Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (55 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-০৬-২০১২

বুদ্ধের বাণী একুশ শতকে আরও প্রাসঙ্গিক

সুকোমল বড়ুয়া


বুদ্ধের বাণী একুশ শতকে আরও প্রাসঙ্গিক
আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে, ৫৬৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এমনি এক শুভ তিথিতে গৌতম বুদ্ধ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বুদ্ধত্ব লাভ করেন ৫২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, তাঁর মহাপরিনির্বাণ ঘটে ৪৮৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। তাঁর জন্ম ও বুদ্ধত্ব লাভের মধ্য দিয়েই পৃথিবীর বুকে এমন একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার বাণী সম্পূর্ণ অহিংস ও মানবতাবাদী। বৌদ্ধধর্ম একটি বিশ্বজনীন অহিংস, মানবতাবাদী ধর্ম। এ ধর্মের বাণীগুলো মানবিক আবেদনে পরিপূর্ণ। মানবতা এবং মানবিক গুণাবলির বহিঃপ্রকাশই এই ধর্মের বিশেষত্ব।
শুরু থেকেই মানবকল্যাণে মহামতি বুদ্ধের কণ্ঠে মহাপ্রেমের মহাবাণী উৎসারিত হয়েছিল। বুদ্ধত্ব লাভের পর পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের তিনি বলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখ ও মঙ্গলের জন্য এমন ধর্ম প্রচার করো, যেই ধর্মের আদি, মধ্য এবং অন্তে কল্যাণ; সেই অর্থযুক্ত, ব্যঞ্জনযুক্ত পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য প্রকাশিত করো।’
‘সকল প্রাণী সুখী হোক। ভয়হীন ও নিরুপদ্রব হোক।’ এই বাণী প্রথম ধ্বনিত হয়েছিল বুদ্ধের কণ্ঠে। সূত্রনিপাত গ্রন্থের মৈত্রীসূত্রে বলা হয়েছে: ‘সভয় বা নির্ভয়, হ্রস্ব বা দীর্ঘ, বৃহৎ বা মধ্যম, ক্ষুদ্র বা স্থূল, দৃশ্য অথবা অদৃশ্য, দূরে অথবা নিকটে যে সকল জীব জন্মগ্রহণ করেছে বা জন্মগ্রহণ করবে, সে সকল প্রাণী সুখী হোক।’
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বুদ্ধের দুটি বাণী বিশ্ববাসীকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত করেছিল: মুক্তির জন্য ঈশ্বর বা পরনির্ভরশীল না হওয়া, এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়া। তিনি তাঁর শিষ্যদের বলতেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, তোমরা মুক্তির জন্য পরনির্ভরশীল হয়ো না, অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থেকো না, নিজেই নিজের প্রদীপ হও, নিজে নিজের শরণ গ্রহণ করো।’ এ বাণীর মধ্যেই রয়েছে সর্বজীবের মুক্তি ও কর্মস্বাধীনতার পূর্ণ আশ্বাস।
বুদ্ধের শিক্ষায় অধ্যাত্ম জীবনে মানুষের মুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধের কথাও গুরুত্ব পেয়েছে। সামাজিক মর্যাদা ও শিক্ষার গুরুত্বকে তিনি খাটো করে দেখেননি। তিনি জানতেন, প্রকৃত শিক্ষাই মানুষের মনকে বড় করে, ভালো-মন্দ বিচার করার শক্তি দেয়। তিনি মনে করতেন, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা বা অতিরিক্ত ভোগলিপ্সা নির্বাণ লাভের অন্তরায়; তা থেকে দুঃখমুক্তি আসে না।
মহামানব বুদ্ধের বিশ্বজনীন মুক্তির ব্যাকুলতা এবং মানবতাবাদী ঐতিহ্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। আজ পৃথিবীব্যাপী ক্রোধ, সহিংসতা, জিঘাংসা, দুঃখ দেখলে মনে হয়, বুদ্ধের অহিংস বাণীর কত প্রয়োজন। বুদ্ধ চেয়েছিলেন মানবসমাজকে সর্ববিধ দুঃখের হাত থেকে উদ্ধার করতে। তিনি আন্তর্জাতিক, দেশ ও জাতির গণ্ডি অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বের মানুষের দুঃখ-বেদনার কথা ভেবেছিলেন। বুদ্ধের চিন্তাধারাকে প্রাচীনকালে ভারতীয় ও গ্রিক দার্শনিকেরা এবং পরবর্তীকালে রুশো, গান্ধী ও মাও জেদং স্বাগত জানিয়েছিলেন।
বুদ্ধ অধ্যাত্ম বা বৈরাগ্য জীবনের মুক্তির পাশাপাশি সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং বিশ্বজনীন মুক্তি ও নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। বস্তুত বুদ্ধের এই মুক্তিদর্শন আধ্যাত্মিক জগৎ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পূর্ণতাসহ জাগতিক সব প্রকার সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে পূর্ণ করে। তাই বিশ্বের সাম্যবাদীরা বুদ্ধের সমাজ ও অর্থনৈতিক মুক্তির এই চেতনাকে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বুদ্ধ ধনবাদী তথা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাকে যেমন উৎসাহিত করেননি, তেমনি বর্ণ ও বৈষম্যবাদী সমাজকেও কখনো স্বাগত জানাননি। কারণ, বুদ্ধ জানতেন, ধনবাদ কিংবা পুঁজিবাদ কখনো মানুষের জীবনে সামগ্রিক সুখ আনতে পারে না। বুদ্ধ চেয়েছেন মধ্যম পন্থার মাধ্যমে ‘সকলের জন্য অধিক সুখ প্রতিষ্ঠা’।
বৌদ্ধসমাজ দর্শনে সাম্যবাদ, গণতন্ত্র এবং সব মানুষের ধর্মীয় অধিকারলাভ প্রভৃতি বিষয় বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। তাঁর জীবনদর্শনে চিন্তা ও মননের স্বাধীনতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও মূল্যবোধ বিকাশের সব বিষয় অমিত প্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি সমাজের বহু আক্রান্ত মূল্যবোধকে বল্গাহীনভাবে দেখেননি। বুদ্ধ তাঁর জীবনদর্শনে ও শিক্ষামূলক আদর্শে অতিমানবিক বা অতিপ্রাকৃতিক জীবনকে গ্রহণ করেননি। তাঁর উন্নততর জীবনে অনাড়ম্বর ও বৈচিত্র্যহীন সংযত আচরণ, আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও সংবেদনশীল বিনয়নীতি সামগ্রিক জীবনে বিশেষভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়।
প্রকৃত জীবন গঠনের মানসে শীলের গুরুত্ব বৌদ্ধধর্মে সর্বত্র বা সংযত আচরণকে তিনি বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়েছেন। এ জন্য বৌদ্ধধর্মে পঞ্চশীলে আছে প্রাণীবধ বা হিংসা না করা, চৌর্যবৃত্তি না করা, মিথ্যা কথা না বলা, ব্যভিচার বা যৌনাচার না করা, কোনো প্রকার মাদকদ্রব্য সেবন না করা প্রভৃতি। এগুলো হলো সুন্দর আচরণবিধি, যা সৌজন্য, ভদ্রতা, মানবতা, সহিষ্ণুতা, পরোপকার, মার্জিত রুচি, দায়িত্ব-কর্তব্যবোধসহ সৃজনশীল কর্ম, সাম্য, মৈত্রী প্রভৃতি আদেশ-উপদেশের নির্দেশনা। এসব মানবিক গুণের অনুশীলনকে বুদ্ধ উৎসাহিত করেছেন। এসব গুণের সমাবেশেই একটি মানুষের জীবন যেমন সুন্দর ও পরিপূর্ণ হয়, তেমনি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনও জননীতি, জন-আদর্শে পরিপূর্ণ ও সমৃদ্ধিশালী হয়। অতএব, বুদ্ধের বহুমাত্রিক কল্যাণময়তা এভাবে মানবগোষ্ঠীকে মঙ্গলের পথে আসতে আহ্বান জানায়। বিশ্বশান্তি ও বিশ্বমানবতা গঠনে প্রেরণা জোগায়।
বৌদ্ধধর্ম বলছে, বিজ্ঞানের আবিষ্কার আপাতদৃষ্টিতে সুখ-সমৃদ্ধময় মনে হলেও মানব কিংবা জীবকুলকে জরা, ব্যাধি, মৃত্যু থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। তাই বুদ্ধ বলেন, ‘আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের মতো আর কোনো মার্গ নেই; চতুরার্য্যের সমান আর কোনো সত্য নেই।’ কিন্তু বিজ্ঞানের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের কোনো বিরোধ নেই। বরং বৌদ্ধধর্ম সত্যিকার অর্থে বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম। তবে ভোগবাদী বিজ্ঞান ও লোকোত্তর বিজ্ঞানের মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে। ভোগবাদী বিজ্ঞান মানুষকে অমঙ্গলের পথে নিয়ে যায়। ভোগবাদী বিজ্ঞানের অপব্যবহারের ফলে আজ বিশ্বে যুদ্ধ, আণবিক বোমা ও মারণাস্ত্র ব্যবহূত হচ্ছে। এগুলো বিশ্বশান্তির হাতিয়ার হতে পারে না।
মহামতি বুদ্ধের মতো আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরাও বলছেন, মানুষের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা, হিংসা-বিদ্বেষ থেকেই মারাত্মক ব্যাধির সৃষ্টি হয়। এ জন্য বুদ্ধ লোভ-লালসাহীন ভাবনার কথা বলেছেন; উদগ্র কামনা-বাসনাপূর্ণ ভাবনা ত্যাগ করতে বলেছেন। এতেই মানুষের প্রকৃত মানসিক শান্তি আসতে পারে।
পৃথিবীর মানুষ আজ যুদ্ধ, হানাহানি, রক্তপাতের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাও কাজ করে, শঙ্কা হয় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের। কেন? বৌদ্ধদর্শনে এর উত্তর পাওয়া যায় অতি সহজে। বুদ্ধ বলেন, ক্রোধ, লোভ, দ্বেষ, মোহ, কামনা-বাসনা থেকেই এসব অশান্তি এবং যুদ্ধবিগ্রহের উদ্ভব। লোভ, দ্বেষ ও ক্রোধের বশবর্তী হয়ে পরস্পরের প্রতি যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছি। একে অপরকে আক্রমণ করে চলেছি। একে অন্যকে ধ্বংস করার জন্য প্রবৃত্ত হচ্ছি। এটা ব্যক্তিজীবনকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত করে দেশ তথা গোটা বিশ্বকে। ক্ষোভ বা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া যায় সত্যি; কিন্তু এর ভয়াবহ পরিণতি যে গোটা বিশ্বের নিরীহ মানুষকে দিতে হয়, সেই বোধ যুদ্ধবাজ শাসকদের নেই। যারা এমন চরিত্রের, তাদের উদ্দেশে বুদ্ধের বাণী এ রকম: ‘যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার যোদ্ধাকে পরাস্ত করা বড় কথা নয়, যে নিজেকে অর্থাৎ নিজের রিপুসমূহকে দমন করতে পেরেছে, সেই প্রকৃত জয়ী।’
আমরা অন্যকে জয় করতে চাই বিভিন্ন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। অথচ আমাদের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে নিজেকে জয় করতে চাই না। এর চেয়ে অগৌরবের বিষয় আর কী হতে পারে? যুদ্ধ মানবসভ্যতার এক অভিশাপ। মানুষের মেধার আবিষ্কার মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়, মানবজাতিকে ধ্বংস করার জন্য নয়। সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার আগে কলিঙ্গ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁর মনকে দারুণভাবে আহত করেছিল। বুদ্ধের অমৃতবাণী তাঁর অশান্ত হূদয়ে শান্তির বারতা এনেছিল। বুদ্ধের বাণীটি ছিল এ রকম: ‘অপ্রমাদ অমৃতের পথ, প্রমাদ মৃত্যুর পথ। অপ্রমাদীরা অমর, যাঁরা প্রমত্ত তাঁরা মৃতের ন্যায়।’ মহামতি বুদ্ধের এ রকম মানবতাবাদী মতবাদ ও অহিংসনীতি বিশ্বের সব মানবগোষ্ঠীকে এক অভিন্ন বিশ্বমৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হতে উজ্জীবিত করে।
হিংসা, হানাহানি, ষড়যন্ত্র, এমনকি পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কার অস্থির এই একুশ শতকে বুদ্ধের বাণী আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক।
‘সব্বে সত্তা সুখীতা ভবন্তু’—বিশ্বের সকল জীব সুখী হোক। সকলেই মঙ্গল লাভ করুক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক। ‘নিব্বানং পরমং সুখং’—নির্বাণ পরম সুখ, নির্বাণ পরম শান্তি।
ড. সুকোমল বড়ুয়া: সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন, বাংলাদেশ চ্যাপ্টার।
[email protected]

ইসলাম

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে