Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯ , ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.7/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-০২-২০১৫

বঙ্গবন্ধুর স্পিকার রাষ্ট্রপতি পরে উপজেলা চেয়ারম্যান

নঈম নিজাম


সময়টা আসলে খারাপ। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে কোনো আপস হবে না। বজায় রাখতে হবে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। তারপরও ভালোকে ভালো বলতে হবে। অন্যায়কে আশ্রয় দেওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগের দরকার নির্বিঘ্নে রাষ্ট্র চালানো। কোনো দখল, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাসকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া নয়। যে নেতারা এমন কাণ্ডে জড়াবেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে তাদের দলীয় পদ কেড়ে নিতে হবে। তুলে দিতে হবে আইনের হাতে।

বঙ্গবন্ধুর স্পিকার রাষ্ট্রপতি পরে উপজেলা চেয়ারম্যান

বিএনপির এক নেতা ছিলেন সাইফ উল্লাহ মিয়াজি। থাকতেন নয়াপল্টানে। তিনি ছিলেন বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক। জিয়াউর রহমান, বিচারপতি সাত্তারের সময় থেকে বিএনপি করতেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের স্নেহভাজন ছিলেন। বিএনপি অফিসের তালা খুলতেন তিনি। মাঝে মাঝে সারা দিন একা বসে থাকতেন। বিএনপি চেয়ারপারসনও তাকে পছন্দ করতেন। তখন এত নেতা-কর্মী ছিলেন না। সবাই সবাইকে জানতেন, চিনতেন। মানুষটি '৯১ সালে মনোনয়ন চাননি। পার্টি অফিসে বসে কাজ করেছেন। প্রেসরিলিজ লিখে লিখে পাঠাতেন পত্রিকা অফিসে। ধারণা করেছিলেন কিছু একটা পাবেন। সালাম তালুকদার একবার বিএনপি চেয়াপারসনের সামনে তাকে জিজ্ঞাসাও করেছিলেন, কি দেব তোমাকে? বেগম জিয়া বলেছিলেন কোনো একটি দেশে রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়ে দিন। শেষ পর্যন্ত তাকে রাষ্ট্রদূত করা হয়নি। পরবর্তীতেও তার কোনো মূল্যায়ন হয়নি। '৯৬ সালে পার্টির মনোনয়ন চেয়েছিলেন কুমিল্লা-১১ থেকে। পাননি। মনের দুঃখে দল ছাড়েন। আর রাজনীতি করেননি। এখন জীবনের শেষ দিনগুলো কাটছে নীরবে-নিভৃতে, কেউ তার খোঁজ নেন না। রাজনীতি আসলে এমনই। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলানো বড়ই কঠিন। অথচ সব সময় এমন ছিল না। স্বাধীনতার আগে মূল্যায়ন ছিল ত্যাগী নেতা-কর্মীদের। দলে ভূমিকা দেখে, অবদান দেখে, মিলত পদ-পদবি। যোগ্যতার মাপকাঠি তখনো কমবেশি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তবুও ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়নে নেতারা থাকতেন আপসহীন।


ষাটের দশকের কথা। আওয়ামী লীগের তখন খারাপ সময়। এমন সময় এক আইনজীবী এলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। বললেন, আমি আপনার সঙ্গে রাজনীতি করতে চাই। বঙ্গবন্ধু তাকে বললেন, পার্টি অফিসে ঠিকমতো সময় দিতে পারবেন? জবাবে সেই ভদ্রলোক বললেন, অবশ্যই পারব। আদালতে যাওয়া ছাড়া আমার কোনো কাজ নেই। আওয়ামী লীগ অফিসে বসার মতো তখন লোকের অভাব। বিশেষ করে বাতি জ্বালানো মানুষ পাওয়া যেত না। পাকিস্তানি শাসকদের যন্ত্রণার শেষ ছিল না। ভদ্রলোক বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া কথা রাখলেন। তিনি নিয়মিত দলের অফিসে এসে বসতেন। অনেক সময় পিয়নটিও আসত না। কিন্তু সেই ভদ্রলোক ঠিকই আসতেন। শাসকরা তার সাদামাঠা চেহারা দেখে মামলা, হামলা থেকে রেহাই দিতেন। এই ভদ্রলোক দীর্ঘদিন দলের প্রেসরিলিজ লেখা থেকে শুরু করে অনেক কিছুই করেছেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এই মানুষটিকে মূল্যায়ন করেন। প্রথমে তাকে বানিয়ে দেন স্পিকার। পরে করেন দেশের রাষ্ট্রপতি। এই ভদ্রলোকের নাম মোহাম্মদ উল্লাহ। বাড়ি বৃহত্তর নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুরে। মোহাম্মদ উল্লাহর ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। বঙ্গবন্ধুর সেই রাষ্ট্রপতি পরে বিএনপিতে যোগ দেন। এমপি থেকে শুরু করে উপজেলা চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। রাজনীতি আসলে কি লোভনীয় কিছু? একবার এই চক্করে ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না। মোহাম্মদ উল্লাহ বের হতে পারেননি। '৯১ সালে বিএনপি থেকে আবার এমপি হন। সংসদে যেতেন। চুপচাপ থাকতেন। একদিন পার্লামেন্টে তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। আমি তখন আজকের কাগজ, পরে ভোরের কাগজে সংসদ রিপোর্টার। মোহাম্মদ উল্লাহ চুপচাপ সামনের সারিতে বসতেন। কারও সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলতেন না। পার্লামেন্টের কোনো কিছুতেই অংশ নিতেন না। সংসদ লবিতে মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা হতো। একবার আমি তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনার জীবনের হিসাব-নিকাশ মিলেছে কি? তিনি হাসলেন। কোনো জবাব দিলেন না।

'৯১ সালের সংসদের স্পিকার ছিলেন শেখ রাজ্জাক আলী। খুলনা জেলা জাসদের সভাপতি ছিলেন। '৭৮ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন জাসদ ত্যাগ করে। প্রগতিশীল মানুষটি পরের বছর এমপি নির্বাচিত হন। শেখ রাজ্জাক আলী '৯১ সালে প্রথমে ডেপুটি স্পিকার, পরে স্পিকার নির্বাচিত হন। পড়াশোনা জানা মানুষ ছিলেন। পার্লামেন্ট পরিচালনায় তার ব্যক্তিত্ব ছিল প্রশংসনীয়। সেই সময়কার এমপি অথবা সাংবাদিকদের কাছে তার মূল্যায়ন অনেক উচ্চতায়। তার সময়ে বেসরকারি সদস্য নূরুল ইসলাম মণির আনা কোস্টগার্ড বিল সংসদে পাস হয়েছিল। সংসদে চিফ হুইপ খন্দকার দেলোয়ার অনুরোধ করেছিলেন, তাদের সদস্য সংখ্যা কম। তাই বিল পাস ভোটাভুটিতে না দিতে। স্পিকার সরকারি দলের কথা শোনেননি। এ ছাড়াও সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে রাজ্জাক আলী ছিলেন কৌশলী। এক ধরনের পজেটিভ ধারা ছিল তার মাঝে। শেখ রাজ্জাক আলী '৯৬ সালের একতরফা নির্বাচনের পরবর্তী সংসদেরও স্পিকার ছিলেন। এরপর থেকে ছিটকে পড়েন রাজনীতি থেকে। ২০০১ সালে তাকে মনোনায়ন দেওয়া হয়নি। হাইকমিশনার করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিদেশে। ফিরে এসে তিনি আর বিএনপিতে প্রাণ ফিরে পাননি। রাজনীতিতে দক্ষ মানুষদের ঠাঁই হয় না। এই সংস্কৃতি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের সব দেশেই কমবেশি। শেখ রাজ্জাক আলী এক পর্যায়ে নিজের মতো করে রাজনীতি করার চেষ্টা করেছেন। তারপর চুপ হয়ে যান। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন একধরনের রক্তক্ষরণ নিয়ে। বিবেকবান মানুষরা রক্তক্ষরণ নিয়েই থাকেন। চাটুকার আর তোষামোদকারীদের দিন কাটে মহাআনন্দে। কারণ বোধশক্তি নেই।

রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল রাজীব গান্ধীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর। মনমোহনের সময়ও প্রণব মুখার্জির নাম আরেক দফা উঠে আসে। কিন্তু তাকে করা হয়নি। জ্যোতি বসু ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে। আরেকজন ব্রিটিশ রাজনীতিকও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। তার নাম কার্জন। ভারতবাসীর কাছে তার পরিচিতি লর্ড কার্জন নামে। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয়। অভিজাত পরিবারের এই সন্তান বিশাল ব্রিটিশ সামাজ্যের পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্বও পালন করেন। একজন দক্ষ রাজনীতিক হলেও ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। কারণ রাজনৈতিক কূটকৌশলে তিনি ক্ষিপ্রতা দেখাতে পারেননি। টোরি সরকারের প্রধানমন্ত্রী শারীরিক ও মানসিকভাবে ছিলেন অচল। তিনি চোখেও দেখতেন না। তারপরও কার্জনকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়নি। একজন যোগ্য, দক্ষ মানুষের মূল্যায়ন রাজনীতিতে কেউ করতে চান না। এখনো রাজনৈতিক দলগুলোতে মেধাবী, দক্ষ, যোগ্য মানুষরা নীরব অশ্রুপাত করেন। সব দলেই কমবেশি এক চিত্র। সবকিছু থাকে তোষামোদকারীদের দখলে।

কেউ বুঝতে চান না, তোষামোদকারীরা সব সময় বিভ্রান্ত করে, ক্ষতি করে। তাদের কাছে রাজনৈতিক বসদের খারাপটা চোখে পড়ে না। পাকিস্তান আমলে একবার রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২২ জুন ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তথ্য ও বেতারমন্ত্রী শাহাবুদ্দিন জাতীয় পরিষদে ঘোষণা দেন, বেতার-টিভি থেকে পাকিস্তানবিরোধী রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে রবীন্দ্রনাথের অন্য গানের প্রচারও হ্রাস করা হবে। মন্ত্রীর এই ঘোষণার প্রতিবাদ জানান প্রতিগতিশীল সংগঠনগুলো। কিন্তু মন্ত্রীর পক্ষে সমর্থনকারীর সংখ্যা একেবারে কম ছিল না। এর মধ্যে এনএসএফ ইসলামী ছাত্র সংঘসহ কয়েকটি ছাত্র সংগঠনও ছিল। এই দলে সুশীল সমাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিকরাও যোগ দেন। রবীন্দ্রসংগীত তারা শুনতে চান না। অনেক শিক্ষক, সাংবাদিক মুসলিম ভারতের ইতিহাস খুঁজে যুক্তি দিয়ে লেখালেখিও শুরু করেন। তারা বলতে থাকেন, মন্ত্রী ভালো করেছেন। আহা বেশ বেশ। কি অদ্ভুত কথা! এখন শুনতে বাজে মনে হলেও এটাই ছিল একসময়ের বাস্তবতা। এইচ এম এরশাদের মায়ের মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীদের কান্নার ভিজুয়াল তখন বিটিভিতে দেখেছিলাম। একপর্যায়ে এইচ এম এরশাদ অনেককে সান্ত্বনা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই চাটুকাররা এখনো আমাদের সমাজে সুশীল বুদ্ধিজীবীর রূপ নিয়ে আছেন। চাটুকারিতা ও দলবাজিতে তারা যুগে যুগে ওস্তাদ। সামান্য মধুর লোভে তারা দেশের, দশের সর্বনাশ করে ছাড়েন। আর বলেন, আহা বেশ বেশ বেশ। সমাজ, দেশ, দল ডুবলে তাদের কিছু যায় আসে না। কোথায় থামতে হবে, কোথায় থামাতে হবে না, তা তারা জানেন না। আর জানেন না বলেই এখন ভালোকে ভালো, খারাপকে খারাপ বলেন না। বরং নিজেরাও আজান দিয়ে রাজনৈতিক কর্মীদের হার মানিয়ে দেন।

সময়টা আসলে খারাপ। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে কোনো আপস হবে না। বজায় রাখতে হবে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। তারপরও ভালোকে ভালো বলতে হবে। অন্যায়কে আশ্রয় দেওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগের দরকার নির্বিঘ্নে রাষ্ট্র চালানো। কোনো দখল, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাসকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া নয়। যে নেতারা এমন কাণ্ডে জড়াবেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে তাদের দলীয় পদ কেড়ে নিতে হবে। তুলে দিতে হবে আইনের হাতে। যারা মনে করেন সন্ত্রাস, দখল, অনিয়ম করে রাষ্ট্র শাসন করলে কিছু যায় আসে না এই চাটুকাররা আওয়ামী লীগের বন্ধু নন। আওয়ামী লীগ কখনো খারাপ সময়ে পড়লে এই চাটুকারদের আর দেখা যাবে না। প্রকৃতি বড় নিষ্ঠুর। বাংলাদেশের আবহাওয়া পরিবর্তন হয় হরহামেশাই। হুট করে পরিবেশ বদলে যেতে পারে। ঘন বর্ষায় আকাশজুড়ে ঝড় নামতে কতক্ষণ! তখন জীবনের সব হিসাব-নিকাশ বুঝিয়ে দিতে হবে। তাই সাবধান হতে হবে আগে থেকে।

পাদটীকা : ভাগ্যজোরে এক চোর এক সুন্দরী নারীর প্রেমে পড়ে। চোরের প্রেম নিবেদনে সেই নারীও সাড়া দেয়। কিন্তু বিয়ের আগে নারী একটি শর্ত জুড়ে দেয়। শর্তটি ছিল জীবনে আর কোনো দিন চুরি করতে পারবে না। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। না শোনে স্ত্রীর শর্ত। শেষ পর্যন্ত বিয়ের পর চোর দিনের বেলায় ভালো থাকে। রাত হলে স্ত্রী তাকে চোখে চোখে রাখে। ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। চোর আর ঘর থেকে বের হতে পারে না। এই পরিবেশে চোর নিজেকে বদলে নিল। চুরি শুরু করল নিজের ঘরে। এক ঘরের জিনিস চুরি করে রেখে দিত অন্য ঘরে। নিজের ঘরে নিজেই চোর।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে