Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৯ , ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (55 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৫-০৪-২০১৫

পাঠকদের ঘরকুনো করে রাখতে চাননি সত্যজিৎ

দেবাশীষ দেব


পাঠকদের ঘরকুনো করে রাখতে চাননি সত্যজিৎ

‘গোপালপুরে আগে কখনও আসিনি...এমন নিরিবিলি আর মনোরম জায়গা কমই দেখেছি। নিরিবিলি আরও এই জন্য যে, এটি হল অফ সীজ্ন— এপ্রিল মাস... হোটেলের লম্বা বারান্দার ঠিক নীচ থেকেই শুরু হয়েছে বালি; একশো গজের মধ্যেই সমুদ্রের ঢেউ এসে সেই বালির উপরে আছড়ে পড়ছে। লাল কাঁকড়াগুলো মাঝে মাঝে বারান্দায় উঠে এসে ঘোরাফেরা করে। আমি ডেক-চেয়ারে বসে দৃশ্য উপভোগ করি আর লেখার কাজ করি। সন্ধ্যায় ঘণ্টা দুয়েকের জন্য কাজ বন্ধ রেখে বালির ওপর হাঁটতে বেরোই। প্রথম দু’দিন সমুদ্রের তীর ধরে পশ্চিমদিকটায় গেছি; তৃতীয় দিন মনে হল একবার পূবদিকটাতেও যাওয়া দরকার; বালির ওপর আদ্যিকালের পোড়া বাড়িগুলো ভারী অদ্ভূত লাগে।...পূব দিকে কিছুদূর গিয়ে দেখলাম এক জায়গায় বালির অংশটা অনেকখানি চওড়া হয়ে গেছে, আর তার ফলে শহরটাও সমুদ্র থেকে অনেকটা পিছিয়ে গেছে। প্রায় সমস্ত জায়গাটা জুড়ে কাত করে শোয়ানো রয়েছে অন্তত শ’খানেক নৌকো...নুলিয়াগুলোকেও দেখলাম এখানে ওখানে বসে জটলা করছে, কিছু বাচ্চা নুলিয়া জলের কাছটাতে গিয়ে কাঁকড়া ধরছে, খান চারেক শুয়োর এ দিক ও দিক ঘোঁতঘোঁত করে বেড়াচ্ছে।’ এত দূর পড়ে পাঠকের মনে হতে পারে এ নিশ্চয়ই কোনও ভ্রমণ কাহিনির অংশ। সমুদ্র সৈকতের এই ছবিটি কিন্তু ধরা পড়েছিল ‘প্রফেসর হিজিবিজবিজ’ গল্পের হিমাংশু চৌধুরীর লেখায়। যার স্রষ্টা সত্যজিৎ রায়!


গল্পে আরও একটু এগোলে বোঝা যায়, রহস্যের গন্ধেও প্রকৃতির ছোটখাটো বর্ণনা থেকে হিমাংশুর দৃষ্টি এড়ায় না। ‘এখন ভাঁটার সময়। সমুদ্রের জল পিছিয়ে গেছে। ঢেউও অল্প। পাড়ের যেখানে এসে ঢেউ ফেনা কাটছে, তার কাছেই কয়েকটা কাক লাফালাফি করছে, ফেনাগুলো সরসর করে এগিয়ে এসে পিছিয়ে যাচ্ছে, আর তারপরেই ফেনার বুড়বুড়িতে ঠোকর দিয়ে কাকগুলো কী যেন খাচ্ছে। নুলিয়া গ্রাম ছাড়িয়ে মিনিট দশেক হাঁটার পর দূর থেকে ভিজে বালির ওপর একটা চলন্ত লাল চাদর দেখে প্রথমে বেশ হকচকিয়ে গিয়েছিলাম; কাছে গিয়ে বুঝলাম সেটা একটা কাঁকড়ার পাল, জল সরে যাওয়াতে দলে দলে তারা বাসায় ফিরে যাচ্ছে।’ হিমাংশুর চোখ দিয়ে সাবলীল এই বর্ণনায় লেখক পাঠককে চিনিয়ে দিচ্ছেন কেমন এই গোপালপুর।

শুধু এই একটি গল্পেই নয়। সত্যজিতের অনেক ছোট গল্প, রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনিতেও বাঙালির ‘ভ্যান্ডারলুস্ট’ বা ভ্রমণের নেশার ছবি ধরা পড়েছে। যেমন, ১৯৬২ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’। সত্যজিৎ রায়ের লেখা প্রথম বাংলা ছোটগল্প এটি। সেই গল্পে রয়েছে, মানুষের থেকেও বুদ্ধিমান প্রাণী অ্যাং-এর সঙ্গে হঠাৎই আলাপ হয়ে যায় বঙ্কুবিহারী দত্তের। কাঁকুড়গাছি নামের এক অখ্যাত গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে বাংলা এবং ভূগোল পড়ান এই বঙ্কুবিহারী। ক্রেনিয়াস গ্রহ থেকে আসা অ্যাং যখন বঙ্কুবাবুকে প্রশ্ন করে— ‘এমন কোনও জায়গা বা দৃশ্য আছে যা তোমার দেখতে ইচ্ছে করে কিন্তু হয়ে ওঠে না?’ বঙ্কুবাবু ভাবলেন, ‘সারা পৃথিবীটাই তো দেখা বাকি। ভূগোল পড়ান, অথচ বাংলাদেশের গুটিকতক গ্রাম ও শহর ছাড়া আর কি দেখেছেন তিনি? বাংলাদেশেরই বা কি দেখেছেন? হিমালয়ের বরফ দেখেননি, দিঘার সমুদ্র দেখেননি, সুন্দরবনের জঙ্গল দেখেননি, এমনকি শিবপুরের বাগানের সেই বটগাছটা পর্যন্ত দেখেননি।’ বঙ্কুবিহারীর এই দীর্ঘশ্বাস যেন পাঠকেরও। লাইনগুলি পড়তেই তাঁদের চোখে ভেসে ওঠে কতগুলো স্থান আর তার মাহাত্ম্য।
বেড়ানো মানে নতুন কোনও জায়গায় গিয়ে এ মাথা থেকে ও মাথা দিন কয়েকে চষে ফেলাই নয়। রোজের জীবন থেকে একটু দূরে নিজের সঙ্গে সময় কাটানোও বটে। কর্পোরেট বাঙালির কাছে এখন এটাই মন্ত্র। অথচ এই ধারণাটা সত্যজিতের লেখায় উঠে এসেছিল অনেক বছর আগেই। তাই তাঁর ‘অনাথবাবুর ভয়’ গল্পের সীতেশ রঘুনাথপুরে গিয়ে সহপাঠী বীরেনের পৈতৃক বাড়িতেই ওঠেন। আলো, বাতাস এবং নির্জনতার নিরিখে অবসর খুঁজে নেন বাড়ির চিলেকোঠায়। সীতেশ জানাচ্ছেন— ‘আমি যাচ্ছিলাম রঘুনাথপুর, হাওয়াবদলের জন্য। কলকাতার খবরের কাগজের আপিসে চাকরি করি। গত ক’মাস ধরে কাজের চাপে দমবন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিল। তাছাড়া আমার লেখার শখ, দু-একটা গল্পের প্লটও মাথায় ঘুরছিল, কিন্তু এত কাজের মধ্যে কি আর লেখার ফুরসত জোটে? তাই আর সাত-পাঁচ না ভেবে দশদিনের পাওয়া ছুটি আর দিস্তাখানেক কাগজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।’

ডালটনগঞ্জ শহরের ছোট্ট অখ্যাত জায়গা কাঠঝুমরী। ভ্রমণ তালিকায় সে ভাবে আজও হয়তো তার নাম নেই। আলাদা ভাবে হাওয়া বদল করতে আসা দু’জন মানুষকে নিয়ে সত্যজিতের আরও একটি গল্প ‘বিষফুল’ সূত্রে পরিচয় কাঠঝুমরীর সঙ্গে। একটি চরিত্র জগন্ময় বারিক, যাঁকে ডালটনগঞ্জে আসার প্ল্যান বাতিল করে আসতে হয় কাঠঝুমরীতে। মুর সাহেবের বিলিতি বাংলোয় ভাড়া এসেছেন তিনি। সস্তা আর ভাল খাবার পেয়ে সব মিলিয়ে অবশ্য অখুশি নন জগন্ময়। বাকিটা সত্যজিতের কলমে— ‘কলকাতার মানুষ জগন্ময় বারিক কল্পনাই করতে পারেননি যে ট্রাম বাস লরি ট্যাক্সি রেডিও, টেলিফোন, টেলিভিশন, সিনেমা, মানুষের কোলাহল ইত্যাদি বাদ হয়ে গেলে কী আশ্চর্য টনিকের কাজ হয়...মূর সাহেবের বাংলো প্রথম দর্শনেই জগন্ময়বাবুর মনটা ভাল হয়ে গিয়েছিল। দূরে পিছনে পাহাড়ের লাইন, তারপর এগিয়ে এলে প্রথমে বন, বনের পর অসমতল প্রান্তর— তার এখানে ওখানে ছড়ানো ছোট বড়ো টিলা, আর আরও এগিয়ে এলে লম্বা লম্বা গাছ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিমনি আর টালির ছাতওয়ালা বিলিতি পোস্টকার্ডের মতো মুর সাহেবের বাংলো।...এখানে এসেই জগন্ময়বাবু তাঁর দিনের রুটিন ঠিক করে নিয়েছিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে চা খেয়ে হাঁটতে বেরোন, ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট...তারপর বাংলোর বারান্দায় বা সামনের কম্পাউন্ডে বসে ম্যাগাজিন পাঠ...তারপর স্নান-খাওয়া সেরে দিবানিদ্রা। বিকেলে চায়ের পর আবার পদব্রজে ভ্রমণ। রাত্রে সাড়ে ৮টার মধ্যে খাওয়া শেষ করে ঘুম।’ যদিও জগন্ময়বাবুর কপালে এই রকম আনন্দে কাটানো সময় তিন দিনের বেশি স্থায়ী হয়নি— এক গভীর সমস্যায় পড়ে শেষ পর্যন্ত তিনি বাংলো ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
তাঁর ‘বাতিকবাবু’ গল্পে রয়েছে— ‘কলকাতার ব্যাঙ্কে চাকরি করি, দিন দশেকের ছুটি জমেছে, বৈশাখের মাঝামাঝি গিয়ে হাজির হলাম আমার প্রিয় দার্জিলিং শহরে।... চা খেয়ে হোটেল থেকে বেরিয়েছি... দার্জিলিঙের সবচেয়ে মনোরম সবচেয়ে নিরিবিলি রাস্তা জলাপাহাড় রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে...। পরদিন সকালে মেঘ কেটে গিয়ে ফরসা হয়েছে দেখে চা খেয়ে বার্চ হিলের উদ্দেশ্যে হাঁটতে বেড়িয়ে পড়লাম। খটখটে দিন। ম্যাল লোকে লোকারণ্য, ভিড়ের মধ্যে ঘোড়া ও চেঞ্জারদের সঙ্গে কোলিশন বাঁচিয়ে ক্রমে গিয়ে পড়লাম অবজারভেটরি হিলের পশ্চিমদিকে অপেক্ষাকৃত জনবিরল রাস্তাটায়।’ অর্থাৎ প্রিয় শহর দার্জিলিঙের আনাচে কানাচের সঙ্গে পরিচিত এই লোকটি। যাঁর হাত ধরে পাঠক নিশ্চিন্তে হেঁটে যেতে পারেন ওই পথে।

‘ভক্ত’ গল্পে ইনসিওরেন্স কোম্পানির অরূপরতন সরকারের পুরী যাত্রা কিংবা ‘রতনবাবু আর সেই লোকটা’ গল্পে ভ্রমণ বাতিক রতনবাবুর ছবিও সত্যজিৎ একই রকম যত্নে তুলে ধরেছেন পাঠকের কাছে। এমনকী সত্যজিতের ফেলু মিত্তিরকে নিয়ে গোয়েন্দা উপন্যাসগুলিও প্রায় ভ্রমণকাহিনি পর্যায়ের। ফেলুদার পটভূমি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সিকিম, নেপাল, কাশ্মীর কিংবা লন্ডন। রহস্যের সমাধানের ফাঁকে সেই সব জায়গার ইতিহাস আর ভূগোলের বৈশিষ্ট্য বর্ণনাও রয়েছে নিপুণ ভাবে। ইচ্ছে হয়, ঘুরে আসি। অন্য দিকে, প্রফেসর শঙ্কুর সায়েন্স ফিকশন সিরিজে আমরা দেখি, প্রফেসরকে ফেলুদার থেকেও ঢের বেশি বিপদসঙ্কুল স্থানে যেতে হয়েছে। কখনও তিনি গিয়েছেন পর্বতচূড়ায়। কখনও বা সমুদ্রের তলা, দুর্ভেদ্য জঙ্গল অথবা মরুভূমিতে। শেষে মঙ্গলগ্রহে পাড়ি দিয়ে চিরকালের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন।
সব বয়সের পাঠকের কাছেই সত্যজিতের লেখা অসম্ভব রকম প্রিয়। তবু ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে ওঠা মনের ঠিকানাগুলো যেন তাঁর কাছে বড্ড বেশি প্রিয় ছিল। তাই ওদের ঘরকুনো করে না রেখে গল্পের মাধ্যমে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। চিরকালই বাঙালির পায়ে সর্ষে। সেই কারণেই একঘেয়ে জীবন থেকে ছুটি নিয়ে অচেনা পথের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়া সত্যজিতের গল্পের চরিত্রেরা ছোটদের পাশাপাশি বড়দের কাছেও সমান আকর্ষণীয়। ‘পিন্টুর দাদু’ গল্পে পিন্টুর বন্ধু স্বপন আর সুদীপের দাদুর মুখে শুধু নাম আর ধাম বসিয়ে এক মজাদার ছড়া লিখেছিলেন লেখক সত্যজিৎ। লাইনগুলি ছিল এ রকম—

‘লন্ডন মাড্রিড সানফ্রান্সিস্কো
আকবর হুমায়ুন হর্ষ কনিষ্ক
অ্যান্ডিজ কিলিমাঞ্জারো ফুজিয়ামা
তেনজিং ন্যানসেন ভাস্কো-ডা-গামা
রিগা লিমা পেরু চিলি চুংকিং কঙ্গো
হ্যানিবল তুঘলক তৈমুরলঙ্গ...’

লাইনগুলি মনে মনে আওড়ালেই যেন শিকল ভেঙে বেরিয়ে পড়ার দুর্নিবার টান লাগে পাঠকের। একেই বোধহয় বলে ম্যাজিক!

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে