Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.3/5 (21 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-০৯-২০১৫

নীলের লাল রক্ত

ফকির ইলিয়াস


দাবি অনেক করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়েছে কি? একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে কেউ অপরাধ করলে শাস্তি পেতে পারে। তার বিরুদ্ধে মামলা করা যেতে পারে। কিন্তু তাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা হবে কেন? এ বিষয়ে লেখা দীর্ঘ না করে কিছু প্রস্তাব পেশ করতে চাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রশাসকদের সমীপে। এ পর্যন্ত লেখক-ব্লগার হত্যা মামলাগুলোর অগ্রগতি মানুষকে জানার সুযোগ দেয়া হোক। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাদের সর্বশেষ অবস্থা এখন কী, তা জানানো হোক। 

নীলের লাল রক্ত

আরেকজন ব্লগারকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার নাম নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায়। ‘নিলয় নীল’ নামে তিনি লিখতেন। গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। তাকে যে কায়দায় হত্যা করা হয়েছে, তা আদিমতার যে কোনো স্তরকে হার মানায়। বাংলাদেশে গেল কয়েক মাসে চারজন ব্লগারকে খুন করা হয়েছে। ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে)-এর এক প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, ‘আর কতজন ব্লগারকে হত্যা করা হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ন্যায়বিচারের দিকে তাকাবেন?’ রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ- এদের কারও হত্যার বিচারের সুরাহা এখনও হয়নি। কেন হয়নি, তা জানেন না বাংলাদেশের মানুষ।

বড় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না? খবর বেরিয়েছে, নিলয় নীল তার নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করতে গিয়েছিলেন। পুলিশ তার জিডি গ্রহণ করেনি। বরং তাকে দেশ ছেড়ে যেতে বলেছিল। এই দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শের নেপথ্য কারণ কী? কেন এমনটি বলবে দেশের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী?

আমরা অতীতে দিকে তাকালে দেখব, বাংলাদেশে এর আগেও এমন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। শাহ এএমএস কিবরিয়া, হুমায়ুন আজাদকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বাংলা ভাষার একজন লেখক হিসেবে নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে খুব। এই বাংলাদেশ আজও শাহ কিবরিয়া হত্যার বিচার শেষ করতে পারেনি। পারেনি হুমায়ুন আজাদ হত্যার বিচার করতে। জঙ্গিরা দেখাচ্ছে তাদের ফণা। আর প্রগতিবাদীরা লেজ গুটিয়ে মার খাচ্ছে! আমরা অনেকবার বলেছি, এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? কাজ হয়নি। আমরা কি প্রতিরোধ করতে ভুলে গেলাম? আমরা কি একাত্তর ভুলে গেলাম? ভুলে গেলে তো বাঁচতে পারব না।

বাংলাদেশের বুকের ওপর একটি কালো অজগর ফণা তুলতে চাইছে। এ ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই ভিন্নমতের মানুষের ওপর চাপাতির আঘাত আসছে।
আমরা দেখেছি, অভিজিৎ রায় হত্যার পরও এভাবে উদ্বেগ জানিয়ে সিপিজের এশিয়া বিষয়ক প্রোগ্রাম সমন্বয়ক বব ডায়েটজ বলেছিলেন, বাংলাদেশে হামলাকারীদের বিচার না হওয়ার যে নজির রয়েছে তারই ফলে অভিজিতের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণের ঘটনায় কারও বিচার না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যম কর্মীদের হত্যার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সিপিজের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে যারা ব্লগে বা অন্য কোনো মাধ্যমে লিখেছেন, তারা হুমকির মুখে রয়েছেন। ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের সময় ব্লগারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে এতে বলা হয়েছিল, সে বছরের ফ্রেব্র“য়ারিতে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যা করে ধর্মের নামে সন্ত্রাসকারীরা। ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য এখনও কেউ শাস্তি পায়নি। এ বছর বইমেলা থেকে ফেরার পথে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখক অভিজিৎ ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার ওপর যেভাবে হামলা হয়, সেভাবেই ১১ বছর আগে হামলা হয়েছিল লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে বাংলা একাডেমি ও টিএসসির মাঝামাঝি এলাকায় হামলার শিকার হন হুমায়ুন আজাদ, মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি।

যে বিষয়টি গোটা বিশ্বের মানুষকে শিহরিত করে তুলছে তা হল, জঙ্গিবাদীরা মসজিদেও আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছে। সৌদি আরবের একটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন মাত্র ক’দিন আগে। সৌদি আরবের আবহা শহরের একটি মসজিদে মুসল্লিরা যখন নামাজ পড়ছিলেন, ঠিক তখন হামলাকারী বিস্ফোরণটি ঘটায়। একই কায়দায় আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় বাগলান প্রদেশের একটি মসজিদে বোমা বিস্ফোরণে অন্তত ২৯ ব্যক্তি আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজন স্থানীয় সিনিয়র কর্মকর্তাও রয়েছেন। এর আগে ঈদের জামাতেও বোমা হামলা করা হয়েছে আফগানিস্তানে। মুসলমান হয়ে মুসলমানের ওপর বোমা মারা হচ্ছে। শিয়া-সুন্নির গোত্রগত সংঘাত আর ইসলামী স্টেট বানানোর ধুয়া তুলে বিশ্বকে অশান্ত করে তোলা হচ্ছে। কথা হচ্ছে, নিজ ধর্মের মানুষই যাদের হাতে নিরাপদ নয়, নিজ ধর্মীয় উপাসনালয়ের ওপর যারা বোমা মারছে, বিশ্বের অপরাপর মানুষ তাদের হাতে কতটা নিরাপদ? নিলয় নীলের লাল রক্ত আমাদের আবারও সেই প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে।

এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একইভাবে নিলয়কে কুপিয়ে হত্যার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। খুনিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা। বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক রবার্ট ওয়াটকিনস রাতে এক বিবৃতিতে এই হত্যাকাণ্ডকে ‘আরেকজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের বিরুদ্ধে সংঘটিত বর্বর অপরাধ এবং সহিষ্ণুতার ওপর আঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের গবেষণা পরিচালক ডেভিড গ্রিফিথ বলেছেন, এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড এখানেই শেষ হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের কণ্ঠ রোধ করতেই যে পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে, এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে সামান্যই এবং এটি অগ্রহণযোগ্য। গ্রিফিথ বলেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীন চর্চাকে কোনোভাবেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া যাবে না। এ ধরনের আক্রমণ যাতে আর না হয়, সেজন্য বাংলাদেশ সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেয়া উচিত। স্বাধীন, কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব ঘটনার তদন্ত করা উচিত। আর যারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাদের নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

দাবি অনেক করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়েছে কি? একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে কেউ অপরাধ করলে শাস্তি পেতে পারে। তার বিরুদ্ধে মামলা করা যেতে পারে। কিন্তু তাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা হবে কেন? এ বিষয়ে লেখা দীর্ঘ না করে কিছু প্রস্তাব পেশ করতে চাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রশাসকদের সমীপে। এ পর্যন্ত লেখক-ব্লগার হত্যা মামলাগুলোর অগ্রগতি মানুষকে জানার সুযোগ দেয়া হোক। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাদের সর্বশেষ অবস্থা এখন কী, তা জানানো হোক। এ মামলাগুলো দ্রুত বিচারিক আদালতে নিষ্পত্তি করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। মনে রাখা দরকার, বর্তমান সরকারের একটি গোপন প্রতিপক্ষ সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য যা যা করা দরকার তা করে যাচ্ছে। তাই সময়মতো সতর্ক না হলে সরকার, দেশ ও জাতি বড় ধরনের অস্থিরতার মুখোমুখি হতে পারে।

আজ যদি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করা না যায়, তাহলে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত কোনো মুক্তচিন্তার লেখক-বুদ্ধিজীবীই এদের হাত থেকে রেহাই পাবে না। যারা যুক্তি দিয়ে পারে না, তারাই রক্ত নিয়ে খেলে। আজকের বাংলাদেশে যে হোলিখেলা শুরু করেছে জঙ্গিরা, তা থেকে প্রধানমন্ত্রী নিজেও যে নিরাপদ নন, তা তো তিনি বারবার নিজেই বলেছেন। তাহলে এর সুরাহা কী? বিষয়টি নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বের সঙ্গে ভাববেন বলেই আশা করব। 

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে