Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট, ২০১৯ , ৫ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (12 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-০৮-২০১২

পদদলিত

মীজান রহমান


পদদলিত
এক

  সেদিন জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের সামনে ভিড়ের ঠেলায় লোকজনের পায়ের নিচে চাপা পড়ে মারা গেলেন এক ভদ্রমহিলা।
  পায়ের নিচে চাপা পড়াটা নতুন কিছু নয়। অতিরিক্ত পা যেখানে সেখানে এমন দু’চারটে মৃত্যু দুর্ভাগ্যজনক হলেও অভাবনীয় নয়। পৃথিবীর বহু দেশে, জনবাহুল্যময় দেশে, বহুবারই এরকম ঘটনা ঘটেছে। জনবহুল না হলেও ঘটে অনেকসময়। জলের দামে জিনিস বিক্রি হলে উন্নত-অনুন্নত সব মানুষই সমান বেগে ছোটে যাতে তার সখের জিনিসটা হাত করতে পারে সবার আগে। খেলার মাঠেও মাঝে মাঝে এরকম পাগলা দৌড় হয়ে থাকে, যাতে কেউ না কেউ চাপা পড়ে কারো-না-কারো পায়ের তলায়।
  কিন্তু জোহানেসবার্গের সেই মহিলাটি কোনও পণ্যের পেছনে ছোটেননি, খেলার মাঠে তো অবশ্যই না।
  জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় অনেকটা আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত---আন্তর্জাতিক দাড়িপাল্লাতে স্থান হয়ত তার একেবারে তলার দিকে, কিন্তু জাতীয় বিচারে তার অবস্থান সাত আসমানের ওপর। বাইরের জগতে যতই হাস্যকর হোক নিজের দেশে সে ‘অক্সফোর্ড’ আর ‘হার্ভার্ড’। সেখান থেকে ডিগ্রি করলে চাকরি হতে পারে, নইলে হবে না। এবং চাকরি ছাড়া গরিবের ঘর অন্ধকার। সেজন্যেই ওখানে ভর্তি হওয়া এত জরুরি।
  সেদিনকার ঘটনাটা ছিল এরকম।
  ভর্তির সময় আসন্ন। স্কুল-থেকে-ভালো-রেজাল্ট-করা ছেলেমেয়েদেরই ভর্তির অধিকার কেবল। নম্বর কম হলে কোনও খাতির নেই----৭৪,০০০ ছাত্রছাত্রীর দরখাস্ত ইতোমধ্যেই খারিজ হয়ে গেছে। জোর প্রতিযোগিতা। ‘অনলাইন’এ ভর্তির ব্যবস্থা ছিল। সে সুযোগ অনেকেই গ্রহণ করেছিল। কিন্তু অনলাইনে ভর্তি হতে কম্পিউটার লাগে, ইন্টারনেট লাগে। দক্ষিণ আফ্রিকায় সবার সে সঙ্গতি নেই। যেমন নেই আমাদের বাংলাদেশে। তাদের ছেলেমেয়েদের ভর্তির উপায় একটাইঃ নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী অফিসের সামনে গিয়ে লাইন করে দাঁড়ানো, তারপর ফর্ম পূরণ করে, টাকাপয়সার লেনদেন চুকিয়ে, ভর্তির খাতায় নাম লেখানো। কম্পিউটার যখন ছিল না, খুব বেশিদিনের কথা নয় সেটা, তখন এভাবেই সবাই ভর্তি হত স্কুলকলেজে। ধনীগরিব নির্বিশেষে। এখন শুধু ধনী পরিবারের ছেলেমেয়েরাই ভর্তি হয় ‘অনলাইন’এ, আর গরিবরা দাঁড়ায় লম্বা লাইনে। অনেক সময় গ্রাম থেকে গোটা পরিবার চলে আসে ছেলেকে বা মেয়েকে কলেজে ভর্তি করাতে। তাদের অধিকাংশই দিনমজুর, বা স্বল্পবিত্ত কৃষিজীবি পরিবার। দিন আনে দিন খায়। দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মাসিক আয় ত্রিশ ডলারেরও কম। তাদের অতীত ও বর্তমান দুইই সমান অন্ধকার। একমাত্র ভরসা, একটি মাথাওয়ালা সন্তান। তাকে যদি কোনক্রমে জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো যায় তাহলেই ভাগ্যের চাকা কিঞ্চিত্ ঘুরে যাবার সম্ভাবনা, নইলে নয়। সে হল তাদের ভবিষ্যতের ইন্সুরেন্স পলিসি ।
  তাই তারা ভর্তির আগের দিন, কিম্বা তারও আগে, দূর দূর গ্রাম থেকে বোঁচকাপত্র নিয়ে চলে আসে শহরে। থাকার জায়গা নেই (হোটেলে থাকার প্রশ্ন তো রীতিমত হাস্যকর) বলে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে তাঁবু গেড়ে সময় কাটায় যাতে ভর্তির সময় কাছিয়ে এলে দরজা খোলার আগেই লাইনের সামনে গিয়ে উপস্থিত থাকতে পারে। কিন্তু গরিবের মার সবদিকে। প্রথমত ‘অনলাইন’ওয়ালারা আগে থেকেই অধিকাংশ সিট দখল করে নিয়েছে, বাদবাকিদের জন্যে রয়েছে ক্ষুদকুড়া----সর্বকুল্যে ৫০০ টি সিট। সেই ৫০০ সিটের জন্যে লাইন দিয়েছে কম করে পাঁচ হাজার ছাত্রছাত্রী। সুতরাং ওদের প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল ‘অনলাইন’ নয়, নিজেদের আপনজনেরাও। ‘অনলাইন’রা ভিড় করে কম্পিউটারের গেটে, দরিবের ছেলেমেয়েরা করে লোহা বা কাঠের গেটে। এবং সে ভিড়ের ধাক্কা প্রতিদিন সহ্য করেতে হয় সমাজের সবচেয়ে দুর্বল যারা তাদের।
  জোহানেসবার্গের সেই অভাগা মহিলা তাঁর ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন শত শত মাইল দূরবর্তী কোনও অজানা গ্রাম থেকে। বেচারি গেটের ভেতরে ঢুকে অফিস পর্যন্ত যেতে পারেননি। তার আগেই তাঁর গায়ের ওপর দিয়ে প্রবলবেগে ছুটে গেল এক অন্ধ, ক্ষুব্ধ, উণ্মত্ত জনস্রোত।

                                  দুই

  জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শোচনীয় ঘটনাটির পাশাপাশি এবার একটি ভিন্নপ্রকৃতির লাইনের দৃশ্য দাঁড় করানো যাক। চীনের কোনও বড় শহরের অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ এলাকার ঘটনা। আধুনিক ‘বিশ্বায়িত’ পৃথিবীর সবটুকু সুযোগ সুবিধা প্রায় পূর্ণভাবে ভোগ করার সৌভাগ্য হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। একদিন দেখা গেল সেখানেও লোকে লোকারণ্য। কোনও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদায়ালয় প্রাঙ্গনে নয়, একটা দোকানের সামনে। সাধারণ দোকান নয়, বহুজাতিক বিশ্বের বহুজাতীয় বাণিজ্যের দোকান। আপেল কোম্পানির হাইটেকের দোকান। তারা নতুন ফোন বের করেছে----iPhone 4. তার জন্যে রাত বারোটা থেকে লাইন লাগিয়েছেন আলালের ঘরের দুলালেরা। সকালে দোকান খোলার আগে লাইন বড় হতে হতে শহরের শেষ মাথায় গিয়ে ঠেকবার অবস্থা। প্রাচ্যের ভিড় পশ্চিমের পোষা বেড়ালের মত শান্তশিষ্ট নয়। তারা একটুতেই ক্ষেপে যায়, একটুতেই কথা কাটাকাটি শুরু করে, তারপর হাতাহাতি হতে হতে কিলঘুষি পর্যন্ত চলে যায়----কখনোবা তার চেয়েও গুরুতর অবস্থা সৃষ্টি হয়। যাকে বলে গরম দেশের গরম মেজাজ। বারুদের সামনে যেন দেশলাইর কাঠি সবসময়ই প্রস্তুত।
  ‘আপেল’এর নতুন ফোন কেনার নেশায় এমনই পাগল হয়ে গেল জনতা যে গেট খোলার আগেই লেগে গেল তুমুল ঘাপলা----কে কার ঘাড় টপকে কার আগে বাগাতে পারে তার পছন্দের মডেলটি। যেন পুরো জীবনটাই নির্ভর করছে সেই মডেলটার ওপর----না পেলে বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন হয়ে যায়। এর চেয়ে বড় প্রতিযোগিতা আর নেই তাদের জীবনে। সৌভাগ্যবশত ‘আপেল’এর ভিড়ে পায়ের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারাতে হয়নি কাউকে, কারণ অবস্থা সুবিধার নয় দেখে দোকানের বুদ্ধিমান কর্মকর্তারা সাময়িকভাবে বেচাকেনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন (যদিও সেটা যে খুব বিচক্ষণতার পরিচয় তা নয়, কারণ বিক্ষুব্ধ জনতা অনায়াসে দোকান লুটপাট করে সব খালি করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারত)। জোহানেসবার্গের বিশ্ববিদ্যালয় গেটে সেটা সম্ভব হয়নি, কারণ সেখেনে বিক্রির জিনিস ছিলনা কিছু, ছিল গরিব ছেলেমেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে ঠেলাঠেলি। ওতে লোকের প্রাণ যেতে পারে বটে, কারণ ওসব প্রাণের মূল্য অতি সামান্য।
  প্রাণ যাক বা না যাক, দোকানের ভিড় কেবল অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমন ধারণা যেন পোষণ না করেন কেউ। ঠাণ্ডার দেশ বলে শীতপ্রধান ‘উন্নত’ দেশের লোকেরা যে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখতে পারেন সবসময় তা নয়। লোকসংখ্যা যখন একটু কম ছিল আগে তখন হয়ত অতটা সমস্যা ছিল না, কিন্তু এখন তো ভিড় সবখানে। অতএব মেজাজমশায়ও একটু বেয়াড়া হয়ে যায় মাঝে মাঝে। ক্যানাডাতে তেমন নয় যেমন আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে Black Friday বলে একটা নতুন বুলি বেরিয়েছে, যার সঙ্গে ভিড়ের ঠেলা কাকে বলে তার একটা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। বিষয়টি হয়ত সবার জানা নয়।
  প্রতিবছর নভেম্বরের শেষ বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের Thanksgiving Day. সেদিন সারা দেশের ছুটি। অনেক ক্ষেত্রে তার পরের দিনও। তবে বড় বড় ব্যবসায়ীদের জন্যে পরের দিনটিই হল সবচেয়ে মুনাফার দিন----বছরের ধূম বিক্রি ঐ দিনটিতেই। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী সেদিন সব দোকানেই জিনিসপত্র অন্তত অর্ধেক দামে বিক্রি হয়, অনেক ক্ষেত্রে তারও কম। এর নাম ‘থাঙ্কসগিভিং সেল’। আধুনিক পণ্যজীবি সমাজে ‘সেল’ শব্দটি অনেকটা পাইড পাইপারের বাঁশির মত----আওয়াজ শোনামাত্র ছেলেবুড়ো, খোকাখুকি, গরিবধনী----বিশেষ করে গৃহবধূরা চোখ বুঁজে ছুটতে শুরু করে সেদিকে। থ্যাঙ্কসগিভিং ফ্রাইডেতে সেটা চরম মাত্রায় পৌঁছায়। ক্রেতারা অনেক সময় আগের রাত থেকে বসে থাকেন দোকানের সামনে----সেই চাইনিজ আইপড-ক্রেতাদের মত। এত ভিড় হয় কোন কোন দোকানে যে বাড়তি পাহারাদার লাগিয়েও ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়না অনেক সময়। ‘ভিড়’ বলতে বোঝায় ব্যক্তিসমষ্টি। কিন্তু অতিরিক্ত ভিড় হয়ে গেলে তারা আর ব্যক্তি থাকে না, তারা নিজেদের ব্যক্তিত্ব বর্জন করে ভিড়ের ব্যক্তিত্ব ধারণ করে। এটাকে আমি বলি ‘মব কালচার’। অত্যন্ত সহজ সরল শান্তশিষ্ট মানুষও তখন ভিড়ের ভয়াল মূর্তিতে পরিণত হয়। বুনো শেয়ালের ‘প্যাক’ যেমন। একরকমের প্যাক মানসিকতা। থাঙ্কসগিভিং ফ্রাইডেকে আজকাল ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ বলেই চেনে অধিকাংশ মানুষ, কারণ গত দুচারবছরে সেলের দোকানগুলোতে ভিড়ের ঠেলায় বেশ কিছু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। তাতে করে এমন একটা ধারণা জন্মে গেছে মানুষের যে থ্যাঙ্কসগিভিং ফ্রাইডেতে একটা-না-একটা অঘটন ঘটবেই। দোকানের দরজা খোলার সাথে সাথে লোকজন এমন পাগলের মত ছুটতে শুরু করে যে সেই ছোটার সঙ্গে স্পেন বা মেক্সিকোর ষাঁড়ের দৌড়ে খুব একটা তফাত্ নেই।
  আসলে ভিড়ের কোনও প্রথম বিশ্ব-তৃতীয় বিশ্ব বলে কিছু নেই। ভিড় সবদেশেই এক। ভিড় একপ্রকার হিংস্র জন্তু।

                                   তিন                                

  জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে যে ভিড়ের তলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন সেই অভাগিনী মা, তার সঙ্গে চীনের আইফোন কোম্পানির সামনে জমাট হওয়া ভিড় আর আমেরিকার ব্ল্যাক ফ্রাইডের বেসামাল ভিড়ের একটা বাহ্যিক সাদৃশ্য থাকলেও এগুলোর মৌলিক প্রকৃতি কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। চীন আর আমেরিকার ভিড় হল অপেক্ষাকৃত সচ্ছল, শিক্ষিত, আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেনীর পণ্যভোগী চরিত্রের লোকেদের। চীনের আইফোনক্রেতারা সম্ভবত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির নেশাতে আপাদমস্তক নিমজ্জিত। আমেরিকার সেলের দোকানেও অনেকটা তাই----এই ক্রেতাদেরও হয়ত প্রধান লক্ষ ইলেক্ট্রনিক দ্রব্যাদি----টিভি, ভিসিআর, ক্যামেরা, ভিডিও, স্মার্টফোন, ব্ল্যাকবেরি, ল্যাপটপ কম্পিউটার। বেশিদিন আগের কথা নয় যখন আমরা ভাবতাম এগুলো সব বিলাসদ্রব্য---বড়লোকের সখের খেলনা। কিন্তু এখনকার মধ্যবিত্ত জীবনে এগুলো বিলাসদ্রব্য নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয়। ফ্রিজ, রেঞ্জ, এসি, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, গাড়ি, এগুলোর মত প্রয়োজনীয় দ্রব্য। একেবারে না হলেই নয়। গরিবের ঘরে নিত্যপ্রয়োজনীয় বলতে কি বোঝায়? বাচ্চার দুধ, দুবেলার খাবার, শীতের কাপড়, স্কুলের বইখাতা, মাথার ওপরে টিনের চাল। কম্পিউটার তাদের জন্যে অনাবশ্যক বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়----ওটি তাদের নাগালের বাইরে। তাই তাদের ছেলেমেয়েরা অনলাইনে ভর্তি হতে পারে না। অনলাইনে পত্রিকা পড়তে পারে না, জানতে পারে না বাইরের বিশ্বের খবরাখবর। তারা ই-মেইল কাকে বলে জানে না, ফেসবুকের নামও হয়ত শোনেনি, ব্লগ টুইটার ওয়েব এগুলো সব দুর্বোধ্য বিদেশী শব্দ যার মাথামুণ্ডু তারা বোঝে না। তাদের জন্যে লাইনে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় নেই।
  আধুনিক প্রযুক্তি এযুগের মানুষকে পরিষ্কার দু’ভাগে ভাগ করে দিয়েছেঃ হয় অনলাইন, নতুবা লম্বা লাইন।
  কিংবা হয়ত আমারই ভুল। প্রবীনরা তো বরাবরই এরকম। রক্ষণশীল, প্রগতিভীরু, প্রতিক্রিয়াপ্রবণ। তাদের জন্যে ‘আগেকার যুগ’এর মত যুগ হয় না। তাদের বিচারে বর্তমান যুগ সবসময়ই কলিযুগ। হতে পারে যে আমি নিজেও সেই বৃদ্ধের ছানিপড়া দৃষ্টিতে দেখছি বর্তমান প্রযুক্তিকে। নিজের স্থানকালের এই সীমাবদ্ধতা আমি সবিনয়ে স্বীকার করে নিচ্ছি।
  তবু, বাস্তবতা বলে একটা কথা আছে। চোখের সামনে যা ঘটে যাচ্ছে তাকে তো আর না-দেখার ভাণ করা যায় না। কিছুদিন আগে আমেরিকার এক বড় কলকব্জার কোম্পানিতে শ্রমিক ইউনিয়ান ধর্মঘট ঘোষণা করলেন। ধর্মঘট তো একসময় অহরহই ঘটত এদেশে---নতুন কিছু নয়। নতুন ছিল এ ধর্মঘটের ধরণটি। সাধারণত শ্রমিকরা ধর্মঘট করে বেতনবৃদ্ধির দাবিতে, বা ভাল পেনশন, ভাল চিকিত্সা, ছুটিছাটা, ইত্যাদির দাবিতে। কিন্তু এবারের দাবি এসবের কিছুই নয়। এবার তাদের অভিযোগঃ অতিরিক্ত আধুনিকায়ন, অর্থাত্ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের কারণে শ্রমিক সংখ্যা কেবলি ছাঁটাই করছেন বড়কর্তারা। যতই দিন যাচ্ছে ততই মুনাফালোভী মালিকরা শ্রমিক সরিয়ে যন্ত্র ব্যবহার করছেন। কোম্পানিটা এত বিশাল যে ব্যাপারটা লোকের চোখে পড়েছে।
 কিন্তু এই যে মানুষের-বদলে-যন্ত্রের ব্যবহার, এটি নতুন কিছু নয়। এমনকি কম্পিউটার যুগেরও একক কোনও বৈশিষ্ট্য নয়। মালিকদের চিরকালই এই প্রবণতা। ব্যবসার খরচ কমাতে হলে প্রযুক্তি বাড়াতে হবে যাতে মানুষ কমানো যায়। আমি বলছি না যে এটা কোনও নিন্দনীয় নীতি, মোটেও না। আমি ব্যবসায়ী হলে হয়ত ঠিক একই কাজ করতাম। সব ব্যবসারই অন্তত তিনটি দিক আছে। একঃ যারা পয়সা খাটায়, অর্থাত্ অর্থ বিনিয়োগকারী মহাজন গোষ্ঠী। দুইঃ উত্পাদক, মানে গায়েখাটা শ্রমিক। তিনঃ খরিদ্দার, যারা সেই উত্পন্ন দ্রব্য ক্রয় এবং ব্যবহার করেন। প্রযুক্তির ব্যবহার দ্বারা উত্পাদনের মান ও গতড় বৃদ্ধি পায়, সাথে সাথে বিক্রয়মূল্য হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। সব ব্যবসার প্রায় একই ধর্ম। প্রশ্ন হল তার মাত্রা, তার ভারসাম্য, যার ওপর নির্ভর করে সার্বিক সামাজিক কল্যান, সমাজের সাধারণ সুখস্বচ্ছন্দ্য। এই সার্বিক কল্যানকে লক্ষ্য রেখে গত একশ’ দেড়শ’ বছরে শ্রমিক-মালিকের পারস্পরিক সম্পর্কের একটা গ্রহণযোগ্য বোঝাপড়া সৃষ্টি হয়ে আসে----শ্রমিকের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিক, মুনাফার একটা যুক্তিসঙ্গত অংশ শ্রমিকের প্রাপ্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া। অনেক সংগ্রাম, অনেক সাধ্যসাধনা করে এগুলোর অনেকটাই তারা আদায় করে নিয়েছিল গত শতাব্দীর পঞ্চাশ আর ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে। পশ্চিম বিশ্বের প্রাচুর্য ও সুখস্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। ধনীদরিদ্রের বৈষম্য আগের চেয়ে অনেক কমে যায়।
   কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই যে এই বৈষম্য মোচনের প্রয়াসে শ্রমিক ইউনিয়ানগুলোর অবদান অসামান্য। বর্তমান যুগে লোকজন হয়ত শ্রমিক ইউনিয়ানের নাম শুনলেই বিরক্ত হয়ে ওঠে। অনেকে ধরেই নেয় যে ইউনিয়ান মানে গুণ্ডাপাণ্ডাদের আখড়া, মাফিয়ার  চোখের ইশারাতে তারা উঠাবসা করে। নিজেদের স্বার্থ আদায়ের জন্যে তারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি রেখে যখন তখন স্ট্রাইক ঘোষণা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। ইত্যাদি ইত্যাদি। হতে পারে যে ইউনিয়ানের ক্ষমতাবান নেতারা আজকাল সত্যি সত্যি খুব একটা তোয়াক্কা করে না পাব্লিকের সুবিধা অসুবিধার কথা, নিজেদের পেট মোটা হলেই তারা খুশি, পাব্লিক আর দেশ জাহান্নামে যায় যাক, তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। ওদের হালচাল দেখলে মাঝে মাঝে আমারও যে তা মনে হয়না তা নয়। কিন্তু ওরকম চূড়ান্ত রায় দেবার আগে ঠাণ্ডা মাথায় একটু ভাবলেই দেখা যাবে যে কোন কোন ইউনিয়ানের ওই ধরণের থোরাই-কেয়ার-করা ভাব থাকলেও সবাই তা নয়, এমনকি বেশির ভাগ ইউনিয়ানই সম্ভবত সেরকম মনোভাব পোষণ করে না। অধিকাংশ সময়ই ওদের দাবি দাওয়ার একটা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি থাকে, যা আমরা বাইরে থেকে সবসময় বুঝতে পারিনা, না বুঝে ওদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি। উত্তর আমেরিকার শ্রমিক সংগ্রামের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যাবে যে ওই ইউনিয়ানগুলোর অক্লান্ত, নিরাপস সংগ্রামের কারণেই এদেশের সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে আজকে এত স্বাচ্ছল্য, এত প্রাচুর্য।
  এই রক্তক্ষরণ আস্তে আস্তে, প্রায় অলক্ষ্যে, শুরু হয় বলতে গেলে সত্তর দশক থেকেই। প্রথমত ভিয়েতনামে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতির নাকানি চুবানি। তারপর আশির দশকে পৃথিবীর দ্বিতীয় মহাশক্তির সমপরিমান লাঞ্ছনা আফগানিস্তানের মত একটি নগণ্য দেশের কাছে। এদুটি ঘটনার গুরুত্ব হয়ত বিজ্ঞজনেরা এখনো পুরোপুরি মূল্যায়ন করে উঠতে পারেনেনি। আমার ব্যক্তিগত মতে, এই অভাবনীয় ও অপ্রত্যাশিত ঘটনাদুটি একসাথে মিলে পৃথিবীর পরিচিত চেহারাটি আগাগোড়া বদলে দিয়েছে পরবর্তী দশকগুলোতে। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েট ইউনিয়ানের পতন ও পরাজয় পশ্চিম বিশ্বে উত্সবের জোয়ার তুলেছিল ঠিকই, হয়ত তৃতীয় বিশ্বেও অনেকেই খুশিতে বাগবাগ হয়েছিলেন, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল তৃতীয় বিশ্বকে যতটা ঘায়েল করেছে, এমনকি প্রকারান্তরে প্রথম বিশ্বকেও, তারও পূর্ণ মূল্যায়ন হতে আরো অনেক সময় লাগবে।
  ইতিমধ্যে আরো কিছু ঘটনা আধুনিক মানুষের জীবনে জটিলতার মাত্রা শতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথমত প্রযুক্তি ও তথ্যবিজ্ঞানের বিপুল সম্প্রসারণ---বিস্ফোরণ বললেও অত্যুক্তি হয়না। আশির দশকে ব্যক্তিগত কম্পিউটার (পি সি), নব্বুইতে আন্তর্জাল ও মুঠোফোন, শতাব্দী যেতে-না-যেতেই উপস্থিত আরো হাজারটে খেলনা----ব্লগ, টুইটার, টেক্সটিং, ফেইসবুক। আধুনিক মানুষ সারাক্ষণ যন্ত্রের সাথে সংযুক্ত, সারাক্ষণ একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত। সংযুক্ত তারা নয় কেবল প্রতিবেশিদের সঙ্গে, এমনকি নিজের পরিবারের সঙ্গেও----সে সময়টাও যেন তাদের নেই। অনেক সময় দেখা যায় বাবামা আর ভাইবোনেরা একই বাড়িতে বাস করা সত্ত্বেও তাদের সামনাসামনি দেখাসাক্ষাত্ ঘটে কচিত্ কদাচিত্। যোগাযোগের প্রয়োজন হলে উপরতলা থেকে নিচে নামার পরিবর্তে হয়ত টেক্সটিং করে যা বলার বলে ফেলা হয়। সেকালের তথাকথিত ‘নিউক্লিয়ার’ ফ্যামিলিতে একরকম ‘ফিশন’ধরেছে যেন। যন্ত্র বলতে গেলে আধুনিক মানুষের জীবন দখল করে নিয়েছে। এবং সেটা এমন নিপুনভাবে ঘটেছে যে সাধারণ মানুষ টেরই পাচ্ছে না যে তার অস্তিত্বের প্রায় পুরোটাই এখন যন্ত্রের কাছে জিম্মি। এই পরাক্রান্ত দানবের সাথে আদিকালের সাধারণ শ্রমিকের কায়িক শক্তির কোনও তুলনাই হয় না।
  মরার ওপর খাড়ার ঘা বলে একটা কথা আছে। ‘খাড়া’র বদলে ‘মুগুর’ও ব্যবহার করা যেতে পারে। এই মুগুরের ঘা’টি এসেছে বিশ্বজুড়ে যখন ‘বিশ্বায়ন’এর হিড়িক পড়তে শুরু করে। প্রথ, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিশ্ব----সব বিশ্বই তখন একসাথে মিলে, বা এক বিছানায় শুয়ে, এক অদ্ভুত ট্যাঙ্গো নৃত্যে( কিংবা এক অবিশ্বাস্য রমণলীলাতে) মত্ত হয়ে গেল। পশ্চিমের পণ্য প্রাচ্যে, প্রাচ্যের পণ্য প্রতীচ্যে। পশ্চিমের বণিক প্রাচ্যের সস্তা শ্রমের বাজারে পেলেন সোনার খনি, আর প্রাচ্যের উচ্চাকাঙ্খী তরুণতরুণী দেখলেন, এই সুযোগে যদি ছোটবেলার সাধের স্বপ্নগুলো সিদ্ধ হয়ে যায়। বাড়িগাড়ি, সোনাজহরত, ছুটিছাটায় সমুদ্রসৈকত, ছেলেমেয়েদের ইংরেজি স্কুল, আইভি লীগ কলেজে পড়াশুনা, তারপর নিশ্চিন্ত স্বচ্ছন্দ অবসর। আর কি চাই জীবনে। দুঃখের বষয় যে দুএর মাঝখানে চাপা পড়ে পিষ্ট হতে লাগল সেই অভাগা শ্রেনীটি---গায়েখাটা শ্রমিক। প্রাচ্যের শ্রমিক পশ্চিমের ক্ষুদকুড়ো কুড়িয়েই যেন পরম কৃতজ্ঞ, আর পশ্চিমের সাধারণ শ্রমিক বেকারভাতার জন্যে সরকারের করুণাপ্রার্থী। আগে, যখন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ছিল না, যখন বিশ্বায়ন ছিল না, যখন অর্থ আর শ্রমের অবাধ চলাচল ছিল না এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে, তখন শ্রমিকের সম্মান ছিল, তার শ্রমের মূল্য ছিল। এখন সে অসহায়----তার কোনও বন্ধু নেই। সে এতিম। এখন সে ধনকুবেরদের কৃপার ওপর নির্ভরশীল। এখন সে তাদের আজ্ঞাবহ কৃতদাস।
  এই যে বিভাজন, এই যে শ্রেনীতে শ্রেনীতে পুরাতন দ্বন্দ্বের পুনরাবির্ভাব, এই বিভাজন বড় সূক্ষ্ণ, বড় মসৃণ। বন্ধুর বেশে এ এক অব্যর্থ মারণাস্ত্র।
  জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, চীনের প্রযুক্তি বিপণি, আর আমেরিকার ব্ল্যাক ফ্রাইডে---সবই সেই একই বিভাজনের ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

অটোয়া

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে