Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৭ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.6/5 (20 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-০৮-২০১৫

মুক্তিযুদ্ধের রক্তঋণ ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা

ফকির ইলিয়াস


শেখ মুজিব কখনই মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য তিনি প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন। তার অগ্রজ কিংবা সমসাময়িক অন্য কোনো নেতা যা পারেননি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। যে গোষ্ঠী এখনো শেখ মুজিব নামটিকে ভয় পায়, তারা কারা? সে সব বিষধরের পরিচয় জানাতে হবে এই প্রজন্মকে। 

মুক্তিযুদ্ধের রক্তঋণ ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা

আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জানি। তিনি ১৯৭১ সালে বীরদর্পে যুদ্ধ করেছেন দেশমাতৃকার জন্য। তিনি খুব ধার্মিক মানুষ। তার একজন ছেলেকে তিনি একটি মাদ্রাসায় পড়িয়েছেন। সেই ছেলে একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের রাজনীতির তালিম নিয়েছে। ছেলেটি তার মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে অনেকটাই কনভিন্স করেছে শেষ বয়সে। সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা এখন ওই মৌলবাদী চেতনা লালন করেন মনে মনে। এমনকি এটাও মনে করেন- মুক্তিযুদ্ধের ধারণাটাও ভুল ছিল! আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম- কেন তার এমন মতো পাল্টালো! এটা কি দেশের আপামর রাজনৈতিক ব্যর্থতার চিত্র দেখে? না- সেটাও তিনি বললেন না। তার কথা ধর্মীয় রাজনৈতিক ইজমই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে। আমি একজন বিশিষ্ট মানুষকে জানি। তার বাবা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। শান্তি কমিটির মেম্বার ছিলেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন- আমি রাজাকারের ছেলে! আমার মরহুম বাবা ভুল করেছিলেন। আমি তার দায় নিচ্ছি না। আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করি। ১৯৭১ ই আমার শক্তির উৎস। এখানে আমরা দুটি ভিন্ন চিত্র দেখলাম। একজন মুক্তিযোদ্ধা এখন মৌলবাদী। অন্যদিকে একজন রাজাকার সন্তান এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যতম শক্তি। যে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট তা হলো- একজন রাজাকার সব সময়ই রাজাকার হলেও একজন মুক্তিযোদ্ধা সব সময় মুক্তিযোদ্ধা নয়। তারপরও আমরা দলবদল দেখি। প্রতিপত্তি বিস্তারের জন্য খোলস পাল্টাতে দেখি।
 
মুক্তিযুদ্ধের অর্জন কী? এই প্রশ্নটি কেউ কেউ করেন। যে দেশটি সাড়ে সাত কোটি মানুষ নিয়ে স্বাধীন হয়েছিল- সেখানে এখন মানুষের সংখ্যা ১৬ কোটি। ছিটমহলগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আয়তন বাড়িয়েছে ২০১৫ সালে। এই অর্জনটাও কিন্তু সেই মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায়। যে চুক্তিটি করে গিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
 
১৯৭১-এর পরের বাংলাদেশের দিকে যদি তাকাই- তাহলে আমরা দেখব, যে প্রত্যয় নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন, তা দ্বিগুণ হয়েছিল স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর। পাকিস্তানি হায়েনাদের জল্লাদখানা থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলার মাটিতে পৌঁছার পরপরই তার চিত্তের উদারতা আরো বিশালতায় রূপ নিয়েছিল। তিনি তার মহানুভবতা দিয়ে দেখেছিলেন চারপাশ। বঙ্গবন্ধু কখনই ভাবেননি, এই বাংলার মাটিতে কেউ তার শক্র হতে পারে। এমনকি সেই পরাজিত রাজাকার চক্রও আবার ফুঁসে উঠতে পারে সেটা ছিল তার কল্পনার বাইরে।
 
বঙ্গবন্ধু কেমন বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন? তার কিছু পরিকল্পনা সে সময়ই প্রণয়ন করেছিল তার দল, তার মন্ত্রিপরিষদ। নয় মাসে ধ্বংসস্তূপে পরিণত বাংলাদেশকে তুলে দাঁড় করানো সে সময় কোনো মতেই সহজসাধ্য ছিল না। তার ওপর রয়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের সমর্থনের অভাব। এ কথাটি অস্বীকার করার উপায় নেই বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণেই ভারত বাংলাদেশের মাটি থেকে দ্রুত সরিয়ে নেয় মিত্রবাহিনী এবং তা সম্ভব হয়েছিল ইন্দিরা-মুজিব পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধাবোধের কারণেই। মার্কিন কবি অ্যালেন গিনসবার্গ তার জীবদ্দশায় একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যদি সে সময় ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী না থাকতেন, তবে ভারত এতটা সমর্থন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে দিত কিনা- তা নিয়ে আমার সন্দেহ হয়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’- অমর কবিতার জনক কবি অ্যালেন গিনসবার্গের মতে, ইন্দিরা গান্ধীর মতো একজন জননন্দিত নেত্রীর সাহসী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল। আর এর নেপথ্যের কারণ ছিল ইন্দিরা-মুজিবের রাজনৈতিক মনন।
 
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঠিক পূর্ববর্তী সময়ে একটি গোপন ছক এঁকে রেখেছিলেন শেখ মুজিব। তিনি নিজে বন্দি হয়ে গেলে নেতারা ভারতে কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, কিভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হবে তার পুরো নকশাই ছিল তার নখদর্পণে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা তাদের সে সব কথা এখন বলছেনও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে। এসব কিছুরই প্রধান শক্তি ছিল শেখ মুজিবের বিচক্ষণতাপূর্ণ নেতৃত্ব। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ যখন চলছিল, তখন বন্দি মুজিবও ছিলেন ইয়াহিয়া-ভুট্টো-টিক্কাদের আতঙ্ক। স্বাধীন বাংলাদেশের অবকাঠামো পুনর্গঠনে শেখ মুজিবকে কাজ করতে হয়েছিল ঘরে-বাইরে। দেশ গঠনে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহে তাকে কম বেগ পেতে হয়নি কিন্তু সেসব দুরূহ কাজ তিনি সাধন করতে পেরেছিলেন গণমানুষের ভালোবাসার কারণেই। তিনি বিশ্বের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন বাঙালির পরিচয়।
 
১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ তারিখে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে। এর পরপরই সরকারপ্রধান হিসেবে ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলা ভাষায় দেয়া সে ভাষণে তিনি বাংলাদেশে রক্তাক্ত, নৃশংস গণহত্যার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি পেশ করেন বাঙালি জাতি এবং বিশ্ব মানবের কল্যাণে তার চিন্তা-চেতনার রূপরেখা। তিনি তার ভাষণে বিশ্বে নারী সমাজের অগ্রগতি, শিক্ষা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পানি, বিদ্যুৎ বিষয়াদিসহ তার সরকারের পাঁচ বছরমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু, কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে অধিক ফসল ফলানোর প্রয়োজনীয় সাহায্যও চান বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে। ডাক দেন সজুব বিপ্লবের। বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে ভাষণ দৃষ্টি কাড়ে গোটা বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের। ফিলিস্তিনের কিংবদন্তি নেতা ইয়াসির আরাফাত শেখ মুজিবকে গণমানুষের মহানায়ক উল্লেখ করে বলেন, মেহনতী মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে মুজিবকে সর্বতোভাবে সাহায্য করবেন তিনি। একই সহযোগিতার কথা ব্যক্ত হয় সমাজতন্ত্রী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর পক্ষ থেকেও।
 
শেখ মুজিব বাংলাদেশকে, বাঙালি জাতিকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে বিভিন্ন কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন করতে চেয়েছিলেন। কৃষি খাতে বিপ্লবী ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছিলেন তিনি। তার এই অদম্য কর্মযজ্ঞ কারো কারো হিংসার কারণ হয়েছিল বৈকি। বিশ্বের ইতিহাস প্রমাণ করে যারা ফন্দি-ফিকির করে মহামানব নেলসন ম্যান্ডেলাকে কারাগারে পুরে রেখেছিল, পরবর্তী সময়ে তারাই ম্যান্ডেলার ভক্ত-অনুরাগী বলে বিশ্বে পরিচিত হয়েছে। কিংবা যারা মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিংকে হত্যার ইন্ধন জুগিয়েছিল, তারাই পরবর্তী সময়ে কিং-কে বিশেষভাবে সম্মানিত করতে চেয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মোড়ল মনোভাবাপন্নদের জন্য আতঙ্কের কারণ ছিল ঠিক একইভাবে। তা না হলে যারা মানবতার ধ্বজাধারী বলে নিজেদের ঢোল নিজেরা পেটায়, সেই মার্কিন প্রশাসন একাত্তরে বাংলাদেশের গণহত্যার নিন্দা জানায়নি কেন? কেন রক্তবন্যায় মদদ দিয়েছিল তারা?
 
আমরা স্পষ্ট করেই বলতে পারি, পঁচাত্তরে জাতির জনককে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এই চার মূলনীতির সমাধিই শুধু রচিত হয়নি, একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া হয়েছে। আর তা করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। যারা একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেনি, যারা দায়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজেছিল, মুজিব হত্যায় তাদের নেপথ্য ইন্ধন ছিল। পরবর্তীতে তারাই রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নেয়। ভাবতে অবাক লাগে আজ যারা বঙ্গবন্ধুর বাকশাল পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনায় পঞ্চমুখ হন তারাই সেদিন বাকশালের সদস্য হওয়ার জন্য প্রথম সারিতে থেকে আবেদন করেছিলেন। জাতির জনককে সপরিবারে ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র স্বাধীনতার পর থেকেই শুরু হয়। ‘চুয়াত্তরের মন্বন্তর’ নাম দিয়ে মাঠ গরম রাখার চেষ্টা করা হয়। অথচ এরচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মুজিবের তিরোধানের পর বাংলাদেশের ওপর দিয়ে কয়েকবারই গেছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক কথা হচ্ছে, খুনিদের বাঁচাতে যে দেশে অধ্যাদেশ পর্যন্ত জারি করা হয়, সে দেশে গণঅধিকার কতটা কিভাবে সংরক্ষিত হতে পারে? তেমন কাজগুলোই করেছিল সামরিক জান্তারা।
 
শেখ মুজিব কখনই মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য তিনি প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন। তার অগ্রজ কিংবা সমসাময়িক অন্য কোনো নেতা যা পারেননি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। যে গোষ্ঠী এখনো শেখ মুজিব নামটিকে ভয় পায়, তারা কারা? সে সব বিষধরের পরিচয় জানাতে হবে এই প্রজন্মকে। শিকড়সন্ধানী বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্তম্ভ শেখ মুজিব। তার নাম কোনোভাবেই মুছে ফেলা যাবে না। এই বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশে একাত্তরের চেতনাই বিজয়ী হয়েছে। জেগে উঠেছে শেখ মুজিবের আদর্শ। তারই ধারাবাহিকতায় এগিয়েছে দেশ। যে সব অর্জন নিয়ে আজ বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করতে পারে- তার সবই হয়েছে সেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অনুসরণ করেই। জাতির জনককে ১৯৭১ সালে ওরা হত্যা করতে পারেনি। তাকে এই বাংলাদেশেই হত্যা করেছিল কিছু বাঙালি কুলাঙ্গার। এরচেয়ে চরম বিশ্বাসঘাতকতা, নির্মমতা আর কিছু কি ইতিহাসে থাকতে পারে?

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে