Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯ , ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (4 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-১৪-২০১২

বর্ণিল উৎসবে বরণ নতুন বছর

বর্ণিল উৎসবে বরণ নতুন বছর
ঢাকা, এপ্রিল ১৪ - জীর্ণ পুরনো পেছনে ফেলে চির নতুনের আহ্বানে আবার এসেছে বৈশাখ, শুরু হয়েছে বাংলা নতুন বছর। বর্ণময় আয়োজনে নতুন বছরকে বরণ করেছে দেশবাসী।

শনিবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ১৪১৯ সালকে বরণের পালা। নানা আয়োজনে, নানা আঙ্গিকে দেশজুড়ে এই উৎসবে শামিল হন সবাই।

দেশজুড়ে উৎসব হলেও রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানই থাকে এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে। কয়েক যুগের চর্চায় তা হয়ে উঠেছে বর্ষবরণ উৎসবের প্রাণ। ষাটের দশকে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে একাত্ম এই অনুষ্ঠান প্রতিবাদেরও হাতিয়ার। আর তাই জঙ্গি হামলার লক্ষ্যবস্তুও একে হতে হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা বলেন।

ছায়ানটের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাও এখন বর্ষবরণ উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ। তাতেও শামিল ছিলেন অনেকে।

নানা স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হওয়ায় প্রায় পুরোদিনই জনসমুদ্র ছিল শাহবাগ, রমনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমণ্ডি এলাকা। এতে অনেক বিদেশিকেও দেখা যায়।

বর্ষবরণের উৎসব নির্বিঘœ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ছিল সক্রিয়। তবে কয়েকটি সড়কে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় দীর্ঘ পথ হেঁটে উৎসবের রঙে নিজেকে রাঙাতে হয়েছে ঘর থেকে বেরিয়ে আসা সবাইকে।

আবার ঘরে ফেরার সময় গাড়ি না পাওয়ার দুর্ভোগও পোহাতে হয়েছে। সেই সঙ্গে সন্ধ্যার পর নগরীতে ছিল ব্যাপক যানজট।

সকাল সোয়া ৬টায় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনার বটমূলের ঘুম ভাঙান ছায়ানটের শিল্পীরা। নগরবাসীর সব পথ তখন যেন মিশেছিল রমনায়।

নানা কারুকাজে বাঙালিয়ানার ছাপে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি কিংবা লাল শাড়ি পরে বিভিন্ন বয়সী নারীরা রমনার কয়েকটি ফটক দিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ঢোকেন উদ্যানে, সেই লাইনে ছিল হরেক রঙের পাঞ্জাবি পরা পুরুষরাও। আর ছিল বর্ণিল পোশাকে শিশুরা।

এবার ‘এসো হে বৈশাখ’ নয়, বরং ‘রাগ ভৈরব’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দিয়ে শুরু হয় ছায়ানটের বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। এর পর ‘পূর্ব গগন ভাগে’ - কবিগুরুর এ গান গাওয়া হয় সম্মিলিতভাবে।

পহেলা বৈশাখ ও ছায়ানটের বর্ষবরণের এ আয়োজনের তাৎপর্য তুলে ধরে সূচনা বক্তব্যে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, “এটি শুধু এখন ছায়ানটের অনুষ্ঠান নয়। এটি এখন জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।”

মূল অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর ছায়ানটের শিল্পীরা পরিবেশন করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, অতুল প্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন, বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শাহ আবদুল করিম, লালন শাহ, তোরাব আলী শাহ, জ্ঞান প্রকাশ ঘোষের গান। মাঝে আবৃত্তি করেন ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়।

এর মাঝে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে ছায়ানটের সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেন, “রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, বিরোধ বিদ্বেষ দূর হোক, কিন্তু মন থেকে কখনো কখনো ঘৃণা অপসারণ করা দূরুহ হয়ে যায়। যারা ধর্মের নামে মনুষ্যত্যের অবমাননা করে, তাদের শাস্তি পেতেই হবে।”

কয়েকটি নিরাপত্তা স্তর পেরিয়ে রমনায় ঢুকতে হলেও তা নিয়ে অসন্তুষ্ট দেখায়নি কাউকে, ২০০১ সালে রমনায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমাহামলার পর নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে প্রতিবছরই। এবার নিরাপত্তা বহরে যোগ হয় রোবট, যা বোমা সনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে পারে।

সকাল ৯টার আগে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শেষ হতে না হতেই সবাই ছুটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পানে, যেখানে শুরু হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। পথে শিশু পার্কের সামনে ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানস্থলেও দাঁড়াতে দেখা যায় অনেককে।

বাঙালির চিরায়ত উৎসব পহেলা বৈশাখকে স্বাগত জানাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের নিয়মিত আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই নয়, যোগ দেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেকেই।

সাম্পান আর ভয়ংকর দানব যোগ হয়েছে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায়, যার মাধ্যমে উঠে এসেছে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার সাফল্য উদযাপন আর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার ত্বরান্বিত করার দাবি।

সোয়া ৯টায় শুরু হওয়া শোভাযাত্রার শুরুর দিকে ছিল রূপকথার সেই ময়ূরপঙ্খী নাওয়ের আদলে গড়া ৪০ ফুট দীর্ঘ সাম্পান। আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠারই উদযাপন এটি।

আর ভয়ঙ্কর চেহারার দানবটিকে যুদ্ধাপরাধীর প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রাটি চারুকলার সামনে থেকে শুরু হয়ে রূপসী বাংলা হোটেলের সামনে দিয়ে ঘুরে শাহবাগ মোড়ে ফিরে শেষ হয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রার অন্যান্য আর্কষণের মধ্যে যথারীতি ছিল দেশীয় ঐতিহ্যে লালিত বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। যতেœর সঙ্গে রাতদিন খেটে এগুলো তৈরি করেছেন চারুকলা অনুষদের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। বরাবরের মতোই ছিল হাতি, ঘোড়া, বাঘ ও পাখির প্রতিকৃতি। রঙ-বেরঙের মুখোশ-ফানুস ও বর্ণিল পোশাকে সেজে হাজার হাজার মানুষ শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে নানা অনুষ্ঠানে শামিল হন সবাই, যার অনেকগুলোও ছিল রাত পর্যন্ত।

রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় বিভিন্ন লোকজ খাদ্য ও পণ্যের পসরা নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। অঘোষিত এই মেলা থেকে কিছু না কিছু কিনেছেন প্রায় সবাই।


উৎসবের পোশাকে প্রিয়জনের হাত ধরে বর্ষবরণে শামিল হওয়া মানুষের স্রোত চোখে পড়ছে পুরো নগরেই। ছোট-বড় সব অনুষ্ঠানের বাইরে সবচেয়ে বড় করে চোখে পড়ছে প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডা আর সময় কাটানোর দৃশ্য। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে বৈশাখের এই অবসরে এ যেন আগামী বছরের স্বপ্ন বোনার সময়। নগরীর সব পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোসহ অলি-গলির খোলা জায়গায়ও এমন দৃশ্য চোখে পড়ছে।

ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও বর্ণাঢ্য আয়োজনে নতুন বছরকে বরণ করা হয়েছে। সরকারি এই ছুটির দিনে সবাই শামিল হন উৎসবে।

নতুন বছর শুরুতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া।

রাষ্ট্রপতি আশা করেছেন, অতীতের বিভেদ ভুলে বাংলা নববর্ষ সবাইকে সুন্দর আগামী গড়ার প্রত্যয়ে অনুপ্রাণিত করবে।

বাদশাহ আকবরের নবরতœ সভার আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজি বাদশাহি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ফসলি সালের শুরু করেছিলেন হিজরি চান্দ্রবর্ষকে সৌরবর্ষের মতো মিলিয়ে নিয়ে। তিনিই হিজরিকে বাংলা সালের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেছিলেন ও পয়লা বৈশাখ থেকে বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেছিলেন। আর বৈশাখ নামটি নেওয়া হয়েছিলো নক্ষত্র ‘বিশাখা’র নাম থেকে।


ইতিহাসের পাতা উল্টে আরো জানা যায়, পয়লা বৈশাখে আকবর মিলিত হতেন প্রজাদের সঙ্গে। সবার শুভ কামনা করে চারদিকে বিতরণ হতো মিষ্টি। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে বর্ষবরণ উৎসব চলে আসে জমিদার বাড়ির আঙিনায়। খাজনা আদায়ের মতো একটি রসহীন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় গান বাজনা, মেলা আর হালখাতার অনুষ্ঠান।

আজ আর খাজনা আদায় নেই, কিন্তু রয়ে গেছে উৎসবের সে আমেজ। সেটা এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহর বন্দর আর গ্রামে, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালির মাঝে।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে