Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯ , ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.7/5 (26 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-০৭-২০১৫

অর্থনীতিতে জনশক্তি ও রাষ্ট্রীয় পাহারা

ফকির ইলিয়াস


বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক নেতা ও দল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশকে তাদের মিত্র মনে করেন। তথাকথিত ভ্রাতৃপ্রতীম সৌহার্দ্য রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এসব রাজনীতিক শ্রম অধিকার আইন সংশোধনে মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহ, খলিফা, সুলতান, আমিরদের সঙ্গে কথা বলেন না কেন? লিয়াজোঁ তৈরি করেন না কেন? চাপ প্রয়োগ করেন না কেন? 

অর্থনীতিতে জনশক্তি ও রাষ্ট্রীয় পাহারা

একটি উন্নয়নশীল দেশে তার জনশক্তি একটি বলিষ্ট সহায়। এরা দেশে কিংবা বিদেশেকাজ করে উদ্যমের সাথে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর কিংবা বিদেশের শ্রমজীবি মানুষ এর উদাহরণ। কিন্তু তারা কি পাচ্ছেন যথাযথ রাষ্ট্রীয় পাহার? তারা কি পাচ্ছেন তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক? উপযুক্ত সম্মান?

বাংলাদেশে মানুষ সাগরে ভাসছে। বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে শংকাময় জীবন কাটাচ্ছে অনেকে। এর কি বিহীত করা যায় না?

মধ্যপ্রাচ্যে প্রায়ই অত্যন্ত নির্মমভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন বাংলাদেশের শ্রমিকরা। তাদের ওপর অমানবিক হামলে পড়েছে সেদেশের পুলিশ, আধা-সামরিক বাহিনী। বেদমভাবে লাঠিপেটা করা হয়। বাংলাদেশী শ্রমিকদের অপরাধ, তারা তাদের বেতন-ভাতা ও সুবিধার জন্য আন্দোলনে নামেন। রাজতন্ত্রের দেশগুলোতে আন্দোলন, মিছিল, মিটিং যে করা যায় না- তা বাংলাদেশী প্রবাসী সমাজের অজানা নয়। তারপরও তারা কেন এই পথ বেছে নিতে মাঝে মাঝে বাধ্য হন তার কারণ খোঁজা খুবই জরুরি। 

এটা বিশ্বের সব সভ্য সমাজই জানেন, মধ্যপ্রাচ্যে এখনও বহাল রয়েছে এক ধরনের দাসপ্রথা। যারা ভিসা প্রদান করে কিংবা যারা বিভিন্ন ছোট-বড় কোম্পানির মালিক তাদের আরবিতে বলা হয় ‘কফিল’ বা ‘আরবাব’। আর যিনি চাকরি নিয়ে যান তাকে আরবিতে বলা হয়ে থাকে ‘আমাল’ বা ‘নফর’। আরবাব শব্দের আভিধানিক প্রতিশব্দ হচ্ছে প্রভু। আর ‘নফর’-এর প্রতিশব্দ হচ্ছে চাকর। আর এভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে উঠেছে এক ধরনের প্রভু-দাস প্রথা। দুঃখের কথা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দরিদ্র শ্রমশক্তিকে তা জেনেশুনেই চাকরি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে হচ্ছে। জীবনের অন্বেষণে আপস করতে হচ্ছে। 
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে আমি স্পষ্ট বলতে পারি, এসব দেশে দরিদ্র জনশক্তির প্রতি সবল কফিলদের আচরণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অমানবিক। এসব দেশের অধিকাংশগুলোতেই কোন বিদেশী স্বনামে কোন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান খুলতে পারেন না। ব্যবসা করতে হয় ওই আরব কফিলের নামে। আর ব্যবসা জমে উঠলে পাষণ্ড কফিল ওই বিদেশী ব্যবসায়ীকে বিনা কারণেই তার দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারে ভিসা বাতিল করে। অতীতে এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে। এখনও ঘটছে। কখনও কাউকে বিনা কারণে জেল খেটেও দেশে আসতে হয়েছে। 

সেসব দেশের কফিলগুলো এতই পরাক্রমশালী, সেদেশের লেবার ডিপার্টমেন্ট সব সময় কফিলদের পক্ষেই থাকে। মোট কথা, প্রতিটি বিদেশী শ্রমিকের ভাগ্য নির্ভর করে আরবি কফিলের হাতের ওপর। সেদেশে যাওয়ার পরপরই প্রতিটি শ্রমিকের পাসপোর্ট জমা নিয়ে নেয় কফিল। দেশে আসার আগ পর্যন্ত পাসপোর্টের মালিককে আর তা দেখার সুযোগটুকু পর্যন্ত হয় না। আর এভাবেই মানসিক চাপের মুখে রাখা হয় শ্রমিককে প্রবাস জীবনের প্রথম দিনটি থেকে। 

এক সময় ছিল যখন কুয়েতে একশ’ দিনার, ওমানে আশি রিয়াল, দুবাইয়ে দেড় হাজার/দুই হাজার দিরহাম, সৌদি আরবে দেড়-দুই হাজার রিয়াল মাসিক বেতনে শ্রমিক নিয়োগ করা হতো। এই মাসিক বেতনের পরিমাণ এখন অর্ধেকেরও নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। অথচ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বেড়েছে দেড়-দুই গুণ। আমরা জানি এবং দেখছি, আন্তর্জাতিক শ্রমশক্তির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, কাউকে নামমাত্র বেতনে কঠিন শ্রম দেয়ার মুখোমুখি ঠেলে দেয়া হবে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, ইউরোপের দরিদ্রতম দেশ থেকে কিন্তু চল্লিশ-পঞ্চাশ দিনার মাসিক বেতনে কোন শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশেই এ রকম নিম্ন মজুরিতে নেয়া হচ্ছে না। যাবেও না ইউরোপ থেকে শ্রমিক। অথচ বাংলাদেশী শ্রমিকরা কুয়েত-সৌদি আরবসহ অন্যান্য তেল সম্পদের দেশে শ্রম দিচ্ছে সপ্তাহে ষাট ঘণ্টারও বেশি। জনশক্তি রপ্তানিকারকরাও নানা মিথ্যা তথ্যের আশ্রয় নিচ্ছে। 

মধ্যপ্রাচ্যে এই যে নির্মম শ্রম বাণিজ্য চলছে, এর মুনাফালোভী বেনিয়ারা কোনভাবেই আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার আইন মেনে চলছে না। অথচ জাতিসংঘ সংবিধানে শ্রম অধিকার খুব স্পষ্টভাবেই বর্ণিত আছে। জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এসব আইনি নীতিমালা মেনে চলারই কথা। কিন্তু তারা তা মানছে না। বরং অমানুষিক নির্যাতন করছে শ্রমিকদের ওপর। গৃহবাবুর্চির চাকরির নামে হরণ করছে নারীর সম্ভ্রম। ফলে আমরা সম্প্রতি দেখেছি- সৌদী আরবে মহিলা চাকুরিজীবির জন্য বাংলাদেশে ঢাকঢোল পিটিয়েও তেমন সাড়া পাওয়া যায় নি।

ইউরোপ-আমেরিকায় একজন শ্রমিক প্রতি সপ্তাহে তার বেতন পান। এসব দেশে সপ্তাহে মজুরি দেয়া হয় ঘণ্টাপ্রতি। একজন দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক কাজ করেন সপ্তাহে চল্লিশ ঘণ্টা। এর বেশি কাজ করলে তা ওভারটাইম হিসেবে বিবেচিত হয়। 

বিশ্বে পয়লা মে যে মহান মে দিবস পালিত হয় এর মূলমন্ত্রই ছিল শ্রমিকের শ্রম অধিকার আইন সংরক্ষণ করা। বিশ্বের সভ্য দেশগুলো সে আলোকেই শ্রম আইনে সংযোজন-বিয়োজন ঘটাচ্ছে প্রায় প্রতি বছর। আমার প্রশ্ন হচ্ছে- মধ্যপ্রাচ্যের আলখেল্লাধারী রাজ শাসকরা কি নিজেদের সভ্যতার পথে অগ্রসরমাণ বলে দাবি করেন না ? যদি করেন তবে তারা তাদের শ্রম আইনগুলো আরও উদার করছেন না কেন? কেন আটকে রাখা হচ্ছে শ্রমিকের বেতন মাসের পর মাস? 

এখানে আরেকটি বিষয় বলা দরকার, বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক নেতা ও দল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশকে তাদের মিত্র মনে করেন। তথাকথিত ভ্রাতৃপ্রতীম সৌহার্দ্য রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এসব রাজনীতিক শ্রম অধিকার আইন সংশোধনে মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহ, খলিফা, সুলতান, আমিরদের সঙ্গে কথা বলেন না কেন? লিয়াজোঁ তৈরি করেন না কেন? চাপ প্রয়োগ করেন না কেন? 

আমরা দেখছি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শ্রমিকরা না না ভাবে নাজেহাল হচ্ছেন। তাদের হীনভাবে দমন করা হয়েছে। এ বিষয়ে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারছে না প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এমনকি বিভিন্ন দূতাবাসের বিরুদ্ধেও প্রবাসী মানুষের অভিযোগ আমরা মিডিয়ায় দেখছি। এই বিষয়গুলোর সমাধান দরকার।

বাংলাদেশের শ্রমশক্তিকে বিদেশে পাঠিয়ে কাজে লাগাতে হলে কিছু কাজ করা খুব জরুরি। আর তা হচ্ছে- 

১. মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য জাতিসংঘের মাধ্যমে সেসব দেশগুলোর প্রতি প্রস্তাবনা পাঠাতে হবে। 

২. বাংলাদেশের রিক্রটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠানোর চুক্তিনামা প্রবাসী মন্ত্রণালয়কে পরখ করে দেখতে হবে। ন্যূনতম বেতন কত হলে লোক পাঠানো যাবে তার একটা গাইড লাইন তৈরি করতে হবে। সে প্রক্রিয়ায় লোক পাঠাতে হবে। বিশ্বে নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে হবে।

৩. মধ্যপ্রাচ্যের বাংলাদেশ দূতাবাসকে শ্রমিকদের সর্বপ্রকার সহযোগিতা দিতে এগিয়ে আসতে হবে। যাতে প্রবাসী বাঙালিরা তাৎক্ষণিক তাদের সমস্যায় সহযোগিতা পান। প্রতিটি দূতাবাসে একটি মনিটরিং সেল বা তত্ত্বাবধান শাখা থাকতে হবে। 

৪. কোন বাংলাদেশী শ্রমিক যাতে অমানবিকভাবে নিগৃহীত না হন, সেজন্য রাজনৈতিকভাবে আলোচনা করতে হবে। উটের জকি, গৃহপরিচারিকা, অবৈধভাবে পাচার ও দাসপ্রথা বন্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে যত শিগগিরই উদ্যোগী হবে ততই মঙ্গল হবে প্রবাসী সমাজের।

৫. মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। জনশক্তিকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যাতে তাদেরকে বিদেশে গিয়ে ভাষা, কর্ম ও জীবনাচারে বেশি বেগ পেতে না হয়।

মানুষ এগুচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে চলমান বিশ্ব। বৈদেশিক মুদ্রা সচল রাখছে বাংলাদেশ। তাই প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সুবিধাদি বিষয়ে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে জরুরী ভিত্তিতে।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে