Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ , ১৩ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-২৪-২০১২

প্রধানমন্ত্রীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে পদ ছাড়লেন সোহেল তাজ

আবদুল্লাহ আল মামুন


প্রধানমন্ত্রীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে পদ ছাড়লেন সোহেল তাজ
সংসদ সদস্য পদও ছাড়লেন তানজিম আহমদ সোহেল তাজ। প্রতিমন্ত্রী থেকে পদত্যাগের কারণ ছিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের এক সদস্যের অশোভন আচরণ। আর সংসদ সদস্য পদ ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে। সোমবার স্পিকারের কার্যালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার পর এক খোলা চিঠিতে রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন সোহেল তাজ। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের পর তিন বছরেও পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে দফতরবিহীন মন্ত্রী রাখায় ক্ষুব্ধ হন তিনি। সর্বশেষ ১৭ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি লিখে তার পদত্যাগের বিষয়টি গেজেট নোটিফিকেশনের অনুরোধ করেন। ওই দিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত জানাবেন। কিন্তু পরে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গেজেট নোটিফিকেশনের বিষয়ে সম্মতি দেননি। সোহেল তাজকে দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবেই রাখা হয়েছে। এতে অভিমানের পাশাপাশি চরমভাবে ক্ষুব্ধও হন সোহেল তাজ। এই ক্ষোভ আর কারও প্রতি নয়, সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর। একটি সূত্র জানিয়েছে, সোহেল তাজের পরিবারের সদস্যরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোহেল তাজের সংক্ষুব্ধ জায়গাগুলো চিহ্নিত করে পুরো বিষয়টি নিয়ে ওয়ান টু ওয়ান আলোচনা করতে পারতেন। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর অনেক কিছু করার ছিল। বিষয়টি ঝুলিয়ে না রেখে ধোঁয়াশা সৃষ্টি না করে জটিলতা খোলসা করা উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি।
গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সোহেল তাজের পদত্যাগপত্রটি সংসদ ভবনে স্পিকারের কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়। সংবিধানের ৬৭ (২) ধারা মোতাবেক তিনি পদত্যাগ করেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন। সকাল সাড়ে ১০টায় তার ব্যক্তিগত সহকারী আবু কাউসার স্পিকারের পিএ মোহাম্মদ শামীমের কাছে এই পত্র জমা দেন। এ সময় স্পিকার আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট ঢাকার বাইরে ছিলেন। পদত্যাগের পর তানজিম আহমদ সোহেল তাজ সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় টেলিফোনে যুগান্তরের এই প্রতিবেদককে বলেন, এ ছাড়া তার জন্য অন্য কোন পথ খোলা ছিল না। সম্মান রক্ষা করতেই তিনি পদত্যাগ করেছেন। এ সময় দফতরবিহীন মন্ত্রী রাখার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় তানজিম আহমদ সোহেল তাজ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তার কণ্ঠ জড়িয়ে আসে। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
পদত্যাগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভানেত্রী ও জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, তিনি আওয়ামী লীগের জন্য বদনাম ছাড়া কিছু আনেননি। তার মনে হয়, স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্রান্তকে সাহায্য করার জন্যই এটা করা হয়েছে। ঢাকায় অবস্থানরত সোহেল তাজের মা ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জোহরা তাজউদ্দিন এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় যুগান্তরকে বলেছেন, তিনি এ পদত্যাগকে স্বাধীন মত প্রকাশের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই মনে করছেন। তার বোন মাহজাবিন আহমদ মিমি বলেন, তারা পদত্যাগকে স্বাগত জানিয়েছেন। অন্যদিকে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী বলেছেন, রাজনীতিতে সোহেল তাজের মতো নেতার প্রয়োজন ছিল। পদত্যাগপত্র দেয়াটা দুঃখজনক। তবে এসব ঘটনা রাজনীতিরই অংশ।
স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জোহরা তাজউদ্দিনের একমাত্র ছেলে তানজিম আহমদ সোহেল তাজ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থান করছেন। তিনি কাপাসিয়া থেকে নির্বাচিত দুইবারের সংসদ সদস্য। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সোহেল তাজ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। পরে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। পদত্যাগের পাশাপাশি কাপাসিয়া ও দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। সোহেল তাজ চিঠিটি এ প্রতিবেদকের কাছে পাঠিয়েছেন। এই চিঠিতে রয়েছে তার কষ্টের কথা। রয়েছে দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসার প্রকাশ। লিখেছেন, অনেক কষ্ট করে গড়ে তোলা সুন্দর একটি জীবন ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। কৈশোর বয়স থেকে নিজে দিন-রাত কাজ করে পড়াশোনার খরচ চালিয়েছিলেন। বাবা-মায়ের দেয়া শিক্ষা, দেশপ্রেম থেকেই দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে সবকিছু ছেড়ে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। তাদের রাজনৈতিক সহকর্মীদের পরামর্শ এবং কাপাসিয়ার মানুষের অনুরোধেই তার সক্রিয় রাজনীতিতে আসা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও শরীরে বয়ে চলা বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহমদের রক্তই তাকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগ দিতে এবং দেশের মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে। কোন ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেকে জড়াননি। পৈতৃক সম্পত্তি থেকে যা আয় হতো তা দিয়েই চলত তার রাজনীতি। এমনকি পৈতৃক সম্পত্তিও বিক্রি করেন। সোহেল তাজ লিখেন, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার সব সময় চেষ্টা ছিল পুলিশ বাহিনীকে একটি সুশৃংখল পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে জনগণের বন্ধু করে তোলা। কতটুকু পেরেছেন বা কেন পারেননি সে কথায় না গিয়ে তিনি বলতে চান, তিনি তার মায়ের কাছ থেকে শিখেছেন সব সময় অনিয়ম ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। অন্যায় যেই করুক না কেন। চিঠির এক অংশে পদত্যাগের কারণ জানাতে গিয়ে কাপাসিয়ার মানুষের উদ্দেশে বলেন, আমি জানি, আমার এ সিদ্ধান্তে আপনারা ক্ষুব্ধ ও অভিমানী হবেন, প্রতিবাদ করবেন। সঙ্গত কারণেই সবকিছু খুলে বলতে পারছি না। তবে সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ করলেও আপনাদের পাশে থাকব সব সময়। হয়তো অন্য কোনভাবে, অন্য কোন পথে। এই প্রতিজ্ঞা করছি। সক্রিয় রাজনীতিতে আবার আসার সম্ভাবনা না থাকলেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার বাবা তাজউদ্দিন আহমদের আদর্শে গড়া আওয়ামী লীগই তার শেষ ঠিকানা। চিঠিতে তিনি ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতি পরিহার করার অনুরোধ করেন এবং কাপাসিয়ার নেতৃত্ব যেন ভালো মানুষের দ্বারা পরিচালিত হয় সে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন।
সোহেল তাজের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, ২০০৯ সালের জুনে তানজিম আহমদ সোহেল তাজ পদত্যাগ করেন মূলত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার শেখ ফজলুল করিম সেলিমের অশোভন আচরণের প্রতিকার না পেয়ে। সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাধা দেয়ায় শেখ সেলিম ক্ষুব্ধ হন। টুকুর মেয়ের সঙ্গে তখন শেখ সেলিমের ছোট ছেলের ‘অ্যাফেয়ার’ চলছিল। বর্তমানে টুকু তার বেয়াই। শেখ ফজলুল করিম সেলিম চেয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী তার হবু বেয়াইয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কারণে প্রতিমন্ত্রী ওই কাজটি করতে অস্বীকৃতি জানান। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল বিএনপির যেসব মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলা হয়েছে, তারা বিদেশে যেতে পারবেন না। এই নির্দেশের কথা প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ তার দলের নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে জানিয়ে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু শেখ সেলিম তা মানেননি। তার কথা সোহেল তাজকেই এটা করতে হবে। এ নিয়ে কথাবার্তার এক পর্যায়ে শেখ সেলিম উত্তেজিত হয়ে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। পরে সোহেল তাজ এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করে তার প্রতিকার চান। কিন্তু এর কোন প্রতিকার না পাওয়ায় তানজিম আহমদ সোহেল তাজ ৩১ মে যমুনায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র তার হাতে তুলে দেন। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করেননি। ফলে পরের দিন ১ জুন পিএসের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন তানজিম আহমদ সোহেল তাজ। এ খবর পেয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ওই দিন দুপুরে সোহেল তাজের বোন মাহজাবিন আহমদ মিমির ধানমণ্ডির বাসায় ছুটে যান। সেখানে অবস্থানরত সোহেল তাজকে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করার অনুরোধ করেন তিনি। কিন্তু সোহেল তাজ তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি। এ সময় সোহেল তাজ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য শেখ সেলিমের অশোভন আচরণ ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করার পরও তিনি কোন উদ্যোগ নেননি। তাই মানসম্মান নিয়ে থাকতে হলে তার পক্ষে আর মন্ত্রীত্ব কন্টিনিউ করা সম্ভব নয়। এরপর ৯ জুন তিনি যুক্তরাষ্ট্র চলে যান। সেখানে অবস্থানকালে ১৯ জুলাই পদত্যাগ নিয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খোলেন সোহেল তাজ। ওই দিন যুগান্তরের এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, আÍসম্মান বিসর্জন দিয়ে মন্ত্রীত্ব করার লোক তিনি নন। হতাশা প্রকাশ করে সোহেল তাজ আরও বলেন, বাংলাদেশে কোন কিছুরই পরিবর্তন হবে না। খেলা একই আছে, খেলোয়াড় বদলেছে মাত্র।
কাপাসিয়ায় তোলপাড় : দলীয় কর্মীরা হতাশ
কাপাসিয়া প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের একমাত্র ছেলে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও গাজীপুর-৪, কাপাসিয়ার সংসদ সদস্য তানজিম আহমদ সোহেল তাজের পদত্যাগের খবর এলাকায় প্রচার হলে দলীয় ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক তোলপাড় ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। দলীয় লোকজন পদত্যাগের খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনে একে-অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত হতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ সময় মাঠ পর্যায়ের ত্যাগী আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েন। অপরদিকে বিরোধীদলীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে আনন্দ, উল্লাস ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। সকাল সোয়া ১০টায় সোহেল তাজের এপিএস আবু কায়সার পদত্যাগপত্রটি স্পিকারের কাছে পৌঁছে দেন।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে