Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯ , ৩ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (17 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-২৬-২০১২

কাঁদলেন যুদ্ধবন্ধুরা

কাঁদলেন যুদ্ধবন্ধুরা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে বীভৎসতা তাদের অনেকেই নিজ চোখে দেখেননি, কিন্তু কাজ করেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের পক্ষে। বিশ্বের দেশে দেশে বাঙালির স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন, শরণার্থীদের জন্য খাদ্য ও ওষুধ সংগ্রহ, শরণার্থী শিবিরে অসহায় মানুষের সেবা করে তারাও হয়ে উঠেছিলেন একেকজন মুক্তিযোদ্ধা। সেই বিদেশী যুদ্ধবন্ধুরা সম্মাননা নিতে বাংলাদেশে এসে ঘুরে দেখেছেন সেই সময়ের বীভৎসতার নানা চিত্র। গতকাল দিনভর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, শিখা চিরন্তন ও জাদুঘর পরিদর্শন করেন তারা। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতি আর ছবি দেখে আবেগে আপ্লুত হয়েছেন সবাই। কারও চোখ বেয়ে গড়িয়েছে অশ্রু। যুদ্ধজয়ের ৪০ বছর কৃতজ্ঞ বাংলাদেশ সম্মাননা জানানোয় তারা গর্বিত বলেও জানিয়েছেন অনেকে।
মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর পরিদর্শনের সময় গণহত্যার নিদর্শন স্বরূপ তরে তরে সাজিয়ে রাখা মাথার খুলি আর হাড়গোড় দেখে আঁতকে উঠেন অনেক বন্ধু। অশ্রুতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তাদের।
অধ্যাপক তসুইয়োসি নারা। জাপানের জ্যেষ্ঠ এ অধ্যাপক মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তানে ছিলেন। যুদ্ধের সময় টোকিওতে কাজ করছিলেন। এমন সময় যুদ্ধের খবর পান। খবরের কাগজে বাংলাদেশী শরণার্থীদের বেদনার্ত ছবি দেখে হৃদয়ে নাড়া দেয় তার। গঠন করেন জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতি। ১২০ জন সহকর্মীকে যুক্ত করেন এর সঙ্গে। এরপর চলে জাপানজুড়ে খাদ্য আর রসদ সংগ্রহ। তা সংগ্রহ করে পাঠাতে থাকেন ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে। ত্রাণ কার্যক্রম চলাকালে দু’বার কলকাতায় আসেন শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ বিতরণে। এই ঘনিষ্ঠ যুদ্ধবন্ধু এবার বাংলাদেশে সরকারের সম্মাননা নিতে এসেছেন। গতকাল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দোতলায় যুদ্ধকালীন নানা স্মৃতি ঘুরে দেখার সময় চোখ পড়ে সে সময়ের সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে আসা জাপানি তরুণ সাংবাদিক নাওয়াকি উসুই’র একটি ছবির ওপর। স্থির দাঁড়িয়ে দেখেন সেই ছবি। মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের সঙ্গে তোলা এই ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, তার চেনা সেই সাংবাদিক এখন আর নেই। বাংলাদেশের দেয়া সম্মাননার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে নারা বলেন, আমি বাংলা বলতে পারি। এরপর নিজে থেকেই বাংলায় বলে যান যুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের অনেক স্মৃতির কথা। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট তার হাত দিয়েই গড়া। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭৪ সাল থেকে ’৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে কাজ করেছেন। এখন এমিরেটাস অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কাজ করার সময় অনেকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। অধ্যাপক কবীর চৌধুরীসহ অনেকে তার খুবই কাছের লোক ছিলেন। নারা বলেন, সম্মাননা নেয়াটাই বড় নয়। তিনি এসেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ যোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাতে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। এ দেশের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে দেশকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
যুদ্ধবন্ধুরা গতকাল প্রথমে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। এরপর যান সেগুনবাগিচার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। সেখানে তাদের স্বাগত জানান জাদুঘরের কর্মকর্তারা। সেখানে পৌঁছেই বাংলাদেশীদের পরম বন্ধুরা ‘শিখা চির অম্লান’-এ ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি সম্মান জানান। এরপর তারা জাদুঘরের বিভিন্ন নিদর্শন ঘুরে ঘুরে দেখেন। এরপর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিখা চিরন্তনে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তারপর ঘুরে দেখেন জাদুঘর। অনেকে পরিচিত কোন দৃশ্য বা ছবি দেখলেই অন্যকে তা দেখিয়ে নিজের স্মৃতিচারণ করেন। সন্ধ্যা পৌনে ৬টা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা তারা সেখানে অবস্থান করেন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর মিত্র বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড লে. জেনারেল অব. জ্যাক ফ্রেডেরিক র‌্যালফ জ্যাকব তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন সেই স্বাধীনতার মূল্য দেয়ার সময়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। আমরা বাংলাদেশের শুভ কামনা করি। জেনারেল জ্যাকব যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এটি একান্তই বাংলাদেশের বিষয়। তবে এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হবে, এমনটি মনে করেন তিনি।
আরেক বন্ধু জাপানের তাকামাসা সুজুকি। তিনিও মক্তিযুদ্ধকালে সময়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন ও ত্রাণ সহায়তার জন্য কাজ করেন। জাপানি ভাষায় সঙ্গী গাইডকে তিনি বলে যাচ্ছিলেন তার যুদ্ধকালীন স্মৃতির কথা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আরও বেশ কয়েক বার বাংলাদেশে এসেছেন। তবে এবারের আসাকে ভিন্নভাবে দেখছেন তিনি। যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মানুষের জন্য পরম বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এবার বাংলাদেশ তার সেই বন্ধুত্বের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন করছে। সুজুকি বলেন, এটা আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি। তিনি বলেন, আমি কোন ব্যক্তির জন্য বা দেশের জন্য কাজ করিনি। আমি কাজ করেছি মানবতার জন্য। আমাকে যে সম্মান দেয়া হচ্ছে, সেটিও মানবতাকেই সম্মান করা।
বিমান মল্লিক। বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটের নকশাকার। লন্ডনে বসে তিনি বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটের নকশা করে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ এই যুদ্ধবন্ধুকেও এবার সম্মাননা জানাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ঘুরে ঘুরে তিনি দেখছিলেন  সে সময়ের স্মৃতি। সম্মাননার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি যখন এই সম্মাননার কথা প্রথম আমার মেয়েকে জানাই, তখন প্রথমেই সে বলে- বাবা তুমি তো অনেক আগেই বড় সম্মান পেয়ে গেছ। তুমি বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটের নকশা করেছো। এর চেয়ে বড় সম্মাননা আর কি হতে পারে? তার ওপর আমি আনুষ্ঠানিভাবে সম্মান পাচ্ছি। এটিও আমার জন্য অনেক গৌরবের। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে এই যুদ্ধবন্ধু বলেন, কেউ অন্যায় করলে তার বিচার যথাযথ আইনে হবে। তবে কাউকে ক্ষমা করে দেয়াটা হলো সবচেয়ে ভাল।
মহারানী বিভু কুমারী দেবী। ত্রিপুরার এই বন্ধু তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ভাষার জন্য বাঙালি রক্ত দিয়েছে। যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। এটি বাংলা এবং বাংলাদেশের জন্য বড়  গৌরবের ইতিহাস। জার্মানি, জাপান, সার্বিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে এবং হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি ইতিহাসের বিষয়।
বৃটেন থেকে সম্মাননা নিতে এসেছেন সাবেক এমপি মাইকেল বারনেস। স্বাধীনতার পর আরও একবার তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জাদুঘরে বঙ্গবন্ধুর বিশাল ক্যানভাসের ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, কি বিশাল মানুষ। বড় মন ছিল তার। তিনি বড়ো ভালবাসতেন দেশের মানুষকে। বৃটিশ এমপি হিসেবে স্বাধীনতার পর একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন বারনেস। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার সেই সময়ের স্মৃতি এখনও মনে পড়ে।
যুদ্ধবন্ধুরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখার সময় এভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন। তাদের কারও কণ্ঠ ছিল আবেগে উচ্ছল। আবার অনেকে বেশ উপভোগ করেছেন নানা দেখা অনেক ঘটনার ছবি নিজ দেখে। তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তারা বরাবরই বলেছেন, শুভ কামনা বাংলাদেশের জন্য।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে