Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ , ১০ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.5/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৬-০২-২০১৫

অদম্য মেধাবী চার নক্ষত্র

অদম্য মেধাবী চার নক্ষত্র

সুমাইয়া, ফরিদা, মোজাম্মেল ও রাজু। চার দরিদ্র পরিবারের চার সন্তান। দারিদ্র্য পেছনে ঠেলে চলতি বছর এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে হয়ে ওঠা অদম্য মেধাবী। নিজে পড়াশোনা করে লেখাপড়া একদম না-জানা মা-বাবারই গর্ব আজ সুমাইয়া। কেরোসিন কেনার সামর্থ্য না-থাকা পরিবারের ফরিদা চুলার আলোয় পড়েই আলোকিত এক কন্যা। আর মোজাম্মেল ও রাজু দিনমজুরি করে দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠা দুই গ্রাম্য কিশোর। চার পরিবারের ঠিক চার নক্ষত্র।

আশ্রয়ণ প্রকল্পে বেড়ে ওঠা সুমাইয়া:

বাবা শহীদ বিশ্বাস ও মা জাহেদা বেগম লেখাপড়া জানেন না। কিন্তু তাঁদেরই ইচ্ছা ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করবেন। নড়াইলের লোহাগড়া পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে কারিগরি বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে মা-বাবার সে ইচ্ছাই পূরণ করল সুমাইয়া খানম।
সুমাইয়ারা লোহাগড়া পৌর এলাকার মাইটকুমড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। তারা দুই ভাইবোন। বড় ভাই জাহিদুল সবে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছে। রাজবাড়ীর মানুষ শহীদ বিশ্বাস। যুবক বয়সে কাজের সন্ধানে আসেন লোহাগড়ায়। ১৯৯৫ সালে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। ফেরেন সর্বস্বান্ত হয়ে। এরপর ২০০০ সাল থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঠাঁই মেলে তাঁর।
বাবা বলেন, ‘আমরা দুজন (মা-বাবা) নামও সই করতে পারি না। তাই প্রতিজ্ঞা ছিল ছেলেমেয়েদের মানুষ করব।’ সুমাইয়ার ইচ্ছা বড় সরকারি কর্মকর্তা হবে। সে বলে, সৎ কর্মকর্তা হলে গরিবদের সহায়তা বেশি বেশি করা যায়।
মা জাহেদা বেগম বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের মুখে তিনবেলা ভাত তুলে দিতে পারি না। বিদ্যুৎ নেই। টাকার অভাবে কেরোসিনও কিনতে পারি না।’

চুলার আলোয় পড়াশোনা ফরিদার:

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের জরমনদী গ্রামের ফরিদা আক্তার। বাবা ফরিদ আহমেদ রিকশাচালক। মা সাবিনা বেগম গৃহিণী। রিকশা চালিয়ে দৈনিক যে আয় হয়, তা দিয়ে ছয় সদস্যের সংসার চলে না। তাই একবার সকালে; আরেকবার স্কুল থেকে ফিরে সেলাইয়ের কাজ করে সংসারের জোগান টানতে হয় ফরিদারও।
এভাবে পেটে দুমুঠো ভাত জুটিয়ে কেরোসিন কেনার আর টাকা হতো না। বাধ্য হয়ে কাজের ফাঁকে কখনো দিনের আলোয়, কখনো চুলার আলোতেই পড়াশোনা করতে হয়েছে ফরিদাকে। স্কুলের টিফিন সেটাও ছিল পানি দিয়ে। এই ফরিদাই সুন্দরগঞ্জ আমিনা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। ফরিদা পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতেও পেয়েছে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি।
গর্বিত বাবার কথায়, ‘কষ্ট করি ছোট কেলাসোত ছোলগুলেক পড়ানো। একন বড় কেলাসোত পড়মো, ট্যাকা পামো কোনটে।’ ফরিদা বলে, ‘ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে চাই। কিন্তু কে যে আমার পড়াশোনার খরচ দিবেন।’

দিনমজুরি খেটেছে মোজাম্মেল:

দারিদ্র্য হারাতে পারেনি মোজাম্মেল হোসেনকে। অধ্যবসায় পুঁজি করে সে পরাস্ত করেছে প্রতিকূলতাকে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নকিপুর এইচ সি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
একসময় বই-খাতা কেনার খরচ জোগাতে না পেরে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মোজাম্মেলের। কিন্তু দিনমজুরের কাজ করে লেখাপড়ার খরচ জুগিয়ে সাফল্যকে ছুঁয়েছে মোজাম্মেল। বাবা মকবুল হোসেন অসুস্থ, শয্যাশায়ী। মোজাম্মেল নবম শ্রেণিতে উঠতেই তার বাবা বিছানা নেন। সেই থেকে শুরু ছেলেটির সংগ্রাম। আর তার মা মমতাজ বেগম অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে স্বামীর ওষুধ ও পথ্য জোগাতে থাকেন।
বাবা অসুস্থ হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনা চালু করতে নানা বাড়ি চলে আসে মোজাম্মেল। শুরু করে প্রতিবেশীদের বাচ্চাদের টিউশনি করানো। কিন্তু তাতে খরচ না ওঠায় এলাকায় দিনমজুর হিসেবে কাজ শুরু করে সে। এসএসসির ফল প্রকাশের আগের দিনও এ কাজ করেছে মোজাম্মেল।

চিকিৎসক হতে চায় রাজু:

জিপিএ-৫ পেয়েও যেন আনন্দ নেই অদম্য মেধাবী রাজু আহমেদের। গত শনিবার দুপুরে ফল প্রকাশের সময় চারদিকে যখন চলছিল আনন্দ-উল্লাস, তখন রাজু ছিল বাবার সঙ্গে ধানমাড়াইয়ের কাজেই ব্যস্ত।
নীলফামারী জেলা সদরের দুহুলী পশ্চিম ধারারপাড় গ্রামের দরিদ্র পরিবারের ছেলে রাজু নীলফামারী সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
রাজু বলল, ‘পরীক্ষায় ভালো ফলের খবর শুনেছি স্কুলের স্যারদের কাছে।’ জানায়, চিকিৎসক হতে চায় সে। এ জন্য চায় ভালো কোনো কলেজে পড়তে। কিন্তু পরিবারের টানাপোড়েন কি পারবে তার এ সাধ মেটাতে?
দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট রাজু। ২০০৯ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে ও ২০১২ সালে অষ্টম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে সে। ওই বৃত্তির টাকা আর স্কুলের ছুটিতে নিজের দিনমজুরের আয়েই চলেছে তার লেখাপড়া। তবে সহায়তা পেয়েছে স্কুলের দরিদ্র তহবিল ও বন্ধুদের কাছ থেকেও। ১২ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাতায়াত করেছে সে।
মা আরজিনা বেগম জানান, পরিবারের এক বিঘা জমির ফসল, স্বামীর দিনমজুরের আয় এবং নিজের সেলাই কাজের উপার্জিত অর্থে অনেক কষ্টে চলছে তাঁদের দিন। বড় মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বৃত্তির টাকায়। সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে টিউশনির আয়ে। এখন রাজুর পড়াশোনা নিয়েই তাঁর দুশ্চিন্তা।
ছেলের কষ্টের কথা বলার সময় আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে মা জানান, রাজুর অনেক দিন কেটেছে না খেয়ে। পরীক্ষার পর ভর্তির টাকা জোগাড় করতে গিয়েছিল এলাকার বাইরে দিনমজুরের কাজে। আয় করেছিল সাড়ে তিন হাজার টাকা। কিন্তু সে টাকা আর তার হাতে নেই। রাজুর বোনের বৃত্তি বন্ধ হওয়ায় সে টাকা তাকেই দিয়ে দিতে হয়েছে।

শিক্ষা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে