Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২৪ জুন, ২০১৯ , ১০ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.7/5 (27 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-০৮-২০১৫

কেলেঙ্কারির গুজবেই পদত্যাগ মিজান চৌধুরীর

নঈম নিজাম


আওয়ামী লীগের বর্তমান মেয়াদের সরকারের অনেক কিছু প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বিশ্ব বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো বিকল্প নেই। আমরা উজ্জ্বল ভাবমূর্তির আওয়ামী লীগকে দেখতে চাই। কারণ বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। কারও জন্য এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চলছি। এটা এখন আর স্বপ্ন নয় বাস্তব। এই সত্য, এই বাস্তবকে ধরে রাখতে হবে।

কেলেঙ্কারির গুজবেই পদত্যাগ মিজান চৌধুরীর

মিজানুর রহমান চৌধুরী তখন তথ্যমন্ত্রী। আর দেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু একদিন তলব করলেন তথ্যমন্ত্রীকে। অভিযোগ গুরুতর। অভিনেত্রী সুচন্দা কয়েক দফা দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন মিজান চৌধুরীর সঙ্গে। এ নিয়ে কেবিনেটে কানাঘুষা। মিজান চৌধুরী দীর্ঘ ব্যাখ্যায় গেলেন না। অভিযোগ শুনেই তিনি মন খারাপ করলেন। বঙ্গবন্ধুর সামনে বসেই পদত্যাগপত্র তৈরি করলেন। পেশ করলেন। বের হয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। যাওয়ার সময় সরকারি গাড়িও নেননি। পায়ে হেঁটে বের হন আওয়ামী লীগের ষাটের দশকের দুঃসময়ের কাণ্ডারি। '৭৫ সালের পরও আবার আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে রয়েছে তার অবদান। যদিও পরে শুরু করেন মালেক উকিলের সঙ্গে বিভক্তির রাজনীতি। ব্যক্তিগতভাবে মিজানুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। তার গুলশানের বাড়িতে চলে যেতাম যখন তখন। বাধা ছিল না। গেলেই তার ব্যক্তিগত সহকারী আবুল নিয়ে যেতেন সোজা বেডরুমে। নেতা-কর্মী, সমর্থক, সাংবাদিক সবার অবাধ যাতায়াত ছিল তার বেডরুমে। সেখানে লুঙ্গি পরে আরাম করে তিনি বসতেন। কথা বলতেন সবার সঙ্গে। ভোরে দেখা যেত পাশে স্ত্রী শুয়ে আছেন এর মধ্যে তিনি কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতেন। গণমানুষের নেতার চরিত্র ছিল তার মাঝে।

বঙ্গবন্ধুর শাসনকালের পদত্যাগ নিয়ে একদিন তাকে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি হাসলেন। বললেন, স্বাধীনতার পর আমি তথ্যমন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট সবাই তথ্যমন্ত্রীর কাছে সমস্যা নিয়ে আসবেন এটাই স্বাভাবিক। অভিনেত্রী সুচন্দাও এসেছিলেন সচিবালয়ের অফিসে। কারণ তার স্বামী জহির রায়হান নিখোঁজ। বড় ভাই সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়েই নিখোঁজ হন জহির রায়হান। স্বামীর সন্ধানে দিশাহারা সুচন্দা। বলা যায় এক ধরনের অসহায় অবস্থা। এ সময় তিনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্বামীর সন্ধানে সহায়তা চান। সন্তানদের নিয়ে তার থাকার সমস্যার কথাও বলেন। শুধু সুচন্দা নন, এ ধরনের সব পরিবারই তখন আমার কাছে আসতেন। তাদের সুখ-দুঃখ জানাতেন। মন্ত্রী হিসেবে আমি সহায়তার চেষ্টা করতাম। একজন মন্ত্রীর কাছে একজন অভিনেত্রী আসেননি, এসেছিলেন জহির রায়হানের স্ত্রী।

কেবিনেটে আমার এক কলিগ এ বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেননি। রঙ লাগিয়ে ছড়িয়ে দেন চারদিকে। দু-চার কান হয়ে বঙ্গবন্ধুর কানেও যায় বিষয়টি। বঙ্গবন্ধু ডেকে বসেন মিজান চৌধুরীকে। এরপরই পদত্যাগ। পরে বঙ্গবন্ধু গোয়েন্দা রিপোর্টে জানলেন, ঘটনাটি সত্য নয়। সুচন্দার সঙ্গে মিজানুর রহমান চৌধুরীর কোনো সম্পর্ক ছিল না। এক-দুবার দেখা-সাক্ষাৎ কাজের তাগিদে। আমি মিজানুর রহমান চৌধুরীকে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি জানতেন ঘটনা সত্য নয়। তারপরও পদত্যাগ কেন করলেন। জবাবে তিনি বললেন, মিজান চৌধুরীর কাছে পদপদবি বড় নয়। মুজিব ভাই জাতির জনক। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। দলের দুঃসময়ে তার নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছি। তিনি ডেকে বিষয়টি জানতে চেয়েছেন। মনে হয়েছিল, আমার থাকা ঠিক হবে না। তাছাড়া নিরপেক্ষ তদন্তেরও দরকার। আমি মন্ত্রী থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত ব্যাহত হতে পারে। নিরপেক্ষ তদন্তে পরে প্রমাণ হয়েছিল কেবিনেট কলিগদের প্রচারণার শিকার আমি।

নারীবিষয়ক আরেকটি ঘটনা ছিল খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদের মন্ত্রিসভায়। মানে '৯১-৯৬ মেয়াদের কথা বলছি। কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন তখন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী। পরিবেশ সম্মেলনে যোগ দিতে মন্ত্রী এক সুন্দরী নারীকে নিয়ে যাচ্ছিলেন বিদেশ। বেরসিক ইমিগ্রেশন পুলিশ আটকে দেন সেই নারীকে। কারণ মন্ত্রীর স্ত্রী ফোন করে ইমিগ্রেশনকে বলে দিয়েছেন, এই নামের কেউ যেন বিদেশ যেতে না পারে। মন্ত্রীও কম যান না। তিনি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হৈচৈ শুরু করেন। একপর্যায়ে সেই নারীকে নিয়ে বিদেশ গেলেন মন্ত্রী। ভোরের কাগজে তখন কাজ করি। বিমানবন্দর থেকে একজন ফোন করে বিষয়টি আমাকে জানান। আমি ভোরের কাগজে রিপোর্ট করি। মহাবিপত্তি বাধে। সফর শেষ করে দেশে ফেরার পর আকবর হোসেনকে ডেকে নেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। অনুরোধ জানান, পদত্যাগ করতে। আকবর হোসেন বললেন, আমি পদত্যাগ করব না। আপনিও আমাকে বাদ দেবেন না। বেগম খালেদা জিয়া থতমত খান। বিষয় কি বোঝার চেষ্টা করেন। আকবর হোসেন প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, এই নারী পর কেউ নন। গোপনে বিয়ে করেছি। তিনি আমার দ্বিতীয় স্ত্রী। তাই শরিয়ত মোতাবেক আপনি আমাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও বাদ দিলেন না তার মন্ত্রী আকবরকে। প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে বের হয়ে আকবর হোসেন ফোন করেন কুমিল্লার আরেক এমপিকে। এই এমপির মাধ্যমেই সেই নারীর সঙ্গে পরিচয় কর্নেল আকবরের। একদিন পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন মন্ত্রী। শুধু কাবিননামায় বসিয়ে দেন পুরনো তারিখ। এভাবেই পুরো বিষয়টি জায়েজ করে নিলেন মন্ত্রী। আকবর হোসেন ব্যক্তিগত জীবনেও রসিক ছিলেন। উপস্থিত বুদ্ধিতে তার তুলনা ছিল না। সব সময় হাসি-ঠাট্টার মাঝে সবাইকে জমিয়ে রাখতেন। কুমিল্লার রাজনীতিতে তিনি পরাজিত হতেন না। কারণ আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের নেতারাই তাকে জয়ী করতেন। নিজেই বলতেন যতদিন কুমিল্লায় আওয়ামী লীগ আছে, আর দুই নেতা আছেন ততদিন আমি হারব না। ব্যক্তিগত কারণে আমাদের দেশে মন্ত্রীদের পদত্যাগের নজির খুব কম। আবুল কাশেম সাত্তার সরকারের যুবমন্ত্রী থাকাকালে তার বাড়ি থেকে খুনের মামলার শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমদুকে আটক করা হয়েছিল। আবুল কাশেমকে ঘিরে দেশজুড়ে তুমুল বিতর্ক হয় তখন। কিন্তু তিনিও পদত্যাগ করতে চাননি। আসলে মন্ত্রিত্বের মায়া অনেক বেশি। মন্ত্রীরা কখনো নিজেদের ব্যর্থ মনে করেন না। সফল মনে করেন। অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলন যাই করুন না কেন তারা সরতে চান না। মিজান চৌধুরীর মতো দৃষ্টান্তে কেউ যান না। কারণ দাপুটে মন্ত্রীরা বোঝার চেষ্টা করেন না, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ রাজা কাল ফকির। আজ মন্ত্রী, কাল কারাগার।

১৯৯০ সালের ৩ ডিসেম্বর সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করতে দেখেছি তখনকার দাপুটে মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশীদ ও কর্নেল (অব.) জাফর ইমাম বীরবিক্রমকে। তাদের ঘিরে সমাবেশটা খারাপ ছিল না। এর মধ্যে অনেক তরুণের হাতে রাজপথে প্রকাশ্য অস্ত্র। কোনো রাখঢাক নেই। এক ফাঁকে দুজনের সঙ্গে কথাও বললাম। জানতে চাই, কী বুঝছেন? তারা আমাকে বললেন, চিন্তার কারণ নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। আন্দোলন শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। সারা দেশ স্বাভাবিক। আমরা মাঠে নেমেছি, দেখেন কী হয়। সারা দেশে প্রেসিডেন্ট যেখানে যান সেখানেই ঢল। সেই মন্ত্রীদের পালাতে হয়েছিল দুই দিন পর। শুধু তারা নন, দাপুটে অন্য মন্ত্রীদেরও যেতে হয়েছিল কারাগারে। ইতিহাস বড়ই নির্মম। ইতিহাসের কথা মনে রেখেই প্রতিটি সরকারে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন। বর্তমান সরকারকে বাস্তবতা বুঝতে হবে। আইনের শাসনের দিকে সর্বোচ্চ দৃষ্টি রাখতে হবে। কঠোর হস্তে লাগাম টানতে হবে সব দখলবাজির। বাদ দিতে হবে বিতর্কিত মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও আমলাদের। কেলেঙ্কারি মাথায় নিয়ে উন্নয়ন বাস্তবায়ন কঠিন।

লন্ডনের টেমস নদীর তীরে হাঁটতে হাঁটতে আমার এক বন্ধু একবার বলেছিলেন, একটা সময় ছিল যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না। এখন ব্রিটিশদের সেই জৌলুস আর নেই। ক্ষয়ে ক্ষয়ে আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। সব কিছুরই শেষ আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসেন ২০১৪ সালের ২৬ মে। একই বছর নভেম্বর মাসের ৯ তারিখে তিনি মন্ত্রিসভা রদবদল করেন। এই রদবদলে নরেন্দ্র মোদির ভাবমূর্তি সংকটে পড়েনি। বরং তিনি ভুলগুলো সংশোধন করেছিলেন। মন্ত্রিসভার রদবদলে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় না। উজ্জ্বল হয়। দক্ষতা, সততা, নিষ্ঠার মূল্যায়ন হলে মন্ত্রীরা সতর্ক হন। তারা সহজে অনিয়মে জড়ান না। আর পরিবর্তন না হলে বেড়ে যায় স্বেচ্ছাচার। এতে সরকার ডুবে। সঙ্গে ডুবে দলও। আইনের শাসন ছাড়া স্বস্তি আসে না দেশে। গণতন্ত্র কম না বেশি সেই বিতর্কে গেলাম না। বলছি না, খলিফা হারুনুর রশিদের মতো সততা, ন্যায়পরায়ণতা, হজরত আলীর মতো সাহসী হতে। শুধু বলছি, জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে বাস্তবতায় থাকতে হবে।

যে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, আমলারা বিতর্কিত তাদের বাদ দিন। লাগাম টানুন সব খাতে। দখলবাজি, সন্ত্রাসে দেখান জিরো টলারেন্স। ১০-২০ জন বিদায় করে সরকার স্বাভাবিক থাকলে তাই করুন। আওয়ামী লীগের বর্তমান মেয়াদের সরকারের অনেক কিছু প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বিশ্ব বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো বিকল্প নেই। আমরা উজ্জ্বল ভাবমূর্তির আওয়ামী লীগকে দেখতে চাই। কারণ বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। কারও জন্য এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চলছি। এটা এখন আর স্বপ্ন নয় বাস্তব। এই সত্য, এই বাস্তবকে ধরে রাখতে হবে।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে