Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ , ১০ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.4/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-০৪-২০১৫

খালেদ মাহমুদ সুজন: গ্রীক ট্রাজেডির বাংলা নায়ক

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়


খালেদ মাহমুদ সুজন: গ্রীক ট্রাজেডির বাংলা নায়ক

নর্দাম্পটন, নাকি মুলতান!

১৯৯৯ সালের সেই বাঁধভাঙা উল্লাস? নাকি ২০০৩ সালের চোখ মুছতে থাকা মানুষটি?
খালেদ মাহমুদ সুজনের কোন ছবিটা বাঁধিয়ে রাখবো! কোন সুজনকে বীর বলবো?
আসলে ‘বীর’ কাকে বলে!
বীর হলেন হেক্টর। বীর হলেন একিলিস।
বিশ্বের সেরা যোদ্ধা একিলিস, গ্রীক বীর একিলিস দ্বন্ধযুদ্ধে আহবান জানাচ্ছেন ট্রয়ের সেরা যোদ্ধাকে। দূর্গের বাইরে থেকে চিৎকার করে বলছেন, ‘ট্রয় সাম্রাজ্যে কী একজনও বীর পুরুষ নেই! যদি থাকে, বেরিয়ে এসে লড়াই করো।’

এই আহবান শুনে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারলেন না হেক্টর। যুদ্ধ পোশাক পরে চললেন দূর্গের বাইরে। হেক্টরের বাবা এসে বললেন, ‘একিলিসের সঙ্গে তুমি যুদ্ধে হারবে জেনেও যাচ্ছ?’

হেক্টর হেসে বললেন, ‘আমাকে যেতেই হবে। একিলিস আমাকে ডাকেনি; সে জানতে চেয়েছে, ট্রয় সাম্রাজ্যে আদৌ বীর পুরুষ আছে কি না। পরাজয় সুনিশ্চিত জেনেও যে লড়াই করতে পারে, সেই বীর।’

যুদ্ধ চলছে।

হেক্টরের হাত থেকে তরবারী ছিটকে গেছে। একিলিস তরবারী তুলে দিয়ে বললেন, ‘নিরস্ত্র মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করি না। সমান যোগ্যতায় প্রতিপক্ষকে যে বধ করতে পারে, সেই বীর।’

আহ।

একিলিস নিশ্চয়ই বীর; তিনি জিতেছিলেন, পতন ঘটিয়েছিলেন অভেদ্য ট্রয়দূর্গের। হেক্টর আরও বড় বীর; কারণ তিনি পরাজয় জেনেও লড়েছিলেন।

খালেদ মাহমুদ সুজন আমাদের একিলিস, খালেদ মাহমুদ সুজন আমাদের হেক্টর।

খালেদ মাহমুদ সুজন বাংলাদেশের সবচেয়ে স্মরনীয় ও তাৎপর্যপূর্ন জয়ের নায়ক, তিনিই পতন ঘটিয়েছিলেন অভেদ্য পাকিস্তানী দূর্গের; তাই তিনি বীর একিলিস।

খালেদ মাহমুদ সুজন বাংলাদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম লড়াইয়ের নায়ক; যে নায়ক মুলতানে বিশ্বসেরাদের সামনে বুক চিতিয়ে লড়াই করে কপটতার কাছে হার মেনেছিলেন; তাই তিনি বীর হেক্টর।

খালেদ মাহমুদ সুজন আমাদের ক্রিকেটের বীরকূলশিরোমনি।

এই ঢাকা নগরীরর সিদ্ধেশ্বরীতে সুজন জন্মেছিলেনই যেন ক্রিকেটার হওয়ার জন্য। বড় দুই ভাই ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট কাঁপিয়েছেন। সুজনেরও তাই নিয়তি ছিলো ক্রিকেটার হওয়া।

সুজনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটাকে শুধু নিয়তি না বলে বলা ভালো, রক্তে মিশে ছিলো তার ক্রিকেট। ক্রিকইনফো সুজন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছিলেন, 'পানির মাছের মতোই ক্রিকেট জীবন কাটিয়েছেন। খেলা শেষ করে যখন কোচিং শুরু করলেন, মনে হলো পানির মাছ পানিতেই সাতার কাটছে।‘

ঠিক।

সুজনকে ক্রিকেট মাঠেই মানায়।

যখন খেলা ছাড়লেন; কোচিংটা বেছে নিতে এতোটুকু ভাবতে হয়নি। খেলোয়াড়দের সঙ্গে ঠিক তাদের একজন হিসেবে মিশে গেছেন। খেলোয়াড় আর সুজন; ক্লাব বলুন, জাতীয় দল বলুন, কখনো আলাদা করতে পারিনি। সুজন খেলে চলেছেন, কোচিং করিয়ে চলেছেন।

যখন কর্মকর্তা হওয়ার প্রশ্ন এলো, সুজন একটা শর্ত জুড়ে দিলেন- কোচিং ছাড়তে পারবো না। এ নিয়ে সুজন কম জেদ করেননি। শেষ পর্যন্ত বোর্ড তার কথা মানতে বাধ্য হয়েছে। সুজন যাই করুন, যতগুলো পদই সামলান না কেন; কোচিং তার জীবন।

নিজেই বলেন, সব দায়িত্ব আমার কর্তব্য; কিন্তু কোচিং আমার জীবন। ক্রিকেট ছাড়লে আমি বাচবো না!

সুজন কতো বড় ক্রিকেটার ছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর জানাটা আমাদের আজকের প্রজন্মের জন্য খুব জরুরী।

সতীর্ আশরাফুলের বাহারী শটের ফুলঝুরি ছিলো না তার হাতে। মাশরাফির মতো নয়ন জোড়ানো পেসার ছিলেন না তিনি। বাংলাদেশে প্রায়শ যে অমিত প্রতিভাধর খেলোয়াড়দের উদ্ভব হয়, তার একজন কিছুতেই খালেদ মাহমুদ সুজন ছিলেন না।

তারপরও সুজন অনেক বড়, বটবৃক্ষের মতো বিশাল একজন ক্রিকেটার ছিলেন। সুজনের অস্ত্রটা ছিলো এতোটুকু দেহের মধ্যে বিশাল সিংহের একটা হৃদয় আর মাঠে জীবনটা লড়িয়ে দিয়ে আসার মতো পরিশ্রম।

বীর সুজনের কথা বলছিলাম।

সুজনের বীরত্বের কথা জানে অস্ট্রেলিয়া, জানে পাকিস্তান; জানেন ডেভ হোয়াটমোর।

সুজন যখন এই শতকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ দলে অধিনায়কত্ব করছেন, সাকিব-তামিমদের প্রজন্ম তখনও স্কুলে ক্রিকেট শিখছে। সুজনদের প্রজন্ম তখনও কোমর সোজা করে দাড়াতে পারে না, এমন ধারণাই ছিলো।

কিন্তু সুজন এই ক্রিকেট বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন, তিনি শুধু কোমর সোজা রাখতে পারেন, তাই নয়; এই ছোটখাটো মানুষটি চোখে চোখ রেখে কথাও বলতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের নাড়িয়ে দিতে স্লেজিং করেছেন; আলোচনায় এসেছেন। পাকিস্তানে গিয়ে পাকিস্তানীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্লেজিং করেছেন।

যে ডেভ হোয়াটমোর নিজেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের `গডফাদার‘ বানিয়ে ফেলেছিলেন, তার চোখে চোখ রেখে সুজন, একমাত্র সুজনই বলেছিলেন, `তুমি ভুল করছো।‘

তবে ক্রিকেটার সুজনকে বিশ্লেষন করতে বসলে তার পরিশ্রম আর নিবেদনটাকেই সবার আগে আনতে হবে।

ভারতের এককালের ‘মিডিওকোর’ অলরাউন্ডার রবিন সিং একবার বলেছিলেন, ‘বেশীরভাগ ক্রিকেটারই শচীন বা ওয়াসিম হয়ে জন্ম নেয় না। যারা এই প্রতিভাধরের তালিকায় না থাকে, তাদেরকে পরিশ্রম করে ওই ধাপটা অতিক্রম করতে হয়।’
এই কাজটাই ক্যারিয়ার জুড়ে করে গেছেন সুজন।

সেই অমরজ্যোতি থেকে বাংলাদেশ দল; নিজের সীমাবদ্ধতাকেই শক্তিতে পরিণত করেছেন সুজন। শটের সীমাবদ্ধতা দূর করেছেন বুক চিতিয়ে ব্যাটিং করে। বল হাতে গতির স্বল্পতা দূর করেছেন সুচতুর লাইন আর লেন্থের ব্যবহার করে। সবচেয়ে বড় কথা মাঠে সবসময় রক্ত ঢেলে দেওয়ার একটা মানসিকতা দেখিয়ে গেছেন।

সুজনের জীবনের হাইলাইটস বেছে নিতে বললে নিশ্চয়ই ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে সেই পাকিস্তান বধকে মেনে নিতে হবে।
সীমিত এই বোলিং আর ব্যাটিং দিয়ে সেদিন এই অলরাউন্ডারই হয়ে উঠেছিলেন সেরা সেরা তারকা্য় খচিত পাকিস্তানকে হারানোর নায়ক। জীবনে আর একটা ক্রিকেট ম্যাচ না খেললেও চলতো। ওই একটা ম্যাচের সেরা পারফরম্যান্স দিয়েই বাংলাদেশের কিংবদন্তী হয়ে গেছেন সুজন।

আবার চার বছর পর এই সুজনের নেতৃত্বেই ভঙুর ও শিক্ষনবীশ এক বাংলাদেশ দল স্মরণকালের সেরা টেস্ট সিরিজ খেলেছিলো পাকিস্তানে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পাকিস্তানের সঙ্গে তিনটি টেস্টে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াইয়ের; সারা টেস্ট ক্যারিয়ারে পেয়েছেন ১৩টি উইকেট; ৭টিই নিয়েছিলেন ওই মুলতান টেস্টে!

আর শেষ দৃশ্য হিসেবে সেই রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বের হওয়া; ওটাই যেন সুজনকে ট্রাজেডির নায়ক করে দিলো।
সুজন অবশ্য আমার বিবেচনায় ট্রাজেডির নায়ক একটু অন্য কারণে।

খালেদ মাহমুদ সুজন হলেন বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে সর্বকালের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র। বাংলাদেশ জাতীয় দলের এমন কোনো প্রজন্মের ক্রিকেটার আপনি খুজে পাবেন না, যিনি সত্যিই সুজনের ‘বন্ধু’ নন।

আজও আপনি জাতীয় দলের আশেপাশে একটু ঘোরাঘুরি করুন। সুজনের চেহারাটা দেখা গেলেই দেখবেন, ‘চাচা’ বলে একটা চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

হ্যা, সুজন বাংলাদেশ জাতীয় দলের, বাংলাদেশের সব ক্রিকেটারের বয়স-প্রজন্ম নির্বশেষে চাচা।

সুজন কিভাবে ‘চাচা’ হলেন, সে গল্প অনেকবার বলা হয়েছে। তারপরও অল্পের মধ্যে মনে করিয়ে দিতে পারি। জাতীয় দলে একসময় হালিম শাহ নামে সম্ভাবনাময় এক ক্রিকেটার এসেছিলেন। হালিম ছিলেন হাবিবুল বাশারদের সমসাময়িক। এই হালিম একবার আবিষ্কার করলেন, সুজন কী এক বহু দূরের সম্পর্ তার চাচা হন। সেই থেকে সুজন হালিমের চাচা, ক্রিকেটের চাচা, ক্রিকেটারদের চাচা।

সুজন যখন জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন, সহকারী কোচ ছিলেন বা ম্যানেজার ছিলেন; জনপ্রিয়তায় তার আশেপাশে ড্রেসিংরুমে কাউকে পাবেন না। খারাপ না হোক; তিনি থাকলে জাতীয় দলের যা কিছু ভালো, সে জন্য তাকে ক্রিকেটাররা কৃতিত্বও দিয়ে থাকেন।

এই সেদিনও একেবারে তরুন এক ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘চাচা ড্রেসিংরুমে থাকলে সবাই একটু হালকা থাকতে পারে যেন। আমরা মনের আনন্দে কথা বলতে পারি।’

অথচ এই ক্রিকেটারপ্রিয় মানুষটিই গত কিছুদিনে বাংলাদেশে ‘ভিলেন’ হয়ে গেছেন যেন!

এই মানুষটিকেই অনলাইনে কুৎসিত সব বিশেষনে অভিহিত করা হয়, বাংলাদেশের যাবতীয় ব্যর্তার দায় দেওয়া হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা সব কাণ্ডের পেছনে সুজনের হাত দেখতে পাই আমরা।

হ্যা, সুজনের দোষ আছে।

সুজন তো মহামানব নন। কিছু দোষ আছে তার, কিছু ভুল আছে। সেই দোষগুলো, ভুলগুলো আলাদা করে সমালোচনা হতেই পারে; আমিও সুজনের সমালোচনা করেছি, ভুল নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু এটা খুবই অন্যায় যে, সুজনকে ক্রিকেটের ‘ভিলেন’ ভেবে বসে থাকা।

কেউ কেউ বলেন, কিছু গূঢ় উদ্দেশ্য নিয়ে সুজনকে ইচ্ছে করে ভিলেন বানিয়ে রাখা হয়, ইচ্ছে করে তাকে হাসির পাত্র করে রাখা হয়।

যার উদ্দেশ্য আছে, তিনি এসব করায় আমি আপত্তি করার কে!

তবে যারা আজকের তরুন, তারা জানবেন, এইসব করে ধালাও সুজনকে নিয়ে হাসিতামাশা করে আপনি আসলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক নিবেদিত প্রাণ মানুষকে ছোট করছেন। যে মানুষটি সংসার ভুলে, পরিবার ভুলে, ক্যারিয়ার ভুলে শুধু মাঠেই জীবন দিয়ে যাচ্ছে; দেশের জন্য যে মানুষটি অমন করে বারবার নিজেকেই বাজিতে ফেলেছে, তাকে ছোট করাটা আর যাই হোক ক্রিকেটভক্তদের কাজ হতে পারে না।

অথচ সুজনের পরিণতি এই। এই জন্যই আমি বলি, সুজন শুধু গ্রীক ট্রাজেডির নায়ক নন; তিনি গ্রীক ট্রাজেডির বাংলাদেশী নায়ক; আমরা নিজেদের মতো করে তাকে ট্রাজেডিক বানাই!

ক্রিকেট

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে