Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (141 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-০৯-২০১২

আনন্দঘুড়ি পাহাড়ে পাহাড়ে

আনন্দঘুড়ি পাহাড়ে পাহাড়ে
পাহাড়-হ্রদ আর অরণ্যের শহর রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবানে আজ থেকে শুরু হচ্ছে বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণের উৎসব, 'বৈসাবি'। চাকমারা এ উৎসবকে বিজু, ত্রিপুরারা বৈসুক ও মারমারা সাংগ্রাই এবং তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু বলে থাকে। চামকা, ত্রিপুরা ও মারমা জাতিগোষ্ঠীর প্রাণের এ উৎসবের নামের আদ্যক্ষর নিয়েই এ উৎসবকে বলা হয় 'বৈসাবি' উৎসব। তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের প্রথম দিনকে চাকমা ভাষায় বলে ফুল বিজু, দ্বিতীয় দিনকে 'মূল বিজু' এবং তৃতীয় দিনকে 'নুয়াবঝর' বা 'গোজ্যা পোজ্যা দিন' বলা হয়। এভাবেই ত্রিপুরারা প্রথম দিনকে 'হারিবুইসুক' দ্বিতীয় দিনকে 'বুইসুকমা' এবং তৃতীয় দিনকে 'বিসিকাতাল' নামে অভিহিত করে থাকে। এ ছাড়া তঞ্চঙ্গ্যারা এ উৎসবকে বিষু বলে থাকে। যদিও তারা আলাদাভাবে তেমন কোনো আচার-অনুষ্ঠান এখনো করতে পারছে না। ফলে এ উৎসবে তারা চাকমাদের সঙ্গেই অংশগ্রহণ করে।
বৈসুক : ত্রিপুরাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসবের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় উৎসব হলো বুইসুক বা বৈসুক। চৈত্র মাসের শেষের দুই দিন, নববর্ষের প্রথম দিনটিসহ মোট তিন দিন ধরে পালন করা হয় এ উৎসব। চৈত্র মাসের শেষ দুই দিনের প্রথম দিনটিকে ত্রিপুরারা 'হারি বুইসুক' এবং শেষ দিনটিকে 'বুইসুকমা' বলে থাকে। আর নববর্ষের প্রথম দিনটিকে তারা বলে 'বিসিকাতাল'। উৎসবের প্রথম দিন ত্রিপুরা ছেলেমেয়েরা ফুল তোলে। ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। কাপড়-চোপড় ধুয়ে পরিষ্কার করে। ঝুড়িতে ধান নিয়ে তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে মোরগ-মুরগিকে খাওয়ায়। এই দিনে গৃহপালিত সব প্রাণীকে খুব ভোরে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরিচ্ছন্ন জামা-কাপড় পরে ছেলেমেয়েরা গ্রামের ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ায়। শিশু-কিশোরদের বিচিত্র পিঠা আর বড়দের মদ ও অন্যান্য পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়। বৈসুক শুরুর দিন থেকে 'গড়াইয়া' নৃত্যদল গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রত্যেক ঘরের উঠানে নৃত্য করে। এ আনন্দদায়ক নৃত্যকে ত্রিপুরারা গরয়া নৃত্য বা নৃত্য বলে থাকে। এ নৃত্যে ২২টি অসাধারণ মুদ্রা সৃষ্টি করা হয়। এ নৃত্যদলের শিল্পীদের একজনের কাঁধে একটি শূল থাকে। এই শূলে একটি খাদি বাঁধা থাকে। যদি কোনো ঘরের উঠানে এ শূলটি বসানো হয়, তবে ঘরের মালিককে গরয়া দেবতার পূজা দিতে হয়। এভাবে প্রত্যেক ঘরের উঠানে নৃত্য শেষে শিল্পীদের মদ, মুরগির বাচ্চা, চাউল প্রভৃতি দেওয়া হয়। বিনিময়ে শিল্পীরা সুর করে সেই গৃহস্থকে আশীর্বাদ করে যায়। নৃত্য শেষে শিল্পীরা উপঢৌকন হিসেবে পাওয়া সামগ্রী দিয়ে গরয়া দেবতার পূজা করে। কোনো শিল্পী যদি একবার এ গড়াইয়া নৃত্যে অংশ নেন, তবে তাঁকে তিন বছর পরপর এ নৃত্যে অংশ নিতে হয়, নতুবা তাঁর অমঙ্গল হয় বলে স্থানীয়ভাবে একটি মিথ প্রচলিত আছে। এ লোকনৃত্যটিতে ১৬ থেকে ৫০০ জন পর্যন্ত অংশ নিতে পারেন।
সাংগ্রাই : বৈসাবি উৎসবের 'সা' আদ্যক্ষরটি মারমাদের 'সাংগ্রাই' উৎসব থেকে নেওয়া। মারমাদের অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব হলো সাংগ্রাই। মারমারা সাধারণত মঘীসনের চান্দ্র মাস অনুসারে দিনটি পালন করে থাকে। বছরের শেষ দুই দিন নববর্ষের প্রথম দিন পালিত হয় এ উৎসব। সাংগ্রাই উৎসব উদ্যাপনের সময় মারমা যুবক-যুবতীরা পিঠা তৈরি করার জন্য চালের গুঁড়া প্রস্তুত করে। এ সময় 'পানিখেলা' হয়। সাংগ্রাই উৎসব এবং পানিখেলা এখন একে অপরের সমার্থক হয়ে গেছে। এ খেলার সময় এক নির্দিষ্ট স্থানে পানি রেখে যুবক-যুবতীরা একে অপরের দিকে তা ছুড়ে মারে। এ সময় কে কাকে কত ভিজিয়ে দিতে পারে এ নিয়ে হয় প্রতিযোগিতা। এ ছাড়া এই দিন মারমারা বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে ধর্মীয় বাণী শ্রবণ করে। এ ছাড়া ঘিলার বিচি দিয়ে 'ঘিলা খেলা'ও এ সময় মারমাদের একটি প্রিয় খেলায় পরিণত হয়। সংক্রান্তি শব্দ থেকেই সাংগ্রাই শব্দটি এসেছে বলে দাবি সমাজবিজ্ঞানীদের। মারমাদের সাংগ্রাই উৎসবকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাণের আনন্দে যোগ দিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ পাহাড়ে আসে। প্রতিবছর মারমা অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে কেন্দ্রীয়ভাবে পানিখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর আকর্ষণীয় এই আয়োজনটি হবে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া মাঠে। মারমা সাংস্কৃতিক সংস্থা (মাসাস) আয়োজনটির তত্ত্বাবধান করে থাকে।
বিজু : পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় নৃতাত্তি্বক জনগোষ্ঠী হলো চাকমা। বিজু তাই এখানে এনে দেয় এক অন্য রকম অনূভূতি আর মোহনীয় আবেশ। এ উৎসবের সঙ্গে তাই যেন দুলে উঠে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম। প্রথম দিনকে চাকমারা বলে 'ফুলবিজু'। এ দিন বিজুর ফুল তোলা হয় এবং ফুল দিয়ে ঘর সাজানো হয়। পরে সে ফুল দিনান্তে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বিজুর সময় ছোট ছেলেমেয়েরা পরিচ্ছন্ন কাপড় পরে দলবেঁধে বাড়ি বাড়ি বেড়াতে যায়। তারা সবাই বয়স্কদের সালাম করে এবং ঘরের হাঁস-মুরগিকে ধান চাল ছিটিয়ে খাওয়ায়। এ সময় ঘরে ঘরে রান্না করা হয় 'পাজোন' নামের এক বিখ্যাত খাবার। হরেক রকম সবজি আর তরকারির সমন্বয়ে রান্না করা এ খাবারটি এই উৎসবে সবার প্রিয় খাবার হয়ে ওঠে। গ্রাম্য ছেলেমেয়েরা ঘিলা খেলা, গুদু (হাডুডু) খেলায় মেতে উঠে আর আকাশ প্রদীপ জ্বালায়। বয়স্করা মদ 'জগরা' বা 'কাজ্ঞি' পান করে। বিজু উৎসবের সময় কোনো প্রাণী হত্যা করা হয় না। তবে নববর্ষের দিন মাছ-মাংসসহ মজার মজার সব খাবারের আয়োজন থাকে। কেননা এই দিন ভালো কিছু খেলে সারা বছর ভালো খাবার-দাবার করার সম্ভাবনা থাকে বলে তারা বিশ্বাস করে। বছরের শেষ দিন ব্যাপক আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর উন্মাদনার পর বিজুর শেষ দিন মানে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন অনেকটা ঘরে বসে আড্ডা আর ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয় চাকমারা। এই দিনকে তারা গোজ্যাপোজ্যা বা বিশ্রামের দিন বলে।

রাঙ্গামাটি

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে