Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (134 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-০৪-২০১২

গোলাপি পাহাড়ের কোলঘেঁষে...

গোলাপি পাহাড়ের কোলঘেঁষে...
জলের সঙ্গে নীলের বন্ধুত্ব সেই আদিকালের। খোলা আকাশের নিচে জল মানেই নীলের খেলা। ধূসর বালুর বুকে এমন প্রাণবন্ত নীলের খেলা দেখার জন্যই এবার ছুটে গিয়েছিলাম নেত্রকোনার বিরিশিরিতে, যেখানে রয়েছে নীল স্বচ্ছ এক নদী সোমেশ্বরী। শুধু তা-ই নয়, সেখানে আরও লুকিয়ে আছে পাহাড়ের কোলজুড়ে গাছের পাতার রং চুরি করে শুয়ে থাকা এক নতুন ভুবন—সবুজ পানির হ্রদ, আর সাদা সাদা চুনাপাথরের আড়ালে লুকিয়ে রাখা অবাক বিস্ময় করা গোলাপি পাহাড়।
এই পাহাড়ের গল্প অনেক শুনেছি, বাংলাদেশের মধ্যে একটা চিনামাটির পাহাড়, সেখানে আবার একটা নীল পানির লেকও নাকি আছে! কৌতূহল আর চেপে রাখতে পারলাম না। লাল-সবুজের বাংলাদেশে যে একমাত্র গোলাপি পাহাড়টা আছে, সেটাকে আর কত দিনই বা দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখা যায়! শীতকালের সেই যাত্রার গল্প এই গ্রীষ্মের শুরুতে শোনাচ্ছি।
ময়মনসিংহ নেমেই সবার আগে ছুটে গেলাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কী ভাগ্যবান! তাদের যেন ব্যক্তিগত একটা নদী আছে, যখন মন চায় এই নদীর তীরে বসে বিকেল কাটাতে পারে, আনন্দ-উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার কাটতে পারে। আর মন খুব বেশি ভালো থাকলে সবাই একজোট হয়ে বড়শি বিছিয়ে দেয় ব্রহ্মপুত্রের শান্ত কোলে, এই নদ এখানে খুব আপন করে নিয়েছে তার বাসিন্দাদের। ইচ্ছা হলে নৌকা ভাড়া নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায় দূরের সেতু পর্যন্ত।
ঠিক সন্ধ্যার বাসের টিকিট পেলাম আমরা, ময়মনসিংহ থেকে বিরিশিরি যেতে নাকি তিন ঘণ্টা লাগবে। ভয়াবহ কুয়াশা পড়েছে, বাসের সামনে ঘুটঘুটে অন্ধকার, সেখান দিয়েই আন্দাজে ঢিল ছোড়ার মতো করে ড্রাইভার বাস ছেড়ে দিয়েছে। চলছে বাস, না না ভুল বললাম লাফাচ্ছে বাস, বাস কী রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে নাকি বান্দরবনের পাহাড় দিয়ে যাচ্ছে কিছুই ঠাহর করতে পারলাম না। সিটে বসে থাকাটাই দুষ্কর হয়ে দাঁড়াল কিছুক্ষণ পরে। আর ঘরোয়া পরিবেশে দোলনায় ঘুমানোর মতো করে লাফাতে লাফাতে ঘুমাচ্ছে স্থানীয় যাত্রীরা! একজনকে দেখলাম লুঙ্গি দিয়ে নিজেকে বেঁধে রেখেছে সিটের সঙ্গে, সিটবেল্ট! রাস্তার এই ‘রোলার কোস্টার’ অবস্থা দেখে বিস্ময়ে চোয়াল যখন ঝুলে পড়ার দশা, তখনই শুনি ড্রাইভার তার হেলপারকে হাঁক দিয়েছে ‘এই, হেডলাইটটা জ্বালা’! বলে কী, হেলপার কীভাবে হেডলাইট জ্বালাবে, এটা তো ড্রাইভারের কাজ! তীব্র কুয়াশায় জানালা দিয়ে মাথা বের করে দেখি, হেলপার এক হাতে দরজা ধরে ঝুলে আরেক হাতে একটা নোকিয়া ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে চলন্ত বাসের সামনের রাস্তায় ধরে রেখেছে, ড্রাইভারের ভাষায় এটাই হেডলাইট!
স্পাইডারম্যানের মতো বাসের দেয়াল আঁকড়ে থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে ঝালমুড়ি খেতে খেতে রাত সাড়ে ১১টায় বিরিশিরিতে নামলাম। আগে থেকে ওয়াইডব্লিইসিএ রেস্টহাউসে সিট বুক করা ছিল বলে বেঁচে গেলাম, সে রাতটা বিশ্রামের। পরদিন সকালে একটা রিকশা এসে জানান দিল আমরা তার মেহমান, সে আমাদের পুরো বিরিশিরি উড়িয়ে উড়িয়ে দেখাবে, বিনিময়ে তাকে দিতে হবে ৪০০ টাকা।
গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে টুংটাং বেল বাজিয়ে চলছে রিকশা, দুই পাশে বিস্তীর্ণ সবুজ খোলা মাঠ, মাঠের মাঝেমধ্যে একটা করে গাছ। চোখ ফেরাতে পারছি না সবুজের পর্দা থেকে। ভাবের রাজ্যে আঘাত হানল একটা গরুর মোলায়েম ডাক— কী নিশ্চিন্তে সে এই ভয়াবহ সুন্দর সবুজ খেতে খেতে হেঁটে চলে যাচ্ছে।
আরও একটু সামনে যেতেই ছলাৎ করে উঠল হূৎপিণ্ডটা, এ আমি কী দেখছি! চোখের সামনে টলটলে নীলের সমুদ্র যেন। খানিক আগের সবুজ হারানোর ব্যথা কোথায় ভেসে গেল, কে জানে। যত দূর চোখ যায় সোমেশ্বরীর পানি সোনা রোদে চকচক করছে, রিকশা যত সামনে এগোচ্ছে, ততই ধীরে ধীরে চোখের সামনে ফুটে উঠছে নীলের পরিধি। অনেক দূরের পাহাড় থেকে রিমঝিম করে বয়ে আসা টলটলে পানির কলকল শব্দ মনে মাদকতা ধরিয়ে দিচ্ছে। মেঘালয় থেকে বয়ে আসা পাথুরে এই নদীর পানির হিম হিম ঠান্ডা অনুভূতি টের পাওয়া যাচ্ছে তীর থেকেই। নদী এখানে শান্ত, তার কোনোই তাড়া নেই। সারাটা মেঘালয় চরম স্রোতে দাবড়ে এসে এখানে সুবোধ শুয়ে আছে সোমেশ্বরী। তার বিশাল বুকে শুকনো এই মৌসুমে অনেক চর জেগে উঠেছে, হেঁটে হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে সাধারণ লোকজন। আলতো করে পা ভিজালাম, কী ঠান্ডা! এক নিমেষেই যাত্রাপথের সব ক্লান্তি ভেসে গেল জলের স্রোতে। আর কিছু দিন পরেই এই নদী হয়ে উঠবে খরস্রোতা, আরও সুন্দর।
দূরের গারো পাহাড়কে বেশি দূরে মনে হয় না এখান থেকে, সোমেশ্বরীর ছোঁয়া পেয়েছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গারো পাহাড়ও। নদীজুড়ে একটা নৌকা চলে যাত্রী পারাপারের জন্য, আমাদের রিকশাও যাত্রী হয়ে গেল, সবাই মিলে ধরাধরি করে রিকশাটাকে নৌকার ওপরে তুলে দিলাম, ওপারে যেতে হবে—সেখান থেকেই চীনামাটির পাহাড়। অনেক লোককে দেখলাম, হেঁটে হেঁটে এমন সুন্দর নদীটা পার হচ্ছে। আমরা নৌকাতেই চড়ে পার হলাম। মাঝনদীতে একটা চরে নৌকা আমাদের নামিয়ে দিল। এখান থেকে হেঁটে যেতে হবে ওপারে। আরও কত বিস্ময় যে আমাদের জন্য জমা করে রেখেছিল এই নীলাঞ্জনা সোমেশ্বরী, তা তখনো জানতাম না। জানলাম যখন, দেখলাম মাঝের চর থেকে ঘাস আর বাঁশ দিয়ে বানানো অপরূপ একটা সেতু উঠে গেছে নদীর ওপরের পাড় পর্যন্ত। সেই সেতুর নিচ দিয়ে ভদ্র দূরত্ব বজায় রেখে তীব্রবেগে কলকল শব্দে বয়ে চলেছে দুরন্ত সোমেশ্বরী। সেতুর ঠিক পাশেই হাজার হাজার পাথর আর নুড়ির মৌন মিছিল বয়ে চলেছে স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে। যত দূর চোখ যায় শুধু নীল পানি, আকাশ তার সবটুকু রং দান করে দিয়েছে এই কোমল নদীটিকে।
সোমেশ্বরী পার করে তার তীর ধরে বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে অনেক দূর যেতে হয় বিজয়পুরের সুসং দর্গাপুরে যেতে। ধানখেত মাড়িয়ে, সরিষাখেত ছাড়িয়ে সূর্য যখন মাথার ওপর ছুঁই ছুঁই করছে, তখন আমরা পৌঁছালাম চীনামাটির পাহাড়ে। প্রকৃতি এখানে আপন হাতে সাজিয়েছে তার পাহাড়গুলোকে। ছোট ছোট লতাগুল্মের গা মাড়িয়ে উঠতে হয় সেই পাহাড়ের চূড়ায়, তবেই নাকি দেখা মেলে এক আশ্চর্য সুবজ হ্রদের, যার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে গোলাপি পাহাড়টা। দুই চোখে লোভ আর লালসা নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে পড়ি সেই পাহাড়ের চূড়ায়। যত দূর চোখ যায় পুরোটাই সমতল। একটু দূরেই ভারতের বিশাল বিশাল পাহাড়গুলো ঘিরে রেখেছে বিরিশিরির দুর্গাপুরের এই চিনামাটির পাহাড়টাকে। পাহাড়ের ওপর থেকেই পুরো বিরিশিরি একবারে দেখা যায়, ঢাল বেয়ে নিচে নামতেই পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে ধীরে ধীরে চোখের আঙিনায় আলো ফেলে সবুজ হ্রদের পানি। ধবধবে সবুজ এই পানি এতটাই স্বচ্ছ যে তার নিচের সাদা চুনাপাথরের মেঝেটাও স্পষ্ট দেখা যায়, সারা জীবন দেখে এসেছি কাদা হয় কালো কালো, পায়ে লাগলেই ধুয়ে না ফেলা পর্যন্ত শান্তি নেই। আর এখানে দেখলাম কাদার ভিন্ন এক রূপ, প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে যেই একটু পানিতে নামলাম, অমনি পানিটুকু সাদা সাদা কাদায় ভরে গেল। আজব একটা অনুভূতি, এই কাদা পরিষ্কার করতেও মন চায় না। সবুজ হ্রদের ঠিক গা ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে আছে গোলাপি পাহাড়। দেয়ালজুড়ে চুনাপাথরের প্রতিটি কণায় গোলাপি আভা। ইচ্ছা করলেই সেগুলো ধরে ধরে দেয়াল বাওয়া যায়। গোলাপি এই পাহাড় মিশে গেছে একেবারে সবুজ হ্রদের তলদেশ পর্যন্ত, সবুজ আর গোলাপি রং মিলে পানির নিচে তৈরি করেছে আশ্চর্য সুন্দর এক জগৎ। এই সৌন্দর্য দেখার জন্য ওই পানির নিচে কেউ নেই। মাছ বা অন্য কোনো প্রাণী দেখতে পেলাম না পানিতে, সম্ভবত চুনাপাথরের পানিতে রাসায়নিক বিক্রিয়াজনিত কারণে কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না।
সবুজ পানির সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে আমরা যখন টপাটপ ছবি তোলায় ব্যস্ত, তখন স্থানীয় এক পিচ্চি এসে জানাল, গোলাপি পাহাড়টা পার হলেই নাকি আরেকটা হ্রদ আছে নীল পানির। সেটা নাকি বিরাট সৌন্দর্যের কারখানা। পড়িমড়ি করে মাঝের সমতল আর ছোটখাটো দুটি খাল লাফিয়ে পার হয়ে ছুটলাম সেই নীল পুকুর দেখার জন্য। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা পরিপূর্ণ নীল পানি দেখতে পেলাম না, আরও বেশি শীত পড়লে তখন পানি আরও নীল হয়ে যায়, এ জন্য ফেব্রুয়ারি-মার্চ হলো নীল পানি দেখার জন্য সবচেয়ে আদর্শ সময়। এই হ্রদে পাথর কেটে সিঁড়ির মতো করে বানানো হয়েছে এখানকার প্রতিটি স্তরে বসে যেখান থেকে খুশি আর মনমতো প্রকৃতি দেখার জন্যই এমন সুব্যবস্থা।
বিরিশিরি হ্রদে চাঁদের মতো একটা পাহাড় আছে, ওই পাহাড়ে গিয়ে দাঁড়ালে নিচে দেখা যায় অনেকগুলো পিলার। কথিত আছে, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা এই পিলারগুলোর মাঠে ট্রেনিং নিয়েছেন। পিলারের পাশ দিয়ে দুটি সুড়ঙ্গ রয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করে পাহাড়ের নিচ দিয়ে সবুজ হ্রদের তীরে যাওয়া যেত। কোনো এক সময় ভূমিধসের কারণে সুড়ঙ্গগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
দেখতে দেখতে বেলা চলে যায়, গারো পাহাড়সহ আরও অনেক জায়গা আমাদের দেখার কথা ছিল, কিন্তু পারিনি সময়ের স্বল্পতার কারণে। মনটা খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠল আবার সোমেশ্বরী দেখতে পাব বলে, আবার সেই বাঁশের সেতু, হাঁটুপানি, নৌকায় চড়া সব যেন বাংলার দুরন্ত প্রকৃতির একেকটা নির্মল প্রতিচ্ছবি।

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে যেতে হলে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি বিরিশিরিতে ‘সরকার’ নামক একটি বাস যায়, তবে সবচেয়ে ভালো হবে আপনি যদি মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে বাসে করে ময়মনসিংহ মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ডে চলে যান। প্রতিজনের ভাড়া পড়বে ১৮০ টাকা করে। সেখান থেকে অটোরিকশা বা রিকশা নিয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু (শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ নামে পরিচিত) মোড়ে চলে যাবেন। প্রতিনিয়তই বিরিশিরির বাস পাওয়া যায় ওখানে, ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা। বিরিশিরিতে রেস্টহাউস আছে হলো ওয়াইডব্লিউসিএ। যাওয়ার আগেই বুকিং দিতে হবে, ভাড়া পড়বে ৬০০ টাকার মতো। সাদামাটির পাহাড় এবং সোমেশ্বরী নদী ঘুরে আসার জন্য আপনি রিকশা বা মোটরসাইকেল ভাড়া করতে পারেন।

নেত্রকোনা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে