Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৯ মে, ২০১৯ , ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.1/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-৩০-২০১২

ভিওআইপি: হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার

মোহাম্মদ আল-আমীন


ভিওআইপি: হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার
পরিবার আর আত্নীয়-স্বজনকে ভালোবাসে না এমন লোক খুজে পাওয়া দুষ্কর। প্রত্যেকটি মানুষই চায় পরিবার-পরিজনদের নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে। এই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে অনেকেই দেশ ছেড়ে ছুটে যায় দূর প্রবাসে। একজন প্রবাসী বিদেশে থাকলেও তার মনটা সারাক্ষণ পরে থাকে মাতৃভুমিতে। মনটা ব্যাকুল থাকে সেই আপনজনদের খোঁজ-খবর নিতে। আর আপনজন, বন্ধু-বান্ধব আর গোষ্ঠীর লোকদের খোঁজ-খবর বাংলাদেশিরাই বেশি নেয়- সেটা প্রবাসে যারা অন্যান্য দেশের লোকদের সঙ্গে চলাফেরা করেছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন।

আমি দেখেছি, একজন বাংলাদেশিকে তার দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয়ের আপদ-বিপদে পাশে দাঁড়াতে হয় যা অন্যান্য দেশের লোকদের মাঝে তেমন দেখা যায় না। আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, এইদিক থেকে প্রথমেই বাংলাদেশের অবস্থান তারপর পাকিস্তান, ভারতে আর শ্রীলঙ্কার স্থান। প্রবাসী বাংলাদেশিরা সেই পরিবার-পরিজনের খোঁজ নিতে মাসিক বেতনের একটা বড় অংক খরচ করেন টেলিফোনের পেছনে।

প্রায় ৮০ লাখ বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছেন। বলা যায় এই ৮০ লাখ প্রবাসী দেশের ৫ কোটি লোকের রুটি-রুজির সংস্থান করছেন। একটা সময় ছিল বাংলাদেশে প্রবাসীদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে মোবাইল মানুষের জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিকট অতীতেও দেখেছি মোবাইল ফোন ব্যবহার হতো ফ্যাশন বা স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে। আর সেই ফ্যাশন উচ্চবিত্ত লোকদের মাঝেই দেখা যেতো।

কিন্তু বর্তমানে প্রয়োজন এবং সহজলভ্যতার কারণে সমাজের একেবারেই নিম্নপর্যায়ের লোকেরাও মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। মোবাইলফোনের কারেণেই আজকে বিশ্বটাকে হাতের মুঠোয় মনে হচ্ছে। বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে। শুধু কলই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এমএমএসের মতো জনপ্রিয় সেবাও।

টেলিযোগাযোগ খাত হচ্ছে বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরির অন্যতম উপাদান। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল সোসাইটি তৈরির কাজও ত্বরান্বিত হবে। বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় যেসব সেক্টর রয়েছে তার মধ্যে টেলিকম হচ্ছে অন্যতম। গত ১১ বছরে টেলিযোগাযোগ খাতে প্রায় ৩২ হাজার কোটির টাকারও বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৬টি মোবাইল অপারেটর  মোবাইল সেবা প্রদান করছে এবং । তাদের কাছ থেকে বার্ষিক ২২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় হচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশে প্রায় ৬ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারী রয়েছে। যা দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩০ ভাগ প্রায়।
আর প্রবাসে থাকা প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশির সঙ্গে এসব মোবাইল ফোন গ্রাহকদের এক বিরাট অংশের সঙ্গে যোগাযোগ হয় হর-হামেশা।

এদিকে, বাংলাদেশে বিদেশ থেকে যত কল টারমিনেশন হয় এর এক-তৃতীয়াংশই আসে অবৈধ পথে।  সরকার বলছে- তাদের টার্গেট পূরণ হচ্ছে না বলে ভিওআইপি লাইসেন্স দেয়া বন্ধ রেখেছে। তারপরও ভিওআইপি বন্ধ নেই। চলছে, তবে তা রয়েছে সিন্ডিকেটের কবলে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমানে সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোবাইল কোম্পানিগুলো অবৈধ ভিওআইপি’র (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) মাধ্যমে কল টারমিনেশন করছে যার ফলে বাংলাদেশ সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

সরকার অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া ছাড়াও লাইসেন্স দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। এটা ছিল সরকারের একটি ভুল সিদ্ধান্ত। কারণ, অবৈধ কল ট্রান্সফার বন্ধ করার জন্য সর্ষের মধ্যে যে ভূত রয়েছে তা দূর করতে হবে। একইসঙ্গে অবৈধ ভিওআইপি-কে বৈধ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

অবৈধ কল টারমিনেশনের ব্যবসা এখন জমজমাটভাবে চলছে। এখন বিদেশের নামিদামি মোবাইল ফোন অপারেটররাও কল টারমিনেশন করছে অবৈধ পথে। তাই সরকার এ খাত থেকে যে পরিমাণ লাভ করার কথা তা করতে পারছে না। শক্তিশালী সিন্ডিকেট এটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব সিন্ডিকেট অবৈধ কল টারমিনেশনের জন্য টেলিটক ও বিটিসিএল-কে ব্যবহার করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি মোবাইলফোন অপারেটররাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেও অল্প বিস্তর অবৈধ কল টারমিনেশন হচ্ছে।

এক্ষেত্রে সৌদি আরব প্রবাসীদের কথা বলা যেতে পারে। এখানে বাংলাদেশের প্রায় ২৫ লাখ লোক কর্মরত আছেন। তারা প্রতিনিয়তই দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন ফোনের মাধ্যমে। গড়ে একজন প্রবাসী দিনে ৫ মিনিট করে কথা বললেও দৈনিক ১২,৫০০,০০০ মিনিট কল টারমিনেশন হচ্ছে বাংলাদেশে। সংখ্যাটা এর দশ ভাগের একভাগ হলেও কম নয়।

অপরদিকে, বাংলাদেশে বিদেশ থেকে যত কল টারমিনেশন হয় এর এক-তৃতীয়াংশই আসে অবৈধ পথে। সূত্র জানায়, গত ২৩ জানুয়ারি থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আসা ৮০ হাজার নমুনা কলের মধ্যে ৩৫ হাজার ৮৬৪টি কলই এসেছে অবৈধ পথে। প্রতি মিনিট ইনকামিং আইএসডি কলে তিন সেন্ট করে বাংলাদেশ পায়। সেক্ষেত্রে কয়েক কোটি মিনিট কল অবৈধ পথে আসে। এতে সরকারের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দশ কোটি টাকা।

গত বছরের ১১ মে থেকে চলতি বছরের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ইনকামিং আইএসডি কলের ৩৫ দশমিক ৬৯ শতাংশই অবৈধ পথে এসেছে। সে হিসেবে ১৫ লাখ ২০ হাজার নমুনার মধ্যে ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪২৯টি কলই দেশে এসেছে অবৈধ পথে। অবৈধ পথে আসা এই ইনকামিং কলের ৩ লাখ ১৬ হাজার ৪০৮টিই এসেছে টেলিটক সিমের মাধ্যমে। অন্যদিকে অবৈধ কল আসার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে বিটিসিএল’র আন্তর্জাতিক গেটওয়ে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির শীর্ষ কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার আশীর্বাদ ও সহযোগিতায় প্রভাবশালীরা নির্বিঘ্নে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলের বৈধ চ্যানেল দিয়েই অবৈধ ভিওআইপি কল আদান-প্রদান হচ্ছে। তবে দেখা গেছে, দায়িত্ব এড়াতে বিটিসিএল অভিযোগের তীর বারবার বিটিআরসির দিকেই ঘুরিয়ে দিতে চায়।

অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধ করতে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিটিআরসি কঠোর অভিযান চালায়। তখন এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ায় ব্যবসাটি অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিদেশ থেকে বৈধপথে কল আদান-প্রদান করতে তিনটি আইজেডব্লিউ (ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে) কোম্পানিকে লাইসেন্স দেয়া হয়।

ভিওআইপি ব্যবসা করতে হলে একসময় বিদেশে মার্কেটিং করতে হতো। এখন বিদেশি টেলিকম অপারেটরদের স্থানীয় এজেন্টরাই এখানে বসেই বিপণনের কাজ করে দিচ্ছে। আগে আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানে মোবাইল সিমকার্ড ব্যবহৃত হতো এবং নানা যন্ত্রপাতি নিয়ে বড় পরিসরে বাড়িভাড়া করে করতে হতো। কিন্তু এখন অনেক সহজে এবং ভি-স্যাট ছাড়াই ছোট একটি ঘরে বসেই ভিওআইপি ব্যবসা করা সম্ভব হচ্ছে। ই-১ ও মাল্টি ফ্লেক্সিবল প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে একটি লাইন থেকে কমপক্ষে ৩০টি লাইন সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, সরকারের প্রশাসন যন্ত্র থেকে সর্ষের ভুত তাড়িয়ে (বর্তমান বিটিসিএল) জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং মোবাইল ফোন অপারেরেটরদের প্রতি নজরদারি বাড়াতে হবে। বিটিআরসি এবং মোবাইল ফোন অপারেটরদের কতিপয় অসাধু ব্যক্তিদের যোগসাজশে এই অবৈধ ভিওআইপি কল সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাই সরকারের উচিত সময় ক্ষেপণ না করে অতিদ্রুত সহজশর্তে এবং কম টাকায় ভিওআইপির লাইসেন্স দেয়ার ব্যবস্থা করা।

সহজশর্ত এবং কম টাকায় লাইসেন্স এর ব্যবস্থা করতে না পারলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে অবৈধ ভিওআইপি বন্ধের সিদ্ধান্ত কোনো কাজে আসবে না বলেই আমি মনে করি। প্রশাসনের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে সরকারের রাজস্ব আয়ের এই বিশাল খাতটি অন্ধকারে নিমজ্জিত হোক তা কারোরই কাম্য নয়। সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে এই খাতটির ভবিষ্যৎ।
সরকার যদি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারে তাহলে বন্ধ হবে অবৈধ ভিওআইপি এবং সরকারের তহবিলে বছরওয়ারি যোগ হবে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব।

সৌদি আরব

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে