Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (130 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৯-২৩-২০১৫

লোভ এবং ‘হালাল’ খাবার জটিলতায় কোরিয়াতে শ্রমবাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ

মাঈনুল ইসলাম নাসিম


লোভ এবং ‘হালাল’ খাবার জটিলতায় কোরিয়াতে শ্রমবাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ

এশিয়ার ‘টাইগার ইকোনমিজ কান্ট্রি’ দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে দেশওয়ারী কোটা কোনদিনই পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ, এখনও পারছে না। কারণ হিসেবে অনেকটা আক্ষেপের সুরেই বেশ কিছু কঠিন সত্য জানালেন সিউলে দায়িত্বরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জুলফিকার রহমান। কোম্পানির তরফ থেকে ফ্রি দেয়া খাবারের প্রতি নেক্কারজনক অনভ্যস্ততার পাশাপাশি সামান্য কিছু বাড়তি অর্থের লোভে হুটহাট যখন তখন মালিকের বারোটা বাজিয়ে কোম্পানি বদলের হিড়িক রীতিমতো হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে এদেশে বাংলাদেশের প্রবল সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার।
 
পেশাদার কূটনীতিক জুলফিকার রহমান এই প্রতিবেদককে জানান, “শতভাগ কম্পিউটারাইজড সিস্টেমে বাংলাদেশ সহ ১৫টি দেশ থেকে কর্মী নিয়ে থাকে কোরিয়া এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে ঢাকা বা সিউলে কারো কোন হাত থাকে না, থাকার সুযোগও নেই। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানার মালিকদের বিভিন্ন এসোসিয়েশন রয়েছে এখানে, যাদের ওয়েবসাইটে প্রদত্ত ডাটাবেজ থেকে বিভিন্ন এমপ্লয়ার বা মালিকরা তাদের প্রয়োজন বা চাহিদা মাফিক কর্মী সংগ্রহ করে থাকেন। অনলাইন ডাটাবেজ এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম (ইপিএস) স্কিমের আওতায় কোরিয়ান মালিকপক্ষ বাংলাদেশ থেকে না অন্য কোন দেশ থেকে কর্মী নেবেন, এটা একান্তই তাদের নিজস্ব এখতিয়ার”।
 
বর্তমানে যে ১৫ হাজার বাংলাদেশী বসবাস করছেন দক্ষিণ কোরিয়াতে, তার মধ্যে প্রায় ১৩ হাজারই এসেছেন সরকারী ঐ ইপিএস স্কিমের অধীনে। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের জন্য ৩ হাজারের কোটা নির্ধারিত থাকলেও বাৎসরিক কোটার এক-তৃতীয়াংশই পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। কারণ জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত জুলফিকার রহমান বলেন, “আমাদের কর্মীরা কঠোর পরিশ্রমী এটা সত্য। আমার সাথে গত কয়েক মাসে বিভিন্ন কোম্পানির বহু মালিকের সাথে কথা হয়েছে। বাংলাদেশের লোকজন শুকরের মাংস খান না এটা তাঁরা জানেন এবং সেজন্য কাউকে তাঁরা বাধ্যও করেন না। তবে মালিকপক্ষের জন্য বড় সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশ সহ সব দেশের ওয়ার্কার্সদের জন্য গরু বা মুরগীর মাংস যেটা তাঁরা সযত্নে খেতে দেন সেটাও আমাদের বাংলাদেশীরা হালাল-হারামের প্রশ্নে খান না বা খেতে চান না”।
 
রাষ্ট্রদূত আরো জানান, “এখানে চিকিৎসার পাশাপাশি কর্মীদের থাকা-খাওয়া সবই যেহেতু মালিকপক্ষকে বহন করতে হয়, তাই বাংলাদেশীদের নিয়ে তাঁরা বেশ বিব্রত বোধ করেন বিভিন্ন কোম্পানিতে খাবারের চলমান এই অপ্রীতিকর ইস্যুতে। স্বল্প সংখ্যক কোম্পানি তাদের বাংলাদেশী ওয়ার্কার্সদেরকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় হালাল ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে খাবার সরবরাহ করে থাকেন। বেশ কিছু মালিক অবশ্য মাসান্তে বেতনের সাথে খাবারের জন্য আলাদা পেমেন্ট করে দেন এবং কর্মীরা যার যার ডরমিটরিতে নিজেদের মতো করে রান্না করেন। এমপ্লয়ার তথা মালিকপক্ষ এজন্য বেশ বিব্রত যে, কোম্পানির ফ্রি খাবার থাকা সত্বেও অপ্রত্যাশিতভাবে শুধুমাত্র বাংলাদেশীদের জন্য তাঁদেরকে বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়”।
 
এদিকে অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ কোম্পানিতে শুধু এই খাবার ইস্যুতেই চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে বাংলাদেশীদের মাঝে, যেখানে কোম্পানির খাবারই খেতে হয়। ইপিএস স্কিমের আওতায় কোরিয়াতে যারা এসেছেন বা আসছেন বাংলাদেশ থেকে, তাদের মাসিক গড় বেতন ১৮ থেকে ২০ লাখ কোরিয়ান ওন, ইউএস ডলারের হিসেবে মাসে যা প্রায় ১৫শ’ থেকে ১৭শ’ ডলার। থাকা-খাওয়া-চিকিৎসা সব কিছু ফ্রি হবার কারণে প্রায় সব বাংলাদেশীরাই গড়পড়তায় প্রতি মাসে ১৪-১৫শ’ ডলার সঞ্চয় করতে পারেন এখানে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, যে মালিক নিজের খরচায় ৮-৯শ’ বা হাজার ডলার খরচা করে বাংলাদেশীকে নির্ধারিত সময়ের কন্ট্রাক্টে কোরিয়াতে আনলেন, মাসে ১৫-১৭শ’ ইউএস ডলার বেতন পাওয়া সত্বেও কিছুদিন কাজ করার পরই তাঁর ঐ বাংলাদেশী কর্মী মাত্র ১ থেকে দেড়শ’ ডলার বেশি বেতনের লোভে মালিককে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চলে যাচ্ছেন অন্য কোন কোম্পানিতে।
 
প্রোডাকশন চালু রাখা সহ তাৎক্ষণিকভাবে নতুন লোক নেয়ার ঝামেলায় কোরিয়ান মালিকদের পড়তে হয় হয় হরহামেশা মূলতঃ লোভী বাংলাদেশীদের কারণেই। কোম্পানির খাবার খেতে অনীহা তথা দেশী স্টাইলে খাবারের আকুলতায় বাংলাদেশী কর্মীরা চরম স্বার্থপরের মতো যখন তখন চাকরি ছেড়ে গত কয়েক বছরে কোরিয়ান এমপ্লয়ারদের অনেকটা বিপদে ফেলে দিয়েছেন, এখনও দিচ্ছেন। অনেকে আবার চাকরি না ছেড়ে কোম্পানির ভেতরে থেকেই পরিবেশ নষ্ট করছেন নানান ভাবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, হালাল-হারামের কথা বললেও এই শ্রেনীর বাংলাদেশীদের অধিকাংশরাই কিন্তু সকাল-সন্ধ্যা নামাজ বা পবিত্র রমজানে সংযমের ধার ধারেন না কখনোই। কোম্পানির প্রতিদিনের খাবারের মেনুতে দুই বেলা ফ্রেশ শাকসবজি-সালাদ-ফলমূল এবং সপ্তাহে ১ দিন সুস্বাদু ফিশ থাকা সত্বেও ভিন্ন মতলবে হালাল-হারামকে ইস্যু বানাবার প্রেক্ষিতে বিষয়টি অনেকটা ভাইরাসে রুপ নিয়েছে একশ্রেনীর বাংলাদেশীদের মাঝে।
 
রাজধানী সিউল সহ বিভিন্ন শহরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশীদের সাথে নিয়মিত কথা বলে জানা গেছে, হালাল-হারাম লংকাকান্ড এবং সামান্য ক’টি ডলারের লোভে মালিকের বারোটা বাজিয়ে কাজ ছাড়ার এমন কান্ডকারখানা ব্যাপকহারে চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। ফলে যৌক্তিক কারেণেই কোরিয়ান মালিকেরা ইদানিং আশংকাজনকহারে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন বাংলাদেশীদের উপর থেকে। নতুন কর্মী নেবার ক্ষেত্রে নেপাল-শ্রীলংকা-ইন্দোনেশিয়া এখন তাঁদের ‘প্রায়োরিটি’ কান্ট্রি। সব মিলিয়ে কপাল পুড়ছে বাংলাদেশের, যা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে কালো তালিকাভুক্ত বা সাময়িক ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’ করা হলেও হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে সিউল থেকে। বাংলাদেশ হতে যারা ‘অমুসলিম দেশ’ কোরিয়াতে আসবেন তারা হালাল-হারাম ইস্যুতে তুলকালাম না করার পাশাপাশি যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ ছাড়াই যখন তখন যাতে কোম্পানি পরিবর্তন না করেন, সেটা নিশ্চিত করার তাই এখনই সময়।

দক্ষিন কোরিয়া

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে