Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০ , ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.1/5 (38 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১৯-২০১৫

যেতে নাহি দিব হায়, তবুও চলে যেতে হয়!

রেজাউল করিম মানিক


যেতে নাহি দিব হায়, তবুও চলে যেতে হয়!

লালমনিরহাট, ১৯ নভেম্বর- বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে, ৬৮ বছরের মায়ার জাল ছিন্ন করে অবশেষে চলে যেতে হচ্ছে তাদের। অশ্রুসিক্ত নয়নে, পাড়া প্রতিবেশি আর আত্বীয় স্বজনকে কাঁদিয়ে তারা চলে যাচ্ছে নতুন ঠিকানায়। বৃহস্পতিবার দুপুরে লালমনিরহাটের বুড়িমারি স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করলেন হাতিবান্ধার বিলুপ্ত দুটি ছিটমহলের ৬৩ জন বাসিন্দা।

বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষের ভিটা ছেড়ে যেতে মন চায় না কারো। কিন্তু তবুও চলে যেতে হচ্ছে। কারণ, ছিটমহল বিনিময়ের পরে কে বাংলাদেশে থাকবে আর কে ভারতে যাবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে মোতাবেক বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১১১টি ছিটমহলের ৯৭৯জন চেয়েছিলেন ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে। তারাই যেতে শুরু করেছে ভারতে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রথম ধাপে ভারতে চলে গেলেন ৬৪জন। বাংলাদেশে থাকা আত্মীয় স্বজন আর বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়ার আগে তারা আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠে। সরেজমিনে হাতীবান্ধার উত্তর গোতামারির বিলুপ্ত ছিটমহলে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য। দেশত্যাগীরা হুহু করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে এলাকার আকাশ বাতাস। বিদায় জানাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসে স্বজনরা। আবার কতদিনে দেখা হবে প্রিয়জনদের সঙ্গে। এ কষ্ট সহ্য করতে পারছে না কেউ।

ভারত পাড়ি দেয়ার আগে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাধবী রানী বলেন, ‘মোর এই সময় আর ভারত যাবার মন না চায়। স্যাটে মোক ক্যাও চিনবার পাইবে না, মুই ডোকা (কামলা) দিয়া খ্যাওন। মোর নিকট ক্যাউ কামলা নিবে না। মুই এই সোনার বাংলা ছাড়ি যাবার ন্যাং বাহে...। বলতে বলতে মূর্ছা যাচ্ছিলেন। 

বৃহস্পতিবার সকালে বিদায় নেয়ার সময় গোতামারি উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সুচরিতা রানী বলেন, ‘সে এখানে থাকতে চায়। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে তাকেও ওপারে যেতে হচ্ছে। জানি না আর কোনো দিন এদেশে আসতে পারব কিনা।’


উত্তর গোতামারীর কানন বালা (৪৭) জানান, তার দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে বাংলাদেশে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, মেয়ে, জামাই ও নাতী-নাতনী ছেড়ে ভারতে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তবুও স্বামীর সাথে তাকে যেতেই হচ্ছে ভারতে। ববিতা রানী (২৩) জানান, তার বিয়ে হয়েছে বাংলাদেশে, কিন্ত তার বাবা-মা ভারতে যাচ্ছেন। 

এদিকে গোতামারী ছিটমহলে মানিক ও স্বপ্না দম্পতির ঘরে জন্ম দিয়েছে ফুটফুটে সন্তান। দুর্গাপূজার দশমীর দিনে জন্ম নেয়া ওই শিশুর না রাখা হয়েছে দশমী। স্বপ্না মাত্র ২৮ দিনের দশমীকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন ভারতে। 

স্বপ্না রানী বলেন, স্বামী-সন্তানের কথা ভেবে যেতেই হবে ভারতে। নবজাতকসহ তাদের বিদায় জানাতে তার বাবা-মা ও ছোট ভাই এসেছেন। ইতোমধ্যে পরিবারের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পাড়া-পড়শীদের কাছ থেকে একে একে বিদায় নিয়েছেন সবাই।

স্থানীয়রা জানায়, ছিটমহল বিনিময়কালে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়া বাসিন্দাদের বিদায় জানাতে কয়েকদিন আগে থেকেই বাড়ি বাড়ি চলছিল আপ্যায়ন। গোতামারীর বৃদ্ধ তারক নাথ (৯০) পরিবারের ১৩জনকে চলে যাচ্ছেন ভারতে। বাংলাদেশে থাকছে তার দুই ছেলে। বেশ কয়েকদিন থেকে তারা হাসি খুশিই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই বিদায়ের দিন বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কোনো কথা  বলছেন না বৃদ্ধ তারক নাথ। তিনি ছেড়ে দিয়েছেন খাওয়া-দাওয়া। তার পরিবারের বড় ছেলে ধনেশ্বর নাথ রায় জানান, দুই ছেলের কথা সব সময় ভাবেন তিনি। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পাড়া-পড়শী বৃদ্ধ তারক নাথকে দেখার জন্য এসেছেন বিভিন্ন স্থান থেকে। সকালে গোতামারী ছিটমহলে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের সব আসবারপত্র তুলছেন সরকারি গাড়িতে।

বৃহস্পতিবার বেলা ওঠার আগে থেকেই ভারতে গমনেচ্ছুকরা সবকিছু গোছগাছ শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাঠানো গাড়িতে সেসব জিনিসপত্র তুলে নেয়। তাদের বিদায় জানাতে সকাল থেকেই ভিড় জমায় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পাড়া প্রতিবেশীরা। সর্বত্রই বেজে উঠে বিদায়ের সুর। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।


প্রথম দফায় হাতিবান্ধা ও পাটগ্রামের সদ্য বিলুপ্ত ছিলমহল থেকে এক নবজাতকসহ ৬৩জন ট্রাভেল পাসধারী দুপুর ১টা ৩৫মিনিটে বুড়িমারী স্থলবন্দরের জিরো পয়েন্ট চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে চলে যায়। এর মধ্যে সনাতন ধর্মালম্বী ৬১জন ও দুই পরিবারের দুজন মুসলমান রয়েছেন। 

পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিলুপ্ত ছিলমহলের ট্রাভেল পাসধারীরাও ভারতে যাবেন। বিকেল নাগাদ প্রথম পর্যায়ে ৬৩জন ট্রাভেল পাসধারী ভারতের কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান নেবে। তাদের গ্রহণ করবে কোচবিহার জেলার ডিএম ওলাথ নাথ।

প্রথম পর্যায়ে ট্রাভেল পাসধারীদের বিদায় জানাতে বুড়িমারী স্থলবন্দরে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন- পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুর কুতুবুল আলম ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সেকেন্ড ইন কমান্ড মাসুদুর রহমানসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা। এসময় তাদের সঙ্গে ভারতে প্রবেশ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার সন্দীপ মিত্র ও বিলুপ্ত ছিটমহল বিনিময় কমিটির বাংলাদেশ ইউনিটের নেতারা।

এর আগে সকালে ভারতে গমনেচ্ছুকদের মিষ্টি মুখ করান ও রজনীগন্ধা ফুলি দিয়ে বিদায় জানান হাতীবান্ধা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন বাচ্চু ও উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান। একই সময় উভয় দেশে বিলুপ্ত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির নেতারা মিষ্টি বিনিময় করেন। উপস্থিত ছিলেন- কমিটির ভারত ইউনিটের সভাপতি দ্বীপ্তিমান গুপ্ত, বাংলাদেশ ইউনিটের সভাপতি মঈনুল হক, সম্পাদক গোলাম মোস্তফা, লালমনিরহাট ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম।

হাতিবান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, লালমনিরহাটের ৫৯টি অধুনালিপ্ত ছিটমহলের ৪০টি পরিবারের ১৯৫ জন ভারতের নাগরিকত্ব পেতে আবেদন করেন। পরিবহন সুযোগের জন্য ভারত গমনুচ্ছুকদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছে। যার মধ্যে প্রথম দলটির নাম উত্তর গোতামারী। দুপুরে  বুড়িমারী স্থলবন্দর হয়ে ভারত চলে গেছে ১৯টি পরিবারের ৬৩জন ট্রাভেল পাসধারী।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান জানান, প্রথম দল হিসাবে সদ্য বিলুপ্ত উত্তর গোতামারী ছিটবাসীর ট্রাভেল পাসধারীরা ভারতে চলে গেছে।  এভাবে পর্যাক্রমে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব পাসধারীদের পাঠানো হবে। 

জেলা প্রশাসন সূত্রমতে, লালমনিরহাটের সঙ্গে মিশে যাওয়া সদ্যবিলুপ্ত ৫৯টি ছিটমহলের মধ্যে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধার ৪০ পরিবার ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। ওই পরিবারগুলো বুড়িমারী স্থলবন্দর হয়ে বাস ও ট্রাকে করে ভারতের কোচবিহারের মেখলিগঞ্জ এলাকার আবাসনে আশ্রয় নেবে। এছাড়া যে সকল পরিবার ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ভারত যাবেন না, তাদের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসে নি।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৩১ জুলাই মধ্য রাতে ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দি জীবনের মুক্তি মিলে ভারত-বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহলের কয়েক হাজার মানুষের। যার মধ্যে ১১১টি বাংলাদেশের ও বাকি ৫১টি ভারতের ভূ-খণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়। এগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলায় ১২টি, লালমনিরহাট জেলায় ৫৯টি, পঞ্চগড় জেলায় ৩৬টি এবং নীলফামারীতে রয়েছে ৪টি সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহল।

লালমনিরহাট

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে