Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯ , ৩ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (58 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-১২-২০১৫

লীলা মজুমদার: কঠোর নীতিবোধ সম্পন্ন কোমল কাহিনীকার

লীলা মজুমদার: কঠোর নীতিবোধ সম্পন্ন কোমল কাহিনীকার

শিক্ষিকাদের তত্ত্বাবধানে ইংরেজ বান্ধবীদের সঙ্গে ক্লাস করা, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে দিদির সঙ্গে স্কুল থেকে ফেরা, বর্ষা থেকে শীতে পাল্টাতে থাকা শিলং-এর আশ্চর্য রূপ, বাড়িতে কাজ করতে আসা খাসিয়া মেয়েদের মুখ থেকে সুযোগ পেলেই আজগুবি সব গল্প শোনা, লাইব্রেরি আর বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে একরাশ ইংরেজি বই জড়ো করে এনে গোগ্রাসে পড়া আর এসবের বাইরে একা একা ঘুরে বেরিয়ে প্রকৃতির ছোটখাটো মজা আর ভাললাগা কুঁড়িয়ে বেড়ানো। এই ছিল ছোট্ট লীলার আট বছরের রোজনামচা। আর তখন থেকেই শুরু তার গল্প লেখার।

বলছি লীলা মজুমদারের কথা। ভারতীয় শিশু-কিশোর সাহিত্যিক লীলা মজুমদার। ১৯০৮ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারি কলকাতার রায় পরিবারে জন্ম নেন তিনি। তাঁর বাবা প্রমদারঞ্জন রায় ও মা সুরমাদেবী। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন প্রমদারঞ্জনের ভাই এবং লীলার কাকা। সেইসূত্রে লীলা হলেন সুকুমার রায়ের খুড়তুতো বোন এবং সত্যজিৎ রায়ের পিসি। ১৯২২ সালে সন্দেশ পত্রিকায় লীলা মজুমদারের প্রথম গল্প লক্ষ্মীছাড়া প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায় সন্দেশ পত্রিকা পুনর্জীবিত করলে তিনি ১৯৬৩ থেকে ১৯৯৪ অবধি সাম্মানিক সহ-সম্পাদক হিসাবে পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০৭ সালে প্রয়াণ হয় তাঁর। গেল ৫ই এপ্রিল ছিল লীলা মজুমদারের মৃত্যুদিবস।

ছোট বেলা থেকেই গল্পের ভূত জেঁকে বসেছিল লীলা মজুমদারের মাঝে। চারপাশের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আট বছর বয়স থেকেই তাঁর মাথায় বাঁধতে শুরু করল মজার মজার সব গল্প। সেইসব গল্প ভাইবোনদের শুনিয়ে তাক লাগিয়ে দিতেন তিনি। ওই ছোট বয়সেই সম্ভবত তিনি টের পেয়েছিলেন, তাঁর সারা জীবনের কাজ হতে চলেছে এই লেখালিখি। তবে ছোট থেকে যে ভাষায় তিনি গড়গড় করে কথা বলতেন সে ইংরেজী ভাষাকে দূরে ঠেলে লেখার জন্য পুঁজি করেছিলেন বাংলা ভাষাকেই।

ছোট্টবেলাতেই শিলং-এর একটি বিকেলবেলা তাঁর মনে দাগ কেটেছিল। আর সেই বিকেলে যে সম্পর্কের সূত্রপাত হয়, তার চিহ্ন তিনি বহন করেছিলেন আমৃত্যু। সেই মানুষটি সম্বন্ধে লীলা এক কথায় লিখেছেন, ‘আমার মনে হয় এমন সুন্দর মানুষ পৃথিবীতে কম জন্মেছে।’ তিনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবি সপরিবার শিলং বেড়াতে গিয়েছিলেন যখন, বাবার হাত ধরে ছোট্ট লীলাও গিয়েছিল কবিকে দেখবে বলে। সেই তাঁর রবীন্দ্র-সংসর্গের শুরু। পরবর্তীতে খোদ কবিই তাঁকে ডেকে নিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে ।

শান্তিনিকেতনের কাজে মেতে থাকা, পরে মন-না-লাগায় সে-কাজ ছেড়ে চলে আসা, ফের শান্তিনিকেতনেই পাকাপাকি থাকার জন্য বসতবাটি তৈরি করা... মোট কথা, রবীন্দ্রনাথ আর শান্তিনিকেতনের তৎকালীন নির্ঝঞ্ঝাট প্রাকৃতিক আশ্রয়ের ছায়া তাঁকে বার বার টেনেছিল। এছাড়া উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভাতিজি আর স্বয়ং সুকুমার রায়ের ছোট বোন। এমন মানুষটির ভবিষ্যৎ বোধ হয় জন্মেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।

একদিন ‘সন্দেশ’-এর প্রথম সংখ্যা হাতে করে ভিতরমহলে এলেন কাকা উপেন্দ্রকিশোর। অমন সুন্দর পত্রিকা দেখে লেখার লোভ খুবই হয়েছিল তাঁর, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতেন না। শেষমেশ লেখা হল সন্দেশ-এ। বড়দা সুকুমারের নির্দেশে একখানা ছোট গল্প লিখে দিলেন, ছাপাও হল। নিজে নাম দিয়েছিলেন ‘লক্ষ্মীছাড়া’, বড়দা বদলে রাখলেন ‘লক্ষ্মী ছেলে’। আর তখন থেকেই, শিশুদের জন্য ছাপার হরফে নতুন এক ভালবাসার মানুষের আবির্ভাব হল, যার নাম তখন ছিল লীলা রায়। সন্দেশে লেখা বের হওয়ার পরপরই বিভিন্ন পত্রিকা থেকে ছোটদের জন্য গল্প লিখে দেওয়ার আর্জি আসতে লাগল লীলার কাছে। কিন্তু জীবন বরাবরই লীলাকে স্থিতি থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। উপেন্দ্রকিশোর গত হওয়ার পর সুকুমারের হাত ধরেই দিব্যি এগোচ্ছিল সন্দেশ, সেই তরুণ সুদক্ষ লেখক-সম্পাদকও মারা গেলেন অকালে।

সাহিত্যিক লীলা মজুমদারের সৃষ্টি তাঁর চারিত্রিক পেলবতারই প্রতিফলন, তাঁর স্বপ্নময় ভাবনারই প্রকাশ। কিন্তু তার আড়ালে লীলার ভেতর কঠোর নীতির একজন মানুষ লুকিয়ে ছিলেন, তাঁর জীবনকে না-জানলে সে-কথা বোঝার রাস্তা নেই। নীতিবোধ আর আত্মমর্যাদার প্রশ্নে কখনও কোন আপস করেননি লীলা। কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নয়, এমনকী, যেমন দেখা গেল, নিজের বাবার সঙ্গেও নয়।যে-মানুষটির উপস্থিতি রীতিমতো উপভোগ করতেন তিনি ছোটবেলায়, যে-মানুষটির রসবোধ চারিয়ে নিতেন নিজের মধ্যে, সবচাইতে ভালবাসার কয়েক জনের তালিকায় উপরের দিকে, সেই মানুষটির সঙ্গে তাঁর কথা বন্ধ হয়ে গেল। মানুষটি স্বয়ং তাঁর পিতৃদেব প্রমদারঞ্জন রায়। বাবার অমতে ডাক্তার সুধীন কুমার মজুমদারকে বিয়ে করেন লীলা। আর সেইসঙ্গে বন্ধ হল বাবার মনে যাতায়াত করার রাস্তা। তখন থেকে মৃত্যু অবধি লীলা মজুমদারের দিকে ফিরে তাকাননি তাঁর বাবা।

সন্দেশ পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর লেখালেখির জন্য আর কোন ছায়া খুঁজে না পেয়ে মহারানি গার্লস স্কুলে শিক্ষিকার পদে যোগ দেন ২৩ বছর বয়সী লীলা। কিন্তু সেখানেও বেশি দিন মন লাগল না। পরে রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে বিশ্বভারতীতে যোগ দেন লীলা। তবে বিশ্বভারতী বা অধ্যাপনা, কোনটিই তাঁর মনকে বেশিদিন সেই শান্তি দিতে পারল না, যার খোঁজে এতগুলো বছর হেঁটেছেন তিনি। ১৯৬১ থেকে খোদ সত্যজিৎ রায়ের উদ্যোগে ফের বেরোতে লাগল সন্দেশ, তাঁরই আর্জিতে তাঁর আদরের ‘লিলুপিসি’ সম্পাদনায় হাতে হাত মেলালেন। যে-পত্রিকা দিয়ে তাঁর গল্প লেখার শুরু, সেই পত্রিকারই পাতা এবার সেজে উঠতে লাগল তাঁর নিপুণ সম্পাদনার গুণে।

আর এই সমস্ত কিছুর মধ্যে, এই ভ্রাম্যমানতা, এই স্থিরতার খোঁজের সফর চলতে চলতেই দু’হাত ভরে তিনি লিখে গিয়েছেন অসামান্য, অবিস্মরণীয় লেখা। শেষ জীবনটা কলকাতাতেই কেটেছিল লীলা মজুমদারের। একেবারে শেষ দিকে স্মৃতি প্রতারণা করেছিল ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে আপামর বাঙালির স্মৃতিতে শতায়ু লীলার চিরকালীন আসনটি পাতা হয়ে গিয়েছে।

সূত্র: আনন্দবাজার

১২ এপ্রিল ২০১৫/১১:৪৮পিএম/স্নিগ্ধা/

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে