Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ , ৯ ফাল্গুন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-০২-২০১২

ত্রিভুজ রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি

আবদুল গাফফার চৌধুরী


ত্রিভুজ রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি
আমার এক ব্রিটিশ সাংবাদিক বন্ধু বাংলাদেশে ব্রিটেনের ত্রিভুজ রাজনীতির প্রতিফলন দেখেন। ব্রিটেনে যেমন টোরি ও লেবার পার্টি দুটি প্রধান দল হওয়া সত্ত্বেও লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকেও একটি প্রধান দলের কাছাকাছি বলে গণ্য করা হয়, বাংলাদেশেও তেমনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি প্রধান দল হওয়া সত্ত্বেও জেনারেল (অব.) এরশাদের জাতীয় পার্টিকে কাছাকাছি প্রধান দল হিসেবে গণ্য করা উচিত বলে আমার এই ব্রিটিশ সাংবাদিক বন্ধু মনে করেন।
ব্রিটেনের রাজনীতি থেকেই তিনি যুক্তি খাড়া করেন। বলেন, ব্রিটেনে লিবারেল পার্টি এক সময় অন্যতম প্রধান দল ছিল, এককভাবে ক্ষমতায়ও ছিল। লেবার পার্টির অভ্যুদয়ের পর লিবারেল পার্টি ব্রিটিশ রাজনীতিতে প্রাধান্য হারিয়ে তৃতীয় দলে পরিণত হয়। লেবার পার্টির সঙ্গেই তাদের ছিল সখ্য। লিবারেল কোয়ালিশন করে তারা ক্ষমতায়ও গিয়েছিল। বর্তমানে যেমন তারা অভাবিতভাবে টোরি দলের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর পদটি দখল করতে পেরেছেন।
বাংলাদেশের জাতীয় পার্টিও অনেকটা তাই। এক সময় তারা ছিল ক্ষমতাসীন প্রধান দল। প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জাতীয় পার্টির সেই অবস্থান আর নেই। কিন্তু বিস্ময়করভাবে জে. এরশাদ জাতীয় রাজনীতিতে এখনও টিকে আছেন। সংসদে তার দলের সদস্য সংখ্যাই প্রধান দুটি দলের পরই বেশি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর জয়ী আওয়ামী লীগের পক্ষে জাতীয় পার্টির সমর্থন না থাকলে সরকার গঠন কষ্টকর হতো। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সংসদে বিএনপির সদস্য সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছেছিল জাতীয় পার্টি। এরশাদ সাহেব একটু ম্যানুপুলেটিভ হলে আরও দু’একজন সদস্যকে দলে ভিড়িয়ে বিএনপিকে হটিয়ে সংসদে বিরোধী দলের স্থানটি দখল করতে পারতেন।
আমার ব্রিটিশ সাংবাদিক বন্ধু ব্রিটিশ রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশে রাজনীতির এই ত্রিভুজ চরিত্রের তুলনা টেনে বলেছেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর জনপ্রিয়তা অনেকটা হারিয়েছে। কিন্তু মহাজোটে অবস্থান করেও জেনারেল এরশাদ কিংবা তার জাতীয় পার্টি তাদের সীমিত জনপ্রিয়তা এখনও হারায়নি। আগামী সাধারণ নির্বাচন যদি সঠিক সময়ে সঠিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে তাতেও জাতীয় পার্টির যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে তাতে সন্দেহ নেই। এমনও হতে পারে, ব্রিটেনের গত সাধারণ নির্বাচনে প্রধান দুটি দল প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টি প্রধান দুটি দলের কোনটি সরকার গঠন করবে, তা যেমন নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশেরও আগামী নির্বাচনে তেমনি জাতীয় পার্টি প্রধান দুটি দলের চেয়ে বেশি আসন না পেলেও কোন দল সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। আমার এই ব্রিটিশ বন্ধুর ধারণা, আগামী নির্বাচন যে কোন পদ্ধতির অধীনেই অনুষ্ঠিত হোক না কেন, আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি কোন দলই এককভাবে অথবা তাদের জোটের সদস্য সংখ্যার জোরে সরকার গঠন করতে পারবে না, জাতীয় পার্টির সমর্থনের ওপর তাদের নির্ভর করতে হবে।
বাংলাদেশের গত সাধারণ নির্বাচনে এরশাদ সাহেব মহাজোটে ছিলেন (এখন পর্যন্ত আছেন) এবং বিএনপির প্রায় কাছাকাছি জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য সংখ্যা। তথাপি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতার দর কষাকষিতে জাতীয় পার্টি সুবিধা করতে পারেনি। মন্ত্রিসভায় পূর্ণ মন্ত্রীর মাত্র একটি আসন পেয়ে জাতীয় পার্টিকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। সেই একজন মন্ত্রীও বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী থাকাকালে নানা হেনস্তা সহ্য করেছেন এবং একসময় মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এরশাদ সাহেব তাকে পদত্যাগ করতে দেননি। তিনি মহাজোটের ঐক্য রক্ষা করেছেন। আমার ধারণা, গত সাধারণ নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের অধিকারী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহানুভবতা দেখিয়ে তার মন্ত্রিসভায় অযোগ্য ও অদক্ষদের সংখ্যা না বাড়িয়ে জাতীয় পার্টি ও মহাজোটের বাম শরিক দলগুলো থেকে দু’তিনজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ মন্ত্রী গ্রহণ করে তার সরকারের দক্ষতা বাড়াতে পারতেন। তিনি তা করেননি। তার পরিণতি এখন সবার চোখের সামনে।
ব্রিটিশ সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি যে, আগামী নির্বাচন বানচাল করার ষড়যন্ত্র সফল না হলে এবং নির্বাচন সঠিক সময়ে সঠিকভাবে অনুষ্ঠিত হলে জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সদস্য সংখ্যা বাড়বে এবং এরশাদ সাহেবের দর কষাকষির ক্ষমতাও বাড়বে। তিনি যদি এখন মহাজোট ছেড়ে যান তাহলে মহাজোট যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি জাতীয় পার্টিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একাধিক জেলায় বহু আসনে জাতীয় পার্টির সমর্থক ভোটারদের ভোট যুক্ত না হলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী যেমন জয়ী হবে না, তেমনি বহু জেলায় বহু আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের ভোট যুক্ত না হলে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়ী হতে পারবে না। সুতরাং ভোট লাভের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে যে একটি পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, তা কোন দলই সহজে ছাড়তে চাইবে মনে হয় না।
তথাপি জেনারেল এরশাদ যে মাঝে মাঝে মহাজোট ত্যাগের এবং জাতীয় সংসদের সব আসনে তার দলের প্রার্থী দাঁড় করানোর কথা বলেন, এটা আমার কাছে একটা কৌশল মনে হয়। এটা বিএনপিকে নির্বাচনে টানার জন্য এক ধরনের চাপ সৃষ্টি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ধুয়া তুলে বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসতে চায়, তাহলে জাতীয় পার্টি মহাজোট থেকে বেরিয়ে এসে সংসদের সব ক’টি আসনে যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাহলে আগামী সংসদে জাতীয় পার্টিরই প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি লাভের সম্ভাবনা বেশি।
বিএনপি যদি নির্বাচনে না যায়, তাহলে দলটির ক্রমাগত সংসদ বর্জনে বিরক্ত বহু সদস্য দলত্যাগ করে জাতীয় পার্টিতে চলে আসতে পারে। তাহলে নির্বাচনে না গিয়ে মাঠে আন্দোলন করাও বিএনপির জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। পুত্রের বদলে পুত্রবধূকে দলের নেতৃত্বে এনেও কোন লাভ হবে না। আর যদি দলের এই সম্ভাব্য করুণ পরিণতির কথা ভেবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে ২০০১ সালের মতো ভূমিধস বিজয়ের অধিকারী হবে এ আশা দুরাশা। কথায় বলে যত গর্জায় তত বর্ষায় না। নির্বাচনে জেতার ব্যাপারে বিএনপি-জামায়াত এখন যত গর্জাচ্ছে, নির্বাচন হলে দেখা যাবে বহ্বাড়ম্বে লঘুক্রিয়া। আমার আশংকা, একটা হাং পার্লামেন্ট হয়ে যেতে পারে। আগামী দেড় বছরে আওয়ামী লীগ সরকার যদি ভুল শোধরাতে না পারে, তাহলে তারা যে সব ভালো কাজ করেছেন, তার দামামা বাজিয়ে লাভ হবে না।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ব্রিটেনকে নিশ্চিত পরাজয়ের আশংকা থেকে রক্ষা করেছিলেন চার্চিল, ১৯৪৫ সালে তার নেতৃত্বে ব্রিটেন জার্মানিকে পরাজিত করে। আর সেই বছরেই সাধারণ নির্বাচনে সেভিয়ার চার্চিলকে ভোট না দিয়ে তার বিরুদ্ধবাদী দলকে ভোট দিয়েছিল ব্রিটেনের মানুষ। ইতিহাস থেকে আওয়ামী লীগের শিক্ষা নেয়া উচিত। কিছু ভালো কাজ করে আÍসন্তোষে ভোগা উচিত নয়।
আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যদি এককভাবে বা জোটবদ্ধভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তাহলে জাতীয় পার্টির সমর্থনের জন্য এরশাদ সাহেবের মুখের দিকে তাদের তাকাতেই হবে। জাতীয় পার্টি যদি নির্বাচনে মহাজোটের ভেতরে থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগের সুবিধা। আর বিএনপি নির্বাচনে না এলে জাতীয় পার্টি মহাজোটের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করলেও আওয়ামী লীগের সুবিধা। তারা সংসদে সংসদীয় বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টিকে পাওয়ার আশা করবে। তাতে বিএনপি-জামায়াতের চক্রান্তে বছরের পর বছর ধরে যে অচল সংসদ ও সংসদীয় ব্যবস্থা চলছে তার অবসান হবে এবং বিরোধী দলের অবস্থান গ্রহণে সংসদ এবং সংসদীয় গণতন্ত্র আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। তবে বিএনপি যদি নির্বাচনে যায় এবং জাতীয় পার্টিও মহাজোট থেকে বেরিয়ে এসে দলীয়ভাবে নির্বাচন করে, তাহলে বিএনপি হয়তো আশা করবে এবং চেষ্টা চালাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আশায় এরশাদ সাহেবের সমর্থন পেতে। তখন কি তিনি ব্রিটিশ লিবডেম পার্টির নেতা নিক ক্লেগের ভূমিকা গ্রহণ করবেন? একমাত্র ভবিষ্যতেই তা জানা যাবে।
এরশাদ সাহেবের রাজনীতি আমরা কেউ কেউ পছন্দ করি বা না করি বাংলাদেশের রাজনীতির ত্রিভুজ ধারায় তার গুরুত্বকে অস্বীকার করা যাবে না। জাতীয় পার্টিতে নানা ভাঙচুর চলেছে। তারপরও দলটির টিকে থাকা এবং দেশের রাজনীতিতে অবস্থান শক্ত রাখা দলটির পেছনে জনসমর্থনের প্রমাণ দেয়। দেশে এখন দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোটই তাদের শক্তি বৃদ্ধি ও জোট সম্প্রসারণের চেষ্টা চালাচ্ছে। এ সময় এরশাদ সাহেব সচেষ্ট ও সক্রিয় হলে তার দলের বিচ্ছিন্ন অংশগুলোকে দলে ফিরিয়ে এনে শক্তি বাড়াতে পারেন। তা ছাড়া মডারেট ইসলামপন্থী দলগুলোর কাছে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে। তিনি আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হলে জাতীয় পার্টিকে প্রকৃত একটি শক্তিশালী জাতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে দাঁড় করাতে পারবেন। আমার ব্রিটিশ সাংবাদিক বন্ধুরও সেই ধারণা।
আমি চিরদিনই জেনারেল এরশাদ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সমালোচক। তা সত্ত্বেও মনে করি দেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতাবিরোধীদের অভ্যুত্থান ঠেকাতে মধ্যপন্থী একটি শক্তিশালী দল প্রয়োজন। এই প্রয়োজন জাতীয় পার্টি পূরণ করতে পারে। আরও একটি কথা এখানে বলতে আমার কোন দ্বিধা নেই। আগামী জাতীয় সংসদে যদি বিএনপি-জামায়াত জোটের বদলে জাতীয় পার্টি সংসদীয় বিরোধী দলের স্থান দখল করতে পারে, তাকে আমি দেশের জন্য মঙ্গলজনক মনে করি। বিএনপি-জামায়াত জোটের সরকারের চেয়ে আওয়ামী-জাতীয় পার্টি জোট সরকারও হবে আমার কাছে অনেক বেশি কাম্য। সম্ভবত দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছেও।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে