কারণ প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্ব। এ তত্ত্বের মূল নীতি হলো: ওটা থাকলে এটা হয়, ওটার উৎপত্তিতে এটার উৎপত্তি, ওটা না থাকলে এটা হয় না, ওটার নিরোধে এটার নিরোধ হয়।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীর সবকিছুই কার্যকারণ শৃঙ্খলে আবদ্ধ এবং শর্তসাপেক্ষ। জড়জগৎ ও মনোজগৎ—নীতির দ্বারা পরিশাসিত হয়। ১০টি কারণে জন্ম, মৃত্যু ও দুঃখের সৃষ্টি হয়। তাই প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্বকে দ্বাদশ নিদানও বলা হয়। এসব নিদান বা কারণ হচ্ছে: ১. অবিদ্যা ২. সংস্কার ৩. বিজ্ঞান ৪. নাম-রূপ ৫. ষড়ায়তন ৬. স্পর্শ ৭. বেদনা বা অনুভূতি ৮. তৃষ্ণা ৯. উপাদান ১০. ভব বা উৎপত্তি ১১. এবং ১২. জন্ম, জরা, ব্যাধি, দুঃখ ইত্যাদি। এই ১২টি কারণ শর্ত সাপেক্ষে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটির কারণে অপরটি উৎপন্ন হয়, একটির নিরোধে অপরটির নিরোধ হয়। এই তত্ত্ব বিশ্লেষণে দেখা যায়, অবিদ্যার কারণে সংস্কার, সংস্কারের কারণে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের কারণে নাম-রূপ, নাম-রূপের কারণে ষড়ায়তন, ষড়ায়তনের কারণে স্পর্শ, স্পর্শের কারণে বেদনা, বেদনার কারণে তৃষ্ণা, তৃষ্ণার কারণে উপাদান, উপাদানের কারণে ভব, ভবের কারণে জন্ম এবং জন্মের কারণে মানুষ জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, অপ্রিয়সংযোগ, প্রিয়বিচ্ছেদ, ঈপ্সিত বস্তুর অপ্রাপ্তিজনিত দুঃখ প্রভৃতি ভোগ করে। বর্ণিত কারণসমূহ একটির কারণে অপরটির ধ্বংস হয়। ফলে অবিদ্যা বিদূরিত হলে সংস্কার বিদূরিত হবে, এমনিভাবে জন্ম নিরোধ করা গেলে জরা, ব্যাধি এবং মৃত্যু-দুঃখ নিরোধ হবে।
বুদ্ধ উপর্যুক্ত দর্শন এমন একসময় প্রচার করেছিলেন, যখন প্রাচীন ভারতের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী জাতিভেদ প্রথার নিগড়ে আবদ্ধ, অসাম্য-অনাচার সর্বস্বতার দ্বারা দারুণভাবে বিপর্যস্ত, ধর্মীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং বিশ্বাসরূপী সংস্কারের বেড়াজালে শৃঙ্খলিত ছিল। তিনি মানুষকে কোনো প্রকার বন্ধনে আবদ্ধ করেননি, বিশ্বাসরূপী শৃঙ্খল দ্বারাও বাঁধেননি। অধিকন্তু দিয়েছিলেন বুদ্ধি ও বিবেকের স্বাধীনতা। তাই তিনি নিজেকে ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং উপস্থাপিত হয়েছেন পথপ্রদর্শক হিসেবে। তাঁর উপদেশ ছিল ‘নিজের দীপ প্রজ্বলিত করে নিজেই নিজের মুক্তির পথ পরিষ্কার করো, অন্যের ওপর নির্ভর কোরো না।’
বুদ্ধ কখনো জন্মকে প্রাধান্য দেননি, প্রাধান্য দিয়েছেন কর্মকে। তাই তাঁকে বলতে দেখি, ‘জন্মের দ্বারা কেউ চণ্ডাল হয় না, কর্মের দ্বারাই চণ্ডাল হয়।’ তাঁর ধর্ম কর্মপ্রধান, আপনি আচরি ধর্ম, অনুশীলন ও মননের ধর্ম। এ ধর্মে অদৃষ্টবাদ ও বাহ্যিক আড়ম্বরতার কোনো স্থান নেই। যে যেরূপ কর্ম করবে, সে সেরূপ ফল ভোগ করবে। নৈতিকতা এ ধর্মের অন্যতম আদর্শ। সমগ্র ত্রিপিটক অধ্যয়ন করলেও বৌদ্ধ হওয়া যায় না, যদি না তার নৈতিক চরিত্রের দৃঢ়তা থাকে। বুদ্ধ বলেছেন, ‘তিনিই প্রকৃত বৌদ্ধ (ভিক্ষু), যাঁর চিত্ত বিশুদ্ধ, নৈতিকতায় প্রোজ্জ্বল, লোভ-দ্বেষ-মোহ হতে মুক্ত এবং সত্যদৃষ্টি বা প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত।’
একজন বৌদ্ধকে অশুভ কর্ম থেকে বিরত থাকতে হবে, বিরত থাকতে অন্যকে উৎসাহিত বা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করতে হবে। অপর দিকে শুভ বা মঙ্গলজনক কর্ম করতে হবে এবং অপরকেও উৎসাহিত করতে হবে। অশুভ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য বৌদ্ধদের শীল পালন করতে হয়। তন্মধ্যে প্রধান পাঁচটি শীল পঞ্চশীল নামে পরিচিত। এই পাঁচটি শীল হচ্ছে: ১. প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকা ২. অদত্ত বস্তু গ্রহণ না করা বা চুরি না করা ৩. ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা ৪. মিথ্যাচার থেকে বিরত থাকা এবং ৫. মাদকদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। পৃথিবীতে সব দুঃখ, অশান্তি, অন্যায় ও উপদ্রবের মূলে আছে এই পাঁচটি অপকর্ম। হত্যা, চুরি, ব্যভিচার ও মাদক সেবন—বর্তমান বিশ্বের বিরাট সমস্যা। এই সমস্যা মানুষকে শঙ্কিত করে তুলেছে। সভ্যতাকে করছে বিপন্ন। অথচ বুদ্ধ নির্দেশিত পঞ্চশীল এবং আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলন করলে সহজেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। বুদ্ধ ব্যক্তিজীবনের উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে সামাজিক উৎকর্ষ সাধন করতে চেয়েছিলেন। বুদ্ধের চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রে ছিল মানুষ। অধিবিদ্যাসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি নির্লিপ্ত থাকতেন। জগৎ শাশ্বত না অশাশ্বত, ধ্রুব না অধ্রুব এসব অধিবিদ্যাসংক্রান্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলতেন, ‘কোনো ব্যক্তি শরাহত হলে আগে সেবা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলা উচিত, নাকি কে শরটি নিক্ষেপ করল, কোন্ দিক থেকে শরটি এল প্রভৃতি আগে অনুসন্ধান করা উচিত? জগৎ-সংসার দুঃখের ফণায় বিকীর্ণ, জরাতরঙ্গে উদ্বেল এবং মৃত্যুর উগ্রতায় ভয়ংকর। এসব প্রশ্নের চেয়ে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভের চেষ্টা ও উপায় অনুসন্ধান করাই উত্তম।’ মানুষের দুঃখমুক্তিই ছিল তাঁর অভীপ্সা। সমাজ যাদের পতিত হিসেবে উপেক্ষা করেছে, তিনি তাদের উপেক্ষা করেননি। তিনি পতিতকে টেনে তুলে, পথভ্রান্তকে পথ প্রদর্শন করে সমাজে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাইকে তাঁর ধর্মে স্থান দিয়ে তিনি মনুষ্যত্বের জয়গান করেছেন। তিনি নিজেকে এবং তাঁর ধর্মকে সামপ্রদায়িকতার গণ্ডি ও সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। তাঁকে বলতে দেখি, ‘গঙ্গা, যমুনা... প্রভৃতি নদী যেমন সাগরে মিলিত হয়ে নাম হারিয়ে ফেলে, তেমনি ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শূদ্র, ক্ষত্রিয়, চণ্ডাল প্রভৃতি আমার ধর্মে প্রবেশ করে নাম হারিয়ে ফেলে, এখানে সকল মানুষ এক।’ বুদ্ধ প্রতিষ্ঠিত সংঘে বিভিন্ন শ্রেণী ও সমপ্রদায়ের লোক ছিল, যারা আপন মহিমা ও কৃতিত্বে সংঘের মধ্যে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। তাঁর সর্বজনীন বাণীর সুধারস বারাঙ্গনার জীবনকেও পঙ্কিলতামুক্ত করেছিল।
বিশ্বের সব প্রাণীর প্রতি মৈত্রী ও করুণা প্রদর্শন তাঁর প্রচারিত ধর্মের অনন্য দিক। তাঁর অমৃত বাণী বিশ্বের ক্ষুদ্রতম প্রাণী থেকে বৃহত্তম প্রাণীকে পর্যন্ত রক্ষার প্রেরণা জোগায়। তাঁর হাতে ছিল মানবপ্রেমের বাঁশরি, কণ্ঠে ছিল মৈত্রী ও করুণার অমৃত বাণী এবং লক্ষ্য ছিল সত্য ও ন্যায়ের ধর্ম বিতরণ। তাঁকে বলতে দেখি, ‘সাধক ভিক্ষু! মৈত্রীপূর্ণ চিত্তে সকল প্রাণীর প্রতি অপ্রমেয় মৈত্রীভাব পোষণ করবে। মাতা যেমন তার একমাত্র পুত্রকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করে, সেরূপ সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী ও ভালোবাসা প্রদর্শন করবে। কাউকে আঘাত কোরো না। শত্রুকে ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নেবে।’ বিশ্বের সকল প্রাণীর প্রতি বুদ্ধের মমত্ববোধ সর্বকালের মানুষের মনে এক গভীর আবেদন সৃষ্টি করেছে। এই মহামন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে সম্রাট অশোক সম্যকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, ‘রাজ্য জয়, যুদ্ধ, নিপীড়ন, যাগযজ্ঞ-বলি সত্যিকারের ধর্ম হতে পারে না।’ তাই তিনি হিংসানীতি পরিহার করে মৈত্রী-ভালোবাসার নীতি গ্রহণের মাধ্যমে রাজ্যজয়ের পরিবর্তে ধর্মজয়ের পথ গ্রহণ করেছিলেন। বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মের বিশেষত্ব হলো মৈত্রীভাবনা, যা বৌদ্ধমাত্রই অত্যাবশ্যকভাবে পালনীয়। মৈত্রীভাবনার মূল মন্ত্র হলো: ‘সকল প্রাণী সুখী হোক, শত্রুহীন হোক, অহিংসিত হোক, সুখে কাল যাপন করুক।’
মানুষ আজ ধ্বংসাত্মক খেলায় মত্ত। সমগ্র বিশ্বে আজ সংঘাত, সন্ত্রাস, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সমপ্রদায় ও জাতিগত ভেদাভেদ এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। পারস্পরিক সমঝোতার অভাবে পাশাপাশি রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি। ইতিপূর্বে অনেক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। তাতে জাতিগত লাভ হয়নি কিছুই। বরং সভ্যতা ও সংস্কৃতি হয়েছে বিপন্ন। শান্তিকামী মানুষ আর যুদ্ধ চায় না, সামপ্রদায়িক ও জাতিগত ভেদাভেদ চায় না। শান্তি চায়। শান্তি চায়। শান্তি চায়।
আজকের এই শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—শান্তির জয়গানে ভরে উঠুক বিশ্ব। ‘সকল প্রাণী সুখী হোক’।
ড. দিলীপ কুমার বড়ুয়া: অধ্যাপক, চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইসলাম

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে