Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (165 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-১১-২০১৫

দূর দিগন্তের পানে

মোল্লা বাহাউদ্দিন


দূর দিগন্তের পানে

একদিন সবই গল্প হয়ে যায়। কালের স্রোতে পরিবেশ পরিস্থিতি বদলে যায়- গল্প মনে হয় অবিশ্বাস্য, কাল্পনিক। ঘটনাপ্রবাহের সাথে জড়িত চরিত্রগুলো গল্পকারের অলক্ষে হয়ে যায় নায়ক নায়িকা। কখনও ইতিহাস অথবা শুধুই গল্প। জীবন নদীর বুকে নানা আকারের অসংখ্য নুড়ি পাথর ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। কোনটা জ্বল জ্বলে, কোনটা তামাটে, কোনটা বালুরাশির সাথে মিশে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে গেছে। তার মধ্য থেকে কিছু তোলে মালা গাথার চেষ্টা করব। হয়ত এর কোন সাহিত্যিক মূল্য নাও থাকতে পারে।

বঙ্গ ভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলন ব্যর্থ। বঙ্গ ভেঙ্গে গেছে। ভারত ভেঙ্গে দুটি আলাদা স্বাধীন দেশের জন্ম হয়েছে। হিন্দুস্থান আর পাকিস্তান। হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক ভেঙ্গে রক্ত গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। মনির রাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবক দলে যোগ দিয়ে চট্রগ্রাম-কুমিল্লা ছুটোছুটি করে হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক ভঙ্গ রোদ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।  যা একবার ভেঙ্গে যায় তা জোড়া লাগলেও আসল জিনিষ হয় না। তবুও হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক তালি দিতে ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। মনিরের এক মুহুর্ত সময় নেই। এর মাঝে খবর এল তার আর একটি পুত্র সন্তান  পৃথিবীর মুখ আলোকিত করেছে। এটি তঁাঁর তৃতীয় পুত্র, সন্তানের দিক দিয়ে ষষ্ঠ। তিন কন্যা আর দু পুত্রের পর এই তৃতীয় পুত্র সন্তান। পুত্র সন্তান মানে এক দুর্লভ বস্তু। সেই মুহুর্তে বাড়ী এসে নবজাতকের মুখ দর্শন করার সময় নেই। তিনি খবর পাঠালেন নবজাতকের নামের জন্য কেউ যেন মাছিহাতা পীর ছাহেবের কাছে চলে যায় এবং একটি সুন্দর নাম নিয়ে আসে। মনিরের বড় ভাই এই দায়ীত্ব নিয়ে মনিরের বড় ছেলে নুরুকে মাছিহাতার পীর সাহেবের কাছে পাঠানো হল হুজুরের কাছ থেকে দোয়া সহ এই নবজাতকের একটি নাম নিয়ে আসার জন্য। কন্যা সন্তানের নাম নিজেরা রাখলে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু পুত্র সন্তানের নাম পীরছাব হুজুর নিজে রাখেন, এটাই নিয়ম। তিনি আল্লার অনেক কালাম খুঁজে, অনেক দোয়া দুরুদ পড়ে নাম ঠিক করে দেন। তাতে এই নামের অধিকারীরা দীর্ঘায়ূ, মেধাবী এবং পরিশ্রমি ও পরহেজগার হয়। তাই এখানকার মানুষ যারা মাছিহাতার মুরীদ তারা নিজেদের পুত্র সন্তানের নাম নিজেরা রাখে না। এমন কি কোন কাজই তারা পীর ছাবের হুকুম ছাড়া করে না। পীরছাব যা ঠিক করে দেবেন সেভাবেই কাজ হবে। এতে সন্তানের জীবনের বালা মুছিবত এবং আয়ূ সম্বন্ধে নিশ্চিত থাকা যায়। এর দায়ীত্ব নেন হুজুর নিজে। এই নাম দেয়ার জন্য হুজুর কোন হাদিয়া নেন না। অবশ্য জন্ম মৃত্যুর ভার আল্লাহর হাতে। দুর্ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে যায়। হুজুর তখন আল্লাহর হাতে সপে দিয়ে দায়ীত্ব চালান করে দেন। জন্মমৃত্যু আল্লাহর হাতে। তখন হুজুরের করার কিছু থাকে না।
পীরছাবের বাড়ী মাছিহাতা। মাছিহাতা গ্রামটা ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার কাছে পাগাচং ষ্টেশনের নিকট। ইচ্ছে করলে দিনে দিনে ফিরে আসা যায়। কেউ কেউ হেটেও চলে যায়, ফিরে আসে। সকালের ট্রেনে গেলে রাতে ফেরা যায়। নুরু ফিরে এল পরের দিন। কারণ দিনে দিনে ফিরতে গেলে তার অনেক কষ্ট হবে। সে এবং তার পিঠোপিঠি ভাই মানু নানার বাড়ীতে নানীর কাছে অনেক আদরে বড় হয়েছে। এখন তাদের বয়স চৌদ্দ ও ষোল। একদিন বই মাটি চাপা দিয়ে শিক্ষককে পালাগালালি করে দু ভাই গলাগলি করে নানীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, নানি, মাষ্টরে খুব মারে। স্কুলে আর যামুনা।
নানী বলল, আমার সোনামনিরারে মাষ্টরে মারে! থাওক, আর যাওনে কাম নাই।
সেই থেকে দু ভাই নানীর উপাদেয় খাদ্য ভক্ষন করে, তামাক বিড়ি টেনে, হেসে খেলে বড় হয়েছে। এখনও নানী বাড়ী টনকি যখন তখন চলে যায় যখন দেখে বাড়ীতে কোন কাজ করতে হবে। টনকি গ্রামটা তিন চার মাইল দূরে। পায়ে হেটে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। ঘন্টাখানেকের মাঝেই নানি বাড়ী পৌছা যায়। কোন রকমে পৌছতে পারলেই আর কাজ করতে হয় না। আবার যখন ইচ্ছে ফিরে আসে। কোন কাজ করে না, জানেও না, ইচ্ছে আছে বলেও প্রমাণ মেলেনি। অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী। এ ভয়ঙ্কর যে স্থান বিশেষে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তা ভোক্তভুগিই জানে। মাছিহাতা যাবার ব্যাপারটাও এমনিতে রাজি হয়নি। ট্রেনে চড়া যাবে, ভাড়া ছাড়াও উপরি পাওয়া যাবে। সেই লোভে সে এক কথায় রাজি হয়ে গেছে। আর একটা সুবিধে হল সে গত বছর মাছিহাতার ওরসমোবারকে এসেছিল বড় চাচার ছেলে মাফিল ভাইর সাথে। পথঘাট চেনে। মাছিহাতা থেকে নুরু ফিরে এসে বলল হুজুর তো বাড়ীতে নাই। কোথায় কোনখানে মুরিদের এলাকায় গেছে। কবে ফিরবে কেউ বলতে পারে না।
শুনে চাচা বললেন, তাহলে ছোট হুজুরের কাছে বললেই হত।
সেটা তো তুমি বলে দাওনি।
তখন বাংলা ঘরে বসেছিল কয়েক জন।  উত্তর পাড়ার যদু বলল, ছোট হুজুরের কাছে কয় নাই বালই করছে। জানেন না, করিমের ছেলেডার নাম ছোড হুজুরে রাখছিল, তার আটদিন পরই ছেলেডা মইরা গেল। বড় হুজুর আইলে আবার গেলেই অইব। অত তাড়াতাড়ি কি? ছোড হুজুর থেইক্যা অখন আর কেউ নাম রাখেনা।
নবজাতকের ভাগ্যটা খুব ভাল বলে মনে হয় না। তার তিনদিন আগেই ঘরের গাভীন কালা গাইটা হঠাৎ পড়ে মরে গেল। এখন নবজাতকের দুধের অসুবিধে হবে। তার মাঝে এই হুজুরের অনুপস্থিতি। এখন নামের কি হবে! কতদিন পর হুজুর ঘরে ফিরবেন কে জানে।
এই পীর-মুরিদ মূলধনবিহীন ব্যবসাটা তাদের পূর্বপুরুষের। ঔরস সূত্রে তারা করে আসছেন। কথাটা ঠিক হল না বোধ হয়। তাদের মূলধন আছে, পানি পড়া, তাবিজ দেয়া। এখন তিন হুজুর: বড় পীরছাব, মেজপীরছাব আর ছোট পীরছাব। বড়পীরছাব প্রধান। তার দোয়া বেশি কাজে লাগে। কোন কোন এলাকায় বছরে কত আয় হয় তা তাদের জানা আছে। তিন হুজুরের এলাকা বা সময় ভাগ করা আছে। কোন এলাকায় কোন হুজুর কবে যাবেন তা স্থির করেন বড় পীরছাব। বড় পীরছাবের এলেম বেশি, তাই মুরিদও বেশি। তিনি যদি সিলেট অঞ্চলে গিয়ে থাকেন তাহলে কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। কারণ ওখানে তাঁর নাবালিকা তৃতীয় বিবি আছেন। অকালে এই নাবালিকার মাতা পিতা দূর্ঘটনায় মারা গেলে তার আতœীয়স্বজন হুজুরের কাছে পরামর্শের জন্য হাজির হন। হুজুর অনেক চিন্তা ভাবনার পর ফতোয়া দেন যে, এই নাবালিকার শাদি দিয়ে তার অভিভাবক প্রয়োজন। পাত্র হিসেবে তিনি নিজকেই পছন্দ করেন। এতিম নাবালিকাকে শাদি করে তার পৈতৃক চা বাগান এবং বিষয় সম্পত্তির মালিক হয়ে মন দিয়ে দেখাশুনা করছেন। তাছাড়া সেখানে মুরীদ এবং টাকার সংখ্যা বেশি।। নিজের একটা চা চাগানও  আছে। হিসাবটা দেখতে হবে। নতুন বাগান কেনার চিন্তা ইত্যাদি অনেক কাজ থাকে। আর যদি ময়মনসিংহের দিকে গিয়ে থাকেন তাহলে তাড়াতাড়ি ফেরার সাম্ভাবনা আছে। সব সময় খবর রাখতে হবে কবে ফেরেন। 
আতুঁরঘরের মেয়াদ শেষ। হুজুর তখনও ফেরেননি। দোয়া ছাড়াই নিয়ম কানুন শেষ হয়ে গেল। সবাই দেখে বলল, গায়ের রং হবে একবারে খাঁটি আলকাতরা। 
অবশেষে দেড়মাস পর খবর মিলল। পীরছাব হুজুর ফিরেছেন। নুরুকে আবার পাঠানো হল। এই দেড় মাস নবযাতকে কোন নাম ছিলনা। যার যা ইচ্ছে সেভাবে সে নামেই ডেকেছে। হুজুর বহু পরিশ্রম করে, আল্লার অনেক কালাম পাঠ করে, অনেক খুঁজে, বহু দোয়াদরুদ পরে, একটা নাম ঠিক করলেন। তার সাথে বহু আয়াত  পরিক্ষা নিরীক্ষা করে একটা তাবিজ দিলেন। যে তাবিজের মরতোবা তিনি এবং একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। নামের জন্য কোন হাদিয়া লাগে না, তবে তাবিজের দাম পাঁচ সিকে দিতে হয়।
পাঁচসিকে দাম! তওবা, তওবা! দাম নয়, হাদিয়া পরিশোধ করে তাবিজ এবং নাম নিয়ে মোল্লা বাড়ীতে পৌছানো হল। নামটি শুনে সবাই খুশি হয়ে হাত তোলে দোয়া করলেন। 
বঙ্গ ভঙ্গ রোধ, হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক ভঙ্গ রোধে ব্যর্থ হয়ে ভগ্ন হৃদয়ে মনির বাড়ী ফিরে এলেন। পরাজিত সৈনিক। এসে দেখলেন তার যৌথ পরিবারও ভেঙ্গে গেছে। দ্বিতীয় পরাজয়। যৌথ পরিবার ভঙ্গুর। একদিন ভাঙবেই। রোধ করা যায় না। ভাইরা পৈতৃক সম্পত্তি ভাগাভাগি করে যার যার  হিস্যা  বুঝে নিয়েছে। মনিরের ভাগে কোথায় কতটুকু পড়ল সেগুলো বুঝে নিতে তার যথেষ্ট সময় লাগল। একান্নবর্তী পরিবার যখন ভিন্ন হয়ে যায় তখন ভাই আর ভাইর স্বার্থ দেখেনা, নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। মুখোমুখি হয়ে গেলে মনে হয় চেনা চেনা। ভঙ্গ মানে সবকিছুই ভেঙ্গে যাওয়া। যেমন বঙ্গ ভঙ্গের সাথে সাথে হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক ভঙ্গ, একে অপরকে জবাই করতে দ্বিধা করেনি। অথচ দুদিন আগেও তারা ছিল বন্ধু। পরিবার ভঙ্গে ভাইদের মাঝে তেমন কিছু হয়নি। নিজেদের স্বার্থ নিয়েই তারা ব্যস্ত।
হালচাষ জমিজমার কাজ সম্বন্ধে মনির একবারেই অজ্ঞ। চাষাবাদ শেখার সুযোগও আসেনি তার। মোল্লা বাড়ীর সবচেয়ে আদরের সন্তান, মাদ্রাসা বাদ দিয়ে মোল্লা বাড়ীর রীতিনিয়ম ভঙ্গ করে তিনিই প্রথম বাংলা/ইংরেজি স্কুলে যাওয়া শুরু করেন। তাই চাষাবাদ থেকে তাকে দূরেই রাখা হয়েছে। সেও দুবরাজ মিয়ার ইচ্ছেয়। ফুফাত ভাই হাবিবুর রহমান চৌধুরি ওরফে দুবরাজ মিয়া কংগ্রেসের একজন নেতা। কংগ্রেসের আরও দুজন নেতা মালেক মিয়া এবং কাজী শামসুদ্দিন খাদেমের সান্নিধ্যে এসে মনির স্কুলকে দেশের কাজের চেয়ে গৌন মনে করে দেশের কাজে যোগ দেন। ছাত্রজীবনে সংগ্রামে জড়িয়ে পড়লে লেখাপড়া হয় না। মনিরের বেলায়ও অন্যথা হয়নি। দুবরাজ মিয়ার সংগ্রামি জীবনে তিনি জড়িয়ে পড়েন। স্বাধীনতার পর দুবরাজ মিয়ার পরামর্শে মনির হোমিওপ্যাথি শিখেন। দুবরাজ মিয়া বলেছিলেন, মনা, দেশ তো স্বাধীন হচ্ছেই। বাড়ী গিয়ে একটা কিছু করতে হবে তো! দেশে কোন ডাক্তার নেই। হোমিওপ্যাথিটা শিখে গেলে দেশের অনেক উপকার হবে, নিজের সময়ও কাজে লাগবে। অনেকটা চাপের মুখে মনির হোমিওপ্যাথি শিখে এল। এখন মনির ডাক্তারি করার প্রস্তুতি নিচেছ। 
এই অজ এলাকায় ডাক্তারের বড় অভাব। কুমিল্লা জেলার (তখনও ত্রিপুরা নামে পরিচিত, বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া) এই এলাকাটা সবদিকদিয়েই পিছিয়ে আছে। এক আজব জায়গা। কসবা রেল ষ্টেশন থেকে ছয়সাত মাইল পূর্ব উত্তরদিকে ইন্ডিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত। এখানে যেমন শিক্ষা ব্যবস্থা অবহেলিত তেমনি যাতায়াত ব্যবস্থা। শিক্ষার হার শূন্যের কোঠায়। যাতায়তের ব্যবস্থা পথব্রজ অথবা একমাত্র রেলগাড়ীই সম্বল। নিকটবর্তি ষ্টেশন এখান থেকে তিন চার মাইল কসবা অথবা গঙ্গাসাগর। স্টেশনে পৌঁছতে হলে অনেক খালবিলনদী পেরিয়ে তবেই পৌঁছতে হবে। শাসন ব্যবস্থাও অদ্ভুদ। সরকারি নির্দেশ এখানে আদৌ পৌঁছেনা। পৌঁছলেও বহুদিন পর। হয়ত বা তখন এর প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়। এহেন এলাকায় ডাক্তারের বড় প্রয়োজন। সে যে কোন ডাক্তার হোক। ডাক্তার মনিরের পশার জমতে সময় লাগেনি। কৃষিকাজ কামলার উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। সেভাবেই চলল দিন।
তিনি বাড়ি ফিরে নবজাতককে নিয়ে কোন আনন্দ করলেন না। কারন প্রথম সন্তানের প্রতি মাতাপিতার যে আদর যতœ এবং আকর্ষন থাকে পরবর্তি সন্তানের প্রতি তেমন থাকেনা। তারপরও পুত্র সন্তান বলে কথা। তিনি নবজাতককে কোলে নিয়ে আদর করলেন। হাত তোলে দোয়া করলেন, জীবনে মানুষের মত মানুষ হও। আল্লাহর উদ্দেশ্যে বললেন, আল্লাহ, তোমার মাল আমার হাতে আমানত। আমাকে তৌফিক দাও, আমি যেন এই দায়ীত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারি।

-২-

সে মালটা আমি, নামটা আমার। আল্লার মাল বাবার হাতে আমানত। বংশের পদবী হিসেবে মোল্লা যোগ করতে হয়েছে। আমি বেঁচে আছি। কার দোয়ায় জানি না। তাবিজের জোড়ে, নাকি নামের কারনে, নাকি আল্লাহর মেহেরবানীতে। তবে শারিরীক গঠন একেবারে ঢিলেডালা, মা বলতেন কেউ ভয়ে কোলে নিত না। ওজন এত ছিল যে মা নিজেও আমাকে বেশির ভাগ সময় শুইয়ে রাখতেন। লুকিয়ে রাখতেন মানুষের নজর থেকে। এত লুকিয়ে রেখেও শেষ রক্ষা হল না। নজর লেগেই গেল। একদিন দুপুরে আমাকে বিছানায় শুইয়ে মা গিয়েছিল গোসল করতে। এমন সময় পাড়ার মালেকের মা এসে হাজির। আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। আনোয়াবাবু কাছে থেকেও কিছু করতে পারেনি। সেই নজর লেগেই গেল। একবারে ম্যালেরিয়া। বাঁচার আশা নেই। এ ছেলে কুফা, জন্মের পর হুজুরের দেখা নেই,  এখন কালা জ্বর। এসব দেখে মনে হয় লক্ষন খুব সুবিধের নয়। সেই জ্বরে বাবার ঔষধে কাজ হয়নি দেখে পীরছাব হুজুরের পানি পড়া খেয়ে তাজিবের জোড়েই ভাল হয়ে যাই। কিন্তু শরীরের ওজন আর নেই। আমি এখন শুকনো লিকলিকে চামচিকে। দু দুটো তাজিব নিয়ে বেঁচে আছি। 
এখানকার মাতাপিতারা ব্যবসায়ী। সন্তান উৎপাদনে। নিঃস্বার্থভাবে কেউ সন্তান উৎপাদন করে না। তাদের হিসেব একটা কন্যা সন্তান জন্ম হলে বড় হয়ে চলে যাবে অন্যের ঘরে। কাজেই তাকে যত অবহেলা অনাদর সহ্য করতে হয়। জন্মের পরই যেন এটা অন্যের। নিজের ঘাড়ে চেপেছে। যত তাড়াতাড়ি বিদেয় করা যায়। তার কাছ থেকে কোন লাভ আশা করা যায় না।
পুত্র সন্তান মানে বৃদ্ধ বয়সের সঞ্চয়। খুব যতনে সাবধানে লালনপালন করে। তারা বড় হয়ে রোজগার করবে, কৃষি কাজে সাহায্য করবে, নিজের হাতে সব কাজের ভার নিয়ে মাবাপকে ছুটি দিয়ে সুখ দেবে। অপরিসীম সুখ। এটা সাধারণ হিসেব। কোন কোন সময় হিসেবে গড়মিল হয়। বিয়ের পর ছেলে তার স্ত্রী নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। তখন হিসেব মেলেনা। নতুন করে ভবিষ্যতের ছক তৈরী করতে হয়। এখানে মায়ের ভূমিকা প্রায় নেই। মেয়ের জাত, কোন ধর্তব্যের মধ্যে নেই। ব্যতিক্রম ক্বচিত দেখা যায়। বাপের গর্ব। ছেলেকে জন্ম দিয়েছি! আমাকে দেখাশোনা করা তার দায়ীত্ব! করতেই হবে যে! যে কবেই হোক। তারা ভাবেনা এ সন্তানের জন্ম তার ভোগের ফসল। আনন্দ ফুর্তির ফল। স্ত্রীসহবাস, যৌবনের উত্তাল উন্মাদনার ফল। আগে নিজে যৌবনকে উপভোগ করেছে, সন্তান এসছে পরে তার চিহ্ন নিয়ে। এখন মাতাপিতার কর্তব্য সে ভোগের ফসলকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। সেসব কথা কারও মাথায় আসেনা। শুধু  হিসেব ঃ আর কয় বছর পর হালচাষ করতে পারবে, কবে বিয়ে দেবে, ছুটি নেবে। কবে জন্ম হল তার কোন হিসেবে নেই। শুধু বছরটা কেউ কেউ মনে রাখে। তার বেশি প্রয়োজন নেই।
আমাদের বাড়ীর দক্ষিনে একটা পুকুর আর উত্তরে একটা পুকুর। আমি বড় হচ্ছি। আবছা যতটুকু মনে পড়ে, আমার পৃথিবীটা এই বাড়ী, বাড়ীর দক্ষিনে পুকুর পাড়। ধীরে ধীরে পাশের রহমতদের বাড়ী, তারপর পুবের বাড়ী। কিন্তু উত্তর বাড়ীতে নয়। উত্তর বাড়ী মানে ছাড়া বাড়ী। ছাড়া বাড়ীর আন্ধা পুকুরের ধারে কাছেও নয়। ওখানে দিনের বেলায়ও ওনারা দেখা দেন। কথা শিখার আগেই যেন সকলের মুখে এটা শুনে আসছি, ছাড়া বাড়ীতে যাবেনা! আমার খেলার সাথী ছোট চাচার ছেলে রহিমুদ্দিন ওরফে রমা, আর পাশের বাড়ীর রহমত। সকলের কাছেই ছাড়া বাড়ী নিষিদ্ধ এলাকা। মহা আতঙ্ক।
দক্ষিনের পুকুরের দক্ষিন পাড়ে দুটা বড় আম গাছ। পুকুরের পাড় ঘেষে দক্ষিণে সিনাই নদী, তারপর মাঠ, চক পেরিয়ে বহুদূর পর্যন্ত ফসলি জমি। আরও দূরে মধুপুরের পাহাড়বন। সর্বদা আবছা কুয়াসায় ঢাকা। চৈত্রের খরতাপে, চারদিক যখন মরিচীকার ঢেউ খেলে বেড়ায় তখন এই বৃক্ষ ছায়া তলে হাওয়া  এসে প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। সেই দূর মধুপুরের পাহাড় থেকে রওয়ানা দেয় এই হাওয়াটা। চান্দের চড়ের বিলের উপর দিয়ে, নোয়া গা ছাড়িয়ে, নাইপতাবেড়ির মাঠ, কবরখলা পেরিয়ে, নদীর জলে ঢেউ তোলে এই আম গাছের নীচে দিয়ে, পুকুরের পশ্চিম পাড়ে এই এলাকার বিশাল তিনটা শিমূল গাছের পাতা নাড়িয়ে, আমাদের বাড়ীর গাছগাছালির উপর ঢেউ তোলে, উত্তরে ছাড়াবাড়ীর চিরঅন্ধকার গাছ আর বাঁশঝাড়ের উপর দিয়ে, তার উত্তরে নামাবাড়ীর কবরখলার বিশাল জাম গাছাটা ছাড়িয়ে কোথায় চলে যায়! অথবা ভাদ্রের তালপাকা গরমে, বা আশ্বিনের গুমোট স্তব্ধ দুপুরে যখন পাট পচা গন্ধে চারদিক একটা গরম চাদরে ঢেকে যায় তখনও এক ফোটা হাওয়া পাওয়ার আশায় অনেকেই এই আম তলায় চলে আসে। কেউ খালি হাতে, কারও হাতে হুকা তামাক, একটা দড়িতে আগুন, কারও হাতে একটা বালিশ এবং চাটাই। কেউ ঘুমিয়ে পড়ে।
শীতের দিনে আসে চাদর মুড়ি দিয়ে। তখন উত্তরে হাওয়া আসে। ধীরে ধীরে। আমতলায় জোড়ে বয়না। এখানে খুব সকালে রোদ আসে। পূর্বদিকে খালি। কয়েক বিঘে জমির পর নদীটা বেঁকে পূর্বে চলে গেছে। তারপর বুরো জমি, গানপুরের বিল। রোদ তীর্যকভাবে আমতলায় এসে পৌঁছে। বেলা বাড়ার সাথে সথে তারা স্থান পরিবর্তন করে। পুকুর পাড়েই। একটু পূর্বে বা পশ্চিমে। সুবিধেমত। কেউ চিড়েমুড়ি নিয়ে আসে। বসে বসে চিবোয়। পূর্বে দক্ষিণে পশ্চিমে কুয়াসা ঢাকা জগতটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে।
বড় চাচা পুকুর পাড়ে আম গাছ তলেই বেশিরভাগ সময় থাকেন। যত রকমের কাজ, বাঁশের, বেতের, কাঠের সব কাজ জানেন চাচা। নিজে নৌকা তৈরী করেন। পায়ের খড়ম, টেবিল, চেয়ার, খাট পালং। সব পারেন তিনি। তিনি কাজ করেন আর আমি সাথে থেকে অকাজ করি। তিনি বিরক্ত হন না। কারণ আমি ছেলে। 
বাড়ীর ভাইবোনদের সাথে মারামারি খেলাধূলা করে, রমা রহমতকে নিয়ে দৌড় ঝাপ দিয়ে, মাকড়সার জাল দিয়ে ফরিং ধরে, লেজে সূতো বেধে দিনগুলো ভালই কাটছিল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পাড়ার অনেকে আসে নালিশ নিয়ে। কচি পাট ক্ষেতের উপর দিয়ে ঘুড়ি নিয়ে দৌড় দিলে বাড়ীতে নালিশ আসে। পাশের বাড়ীর ফুলিকে ঢিল মারলে নালিশ আসে, ফালানিকে পানিতে চুবিয়ে দিলে নালিশ, গাছের শশা খেলে, কারও ছাগলকে ঘোড়া হিসেবে ব্যবহার করলে নালিশ আসে। সমানে তিন জনের বাড়ীতে। যখন বিচারে শাস্তি সাব্যস্ত হয় তখন এক দৌড়ে চলে যাই বড় চাচার কাছে। আর পায় কে ? সব মাফ
সুখেই ছিলাম। কপালে নেই। হঠাৎ একদিন সব উলটপালট হয়ে গেল। বাবা আমাকে স্কুলে পাঠাবেন। অথচ এ পাড়া থেকে আর কেউ স্কুলে যায়না। আমার প্রতি এটা বড় অন্যায়।
এতদিন বাড়ীতে হাফিজসাব হুজুরের কাছে মাঝে মাঝে পড়তে গিয়েছি। বাড়ীর আর সব ভাইবোনদের সাথে। যেহেতু আমি ছোট, তেমন বাধ্যবাধকতা নেই। বিসমিল্লাহ সহ বেশ কয়েকটা সুরা মুখস্থ করে ফেলেছি এরি মধ্যে। হাফিজসাব বলেন, আমার স্বরণশক্তি অসাধারণ। আদর দিয়ে শেখাতে হবে। তাই আমি ছাড়া জালিবেতটা সবার উপরই ব্যবহার হয়েছে। আমার সুবিধেমত, আমার ইচ্ছেমত  পড়তে আসা যাওয়া। কোন ভয়ের কিছু ছিলনা। কিন্তু স্কুলটা যে অন্যকিছু। সেখানে যে অনেক ভয় লুকিয়ে আছে।
আমি কাল স্কুলে যাব মানে যেতেই হবে। আমার বয়স কত, সঠিক জন্ম তারিখটা কবে, তা কেউ জানে না। এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়না। কোন পরিবারেই কারও জন্মদিন মনে রাখার নিয়ম নেই। মাতাপিতার ঘরে যখন অনেক সন্তান সন্ততিতে ভরে যায় তখন কার খবর কে রাখে। প্রায় প্রতিটি ঘরে সন্তান সন্তনি অনেক। একটা প্রতিযোগিতা। কে বেশি সন্তান উৎপাদন করতে পারে। যার যত বেশি পুত্র সন্তান সমাজে তার তত বেশি মর্যাদা। কারও সন্তান পীরছাব হুজুরের দোয়ায় বেঁচে থাকে, কারওর থাকেনা। তাতে উৎপাদনে বিরতি নেই। চলতেই থাকে। মরতে মরতে ঝরতে ঝরতে যে কয়টা থাকে। সন্তান কি হল, মেয়ে না ছেলে সেটাই বড় কথা। ছেলে হল বংশের বাতি। বৃদ্ধ বয়সের আশ্রয়। জন্ম তারিখ নিয়ে কি হবে! ছেলে মেয়ে মানুষ হবে কিনা, বা কিভাবে করতে হয় সে ভাবনা তাদের নয়। জান দিয়েছে যে রিজিক দেবে সে। এইই এখানকার নিয়ম।
বড় হয়ে, পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে এসে, অনেক ঘাটের জল খেয়ে, জন্ম তারিখটা প্রয়োজন অনুভব করতে বাধ্য হয়ে, মাকে জিজ্ঞেস করেছি, মা আমার জন্ম তারিখটা কবে ছিল। মা উত্তর দিয়েছেন, তোমার জন্ম আশ্বিন মাসে। তখন এমুন গরম আছিল যে গাছের একটা পাতাও লড়ে না (নড়েনা)। চারদিকে হুদা (শুধু) নাইলা (পাট) পচা গন্ধ। এইখানে পাটের গাদা, পঁচা পাট, হুকনা (শুকনো) পাট, পাটের হোলা (সোলা) চাইরদিকে ভইরা আছে। উডানে (উঠান) পুকুইর পারে, ছাড়া বাড়ীর পুকুইর পাড়ে, কোনখানে পা ফেলানোর জায়গা নাই। হেই দুপুরে তোমার জন্ম।
তাহলে আমার জন্ম পঁচা গন্ধের মাঝে ?
তখন তো সব খানেই পঁচা গন্ধে ভরা। নাইলা না পচাইলে পাট লইব কেমনে ?
তা বুঝলাম। আমার জন্ম পঁচা গন্ধের মাঝে আশ্বিন মাসে। যদি আশ্বিন মাস হয় তাহলে ধরে নেই সেটা ইংরেজি সেপ্টেম্বর/অক্টোবর মাস। কিন্তু কোন বছর ? সেটাইতো আসল।
ওইযে, যে বছর পাকিস্তান অইল। তার পরেই।
তাহলে এখন নিজের জন্মদিন নিজেই স্থির করে নিতে হবে। তার মানে সেপ্টেম্বর/অক্টোবর ১৯৪৭ সাল।
স্কুলে প্রথম দিন যাবার সময় মায়ের হিসেব অনুযায়ী, আমার বয়স সাড়ে চার বছর অথবা পাঁচের কাছাকাছি। স্কুলে যাবার বয়স হয়েছে কিনা জানি না। যদিও এ গ্রামে এ বয়সে স্কুলে যাবার রেওয়াজ নেই। যদি কেউ যায় তাহলে খুব পোক্ত হয়েই স্কুলে যায়। বাবার ধারণা আমি এখন থেকেই স্কুল শুরু করতে পারব। হাফিজসাবও বলেছেন। আমার মাঝে তিনি পাগলামি আর বুদ্ধি দুটোই দেখেছেন। স্কুলে আমি ভাল করবই।  এ তাঁদের বিশ্বাস। মাঝে মাঝে বাবা মাকে বলতে শুনেছি, বড় দুটার মত দামড়া করে স্কুলে দিলে আগেই ফাঁকি শিখে ফেলবে। এবং সেই রকমই হবে। আমি নিজে তার পড়াশুনার দায়িত্ব নেব।

-৩-

স্কুলে যাব সে চিন্তায় সারারাত ঘুম হয়নি। ক্ষনে ক্ষনে ঘুম ভেঙেছে। আর স্কুলটাকে কল্পনায় নানাভাবে সাজিয়েছি। শিক্ষক কেমন, ছাত্ররা কেমন, কেউ আমার সাথে মারামারি করবে কিনা, মারামারিতে আমি তো কারও সাথে পেরে উঠবনা। কারণ আমার শারিরীক গঠন এমন যে একটা থাপ্পর দিলে পরে যাব। আর উঠতে পারবনা। এসব অনেক চিন্তা। বড় বোন রুসেনা বলেছে পড়া না পারলে শিক্ষকরা নাকি বেত দিয়ে মারে, বেঞ্চের উপর দাড় করিয়ে রাখে। এজন্যই ও স্কুলে যাবে না। অবশ্য বাবা বলেছেন পড়া বলতে পারলে শিক্ষক কোন শাস্তি দেন না বরং খুব আদর করেন। স্কুলে খেলা আর পড়ার সময় পড়া। তাহলেই শাস্তি দেয় না। এমনি ভাবনার মাঝে আযানের ধ্বনি ভেসে এল। প্রথমে আমাদের মসজিদ থেকে। তারপর নোয়াগা তার সাথে আরও দূরের কোন মসজিদ থেকে ধ্বনি ভেসে আসছে। তারপর আরও বহুদূর থেকে অস্পষ্ট  ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। সেসব মসজিদ কতদূর কে জানে!
আজান শেষ হতে না হতেই শুরু হল হুলুধ্বনি। কাশের ঘন্টা। চারদিক থেকে। হুলুধ্বনিটা যেন চারদিক থেকে উপছে পড়ছে। ছন্দের তালে তালে ওই ঘন্টাধ্বনি আর হুলুধ্বনি বেজে চলেছে।
এখন কয়টা বাজে বা কতক্ষন পর সাতটা বাজবে সে সব সময়জ্ঞান আমার নেই। বাবা বলেছেন এখন মর্নিং স্কুল। সকাল সাতটায যেতে হবে।  নামাজ শেষ করে বাবা ডাক দিলেন, উঠে হাত মুখ ধুয়ে প্রস্তুত হয়ে নাও।
বাবার জীবন যাত্রা এবং কার্যক্রমের একটা তালিকা আছে। এই তালিকার বাইরে খুব একটা নড়চড় হয় না। রাত অর্ধেক হলেই ঘুম থেকে উঠে পড়েন। জিকির পরে তাহাজ্জুত পড়েন, তারপর ফজর নামাজ পরে কিছু খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নেন। দুপুরে গোসল করে নামাজ পড়েন, খাওয়াদাওয়া করে একটু বিশ্রাম, তারপর আসর পরে পুকুর পার নদীর ধার দিয়ে একটু বেড়ানো। মাগরেব, এশা পরে একটু ঘুমিয়ে নেন। এই তাঁর জীবনের ছক বেঁধে দেয়া হয়েছে।
ডাক্তারি থেকে সরিয়ে তাঁকে বাধ্য করা হয়েছে এই অলস অকর্মন্য জীবন যাপনে। তাঁর দু ছেলে এখন লায়েক হয়েছে। বাবার পশার অনেক। রুগী বাড়ীতে ধরে না। লাইন পুকুর পারে চলে যায়। এখানকার মানুষ বড় গরীব। চিকিৎসাশেষে ঔষধের দাম দিতে পারেনা। বাবা ফিরিয়ে দিতে পারেন না। বলেন পরে দিয়ে দিও। সে আর কোনদিন দেয়না। এমনি করে প্রতি বছর পৈতৃক ফসলি জমি বিক্রি করে চলছিল ডাক্তারি। এ অবস্থা দেখে নুরু মানু দু ভাই মামার শরনাপন্ন হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ডাক্তারির আর প্রয়োজন নেই। সব ছেড়ে দিয়ে আল্লাহ আল্লাহ কর। ছেলেরাই সব দেখবে। জমি জমা যা আছে তা দেখাশুনা করলেই চলবে। ডাক্তারির প্রয়োজন হবে না। নুরু মানু দুজনে মহা উৎসাহে দায়িত্ব নেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। মামা সব ব্যবস্থা করে গেলেন। কামলার সাথে নুরু মানুও খাটবে। সেই থেকেই বাবার ছুটি। শুধু এবাদত বন্দেগি করা।
বাবার কথামত উঠে পড়লাম। ঘাটের পাশে ছোট ঝোপ। একটা পিছলা গাছের ডালা ভেঙ্গে মেছওয়াক বানিয়ে দাঁত মেজে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে এসে দেখি মা গরম ভাত বেড়ে দিচ্ছে। আজ আমার স্কুলের প্রথম দিন। ঘরের বড় রাতাটা জবাই করেছে। আজ আনন্দের দিন। মা কখন উঠে মোরগ জবাই করে ভাত রেধেছে তা টেরও পাইনি।
খালি পায়ে নতুন জামা পড়ে বাবার পিছু পিছু রওয়ানা দিলাম। হাতে একটা “শিশু শিক্ষা” বই। আর একটা শ্লেট। পকেটে পেন্সিল। তবে কাঠের পেন্সিল নয়, মাটির তৈরী। শ্লেটও মাটির তৈরী। এই পেন্সিল শুধু শ্লেটে লেখার জন্যই। বাবা কসবা বাজার থেকে কিনে এনেছেন দুদিন আগে। হিয়াইল্লা বাড়ী পেরিয়ে উত্তরে গোপাটে দাঁড়িয়ে বাবা বললেন ঐ তো স্কুল। এই গোপাট দিয়েই তুমি স্কুলে যাবে। ডানদিকে ওটা বুলাই বিল। বিলের পর কড়াবাড়ীর আমকাঠালের জংগল। ওই জংগলে কোনদিন যাবেনা। তাকিয়ে দেখলাম সামনে বুলাই বিল যেন বিল নয়। একটা দীঘির আকারের পানি জমে আছে। তার চারদিকে সবুজের আস্তরন। ধানের কচি চারা গজিয়ে সমস্ত বিলটাকে সবুজে ঢেকে দিয়েছে। এখন সবুজ মাঠ। বাবা বললেন এখন বুলাই বিল খুজে পাবে না। বর্ষা হলেই দেখবে এটা কত বড় হয়ে বিল হয়ে গেছে। ওই যে পুব দিকে মুড়া দেখছ সেখানেও পানি ভরে যাবে, তখনি এটা বিলে রূপান্তরিত হবে। কড়াবাড়ীর আম কাঁঠালের জঙ্গলটার দিকে তাকালাম। মনে হয় একটু সবুজ ছবি, গাছের নীচে অন্ধকারে ঢেকে আছে সব। গোপাট ধরে যতই স্কুলের কাছাকাছি আসছি ততই বুকের ধুকধুকানি বেড়ে যাচ্ছে। দেখি স্কুলের সামনে একটা তেতুঁল গাছ। তেঁতুল গাছের  নীচে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে এক সাথে কি যেন চিতকার করে বলছে। কাছে আসতে দেখি  একজন সামনে দাঁড়িয়ে যা বলছে সবাই একসাথে তাই বলছে। তিন দশ তিন তেত্তিশ। তিন দশ চার চৌত্রিশ। তাদের পাশ দিয়ে বাবার সাথে সোজা চলে গেলাম স্কুল ঘরের ভেতর। একজন লোক কয়েকটা খাতা নিয়ে কি যেন দেখছে। তার কাছে গিয়ে বাবা বললেন, এই যে মুসলেম, তোমার জন্য নতুন একজন ছাত্র নিয়ে এসেছি। আজ থেকে তোমার জিম্মায দিয়ে গেলাম। আমার দিকে ফিরে বললেন, এই তোমার শিক্ষক মুসলেম। মন দিয়ে লেখাপড়া করবে, শিক্ষকের কথা শুনবে। বলে বাবা চলে গেলেন।
মুসলেম স্যার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি ?
নাম বলার পর তিনি একটা খাতায় লিখে নিলেন। একটা হুগলার চাটাই দেখিয়ে বললেন, এখানে তুমি বসবে। এখন বাইরে লাইনে গিয়ে দাঁড়াও।
আমি যখন লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম তখন লাইন বলছে, নয় দশ এক একানব্বই। আরে! এগুলি তো আমি পারি! এতগুলি পোলাপান এক দুই পারে না! বাবার কাছে শিখেছি। ওরা কেউ পারে না। আমার মনে হল আমি তাদের চেয়ে ভাল। এভাবে দশ দশে একশ বলার সাথে সাথেই ঝড়ের বেগে ছেলেরা চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। ছেলেমেয়েরা যার যেমন ইচ্ছে ছুটো ছুটি করছে। আমার কোন বন্ধু না থাকায় তেঁতুল গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে অবস্থা বুঝবার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিছুক্ষন পর ঘন্টা বেজে উঠল। যন্ত্র চালিতের মত দৌড়ে সবাই যার যার ক্লাশে চলে গেল। আমিও তাদের অনুসরণ করে আমার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসলাম।
কতক্ষণ পর মুসলেম স্যার এসে বললেন তোমরা স্বরবর্ণ লেখ, বলে অন্য ক্লাশে চলে গেলেন। অন্য ক্লাশে মানে বাঁশের বেড়া দিয়ে এ ঘরটাকে দু ভাগ করা হয়েছে। এক পাশে আবার দু ভাগ করে এক দিকে প্রথম শ্রেণী  আর এক দিকে  দ্বিতীয় শ্রেণী করা হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণীকে কি লিখতে বলে গেলেন তা খেয়াল করিনি। আমি এক মনে অ,  আ লিখতে শুরু করলাম।
লেখা শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ হল। কিন্তু শিক্ষক আর আসে না। বেড়ার ও পাশ থেকে একজন  দামড়া সাইজের ছেলে চিৎকার করে বলছে, আজ সবাইর ছুটি, মুসলেম স্যার আজকে আর আইবনা। যাও, সবাইরে ছুটি দিয়া দিলাম। আমারে কইয়া গেছে ছুটি  দিয়া দেওনের লাইগা।
বেড়ার এপাশ থেকে ওপাশে আসা যাওয়ার জন্য দরজার মাপে জায়গা খোলা আছে। দামড়া ছেলেটা এ পাশে এসে সবাইকে বলল, তোমাদের ছুটি। ছেলেটা একটা পা খুড়িয়ে  চলে। অনেকগুলো বই হাতে। তার পেছনে আরও কয়েকটা ছেলে। একজন জিজ্ঞেস করল, ফুলু ভাই, স্যার গেল কই ?
ক্ষেতে কাম করতে গেছে গা, আর কই যাইব ? চল, চল বাড়ি যাই।
তার পরদিন শিক্ষক স্কুলে আসতে পারেননি।
শিক্ষক যেদিন আসেন, সেদিন একটা না একটা কাজ দিয়ে তিনি চলে যান। আর ফুলমিয়া এই সুযোগটা ব্যবহার করে। নিজের ইচ্ছেমত সবাইকে ছুটি দিয়ে দেয়। এমনি করে চলল কয়েক মাস।

-৪-

চন্ডিদ্বার বাজার বসে সপ্তাহে দুদিন। সোম আর শুক্র। একদিন বায়না ধরলাম বাবার সাথে চন্ডিদ্বার বাজারে যাব। বাবা রাজি নন, মায়ের সুপারিশে অনুমতি মিলল। বাবার পিছু পিছু হাটছি আর ভাবছি, বাজার দেখতে কেমন। নিশ্চয়ই একটা বড় আকারের দোকান যেখানে সব পাওয়া যায়। আমাদের পাড়ার মালেকের মার দোকানে গুড়মুড়ি, বুট বাদাম ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না। তাও  পয়সা দিয়ে নয়, পাটের বদলে সে বুট বাদাম বিক্রি করে। আমার পৃথিবীটা পুকুর পাড়, পাড়া ছাড়িয়ে দুমুইরার স্কুল। এখন তার পরিধি আরও বেড়ে গেল। একবারে চন্ডিদ্বার বাজার। এমন ভাবতে ভাবতে চলতে চলতে হঠাৎ একটা গুম গুম আওয়াজে চমকে উঠলাম। কখন চন্ডিদ্বার পৌঁছে গেছি জানিনা, একটা বাড়ীর মোড় পার হতেই গুম গুম শব্দটা কানে এসে ধাক্কা দিল। তাকিয়ে দেখি একটু দূরে অনেক, অগণিত মানুষ। এক সাথে, এক জায়গায়। যেন মৌচাক। এই কি বাজার ?
বাবা ওটা কি ?
ওটাই তো বাজার।
এ্যা! এটা বাজার! এত মানুষ! আরও কাছে এগিয়ে যাচ্ছি। শব্দ বাড়ছে। একটা থেকে অনেক শব্দের আওয়াজ আলাদা হচ্ছে। একেবারে কাছে গিয়ে বুঝলাম আলাদা আলাদা শব্দগুলো একত্রিত হয়ে একটা বিকট গুম গুম আওয়াজ তৈরি হচ্ছে। এখানে এত অগণিত মানুষের মাঝে হারিয়ে গেলে আর খোজে পাওয়া যাবে না। বাবার হাতে ধরে ফেললাম শক্ত করে।
ভেতরে ঢুকে দেখি এলাহি কান্ড! অগনিত জিনিষ, হরেক রকমের খাদ্য, দোকানে বাইরে। সবখানে। আমি অবাক বিস্ময়ে তাখিয়ে দেখছি। এ আর এক জগত। মনে হয় বাড়াই গ্রামের পুকুর পাড়ে বসে পৃথিবীটাকে কিছুই দেখা হল না। আমার নজর এখন জিলেপি আর একটা নতুন জিনিষ নাম মুড়ালি। (আটা/ময়দা দিয়ে আঙ্গুলের সাইজে তৈরি, চিনির রসে শুকিয়ে নেয়া।)একটি জিনিষের দিকে। জিলেপি আর মুড়ালি যে কি জিনিষ, তার যে কত মূল্য তা তখন সেই মুহূর্তে মুখে না দিলে জীবনই ব্যর্থ হয়ে যেত।
পরের দিন গল্প শেষ হয় না। শ্রোতা রহমত আর রমা। উত্তর পাড়ার নাজু, বাচ্চু, মানিক। কত জিনিষ, দেখতে কেমন, কি কি আনলাম এসব গল্প অনেকদিন চলল। আমি স্কুলে যাই, চন্ডিদ্বার বাজার পর্যন্ত যেতে পেরেছি। আমি অসাধারণ। আমার দলের পরিধিও বেড়ে গেল দেখতে দেখতে। কিন্তু কেউ স্কুলে যায় না।
স্কুলে অনিয়ম চলতেই থাকল। শিক্ষক আসেনা, আসলেও একটা কিছু কাজ দিয়ে চলে যায়। একদিন বাবা বললেন, তাহলে তোমাকে চন্ডিদ্বার স্কুলে যেতে হবে।
এ্যা! এত দূর হেটে যাব ?
দু মাইল এমন আর কি ? আমরা তো ছয় মাইল হেটে প্রতিদিন স্কুলে যেতাম।  তখন  তো চন্ডিদ্বার স্কুল ছিল না। তুমি দু মাইল যেতে পারবেনা ?
আমি চুপ করে রইলাম। সোজা পথ হলে তো কথা ছিলনা। বাড়ীর দক্ষিনে পুকুর, পুকুর পার শেষ হলেই নদী। নদী পার হয়ে ওপারে গেলেই নাইপতা বেরির কবরখলা। ঝোপ ভর্তিই নয়, তাতে শেয়াল, বাগডাস, খাটাস সবই আছে। তারপর তুলা গাছটায় তানারা থাকেন। তুলা গাছটার নীচে দিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। তারপর খোলা জায়গা পেরিয়ে নোয়াগা। তারপর আলমপুর পেরিয়ে তবে চন্ডিদ্বার। যখন এমনি মহা বিপদের কথাগুলো ভাবছি তখন বাবা বললেন আলীম তো চন্ডিদ্বার স্কুলে যায়। ওর মাষ্টার ওকে সাথে নিয়ে যায়। আমি বলে দেব তোমাকে সাথে নিয়ে যাবে।
শুনে ধরে পানি এল। আলিমুদ্দির বাড়ী মানিকদের পাশের বাড়ীটা। আমার চেয়ে বয়সে চারপাঁচ বছরের বড় হবে। পোক্ত হলেও স্কুলে যাবার বাসনা ছিল না। বাড়ীতে মাষ্টার এসেই ঝামেলটা হয়েছে। “বাড়ীতে মাষ্টার ডেকে আনা আর পুলিশ ডেকে আনা সমান”। স্কুলে যেতে হয়। পড়তে হয়। আলিমদ্দির কেন, বংশের কারওর ইচ্ছে ছিল না। চন্ডিদ্বার স্কুলে ছাত্র বাড়ানোর জন্য হাই স্কুলের ছাত্রদের লজিং এর সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। দূরের ছাত্রদের জন্য সব গ্রামে ধনী গৃহস্থের ঘরে একজন করে হাই স্কুলের ছাত্র পাঠানো হচ্ছে। আলিমদ্দিরা ধনী গৃহস্থ। তাদের ভাগে পড়েছে তালতলার হাসেম মাষ্টার। দশম শ্রেণীর ছাত্র। আলিমদ্দির মাষ্টার। এক সাথেই স্কুলে আসা যাওয়া করে।
বাবা সাথে নিয়ে গেলেন আলিমদ্দির বাড়ীতে। আলিমদ্দির মাষ্টার ও আলিমদ্দিকে ডেকে বললেন আমাকে যেন তাদের সাথে স্কুলে নিয়ে যায়। পরদিন আলিমদ্দি বাড়ী থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল স্কুলে।  চন্ডিদ্বার বাজারে পৌঁছে আমি থ হয়ে গেলাম। বাজারের এত হাজার হাজার মানুষ গেল কোথায়! চারপাশে কয়েকটা খালি ছাবড়া খা খা করছে। দীঘির পাড় ঘেসে কয়েকটা, বাজারের পশ্চিম পাশে কয়েকটা টিনের ঘর। মুদির দোকান, ঔষধের দোকান। স্কুলে পৌঁছে আরও অবাক হয়ে গেলাম। এলাহি কারবার। আমাদের গ্রামের স্কুলের মত এতটা ছোট ঘর নয়। অনেক লম্বা দুটা ঘর, তার চেয়ে ছোট দুটা। ছোটগুলোও আমাদের গ্রামের স্কুলের চেয়ে বড়। দীঘির পারে কয়েকটা আমগাছ, মাঠ। মাঠের এক পাশে টিউবওয়েল। অনেক ছেলেমেয়ে মাঠে খেলছে। এতবড় স্কুল! বাবার পেছন পেছন যাচ্ছি আর অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছি। দুঘরের মাঝামাঝি একটা কামড়ায় গিয়ে বাবা ঢুকলেন। অনেক শিক্ষক বসে আছেন। এত শিক্ষক! আমাদের গ্রামের স্কুলে মাত্র একজন শিক্ষক। তাও রোজ আসেন না!
বাবাকে দেখেই দুজন উঠে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আরে তুমি কি মনে করে ?
তোমাদের জন্য নতুন ছাত্র নিয়ে এলাম।
তোমার ছেলে ?
হ্যা।
কোন শ্রেণীতে দেবে ?
দ্বিতীয় শ্রেণীতে দিয়ে দাও।
পারবে তো?
দেখ পারবে বোধ হয়। না পারলে প্রথম শ্রেণীতে দিয়ে দিও।
আমার দিকে তাকিয়ে বাবা বললেন, এই তোমাদের হেড মাষ্টার। তোমাকে সব দেখিয়ে দেবে। আলীমকে বলে দিয়েছি। তোমাকে সাথে নিয়ে যাবে। এই বলে বাবা অন্য শিক্ষকের সাথে বাজারের দিকে চলে গেলেন।
হেড মাষ্টার স্যার পাশের একটা কামড়ায় নিয়ে গেলেন। এতবড় কামড়াটা একবারে গিজ গিজ করছে। ভর্তি। আরে! সবাই যে বেঞ্চের উপর বসে আছে! আমাদের গ্রামের স্কুলে তো হুগলার চাটাইর উপর বসতাম। এখানে সবাই বেঞ্চে বসে! আমি ফেল ফেল করে সব দেখছি। স্যার আমাকে একটা বেঞ্চের কোনে বসিয়ে দিয়ে বললেন, এখন থেকে এখানে বসবে বলে তিনি চলে গেলেন।
আমি  ভয়ে জড়সড় হয়ে মাথা নিচু করে বসে আছি। আলিম কোথা থেকে এসে বলল, আরে তুই এই ক্লাশে ? তাহলে তো ভালই হল। আমিও এই ক্লাশে। আিলমকে দেখে  মনে হল পৃথিবীতে এই বোধ হয় আমার একমাত্র আপনজন। এবার মাথা তোলবার সাহস পেলাম। তাকিয়ে দেখলাম ছেলেমেয়ে ভর্তি। কেউ সাইজে অনেক বড় যেন শিক্ষক। কেউ মাঝারি, কেউ ছোট। আমার সাইজের আছে কয়েকটা মেয়ে। যেন এটা বাজার বসেছে। কারও কথা কেউ শুনছে না। আলিম বলল, চল আমার বেঞ্চিতে আমার পাশে বসবি। বলে সে আমার বই শ্লেট নিয়ে পাশের বেঞ্চিতে আর একটা ছেলেকে সরিয়ে আমাকে বসতে দিল। একবারে গাদাগাদি, চাপাচাপি।
আলিম হঠাৎ তালিম দেয়া শুরু করল। সবাই চুপ করে যার যার সিটে বস। স্যার এখনি এসে পড়বে। বলার সাথে সাথে ক্লাশ একবারে চুপ হয়ে গেল। একটা খুব লম্বা ছেলে, না ছেলে নয়, বেটা (পূর্নবয়স্ক পুরুষ) তখন দাঁড়িয়ে আছে। আলিম বলল, এ্যাই আব্দুল হাই, তুমি দাড়িয়ে কেন ? বসে পড়।
কি ব্যাপার! আলিম যে সরদার! সবাই তার কথা শুনে! আলিম কি সবাইকে পড়ায় ? কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্যার এসে ঢুকলেন। সবাই দাঁড়িয়ে গেল। হাতে একটা জালি বেত। টেবিলের উপর জালি বেতটা দিয়ে দুটো বারি দিয়ে ক্লাশে চোখ বুলিয়ে নিলেন। বললেন, বস সবাই।
আলিম কানে কানে বলল, এ হল তেতুইয়ার স্যার। অঙ্ক পড়ায়। যোগ বিয়োগ শেষ। এখন ভাগ চলছে। তিনি কাল রংএর বোর্ডে অঙ্ক কষে যাচ্ছেন। প্রতি বেঞ্চ থেকেই দু একজনকে জিজ্ঞেস করছেন, বুঝেছ ? এর ফল কিভাবে হল, বলতো ? আমি যে নতুন এসেছি সে খবর তার নেই। মনে হয় নতুন মুখ এমনি প্রতিদিন আসে আর যায়। কোন খাতায় নাম নেই। থাকলেও ডাকেনি। এটাই বোধ হয় নিয়ম।
তিনি ক্লাশ শেষ করে চলে যেতেই শুরু হল আবার হৈ চৈ। আবার এলেন অন্য শিক্ষক। চাপিয়ার স্যার, হাজিপুরের স্যার, গোপিনাথপুরের স্যার। কারও নাম নেই। নাম বলা বেয়াদপি। তাই শিক্ষকরা তাঁদের গ্রামের নামেই পরিচিত।
ফেরার পথে জানতে পারলাম আলিম ক্লাশের মনিটর। শিক্ষকের অনুপস্থিতে সেই সব কন্ট্রোল করে। বিচার সালিশ করে। অনেক ক্ষমতা। কাজেই ক্লাশে আমার সাথে কেউ মারামারি করবে বলে মনে হয় না। প্রতিদিন একজন দুজনের সাথে ভাব হচ্ছে। বেশিরভাগই মেয়ে। ক্লাশে প্রথম আলিম। দ্বিতীয় ছায়া। কিছুদিনের মধ্যে অনেক ছেলেমেয়েদের সাথেই আমার ভাব হয়ে গেল। অমিয়, প্রভাত, গোবিন্দ, রাখাল, ছায়া, শেফালি, সবিতা, পার্বতী, বাসন্তি, নুরুল হক, বদি আরও অনেক।
অনেকেই পেছনে বসতে ভালবাসে। সামনে সিট খালি থাকলেও পেছনে। একদিন ছায়া আমার পাশে বসেছে। এক সময় বলল,  এ্যাই, তুমি আমার গায়ে শ্বাস ফেলেছ। তিনটা ফুলের নাম বল!
আমি ফেল ফেল করে তাকিয়ে আছি। কখন শ্বাস ফেললাম! আবার ফুলের নাম কেন! কি ফুল ?
যে কোন তিনটা ফুলের নাম বললেই হবে।
আম জাম লিচু।
আরে এগুলো তো ফুল নয়! ফুলের নামও জাননা ?
মুখ দিয়ে যা এসেছে না ভেবেই বলে ফেলেছি। ভেবে দেখলাম তাইত! এগুলো তো ফল। ছায়ার পেছন বেঞ্চে ছিল সবিতা। বলল, আমি বলে দিই, তুমি আর একবার বললেই  হবে। বল জবা, বকুল, গন্ধরাজ।
এখন কি হল ?
আর কিছুনা। শ্বাস ফেললে তিনটা ফুলের নাম বলতে হয়। সেই থেকে শুরু হয় ছায়ার কাছে তালিম নেয়া আর আলিমের কাছে সাহস নেয়া। মনে হয় ছায়ার কাছে তালিম নেয়ায় একটা মজা আছে। অনেক কিছু শেখা যায়। তখন শেখার সময়। যা কিছু নতুন তাই শিখে নেয়া। শিক্ষকই হোক আর ছাত্রই হোক। এ বয়সের শিক্ষাই জীবনের শেষ ধাপ পর্যন্ত জ্বল জ্বল করে জ্বলতে থাকে। স্কুল পেরিয়ে যা শেখা হয় তা মনে দাগ নাও কাটতে পারে। ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক।
পার্বতী  দেমাগী। কারও সাথে খুব কথা বলে না। সবিতা লাজুক। কথা কম বলে। শেফালী ঝগড়াটে। প্রতিদিন দু একটা বাধেই। শিক্ষক পর্যন্ত গড়ায়। অনেকের সাথে আড়ি। শুধু ছায়া বক বক করে কথা বলতেই থাকে। অঙ্ক, ইংজেরী বাংলা সব বিষয়ে পাকা। পড়া ছাড়াও তালিম দেয়- জল পান করার সময় টিউবওয়েল ছুয়া যাবে না। ছুলে তাদের কি যেন কি হয়। ফুল ছুড়ে দেয়া যাবে না, কোন সময় কোন দেবতার নাম নিতে হয় সব ছায়া জানে। কিছুদিনের মধ্যেই স্কুলটা আকষর্ণীয় হয়ে উঠল।

-৫-

সুদিনে স্কুলে যেতে তেমন অসুবিধে হয় না। বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে। নদী পেরিয়ে, নাইপতাবেড়ি হয়ে নোয়াগার চক কোনোকোনি গেলে পথ অর্ধেক হয়ে যায়। বর্ষা শুরু হলেই যত ঝামেলা। প্রথম বর্ষনে লিকলিকে নদীটা হয়ে যায় ভয়াল। পরিধি বেড়ে আধ মাইল বেড়ে যায়। নৌকা ছাড়া পারাপারের কোন উপায় নেই। পরের বর্ষনে নাইপতাবেড়ি যখন ডুবে যায় তখন নোয়াগার মসজিদে গিয়ে নেমে, গ্রামের ভেতর দিয়ে কাচা রাস্তা ধরে. পঞ্চবটির ভাংগা কাঠের পুল পেরিয়ে,  বটগাছটা ছাড়িয়ে, এই এলাকার সবচেয়ে উঁচু তালগাছটার নীচে দিয়ে, আলমপুর হয়ে, চন্ডিদ্বারের ভেতর দিয়ে স্কুলে পৌঁছা যায়। পঞ্চবটিতে পাঁচটা বটগাছ আমরা দেখিনি। মাত্র একটা বটগাছ মাঠের পূর্বদিকে অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে আছে। তারপরও কেন এর নাম পঞ্চবটি তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়না। হয়ত কোনদিন এখানে পাঁচটা বটগাছ ছিল। তাই পঞ্চবটি। আরও বর্ষনে কাচা রাস্তাও যখন ডুবে যায় তখন এ পথও বন্ধ হয়ে যায়। তখন একমাত্র নৌকা অথবা পদব্রজে বাড়াই গ্রামের ভেতর দিয়ে, গোপিনাথপুরের তিন পাড়ের খেয়া পেরিয়ে, হরিয়াবহ গ্রাম ছাড়িয়ে তবে স্কুলে পৌঁছা যায়। তখন পথ হয়ে যায় দ্বিগুন বা তারও বেশি।
চন্ডিদ্বার স্কুলে ভর্তি হয়েই আমার চোখ যেন খুলে গেল। বেড়ে গেল পৃথিবীর পরিধি, বন্ধুর সংখ্যা। প্রতি সন্ধ্যায় প্রতিবেশির নালিশের সংখ্যা। এখন আমার খেলার সাথী রহমত, নাজু, বাচ্চু, মানিক আর রমা। মাঝে মাঝে বারেকও থাকে। ছাড়াবাড়ীটা আমরা দখল করে নিয়েছি। অশরিরী কোন আতœার দেখা এখনও মেলেনি।
একই ক্লাশে পড়েও আলিমদ্দি আমার খেলার সাথি নয়। তার চালচলন বড়দের সাথে, হাসেম মাষ্টারের সাথে তার সখ্যতা। বেশি সময় ব্যস্ত থাকে কৃষিকাজ নিয়ে। লেখাপড়া নিয়ে  ছায়া, আলীম আর আমি এই তিনজনের মাঝে চলে প্রতিযোগিতা, কে প্রথম হবে। জমিতে ফসল ফলানো আর লেখাপড়া। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রতিযোগিতা।
প্রতিযোগিতায় হেরে গেছি। আলিম প্রথম স্থান আর আমি দ্বীতিয় স্থান অধিকার করে তৃতীয় শ্রেণীতে এলাম। কিন্তু আমার জিদ রয়ে গেল যেভাবেই হোক প্রথম স্থান দখল করতে হবে। ছায়া তৃতীয় স্থান পেয়ে কয়েকদিন স্কুলে আসেনি। 
এখন ফুটবল খেলতে মাঠে যাই। উত্তর পাড়ার মাঠে, মুড়ার ফকিরবাড়ীর মাঠে প্রায় প্রতিদিন খেলা হয়। সন্ধ্যার আগেই বাড়ী ফিরি। আম কাঁঠালের বাগানে ডাঙগুলি খেলি নাজু, বাচ্চু, মানিকদের সাথে। পশ্চিম পাড়া থেকে অনেকে চন্ডিদ্বার স্কুলে যায়। ফজলু, ফরিদ, হানু, দুলাল তাদের সাথে ভাব হয়েছে। আম কাঁঠালের বাগে (বাগান) সবার সাথে দেখা হয়। রহমতের অতদূর যাবার অধিকার নেই। এমন কি ছাড়াবাড়ীতেও নয়। যদি তাকে দেখা যায় তাহলে তার বাবার চিৎকার পাড়া মেতে উঠে। চোখের আড়াল হলেই পাড়া মাতিয়ে তোলে। গরুখোজা শুরু হয়।
রহমত তার বাবার একমাত্র সন্তান। বাবা রুছমত খা। ডজনখানেক শাদি করেছেন। কোনটাই রাখতে পারেননি। কেউ মরেগিয়ে বেচেছে, কোনটা পালিয়ে গেছে, কোনটা নিজে তালাক দিয়ে, পাছায় গরম কাচির দাগ দিয়ে বিদায় করেছে। তাকে নিয়ে অনেক কাহিনী আছে। কয়েকটা সন্তান মরে গিয়ে সবেধন নীলমনি বেঁচে আছেন। রুছমত বৃদ্ধ হয়েছে। উৎপাদনের ক্ষমতা আর নেই। রহমতকে প্রাণ দিয়ে আগলে রাখে। এতবড় হয়েছে, তারপরও কোলে নিয়ে বেড়ায়। আমি যেদিন জনতপুরের কান্দার আমগাছ থেকে পড়ে গিয়ে বা হাতটা ভাঙলাম সেদিন রহমত গাছের নীচে ছিল। হাতটা যখন কাপতে কাপতে আলাদা হয়ে যাচ্ছিল তখন রহমতের ডাকেই ইনুস এসে পানিতে ডুবিয়ে রেখেছিল অনেকক্ষণ। তারপর বাড়ীতে নিয়ে এসেছিল। তিনমাস ছুটি। নড়াচড়া নেই। কিন্তু বিপদ হয়েছে রহমতের। আমার সাথে গেলে রহমতের হাতও ভাঙতে পারে এই ভয়ে তার বাবা আমার কাছে আসতে দেয় না। অথচ আমার কাছে না এলে তার ভাত হজম হয় না।
আমাদের তিনজনের প্রতিযোগিতা চলছে। ছায়ার শিক্ষক কে জানি না। আলিমের গৃহশিক্ষক হাসেম মাস্টার,আমার শিক্ষক বাবা। এই প্রতিযোগিতায় আমাকে জিততেই হবে।

প্রতিযোগিতা চলছে আমাদের বাড়ীতে কে বেশি ফাঁকি দেবে। এ সংসারের হাল ধরেছে দুভাই। কাজে যাবার সময় পেটে ব্যথা, মাথা ব্যথা বা এ ধরনের অসুখ লেগেই থাকে। অসুখ তো কারওর আয়ত্বে নেই। মানু ভাইর যেদিন পেটে ব্যথা হয়, কাজে যেতে পারে না সেদিন দুপুরে নুরু ভাইর নাকে ব্যথা হয়। দিনের শেষে কোন ঔষধ পথ্য ছাড়াই সেরে যায়। তারা দুজন দুদিকে আড্ডা দিতে চলে যায়। অনেক রাত পর্যন্ত চলে। পরদিন আবার কিছু একটা হয়। তেমনি চলছে জমিজমার কাজকর্ম। কামলার উপর নির্ভর করে। তাদের শারিরীক অসুস্থতার জন্য বাড়ীর ছোটখাট কাজগুলোও করতে পারে না। সেগুলো করতে হয় আমাকে। তারা ঘন্টায় ঘন্টায় তামাক সেবন না করলে অসুখ বেড়ে যায়। তামাক প্রস্তুতের কাজটা আমাকেই করতে হয়। যতক্ষন বাড়ী থাকি।
প্রতিযোগিতা চলছে মাছিহাতায়। কার পকেট বেশি ভারি হবে। কোন পীর কোনদিক যাবেন। পালা করে পীরছাব হুজুর মুরীদের খবরাখবর নিতে আসেন। কোন পীরছাব কোন এলাকায় যাবেন, কোন এলাকায় পকেট বেশি ভারি হয়। ছোট পীরছাব বড় পীরছাবের আদেশ ছাড়া যেতে পারে না। মেজ পীরছাব এখন  আমাদের এলাকায় ঘন ঘন আগমন করেন। এ বাড়ী সে বাড়ী করে মাসের উপর কাটিয়ে দেন। সমস্ত গ্রামে সারা পড়ে যায়। হুজুর আসছেন। সবাই সাবধান হয়ে যাও। কার বেয়াদবি কখন ধরা পড়ে কে জানে ! কখনও কখনও হুজুরের বাড়ীর অন্য কেউ আসেন। তাঁর ছোট ছেলে, মেজ ছেলে বা বড় ছেলে। এ যেন মামার বাড়ীতে বেড়াতে আসা। পীরছাব হুজুরের এক মামা আসে। তাকে সবাই বলে মামাহুজুর। তারা সবাই পীরের মর্যাদা পেয়ে থাকেন। আঠার বিশ বছরের ছেলেদের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে গ্রামের সকলে। তার বয়স যাই হোক। পীরের বংশ তো ! মামুহুজুর আসলে তো যেতেই চান না। কয়েক মাস থাকেন। বিশেষ করে আম কাঁঠালের মৌসুমে। গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটি বাড়ীতে খেয়ে, ঘুমিয়ে, তাবিজ তুমার টুনাযাদু পানি পড়া দিয়ে, পকেট ভারি করে তবে ফিরে যান। পীরছাব হুজুরের বাড়ীতে বছরমুনি (বছর মুনি মানে যে কামলা বাতসরিক মাইনে কাজ করে) থাকে মকবুল। জমির কাজ শেষ হলে হুজুর পাঠিয়ে দেন মুরিদের বাড়ী। তার দেহের সাইজ একটা দৈত্যের। সাত ফুট লম্বা, দশাসই শরীর। পাঁচজনের খাবার অনায়াসে খেয়ে ফেলে। যেন একটা মেশিন। নিজের কোন বুদ্ধি নেই। যা বলবে তাই করবে। কিছু না বললে বসে থাকবে। রান্নাঘরের আশেপাশে। সেও বেড়ায়। এক মাস দুমাস। তাকে দিয়ে কোন কাজ করানো নিষেধ। পীরের বাড়ীর চাকর যে!
প্রতিযোগিতা চলছে হিন্দু পুরোহিতের মাঝে। কে বেশি যজমান যোগার করবে, কার কত বেশি প্রণামি মিলবে। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের আপ্রাণ চেষ্টা। এই পুরোহিত আর পীরের মাঝে কোথায় যেন একটা মিল আছে। এই দু দলই যজমান আর মুরিদের উপর নির্ভরশীল। সারদা বাবুকে প্রায়ই দেখি মুটের মাথায় করে যজমানের বাড়ী থেকে প্রণামি নিয়ে যাচ্ছেন। একদিন দেখলাম একটা ছাগল নিয়ে বাড়ীর দিকে যাচ্ছেন। তাদের পূজি ধর্ম। এ দিয়ে তারা অনায়াসে রোজগার করতে পারেন। ধর্ম ব্যবহার হয় ব্যবসা হিসেবে।  সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। সাধারণ মানুষকে ধোকা দেবার একই কায়দা কানুন। আশেপাশের গ্রাম বেশির ভাগই হিন্দু। প্রায় প্রতিটি গ্রামে বটগাছ আছে। যেখানে বটগাছ সেখানে দেবতার আনাগোনা, সেখানেই পূজার স্থান। আলম পুরের বটগাছ, গোসাইস্থলের বটগাছ, রাজনগরের বটগাছ ইত্যাদি সব বটগাছের নীচে পূজার স্থান। এসব পূজার স্থানে কড়ির আদান প্রদান। প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে তুলসী মন্ডপ। পুরোহিতের শাস্ত্রবাক্য একটা এটমের চেয়েও শক্তিশালী। তবে তারা পীরের মত মাসের পর মাস যজমানের বাড়ীতে খেয়ে বেড়ায়না। প্রতি গ্রামেই পুরোহিত আছে যার যার যজমান নিয়ে। তাদের সবকিছু আসে যজমানের কাছ থেকে। পার্থক্য শুধু নামে। পীরকে দিতে হয় হাদিয়া বা নজরানা আর পুরোহিতকে দিতে হয় প্রণামি। পীরকে দিলে হয় ছওয়াব, পুরোহিতকে দিলে হয় পূণ্য। ছওয়াব বেশি হলে বেহেস্ত মিলবে, আর পূণ্য বেশি হলে স্বর্গ মিলবে। গন্তব্য স্থল বেহেস্ত অথবা স্বর্গ। জেলেরা যেন বেড় জাল দিয়ে মাছ ধরছে।
প্রতিযোগিতা চলছে মাতাপিতার মধ্যে। এখানকার মানুষ পৃথিবীতে এসেছে আল্লাহর ইচ্ছায়। জান দিয়েছে যে রিজিক দিবে সে। তাদের কাজ হল জমিতে কাজ করা, আল্লাহর ইবাদত করা হুজুরের আদেশ মান্য করা আর সন্তান পয়দা করা। আল্লাহই সব ব্যবস্থা করবেন হুজুরের দোয়ায়। বার/তের হলেই মেয়েদের, আঠার/উনিশ হলেই ছেলেদের বিয়ে দিতে হবে। পীরের নির্দেশ। আল্লাহর পরেই পীরছাব হুজুরের স্থান। তিনিই আদেশ নির্দেশ দিয়ে চালিয়ে আসছেন। সরকারি নির্দেশের চেয়েও কঠোর পীরের নির্দেশ। বাংলা/ইংরেজি লেখাপড়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু এবাদত করতে হলে আরবী যতটুকু শিখতে হয় সেটুকুই। তাই গ্রামে একজন কারীসাব আছেন। বাড়ী নোয়াখালি। পশ্চিমপাড়ায় হাজি সাহেবের বাড়ীতে তার মাদ্রাসা। ফজরের পরেই শুরু হয় তালিম। চলে বেলা দশটা পর্যন্ত। তিনি ছেলেমেয়েদের তালিম দিয়ে আল্লার এবাদতের উপযুক্ত করে তোলেন। নামাজ রোজা করতে হলে যা প্রয়োজন তা বাধ্যতামূলক। পীরের পরেই কারীসাবের কেরামতি চলে। তিনি যে কবে থেকে এখানে এসে কারীগিরি শুরু করেছিলেন সে জানিনা। জীবনের শুরু থেকেই তাকে দেখে এসেছি। গ্রামের প্রায় সবাই তার ছাত্র। কোরান খতম করলেই তার লেখাপড়া শেষ। কারীসাব বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র। এবাড়ী সেবাড়ী দাওয়াত খেয়ে কাটে তার দিন। বছরে একবার কয়েকদিনের জন্য কোন একটা ঈদে বাড়ীতে যান। এখন বাড়াই গ্রামই তার জীবন, প্রতিটি বাড়ী তার আপন, রুজীর উৎসস্থল। একবারে স্থায়ী ব্যবস্থা।
আমাদের বাড়ীর হাফিজসাব দুবেলা পড়ান। সকালে আরবী, সন্ধ্যায় বাংলা। এ ব্যবস্থা করেছেন বাবা। কিন্তু কেউ বাংলার দিকে এগোয়নি। আর আমি এগোইনি আরবীর দিকে। ছয় সাত বছরেই কোরান খতম দিতে হবে। বাধ্যতামূলক। কিছু বুঝার প্রয়োজন নেই। খতম দিলেই ছওয়াব। খতম দিতে থাক। ছওয়াব কামাই কর। নিজের জন্য এবং মা বাপ আতœীয়স্বজনের জন্য। ধীরে ধীরে অনেক কায়দা করে, বাবাকে বুজিয়ে হাফিজ সাবের কবল থেকে মুক্ত হয়ে গেলাম। এখন বাবা দেখাশোনা করবে আরবী, ইংরেজি সব।
প্রতিযোগিতায় জিতে গেছি। আমি প্রথম স্থান অধিকার করে ৪র্থ শ্রেনীতে উঠলাম। 

-৬-

এখানকার মানুষ তিরিশের উপর গেলেই বৃদ্ধ হয়ে যায়। অল্প বয়সে বিয়ে করে। ছেলে মেয়ে জন্ম দেয়। ছেলে মেয়ের বিয়ে আঠার পেরোয় না। যেই না ছেলের বিয়ে দেয়া হল, সে হয়ে গেল বৃদ্ধ। মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি। মাথায় টুপিটা দিলেই মনের পরিবর্তন। বেহেস্ত আর কতদূর! এটা যেন বেহেস্তে যাবার এক ধাপ। দাড়ি রাখলে তো আরও কাছাকাছি চলে গেল। বেশিদূর নয়। অথচ কেউ জানে না টুপি আর দাড়ির কি ব্যাখ্যা। পীরছাব হুজুর রাখেন তাই। ছেলে বড় হয়েছে। সেই সব দেখাশুনা করবে। এখন তার আল্লাহ আল্লাহ করার সময়। বয়স যাই হোক। পঁয়ত্রিশ বা চল্লিশ। তারা বৃদ্ধ হয়ে যায়। অফুরন্ত ছুটি। কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে আড্ডা আর এবাদত বন্দেগী নিয়েই থাকে। মসজিদে বা আম তলায় কাটে সময়। পরচর্চা, পরনিন্দা আর গুজব নিয়ে কাটে তাদের দিন। সমাজের রীতিনিয়ম তৈরি করে। আর কোন কাজ নেই।
পুকুর পারে আমতলায় যাদের দিন কাটে তারা বর্ষায় কিছু উপরি পায়। পুকুরের পাড় ঘেষে নদী। বর্ষাকালে অনেক রকমের নৌকো আসে যায়। ভাটির দেশ থেকে আসে, উজানে যায়। ইন্ডিয়ার বর্ডার থেকে বাঁশ, বেত আর বালু নিয়ে ফিরে আসে। ভাটির দেশে বিক্রি করে। নৌকো কাছে এলেই জিজ্ঞেস করে, নাইয়ার বাড়ী কোন্ গেরামে ?
মান্দারপুর.....
যাইবা কই.....
নিছমপুর.....
নিছমপুর ইন্ডিয়ার বর্ডার। উন্নত জাতের বালু পাওয়া যায়। কোন মালিক নেই, দাম দিতে হয় না। এমনি কুড়িয়ে নিয়ে আসা। ভাটির দেশে দাম যা পাওয়া যায় তাই লাভ। এমনি করে নৌকো আসে, প্রশ্ন আর উত্তরের পালা চলে। সময় কাটে।
বাচ্চুদের পাশের বাড়ীর চানখা এসব নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়। চানখার কেউ নেই। সে একা। সমস্ত শরীরে দাদে ভর্তি। এক ইঞ্চি জায়গা খালি নেই। তার ধারে কাছে কেউ বসে না। সারাক্ষন শরীর চুলকাচ্ছে। হাতে একটা বাঁশের কঞ্চি বা চিকন কাঠের চেলা থাকে। পিঠে হাত যায় না। পিঠ চুলকাতে লাগে ওটা। ছোটবেলায় সে স্কুলে গিয়েছিল। অংকের মাথা ছিল। শীত নেই, গ্রীষ্ম নেই। সে আছে পুকুপাড়ে। ঘরে ফেরে গভীর রাতে। নিজ হাতে রান্না করে। কখন করে সেই জানে। আমতলায় বসে বসে সে গননা করে। আজ কয়টা নৌকা উজানে গেল, কয়টা ভাটির দিকে গেল। কোন নাইয়ার বাড়ী কোন দেশে, কোন গেরামে। মনে হয় এটা যেন তার চাকরি। নিরলস কর্তব্য পালন করে যাচ্ছে। যখন যাকে পায় তাকেই প্রশ্ন করে, কথা বলে। স্কুলে যাবার সময় আমাদেরকে ধা ধা জিজ্ঞেস করে। বলত, হারাইলে বিছরায়, পাইলে নেয় না, এটা কি ? নিজেরা না পারলে তোমাদের শিক্ষককে জিজ্ঞেস করো। স্কুল থেকে ফেরার পথে উত্তর বলে যেও। আমি তো আছিই।
আলিমদ্দির দু দাদা আসে। জমজ। কে ছোট কে বড় কিছুতেই চিনতে পারিনা। দুজনেরই চুল সাদা। একই চেহারা। তারা আড্ডা দেয় পুকুর পাড়ে বড় চাচার সাথে। রহমতের বাবা রুছমত আসে ঘাড় নীচ করে হেটে। সে সোজা হয়ে হাটতে পারেনা।  আমতলার এক পাশে চুপ চাপ বসে থাকে। কারো সাথে কথা বলে না। আপন মনে চলে। শুধু রহমতকে খুজে বেড়ায়। চোখে চোখে রাখে। আর আসে আলিমদ্দির চাচা, লালু আরও অনেকে। কেউ কেউ বাড়ী থেকে তামাক টিক্কা নিয়ে আসে। একটা দড়িতে আগুন ধরিয়ে রাখে। সারাদিন তামাক আর আড্ডা চলে। তারা সুখি। 
দশ/এগার বছর বয়সের ছেলেরা এমন একটা অবস্থায় বাস করে তারা না পারে কারো কোলে থাকতে বা উঠতে না পারে কারো সাথে গলাগলি বা কোলাকোলি করতে। কিন্তু তারা ছোটখাটো সব ধরনের কাজ করতে পারে। ঘরের ফাই ফরমাস তাদের করতে হয়। আমি যেন আমাদের বাড়ির কাজের ছেলে। ছোট খাটো সব কাজ আমাকে করতে হয়। নুরু,মানু ভাই ঘরে শুয়ে বসে থাকলেও আমাকে যখন তখন আদেশ করে।
নুরু ভাই চান না আমি স্কুলে যাই। প্রায়ই বলে ’ভাই পড়ায় কোন্ শালা!’ স্কুলের সময় প্রতিদিন আমাকে কোন না কোন একটা কাজে পাঠিয়ে দেয় যাতে স্কুলের সময়টা চলে যায়। এ নিয়ে বাবার সাথে কথা কাটাকাটি হয়। বাবা এখন অসহায়। মানু ভাই চুপ করে থাকে। আমি না গেলে তাকে যেতে হবে তাই নুরু ভাইর আদেশের নীরব সায় দিয়ে চুপ করে থাকে। প্রথমত দু ভাইর হুকা সেজে দিতে হয় ঘন্টায় ঘন্ট্য়া যতক্ষন বাড়ি থাকি। গরুর ঘাস কাটা, ফেন দেয়া, বিকেলে মুড়াতে ছেড়ে দিয়ে রাখাল হয়ে বসে থাকা ইত্যাদি ছোট কাজ গুলো তারা করে না। বেশি সময়ের জন্য যেতে হয় ক্ষেতের পাখী তাড়াতে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই অঞ্চল। বিভিন্ন ঋৃতুতে বিভিন্ন রকমের পরযায়ী পাখী আসে একবারে যেন ঘড়ির কাটা ধরে। প্রতি বছর ঠিক একই সময়ে আসে আবার ঠিক তাদের নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে যায়। আমাদের দেশে শীতের শেষের দিকে আসা শুরু করে। এদের মাঝে হাড়গিলে, টিয়া আর একটা পাখী স্থানীয় ভাষায় বলে বাইলা। বাইলা দেখতে ঠিক চড়–ই পাখীর মত। চড়–ই থেকে বাইলাকে আলাদা করা যাবে না। এরা চলে ঝাকে ঝাকে। একেকটা ঝাকে থাকে হাজার হাজার বা লাখের মত।  হাড়গিলা খায় শামুক বা মাছ ইত্যাদি। কাদা পানিতে তাদের খাবার খুজে পায়। যখন বুরো জমি রোপন করে তখনই তাদের আগমন শুরু হয়। তাদের ঝাক একবার যে রোপা জমিতে বসেছে যে জমির সব চারা তাদের পায়ের চাপে কাদার নীচে চলে যায়। আবার নতুন করে রোপন করতে হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যে কোন সময় যে কোন জমিতে বসতে পারে। আর একবার বসা মানে ছয় সাত কেজি ওজনের এই পাখীর পায়ের চাপে সব চারা শেষ। সে সব পাখী আমাকে পাহাড়া দিতে হয়। কিন্তু জমি তো একটা নয়। আমি পাহাড়াদার একজন. কোন জমি পাহাড়া দিব। তখন দেখতে হয় কোন এলাকা ওরা বেশি পছন্দ করে। দলাই বিলে জলজ লতাপাতা এবং কাদা পানিতে স্থানীয় কিছু পাখীর বাস। যেমন কয়েক রকমের বক, বালি হাস, ডাহুকের মত দেখতে আর একটা পাখী সহ অনেক রকমের পাখী বাস করে। তবে এরা ধানের চারার খুব একটা ক্ষতি করে না। হাড়গিলা এসব স্থানগুলো পছন্দ করে। তাই আমাকে ধলাই বিলের দক্ষিনের জমি পাহাড়া দিতে হয়। প্রায় তিন সপ্তাহ যতদিন না ধানের চারা বড় হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এই কয়েক সপ্তাহ আমার স্কুলে যাওয়া হয়না। তারপর কিছুদিন অবসর। আবার যখন ধান পাকার সময় হয় তখন পাহাড়া দিতে হয়। এবার হাড়গিলে নয়। টিয়া পাখী এবং বাইলা। এরা একবার পাকা ধান ক্ষেতে বসেছে তো সব ধান শেষ। টিয়া কয়েক মিনিট সময় পেলে ক্ষেতে বসে খেয়ে উড়ে যাবার সময় আর একটা ধানের ছড়া নিয়ে গাছের ডালে বসে আরাম করে খায়। আর বাইলা ছড়া নিয়ে উড়ে যায় না। ক্ষেতে বসেই ধানের খোসা মানে তুষ ছাড়িয়ে চাউল করে খায়। এত তাড়াতাড়ি খায় যে কয়েক মিনিটেই একটা ছড়া শেষ। তাই ধান কাটা পর্যন্ত আমাকে পাহাড়া দিতে হয়। তখন আবার ঠিক করতে হয় কোন ক্ষেত পাহাড়া দিব। জরা খেত দু বিঘার উপর। এতে যা ধান হয় তা দিয়ে কয়েক মাস চলে যায়। জরা খেতের তিন দিকে মুড়া, একদিকে নদী। এখানে ঝোপ ঝারে ভর্তি। টিয়া আর বাইলার আশ্রƒস্থল। যখন তখন খেতে ঝাপিয়ে পড়ে। তাই জরা খেত পাহাড়া দিতে হয়। 
এসব ছাড়াও আমাকে আরও কাজ করতে হয়। যেমন বাজার করা, বাজারে দুধ বিক্রি করা ইত্যাদি যেসব কাজ দু ভাইর ইজ্জতের ব্যাপার সেগুলো আমাকে করতে হয়। মোট কথা একটার পর একটা কাজ আমাকে করতে হয়। আবার কখনও আদেশ ছাড়া আমি নিজে থেকেই কোন কাজ করি যখন দেখি কোন জিনিষ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বা খুব প্রয়োজন। 
সন্ধ্যার পর পৃথিবী যখন অন্ধকারে ঢেকে যায় পথ ঘাট চোখে দেখা যায় না তখন আমার কাজ কমে যায়। নুরু ভাই কোন আদেশ করতে পারে না তখন বাবা ডেকে পড়া নিয়ে বসেন। সব বিষয়েই আমি মজা পাই কিন্তু অংক আমার মাথায় ঢুকে না। সেটা কি আমার মাথার দোষ নাকি বাবার বুঝানোর কায়দা তা অনেক দিন বুঝতে পারিনি। যখন বুঝলাম তখন দেখলাম আমার মাথার অনেকগুলো নাট বল্টু নড়বড়ে। এখনও টাইট দেয়া হয়নি।
                             -৭-

হাফ স্কুল। ফিরে দেখি গ্রামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা পুকুরপাড়ে নিশান নিয়ে প্রস্তুত।  পাটশুলার মাথায় লাল নীল হলুদ কাগজের তেকোনা নিশান হাতে টুপি মাথায় রেল ষ্টেশনে যাবে। আজ পীরছাব হুজুর আসবেন। গত দু মাস যাবৎ হুজুর এখানে পদার্পন করতে পারেননি। তাঁর মুরিদের অনেক আপদ বিপদ যাচ্ছে। তিনি না আসলে কোন কিছুরই সুরাহা হবে না। তাছাড়া অনেকের বাড়ীতে এ দুমাসে অনেক ঘি, হাঁস মোরগ জমেছে। এগুলো সৎকার করতে হবে। অনেকের অনেক মানত। হুজুর তো আর ছাগল ভেড়া হাঁস মুরগি গাছপালা জায়গাজমি নিয়ে যেতে পারেন না। তাই বিক্রি করে টাকাটা দিয়ে দিলেও সওয়াবের কোন কমতি হবে না। মানতের উদ্দেশ্যও সফল হবে। আর যেগুলো বিক্রি করা যায় না। সেগুলোর ফসল পৌঁছে দিলেই হয়।
ছেলে মেয়েরা রওয়ানা দিয়েছে। লাইন ধরে। কয়েকজন বয়স্ক লোক তাদের তালিম দিচ্ছে কিভাবে হাটতে হবে। সামনে দশ বার জন বয়স্ক লোক, মাঝখানে বাচ্চারা, পেছনের দিকে আট দশ জন বৃদ্ধ।  সবশেষে পাল্কি। খালি পাল্কি যাচ্ছে হুজুরকে বহন করে আনার জন্য। এখান থেকে পাঁচ মাইল। এতদূর পথ হুজুর পদব্রজে তার স্থুল দেহখানা নিয়ে আসতে পারবেন না। তাই এই ব্যবস্থা। আর ছোট ছোট বাচ্চারা এই পাঁচ মাইল হেটে একবার যাবে, আবার হুজুরকে নিশান উড়িয়ে নিয়ে আসবে।  তাদের কোন কষ্ট হবে না। তাছাড়া হুজুরের সেবায় যে যত কষ্ট করবে তার তত ছওয়াব বেশি হবে।
আমি আর দাঁড়ালাম না। সোজা বাড়ীর ভেতর চলে গেলাম। বাড়ীতে ঢুকতেই মা আদেশ করলেন পীর ছাবকে আনতে যেতে হবে। আমি অসুস্থতার ভার করে কোন রকমে এড়িয়ে যেতে সক্ষম হলাম।
ঘর থেকে জানালা দিয়ে দেখলাম পুকুরের দক্ষিন পাড়ে বেশ কিছু লোক হুজুরের জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে। পুকুর পাড়ে আম গাছের নীচে হুজুরের জন্য চেয়ার রাখা হয়েছে একদিকে, আর একদিকে জাজিমের উপর ছফেদ বিছানা পাতা হয়েছে। বলা তো যায় না হুজুর শুয়ে বিশ্রাম নিবেন নাকি চেয়ারে বসে বিশ্রাম নিবেন। এতদূর পথ পাল্কিতে বসে ক্লান্ত হয়ে আসবেন। এই আমগাছতলায় খোলা হাওয়ায় তিনি আগে বিশ্রাম নিবেন, তারপর বাংলাঘরে যাবেন। রাজকীয় খাদ্য খেয়ে ঘুমিয়ে ক্লান্তি দূর করবেন।
বিছানার পশ্চিমে মাদুর পাতা হয়েছে। নামাজের জন্য। ঘাসের উপর নামাজ পড়তে হয় কষ্ট করে। তাই একটা কাথা বিছিয়ে তার উপর নামাজের মোসলা দেয়া হয়েছে।
অবশেষে, সন্ধ্যার সময়, সূর্য ডুবু ডুবু, নদীর ওপারে পাল্কি দেখা যাচ্ছে। তিনি আসছেন। সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। হুজুরের সন্মনার্থে। তিনি সব জান্তা। দূর থেকেও মানুষের মনের কথা জানতে পারেন।  অসম্ভবকে তিনি সম্ভব করতে পারেন। পুকুর পাড়ে একটা হৈ চৈ পড়ে গেছে। এটা আন, ওটা আনতে হবে। জলচৌকি নেয়া হয়নি। তিনি এসে কিভাবে ওজু করবেন ? তাই আমার উপর আদেশ হল জল চৌকি নিয়ে যাবার জন্য।
খুব কায়দা করে, অতিশয় সাবধানে, কয়েকজন পাল্কির চারদিক ধরে, নদীর হাটুজল পেরিয়ে, কিছুক্ষনের মধ্যেই পাল্কি এসে নামল পুকুর পারে। পাল্কির চারদিকে সকলে ভীড় করে দাঁড়িয়েছে। পাল্কিার দরজা খোলাই ছিল। পাল্কির দুধাওে দুজন ধরে, খুব তাজিমের সাথে, সাবধানে হুজুরকে বের করলেন। তিনি দাঁড়াতেই পায়ে হাত দিয়ে সালামের লাইন পড়ে গেল। ছেলে বুড়ো সকলে। যারা হুজুরের চেয়ে বয়সে অনেক বড় তারাও পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। হুজুরকে কদমবুসি করা মানে আল্লাহকে খুশি রাখা। আল্লাহ খুশি থাকা মানে পুলছেরাত পার হবার সেতু শক্ত হওয়া।
মাগরেবের নামাজের সময় বয়ে যাচ্ছে। তাই তাড়াতাড়ি করে নামাজের ব্যবস্থা করা হল। অবশ্য আগে থেকেই করা ছিল। এখন হুজুর ওজু করবেন। জলচৌকিটা রাখা হল এক পাশে। নোয়াজ আলীর হাতে পানি ভর্তি বদনা। বারেকের হাতে একটা তোয়ালে। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে জলচৌকিতে বসলেন। নোয়াজ আলী বদনা থেকে পানি ঢালছে, বারেক তোয়ালে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এক বদনা শেষ হয়ে যাওয়ায় আর এক বদনা পানি আনতে হল। ওজু শেষ হতেই বারেক হুজুরের পা মুছে দিয়ে হুজুরের হাতে তোয়ালে দিল। হুজুর নিজে কষ্ট করে তাঁর মুখ এবং হাত মুছলেন।
নামাজ শেষ হতেই শুরু হল আবদার। কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে পানির গ্লাস হাতে। হুজুর একের পর এক সব কটিতেই ফু দিয়ে দিলেন। যার যত অসুখ বিসুখ সব সেরে যাবে এই পানি পড়ায়। বাড়ীতে কোন বালামুসিবত এলে এই পানি ছিটিয়ে দিলে আর কিছুই থাকবেনা। তাছাড়া হুজুর যতদিন আছেন ততদিন কোন বিপদ আপদ আসবে না এখানে। যে সব বালা মুসিবত পানিতে সারে না সেগুলোর জন্য তাবিজ নিলেই হয়। তাবিজের ফজিলত অনেক। তাবিজের শ্রেণী আছে। জরুরী কাজের জন্য নিলে তার হাদিয়া (ফি) বেশি। হাদিয়া নির্ভর করে কি ধরনের কাজ, কতদিনে তার ফজিলত (ফল) আশা করে এসব কিছু উপর। হুজুরের কাছে সব কাহিনী বলতে হয়, তারপর তিনি ঠিক করেন কি তাবিজ লাগবে এবং হাদিয়া কত।
তিনি এখন আস্তানা গাড়বেন মোল্লা বাড়ীতে। তারপর একে একে সব বাড়িতেই দাওয়াত কবুল করবেন। নিঃস্ব দিনমজুরও হুজুরকে এক বেলা দাওয়াত না করে পারে না। পরকালে সুখ আশা করতে হলে হুজুরের খেদমত করতে হবে। সবচেয়ে বড় মুরগিটা হুজুরের জন্য রাখা হয়েছে। পোলাও কোরমা করার সামর্থ না থাকলেও ধার কর্জ করে পীরছাবকে এক বেলা দাওয়াত করতে হবে। তিনি মেহেরবানী করে দাওয়াত কবুল করে তসরিফ নিলেই হয়। তিনি দয়া করে সুখাদ্য ভক্ষন করে সকলকে কৃতার্থ করে যখন ফিরে আসেন তখন খালি হাতে আসেন না। পীরছাবকে খালি হাতে দেয়া মানে পরকাল খালি থাকা। তাই ঋণ করে হলেও হুজুরের হাতে নগদ কিছু দিতে হয়। এমনি একে একে সব বাড়ীতে পদধূলি দিয়ে এক সময়  পকেট ভাড়ি করে ফিরে যান নিজ বাড়ীতে। যতদিন থাকেন ততদিন তাঁর চারপাশে ভীড় করে থাকে মুরিদের দল। সব কাজ বাদ দিয়ে। বেহেস্তের কাজে।

-৮-

বাবার আলমারিতে অনেক বই। একদিন একটা বই নিয়ে চোখ বুলাচ্ছি। কবিতার বই। কয়েকটা লাইন আজও স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করছে।

‘কেন নিবে গেল বাতি।
আমি অধিক যতনে ঢেকেছিনু তারে জাগিয়া বাসর রাতি,
তাই নিবে গেল বাতি।
কেন ঝরে গেল ফুল।
আমি বক্ষে চাপিয়া ধরেছিনু তারে চিন্তিত ভয়াকুল,
তাই ঝরে গেল ফুল।
কেন মরে গেল নদী।
আমি বাঁধ বাঁধি তারে চাহি ধরিবারে পাইবারে নিরবধি
তাই মরে গেল নদী।
কেন ছিড়ে গেল তার।
আমি অধিক আবেগে প্রাণপণে বলে দিয়েছিনু ঝঙ্কার,
তাই ছিড়ে গেল তার।

কবিতাটা পড়ে স্তব্দ হয়ে রইলাম। ইচ্ছে হল সবটা বই পড়ে ফেলি। জীবনের প্রথম মুখস্ত কবিতা ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি'র চেয়েও ভাল, শ্র“তিমধুর। আমার স্কুলের বইর সাথে নিয়ে নিলাম। আরও পড়ব এই ভেবে। স্কুলে যাবার পথে আলিমদ্দি আর হাসেম মাষ্টার অনেক কথা বলে যার বেশিরভাগ আমি বুজতে পারিনা। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করলে বলে, তুই বুঝবি না। একেক বার তারা হেসে লুটোপুটি খায়। মনে হয় তারা ছাত্র শিক্ষক নয়, গলায় গলায় বন্ধুত্ব। বয়সের কোন পার্থক্য নেই।
সেদিন আলিমুদ্দি বলছিল, দৌড় দিয়া ভাগছিল। পিছন থাইক্কা চুল ধইরা কইলাম, আমি কইয়া দেমু আওয়াজ করলে... তারপর হাসি। হাসি থামলে হাসেম মাষ্টার বলল, আমার কথা কস নাই তো ?
তাদের এই মধুর আলাপের মাঝখানে আমি বলে বসলাম, আলিমদ্দি, আমি একটা নতুন কবিতা মুখস্ত করছি। তুই কিছুতেই পারিবনা। এটা কোন বই এ নাই। শুনবি কবিতাটা ? বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে মুখস্ত ছেড়ে দিলাম। ‘কেন নিবে গেল বাতি ....’ মুন্সি আর আলিমদ্দি দুজনেই অবাক। কোথা পাইছস এই কবিতা ?
বাবার বই থেকে।
কি বই সেটা ?
এই যে! বলে বইটা বের করে দিলাম। মুন্সি ছো মেরে বইটা নিয়ে নিল। উল্টেপাল্টে দেখে বলল, আমার কাছে এখন থাক বইটা। আমি পড়ে ফেরত দেব। স্কুল ছুটির পর আমি আর আলিমদ্দি মুন্সির অপেক্ষা করছি মুর্শেদের ঔষধের দোকানের সামনে। কোন কোনদিন আমাদের পরে মুন্সির ছুটি হয়। তখন আমরা অপেক্ষা করি। কতক্ষন পরে মুন্সি এল এসেই বলল, চল আজ লেবেনচুষ কিনব। আবরুর দোকান থেকে চকলেট কিনে সবগুলোই আমাকে দিয়ে দিল। দু পয়সায় ষোলটা চকলেট। আনেক রং বেরং এর। আমি তো অবাক। হঠাৎ আমাকে চকলেট কেন ? আলিমদ্দিকে একটা দিয়ে, মুখে একটা পুড়ে বাকীগুলো পকেটে রেখে বাড়ীর পথে হাটছি। একটু দূরে শীল বাড়ীর কাছে এসে মুন্সি বলল, বাহার, তোদের আলমারিতে আরও বই আছে না ? এই বইটা আমাকে দিয়ে দে।  আমি আরও চকলেট দিব। বই তো আলমারিতে পড়েই আছে। অনেক দিন থাকলে পোকায় কেটে একেবারে শেষ করে ফেলবে। তার চেয়ে আমার কাছে থাকলে অনেক যতেœ থাকবে। যখন ইচ্ছে তুই ও নিয়ে পড়তে পারবি। মাঝখান থেকে তোর লাভ হল চকলেট। যতটা বই দিবি তত আনার চকলেট পাবি। দু পয়সায় ষোলটা চকলেট। তাহলে এক আনায় বত্রিশটা!
কোন উত্তর নেই। হিসেব করছি। বই থাকলে কি হবে, না থাকলে কি হবে। কত বই আছে, এসবের বদলে কত চকলেট পাওয়া যেতে পারে। মুন্সি আলিমদ্দি সমানে বলে যাচ্ছে। এটা এমন কিছুই না। পুরনো এসব বই এর কোন দরকারও নেই। স্কুলে তো আর লাগবেনা। ঘরে পরে থেকে লাভ কি ? আলিমদ্দির ঘর আর আমাদের ঘর তফাতটাই বা কি ? মাঝখান থেকে চকলেট লাভ। শেষ পর্যন্ত চকলেটের জয়। একদিন একটা বই দেই, কয়েক দিন চকলেট চলে। 

-৯-

জৈষ্ঠ মাস। নতুন পানি চারদিকে থৈ থৈ করছে। এখনও নাইপতাবেরির টেক তলিয়ে যায়নি। নদী পেরিয়ে এখনও নোয়াগার ভেতর দিয়ে পঞ্চবটি হয়ে স্কুলে যাওয়া যায়। নদী পার হতে সব সময়  নৌকা থাকে না। এটা খেয়াঘাট নয়। তাই একটু আগেই  ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। কারও সাহায্যে পার হওয়া যায় কিনা। আলিম হাশেম মাষ্টার আগেই আমতলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। দেখি ঘাটে তাজু হাজির নৌকা সাজানে হচ্ছে। এ এলাকার সবচেয়ে বড় নৌকা। সকলেই চেনে। ভাড়ায় খাটে। কার কি মাল কোথায় যাবে! একটু এগিয়ে কাছে গিয়ে দেখি কাঁঠাল। ভরা হচ্ছে। পীরছাব হুজুরের বাড়ীতে যাবে। এটা ছোটখাট একটা উৎসব। সমস্ত গ্রাম মিলে প্রতি বছর এমনি আনন্দ করে। আম কাঁঠাল ফলমূল ধান চিড়া ইত্যাদি হুজুরের খেদমতে হাজির করে। এ উৎসব বছরে কয়েকবারও হতে পারে। কিছু নিয়মকানুনও আছে। এগুলো মানলে ছওয়াব বেশি হয়।
গ্রামের উত্তরে নামাবাড়ী থেকেই আমকাঠালের বাগান শুরু। বাড়াই গ্রামের মালিকানা দু আড়াই মাইলব্যাপি নয়ামুড়া পর্যন্ত। নিয়ম হল এই নামা বাড়ী থেকে নয়া মুড়া পর্যন্ত সব গাছ থেকে বড় কাঁঠালটা হুজুরে জন্য যাবে। এটা করতে হবে নিজেরা খাবার  আগেই। গাছের প্রথম ফলটা। কার গাছ সেটা জানার দরকার নেই। মুসলমানের হলেই হল। বিধর্মির গাছ থেকে নয়। কারণ নয়ামুড়ার সব হিন্দু। সাবধানে কাটতে হবে। আমের বহর কিছুুদিন আগে গেছে। এখন কাঁঠালের বহর। একটা নৌকায় না কুলালে  উত্তরহাটির নুরুর নৌকা নেয়া হবে। নৌকা একেবারে কানায় কানায় পূরতে হবে। যারা নিয়ে যাবে তারা আগামীকাল ফজরের পরেই রওয়ানা দেবে। শেষ রাতে তাদের জন্য রান্না করে ভাত তরকারি দিয়ে দিতে হবে। সারাদিন নৌকা বেয়ে সন্ধ্যায় গিয়ে পৌঁছবে। হুজুরের দরগাহে। হুজুরের বাড়ীকে দরগাহ বলে সকলে। পথে সারাদিন খেতে হবে। সাথে চিড়েগুড় নিয়ে যাবে। কারণ ফেরার পথে এই চিড়াগুড় খেয়ে ফিরতে হবে। হুজুরের বাড়ী থেকে খাবার দিয়ে দেবার রেওয়াজ নেই। শুধু রাতটা থাকার জন্য বাইরের ঘরে খড় বিছিয়ে কাটিয়ে দেবে। রাতের খাবার মিলবে বাড়ীর চাকরের সাথে। ফজর বাদ ফেরত রওয়ানা দিতে হবে। এসব  হুজুরের নজরানা। পুরনো দিনের জমিদারদের মত।
নজরানা অনেক রকমের আছে। গাছের তরিতরকারি ফলমূল ছাড়াও নজরানা আছে, নিয়ত আছে। জিনিষটা খুবই স্পর্শকাতর। একবার নিয়ত করে ফেললে মহা বিপদ হলেও তা আদায় করতে হবে। নিয়তের গুনেই মানুষ বেহেস্ত পাবে। যার নিয়ত ভাল নয় সে নবীর শাফায়েত পাবে না। আর নবীর শাফায়েত না পাওয়া মানে নির্ঘাত দুজখ।
মনসুরের বাগানের কয়েকটা গাছে আমের মুকুল ধরে। কিন্তু আম থাকে না। থাকলেও ছিটেফুটা কয়েকটা। দুটা কাঁঠাল গাছেও কাঁঠাল আসে না। এ গাছগুলো বাগানের শেষ মাথায়, লুঙ্গার সাথে। মনসুর নিয়ত করেছে হুজুরের নামে এ গাছগুলোসহ জায়গাটা লিখে দিয়ে দেবে। এসব অফলান্ত গাছে তার প্রয়োজন নেই। হুজুর যখন তসরিফ নিলেন, মনসুর কদমবুসি করে সামনে দাঁড়িয়ে, হাত কচলিয়ে বলল, হুজুর বেয়াদপি মাফ করবেন। একটা নিয়ত কইরা ফালাইছি। মুড়ার পশ্চিম কান্দার এক কানির বাগে (বাগানে) পাঁচটা আম গাছ, আর তিনডা কাডলগাছ, ফল ধরে না। সেগুলি আপনের নামে লেইখ্যা দিমু নিয়ত করছি।
আলহামদুলিল্লাহ, মাশাল্লাহ। নিয়ত যখন করেই ফেলেছ তাহলে আর কি করা! সে জায়গাটা তো অনেক জঙ্গল তাই না ?
জিও হুজুর।
তাহলে একটা কাজ কর।  পরিষ্কার করে ফেল। দিলেই যখন তখন জঙ্গল পরিষ্কার করেই দাও।
মনসুর দুজন কামলা নিয়ে এক মাস লাগিয়ে এই গহিন জঙ্গল পরিষ্কার করে, হুজুরের নামে রেজিস্ট্রিরি করে হুজুরকে জানিয়ে দিল।
পরের বছর থেকেই কিছু কিছু ফল ধরতে শুরু করল। এখন সব গাছেই একবারে ঝেকে ফল আসে।  এসব হুজুরের কুদরত। কিন্তু সে সব গাছের ফল আমরা খেতে পারি না। এখানকার নিয়ম হল পাকা ফলের মালিক যে ধরতে পারে সেই। পাকা ফল খেলে কারওর কোন আপত্তি নেই। কিন্তু হুজুরের গাছের পাকা আম কাঁঠাল ধরাও নিষেধ। হুজুর না থাকলেও তিনি সব জান্তা। জেনে ফেলবেন। অনুমতি না নিয়ে খাওয়ার জন্য তিনি বদদোয়া দেবেন। বদদোয়া মানে সব শেষ। এমনি অনেক কিছু হুজুরের নামে লিখে দিয়ে দেয় অনেকেই। যা তাদের অপ্রয়োজন মনে হয়। তাজু হাজী তার আলিঘোড়ার চকের জমিটা লিখে দিয়েছে। ওতে ফসল হয়না। হুজুরকে দিয়ে দেবার পর সার দিয়েছে। এখন অনেক ফসল হয়। সেই ফসল বিক্রি করে হুজুরের খেদমতে টাকা পাঠিয়ে দিয়ে তাজু হাজি খুব খুশি হয়। আমার এক চাচা যিনি সকলে বড় ছিলেন তিনি মারা যাবার আগে গানপুরের বিলের বোরো জমিটা হুজুরকে দিয়ে গেছেন। সেই জমির ধান বিক্রি করে মেজ চাচা টাকা পাঠিয়ে দেন। এমনি অনেক কিছু হুজুরের খেদমতে যায়। গরু, ছাগল, হাস মুরগি ইত্যাদি। বিক্রি করে টাকা পাঠালেও সমান ছওয়াব পাওয়া যায়।
এই ছওয়াবের জন্য প্রতিযোগিতা হয়। কে বেশি ছওয়াব কামাই করবে। কোন রকম নজরানার জন্য কত হাজার কত লক্ষ নেকি পাওয়া যায় তারা সব হিসেব জানে। যেখানে নিজেরা হিসেব ঠিক করতে পারে না সেখানে হুজুরের দরবারে হাজির হয়ে সবটা জেনে নেয়। হুজুর পরিষ্কার করে বাতলে দেন, কোন জিনিস দান করলে  লক্ষ ছওয়াব পাওয়া যায়।
এইসব আম কাঁঠাল তরি তরকারির জন্য খুব বেশি নেকি পাওয়া যায় না। বেশি নেকি মেলে জমিজমা গরু ছাগল নগদ টাকা পয়সায়। যারা দান করে তারা একটা হিসেব রাখে মনে মনে। বেহেস্তের হিসেব। জমা খরচের।
হিন্দুদের মাঝেও এমন একটা প্রতিযোগিতা চলে। কে বেশি পূণ্য কামাই করবে, কে কত বেশি দান করতে পারবে, পুরোহিতকে সন্তুষ্ট করতে পারবে। যে যত বেশি পূণ্য করবে সে তত তাড়াতাড়ি স্বর্গে যাবে। পীর পুরোহিতের একই কায়দা।
নৌকার কাছে গিয়ে আলিম বলল, এই কাডলডা আমরার হাজাইরা গাছের। নৌকার দিকে তাকিয়ে দেখি এখনও বোঝাই করার অনেক বাকি। এই ছওয়াবের কাজে মানু ভাই আছে। সে থাকবে শুধু মজা করার জন্য। এর মাঝে বারেক এক মাথা কাঁঠাল নিয়ে এসে বলল, একটু ধরে নামাও।
হাসেম মাষ্টার বলল, এই যে একটা নৌকা পাওয়া গেছে। চল, উঠ!
নাইপতাবেড়ি হয়ে নোয়াগা পার হয়ে রাস্তা দিয়ে হাটছি আমরা। নোয়াগা থেকে আলমপুর পর্যন্ত কাচা রাস্তাটা বোধ হয় কোন কালে জমি থেকে উচু ছিল। এখন তার চিহ্ন আছে। বৃষ্টির জল আর মানুষের পায়ের ধাক্কায় রাস্তার মাঝখানের মাটি সরে গিয়ে কোথায়ও গর্ত। কোথায়ও পানি। রাস্তার দুপাশে মাটি জমে একটু উঁচু। চলা যায়,  সাবধানে পা ফেলে। হাসেম মাষ্টার বলল,  খাইছে রে! শিবের বেরেষ রাস্তায়! বেরেষ মান বৃষ বা ষাঁড়। হিন্দুদের দেবতার নামে ছেড়ে দেয়া। যাদের দান করার ক্ষমতা আছে তারা ভগবান শিবের নামে ছেড়ে দেয়। এর মালিক ভগবান শিব। বাসস্থান যত্রতত্র। খাদ্য সরবরাহ যাহা মনে চায়। কেউ বাধা দিতে পারবেনা। তাহলে নির্ঘাত নরকবাস। ধান ক্ষেত পাট ক্ষেত তরিতরকারির বাগান সব খেয়ে শেষ করে ফেললেও কিছু বলা  যাবে না। ভগবানের দূত। কিন্তু মুসলমানের জমিতে গেলে তাড়িয়ে দেয়। এই ষাঁড় এমনি খোলা জগতে খেতে খেতে এমন তাগড়া যে নড়াচড়ার ক্ষমতাও নেই। মনে হয় একটা মাংস পিন্ড। ধীর গতিতে চলে। অনেক গ্রামে এসব ষাঁড়ের দেখা মেলে।
এরা খুব শান্ত স্বভাবের হয়। খুব একটা গুতোগুতি করে না। তারপরও শিং দেখে ভয় পেতেই হয়। খুব সাবধানে এক পাশে লাফ দিয়ে দিয়ে পার হয়ে গেলাম।
কিছুকাল পরে এসব শিবের বেরেষ আর  দেখা যায় না। কোন গ্রামেই না। কেউ বলে শেখেরা খেয়ে ফেলেছে, কেউ বলে ইন্ডিয়ায় নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। তখন থেকে হিন্দুদের মাঝে একটা ভাবনা এসে গেল। এই শেখের দেশে ধর্মকর্ম  করা যাবে ত!
তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। বইর আগা মাথা সব মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু অংক! অংকের কি হবে? শেষ পর্যন্ত কিছু অঙ্ক মুখস্থ করে ফেললাম। প্রতিযোগিতায় জিততে হবে। পরীক্ষায় ভাল নাম্বার পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে ৫ম শ্রেনীতে উঠলাম। আলিম দ্বীতিয় আর ছায়া তৃতীয়। 
বছর শেষ হয়। প্রায় প্রতি বছরই নতুন ক্লাশে পুরনো অনেক মুখ দেখিনা। হারিয়ে যায়। খোজ করি। শুনতে পাই তারা চলে গেছে অন্য কোন খানে। ছায়া চলে গেছে চট্রগ্রামে তার মাসির কাছে। পার্বতির বিয়ে হয়ে গেছে, অমিয় চলে গেছে চট্রগ্রাম তার বাবার ব্যবসায় সাহায্য করে, সবিতা শেফালি চলে গেছে তাদের দাদার কাছে কলকাতায়। রাখাল ঢাকায়, সবিতা এখন সন্তানের মা, মতি রায় কয়েকবার ফেল করে এখন কৃষিকাজ করছে। বাসন্তি কোথায় কেউ খবর জানে না। তাদের পরিবারের সবাই কোথায় চলে গেছে। এমনি করে দিনে দিনে বন্ধুরা হারিয়ে যেতে লাগল। যারা যায় তারা আর ফিরে আসে না। 
বাবার আলমারি যখন খালি, তখন মুন্সিও শেষ।  পরীক্ষায় কয়েকবার ফেল করে বাড়ী ফিরে গেছে। এবার নিয়ে ছয় বার মেট্রিক দেবার চেষ্টা হয়েছে। একবারও এলাও হয়নি। এবার আর ফিরে এল না।
আলিমদ্দি স্কুল ছেড়ে ফিরে গেছে কৃষিকাজে। গোটা দশেক গরুর দেখাশুনা করতে হয়। যথেষ্ট হয়েছে পড়া!
আমি এখন এ পাড়া থেকে একা স্কুলে যাই। পশ্চিম পাড়া থেকে কয়েকজন যায়।
স্মৃতির বালুকণার মাঝে খুজে পেতে গিয়ে দেখি চকলেট বার্টারে বিক্রিয়করা সেই বইগুলো ছিল রবীন্দ্র রচনাবলী। বাবার বড় শখের বস্তু।

-১০-

ইন্ডিয়ার শেখের কোটের বাজার থেকে ছোট  চাচা একটা পেঁপে এনেছিল। এত বড় পেঁপে আর আগে কেউ দেখিনি। একটা কাঁঠালের সাইজ। মানুষকে দেখানোর জন্য দুদিন ঘরে রাখতে হয়েছে। সেই পেঁপের বিচি থেকে চারা করে বিতরণ করা হয়েছে। একটা জ্বলজ্বলে স্মৃতি। অন্য কারণে। কারওর চারা থেকে পেঁপে হয়নি। বাঁচেনি। কিন্তু ছোট চাচার একটা গাছ হয়েছে। পেঁপে ধরেছে। এক গজ লম্বা হবার পরই ঝেকে পেঁপে ধরেছে। উঠানের কোনে। এত ছোট গাছে পেঁপে ধরতে কেউ দেখেনি প্রতিদিন স্কুলে যাবার আগে দেখা যাই কতবড় হল। বিকেলে আমি আর রমা হিসেব করি, আর কতদিনে পাকবে। একদিন সত্যি সত্যি সবচেয়ে বড়টা লাল হল। সাথে সাথে এক দৌড়। চাচা, পাকছে, একটা পাকছে! কই, দেখি বলে চাচা এসে দেখলেন সত্যিই লাল হয়েছে। তিনি পেঁপেটা পেড়ে বললেন, এখনও নরম হয় নাই। ভাল করে পাকুক বলে একটা শিকেয় তুলে রাখলেন।
এবার সকাল বিকেল শিকের দিকে তাকিয়ে থাকা। কখন নরম হবে, কখন কাটবে, কখন আমার ভাগটা পাব। কাটার সময় বলব রমা আর আমার ভাগটা একটু বড় করে কাটতে। যেমন দিয়েছিল শেখের কোটের পেঁপে থেকে।
দুদিন পর স্কুলে যাবার সময় দেখলাম একদম লাল হয়েছে। ভাবলাম স্কুল থেকে ফিরেই কাটতে বলব। স্কুল থেকে ফিরে দেখি শিকে ফুরুৎ। খালি ঝুলছে। চাচা কই ? মাছিহাতা গেছে। বুঝতে বাকী রইলনা। সব গাছের প্রথম ফল যায় হুজুরের পেটে। পুকুরের বড় মাছটা যায় হুজুরের খেদমতে। রমা আর আমি শূন্য শিকের দিকে তাকিয়ে আছি। কিছু করবার নেই।
পঞ্চম শ্রেণীর বালক আমি। আমার মনে অনেক প্রশ্ন এসে উকি দিতে লাগল। তা তো বড়দের সামনে উচ্চারণ করা যাবে না। এ কিসের পীর! আমরা দুজন এতদিন পাহাড়া দিয়ে রেখেছি আর খেয়ে ফেলল পীর ছাব! রাগে দুঃখে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বেশি রেগে গেলে মুখ দিয়ে গালি বের হয়। তবে যে সব শব্দ খুব আপত্তি কর তা বের হয় না। মুখের একটা লাগাম থাকে।
আগ্রহে অপেক্ষা করলাম। যদি অর্ধেকটা নিয়ে আসে। যদিও একটা নিয়ম নয। পীরছাবের বাড়ী থেকে কিছু আশা করা অন্যায়। তারা তো নেবে, দেবেনা। তারা দেবে দোয়া, নেবেন। এটাই নিয়ম।
পরের দিন মাগরেবের আগে চাচা এসে পৌঁছলেন বাড়ীতে। অপেক্ষা করছি কখন আসে। খালি হাত। চাচা অর্ধেকটা আন নাই আমাদের লাইগ্যা?
দূর পাগল, পীরের বাড়ী থাইক্কা কেউ আনে নাকি ? পরের গুলি পাকলে তোমরা খাইও।
পরেরটা পীরকে দিলেই তো পারতে! আমরা খাব বলে পাহাড়া দিয়ে দিয়ে রেখেছি। আর তুমি নিয়ে গেলে পীরের জন্য! আমার মুখ থেকে বের হয়েই গেল বলে! এই বের হয়ে গেল বলে! হঠাৎ শুরু হয়ে গেল ওয়াজ। শুয়রের বাচ্চারা! কুত্তার বাচ্চারা আসে কেন আমাদের বাড়ীতে ? কোন কিছুই আমরা খেতে পারি না! সব তাদের বাড়ীতে যায় কেন ?
চাচা প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। থ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। পীরছাবকে গালি! অবিশ্বাস্য! এ যে অসম্ভব! কল্পনাতীত! ইতিহাসে নেই ! নিশ্চয়ই আমার মাথায় গণ্ডগোল হয়েছে। কি বললি! বলেই চাচা এগিয়ে এল আমাকে ধরতে। আমি দৌড়। তখন গালাগালিতেও আমি বেশ পাকা। পেঁপের চেয়েও বেশি। দৌড়াচ্ছি আর ছাড়ছি। যেন মালার মত। কোনটার পর কোনটা আসবে। একবারে মুখস্ত। সুন্দর আলী থেকে শেখা। সুন্দর আলীর ক্ষেতে কারওর গরু একটা কামড় দিয়েছে তো হয়েছে। দু ঘন্টা ওয়াজ হবে আইলে দাঁড়িয়ে। যার গরুতে খেয়েছে সে শুনুক বা না শুনুক তার কিছু যায় আসেনা। খুব জোরে জোরে অশ্লীল শব্দভান্ডার। নারী এবং পুরুষের গোপন অঙ্গগুলোর বিকৃত নামাবলী। অপরকে আঘাত করার জন্য গালাগালির মালা হিসেবে ঝাড়বে। বহুদূর থেকেও শোনা যায়। চলবে যতক্ষন না তার মুখ দিয়ে ফেণা বেরুবে। এক সময় শান্ত হয়ে এলিয়ে বাড়ী যাবে। সেই ওস্তাদের গালির বহর। আজ এসব যদি একটিও মুখে আনি তাহলে আমি মানুষের পর্যায়ে পড়বনা অবশ্যই। কি করে যে এসব মুখ দিয়ে  বেরোত ত ভাবলে অবাক হই। পীরের চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার! মুখে শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গ। কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা বোধ হয় পীরও জানেনা! ঝাল মিঠাবার একমাত্র অস্ত্র।
ছাড়ছি আর দৌড়াচ্ছি। চাচা পেছনে। অন্ধকার নেমে এসেছে। কিছুই দেখা যায় না। অনুমান করে পুকুরের পাড় ঘুরে ঘুরে। দৌড়ের প্রতিযোগিতা চলছে। চাচা আমার সাথে পারবে কেন ? আমি যে সবচেয়ে ভাল ফুটবল প্লেয়ার! পশ্চিমপাড়ে যে শিমুল গাছটার নীচে দিনের বেলায়ও যাই না তার নীচে দিয়েও দৌড়াচ্ছি। বাড়ীর অনেকে বেড়িয়ে এসেছে। কেউ কিছুটা বুঝেছে, কেউ না বুঝেই যোগ দিয়েছে অভিযানে। চাচা বলছেন, ধর, ধর, তারে ধর। ধইরা মুখটা চাইপা ধর। রাইতটা পার অইব কিনা সন্দেহ। শেষ অইয়া যাইব! কোন রকমে ধইরা ফালা।
নুরু ভাই জিজ্ঞেস করল, কারে বকতাছে ?
পীরছাব হুজুররে!
পীরছাব হুজুররে? তাইলে রাতটা পার অইবোনা! আগুনে ঝাপ দিছে। বলেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ। তিনি ছোট চাচার চেয়ে বেশি দৌড়াতে পারেন। তাছাড়া শাস্তির এটা বড় সুযোগ হাতে। ধরতেই হবে। হাতের শখ মিটবে। কুফাটাকে শাস্তি দিয়ে।
পুকুরের উত্তর পাড়ে সবাই জড়ো হয়েছে। মেয়ে পুরুষ সব। পূর্ব পাড়ে ছোট চাচা, দক্ষিন পাড়ে নুরু ভাই। আর  যায় কোথায় ? পশ্চিম পাড়ে তো বাঁশঝাড় আর সেই ভুতুড়ে শিমুল গাছ। এই এলাকার নয়,  কোথায় এত বড় শিমুল গাছ নেই। তার উপর দিয়ে প্রতি সন্ধ্যায় রথে চড়ে অশরিরী আতœারা যায়। যাবার সময় গাছের সমস্ত ডাল পালা ঝাকিয়ে, আমাদের বাড়ীর গাছপালা কাপিয়ে, ঘরের চাল উড়িয়ে নিয়ে তবে যায়। গতবার পীরছাব হুজুরকে ছোট চাচা বলেছিলেন। পীরছাব হুজুর পানি পড়া দিয়ে বলেছেন ওটা সন্ধ্যার সময় গাছের গোড়ায় ছিটিয়ে দিতে। আর যখন রথের বাতাস বইবে তখন বলবে, আমার হুজুরের নির্দেশ তোমরা এ পথে আর আসা যাওয়া করবেনা। যেভাবে আদেশ ঠিক সেভাবেই বলা। একদিন সন্ধ্যায় যখন হাওয়া বইছিল। তখন চাচা হুজুরের শিখানো বুলি ছেড়ে দিল। সেই থেকে ওনারা পথ বদল করেছে। কিন্তু তারা যে এখানেই থাকে তার প্রমাণ আছে। এখন সেই গাছের নীচে, গুটগুটে অন্ধকারে আমি গ্যাড়াকলে আটকে আছি। সকলের ধারনা, এবার তো ধরা দিতেই হবে। ওদিকে নুরু ভাই, উত্তর পাড়ে বাড়ীর সবাই। পশ্চিম পাড় ছেড়ে নীচে গেলেই পাটক্ষেত। হাটু পানি সাপখোপের বেশি ভয়। আর যাবে কোথায় ? ধরা পড়বেই! 
শিমুল গাছ একটা নয় তিনটা। এক সারিতে। পুকুরের পশ্চিম পাড়ের মাঝামাঝি যেটা সেটাই সবচেয়ে বড়। তার উত্তরে যেটা সেটা সবচেয়ে ছোট। একবারে উত্তরে যেটা সেটাও কম নয়। বড়টার চেয়ে সামান্য ছোট। সে গাছের শিকর কান্ড থেকে অনেকদূর বেরিয়ে আছে। যেন চিতল মাছ। গাছের কান্ড থেকে মাটিতে নেমে এসেছে। তিনদিক থেকে তিনটা। এই শিকড়ের ফাকে নীচে মাটিটুকু বেশ পরিষ্কার। আমি প্রায়ই ওখানে বসে সূর্যাস্ত দেখি। যখন দেখলাম চারদিক থেকে আক্রান্ত, তখন ঝোপের ভেতর দিয়ে চলে গেলাম। সেই গাছের গোড়ায় চুপচাপ বসে রইলাম। কেউ চিন্তাও করতে পারেনি সেই গাছের গোড়ায় একা বসে থাকার। তাও রাতের বেলায়। দিনে বেলায়ও কেউ যায় না।
আমার সারা না পেয়ে হঠাৎ হৈ চৈ থেমে গেল। যেন সম্রাট অশোকের যুদ্ধক্ষেত্র। এখনি কি শেষ হয়ে গেল! সাক্ষাৎ আগুন নিয়ে খেলা। পীরছাবকে গালি! রাত পার হবে কেন! দাদার কোন এক চাচা হুজুরের মানত ঠিক সময়ে আদায় করেনি বলে মুখ দিয়ে রক্ত ওঠে রাতারাতি শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে মানত করলে সাথে সাথে আদায় করে ফেলতে হয়। অন্ধকারে বসে আমি সব শুনছি। বাঁশ ঝাড়ের নীচে খুইজা দেখ। গেল কই! কয়ন যায়না। শেষ হইয়াই গেল নাকি! মেয়েরা কান্না শুরু করে দিয়েছে। সবাই পশ্চিম পাড়ে ঝোপঝাড় খুজে হয়রান। নেই, কোথায়ও নেই। বড় চাচি সবাইকে বলছে তোমরা একটু দোয়া দরুদ পড়। তার উপর কিছু ভর করছে। না অইলে এমুন পাগল অইয়া যায়! সকালে যখন স্কুলে যায় তখনই তার চোখ লাল দেখছিলাম। স্কুল থাইকা আইয়াও কারও লগে কথা কয় নাই। খেলতেও যায় নাই। তাইলে বড়ডাই ধরছে। তুলা (শিমুল) গাছের মাথায় খুজে দেখ। উডাইয়া লইয়া গেছে কিনা কে জানে! পিঠোপিঠি বোন রুসেনা খুব জোরে চিৎকার করে কাঁদছে। ভাইরে তুই কই! অমি আর তোর নামে নালিশ করুম না। আল্লাহ তুমি আমার ভাইরে ফিরাইয়া দেও। রুসেনা আমার বড়। তার অর্ধেক চুল বোধ হয় নেই। দিনে দিনে ছিড়েছি। ওদেরকে মারতে খুব সুবিধে। চুল ধরে নীচে পড়ে গিয়ে পা দুটা চালালেই হল। আনুবু সাহায্যে এলে তার চুলও রক্ষা পায় না। সেই রুসেনা আমার সব ক্ষমা করে দিচ্ছে। তার দেখাদেখি রশিদা, হামিদা আরও অনেকে অনেককিছু ক্ষমা করে দিচ্ছে।
পূবের বাড়ীতেও খবর চলে গেছে। হৈ চৈ শুনে ইমাম চাচা এসেছেন। সবশুনে তিনি ফতুয়া জারি করেছেন। পীরছাব হুজুরকে বকা, আর আগুন নিয়ে খেলা সমান। রাতটা পার অইবনা। রাতারাতি যদি পার হুজুরের কাছে পৌঁছাও। তাহলে বাঁচার চিন্তা করা যায়। সে বাড়ীর আরও অনেকে এসেছে। মহিউদ্দিনভাইও এখন বাড়ীতে। তিনি কিশোরগঞ্জ মাদ্রাসায় পড়েন। হজুরের নির্দেশে। কারণ পূর্বপুরুষ থেকেই ইমামতি মোল্লা বাড়ীর হাতে। ইমাম চাচার পর ইমাম হবে মহিউদ্দিনভাই। তাই সেভাবেই শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পীরছাব হুজুরের অনুপস্থিতিতে ইমামচাচা ফতোয়া দেন, ধর্মীয় সব কাজকর্ম করেন। মোল্ল বাড়ীটা দুভাগ। পূর্বের বাড়ী আর পশ্চিমের বাড়ী। পূর্বের বাড়ীর ওরা পশ্চিমের বাড়ীকে বেশি মূল্য দেয় না। দ্বিতীয় শ্রেণীর মোল্লা। কারণ তারা বাইদ্যানির বংশ। দাদার বাবার চরিত্রের কর্মফল। মূল্য দিতে হচ্ছে তার বংশধরের। একের অপরাধ অন্যের শাস্তি।
দাদার বাবার চরিত্র কেমন ছিল জানি না। তিনি ইমাম ছিলেন। ইদানিংকালে খবরের কাগজ খুললেই দেখতে পাই, ওমুক জায়গায় মসজিদের ইমাম কর্তৃক ধর্ষণ, মাদ্রাসার শিক্ষককের যৌন কেলেঙ্কারি ইত্যাদি। পৃথিবীতে এমন কত ঘটনা ঘটে। সব খবর কি ছাপা হয়! খবরের কাগজের সাংবাদিকরা যেন এই মোল্লামৌলভীদের জাত শত্র“। একটু পেলেই হল। সব ফাঁস করে দেয়! তিলকে তাল করে ? আর মৌলভীরাও কেন যেন এসব ঘটনার সাথে জড়িয়ে পড়ে! কি জানি এর পেছনে কি আছে! হয়ত বা কোন ছুন্নত বা ফতুয়াজাতীয় কিছু হবে হয়ত। কিন্তু দাদার বাবার কাহিনী অন্য রকম। চাচাদের মুখে শোনা।
মোল্লা বংশের একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে। কিভাবে তারা মোল্লা হল আর ইমামতির পদটা রাজকীয়ভাবে দখল করে নিল। আজ থেকে পাঁচ পুরুষ আগে আরব দেশ থেকে এনায়েত নামে এক মহাপুরুষ আসেন এদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারে। তখন এই এলাকা ছিল বাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য। অনবাদি গহিন জঙ্গল। বাঘসহ বন্য জন্তুতে ছিল ভর্তি। এখানে ওখানে দু একটা বাড়ীঘর ছিল। সেই মহাপুরুষ এই এলাকার অশিক্ষিত মানুষকে শিক্ষিত করতে গিয়ে কোন এক রমনীকে চোখে পড়ে যায়। তারপর দীক্ষা দিতে গিয়ে নিজেই দীক্ষিত হয়ে যান। চলার পথে থমকে যান। স্থির করেন এখানে আরও দীক্ষা দিতে নিতে হবে। রমনীকে তার চাই। না হয় দীক্ষা পূর্ণ হবে না। তাই হল। ফতোয়া। শাদি। এখন বাড়াই গ্রামের উত্তর পশ্চিমে হওরাডুলির বিলের মাঝখানে যে ছোট্ট একটা দ্বীপ সেখানেই তিনি আস্তানা গাড়লেন। জায়গার নাম হল এনায়েতপুর। তার নিজের নামে। মানুষ এখন আর এনায়েতপুর বলে জানেনা। কিন্তু জমির দলিলে এখনও এনায়েতপুর মৌজার অধিনে রেজিষ্ট্রি করতে হয়। সেই মহাপুরুষের বংশ বরান মোল্লা, দাদার বাবা। এনায়েত আরবের লোক। ধর্ম তার অধিকারে। সেই সুবাদে তিনি ছিলেন এলাকার ধর্মিয় গুরু। ইমামতির কাজ তাকেই করতে হত। বংশানুক্রমে বরান মোল্লা ইমাম।
প্রতি বছর বেদের বহর আসে। নদীর তীরে নোঙ্গর করে আশে পাশের গ্রামে তারা তাদের ব্যবসা করে। পুুরুষরা নৌকায় থাকে, রান্নাবান্না করে। মেয়েরা তাদের ঝাকি নিয়ে বেরিয়ে পরে ব্যবসায়। বাতের ঔষধ, সিঙ্গা দিয়ে বাতের বিষ রক্ত বের করা, দাঁতের পোকা বের করা, উকুনের ঔষধ ইত্যাদি।
বরান মোল্লার দাঁতে পোকা হয়েছে। বের করতে হবে। বেদেনিকে ডাকা হল। আরে! এযে একবারে ডলডলে! যৌবন ফেটে পড়ছে। লম্বায় ছয় ফুট। মুখের আদল যেন শিল্পীর আঁকা ছবি! তাও আবার অবিবাহিত! দাঁতের পোকা বের করতে গিয়ে বেদেনীর শরীরের গন্ধ, চুলের সুবাস আর প্রঃশ্বাসের তীব্রতা বিষাক্ত করে দিল পরিবেশ। ইমাম বরান মোল্লার গায়ে জ্বালা ধরে গেল। দাঁতের পোকা চলে গেল বুকে। এ পোকার ঔষধ একমাত্র বেদেনী। এ এলাকার তিনিই ধর্মীয় হর্তা কর্তা। ফতুয়া জারি হল। চার বিবাহ পর্যন্ত চলে। বেদেনী বুকের পোকা বের করবে। কাজ হয়ে গেল। কার প্রেমে কে কখন কেন পড়ে কে জানে!
কিন্তু আগের পক্ষের ছেলেরা মেনে নেয়নি। তাই তাকে আলাদা এই পশ্চিমের বাড়ীতে রাখা হয়েছে। মাঝখানে রহমত আর ফুলিদের বাড়ী। পশ্চিমের মোল্লা বাড়ী দু নম্বর মোল্লা বাড়ী। ইমাম চাচা এখনও সে কথা ভুলেনি। যখন তখন গালি দেন। ‘বাইদ্দানীর পুতাইত!’ তবে সম্পর্কের কোন ঘাটতি নেই। সুখে দুখে সব সময় সবকিছুতেই আছেন।

-১১-

উল্টো বাতাস বইছে। এখন আমাকে খুজে বের করাটাই প্রধান হয়ে পড়েছে। অপরাধের পরিমাপ এখন নয়। আগে অপরাধি। অপরাধিবিহীন অপরাধ বিচার নিরর্থক। বাড়ীতে কারও টর্চলাইট নেই। শিমুল গাছে সবটা দেখা সম্ভব নয়। কয়েকজন মিলে পাটশোলার মশাল নিয়ে এসেছে। শিমুল গাছ, বাঁশঝাড় নীচের ঝোপঝাড় সব। কোথায়ও নেই। শিমুল গাছের উপর দিয়ে একটা বাতাস হাহাকার শব্দ করে বয়ে গেল উত্তরে। সবাই সেই বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে হাহাকার শব্দে নরম হয়ে গেল। নীবর, নীথর। মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। এমন সময় শিমুল গাছের মগডালে কিসের আওয়াজ! সকলের কানখাড়া। এ্যা, তাইলে নিয়াই গেল! ধরা গেল না! সবাই সেই অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে কান্না সংবরণ করছে। মেজ চাচা খুব কড়া বিচারক। তার কাছে কোন ক্ষমা নেই। শুরু করলে মাটিতে না শুইয়ে ছাড়েন না। চিৎকার করে নুরু ভাইকে বলেছেন, তুই এখনই মাছিহাতা চলে যা। রাইতে একটা ট্রেন আছে। এখন হুজুরের হাতেই সব। তাইনে ইচ্ছা করলেই পাওয়া যাবে। ফাকি দেওনের কোন পথ নাই। সব জানে, জাইনা গেলে এর মাঝে।
বড় চাচা কোন কথাই বলছেনা। চুপচাপ। সব দেখছেন। বাবা বোকার মত গাছের দিকে তাকিয়ে। বুরহান ভাই, মাফিল ভাই নুরু ভাই আকাশের দিকে তখনও তাকিয়ে। বাবা জিজ্ঞেস করছেন, তোরা কি গাছের মগপাল ভাল করে দেখছিলি ?
হে, তখন তো কিছুই দেখলামনা।
বড় চাচি বলছেন, তখনও ছিল। তোমারা দেখ নাই। এই ত মাত্র নিয়া গেল।
উত্তর গাছের গোড়ায় বসে সব শুনতে  পাচ্ছি। আমি জানি গাছের মগডালে দুটো ঈগল বাস করে। বিল থেকে বড় বড় মাছ ধরে নিয়ে ওই মগডালে বসে খায়। মাঝে মাঝে ফসকে নীচে পড়ে যায়। একদিন বড় একটা শোল মাছ পড়ে গিয়েছিল। আমি রমা মিলে বাড়ীতে নিয়ে এসে অনেক বকুনি খেয়ে জায়গারটা জায়গায় ফেরত রেখে এসেছিলাম। একটা বাসাও আছে। প্রতি বছর বাচ্চা দেয়। এত মানুষের জালাতনসহ্য করতে না পেরে পাখা ঝাপটে উড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও। এই পাখা ঝাপটার শব্দই আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। অথচ আমি বহাল তরিয়তে এখানে আছি।
ওরা যখন এতসব নিয়ে মেতে ছিল তখন আমি পীরের চৌদ্দগোষ্টি শেষ করে দিচ্ছি। পীরের যে ছেলেটা কিছুদিন আগে মসজিদের দরজায় বসেছিল, আর আমরা খেলাশেষে ফিরছিলাম। লাইনধরে একে একে সবাই তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করছিলাম। সে তার পা দুটো বাড়িয়ে দিয়ে বসেছিল। বয়স অর কতই হবে! বড় জোর বেশ বিশ একুশ। এখন এক পা দুটোকে একটা কুড়াল দিয়ে কেটে ফেললাম। তারপর লাথি ঘুসি দিয়ে বসেছিল। একবারে নীচে ডুবায় ফেলে দিলাম। কেন তার পায়ে কেন হাত দিয়ে সালাম করতে হবে! আর পীরছাব হুজুরের বড় ছেলেটাকে চোখ কানা করে দিচ্ছি একটা ছুড়ি দিয়ে। কারণ সে মেয়েদের দিকে এখনভাবে ফেল ফেল করে তাকায় কেন ? মামুহুজুরকে সেই রেল স্টেশনেই শেষ করে দিলাম। রেল লাইনের পাথর দিয়ে। দিনের পর দিন আর বাংলা ঘরে থাকবেনা। বাড়ীর সব উপাদেয় খাদ্য আর নষ্ট হবে না। তিনি পীরছাব হুজুরের মামু। হুজুরের সাথে তো কোন আÍীয়তার সম্পর্ক হতে পারে না। তাই তিনি সকলের মামুহুজুর। ছোট পীরছাবকে বেশি মারলাম না। কারণ সে খুব কম আসে। আমাদের মুখের গ্রাসও খুব কম নষ্ট করে। বড় পীরছাবের হুকুম মেলেনা। শুধু বলে দিলাম এদিকে আর পা বাড়াবেনা। কিন্তু বড় পীরছাবকে তো বন্দুক দিয়ে, কুড়াল দিয়ে, দা দিয়ে জখম করতে করতে মনের আশ মেটেনা। সমস্ত শরীর খুচিয়ে খুচিয়ে ঝাঝড়া করছি আর জিজ্ঞেস করছি, বল আর আসবি আমাদের গ্রামে ? মানুষের সব ভাল জিনিষ খেয়ে আবার নিয়ে যাবি ? আমার এসব কথা শুধুই মনে মনে বলছি আর জ্বুলে পুরে মরছি।
রাত অনেক হয়েছে। রণে ভঙ্গ দিয়ে, নিরাশ হয়, ভারাক্রান্ত মনে সবাই ঘরে ফিরে গেছে। বাড়ীর ভেতর থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। এ বাড়ীতে আওয়াজ করে কান্না নিষেধ। তারপরও অনেকের আওয়াজ ভেসে আসছে। মায়ের গলা, রুসেনা, রশিদা, হামিদা, রফিয়া আরও অনেকের আওয়াজ। নুরু ভাই বুরহান ভাইকে নিয়ে মাছিহাতা যাবার প্রস্ততি নিচ্ছে। এতরাতে একা যাওয়া ঠিক হবে না। এতবড় একটা ঘটনার পর। অনেকেই দোয়াদরুদ পড়ছে। কাঁদছে। সবাই চলে গেল বড় চাচা হুকো হাতে চুপি চুপি বেড়িয়ে এলেন। বড় শিমুল গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে ডাকলেন, পাগলা! খুব নীচ গলায়। যেন কেউ শুনতে না পায়। কোথায় তুই! আয় চলে আয়। কেউ কিছু করতে পারবে না। পাগলা ডাকটা খুব আদরের। যখন তিনি আসল নাম ধরে ডাকেন তখন কাছে যাওয়া নিষেধ। লক্ষন খারাপ। রেগে আছেন। খেতে বসে যখন পাগলা বলে ডাকেন তখন বুঝতে হবে তাঁর পছন্দের খাদ্যের অর্ধেক ভাগ। প্রথম ডাকেই সারা দিলাম না। বেশি কষ্ট দিতেও ইচ্ছে হল না। কম ঝামেলা সহ্য করেন! প্রতিদিন একটা না একটা লেগেই আছে। সমস্ত জুড়িরা রায় দেয় একদিকে, তিনি ভেটো দিয়ে বসেন। পৃথিবীটা দুভাগ হয়ে গেছে। একদিকে আসামীর পক্ষ ভেটোপ্রদানকারী মহাশক্তি, অন্য দিকে বিবেকবান অসহায় ভুক্তভোগি সাধারণ মানুষ।
একদিকে বড় চাচা আর একদিকে বাড়ীর সকলে। আমার বেলায় চাচা অন্ধ। অন্যায় চোখে পড়ে না। এই তো মাস খানেকও হয়নি। শুয়োরের মামলা। শুকরশাবক হত্যা। আসামি পলাতক। নিখোঁজ। শাবকের মালিক মৃত শাবকটি নিয়ে পুকুর পাড়ে আমতলায়। সঙ্গে কয়েকজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ফুলি, ফালানি, পন্ডি। ঘটনা তাদের বাড়ীর সামনেই ঘটেছে। হত্যার সময় তারা স্বচক্ষে দেখেছে। ফরিয়াদির বিবরণ শুনে বিচারক স্থির করলেন সাক্ষীকে জেরা করা নিরর্থক। সাক্ষীরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে এগিয়ে এসেছে প্রমাণ করার জন্য। তাদেরও ঝাল কম নেই। আসামীর উপর এবার প্রতিশোধ। বিচারক দেখলেন ঘটনা সত্য। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার শুয়োরের বাচ্চার দাম কত ?
পঁচিশ টেখা।
পঁচিশ টাকা! এই দিয়া তো একটা বিল কিনা যায়! কও কি!
জি হুজুর, আমরা তো এ দামেই বেচি। এইটাই আমরার ব্যবসা।
তখন আমতলার বাসিন্দা চানখা, রুছমত, আলিমের ছোট দাদা উপস্থিত। নীরবে এজলাসের দিকে তাকিয়ে আছে। এ নতুন ধরনের মামলা, খুনের মামলা। এই প্রথম কাঠোর শাস্তি!
দুই টেখা নিয়া বিদায় হও। আর কোন কথা বলবানা। না নিলে যা পার তাই কর। এখন এইখান থাইকা যাও। বাচ্চা মানুষ। বুঝতে পারে নাই। নিশ্চয়ই ইচ্ছা কইরা করে নাই। বলে তিনি বাড়ীর দিকে চলে গেলেন। দুটাকা নিয়ে ফিরে এসে ফরিয়াদির হাতে দিয়ে বললেন, এইটা না নিলে তাও পাবানা। যাও, নিয়ে ভাগ!
চাচার কণ্ঠস্বর এত কঠোর হতে পারে! ফরিয়াদি দুটাকা হাতে নিয়ে পায়ে পায়ে চলে গেল।
বাতাসে কথা ছড়ায় বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। খবরটা রটে গেছে রি রি করে। ছি ছি শব্দে। ফরিয়াদির উপর অবিচার করা হয়েছে। ফৌজদারি দন্ড বিধির ৪২০ ধারায় আসামীর একশ বেত্রাঘাত, পঁচিশ টাকা জরিমানা অনাদায়ে কয়েদ হওয়া উচিত ছিল। মামলার কোন শুনানি হয়নি। এক তরফা রায়। বাড়ীর ভেতরের এজলাসে আবার শুনানী হবে। বিচারক মেজ চাচা। সহকারি নুরু ভাই। আসামী অনির্দিষ্টকালের জন্য অনুপস্থিত। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ হয়েছে। আসামীর একবার শাস্তি হয়ে গেলে আপীল করার রেওয়াজ নেই আর কোন শুনানী চলবেনা। চলতে পারে না। বাড়াবাড়ি করলে নিু আদালত বাতিল হয়ে যাবে চিরতরে। কারণ আসামী বেকসুর খালাস পায়নি। তাছাড়া খুনের কোন মোটিভই আসামীর ছিল না।
আতœপক্ষ সমর্থন ঃ আমি আর নাজু বসেছিলাম ফুলিদের বাড়ীর সামনে নদীর পাড়ে আম গাছতলায়। একটা শুয়োরের পাল নিয়ে যাচ্ছে তিনজন লোক। হাজারখানেক হবে। এরা প্রতিবছর আসে দক্ষিন থেকে। শালুক, কচু, ঘেচু খাওয়ায়। যেখানে সেখানে ছেড়ে দিয়ে কতক্ষন থাকে। আবার অন্য জায়গায় চলে যায়। শুকরের পাল যখন নদী পার হচ্ছিল তখন নাজু বলল, চল কয়টা পিটানি দিয়ে আসি। যেই বলা অমনি শুরু। ক্ষেতের আইলের বেড়া থেকে দুজনে দুটো শক্ত লগি হাতে নিলাম। শুকরের পাল যাচ্ছে আর আমরা সমানে পিটাচ্ছি। কি মজা! এদের রাখালরা অনেক দূরে। আমাদের হাতের সখ মিচাচ্ছি। এগুলো কত তাজা যে পিঠে মাংশ ছাড়া হাড়ের কোন চিহ্ন নেই। মনে হয় একটা বলের উপর আঘাত করছি। একটা দাঁতালকে যেইনা লগি ঘুরিয়ে মারলাম, চট করে দৌড় দিয়ে সরে গেল। তার পেছনে ছিল একটা ছোট বাচ্চা। লগি গিয়ে পড়ল সেটার পিঠে। পিঠের দাড়া ভেঙ্গে নীচে পড়ে কুত কুত করতে লাগল। যেই দেখলাম আর নড়াচড়া করছেনা, লগি ফেলে দে দৌড়। সাক্ষীরা তখন সশরীরে উপস্থিত। স্বচক্ষে দেখা জ্বলন্ত প্রমান। রাখালরা তো জানেনা আমি কে। সাক্ষীরাই সব খবর দিয়ে বাড়ী চিনিয়ে নিয়ে এসেছিল। সাক্ষীদেরও ঝাল কম নয় আমার উপর। অনেক দিনের ঝাল। প্রধান সাক্ষী ফুলি আর ফালানি যাদেরকে যখন তখন চুবিয়েছি। শুনানী শেষে বিজ্ঞ বিচারক জরিমানাই যথেষ্ট বলে রায় দিয়েছিলেন।
আজকের বিচারে কি হবে! বিচারকের রায় কোনদিন যাবে। উপায় নেই। আদালতে আÍসমর্পন করতেই হবে। অপরাধ স্বীকার করলে শাস্তি কম কম হয়। আস্তে আস্তে অন্ধকারে পা ফেলে এগিয়ে গেলাম। কোন কথা না বলে আমার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন। বাবাকে ডেকে বললেন, মাইচ্ছাতা যাওনের দরকার নাই। পাওয়া গেছে। আমার কাছে আছে।
নিমেষে আবহাওয়ার পরিবর্তন। সকলে তখন চাচার ঘরের সামনে। সত্যিই আমি বেঁচে আছি কিনা দেখবে। নতুন করে। কারও কারও মাথায় তখন বিচার, শাস্তি ইত্যাদি আবার ঘুরে বেড়াচ্ছে। এইতো কতক্ষন আগে। আমি ছিলাম না। আমার কোন শাস্তির প্রয়োজন ছিল না। সব মাফ। যেই না হাতের কাছে এসে গেলাম তখনি মাথা চাড়া দিল বিচার সভার। মেজ চাচা চিৎকার করে বলল, তারে তুমি কিছু করলা না ? এই ছাইড়া দিয়া দিয়া তুমি মাথায় উডাইছ। তারে বাইর কইরা দেও। আমি  কিছু জিগাইতে চাই।
কারও কিছু জিগাইতে অইবনা। পীরছাব হুজুরকে বকছে, সেডার বিচার করবে পীরছাব হুজুর নিজে। তোমরা তারে কিছু কইবানা। তার নমুনা আমার কাছে সুবিধার মনে অয়না। কিছু একটা অইছে মনে অয়। মাথার ঠিক নাই। না  অইলে এমন বকা তো ও কোনদিন বকে না। জানেও না ঐসব বকা। তার মুখ দিয়া বাদশা বলাইছে। আমি নিজে নিয়া যামু পীরছাবের কাছে। হুজুরই বিচার করবে। তোমরা যার যার ঘরে যাও। এ নিয়া একটা কথাও না।
কথাটা মনে হয় যুক্তিযুক্ত। এর বিরুদ্ধে কিছু বলা যায় না। ঠিক আছে, তুমি কালকেই তারে নিয়া হুজুরের কাছে যাও। দরকার অইলে তারে কয়েকদিনের জন্য রাইখা আইও।
রাইখা আওনা মানে পীরের বাড়ীতে কাজের লোক হিসেবে থাকা। তাদের চাকরের কাজ করা আর ছওয়াব কামাই করা। জীন ভুত তাড়ানোর মহৌষধ।
খাওয়াদাওয়ার পর আস্তে আস্তে চাচা জিজ্ঞেস করল, পীরছাবের বকলা কেন ? পীরছাবের বকলে অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। মারা না গেলেও শরীরের কোন একটা অঙ্গ নষ্ট হয়ে সারা জীবন কষ্ট করে।
সবটা পেপে কেন খাইল ?
হুজুরকে দিছে তাই খাইছে।
আগেরটা কেন খাবে? পরের গুলি খাইলেই তো হয়। সেগুলি পীরছাব খাইতে পারল না? প্রথমটা পীরছাব খাবে কেন ?
তাইলে ছওয়াব হয়, গাছে ফল বেশি ধরে।
এটা কেমন কথা। পরের পেঁপে গুলি খাইলে ফল কম ধরবে, আর প্রথমটা খাইলে বেশি ধরবে এ কেমন কথা ? এখন থাইকা কোনকিছু আর দিবানা পীরছাবকে।
বলে কি পাগল! তাইলে যে জিনিষের বরকত হয় না! হুজুরকে যত দিবা বরকত তত বাড়বে, ছওয়াব তত বেশি অইব। হুজুরকে আর বকবানা বলে দিলাম। তাইলে আমি কিন্তু আর বাঁচাইতে পারুম না।
এখন আমি ভিআইপি। চাচার ঘর থেকে সোজা স্কুল। কারও সাথে কথা বলবনা কয়েকদিন। নিু আদালতের বিচারকরা ওৎপেতে থাকে। কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই দেখি কারীছাব বসে আছেন। তিনি সব শুনেছেন। সমস্ত গ্রামে রটে গেছে এই অবিশ্বাস্য ঘটনা। ঝাড়ফুক না দিলে ভুত ছাড়ান যাবে না। জীনের বাদশা ভর করেছে। কোথা থেকে কিভাবে করেছে তাও তিনি বলে যাচ্ছেন। তার আগের দিন বড় তুলা গাছে একটা পেচাকে ঢিল দিয়েছিলাম। সেটা নাকি পেচা ছিল না। পেচার চেহারা ধরে জীনের বাদশা বসেছিল। তখনই আমার উপর ভর করেছে। যার জন্য মুখ দিয়ে যা আসে তাই বলছি। কোথাও লাগাম নেই, ভয়ডর নেই। তিনি আমাকে বসিয়ে অনেক দোয়াদরুদ পরে ফু দিলেন তিনবার। মুখে তখনও পানের গন্ধ। একটা বাটিতে পানি নিয়ে দোয়া পড়ে ফু দিয়ে গায়ে ছিটিয়ে দিলেন। বলে গেলেন সব ঠিক হয়ে যাবে।
তৃতীয় দিন নিু আদালতের বিচারকরা আবার এসে উপস্থিত। মেজ চাচা বলছেন, ভাইজান, আপনি যে এখনও মাছিহাতা গেলেন না। তার কোন শাস্তি অইলনা। কয়দিন আগে শুয়োরের বাচ্চা মারার জন্য জরিমানা দিলেন, তাতেও কোন শাস্তি অইলনা। জুনিয়র বিচারকরাও তাতে সায় দিচ্ছে। ওতো একটা কুফা। শুয়োরের বাচ্চা মাইরা জরিমানা দিছে এমন কথা কেউ হুনেনাই। এইবার পীরছাব হুজুরকে এমন ল্যাংটা করা বকা কেউ বকে নাই। এসবের কি কোন শাস্তি অইবনা ? এসব আলামত খুবই খারাপ। বংশের মুখে কলঙ্ক। হয় আপনে নিয়া যান, না হয় একটা বিচার করেন। না হয় বাড়ী থাইকা বাইর কইরা দেন।
সব শুনে বিচারক বলছেন, হুজুর আগামী মাসে আইব। আইলেই হুজুরের পায়ের উপর ফালাইয়া দিয়া কমু, আপনেই বিচার করেন। অখন আর নিয়া যাওনের কাম নাই। ইডার ভার আমার উপর। তোমরা আর কথা বাড়াবানা। যার যার কাজে যাও।

-১২-

হুজুরের আসার আশায় সবাই চুপ করে আছে।
এমনি অবস্থায় সত্যিই একদিন পাগলা গারদে যাবার উপক্রম হল। এক মাস চলে গেছে। পীরছাব হুজুর এখনও তশরিফ নেননি। উত্তরে গেছেন। আমার বিচার এখনও স্থগিত। একদিন রাতে আমাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মশাল, কুপি ইত্যাদি আলো হাতে। এ ঘর সে ঘর, গোয়াল ঘর, সব বাড়ীর সব ঘর। কোথায়ও নেই। রাত দ্বিপ্রহর বাড়ীতে একটা হৈ চৈ পড়ে গেছে।  গেল কোথায়! পুকুরপাড়ে। সব ঝোপঝাড়, আনাচে কানাচে। গাছের ডালে। তখন বর্ষাকাল। ঘাটের সব নৌকা ঘাটেই। কাপড় চোপড় বইপত্র সবই তেমনি আছে। শুধু আমি নেই। কি হতে পারে এসব আলোচনা। নিশ্চয়ই বাদশার কাজ। উঠিয়ে নিয়ে গেছে। কেউ বলছে, হুজুরকে গালাগালির ফল। গুখরোর লেজে পা দেয়া! দেখ এর কি পরিণাম! জানতাম একটা কিছু হবে। ভয়াবহ। শেষ পর্যন্ত তাই ঘটল। আগেই বলেছিলাম হুজুরের কাছে নিয়ে যাও! এখন সালমাও। সব দোষ এখন বড় চাচার।
রাতে ঘুম থেকে উঠে প্রসাব করার অভ্যেস আমার। বাবা মাঝ রাতে উঠে জায়নামাজে বসে জিকির দোয়া পড়েন। বাবার পাশেই আমার বিছানা। উঠে যাবার সময় জিজ্ঞেস করেন, কোথা যাও ?
পেশাব করতে।
কোন কোন দিন আর ফিরে আসিনা। যেখানে পেশাব করেছি সেখানেই সে অবস্থায় বসে আছি। দেরী দেখে বাবা খোজ করেন। দেখের আমি বসে বসে গুমোচ্ছি। ধরে নিয়ে আসেন। এ রোগ ধরা পরার পর বাবা দুবার করে জিজ্ঞেস করেন। তাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঠিকভাবে ফিরে আসি। সেদিনও বাবা দুবার জিজ্ঞেস করেছেন। আমি বলেছি পেশাব করতে যাই। অনেকক্ষণ ফিরে না আসায় বাবা খোজ করে দেখেন যেখানে আমি পেশাব করি সেখানে নাই। এ ঘর, সে ঘর। তারপর হৈ চৈ। এটা নাকি আমার রোগ। ঘুমের মাঝে হেটে বেড়াই, কথাও বলি। কিন্তু আসলে আমি ঘুমে।
সবাই হতাশ, আশা ছেড়ে দিয়েছে। বড় চাচা বলছেন, একজন আমার সাথে আয়। ছাড়াবাড়ীতে যাব। চাচাও একা যেতে সাহস পাচ্ছেন না। রাতে একা যাবার সাহস কয়জনের আছে। মাফিল ভাই বলল আমি যাব। দুজনে রওয়ানা দিল। হাতে পাটশোলার মশাল। পেছনে আরও কয়েকজন। বড় চাচির ঘর পেরিয়ে, জাম্বুরা গাছটার নীচে গিয়েই মাফিল ভাইর শীরর কাটা দিয়ে উঠল। একটা বিকট আকারের শেয়াল গায়ে লোম নেই, তাচ্ছিল্যভাবে তাকিয়ে পশ্চিম পাড়ের দিকে গেল। তাহলে কি সব শেষ! আর একটু এগিয়ে কাঁঠাল গাছটা বায়ে রেখে ডানদিকে হাটতে লাগল পূর্ব দিকে। বড় চাচা আগে আগে। পুুকুরের কোণে, সিধুর গাছটার নীচে খুব লম্বা লম্বা ঘাস। পায়ে চলা পথ দেখা যায় না। অনুমান করে পা ফেললে মাটি মেলে। সামনে বেতছোবা। গাছের মগডাল পর্যন্ত উঠে গেছে। বেতছোবার নীচে, ঘাসের ফাকে, পায়ে চলা পথের উপর আমি বসে আছি। ঘাসে সমস্ত শরীর ঢাকা। শুধু মাথাটা দেখা যায়। মনে হয় শরীরটা নেই। শুধু মাথা আছে। দেখেই বড় চাচা একটা চিৎকার দিয়ে উঠল। নাইরে! শেষ কইরা ফালাইছে! বলেই আমার মাথাটা ধরে টান দিল। দেখল, নাহ মাথাটা শরীরের সাথেই আছে। আমি কথা বলছি। যেন একটা রবোট। সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। বুকে আকড়ে ধরে, একবারে উঠানের মাঝখানে। এখন ঘরে নেয়া যাবে না। ইমাম চাচা এসে আদেশ দিলেন। গোসল করাতে হবে। বড়ই কাটা দিয়ে ঝাড়তে হবে। দোয়া পড়ে তারপর ঘরে নিতে হবে। ইমাম চাচাই করলেন এসব।
ভাওইল্লা গাছে উডাইতে পারলে শেষ অইয়া যাইত। পীরের দোয়ায় উডাইতে পারে নাই। মাফিল ভাই একটা শেয়াল দেখেছিল দৌড়ে যেতে। সেটা আসছিল ওদিক থেকেই। ওটা আসলে শেয়াল ছিল না। শেয়ালের বেশে বাদশা ছিল। কোন কোন সময় সাদা কাপড় পরে ভাওইল্লাগাছের নীচে দিয়ে পুকুরে নামতে অনেকেই দেখেছে। মানুষের আওয়াজ পেয়েই ছেড়ে চলে গেছে। সবই হুজুরের দোয়া। না হয় বাচার কথা না। এভাবে বহু রাত পর্যন্ত আলোচনা চলল।
সব নিয়ম পালন করে আমাকে শুইয়ে দেয়া হল আমার বিছানায়। 
এই ঘটনার পর বুঝা গেল আমি সত্যিই পাগল। পাগলাগারদ বা পাগলের ডাক্তারের কাছে পাঠাত হবে। এসব রোগের চিকিতসক ওজা। একজন ভাল ওজার খোজ খবর চলছে। ঠিক তখনি পীরছাব হুজুর এসে গেলেন। আর কোন চিন্তা নাই। সব ঠিক হয়ে যাবে।
হুজুর খবর পাঠাতে পারেনি। সময় ছিল না। হঠাৎ মুরীদের জন্য মন কেমন করে উঠল, (নাকি পকেট খালি হয়ে গেল), তাই খবর না দিয়েই চলে এসেছেন। অবশ্য আসতে খুব কষ্ট হয়নি। ষ্টেশন থেকে রিক্সায় নৌকা ঘাট। নৌকায় একবারে আমাদের ঘাটে। খবর হতেই একটা হৈ হৈ রৈ রৈ শুরু হয়ে গেল। মোরগ ধর, জেলেকে খবর দাও, পানি কইরে, বদনা আন, জলচৌকিটা কই, নামাজের মাসলা,  তোয়ালে এসব নিমেষে যোগার হয়ে গেল। তিন মাসে অনেক মানত জমেছে। অনেকের বাচ্চা মোরগ বড় হয়েছে, অনেক ঘি জমেছে। এসব হুজুরের জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি পদধূলি দিয়েছেন। সকলের চিন্তা দূর হয়েছে। মানত কাজে লাগবে। আমার শরীর জ্বালা করছে। হাত নিশপিশ করছে। সত্যিই বোধ হয় পাগল হয়ে গেলাম!
নৌকো থেকে দুজনে ধরে, খুব সাবধানে আমতলায় একটা চেয়ারে বসানো হল। থল থলে নদর দেহখানা। নড়াচড়া করতে কষ্ট হয়। প্রথমেই সরবত পরিবেশন করা হল। বারেক আজ নোয়াজ আলী দুজন দুদিকে দাঁড়িয়ে পাখা করছে। মনসুর আলী পা টিপছে। হুজুর বহুত কষ্টে, পরিশান্ত দেহে এসে পৌঁছেছেন। এখন সেবার প্রয়োজন। বড় চাচির ঘরের চাপা কলা, মেজ চাচার ঘরের দৈ চিড়া দিয়ে তিনি জলযোগ করলেন। রান্নার জন্য সময় লাগবে। তারপরেই মাগরেব আযান আদায় করলেন। নামাজ শেষে সকলের আবদার শুনছেন। কার কি অসুখের জন্য কোন ধরনের পানি পড়া তা দিচ্ছেন। কোন কোন মুসিবত তাবিজ ছাড়া কাজ হবে না তা বাতলে দিচ্ছেন।
বড় চাচা আমাকে হাত ধরে নিয়ে এলেন। হুজুরের পায়ের কাছে বসিয়ে দিয়ে বললেন, হুজুর বেয়াদপি কইরা ফালাইছে, মাফ কইয়া দেন। পোলাপান মানুষ, কিছু বুইঝা কয় নাই। তার উপর ভর করছে। নিজেই জানেনা কি কইছে। তাকে একটু ঝাইড়া দেন হুজুর। মনে অয় মাথায় দোষ পইড়া গেছে। রাইতে ঘর থাইকা বাইর অইয়া যায়। হেইদিন রাইতে ভাওইল্লা গাছে নিয়া যাইতাছিল। গাছে উড়াইতে পারে নাই। তাই বাইচ্চা গেছে। হুজুর এডার একটা ব্যবস্থা কইরা তারে বাচান। একটু দোয়া কইয়া দেন।
আমি সব জানি। আমার অজানা কিছু নাই। তার এখন দরকার একটা তাবিজ। আর সবাই তারে চোখে চোখে রাখবা। বিপদ এখনও কাটে নাই। এখনও নজর আছে। সে ব্যবস্থা আমি করে যাব। তারপরও তোমরা চোখে চোখে রাখবা। এ বাদশাটা খুবই পাজি, খতরনক। শক্ত বান দিতে হবে। কোন চিন্তা কইর না।
আমি হুজুরের পায়ে হাত দিয়ে বসে আছি। আমার মাথায় হাত রেখে হুজুর সাংঘাতিক দোয়া পরলেন। তিন বার ফু দিয়ে বললেন, যা, আর কোন নজর লাগবেনা। তোমাদের বাড়ীটা বান দেওয়া লাগবে। আগামীকাল। বাদ আছর। দিনের বেলায় দিতে হয়। তার জন্য আড়াই টাকা বকশিয়া দিতে হবে। না হয় কাজ হবে না। তার সাথে তাবিজ। তাবিজের হাদিয়া লাগবেনা। বকশিয়া দিলেই চলবে। কাল সব ব্যবস্থা করে দেব।
পরের দিন বাড়ীর চার কোনে চারটা গাছে খড় দিয়ে কিসব বান দিলেন। বলে গেলেন তিনি না আসা পর্যন্ত এ বান যেন খোলা না হয়। নিজ হাতে খুলতে হবে। এক মাস সাতাইশ দিন পর।
এ বাড়ী, সে বাড়ী, একদিন, দুদিন বা তিন দিন করে বেড়াতে বেড়াতে যখন উত্তর পাড়ার শেষ বাড়ীটা শেষ করে নিজ বাড়ীর পথে রওয়ানা হলেন তখন এক মাস পেরিয়ে গেছে। পকেট অনেক ভাড়ী। কাচা পয়সা।
আমার তিনটে তাবিজ। একটা জন্মের পর, ম্যালেরিয়ার ঔষধ হিসেবে হুজুর দিয়েছিলেন, এখন আর একটা দিলেন বাদশা থেকে বাঁচানোর জন্য। আগের একটা ছিল গলায়, নতুন টা কোমরে। এখন গলারটা খুলে হাতে চালান করেছি। হুজুরের দোয়ায় এবং তাবিজের জোরে বাদশা আর দেখা দেয়নি। এক মাস সাতাইশ দিন পর হুজুর আবার পদদূলি দিলেন। মানুষের বালামুসিবত দূর করার জন্য পানি পড়া তাবিজ দিলেন। আমাদের বাড়ির বান খুললেন। বান খুলে আরও তিন দিন থাকতে হল। পরবর্তি দোয়া দরুদ পড়ার জন্য। এটাই নিয়ম। 


-১৩-

ছাড়াবাড়ী নিয়ে আমরা খুব ব্যস্ত। কোন গাছে কোন পাখী কখন ডিম পাড়বে, তা দেবে, বাচ্চা ফুটবে, এগুলো কিভাবে আমাদের পেঞ্জরে আসবে, এইসব চিন্তা ভাবনা । মানিক ভাল পিঞ্জর তৈরী করতে পারে। পাখীর বাচ্চা কিছুদিন বেঁচে থাকে, তারপর মরে যায়। তাতে চেষ্টায় কোন ত্র“টি নেই।
ছাড়াবাড়ীর রাজ্য, রাজধানী সবই চলছিল ঠিকঠাক ভাবে। হঠাৎ রাজধানীতে এক নতুন রাজা এল। আর রাজ্যের মানুষ ভেঙ্গে পড়ল রাজাকে এক নজর দেখার জন্য। দুবরাজ চাচা এসেছেন কোলকাতা থেকে। তাই মানুষের ঢল নেমেছে। মেঠোপথ কানায় কানায় পুরে গেলে দুদিকের ফসলী জমিতেও মানুষ ভরে গেল। তিনি কোলকাতার থাকেন। ওকালতি করেন। এর বেশী কিছুই জানিনা।
এই রাজা এসেই ছাড়া বাড়ীতে ঘুরে বেড়াতে লাগল। প্রতিটি গাছের নীচে দাঁড়িয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে কি সব দেখল। মানু ভাইকে অনেক প্রশ্ন করে সারাদিন কাটিয়ে দিল। দুপুরের আহার তিনি বইদানি আমগাছটার নীচে চেয়ার টেবিলে বসেই সমাধা করলেন। একটা প্রশ্ন করে অনেকক্ষন চুপ করে তাকিয়ে থাকেন কোন একটা গাছের দিকে। হয়ত বা তাঁর কৈশোরের স্মৃতি রোমন্থন করে পুলক অনুভব করছেন। হয়ত বা কোন দুঃখ ব্যথা যা তার মনকে পীড়া দেয়। তখনই আমি জানিতে পারি ছাড়াবাড়ীটা দুবরাজ চাচার। তবে চাচা কোনদিন এই বাড়ী দখল করতে আসবেন না। সবকিছু যেমন আছে তেমনি থাকবে। দুদিন পর তিনি চলে গেলেন। যাবার সময় অনেকের হাতেই কিছু কিছু টাকা দিয়ে গেলেন। আমাদের রাজ্য, রাজধানী যেমন ছিল তেমনি রইল।
তিনি চলে যেতেই বাচ্চু বুদ্ধি দিল, গানপুরের মুড়ায় টিয়া  পাখী বাচ্চা দিয়েছে। আনতে হবে। পশ্চিম পাড়ার হানু, আমি আর বাচ্চু মিলে চললাম গানপুরের মুড়ায়।
বৈশাখ মাস। অনেকদিন বৃষ্টি নেই। বুরো জমি ফেটে চৌচির। বৃষ্টির জন্য মসজিদে নামাজের পর দোয়া হয়। পীরছাব হুজুরের কাছ থেকে দোয়া, পানি পড়া আসে। কাজ হয় না। কিন্তু প্রকৃতির কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম চলতেই থাকে। বৃষ্টি না হলেও এখানকার প্রাকৃতিক রূপ অপরূপ। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। মুড়ার গাছপালা, ঝোপ ঝাড় সবকিছুই সবুজে সেজেছে। মাঠে ধান পাটের চারা, বিলে বুরো ধানের সবুজ গালিচা। দূরের সবুজ পাহাড়, শুকিয়ে যাওয়া নদী, খাল। যেখানে সেখানে নদীতে বাধ দিয়ে জমিতে পানি তোলার ব্যর্থ চেষ্টা। সবদিক তাকিয়ে দেখলে মনে হয় একটা সবুজ ছবি। পটে আঁকা।
বুরো জমির আল ধরে, অনেক সবুজ ঘাস মাড়িয়ে আমরা তিনজন পৌঁছলাম গানপুরের লুংগায়। লুংগা মানে তিন দিকে মুরার পাদদেশ। এই পাদদেশে গাছ খুব লম্বা হয়। একটা নাম না জানা গাছের প্রায় চল্লিশ/পঞ্চাশ হাত উপরে একটা গর্ত। বন্য লতাপাতায় গাছটা একবারে ছেয়ে আছে। গাছের কান্ড দেখা যায় না। অনেক লতা গাছের মগডাল থেকে একবারে নীচে মাটিতে নেমে এসেছে। অনেক মোটা মোটা লতা। বাচ্চু দেখে গিয়েছে। টিয়া বাচ্চাদের জন্য আদার (খাবার) নিয়ে আসে। বাচ্চু নিজের চোখে দেখেছে। বাচ্চা আছে। তবে কয়টা তা বলা যায় না। এখন শুধু গর্ত থেকে ধরে নিয়ে আসা। গাছে উঠতে কোন অসুবিধে নেই। লতার সাহায্যে সহজেই উঠা যায়। তিনজন উঠতে লাগলাম। কথা আছে কেউ নীচে তাকাতে পারবেনা। বেশি উপরে উঠলে নীচে তাকালে ভয়ে পড়ে যাবার সম্ভাবনা। একবার গর্তের মুখে আমরা তিনজন।
সাপ আছে কিনা তা পরিক্ষা করতে হবে। হানু উপরে, তার নীচে বাচ্চু, তার নীচে আমি। হানুকে গাছের একটা ছোট ডালা ভেঙ্গে দিয়ে বললাম গুতো দিয়ে দেখ, সাপ থাকলে বেরিয়ে যাবে। হানু যথারীতি গুতো দিয়ে দেখল। নরম লাগল। হ্যা, বাচ্চা আছে। তবে কয়টা বলা যাচ্ছে না। আমাদের তিনটা হলেই হল । তিনজনে তিনটা। হানু গর্তে হাত ঢুকিয়ে নরম বাচ্চাটাকে বের করে আনল। ওকি! এ যে গুখরো সাপ! হানু কথা বলার আগেই এক হাতে সাপ নিয়ে একবারে নীচে পড়ে গেল! আমার মাথার উপর দিয়ে। নীচে পড়ে গিয়ে কাতরাচ্ছে। উপর থেকে তাকিয়ে দেখছি। সাপটা তার পাশেই আড়মোড়া খাচ্ছে। কিন্ত কামড়াচ্ছেনা। বাচ্চু চিৎকার করে বলছে, দূরে সরে  যা, দূরে সরে যা। কার যাওয়া কে যায়। হানু এক বারে বেহুশ। সাপটা ঝপ করে তার পাশেই পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। হানুও গড়াগড়ি খাচ্ছে উঠে বসার জন্য। পারছে না। আমরা নামলেই সাপে কামড়াবে। ভয়ে নামছি না। কিন্তু নামতে হবে, হানুকে বাঁচাতে হবে। একটা শক্ত লতা ধরে চু করে নীচে নেমে গেলাম। বাচ্চুও সাথে সাথে নেমে এল। সাপটা তেমনি গড়াগড়ি দিচ্ছে। দেখি সাপের মুখে একটা পাখীর বাচ্চা। গিলতে চেষ্টা করছে। তাইত কামড়াতে পারছেনা। দুজনে ধরাধরি করে হানুকে বুরো ক্ষেতের পানির কাছে নিয়ে গেলাম। মাথায়, মুখে পানি দেবার পর এক সময় তার জ্ঞান ফিরে এল।
সাপটা তখনও একই জায়গায়। আমরা চিৎকার করছি। মুড়ার উপর দিয়ে যাচ্ছিল অরুন। আমাদের চিৎকার শুনে এগিয়ে এসে দেখল সাপ। তার হাতে লাঠি ছিলই। সাপটাকে মারতে খুব বেগ পেতে হয়নি। মেপে দেখল আট হাত। অরুনের কৃত্বিত্ব।
টিয়ার বাচ্চা বাদ দিয়ে জান নিয়ে আমরা বিরসমনে বাড়ী ফিরলাম। এ ঘটনার কথা কাউকে বলা যাবে না। গোপন রাখতে হবে।
ঘটনা গোপন থাকেনি। বাতাসে কথা ছড়ায়। মানুষ নিজের কৃত্তিত্ব জাহির করতে চায়। বীরত্ব প্রকাশ না করলে কিসের কি! কেউ না জানলে জানাতে হবে। তবেই না তার বীরত্বের প্রকাশ। সেদিন ছিল চন্ডিদ্বারের বাজার। অরুন বাজারে গিয়ে পড়বি তো পড় নুরু ভাইর সামনে। দাদা, শুন। ওকে সামলাও। আমি না থাকলে ওরা তিনজনেই মারা যাইত আজ। দশ হাত লম্বা পানক (গোখরো)। আমি না থাকলে একটাও বাঁচতনা! কি যে কান্ড! সাপ হাতে লইয়া চল্লিশ হাত উপর থাইক্কা পড়ছে। একটা ত সাপ দেইখ্যাই বেহুস।
এ খবরটা বাজার থেকে বাড়ী পর্যন্ত আরও রূপ ধারন করেছে। সাপটা ছিল বার হাত। তিনজনকে পেছিয়ে ধরেছিল। অরুন গিয়ে ছাড়িয়ে এনেছে। অরুন না থাকলে একটাও জীবিত আসতনা ইত্যাদি। কুফাটাকে এভাবে ছেড়ে দেয়া যায় না।
মহা বিপদ। বড় চাচা বাড়ী নেই। তিনি তাঁর কুড়া ভাইর বাড়ীতে বেড়াতে গেছেন। তিনি কোন আতœীয় বাড়ীতে খুব একটা যান না। কিন্তু কুড়া শিকারি তাঁর আপনের চেয়ে বেশি। নিজে কুড়া পালন করেন, কুড়া শিকার করেন। এখন মাত্র চারটা কুড়া আছে। বর্ষার সাথে সাথেই কুড়া শিকার শুরু হয়। মাঠ ঘাট বৃষ্টির জলে ডুবে যেতে থাকে। বিলে মাঠে কুড়া ডাকতে শুরু করে। টুলম টুলুম.......। চাচা নিজের কুড়া ছেড়ে দেন। কুড়ায় কুড়ায় যুদ্ধ হয়। কুড়াকে ট্রেনিং দেয়া আছে। বন্য কুড়াকে ধরে পড়ে থাকবে। চাচা গিয়ে ধরবে। জবাই করবে। আমি এক দিকে ধরব, চাচা জবাই করবে। খাবার সময় মাথা কলিজা আমার। সবাই জানে। শিকার করতে বহুদূরে চলে যান। এমনি করে বহুদূরের শিকারিদের সাথে পরিচয় হয়। বন্ধুত্ব, তারপর আতœীয়ের চেয়েও বেশি। ওখানে তিনি কয়েকদিন থাকবেন। এখন শিকারের সময় নয়।
মেজ চাচা নিজে হাতে নিয়েছেন মামলা। বাড়ী প্রায় ঘেরাও। ওরা যেন মিলিটারি। মেজ চাচা বলছেন, এইডারে বাড়ীর বাইর করে দে। কোন দোকানে কাজে লাগাইয়া দে। বাড়ীতে থাকলে বাড়ীর সব পোলাপান নষ্ট অইব! এইটা আরও সর্বনাশ কইয়া ছাড়ব। আদেশের সাথে সাথে মিলিটারি নুরু ভাই এসে ধরে ফেলেছে। টেনে হেচড়ে নিয়ে যাবে। মা এসে দাঁড়াল। এত সাহস মায়ের আর কোনদিন দেখিনি।
না, ওরে নেওন যাইবনা। বড়ছাব (বড় সাহেব, মানে বড় চাচা) বাড়ীত আওক। তখন বিচার অইব। বড়ছাব কাউলকাই আইয়া পড়ব। ওর বিচার আর কেউ করতে পারবে না। ও তো কারও কোন নষ্ট করে নাই। তোমরা বিচার করবা কেন ? দেখি কার কত শক্তি! আমার কাছ থেইক্কা কেডা নেয় দেখি! দেখলাম বাবাও সায় দিচ্ছেন। তাইতো! ও তো কারও কোন ক্ষতি করেনি। নিজের ক্ষতি নিজে করলে তার বিচার কে করবে ? যারা সোহাগ করে তারাই।
সোহাগ করে বড় চাচা, বাবা। আর যারা তারা আমার বিচারক, ফরিয়াদি, সাক্ষি। কাজেই রণে ভঙ্গ।
পরবর্তিতে এই অপরাধের কোন বিচার হয়নি। বড় চাচা শুধু বললেন, ভবিষ্যতে এমন কাজ করলে আমিই তোমাকে শাস্তি দিব। কোন পাখীর বাচ্চা আর আনা যাবে না। কারন বাচ্চা মরে যায়। 

-১৪-

পাখীর বাচ্চা আর আনব না। কিন্তু ফল খেতে কোন মানা নেই। মুড়ার জঙ্গলে সারা বছরই কিছু না কিছু ফল পাওয়া যায়। আম কাঠাল তো আছেই। আরও কিছু ফল গাছ আছে যাদের মালিক থাকা সত্বেও নেই। সেসব ফলের  মালিক যে খায় সেইই। যেমন কয়েক রকমের জাম, বেত ফল, বড়ই, টেকরই, পেয়ারা, পেলা (বৈচি), পিচলা, কটকি, ডেওয়া, ডেফল, কাও, বেল ইত্যাদি অনেক রকমের ফল। কিছু ফল শুধু নির্দিষ্ট সময়েই পাওয়া যায়। যেমন আন্নরি। দেখতে কিছুটা বড়ইর মত। পাকার পর একদম সাদা হয়ে যায় এবং সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। খেতে খুব স্বাদের। আমাদের মুড়াতে দুএকটা গাছ আছে। আমরা এ গাছগুলি চিনি এবং পাহারা দেই কখন পাকবে। শুধু বুরো ধান যখন পাকার সময় হয় তখন আন্নরিও পাকে। পাকার সাথে সাথে বনের পাখীরা ঝাপিয়ে পড়ে শেষ করে ফেলে আমরা পৌছার আগেই।  কারন মুড়ার ফল যে খায় সেই মালিক। পাখী খায় তাই পাখীই মালিক। অনেক সময় সবুজ কাচা কিছু ফল নিয়ে ঘরে রেখে দেই। কয়েক দিন পর দেখা যায় সাদা না হয়ে খয়েরি হয়ে গেছে। মুখে দিলে তেতু লাগে। তাই আমরা পাখীদের সাথে পেরে উঠি না। পাকা আন্নরি আমাদের ভাগে জুটে না।
 সেদিন পুকুর পাড়ে আমতলায় বসে  রমার সাথে আমাদের ভবিষ্যত কর্ম নিয়ে বুদ্বি করছিলাম। পুকুর পার হয়ে যে পায়ে চলা পথটা ইন্ডিয়ায় গেছে সে পথ দিয়ে পশ্চিম পাড়ার মফু ইন্ডিয়ার দিক থেকে তার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। মফুর মাথায় ছোট একটা টুকরি। দেখলেই বুঝা যায় এই টুকরিতে করে কোন জিনিষ ইন্ডিয়া নিয়ে বিক্রি করে এসেছে। আবার ইন্ডিয়া থেকে কিছু জিনিষ নিয়ে এসেছে বোধ হয়। সবাই জানে এখানকার বেশিরভাগ মানুষ পাকিস্তান থেকে ইন্ডিয়ায়, ইন্ডিয়া থেকে পাকিস্তানে অনেক রকমের জিনিষ বেচা কেনা করে। এটাকে বলে বেলেক (ব্লেক মানে কালোবাজার)। কাছে আসতে জিজ্ঞেস করলাম, মফু ভাই, ইন্ডিয়া গেছিলা বোধ হয়? টুকরিতে কি?
আন্নরি! বলে টুকরিটা নামিয়ে বসল একটু জিরোবে বলে। টুকরি সামনে রাখতেই আমাদের দুজনের চোখ চড়কগাছ! একি! এত আন্নরি! এত সাদা! এত সাদা এত আন্নরি কোন দিন দেখিনি! জিহ্বায় পানি এসে গেছে! মফুর কাছে কয়েকটা চাইলে দিবে কিনা ভাবছিলাম। কারন এত দামি জিনিষ দিবে কিনা কে জানে! আমি মনে মনে যা ভাবছিলাম রমাও তাই ভাবছিল। ঠিক তখনি মফু এক খাবলা আমার সামনে রাখা এক টুকরো কাঠের উপর রাখল, আর এক খাবলা রমার সামনে মাটির উপর রেখে বলল, নেও খাও। আমাদের মুড়াতে তো ধরা যায় না পাখির জালায়। এসব পাবা কৈ?
তুমি কোন মুড়া থেকে এসব আনলে?
রায়মুড়া থেকে। রায়মুড়ার জংগলে কিন্তু পাখীরা খেয়ে শেষ করতে পারে না। কত খাবে! কত গাছ! শত শত গাছ! সব এক সাথে পেকে গেছে। সব সাদা! যেন একটা ফুলের বাগান! 
রায়মুড়া এখান থেকে কতদূর? 
একবারে বর্ডারে।
কিভাবে, কোন্ পথ ধরে,যেতে হয়? 
সে বলল একদম সোজা। গানপুর পেরিয়ে, বুরো জমির আল ধরে বিষ্ণাউরি ছাড়িয়ে রামপুরা। রামপুরার পরেই জঙ্গল শুরু। অনেকদূর গেলেই শুরু হয় আন্নরির জঙ্গল।
মফু চলে যেতেই দুজনে ঠিক করলাম রায়মুড়ায় যাব। দেরি করা চলবে না। কারন আন্নরি বেশিদিন থাকেনা। আগামীকাল খুব ভোরে। দুটা বাজারের বেগ যোগার করে রাখতে হবে। ভোরে সময় নেই। 
পরদিন খুব ভোরে রওয়ানা দিলাম। রমা আর আমি। আর কাউকে জানানো যাবে না। ভাগ বসাবে। আমাদের লোভ শুধু ফলে নয়। এসব জায়গাগুলোর এত নাম শুনেছি মনে হয় চেনা। তাই সচক্ষে দেখার লোভ। পরামর্শ হল। সাথে থাকবে একটা ব্যাগ আর পাঁচন। পাঁচন দিয়ে যে আমরা কি করব তেমন কোন চিন্তা মাথায় ছিল না। কিন্তু নিতে হবে। যেমন প্ল্যান তেমন কাজ।
আমরা যখন নদী পেরিয়ে গানপুরের চকে পেছনে তাকিয়ে দেখি আমাদের আর এক সাথী। বাঘা। বাঘা আমার পালা কুকুর। চুরি করা। অনেক জিনিস আছে যা চুরি করলে গোনা হয় না। নিজের তৈরি ফতুয়া। দু বছর আগে সকালে গিয়েছিলাম রাজনগর মানু ভাইর বন্ধু ধীরন্দ্রের বাড়ী। কি একটা খবর নিয়ে। আসার পথে বাঘা আমাকে দেখে তেড়ে আসল। ছোট্ট বাচ্চা। সমস্ত শরীরে রয়েল বেঙ্গলের ডোরা কাটা দাগ। আদর করে ডাক দিতেই লেজ নেড়ে কাছে এল। তখন শীতকাল। কোলে নিয়ে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলাম দৌড়। এক বারে বড় চাচার কাছে। চাচা দেখে বললেন, এত সুন্দর বাচ্চা কোথায় পাইলা? বললাম রাজনগর থেকে। তাদের আরও কয়েকটা আছে। আমাকে একটা দিয়ে দিল।
কুকুর নাপাক জন্তু। মোল্লা বাড়ীতে নাপাক জন্তু থাকেবে না। চাচারও লোভ লেগে গেল বাচ্চাটা দেখে। নিজের বাড়ীতে নিয়ে রাখলেন। এখন বাঘা আকারে বাঘের মত লম্বা, রয়েল বেঙ্গলের ডোরা সারা শরীরে। রং ও বাঘের। সর্বদা আমার সাথি। আমি যেখানে যাই বাঘা আছে। আমাদের সব আতœীয় বাড়ী চেনে, আতœীয়রা তাকে চেনে। আমি আতœীয় বাড়ী পৌঁছার আগেই বাঘা গিয়ে উপস্থিত হয়। দেখেই তারা বুঝে নেয়  মেহমান আসছে। বাঘা গন্ধ শুকে চলে আসে। বাঘা আমার অনেক কাজ করে। রাতে আমি ঘুমিয়ে থাকলে বাঘা সারা রাত পাহাড়া দেয়।  বাড়ীর কাছাকাছি অন্য কোন জন্তু বা চোর ডাকাত আসতে সাহস পাবে না। শেয়াল, বাগডাস ইত্যাদির অত্যাচার থেকে বাড়ীস হাস মুরগি কক্ষা পায়। বাড়ীর আশেপাশে কোন কুকুর আসলে রক্ষা নেই। সে ঝাপিয়ে পড়বেই। অন্যের পালিত কুকুরও রক্ষা পায় না। তখন  আমাকেই সামলাতে হয়। এক মাত্র আমিই জানি বাঘাকে কিভাবে বশে রাখতে হয়। বাঘার গলায় দুহাত দিয়ে ধরে বসে গেলে বাঘা আর নড়চড় করে না। একদম স্থির হয়ে থাকে। বাঘাকে দেখে  মনে সাহস বেড়ে গেল। ভালই হল, আমরা এখন তিনজন।
গানপুরের পাশ দিয়ে, ধলাই বিল ছাড়িয়ে বিষ্ণাউরির চকে পৌঁছে অবাক হয়ে গেলাম। বিষ্ণাউরির কয়েকটা বাড়ীর পরেই বিল। বিলের চারদিক বড় বড় গাছে ঢাকা। কোন কোন গাছ হেলে বিলের উপর ঝুকে আছে। নীচে অন্ধকার। বিলে পানি দেখা যায় না। পদ্মফুল ভরে আছে। মাঝে মাঝে জল ঘাস শক্ত হয়ে আছে। কোন পানির চিহ্ন নেই। ঘাসের জঙ্গল। অনেক রকম জলজ পাখি ডাকাডাকি কাড়াকাড়ি করছে। সব পাখির নামও জানিনা। বিলের পূর্ব দিকে উঁচু মুড়া। রামপুর। বিল থেকে একটা সরু খাল নদীর সাথে মিশেছে অনেক দূর গিয়ে। খালটা পেরিয়ে লাল মাটির পথ ধরে আমরা উঠতে লাগলাম। মাত্র তিনচারটা বাড়ী। কোন মানুষজন চোখে পড়েনি। বাড়ীগুলো পেরিয়ে রাঙামাটির মেঠো পথ ধরে এগোচ্ছি। পথের দুধারে সবুজ ঝোপ ঝাড়। পাখির জলসা বসেছে। কত রকমের পাখি! কত সুর! কত রং! এ কোথায় এলাম! আমরা যে তিনটা প্রাণী এখানে তাতে কারও কোন ভ্রক্ষেপ নেই। গানের কোন বিরতি হচ্ছে না। পাখিদের ওই পাঠশালা! না, জলসা। দাঁড়িয়ে পড়লাম। রমা বলল, কি অইল, তুমি দাঁড়াইয়া গেলা কেন ? দেখ্, দেখ্, এই রকম পাখি কোনদিন দেখসছ ? লেজটা কত বড় লম্বা দেখ। আর ওই ছোট্ট পাখিটা দেখ, কত রকমের রঙ!  বসন্তের সকাল! সবুজের সমারোহ। পাখির কলকাকলি। পা চলে না। আমাদের পথ আরও বাকি।
কোন বাড়ী ঘর নেই, মানুষ জন চোখে পড়ে না। একটু এগুতেই থ হয়ে গেলাম। এখানে জঙ্গল নেই। আম কাঁঠালের গাছ, নীচে ফাকা। গাছে, উপরে নীচে, পথের দু ধারে হাজার হাজার বানর। পথ ছেয়ে আছে। বাঘা আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ধরে ফেললাম। যুদ্ধ লেগে গেলে আমরা হেরে যাব। সৈন্য নেই। ছালার ব্যাগ দিয়ে বাঘার মুখ ঢেকে গলা জড়িয়ে ধরলাম। রমাকে বললাম, কোনদিকে তাকাবিনা। সোজা চলতে থাক। বাঘার মুখের ছালা এক হাতে ধরে ভয়ে ভয়ে মাথা নীচ করে এগিয়ে চললাম। অনেকদূর আসার পর বানরের রাজত্ব শেষ। আমরা এখন স্বাধীন। সবদিকে তাকাতে পারি। ডানদিকে তাকিয়ে দেখি আর এক পদ্মবাগান। ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। মুড়া দিয়ে ঘেরা। আরও এগিয়ে যেতে শুরু হল জঙ্গল। পথের দুধারে ঝোপঝাড়। অঢেল আন্নরি গাছ। ছেয়ে আছে। ফলের ভারে গাছ নুয়ে পড়েছে। সাদা আর সাদা। কত খাবে! বুলবুলির সাথেই বেশি প্রতিযোগিতা। কে কত খায় দেখা যাক। আমরা গাছের কাছে যেতেই ঝাকে ঝাকে উড়ে যায়। রমা দিশেহারা। কোন গাছে আগে যাবে। এত আন্নরি! কত খাবে! কত নিবে! আরে এটা না, ঐ সামনেরটায় আরও বেশি। একবারে নুয়ে মাটির সাথে লেগে আছে। না, তার পরেরটা দেখ। ওটাতে বেশি। আমরা খাচ্ছি, বেগে ভরছি আর এগিয়ে যাচ্ছি। এ গাছ বাদ দিয়ে সে গাছে।  কোনদিকে তাকাবার সময় নেই। আমরা কোথায় তা ভুলে গেছি। পাঁচন ফেলে দিয়েছি। বাঘা সাথে আছে। পাহাড়া দিচ্ছে।
আর খেতে ইচ্ছে করছে না। বেগ প্রায় ভরে গেছে। এবার বন মোরগ দেখতে হবে। সকাল থেকেই এদের ডাক বড় জ্বালাতন করছে। রমা বলল আগে বেগ ভইরা লই, তারপর বন মোরগ দেখতে যামু। আমরা এখন যেখানে, তার অনেক নীচে পাহাড়ের ঢালু, তার নীচে  অনেকটা সমতল। গভীর জঙ্গল। উপর থেকে মনে হয় সবুজ গালিচা। সেই ঝোপ থেকে বন মোরগের ডাক আসছে।
মোরগের ডাক লক্ষ করে আমরা পায়ে পায়ে নীচে নামছি। শব্দ করা যাবে না, আওয়াজ করা যাবে না। তাহলে মোরগ উড়ে যাবে। গাছগাছালির ফাক দিয়ে, ঝোপের ভেতর দিয়ে একবারে নীচে নেমে এলাম। নীচে বড় বড় গাছ, উপরে লতা পাতায় ঢেকে আছে। গাছের নীচে একবারে পরিষ্কার। কোথায় মোরগ! যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু ঝরা পাতা। গাছের কান্ড, কোন পাতা নেই। মনে হয় ঘর। উপরে লতাপাতায় আচ্ছাদিত। পাখির কিচিরমিচির ছাড়া কোন শব্দ নেই। আমাদের পায়ের নীচে দলে যাওয়া ঝরা পাতার শব্দ। পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে কোথায়ও। মনে হয় আগুনের শিখা। বন মোরগ উড়ে গেছে। একটা বড় গাছের গোড়ায় অনেকগুলো হাড় পড়ে আছে। বাঘা এখানে এসেই কুই করে ফিরে দিল দৌড়। এক বারে মুড়ার উপরে। সেখানে থেকে চিৎকার করছে। আবার ফিরে আসছে, আমাদের কাছে এসে আবার চলে যাচ্ছে মুড়ার উপর। হঠাৎ গা ছম ছম করে উঠল। এ কিসের হাড়! মানুষের না কোন জন্তুর! একটু দূরে আর একটা গাছের নীচে একটা গরুর মাথা, হাড়গুর! রমা, ফিরে চল জলদি। বাঘা কেন চিৎকার করছে। ফিরে চলছি। আর উঠতে পারছি না। পায়ে জোর নেই। খারা পাহাড়। কোন রকমে এসে  উঠলাম উপরে। এবার ফিরে চলা। বেলা পড়ে এসেছে। কিন্তু পথ কই। সামনে পেছনে ডানে বায়ে কোন পথের  চিহ্ন নেই। আমরা গাছ বদল করতে করতে কখন যে পথ থেকে বহু দূরে চলে এসেছি সে খেয়াল নেই। এবার বাঘা আমাদের সহায়। সে যে দিকে যাবে তার পেছনে চলব।
শেষ পর্যন্ত পথ একটা পাওয়া গেল। কিন্তু যে পথ দিয়ে গিয়েছিলাম সে পথ নয়। আমরা গিয়েছিলাম বিষ্ণাউরির উত্তর দিক দিয়ে, ফিরে এলাম দক্ষিন দিক দিয়ে। বাড়ীর কাছে যখন এসে পৌঁছলাম তখন বেলা প্রায় শেষ। আমতলার কাছাকাছি আসতেই একটা হৈ চৈ পড়ে গেল। পাওয়া গেছে! আইছে! দুইডাই ফিরে আইছে! চিৎকারে বাড়ীর ভেতর থেকে অনেকেই দৌড়ে বেরিয়ে আসছে। কই, কই করতে করতে। ব্যাপার কি! নমুনা ভাল ঠেকছে না। আমরা দুটি প্রাণী সারাদিন নিখোঁজ। ব্যাপার কি হতে পারে তা ভাবিনি। ব্যাপারটা যে এত সাংঘাতিক কিছু হবে তা মনে হয়নি। আন্নরি আনতে গেছি, ফিরে এসেছি। তাতে হয়েছেটা কি! কোথায় আমাদের আপ্যায়ন করবে! তা নয়। সবাই তেড়ে আসছে মনে হয়। ছোট চাচা চিৎকার করছে, ও গেছিল গেছিল, রমাকে নিয়া  গেল কেন ? সবাই আছে প্রায়, কিন্তু বড় চাচা নেই! শত্র“র হাতে ধরা দেয়া যায় না। বলা যায় না কোন আদালত এখন সক্রিয়। বেগ রেখে দিলাম দৌড়। একবারে পূর্বের বাড়ীর পুকুর পারে। রমাও সাথে সাথে।
আমাদের মালামাল পরিক্ষা করা হল। মানু ভাইর রায়, এ ফল শুধু রায়মুড়ার জঙ্গলেই আছে। আর সেখানে চিতা বাঘও আছে। ওখানকার মানুষ সবাই জানে। ওদিকে গরু ছাগল কেউ ছেড়ে দিয়ে ফেরত পায় না। কোন সময় মানুষকেও আক্রমন করে। কাজেই বিচারটা খুব শক্তভাবে করতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য। আর রমাকে কোনদিন আমার সাথে দেখলেই তার বিচার হবে। রহমত গেল, এবার রমাও গেল। কারও সাথে চলা যাবে না।
সন্ধ্যার পর সন্ধির প্রস্তাব। রুসেনা নিয়ে এসেছে। বড় চাচা বাজার থেকে ফিরে সব শুনেছেন। সারাদিন না খেয়ে আছে পাগল দুইডা। আর তোরা বাড়ী থাইকা বার কইরা দিলি! আগে জান বাঁচবে তারপর তো বিচার! কোথায় আছে খুজে আন। এখনই। পূর্বের বাড়ীর পুকুর পারে কামরাঙা গাছটা যে আমার গোপন আশ্রয়স্থল সেটা শুধু রুসেনা জানে। সেই এগিয়ে এল। বলল,  এক দৌড়ে চাচার কাছে চলে যা। এখন চাচা উত্তর ঘরে।
সম্পূর্ণ আতœসমর্পন। ওখানে যে বাঘ থাকে আমরা তো জানি না। জানলে তো যাইতাম না! আর যামুনা ইত্যাদি।
বাইরে বিচারের বানী শক্ত হাতে দাঁড়িয়ে। নুরু ভাই  বলছে, এইভাবে  শেষ অওনের চেয়ে আমরাই মাইরা ফালাই।  চাচা কতক্ষন বাঁচাইব! নাগাল পাইলেই অইছে!
চাচার হঙ্কার, তোমরা এখানে ঝামেলা করবানা! যার যার কাজে যাও!

-১৫-

সরকারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত বেতন ফ্রি। ষষ্ঠ শ্রেনী থেকে বেতন দিতে হয়। স্কুল কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে আমি মেধাবী ছাত্র হিসেবে আমার বেতন ফ্রি। আমি এখন সপ্তম শ্রেনীতে। শিক্ষক ছাত্র সবাইর কাছে আমি প্রিয়। আমার অনেক বন্ধু। মাঝে মাঝে কোন বন্ধুদের আর দেখি না। কোথায় গেল মনে প্রশ্ন উকি দিত। কাউকে প্রশ্ন করিনি। কিছু নতুন ছাত্র এসেছে অন্য স্কুল থেকে, দুজন নতুন শিক্ষক এসেছেন।  নুরুল ইসলাম নামে একজন ছাত্র এল ক্লাশে। বাড়ি জগন্নাথপুর। তখন কারও বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে নুরু রিফিউজি। কারণ জগন্নাথপুরে কোন মুসলমান ছিল না। অতএব বিনিময় করে এসেছে। কয়েকদিন স্কুলে আসার পর নুরু কারও সাথে ভাব করতে পারেনি। স্থানীয় ছেলেরা রিফিউজিদের খুব ভাল চোখে দেখে না। বল খেলতে গিয়ে দেখি সে আমার বিপরীতে খেলছে। খুব ভাল প্লেয়ার। একমাত্র আমার সাথে দুদিনেই গলায় গলায় ভাব হয়ে গেল। জানতে পারলাম নুরু আগরতলার বিশালঘর এলাকা থেকে এসেছে। তারপর দেখতাম সে প্রায়ই স্কুলে অনুপস্থিত থাকত। মাঝে মাঝে বলত, “আমার এ দেশটা ভাল লাগে নারে! ইচ্ছে হয় ফিরে যাই আমাদের আদি বাসস্থানে- আমার জন্মভূমি বিশালঘরে। কেন যে দেশটা এমন ভাগ হল! ফিরে যাবারও কোন পথ রাখেনি। মাঝে মাঝে আমি চলে যাই বিশালঘরে। আমাদের বাড়ীঘর জমিজমা দেখতে। ওখানে আমি ঘুরে বেড়াই। আবার ফিরে আসি। এদেশে সবাই আমাদেরকে তাচ্ছিল্য করে। এতদিনে অনেক চেষ্টা করেও স্থানীয় কোন পরিবারের সাথে আমাদের ভাব হয়নি।” তার মাস কয়েক পর একদিন বলল, আমি বেঙ্গল রেজিমেন্ট -এ চলে যাচ্ছি।
বললাম তুই যা, ঢাকায় দেখা হবে। আমিও মোহাম্মেডার্নে আসছি। 
সেদিন স্কুলের গেইটে ঢুকতেই দেখি শাহজাহান হন হন করে বাজারের দিকে যাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস না করতেই বলল, অংকের স্যার সারদা বাবু আর নাইরে.....এ....এ.....।
শুনে খুশিতে মনটা নেচে উঠল। আর অংক কষতে হবে না। সেই  জালিবেতটা নিয়ে ক্লাশে আসবেন না তিনি। অংক ভুল হলে আর হাত পাততে হবে না। তাঁর  কি হয়েছে, কিভাবে, কোথায়, কখন হয়েছে এসব জানার আমার কোন আগ্রহ নেই। তিনি নেই, অংক নিতে আর আসবেন না এটাই বড় কথা। মনে হল সমস্ত পৃথিবীটা লাল, নীল, সাদা, হলুদ ফুলে ছেয়ে আছে। আমি প্রজাপতি, পাখা মেলে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছি।
লাইব্রেরীর সামনে দিয়ে যাবার সময় দেখলাম শিক্ষকবৃন্দ বিমর্ষচিত্তে বসে আছেন। লাইব্রেরী বলতে যা বোঝায় এটা সেই লাইব্রেরী নয়। প্রাইমারী স্কুলের শেষ কামরাটা স্কুলের অফিস, শিক্ষকদের বিশ্রাম কক্ষ, হেড মাষ্টারের কক্ষ, আর দপ্তরীর দপ্তর। দুটো আলমারী, সামান্য বই আর স্কুলের কিছু কাগজপত্র। দরজার পাশেই দপ্তরি ইব্রাহিমের টুল, পাশে দেয়ালে টাঙ্গানো থালার মত পেতলের ঘন্টা। আজ এখনও স্কুল শুরু হবার ঘন্টা বাজায়নি। তাই ঘন্টার পাশে বসে আছে। আদেশের অপেক্ষায়। মাঝখানে লম্বা একটা টেবিল। দুপাশে শিক্ষকবৃন্দ বসেন। সব শেষে পেছনে হেড মাষ্টারের চেয়ার আর মান্ধাতার আমলের একটা ছোট টেবিল।  এটাই লাইব্রেরী। সেখানে এখন সব শিক্ষক বসে আছেন। হেড স্যার জানালা দিয়ে দূরে, চন্দ্রপুরের ধু ধু মাঠের পরে, রেল লাইনের দিকে তাকিয়ে আছেন। কেউ কারো সাথে কোন কথা বলছেন না। হয়ত বা সারদা বাবুর স্মৃতি রোমন্থন করে নীরব অশ্র“ সম্বরন করছেন।
সমূহ বিপদটা কেটে গেল ভেবে ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দিল। আজকের অংকগুলো ছিল ভিন্নজাতের। দুধের সাথে পানি মিশিয়ে কম দামে বাজারে বিক্রিয় করতে হবে সারদা বাবু নেই। কিভাবে কখন কেন নেই তা আমার জানার কোন প্রয়োজন নেই। তিনি নেই, কাজেই ওসব সমস্যার কথাও আসবে না, সমাধানও করতে হবে না। জীবনে এমন আনন্দের খবর বোধ হয় আর আসেনি।
ক্লাশে বই রেখে আমতলায় গিয়ে দাঁড়ালাম। পাঁচ ছয় জন জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে ফিস ফিস করে কথা বলছে। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই চন্দ্রপুরের নুরুল হক বলল, শুনছস, সারদা বাবু সব নিয়া ইন্ডিয়ায় চইলা গেছে। বিনিময় কইরা।
অ! আমি যা ভেবেছিলাম তা নয়। যা হোক, গেলেই হলো। অংকের ক্লাশে না আসলেই হলো।
আমি ছাড়া সারদা বাবুর জন্য সবাই বিমর্ষ। বিশেষ করে যারা অংকে ভাল তারা সারদা বাবুর খুব প্রিয়। তাদের ব্যাথাটাই বেশি। সবাই আপসোস করছে। কবে তিনি কোন অংকটা একবারে পানির মত সহজ করে বুঝিয়ে দিলেন, তিনি না থাকলে কে কে অংকে ফেল করত, তাঁর কাছে অংক শিখে কে কে ভবিষ্যতে অংকে লেটার পাবার জন্য তৈরী হচ্ছে, সারদা বাবুর অবর্তমানে কার কার ভবিষ্যত অন্ধকার এসব নিয়ে বিশেষ আলোচনা চলতে থাকল।
শাহজাহান ফিরে এল। কাছাকাছি  এসেই বলল, যাক তুই বাইচা গেলি। আর হাত পাততে হইবনা।
আমি তখন অন্য জগতে চলে গেছি। এই কয় বছরে বন্ধুরা যারা হারিয়ে গেল তারা কোথায় গেল! সবাই কি সারদা বাবুর মত  ইন্ডিয়ায় চলে গেল! ইন্ডিয়াতে এমন কি আছে যা এখানে নেই।
সারদা বাবু হাই স্কুলের শিক্ষক। স্কুল শুরু থেকেই তিনি অংক পড়িয়ে আসছেন। সাংসার ছিল একদিকে, স্কুল ছিল অন্যদিকে। সন্তান একদিকে, স্কুল একদিকে। তাঁর আদি পুরুষের বাসস্থান, নিজের জন্মস্থান ছেড়ে, এই স্কুলের মায়া ছেড়ে হঠাৎ করে তিনি মূলুৎপাটিত হয়ে গেলেন। যে মূল তৈরী হয়েছিল যুগে যুগে, তিলে তিলে। তাঁর পূর্ব পুরুষ থেকে সন্তান সন্ততি পর্যন্ত। সবকিছু জমা করেছিলেন নিজেদের করে। নিজেদের জন্য, অজানা ভবিষ্যৎ বংশধরের জন্য। হঠাৎ করেই আজ আর কিছু রইলনা নিজেদের। সবকিছুই পর হয়ে গেল, পরের হয়ে গেল। একটা অলীক সুখের সন্ধানে, রাতের আঁধারে পাড়ি দিলেন ওপার বাংলায়।
সারদা বাবুর অভাব বোধ করে অনেকেই। তাঁর রেখে যাওয়া আতœীয়স্বজন, বন্ধু বান্ধব, স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ আর তাঁর অগণিত ছাত্ররা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অভাব বোধ করে তাঁর জযমানরা। তিনি চলে যাওয়ায় তাদের ধর্ম কর্মে বিশেষ বাধা পড়ে গেছে। তাদের স্বর্গে যাবার চাবিকাঠি সাথে নিয়ে গেছেন। সারদা বাবুর জযমানের সংখ্যা অনেক। তাঁর পূর্ব পুরুষ থেকেই নির্দিষ্ট করা আছে। জযমান তাঁদের আয়ের উৎস। যেমন পীরের আয়ের উৎস তাদের মুরিদ। যার যত বেশি জযমানের অথবা মুরীদ আছে তার তত বেশি আয়। এসব জযমান একদিনে তৈরি হয়নি। তাঁর পূর্ব পুরুষের কালে যত ছিল তা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। বংশানুক্রমে যারা একই বংশের পুরোহিত দ্বারা স্বর্গের সেতু তৈরি করে আসছে, হঠাৎ করে সারদা বাবু চলে যাওয়ায় তাদের সেতু ভেঙ্গে যেন সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে। সারদা বাবুর নিরুদ্দেশের খবর পেয়ে জযমানরা অশ্র“ বর্ষণ করে নতুন পুরোহিতের সন্ধানে আছে।
তারপর একদিন সবাই ভুলে গেল সারদা বাবুর কথা। এমন কি তাঁর প্রিয় ছাত্ররাও। মানুষ কত কিছু ভুলে যায়!

-১৬-

রুসেনাবুর বিয়ে ঠিক হয়েছে। বাড়ীতে আনন্দ আর হৈ চৈ। আতœীয়স্বজন বাড়ী ভর্তি। কার খবর কে রাখে! ফুটবল খেলা নিয়ে মেতে গেলাম। আমার খেলা দেখে সবাই বলে, তুমি একজন ইন্টারন্যাশনেল খেলোয়ার হবে। ঢাকার বড় বড় টীমের সাথে যোগাযোগ কর। আমি যখন বল নিয়ে মাঠে দৌড় দেই তখন মাঠের চারদিক থেকে যে হাত তালি শুরু হয় তার চেয়ে পাওনা আর কি হতে পারে! লেখা পড়া দিয়ে কি হবে! স্কুলে আর যাব না ঠিক করলাম। বাড়ীর আনন্দ আর খেলা নিয়ে মজে রইলাম। লেখাপড়ার কথা কেউ বলেনি। আমিও ফাকি দিতে লাগলাম। ঠিকঠাবভাবেই বিয়ে হয়ে গেল। পরে শুনলাম বিয়ের খরচ মেটাতে ধলাই বিলের দক্ষিনের খেতটা বিক্রি করতে হয়েছে। 
রুসেনাবুর বিয়ের অতিথির আসা যাওয়ার সেতু পোক্ত শেষ না হতেই নুরু ভাইর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। এ এক বিরাটা মহোৎসব। বিয়ের এক সপ্তাহ আগেই মেহমানে বাড়ী ভরে গেল। সবাই এল। বড় বুবু, মেজ বুবু, রুসেনা, রুসেনাবুর বরের বাড়ির আতœীয়স্বজন, খালা এলেন তিনজন সাথে নিয়ে, মামা মামানির সাথে চারজন ছেলে মেয়ে। বাড়ীতে বসারও স্থান নেই। বিছানার কোন আগা মাথা নেই। যে যেখানে পারে শুয়ে পড়ে। বড় চাচার বাংলা ঘর দখল হল। আমাদের প্রতিটি ঘরে চৌকির উপরে নীচে তিল ধারনের স্থান নেই।  আনন্দের সীমা নাই। অতিথির আতিথেয়তার ঘাটতি নেই। পুকুর থেকে বড় বড় মাছ ধরা হচ্ছে। ঘরের সব মুরগি শেষ হলে চাচাদের বাড়ির মুরগি চেয়ে আনা হল। বিয়ের ব্যাপার। খরচ যা লাগে তা তো করতেই হবে। বিয়ের খরচের দায়িত্ব দিলেন মানু ভাইর হাতে। মানু ভাই খরচের কোন কার্পন্য করেননি। বরযাত্রী যাবে নৌকো করে। গ্রামে মাঝারি সাইজের কয়েকটা নৌকা ভাড়ায় খাটে। বর্ষায় এই ছইওয়ালা নৌকা দিয়ে নাইওর যায়। এমনি চারটা ছইওয়ালা নৌকা ভাড়া করা হল। লাল নীল কাগজ দিয়ে সাজানো হল। তারপর বরযাত্রী দিয়ে ভরা হল। চারদিকে আনন্দ। আনন্দের ঢেউ। বরযাত্রীর তরীগুলো আনন্দ আর নদীর জলে ঢেউ তোলে কনের বাড়ির দিকে চলল। বিয়ের সব নিয়ম কানুন শেষ করে নব বধু মানে আমার ভাবীকে নিয়ে ফিরে এল। 
বাড়ীতে এসেও অনেক নিয়ম পালন করতে হল। নিয়ম কানুন শেষ হলেই অতিথিরা ফিরে যাবে। যাই যাই করে আরও তিন চার দিন লেগে গেল বাড়ী খালি হতে। কিন্তু বাড়ি খালি হলেই অনুষ্ঠানের শেষ নয়। নতুন আতœীয়তার মেহমান আদান প্রদান জরুরী। মেহমানদারিতে এদিক সেদিক হলে রক্ষা নাই। হাজার কথা উঠবে। তাই খুব সাবধানে খাবার পরিবেশন এবং কথাবার্তা বলতে হয়। এসব মেহমান আদান প্রদানে লেগে গেল কয়েক মাস। সব শেষে শুনলাম এই মহা আনন্দের মহা খরচ মিটানো হয়েছে জরা খেতটা বিক্রি করে। শুনে আমার মন ব্যাথায় টন টন করে উঠল। এই জরা খেতে আমার কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। দিনের পর দিন আমি এই খেত পাহাড়া দিয়েছি, এই খেতের ফসল আমাদের অর্ধেক বছরের খোরাক মিটাত। খেত আর মুড়ার কান্দায় আম গাছের নীচে কতদিন ঝড় বৃষ্টিতে আশ্রয় নিয়েছি। আম কুড়িয়েছি। এখন খেত আর আমাদের নেই, আর পাহাড়া দিতে হবে না। এই খেতের মালিক এখন উত্তর পাড়ার মালেক। 
জরা খেত কত টাকায় বিক্রি হয়েছে জানি না তবে এই জমির দাম অনেক তা শুনেছি। আর বিয়ের খরচ দেখেই বুঝা যায়। এই মহা যজ্ঞের পরও কিছু টাকা হাতে ছিল। তাই দিয়ে বিয়ে করা যায় কিনা মানু ভাই হিসেব করছিল মনে মনে। একদিন মায়ের কাছে কথাটা বলেই ফেলল। আমি বিয়ে করব, বিয়ে দেখ।
কয়েক মাসের মধ্যেই বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। একটা খসরা করে দেখা গেল জরা খেতের অবশিষ্ট টাকা যা আছে তা দিয়ে খরচ মিটানো যাবে না। আর একটা খেত বিক্রি করতে হবে। নুরু ভাই জমি বিক্রি করে বিয়ে করেছে মানু ভাইও কম যাবে কেন! খরচ কম হবে কেন! তাই ধলাই বিলের উত্তরের জমি বিক্রি হল।  আবার বাড়ি ভরে গেল মেহমানে। চলছে আনন্দোৎসব। কোন কিছুর কমতি নেই। এবার খরচের দায়ীত্ব নুরু ভাইর হাতে। তিনিও কম যান না। সবকিছুই নিজের বিয়ের আদলে করলেন। শুধু পানসী তরীর প্রয়োজন হয়নি। কারন বিয়ে বাড়ীতে নৌকো যায় না। গাড়ী বা রিক্সায় যেতে হয়। তখনও এলাকায় মাইক্রো বাসের চলন হয়নি। তাই কয়েকটা রিক্সা ভাড়া হল। বরের সাথে তার নিকট আতœীয় কয়েক জন রিক্সায় গেল। আমিও একটায় বসার সুযোগ পেলাম। বাকি বৈরাতিরা হেটেই রওয়ানা দিল। ভালয় ভালয় অনুষ্ঠান শেষ হল। নব বধু নিয়ে আমরা বাড়ি ফিরলাম। আমার দুজন ভাবী নিয়ে এখন আমাদের পরিবার।
দুই ভাবী নিয়ে আমাদের পরিবার ভালই চলছিল কয়েক মাস। বিয়ের পর দেখা গেল নুরু ভাই শ্বশুরবাড়ী গেলে ফিরতে চায় না। দুতিন সপ্তাহ পর পর আসে আবার যায়। মাস পেরিয়ে যায় আসতে চায় না। আমার বড় দুলাভাইর মত। বাড়ীর সব হাস মুরগী শেষ হলে কোন কিছুই পাতে দেবার না থাকলে জমি বন্ধক দিয়ে হলেও জামাই খাবার যোগার করতে দেখেছি। নুরু ভাইর বেলায় তা হয়েছে কিনা জানি না। তবে কয়েক মাস পর একদিন বললল, ’আমি জোদা (ভিন্ন) হইয়া যামু’। কি কারনে জোদা হবে তা বলে নাই। জোদা হয়ে যাবে। ব্যাস। যেমন বলা তেমনি কাজ। এক সপ্তার মাঝে নুরু ভাই পশ্চিমের ঘরে সব ব্যবস্থা করে নিল। রান্না বান্না খাওয়া ঘুম সব।
এত সব আনন্দের মাঝে আমার খবর কেউ রাখেনি। আমিও বল খেলা নিয়ে মেতে রইলাম। আরও নাম  করতে হবে। যে যেখানে হায়ার করতে আসে খুশি মনে খেলতে যাই। সেদিন সহ খেলোয়ার ফজলু বলছিল, ‘আমরা মাগনা আর কত দিন খেলব? মাগনা আর খেলব না’। তারপরও মাগনা খেলতে যাই। কসবার দক্ষিনে বায়েক স্কুলে খেলতে গেছি। পাঁচ গোলে বায়েক স্কুলকে জিতিয়েছি। এই পাাঁচ গোলের কৃত্তিত্ব আমার। খেলার পর বায়েক স্কুলের ছেলেরা আমাকে মাথায় তোলে হৈ চৈ করতে লাগল। কিভাবে কি দিয়ে আমাকে খুশি করবে ঠিক করতে পারছিল না। সেদিন আমাকে ফিরে আসতে দেয়নি। কমিটির সভাপতির বাড়ীতে থাকার ব্যবস্থা হল। রাজকীয় খাদ্য পরিবেশন করে তারা খুশি হল না। পরদিন দুপুরে খেতেই হল। কয়েক ডজন ছেলের সাথে কোলাকুলি করে বিদায় নিলাম। আমাকে রিক্সায় উঠিয়ে দিয়ে সভাপতি ইদ্রিস মিয়া আমার হাতে একটি দশ টাকার নোট দিয়ে বললেন,‘আপনার ইচ্ছেমত খরচ করবেন। আর ভবিষ্যতে আপনি আমাদের হয়ে খেলবেন’। 
দশ টাকা! এত টাকা আমার হাতে আর আসেনি। রিক্সায় বসে ফজলুর কথা মনে হল। ‘আমরা আর মাগনা খেলব না’। মনে মনে বললাম তাইত! মাগনা খেলব কেন! প্রতিটি খেলার জন্য কত টাকা নেয়া যায় তা ঠিক করতে পারলাম না। কিন্তু টাকার বদলে খেলতে হবে। কত টাকার বদলে বছরে কয়টা খেলা যাবে তার একটা খসড়া করলাম মনে মনে। অনেক টাকা! 
এই দশ টাকা পকেটে নিয়ে কসবা থেকে হেটে রওয়ানা দিলাম। মনে মনে আমি আকাশে উড়ছি! এই শুরু। ভবিষ্যতে কত রোজগার করব তার হিসেব নেই। মোহাম্মের্ডানে যোগ দিতে পারলে তো কোন কথাই। শুধু টাকা আর টাকা। মেট্রিক পাশ করে কয় টাকা আর রোজগার হবে! 
 এই দশ টাকা দিয়ে কি কি করব তার একটা ছক তৈরি করে ফেললাম মনে মনে। চন্দ্রপুরের মাঠে এসেই আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে গেল। 
এখন মাঠ কোনাকোনি মানে ক্ষেত কোনাইচ্চা হাটা যায় না। জমিতে পানি। শুধু আইল দিয়ে হাটা যায়। টুনুর বাড়ীর পশ্চিমে একটা বড় ক্ষেত। তার এক কোনে এসেই দেখি অপর কোনে আরবীর স্যার সাইদুর রহমান আসছেন। আমি তখন বা দিকের আইল ধরলাম। দেখি তিনি তখন তাঁর ডান দিকের আইল ধরলেন। আমি আবার ডানদিকের আইল ধরে রওয়ানা দিলাম। তিনিও আবার বামদিকের আইল ধরলেন। যেই আমি আবার আইল বদল করতে যাচ্ছি তখন তিনি হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, এ্যাই, এদিক দিয়ে আয়!
ইন্টারন্যাশনেল প্লেয়ার তখন কেঁচোর মত, এ হুঙ্কারে কেপে উঠবেনা কার সাধ্য! একবারে বাধ্য ছেলের মত মুখোমুখি হবার আইল ধরে এগিয়ে গেলাম। সামনে গিয়ে মাথা নীচু করে যন্ত্রের মত থেমে গেলাম।
আমি শুনেছি তুমি ইন্টারন্যাশনেল প্লেয়ার হয়ে যাচ্ছ। ভাল কথা। আমি আমার ক্লাশে ছাত্র পাইনা পড়াতে। আমার ছাত্রটি নেই। খেলায় ভাত দেবেনা। কাল থেকে আমি তোমাকে ক্লাশে দেখতে চাই। আমার জালি বেতটা এখন হাতে নেই। না হয় ছাল তুলে দিতাম এখনি। খেলার সাধ মিটিয়ে দিতাম! খেলতে চাও খেল, কিন্তু পড়া ছেড়ে দিয়ে কেন ?  কে দিয়েছে এ পরামর্শ ? আমার ছাত্র আমি ক্লাশে দেখতে চাই। কাল অবশ্যই ক্লাশে দেখা হবে। এখন যাও!
বাড়ী এলাম। পকেটে দশ টাকা! কি করব! মা’র হাতে দিব নাকি বাবার হাতে দিব ভাবছি। কিন্তু মৌলভী স্যার যেভাবে বললেন তার কি হবে! আমার ভবিষ্যত খেলা শেষ! না তা হতে দেয়া যাবে না। বাবাকে বলব না কিছূই। না টাকার কথা না স্যারের কথা। চন্ডিদ্বারের দিকে না গেলেই হল। মোট কথা খেলা ছাড়া যাবে না। তাছাড়া স্কুলে গিয়ে আমি কিছুই করতে পারব না। সেভেনে শেষের দিকে ক্লাশে যাইনি, অষ্টম শ্রেনীতে যাইনি একদিনও, এখন আমি কোন শ্রেনীতেই নাই। স্কুলে গিয়ে কি করব! 
সাইদুর রহমান স্যার তিন দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। ক্লাশে না দেখে তিনি নিজেই বাড়ীতে এসে উপস্থিত হলেন। তখন বিকেল। আমি খেলতে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। শুনি স্যারের গলা। কই, ডাক্তার সাহেব কই ? কে আছ বাড়ীতে। আমার ছাত্র কই। যেন পুলিশ বাড়ীতে ঢুকছে। এমন সময় বাবা বেরিয়ে এসে স্যারকে দেখেই অবাক। আরে! মাষ্টার সাহেব যে! গরীবের ঘরে পদধূলি ?
বাহার কই ?
আছে তো বাড়ীতেই বোধ হয়। 
এই সুযোগে আমি পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে গেলাম।
বাবার সাথে স্যারের কি কথা হয়েছিল জানি না।
পরের দিন সকালে বাবার কঠোর হুকুম। হঠাৎ বাবা এত রুক্ষ হয়ে গেলেন কেন ? এমন হুকুম তো আগে শুনিনি কোনদিন। কোনদিন একটা ধমকও দেননি। সেই বাবার হুকুম এত কড়া! স্কুলে না গেলে এ বাড়ীতে আর স্থান নেই। অন্য পথ দেখ। খেলার মাঠে পড়ে থাক। এতদিন আমি অন্ধ ছিলাম।
পরদিন চোরের মত পায়ে পায়ে স্কুলে রওয়ানা দিলাম। মনে হচ্ছে আমি হঠাৎ মর্তে নেমে এসেছি।  কল্পনার আকাশ থেকে। সবকিছুই যেন নতুন। পথ ঘাট সব।

-১৭-

স্কুলে এসেই মৌলভীস্যারের সাথে দেখা করলাম। মুখে একটা হাসি এনে বললেন, এসে গেছ। এই ত চাই! আমার ছাত্র না থাকলে পড়াই কাকে ?
অষ্টম শ্রেণীতে স্কুলে যাইনি একদিনও। নবম শ্রেণীর বার মাস চলে গেছে। বাকী ছয় মাস। শিক্ষার নীতি বদলে যাচ্ছে। নতুন নীতি চালু হবে। মেট্রিক আর থাকবেনা। এটাই শেষ বেচ। তাই নবম শ্রেণীতে আঠার মাস, দশম শ্রেণীতে ছয় মাস। এই মিলে দু বছর। সরকারি নিয়ম এবং আদেশ।  মেট্রিকের শেষ সুযোগ। পাশ করতে না পারলে নতুন করে সব শুরু করতে হবে। আমি তাহলে কোন ক্লাশ যাব! নবম শ্রেণীর কোন বইও নেই। অষ্টম শ্রেণীরও নেই। তাহলে ?
স্যার, কোন ক্লাশে যাব আমি ?
কেন, নাইনে যাবা!
এইটে ক্লাশে যাইনি, নবম শ্রেনী তো এক বছর চলে গেছে। বাকি আছে ছয় মাস, আর দশম শ্রেনীতে ছয় মাস, এই বার মাসে আমি পারব কেন ? মোট বার মাস পড়াশুনা করে মেট্রিক দেয়া কি সম্ভব ? 
আমার মন বলছে তুমি পারবে। খাটতে হবে খুব। আমি ছাত্র চিনি। এছাড়া এই সুযোগটা যদি না নাও তাহলে তো তোমার পড়াই হবে না। সবকিছুই যে বদলে যাচ্ছে! এই বদলের যুগে অনেকেই হারিয়ে যাবে চিরতরে! তোমাকে পাশ করতেই হবে। তুমি পারবে। চল হেড মাষ্টার স্যারের সাথে তোমাকে পরিচয়  করিয়ে দেই।
হরলাল রায় কবে চলে গেছেন সে খবর রাখিনি। আমার প্রিয় শিক্ষক। মাঝে মঝে ক্লাশে আসতেন। কোন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে। তাঁর হাতে “গুড” পেয়েছে মাত্র তিনজন। বাংলায়। সপ্তম শ্রেণীতে পেয়েছিলাম আমি। তিনি চলে গেছেন। তাঁর স্থান দখল করেছেন ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার আবু নাসের স্যার। নাম শুনেছি। এই প্রথম দেখা।
সব শুনে হেড মাষ্টার স্যার বললেন, এ অসম্ভব! এই কয় মাসে সে কি করবে ? তার চেয়ে নতুন কোর্সে ক্লাশ এইট থেকে শুরু করুক। ভাল রেজাল্ট করবে।
সাইদুর রহমান স্যার বললেন, আমার মন বলছে সে পারবে। একটা সুযোগ দেয়া হোক। না পারলে সে ক্লাশ এইটে চলে যাবে। এই তো এক মাস পর স্ক্রিনিং পরিক্ষা হবে। পরিক্ষাটা তাকে দিতে দিন।
পরিক্ষা দিতে কোন অসুবিধা নেই। দিতে দিন।
পায়ে পায়ে ক্লাশ নাইনে গিয়ে ঢুকলাম। তখন উত্তর পাশে কদম গাছটার নীচে পূর্ব পশ্চিমে লম্বা টিনের ঘরে নাইন এবং টেন ক্লাশ হয়। ক্লাশে তিল ধারনের স্থান নেই। অনেক নতুন মুখ। পুরনো বেশ কয়েকজন আছে। তারা আমাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। আরে তুমি!
এতদিন পর? খেলা ছেড়ে দিয়েছ? অনেক প্রশ্ন। যেন আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। আবার ফিরে এসেছি। নতুন ছাত্রই বেশি। তারা এসেছেন অন্যান্য স্কুল থেকে বিতাড়িত হয়ে। অনেক ঘাটের জল খেয়ে, অনেক স্কুল শেষ করে, অকৃতকার্য হয়ে। কারন ছাত্র বাড়ানোর জন্য অন্যান্য স্কুলে বাদ পড়া ছাত্রদের এখানে ভর্তি করা হয়েছে। নতুন ছাত্ররা মনে করল আমিও নতুন। পুরনোরা বলল, আমাদের বেচের প্রথম বয়। খুব ভাল ছাত্র। নতুনরা বলল, দেখা আছে। দেখব কত কেরদানি।
ক্লাশ শুরু। প্রথমেই এলেন শশীমোহন দাস। বাড়ী গোপিনাথপুর। তিনি ক্লাশে এসেই একটা বড় হাসি দিয়ে অবিনাশকে ডাকলেন। একবারে পেছনের বেঞ্চে। অবিনাশ দাঁড়াতেই জিজ্ঞেস করলেন, আজকের রুটিনটা কি বলতো?
অবিনাশ হা করে রইল। একটা অট্টহাসি দিয়ে শশীবাবু বললেন, দেখেছ তোমরা ? অবিনাশ নিজের নামও করে, বাপের নামও করে। দেখনা তাকিয়ে তার কাছে কতগুলো বই! একটাও পড়ে দেখেনি। এগুলো বয়ে নিয়ে এসেছে মানুষকে দেখানোর জন্য। মানুষ দেখে বলবে দেখ অমুকের ছেলে কত বই পড়ে!
সমস্ত ক্লাশ হেসে উঠল।
আমার দিকে নজর পড়তেই জিজ্ঞেস করলেন কোন্ স্কুল থেকে এসেছ ?
বললাম, এই স্কুলেরই আমি।
এই স্কুলেরই ছাত্র ? খুচিয়ে খুচিয়ে আরও অনেক প্রশ্ন করলেন। চোখটা মিটি মিটি করে হেসে বললেন, মানুষের অসম্ভব তো কিছু নেই। এগিয়ে যাও।
তিনি যেসব অঙ্ক করালেন তার মাথামুন্ড কিছুই বুঝিনি। কি সব অদ্ভুদ অঙ্ক। কবে একটা ট্রেন কত বেগে রওয়ানা হয়েছিল, কোথায় পৌঁছবে, কতক্ষনে এসব। মাথাটা গুলিয়ে গেল। স্যার চলে যেতেই আরও গুলিয়ে গেল বই দেখে। বরচতলের জাহেরের পাশে বসেছি। তার সামনে বড় বড় বই। সিওর সাকসেস, মেড ইজি ইত্যাদি। জিজ্ঞেস করলাম, এসব কি রে ?
এসব বই। যা না পড়লে পাশ করতে পারবেনা। তারপর ইংরেজি, বাংলা, ইতিহাস, ভুগোল, এ্যালজাবরা, পাটিগণিত, জ্যামিতি এসব দেখে আমি হতাশ হয়ে গেলাম। ক্লাশে যখন পাঙ্কসোয়েশান, নেরেশান, পেসেজ, ফিল আপ দি গ্যাপ দিতে লাগল আমার ভিমরি খাবার অবস্থা। নাহ, আমার দ্বারা হবে না। এসব পারবনা। বইর নাম জানতে জানতে এক মাস পেরিয়ে গেল তারপরই পরিক্ষা এসে গেল।
ফল  বেরোল। অঙ্কে দশ, ইংরেজিতে পঁচিশ, বাংলায় পনের আর সব সাত/আট করে। ক্লাশে একটা হাসির গুঞ্জন। গুড বয়। নতুন ছাত্ররা টিটকেরি দিচ্ছে। সুলেমান আর লতিফ নামে দুজনের জ্বালায় ক্লাশে বসাই দুস্কর। আরও অনেকে যোগ দিচ্ছে। গুড বয়।
গল্প আছে, কসবা থানার স্কুল পরিদর্শক সুলেমানকে চিনে। ইংরেজিতে তাকে ফেল করায় এমন শক্তি নেই। স্কুল পরিদর্শক এলে সুলেমানের প্রশ্নে বিমড়ি খান। সে ফেল করে শুধু অংক আর ইতিহাসে। আর  আব্দুল লতিফ সাহেব আছেন সব কিছুতেই। তিনি ফেল করেন কয়েকটা বিষয়ে। নিয়ম নেই। সোলেমানের একটা নিয়ম আছে। অংক আর ইতিহাস। আমার পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে মৌলভি স্যার একবারে মাথায় হাত দিয়ে বসলেন। করেছিস কি! আমার ইজ্জত ডুবালি! এখন আমি কিভাবে মুখ দেখাব। যেন তিনিই পরিক্ষায় এত খারাপ করেছেন। শশীবাবু আমার অঙ্কের মাথা দেখে হতাশ। সব শেষ। কি সাহায্য করবেন! যার হাতে শূন্য তাকে কি দিয়ে সাহায্য করবেন। একের সাথে এক দিলে দুই হয়। শূন্যের সাথে শূন্য যোগ হলে কি হয় ? টেষ্ট পরিক্ষায় যারা ভাল করবে শুধু তাদেরকেই রেজিষ্ট্রেশন করা হবে। দু মাস পরে টেষ্ট পরিক্ষা। এখন আমার চেয়ে খারাপ ছাত্র ক্লাশে আর নেই। ফুলু চাচা, যিনি আমাদের গ্রামের স্কুলে ছুটি দিয়ে দিতেন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে। তিনি গত পাঁচ বছর যাবত নিরলস চেষ্টা করে আসছেন। কোন মতে একবার সেন্টারে যেতে চান। তিনিও আমার চেয়ে ভাল করেছেন। কিন্তু টেষ্ট দেবার প্রয়োজনীয় নাম্বার পাননি।
চাচার প্রতি সকলেরই একটা করুনার দৃষ্টি। হেড মাষ্টার স্যার শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। শুধু চাচার কারণে। তিনি সকলকেই একটা সুযোগ দিলেন টেষ্ট পরিক্ষা দেবার জন্য। দু মাস পর।
নতুন ছাত্রদের সাথে ধীরে ধীরে ভাব হয়ে গেল। কিছু কিছু মানুষের সাথে নিজের অজান্তেই বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তাদের মধ্যে মতিলাল বনিক, ফুলু ভাই, সোলেমান, লতিফ, নুরুল হক, মাখন লাল, অবিনাশ প্রমুখ।
অংকের মহাসাগর জনাব সোলেমানের সাথে গলায় গলায় ভাব। বিষয় অঙ্ক। সাপ্তাহিক টেষ্টে আমি যদি পাই সতের তিনি পান সাত। আমি যদি পাই দশ, তিনি পান চার। আবার ইংরেজিতে তিনি যদি পান ষাট, আমি পাই পঞ্চাশ, তিনি যদি পঞ্চাশ, আমি পাই আটচল্লিশ। এদিকেও আর একটা সেতু তৈরী হল দুজনের। একবারে গলায় গলায় ভাব। এই দু সাগর মিলে অংকের মহাসাগর তৈরী হল। সোলেমান তার আগে আট বছর পর্যন্ত চেষ্টা করছেন। মেট্রিক-বৈতরনী পার হতে। কিন্তু পারেননি শুধু অংক আর ইতিহাসের জ্বালায়। তিনি এ পর্যন্ত বাইশটা লজিংএ থেকেছেন। এগারটা স্কুলে পড়েছেন। সাত জন লজিং মিস্ট্রেসের সাথে প্রেম করেছেন। ক্লাশ টেনে গিয়ে ফেল করে আবার নাইনে আসেন পোক্ত করার জন্য। এ পর্যন্ত মাত্র দু বার সেন্টারে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে। দুবারই ফেল করেছেন অংক আর ইতিহাসে। তিনি গল্পের আদু ভাইকেও ছাড়িয়ে গেছেন। বয়স তিরিশের উপর। সোলেমান বলে, দেখ, অংক করব কেমনে ? ওদিকে মৌলভি স্যারে কয় সুদ খাওয়া হারাম, আর এদিকে অংকের স্যার সুদ লওয়াটা শিখায়। সুদ খামুনা, সুদ কষা করার দরকারটা কি ? আর একটা ফাইজলামি দেখ। বানর বাঁশে লাফায় আবার পিছলায়, এইডা আবার অংকের কি অইল ? তাও আবার বাঁশে তেল দেওয়া। শালার কার অত তেল আছে যে বাঁশে তেল দিতে যাবে ? খাইয়া আর কোন কাম নাই এইসব করতে যামু। ফেল করলে করমু। বান্দর লইয়া অংক করার কোন মানে হয় না।
মতির বাড়ী স্কুলের পাশেই। আসা যাওয়ার পথে তাদের বাড়ী যাই। মাঝে মাঝে তার পড়ার ঘরে আড্ডা দেই। এ গ্রামে সবাই হিন্দু ছিল। এখন বেশ কিছু মুসলমান বিনিময় করে এসেছে। এটাই যেন একটা নিয়ম হয়ে গেছে। হিন্দুরা চলে যাবে এদেশ ছেড়ে আর ওপার থেকে মুসলমান আসবে।
এর  মাঝে ক্লাশে তসরিফ নিলেন জনাব জামাল। তিনি প্রথম  যেদিন ক্লাশে এলেন সেদিন ভয়ে কেউ কথা বলেনি। পরনে দামী পেন্ট, কেরিলিনের সার্ট, পায়ে চকচকে জুতা। দেখলে মনে হয় খুব বড় লোকের সন্তান। ছাত্রও নিশ্চয়ই তুখোড় হবে। তাই সবাই দূরে রইল। শুধু শশীবাবু জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোন স্কুল থেকে এসেছ ?
ঢাকা থেকে।
এ পর্যন্ত শোনার পরই আমরা আরও ভয় পেয়ে গেলাম। ঢাকার কোন স্কুল চিনিনা। কি একটা নাম বলল।  আমরা ধরে নিলাম আমাদের সবাইকে টেক্কা দিয়ে দেবে। শহরের স্কুল থেকে এসেছে!  অনেক কিছু জানে। ঘাঘু! যে সুলেমান শিক্ষক ছাত্র কাউকে ভয় পায়না, সেও দেখলাম মিট মিট করে তাকাচ্ছে।
শশীবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন, ঢাকা থেকে এখানে এলে কেন ?
বড় ভাই পাঠিয়ে দিলেন।
তোমাদের বাড়ী কোন খানে ?
চন্দ্রপুর।
ঢাকায় কোন ক্লাশে ছিলে ?
মেট্রিক দিয়েছিলাম।  পাশ করতে পারিনি।
কোন্ বিষয়ে ফেল করলে ?
তিনি যা বললেন তাতে আর ইজ্জত নামক কোন জিনিষ থাকার কথা নয়। একটা নয়,  চারটা বিষয়ে তিনি ফেল মেরেছেন। যেগুলো পাশ করেছেন তারও কোন রকমে। সবচেয়ে বেশি নাম্বার পেয়েছেন অংকে। বিয়াল্লিশ। আরও জানা গেল তার বড় ভাই সেক্রেটারিয়েটে চাকরি করেন। থাকেন মেসে। জামালকে দিয়েছিলেন লজিং।  ঢাকার খিলগাঁ নামক জায়গায় কোন এক বাড়ীতে ইত্যাদি ইত্যাদি।
শশীবাবু ক্লাশ থেকে চলে যেতেই সুলেমান ধরে বসল জামালকে। আরে সাব, আপনে তো স্কুলের ইজ্জত মাইরা দিলেন! চন্ডিদ্বার স্কুলে এই পোশাক পরে কেউ আসে! দেখেন না সবাই লুঙি বা পায়জামা পড়ে আসে ? জুতা কেন, সেন্ডেলও অনেকেই পড়ে না।  কাল থাইকা আর এসব পইরা আসবেন না। এসব এখানে মানায় না। তারপর ক্লাশ থেকে বেরিয়ে আমাকে কানে কানে বলল, নতুন জিনিষটার মাঝে অনেক কিছু আছে। সব বাইর কইরা ছারমু দেখিস। জিনিষটা এমনিতে আসে নাই। কোন একটা ঘটনা আছে নিশ্চয়ই।

-১৮-

যেভাবেই হোক পরিক্ষায় ভাল করতে হবে। এই শেষ সুযোগ। পাশ করতে না পারলে জীবনে আর লেখাপড়া হবে না। মৌলভীস্যার পেছনে লেগেই আছেন। শশীবাবু বলেছেন আমার অংকের ভার নেবেন। এখন পড়তে হবে।
বাইরের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে গেলাম। ঘরের আশেপাশে কারও যাওয়া নিষেধ। শুধু মা যাবেন খাবার নিয়ে। রাতদিন পড়লাম। সিওর সাকসেস, মেড ইজি ইত্যাদি সব পড়লাম। মৌলভী স্যার গত কয়েক বছরের মেট্রিকের প্রশ্ন পত্র কোথা থেকে যোগার করে দিলেন। বললেন এসব দেখলে তোমার একটা ধারনা হবে কেমন হবে পরিক্ষা। সেসব দেখে আমার একটা ধারন হল। বুঝলাম মানুষ কেন পাশ অথবা ফেল করে। আমি বলতে পারিনা রাতদিন কিভাবে গেল। ফুটবল খেলার কথা ভুলে গেলাম।
দু মাস পর পরিক্ষা দিলাম। পরিক্ষা শুধু ইংরেজি ১০০ নাম্বারের। দ্বিতীয় পত্র।
ষাটজন ছাত্রের মধ্যে সুলেমান সাতত্রিশ, আমি সাড়ে পঁয়ত্রিশ আর ক্লাশের প্রথম বয় ননীগোপাল তেত্রিশ। বাকী সব বিশের নীচে। মৌলভী স্যার খুশীতে নেচে বেড়াচ্ছেন। একজন ছাত্রের কৃতকার্যে একজন শিক্ষক যে কত খুশি হতে পারেন না দেখলে বুঝা যায় না। হেড মাষ্টার স্যারের সামনে গিয়ে বললেন, বলছিলাম কিনা স্যার ? আমি ছাত্র চিনি। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুমি আমার মুখ রেখেছ। এবার ফাইনাল পরিক্ষার জন্য প্রস্তুত হও।
মেট্রিকের কোর্সে যারা বছরের পর বছর পড়াশুনা করে আসছে এটাই তাদের জন্য শেষ সুযোগ। পরিক্ষায় যারা বিশ বা তার কাছাকাছি পেয়েছে তাদেরকে পরিক্ষা দেবার সুযোগ দেয়া হবে। কিন্তু ফুলু  চাচা! তিনি যে নাম্বার পেয়েছেন তাতে ক্লাশের সবাইকেই সুযোগ দিতে হয়। স্কুলের সুনাম দুর্নামের উপর কতৃপক্ষ জোড় দিচ্ছেন। ভাল রেজাল্ট না হলে স্কুলের এফিলিয়েশন থাকবেনা। স্কুল কমিটি সভায় বসলেন। ফুলুকে সুযোগ দিতেই হবে। একবার অন্তত সেন্টারে যাক।
শেষ পর্যন্ত সুযোগ পেল ফুলু চাচা। তার সাথে ক্লাশের সবই। একমাত্র হম ভাই  ছাড়া। হম ভাই মানে হুমায়ুন কবির। সব শিক্ষকই চেনেন। কোনদিন কোন প্রশ্ন করে সময় নষ্ট করেন না। কিন্তু মৌলভী স্যার মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে হমভাইকে বিপদে ফেলে দেন। এমন কি ‘আমি পারি না' কথাটাও পরিষ্কার করে উচ্চারণ করতে পারে না। উত্তর দেয়, আমি পাইন্না! উত্তর শুনে স্যার বলেন, পারবেন কেন। বাড়ি থেকে বের হয়েই তো দেখেন বিল কি বিলই আপনাদের। বাপের পাটের ব্যবসা আছে। জায়গা জমির শেষ নেই। কষ্ট করে স্কুলে আসেন কেন ? পরিক্ষায় ‘আনএলাউ' হয়ে হমভাই হেডস্যারকে খুন করতে গিয়েছিল। চুততারানির পুতে আমারে আনএলাউ করল কিরে! অসুরের মত শরীর। দশ বারজন মিলে ঝাপিয়ে ধরে তার বাবাকে খবর দেয়। তার বাবা প্রতিজ্ঞা করলেন, কালই তোমাকে একটা ভাল চাকরি দিয়ে দেব। পরিক্ষা দিয়ে কি হবে! মাঝখান দিয়ে অনেক কষ্ট। যে চাকরি দেব তা মেট্রিক পাশ করেও পাবে না। তার বাবা জানতেন লেখাপড়ায় টেবিল চেয়ার আর হুমায়ুন সমান। তাই তিনি কায়দা করে তাকে পুলিশে চাকরি দিয়ে দিলেন। এজন্য তার পকেট থেকে অনেক কড়ি গুনতে হয়েছে। পুলিশে হুমায়ুন খুব ভাল করেছে। কারন সে পুলিশের উপযুক্ত কাঠামোতেই তৈরি।
পরিক্ষার ছয় মাস আছে হাতে। আমাকে পড়তে হবে।
নুরু ভাই ভিন্ন হয়ে গেছে। কারন জানা গেল বাড়ীর কাজ নিয়ে দু ভাবীর মাঝে নীরব কলহ চলছিল। এখন আমাকে কোন কাজের আদেশ করার কোন অধিকার নেই তার। আমার পাশ ফেলে তার কিছু যায় আসেনা। কিছুদিন থেকে দু ভাইকে দেখা যায় যখন তখন এক সাথে বসে কি সব বিষয় নিয়ে খুব ব্যস্থ থাকে। পরে জানা গেল তারা দু ভাই সিদ্বান্ত নিয়ে বাড়ীটা কিক্রি করে দিয়েছে। ক্রেতা পশ্চিম পাড়ার  গাবদ্দি।  
ভাল ভাল সব জমি বিক্রি হয়ে গেছে। এখন বাড়ীটা আছে যা দিয়ে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। এই বাড়ীটা বাড়াই গ্রামের শ্রেষ্ঠ বাড়ী। আমার ভালবাসার ধন। আমার প্রেম, আমার রক্ত মাংশের সাথে জড়িত। জন্মের পর এ বাড়ীতেই এত বড় হয়েছি। এর প্রতিটি গাছপালার সাথে আমার সখ্যতা। আমি জানি কোন গাছে কখন ফল পাকে, কোন্ গাছের ফলের স্বাদ কেমন। আম কাঁঠাল, বড়ই, পেয়ারা, আতা, জাম্বুরা ইত্যাদি সব গাছের সাথে আমার আজন্ম প্রেম। এই পুকুর, পুকুর পাড়ের আম গাছ, ছাড়া বাড়ী, তার প্রতিটি ঝোপের আনাচে কানাচে কখন কোন্ পাখী ডিম দেয়, কখন বাচ্চা ফুটে সব আমার জানা। এ আমার রাজধানী। এখন এই সব কিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে! 
প্রেম শুধু মানব মানবির মাঝেই সীমাবদ্ব নয়। যেখানে মানুষ অনেক দিন বাস করে তার চারপাশে সবকিছুর সাথে প্রেম হয়ে যায়। এই মাটি, তার বুকে প্রতিটি বালুকণায় আমার পদচিহ্ন মিশে আছে। অনেক দিন বাস করার পর নিজেদের অজান্তেই প্রকৃতির সাথে প্রেমে মজে যায় মানুষ। তার চারপাশের প্রতিটি জিনিষ তার আপন হয়ে যায়। আমি ভাবতেও পারিনা এই বাড়ী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু যেতেই হবে!
বাড়ী বিক্রির টাকা দিয়ে সস্তায় অনেক জমি কেনা হল, নতুন বাড়ীর জায়গা রাখা হয়েছে গানপুরের মুড়ার উপর। ঘর ভাংগা শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহের মাঝে গানপুর নতুন বাড়িতে সব ঘর নেয়া হল। আমি বড় চাচার বাংলা ঘরে চলে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম নতুন বাড়িতে না গেলে কেমন হয়! চাচার বাড়ীতে থেকে গেলে চাচা তো ফেলে দেবে না! কিন্তু এ কথাটা মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারছি না। না, বাবাকে, না চাচাকে না ভাইদেরকে। দু সপ্তাহ কেটে গেছে। শুনতে পাই গানপুরের বাড়ি সব ঠিক ঠাক হয়ে গেছে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি আমার বইপত্র কিছুই নাই। মাফিল ভাবী বললেন, মানু ভাই এসে সব নিয়ে গেছে এবং বলে গেছে স্কুল থেকে ফিরলেই যেন নতুন বাড়ীতে চলে যাই। অগত্যা রওয়ানা দিলাম নতুন বাড়ী গানপুর।
গানপুর যেতে হলে সিনাই নদী পার হয়ে যেতে হবে। ‘বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে’। এখন বর্ষা কাল। দু পাড়ের বুরো জমি পানিতে তলিয়ে গিয়ে নদীর পরিধি হয়েছে মাইলেরও বেশি। বেশ কিছুক্ষন ঘুরে পুবের বাড়ির একটা নৌকা পাওয়া গেল। পার হলাম গানপুর। গানপুর একটা দ্বীপ। দক্ষিনে একটা বড় খাল, উত্তরে সিনাই নদী, নদী আর খাল এসে মিসেছে পুরান বাড়ীর পূবদিকে। গানপুরের পূর্ব দিকে বিরাট ধলাই বিল। গানপুর একটা দ্বীপ। পৌছলাম নতুন বাড়ীতে। 
মুড়ার উপর অনেক দূর সমতল। সেই সমতলের উত্তর দিকটা কেনা হয়েছে বাড়ীর জন্য। বাড়ীর উত্তর দিকে মুড়ার ঢালূতে নামলেই লিলার গোপ বিল, এখানে লিলুজির( কেউ বলে মানখা) জঙ্গল। এর পাতা হয় কাটাযুক্ত বিরাট আকারের, শালুকের মত একটা ফল হয়, তার ভিতর হয় সাদা দুধের মত। তাকিয়ে দেখলাম পাতার জন্য পানি চোখে পড়েনা। বাম দিকে তাকিয়ে দেখলাম অনেক বন্য গাছ গাছড়া, ঝোপ ঝাড়। তার বামে মানে পশ্চিম দিকে গানপুরের বিল। দক্ষিনে অনেক দূর খোলা মাঠ। আর পূবদিকে লুংগা, কাটা আর লতাপাতায় ভর্তি। এখানে এই বাড়ি আমার ভাল লাগেনি। এখানে নদী নেই, নদীর পার নেই, নৌকার আসাযাওয়া নেই, ফলের গাছ নেই, ছাড়া বাড়ীর মত জায়গা নেই। পুকুর নেই, পুকুর পারে কোন আড্ডা নেই। এখানে মানুষের বসতি নেই। এখন গানপুরে মাত্র তিনচারটা পরিবার আছে, বাকি সব ইন্ডিয়া চলে গেছে।  যারা আছে তারা আমার অচেনা। কিন্তু আমার ভাল লাগা না লাগায় কিছু আসে যায় না। এসব সিদ্ধান্ত নিবে বড় দু ভাই, সিদ্ধান্ত নেবার বয়স আমার এখনও হয়নি। তাদের কাছে আমি এখনও মানুষ নই, গবাদি পশুর সমান। তারা যা বুঝেছে তাই করেছে। 
এখন স্কুলে যাব কি করে! গানপুরের খাল পেরুতে নিজের নৌকা থাকতে হবে, এখানে পার হবার জন্য কোন নৌকা মিলবে না যেমন মিলত পুরানা বাড়ীতে। গানপুরের খাল পেরিয়ে নোয়াগার খাল। সেখানে তো কিছুই মিলবে না। সাতরে পার হতে হবে। তারপর আলমপুরের পুল। এক কালে এখানে কাঠের পুল ছিল, এখন তার কিছু চিহ্ন আছে শুধু কয়েকট কাঠের খুটি। বর্ষাকালে সাতার ছাড়া উপায় নেই। এইসব ফুলছেরাত পার হয়ে কয়েকদিন স্কুলে গেলাম।
মৌলভিস্যারকে বললাম, বাড়ীতে পড়াশুনার অসুবিধে। তাছাড়া এখন আমরা গানপুরের অধিবাসি। একটা দ্বীপ। তিনটা খাল পেরিয়ে স্কুলে আসতে হয়। নদী সাঁতরে। বেশির ভাগ সময় নৌকা মেলেনা। তিনি ব্যাপারটা খুবই গুরুত্ব দিলেন এবং আমাকে পাশের গ্রাম চন্দ্রপুরে লজিংএর ব্যবস্থা করে দিলেন।
হেড মাষ্টার স্যার থাকেন স্কুলেই। প্রাইমারি স্কুলের একবারে উত্তরের রুমটায়। যেখানে ফাইভের ক্লাশ হত। হাই স্কুলের ফাইভ আর প্রাইমারি স্কুলের ফাইভ এক সাথে এখন হাইস্কুলের ঘরে হয়। এই ক্লাশ ফাইভের এখন খালি থাকায় হেড মাষ্টার স্যারের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্যারের জন্য এখানেই রান্নাবান্না হয়। স্কুলের দপ্তরি কাজ করে দেয়। তিনি বললেন, তোমার যখন যা প্রয়োজন আমার কাছে এসো। স্কুলের পরে বেশির ভাগ সময় স্যারের সাথে কাটাই। যখন যা প্রয়োজন স্যারকে বলি। বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি, ইতিহাস, ভূগোল সব বিষয়ে তাঁর সমান দখল। তিনি খুব দরদ দিয়ে আমাকে সাহায্য করতে লাগলেন।
শশীবাবু নিলেন অঙ্কের ভার। স্কুলের পর তাঁর কাছে এক ঘন্টা পড়ি
বই কিনতে হয়েছে কুটি বাজার থেকে। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার, পাটের আড়ত। সব রকমের ব্যবসার আড়ত। বইর একমাত্র ফুটপাতের দোকান। রাস্তার উপর। চাদর বা মাদুর বিছিয়ে বই নিয়ে বিক্রেতা বসে আছে। ক্রেতা বিক্রেতা দূর দূরান্তের গ্রাম থেকে আসে। যারা কিনতে যায় তারাও বিক্রেতা। পুরনো বই বিক্রি করে নতুন বই কেনে। এখানে সব বই পাওয়া যায়। দশ বছর বিশ বছর পুরনো বই। যারা ফেল করে তাদের খুব একটা বই কিনতে হয় না। কারন তখনকার সময়ে বোর্ডের বই বেশি বদল হত না। মাঝে মাঝে দুএকটা। কাজেই পুরনো বই দিয়েই চালানো যেত। নিজের পুরনো বই বিক্রি করে নতুন ক্লাশের বই কেনা হয়ে যেত। এই বেচা কেনার পর নতুন বইর জন্য সামান্য পয়সা লাগত। কেউ কেউ বই বেচাকেনা করে জীবিকা নির্বাহ করত। কুটি বাজার একটা স্মৃতি! জ্বল জ্বলে নুড়ি। ইতিহাস!
আমাদের গ্রাম থেকে কুটি বাজার প্রায় ছয়/সাত মাইল। যাতায়ত ব্যবস্থা পদব্রজ। কসবা বাজার থেকে কাচা সড়ক কুটি বাজার পর্যন্ত শেষ। বাজারে ঢুকে বামদিকে মোড় নিলে প্রথমেই মিষ্টির দোকান। পথের দুপাশে সাজিয়ে বসে আছে। মিষ্টির গন্ধ চারদিকে ম ম করছে। মাছি ভন ভন করছে। নেড়ি কুকুর লেজ নেড়ে মাছি তাড়াচ্ছে। আয়নার ভেতরে রাখা মিষ্টিও মাছির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রায় সব দোকানের কর্মচারির চেহারা যেন মিষ্টির মত। নাদুসনুদুস।
মিষ্টির দোকান ছাড়িয়ে একটা ছোট কাঠালিয়া বট গাছ পার হয়ে কয়েকটা মুদির দোকানের পর থেকেই শুরু হয় বইর দোকান। অনেকদূর খালি জায়গা। একটু দক্ষিনে একটা বড় বটগাছ। মুদির দোকান থেকে ঘুরে ঘুরে বইর দোকানগুলো একবারে চলে যায় দক্ষিন পশ্চিমে ছোট একটা লোহার পুল পর্যন্ত। তারপর পাটের গুদামঘর। বই নিয়ে যার যার সুবিধেমত বসে। কেউ কেউ শুধু ঘাসের উপর বা মাটির উপর বই বিছিয়ে বসে পড়ে। প্রতি বছর স্কুলে নতুন বইর লিষ্ট দেবার পর থেকেই জমে উঠে বাজার। নতুন বই কেউ কেনেনা যতক্ষন পর্যন্ত পুরনো বই পাওয়া যায়।
কুটি বাজারে পাওয়া যায় না এমন জিনিষ বোধ হয় নেই। একেকটা গলি একই জাতীয় জিনিষের দোকান। বাজারের পশ্চিম দিকে নৌকাহাটা। নৌকায় জিনিষ কেনাবেচা হয়। পশ্চিমদিকে বিল। বিলের ওপারে দিগন্তরেখার মত দূরের গ্রামগুলো দেখা যায়। দূরদূরান্ত থেকে বেপারীরা আসে পণ্য নিয়ে। কেনা বেচা চলে। উত্তরে ভাওয়াল থেকে আসে কাঁঠালের বড় নৌকা। এক এলাহি কান্ড। এখানে গরু ছাগল বেচা কেনা হয় না। তা হয় শুধু কসবা বাজারে।
আলিমের দাদাদের কাছে কুটি বাজারের অনেক গল্প শুনেছি। একবার দু দাদা বাজারে গেছে। ভাওয়াইল্লা কাঁঠালের নৌকায় কাঁঠালের দাম জিজ্ঞেস করছে। অনেক বড় কাঁঠাল। ছোট দাদা বলছে, এত দাম বলছ কেন, একজনেই তো খাইতে পারবে। এটার দাম এত হয় ?
বিক্রেতা রেগে বলে উঠল, তুমি যদি একলা এই কাঁঠালটা খাইতে পার তাইলে নৌকার সব কাঁঠাল তোমাকে দিয়া দিমু।
এতবড় কাঁঠাল একজনে কেন, চার/পাঁচজনেও শেষ করতে পারবেনা। ছোট দাদা বলল, আমি বাজারটা তিনটা পাক দিয়া খামু। বিক্রেতা বলল, তিনডা কেন, তুমি একশডা পাক দিয়া খাও। যা কইছি কইছি। খাইতে পারলে সব কাডল তোমার।
তাইলে দুইজন সাক্ষি দরকার।
আরে সাক্ষির কি দরকার। মুখের কথাই সাক্ষি। মুসলমানের এক কথা।
এই মুসলমান জানেনা আমরা উজানের দেশের মানুষ। কাঁঠালে আমাদের জন্ম। একজন মানুষ কত কাঁঠাল খেতে পারে তা তাদের ধারনা নেই। মাঝারি সাইজের একটা কাঁঠাল দাদা খেতে পারে অনায়াসে। নৌকার কাঁঠালটা নিয়ে তিনি হিসেব করেছেন। এর তিনভাগের  এক ভাগের বেশি খাওয়া  সম্ভব নয়। তাই তিনি বাজারটা তিনবার চক্কর দিয়ে খাবেন।
শুরু হল কাঁঠাল খাওয়া। কয়েকশত মানুষ মজা দেখছে। এ কি করে সম্বব! কাঁঠালের জাতটা খুব ভাল। দাদা অনুমানের চেয়ে একটু বেশিই খেয়ে ফেললেন। খেেেয় বাজার চক্কর দিতে বেরিয়ে পড়লেন।
বড়দাদা চাউলহাটায় চাউল বিক্রি করছে। ছোট দাদা বড় দাদাকে সব বুঝিয়ে বলে দিল। বড় দাদা গিয়ে খাওয়ার পর আর সামান্য বাকী রইল। বড় দাদার খাওয়া দেখে কাঁঠালের মালিকের অক্কা পাওয়ার অবস্থা। যেটুকু বাকি আছে তা যে খেতে পারবে তাতে আর সন্দেহ নেই। এখন কি হবে! মুসলমানের জবান। এখন কি করা যায়!
একটু পরে ছোট দাদা আবার ফিরে এল। বাকী কাঁঠালটুকু খেয়ে বলল, এবার সব কাঁঠাল নামাও। আমি সব বিক্রি করব।
নৌকার মাঝিমাল্লা মোট আটজন। সবাই কান্নাকাটি শুরু করেছে। কেউ এসে দাদার হাত ধরছে, কেউ এসে পায়ে ধরছে। বাবা, আমাদের ভুল হয়ে গেছে। আমরা বুঝতে পারিনি। কাঁঠাল সব আপনার। সব নিয়ে যান। কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়ের সংসার। আমরা আপনার কাছে ভিক্ষে চাই! দয়া করুন। প্রধান মাল্লা মুখ কাল করে বসে আছে। তার মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরোচ্ছেনা।
তাদের অবস্থা দেখে দাদার দয়া হল। বললেন, আমি আসছি। বলে চলে গেলেন চাউল হাটায়। বড় দাদাকে নিয়ে নৌকার সামনে এসে হাজির। সবাই দেখে অবাক! জমজ মানুষ দেখতে এক রকম হয় কিন্তু তাদের সাদা কালো চুল, চুলের সাইজ পড়নের কাপড়, গায়ের রং সব এক রকম হয় কি করে! দাদা বললেন, দেখ তোমাদের আর কষ্ট দিতে ইচ্ছা অইলনা। আমি একলা খাই নাই, দুই ভাইয়ে মিল্লা খাইছি। এখন তোমাদের কাডলের দাম দেওন লাগে।
না বাবা, দাম দেওন লাগবেনা। আপনে না বললে আমরা তো বুঝতেই পারতামনা। বরং আর একটা কাডল লইয়া যান আপনের সত্য কথার জন্য।
এ গল্প আমতলায় বহুবার শুনেছি। আরও অনেক গল্প।
বড়বুর বাড়ী বুগীর। কুটি বাজার থেকে মাইল দেড়েক। প্রথম কুটি বাজারে আসি তখন চতুর্থ শ্রেণীতে। বই কিনে বুবুর বাড়ীতে রাত্রিবাস। তারপরদিন বাড়ীর দিকে রওয়ানা। এই নিয়ম। সেই কুটি বাজার থেকে সিওর সাকসেস, মেড ইজি ইত্যাদি নিয়ে যখন রওয়ানা দিলাম তখন বইর ভারে পা চলে না।

-১৯-

চন্দ্রপুরে যে বাড়ীতে থাকি তার পাশেই ফুল ভাইর বাড়ী। যাক একজন সঙ্গী পাওয়া গেল। ফুলু ভাই সোলেমানকে দুচোখে দেখতে পারে না। ফুলু ভাই এর বয়সও বিশের উপর। কয়েক বছর আগে দমশ শ্রেণীতেই তার কি একটা সাংঘাতিক অসুখ হয়। হঠাৎ করেই মাথার চুলগুলো সাদা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে আবোলতাবোল বকত। অনেক চিকিৎসার পর এখন অনেকটা ভাল হয়ে আবার স্কুলে এসেছে। ছাত্র হিসেবে খুবই ভাল। আমার অংকের অবস্থা দেখে ফুলু ভাই এর দয়া হত। মাঝে মাঝে বলত, তোমাকে আমি অংক শিখাব। অংক বুজলে তো পানির মত। তুই মনোযোগ দিলেই দেখবি অংক কত সোজা। আমি তোকে শিখিয়ে ছাড়ব দেখিস। বলে শুরু করত চারজন লোক একটা কাজ দশ দিনে শেষ করবে বলে শুরু করল। দুদিন করার পর একজন চলে গেলে বাকি কাজটা তিনজনে কয়দিনে করবে ?
যে কয়দিন লাগে সে কয়দিন। তাড়াতাড়ি দরকার হলে রাত পর্যন্ত করবে। না হলে যেভাবে করছিল সেভাবেই করুক। পরে দেখা যাবে কয়দিন লাগল। এখানে অংকের কি আছে ? এসব বাদ দাও।
তখনই রেগে গিয়ে বলে, সুলমাইনা তোর মাথাটা আরও নষ্ট করে দিয়েছে। তার সাথে ঘুরবি অংকে আরও খারাপ হবি। অংক জিনিসটা হল বুদ্ধির কাজ। একটু বৃদ্ধি খাটালে বুঝতে অসুবিধা হয় না। দেখ, এদিকে দেখ।
ফুলুভাই তার চেষ্টার ত্র“টি করে না আমাকে বোঝাতে। কিন্তু আমার অংকের মন বা মাথা কোনটাই বোধ হয় নেই।
সেই ফুলু ভাই ভালভাবে পাশ করল। পাশ করার পর আবার পূর্বের রোগটা দেখা দিল। (অসুখে ভুগতে ভুগতে অনেক পরে এক রাতে সেই কসবা রেল স্টেশনে, যেখানে দাঁড়িয়ে লইত্যাকে আমরা বিদায় দিয়েছিলাম, সেখানে গাড়ীর নীচে পড়ে মরে রইল। কখন, কিভাবে, কেন বাড়ী থেকে এ পর্যন্ত এসেছিল তা কেউ জানে না।)
চার মাস লজিং বাড়ীতে থেকে রাতদিন শুধু লেখাপড়া করলাম। ছাত্র পড়াতে হয় না। বর্ষাকাল। এখন তিনটা নদী পার হতে হয় না। তাছাড়া বড় হয়েছি। নেংটা হয়ে কাপড় বই হাত নিয়ে সাঁতরে নদী পার হওয়া যায় না। বর্ষা শেষ হল, তিন মাস পর ফিরে এলাম নিজেদের নতুন বাড়ীতে।
মেট্রিক বৈতরনী পার হতে হবে। এ মহাসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে কত জীবন শেষ হয়ে গেছে। এ বড় কঠিন পরিক্ষা। এর চৌকাট পার হতে গিয়ে কত কত কৃতি হুচোট খেয়ে ধরাশায়ী হয়ে গেছে চিরতরে। জীবন বদলে গেছে।  যার ছিল উজ্জল জীবন, খোলা ভবিষ্যত সে মেট্রিক বৈতরনি পার হতে না পেরে পৃথিবীর কোন দ্বারই খোলা রইলনা। হারিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের মাঝে। অথচ এমন অনেকেই আছেন যারা মেট্রিক পাশ করতে পারলেই তাদের জীবনটা খুলে যেত। বদলে যেত তার ভবিষ্যত, ভবিষ্যত বংশধর, সবকিছু । এই বিপদ থেকে এস এস সি কোর্স, যা নতুন শুরু হতে যাচ্ছে, অবশ্যই রক্ষা করবে। অনেক শিথিল এবং সহজ করে করা হয়েছে। এই ধারনা।
পরিক্ষার ফরম পূরণ করতে হবে। পরীক্ষার ফি জমা দিতে হবে ৬০ টাকা। লেখা পড়ার জন্য এই প্রথম টাকা খরচ হবে। এতদিন আমার সব ফ্রি ছিল। ভাল ছাত্র হিসেবে আমার সব ফ্রি। কিন্তু বই নিজের টাকায় কিনতে হবে। পরীক্ষার ফি ৬০ টাকা! এত টাকা আমার জন্য খরচ হবে! নুরু ভাই ভিন্ন। বাড়ী বিক্রির টাকা কার কাছে জানি না। বাবা ৬০ টাকা নিয়ে শশী বাবুর হাতে দিলেন। ফরম পূরণের ভার শশীবাবুর হাতে। তিনি সকলের জন্মদাতা এখন। কারণ কারও কোন জন্মদিন নেই কোথায়ও। বোধ হয় স্কুলে এমন কিছুই ছিল না যেখানে জন্ম তারিখ লিখতে হয়। সবাই ফরম পূরণ করছে। একে একে। আমার যখন লাইন এল সামনে দাঁড়ালাম। সেই পরিচিত হাসিটি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষন। হা হা করে একটা অট্টহাসি দিয়ে বললেন, তুমি পাশ করে যাবা। আমার মন বলছে। তবে তোমার চাকরির দরকার সেটা আমি জানি। তাই তোমার বয়সটা বাড়িয়ে দিচ্ছি। ৩১শে ডিসেম্বর ১৯৪৬। ঠিক আছে ?
আপনি যা ভাল মনে করেন তাই ঠিক।
এটাই আমি ভাল মনে করি। তোমার কাজের দরকার। বয়স কম হলে কেউ কাজ দেবে না।
সেই হল আমার জন্ম তারিখ। শশীবাবুর কলমে। এমনি কত মানুষের জন্ম তারিখ কলম দিয়ে হয় কে জানে!
কিন্ত কলম দিয়ে দেহের সাইজ বড় করা যায় না।
মহাসাগর পাড়ি দেবার দিন ঘনিয়ে এল। সবাই সেন্টারে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ব্রাহ্মবাড়ীয়ার অন্নদা স্কুলে আমাদের পরিক্ষার কেন্দ্র। কে কোথা থেকে পরিক্ষা দেবে তার ব্যবস্থা হচ্ছে। আমার চিন্তা নেই। অন্নদা স্কুল থেকে কয়েকমিনিটের পথ, মেড্ডায় আমার নানার বাড়ী। পরিক্ষার দুদিন আগেই গিয়ে পৌঁছলাম।  মামানীর ভাই জাহেদ মামাও পরিক্ষা দেবে। দুজন পরিক্ষার্থী এ বাড়ী থেকে।
আশেপাশের বাড়ী এবং পাড়াতে মামানীর বেশ যাওয়া আসা। অনেকের সাথেই বন্ধুত্ব। এক মহিলা এলেন মামানির ঘরে। মামানীকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ভাগিনা এখনও আসেনি। কাল থেকেই তো পরিক্ষা শুরু।
মামানী হেসে বললেন, ও তো কালই এসে গেছে। আপনি  তার সামনে দিয়েই এলেন। দেখেননি ?
না, ঘরে তো কেউ নেই, একটা বাচ্চা ছেলে। দেখলাম এক কোণে বসে কি যেন খুজছে।
ওই তো। দেখলে কেউ বিশ্বাস করে না। এক বারে তুখোর ছাত্র।
মহিলা উঠে এসে আমাকে আপাদমস্তক এক নজর দেখে নিলেন। ফিরে গিয়ে বললেন, বলেন কি! ও স্কুল শুরু করল কবে ? বয়স কত ?
বলা বাহুল্য, জাহেদ মামার বয়স বিশের কাছাকাছি। এক সাথে বেরোলে মনে হয় চাচা ভাতিজা।
কতক্ষন পর তিনচারটা মেয়ে এসে ঘরে উঁকি ঝুকি মারছে। এ ওকে ঠেলছে, ও একে ঠেলছে। কেউ আমার বয়সের, কেউ তাদের বড়। পেছন থেকে একজন বলছে, এই ছেলেটা পরিক্ষা দেবে!
কয়েকদিন পর্যন্ত পাড়ার লোকজন আসছে। আমাকে দেখতে। আমি একটা চিড়িয়াখানার জীব। অথবা অলৌকিক ব্যাপার, দেখতে আসে।
পরিক্ষার এ কয়দিন আমরা দেশের প্রেসিডেন্ট বা তারও উপরের আসনে। কি আদর যতœ! জীবনে যদি সারাক্ষন এমন পরীক্ষা নিয়ে থাকতে পারতাম! কিন্তু সব পরিক্ষার জন্য আদর যতœ পাওয়া যায় না।
পরিক্ষা শেষ। মুক্ত জীবন। আহ, কি শান্তি! অঙ্ক নেই।

-২০-

দিন কাটছে। অকাজে। বলখেলা আগের মত আর জমেনা। যত রকমের খেলা। সময় কাটে না। সব আতœীয়বাড়ী বেড়ানো শেষ। মাঝে মাঝে বন্ধুরা একত্রিত হই। হিসেব করি। কে কোন বিষয়ে কত পেতে পারি। হিসেব করে দেখা যায় কেউ পাশ মার্ক পাইনা। তাহলে কি সবাই ফেল করবে ? কার হাতে কোন খাতা যাবে কে জানে!
শুধু আমার পরিবারেই হিসেব সীমাবদ্ধ নেই। সব পরিবারেই একটা হিসেব আছে। এই মেট্রিকের হিসেব। ফল বের হলেই সব পরিবার খাওয়া শুরু করবে। মেট্রিকের ফলাফলের ফল। সকলের ছেলেই পাশ করে তাদের সমস্ত পরিবারের দায়িত্ব কাধে নিবে। তারা বসে বসে পায়ের উপর পা তোলে আরাম করবে। যা দিয়ে সমস্ত সংসার, আÍীয়স্বজনও অনায়াসে চলতে পারবে। আর কোন চিন্তা নেই।  সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে এই মেট্রিক পাশ করা গর্ভনররা। মাতাপিতা ভাইবোন সবাই মিলে তার রোজগারের টাকায় আরাম করবে। শুধু পরিক্ষার ফলটার আশায় আছে। গাছ থেকে ফলটা পড়লেই খাওয়া শুরু হবে। প্রতিটি পরিবারের একই আশা। এরা এর বেশি আশা করতে জানেনা। এই গর্ভনররা আদৌ কিছু করতে পারে না সে ভাবনা কারও নেই। কারণ ক্ষমতার চেয়ে লক্ষগুণ ভার তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ন্যুজ্ব করে দেয়া হয়। সেই ন্যুজ্ব দেহ কোনদিনই সোজা হয় না। পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে একদিন শেষ হয়ে যায়। অক্ষম অসহায় জীবন। দুঃসহ যাতনা আর অপূর্ণস্বাধ আহ্লাদ নিয়ে একদিন চিরতরে হারিয়ে যায়।
সেদিনও আড্ডা দিচ্ছিলাম কয়েকজন চন্ডিদ্বার বাজারে বসে। মেট্রিক বৈতরনীর খেয়াপারের যাত্রীরা। কার সংসারে আর কতদিন অপেক্ষা করতে পারবে। পরিক্ষার ফল বের হবার দেরী সইছেনা কারওর। এর মাঝে খবর এল তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরতে হবে। কি ঝামেলা হয়েছে।
গানপুরে আগে কোন মুসলমান ছিল না। এখন কয়েকঘর মুসলমান বাড়ী করেছে। দক্ষিন পাড়ার আনন্দ মোহন বড় আনন্দেই দিন কাটাচ্ছিল। দুটি সন্তান আর স্ত্রী নিয়ে সচ্চল সংসার। নিজের জমিজমা নিজেই করে। নদীর উত্তর পাড়ে কাঁঠাল বাগানে ইপিআর কেম্প হয়েছে বেশ কয় বছর হল। এদিক সেদিক টহল দিয়ে বেড়ায়  ইপিআর সদস্যরা। একদিন গানপুর এলেন একজন ইপিআর। আনন্দ মুড়ার জমিতে কাজ করছিল। ইপিআর সাহেব আনন্দকে ডেকে বলল, তুই ইন্ডিয়া গেছিলি। তোকে এরেস্ট করলাম। আনন্দ  তো অবাক। বলেন কি স্যার! আমি কোনদিন ইন্ডিয়া যাই নাই! এমন কি শেখের কোটের বাজারেও না। আমি কোন সাতে পাঁচে নাই!
বললেই হল, সাক্ষী আছে তুই ইন্ডিয়া গেছিলি। চল কেম্পে!
কেম্পের নাম শুনেই আনন্দের সব আনন্দ তিরোহিত। গাবড়ে গিয়ে তার পায়ে জড়িয়ে ধরে বলল, মাফ কইরা দেন স্যার। আর কোনদিন এমন করুম না।
সাহেব কোন কথা শুনতে রাজি নয়। পকেট থেকে একটা দড়ি বের করে তার হাত বাধতে শুরু করলে। আনন্দ বলল, স্যার, আপনেরে কিছু টেকা দেই, আমারে কেম্পে নিবেন না।
ঠিক আছে। একশ টাকা নিয়ে আয়। আমি এখানে অপেক্ষা করছি।
আনন্দ তীর বেগে ছুটল। মাথায় আগুন জ্বলছে। টাকা কোথায় পায়! কার কাছে টাকা আছে! যে কোন কিছুর বিনিময়ে! নিজের ঘরে এক টাকাও নেই। নগত টাকা কার হাতে আছে! রাজনগরের রশিদের কাছে টাকা থাকে। এক দৌড় রশিদের ওখানে গিয়ে হাজির। রশিদ ভাই, আমার দুটা গরু, যে গরুটা আপনের পছন্দ সেই গরুটা নিয়ে আমাকে কিছু টেখা দেন। আমার বিপদ। এখনি দরকার। কি দরকার সে কথা সে কিছুতেই খুলে বলতে পারে না। আমি পরে বলব আপনাকে। এখন টাকা দেন। আমার জান বাচুক আগে।
রশিদ ভাইর কাছে তখন মাত্র ষাট টাকা আছে। তাই দিয়ে সে একটা গরু বিক্রি করে টাকা নিয়ে এসে হাজির। ইপিআর সাহেব কাঁঠাল গাছের নীচে বসে বিলের অপর পাড়ে, রাঙ্গামাটির মেঠো পথটা যেখানে পাহাড়ের উপরে চলে গেছে তার দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। আনন্দ এল নিরানন্দ নিয়ে। স্যার, মাত্র ষাট টেখা জোগার করতে পারছি। এই নিয়া আমারে মাফ কইরা দেন!
ঠিক আছে এখন ষাট টাকাই দে। বাকি চল্লিশ টাকা কাল যোগাড় করে রাখিস। আমি এসে নিয়ে যাব।
চন্ডিদ্বার বাজারে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। বাড়ী গিয়ে দেখি মানুষ ভর্তি। সবাই আমার অপেক্ষা করছে। এর একটা বিহিত করতে হবে। এবং আমাকেই। কারণ আমি এখানকার ভবিষ্যত কর্তা। এখনই সব হাতে নিতে হবে। আমি কসবা বাজার এমন কি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া পর্যন্ত গেছি। ওখানকার কোর্টকাছারি দেখেছি। আমি সব পারব। সবাই আমার অপেক্ষা করছে।  আনন্দ সুবিচার চায়। এবং তা করতে পারি আমি। আমি মেট্রিক দিয়েছি। অনেক কিছু জানি। এখন আমি ছাড়া এর একটা বিহিত কেউ করতে পারবেনা। এমন কেউ নেই।
রাজনগরের রশিদভাই বলল, তুমি কি করবা তাড়াতাড়ি কর। হিন্দু বইলা তার গরু বেইচ্চা টাকা নিয়া যাবে ? এর কি কোন বিচার নাই ? আমরা সবাই জানি আনন্দ কত ভাল মানুষ। ইন্ডিয়ায় তো কত মানুষেই যায়। তার জন্য আনন্দ টাকা দিবে কিরে ? চল, আমরা সবাই মিল্লা কেম্প যাই। আমরা তো কথা বলতে পারি না। তুমি সব বলবা।
কেম্পে যেতে হবে! এই ইপিআর কেম্পটা হয়েছে প্রায় চার বছর। নদীর উত্তর পাড়ে। নোয়ামুরার কিছু হিন্দুর কাঁঠাল বাগান আর বাড়াই গ্রামের হায়দার আলীর কিছু বাগান নিয়ে। অবশ্য জায়গার দাম সরকার ন্যায্য মূল্য প্রদান করেছে। কিন্তু এই কেম্পকে সবাই ভয় পায়। নামে কাঁঠাল বাগান হলেও সেসব জায়গা ছিল গভীর জঙ্গল। মুরার উপরে আম জাম কাঁঠাল গাছ। নীচে লুঙ্গা এবং নদীর তীর পর্যন্ত কাটাবন ঝোপঝাড়ে ভর্তি। উদবিড়াল, খাটাস, বাগডাস, শিয়াল ইত্যাদি বন্য জন্তু ভর্তি। প্রথম যখন এখানে একটা তাবু খাটায় তখন ইপিআর এর লোক ছিল দশবার জন। এই দশ বারজন দিয়ে এত গহীন জঙ্গল পরিষ্কার করা কিছুতেই সম্ভব নয। তাই আশে পাশে যখন যাকে পেয়েছে তাকে দিয়েই তারা কাজ করিয়েছে। ইপিআর এর সবাই পাঞ্জাবী। দু একজন হয়ত বাঙালী আছে। কিন্তু বাংলা বলে না। তাদের ভাষা গ্রামের অনেকেই বুঝে না। বুঝাতেও পারে না। ধারে কাছে পেলেই গরুর মত খাটায়। অবশ্য খাবার দেয়। এর মধ্যে মান্যগন্য ব্যক্তিরাও বাদ পড়েননি। এখন সেসব জঙ্গল আর নেই। মানুষ দিয়ে যখন তখন কাজ করায় না। দুর্বল হলে চলবে না। এতগুলো মানুষ আমার অপেক্ষা করছে। পরিস্থিতি মানুষকে দুর্বল করে, আবার সাহসি করে তোলে। আমার পেছনে এতগুলো লোক, বললাম, চল।
চল বলে দলের নেতা সেজে মুরার উচু নিচু রাঙ্গামাটির পায়ে চলার পথ ধরে চলছি। অন্ধকার। কিছুই দেখা যায়। অনুমান করে পা ফেলছে সবাই। তাতে হাটা কোন অসুবিধা হচ্ছে না। ভাবছি কি বলব, কোন ভাষায়। উর্দু তো জানি না। ইংরেজি? কোনদিন ইংরেজিতে কথা বলিনি। কিভাবে কি বলব। আবার কোন কাজে লাগিয়ে দেবে না তো! ওরা ইংরেজি জানে কিনা তাও জানি না। বুক দুরু দুরু করছে। সাহস হারালে চলবে না।
এই অন্যায়ের বিচার করতেই হবে।
এপ্রিল মাস। ঢলের পানি বুরো জমি প্রায় তলিয়ে যায় যায়। নদী পেরিয়ে কেম্পের পথ ধরে উপরে উঠলাম। আমি নেতা। সকলের আগে। মুরার উপরে উঠতেই ওপাশ থেকে একটা গভীর চিৎকার, হল্ট! সাথে সাথে সর্চের আলো এসে পড়ল। আমিও চিৎকার করে বললাম, উই ওয়ান্ট টু টক টু হাবিলদার। বলে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমাদের দলটা এই কথাটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমাকে প্রয়োজন ছিল। একজন ইপিআর এগিয়ে এল। সর্চ জ্বেলে দলের সবাইকে দেখল। আবার জিজ্ঞেস করল, কেয়া বাত ?
উই ওয়ান্ট টু টক টু দ্যা হাবিলদার।
কিউ ?
ইপিআর টুক হিজ মানি বলে আনন্দকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম।
চল মেরা পিছে।
দলের সবাই তার পেছনে চলছি। উর্দু তাহলে কিছু বোঝা যায়। খুব কঠিন বলে মনে হল না। কিছু বাংলা আর কিছু উর্দু মিলিয়ে দিলেই হল।
হাবিলদারের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল আমরা লিলিপুট। বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে তাকে বুঝাতে সক্ষম হলাম। সে আমার কথা খুব মন যোগ দিয়ে শুনে আদেশ দিল। একটু পরে সব ইপিআর এসে লাইন ধরে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, কৌন হ্যায় ইসমে ?
আমি তো দেখিনি কোন ইপিআর আনন্দের টাকা নিয়েছে। আনন্দ ছাড়া আর কোন সাক্ষিও নেই। আনন্দকে বললাম এখন তুমি চিনিয়ে দাও কে টাকা নিয়েছে।
আনন্দ সবাইকে ভাল করে দেখে বলল, না এদের মাঝে কেউ না।
আমি হাবিলদারকে বললাম হি ইজ নট হেয়ার। 
ঠিক হ্যায়,  তুম আভি চলা যাও। হাম কাল দ্যাখাঙে।
আমরা চলে এলাম।
সারা পথ আমার প্রশংসা। এমনভাবে বলতে পেরেছি! বিচার হোক বা না হোক, বলতে তো পেরেছি। এটাই আসল কথা। বিচার কি হয় পরে দেখা যাবে।
আইয়ুব খানের আমল। ইপিআর এর বিরুদ্ধে নালিশ! এত বড় বুকের পাটা কার? আমার। আমি এ গ্রামের এক মাত্র লেখাপড়া জানা লোক। যদিও সাইজে এখনও বালক। রাতারাতি কথাটা ছড়িয়ে গেল চারদিক। শক্ত হাতে ধরেছে। বিচার একটা হবেই। রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেক কথা মনে হল। মানুষের এত প্রশংসা! পরে কি হবে কে জানে ! হয়ত আমাকে নিয়েই টানাটানি চলবে। কারণ আনন্দের হয়ে আমিই তো কথা বলেছি। তারপর লিখিত দিয়ে সই করেছি। কি জানি কি হবে! যা হবার হবেই। এখন আর পিছিয়ে যাওয়া চলবে না।
যা ভেবেছিলাম তই হল। ঘুম থেকে উঠেই দেখি সেই গাছের মত লম্বা হাবিলদার ঘরের দরজায়। তার পেছনে হাত বাধা একজন নিরীহ গোছের মানুষ। আমাদের উত্তর পাড়ার হাশেমের মত চেহারা। আমি সামনে গিয়ে দাড়াতেই হাবিলদার জিজ্ঞেস করল, ইয়ে আদমি ? আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। আমি তো দেখিনি। বললাম, আনন্দকে নিয়ে আসি বলে এক দৌড়ে আনন্দের বাড়ী গিয়ে নিয়ে এলাম। আনন্দ এসে দেখে বলল, হ্যা, এই লোক।
চল মেরা সাথ। আনন্দের দিকে তাকিয়ে বলল, তুম ভি চল।
দুজনেই গাবড়ে গেলাম।  কোথায়! কেন ? এখন আর ফেরা যাবে না। কাপড় পড়ে রওয়ানা দিলাম হাবিলদারের সাথে।
হাবিলদারের সাথে হাটছি আর ভাবছি এখন আসামী কে ? আমি না আনন্দ নাকি ঐ ইপিআরটা। রেল গাড়ীতে করে আখাউড়া। সব খরচ হাবিলদারের। আখাউড়া গিয়ে হাবিলদার আমাকে নিয়ে গেল প্লাটফরমের ভিতরে একটা রেষ্টুরেন্টে। বলল, তুম যো কুচ ভি খাও, হাম পয়সা দেয়েগা। এতক্ষনে বুঝলাম আমি আসামী নই। সে নিজেও খেল। ইচ্ছে মত অনেক কিছু খেলাম। কিন্তু আনন্দকে সে কিছু দিল না।
এবার রওয়ানা দিল পায়ে হেটে। আখাউড়া রেল ষ্টেশনের পশ্চিম দিকে নৌকা ঘাটে। একটা নৌকা নিয়ে পৌঁছল একটা ছোট দ্বীপে। রেল ষ্টেশনের পশ্চিম দিকে তিতাস নদীর পশ্চিম পাড়ে একটা দালান। চারদিকে নীচ জমি। একদিকে নদী। একটু বৃষ্টিতেই দ্বীপ হয়ে যায়। সুদিনে পায়ে চলা পথ হয়। এটা নাকি ইপিআর হেড কোয়ার্টার।
পৃথিবীতে অনেক কিছু আছে বাইরে থেকে কিছুই বুঝা যায় না। এই হেড কোয়ার্টারও তেমনি। হাবিলদার নামতেই সেলুট শুরু হল। আবার হাবিলদারও সেলুট দিচ্ছে যখন তখন। আমরা যেন গর্ভনর বা জেনারেল। সেলুট নিচ্ছি। এর ভেতর এত বড় বাড়ী, এত কামড়া, এত মানুষ! এত ঝকঝকে তকতকে! এত নিয়ম কানুন! বাইরে থেকে কিছুই বুঝা যায় না। একটা বড় ঘর। বিরাট টেবিল। চারদিকে অনেক চেয়ার সাজানো। হাবিলদার আমাকে একটা চেয়ারে বসতে বলে সে দাঁড়িয়ে রইল। আনন্দকে বাইরে দাঁড়াতে বলল। আমি টেবিল চেয়ার দেখছি। টেবিল এত পরিষ্কার যে উপরের লাইটগুলো মনে হচ্ছে টেবিল থেকে ছড়াচ্ছে। এক মিনিটের মধ্যে একজন বোধ হয় বড় সাহেব এসে ঢুকলেন। হাবিলদার বড় করে একটা সেলুট দিল। সাহেব এসেই জিজ্ঞেস করল, ইয়ে আদমি ? হাবিলদার উত্তরে কি বলল ঠিক বুঝতে পারলাম না। আঙ্গুল দিয়ে বাইরে দাঁড়ানো আনন্দকে দেখিয়ে দিল। সাহেব আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে  জিজ্ঞেস করল, তুম খোদ দেখা ?
আমি ঘাবড়ে গেলাম। মনে মনে বললাম এখন ঘাবড়ালে চলবে না। সাহস রাখতে হবে। শুকনো মুখে উত্তর দিলাম,নো, আই ডিড নট সি। আই কেইম টু হেলপ হিম, বিকজ হি ডাস নট নু উর্দু অর ইংলিশ।
তারপর আমি কি করি জেনে সে খুব খুশি হল বলে মনে হল। কারণ সে জিজ্ঞেস করল, হাউ ওল্ডার আর ইউ ?
তখন বাজে বেলা একটা। সাহেব উঠে গেল। হাবিলদারকে বলল গেল খানা লাগাও।
আমি এখন গভর্নর। তিনজন খানসামা খাবার পরিবেশন করছে। হাবিলদার দাঁড়িয়ে তদারকি করছে। সব আনার পর হাবিলদার বসল। ইপিআর-এর খানা। রুটিও যে সুখাদ্য হতে পারে এই প্রথম দেখলাম। জানতাম যারা গরীব তারাই রুটি খায়। ইপিআর যে রুটি খায় তা গরীবরাও খায়। তফাত শুধু কি দিয়ে খায়, কিভা্েব পরিবেশন হয়। আস্ত মাসকলাই ডাল সেদ্ব, একটা মাংশ বুনা, একটা সালাদ সব শেষে পায়েস জাতিয় কি একটা। আগে কোথায়ও দেখিনি।
যে লোকগুলো খাবার পরিবেশন করছে তাদের একজন খুব কাছে এসে কানে কানে বলল, আপনি বাঙ্গালি হয়ে আর একজন বাঙ্গালির চাকরি খাচ্ছেন কেন? সাক্ষি দিচ্ছেন কেন ?
আরে! এযে বাংলায় কথা বলে! বললাম, না আমি তো সাক্ষি নই। এখানে কোন সাক্ষী নেই। আমি এসেছি বুঝিয়ে কথাটা বলতে।
আপনি না আসলেই তো হয়। এই লোকটা বেঁচে যায়। বাঙালি হয়ে বাঙালির ক্ষতি কেউ করে ?
যার জন্য এসেছি সেও তো বাঙালি।
সেত হিন্দু! তার জন্য এত দরদ কেন ?
সে যে আমার প্রতিবেশি। আমার নিজের লোক।
ওপাশ থেকে হাবিলদার কি যেন বলল। কথা আর বাড়তে পারলনা।
এবার ফেরার পালা। আবার নৌকা, রেলগাড়ি, নৌকা। হাবিলদার নিজে বাড়ী পৌঁছে দিয়ে কেম্পে গেল। চারদিকে একটা হৈ চৈ পড়ে গেল। বিরাট ব্যাপার। হাবিলদার পর্যন্ত সমীহ করে। সব খরচ দিয়ে নিয়ে গেছে। পরের গল্প কাহিনী আমাকে বলতে হয়নি। আনন্দই যথেষ্ট। কতগুলি গেইট পেরিয়ে, বহু সেলুট নিয়ে কিভাবে আমাকে সম্মান দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় এমনি অনেক কাহিনী। আমি নায়ক। গল্পকার আনন্দ। এমন কি আনন্দ যখন ক্ষেতে কাজ করে তখনও কিছু শ্রোতা আলে বসে গল্প শুনে।

-২১-

সয়দাবাদ আনুবুর বাড়ীতে বেড়াতে গেছি। মে মাস। জোয়ারের পানি যেন খালি কাঁচ। পানির অনেক নীচে বালুকণা পরিষ্কার দেখা যায়। তিনলাখপীরের পুলের নীচে বাইলা মাছ নতুন পানি কাদামাটির সাথে লেপটে পড়ে আছে। যেন বিশ্রাম নিচ্ছে। ছাতির ঢাসার তৈরি চল দিয়ে সে মাছ ধরতে কি মজা। বুবুর দেবর মনার সাথে ধরছি। ডুলি প্রায় অর্ধেক। এমন সময় জহির এসে হাজির। সে এদিক দিয়ে যাচ্ছিল বাড়ী। চন্ডিদ্বার স্কুলে থেকে এসেছে। পরিক্ষার ফল নিয়ে। খালি হাতে। আজ ফল বেরিয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আরে তুমি যে এখানে! ফল বেরিয়েছে জান না ? স্কুলে তো অনেক কান্নাকাটি আবার হাসি আনন্দ চলছে। আর তুমি এখানে মাছ ধরছ! যাও, বাড়ী যাও। পাশ করেছ।
আপনার কি খরব ?
নাহ, হল না। আর একবার শেষ চেষ্টা সাবসিডিয়ারি।
জহির তাহের দু চাচাত ভাই। আনুবুর ভাসুর। তাহের আট দশ বছর চেষ্টার পর ইতি দিয়েছে। কিন্তু জহির আশা ছাড়েনি। শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। মনে কোন কষ্ট আছে বলে মনে হয়নি। গুন গুন গান গাইতে গাইতে বাড়ীর দিকে চলে গেল। বাড়ীতে কেউ জিজ্ঞেসও করবে না সে পাশ করেছে কিনা। সবাই জানে স্কুলে যায়। কবে কি পরিক্ষা তার খবর কেউ রাখে না, জানেও না। কাজেই জবাবদিহি করতে হবে না। তার যখন যা দরকার তা পায়। বিনা প্রশ্নে।
মনাকে বললাম, তুমি আরও মাছ ধর। আমি বুবুকে জানিয়ে বাড়ী চলে যাব। ওদের বাড়ীতে গিয়ে বুবুকে পরিক্ষার খবরটা দিলাম। বুবু খুশিতে বাড়ীর সবাইকে দিল খবরটা। জহিরের দাদিকে খবরটা দিতেই মনে হল যেন কেউটে সাপ ফণা ধরেছে। তোমার ভাই কবে কি পরিক্ষা দিল ? তাইলে জহিরের কি অইল ? ও তো সব সময পরিক্ষা দেয়। তার খবর কি ? জহির কইরে! জহিরের বাপ কইরে ! অনেক দিন ধইয়া তো পরিক্ষা পাশের খবর শুনিনা। তাইলে কি শুধু টেকা পয়সা নষ্ট করার জন্য স্কুলে যায় ? তার চেচামেচিতে অনেকেই এসে হাজির। জহির তাহের সবাই। এখন কি বলে সামাল দেবে!
আমার দিকে চোখ টিপে জহির বলল, দাদি আমার পরিক্ষা তো আগামী বছর। এ বছর পরিক্ষা ছিল না। তোমারে পাশের কথা কি কমু ? এই বছর আমার পরিক্ষা নাই। শুনে সবাই শান্ত হল। শুধু তাহের মুছকি হাসল।
বেলা প্রায় শেষ। বাড়ী পৌঁছে দেখি আবহাওয়া অনুকূলে। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে। বাড়ীর সামনে গ্রামের অনেকেই হাজির। কয়েকটা হুকা হাত বদল হচ্ছে। হুকার তো অভাব নেই। আমাদের বাড়ীতেই তিনজনের তিনটা হুকা। যে মেজ চাচা কোনদিন আমার দিকে ভাল করে তাকাননি, ধমক ছাড়া কথা বলেননি, যখন তখন শাস্তি দিয়ে আনন্দ পেতেন, তিনিই এই জলসার হোতা। খুশিতে ডগমগ করছেন। আমাকে দেখে কয়েকজন এক সাথে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, খবর শুনছ ত ?
হ্যা, শুনছি। জহির বলল। তাই চলে এলাম। ফুলু চাচা এবারও পাশ করলনা। এ নিয়ে অনেকের অনেক মন্তব্য। দাদা ফুলু চাচাকে এত সব ভিটামিন আর টনিক খাইয়েছে যে চাচার মাথাটা নষ্ট করে দিয়েছে। টনিকে যে কাজ হয়না ফুলু চাচা তার প্রমান। ইত্যাদি অনেক গল্প চলল। আমি এক ফাকে সোজা চলে গেলাম বড় চাচার ওখানে। গিয়ে দেখি ওজু করে ঘরে ঢুকছেন। পায়ে নিজের তৈরি খড়ম। খবরটা দিতেই তিনি হাত তোলে দোয়া করলেন। বললেন, অখন থাইকা আমার ছুটি। আর বিচার করতে অইবনা। বলে হেসে ফেললেন।
সবদিকেই যেন একটা খুশির জোযার বইছে। বিশেষ করে আমাদের বাড়ীতে। আর চিন্তা নেই। হিসাব শেষ। এই পাশটার জন্য দশটা বছর সবাই অপেক্ষা করে আসছে। এবার আমিই সব করব। কিন্তু কি করব ? এখন আমার করার কি আছে। পাশ তো করলাম, তারপর কি ? কোথায় যেতে হবে! কি করতে হবে! আমার জীবনের উদ্দেশ্য কি ? কিছু নেই। শুধু টাকা কামাই করা, আর এই মিছিলের দেখাশুনা করা। কিন্তু কি দিয়ে? কোথায় টাকা ? কিভাবে পাওয়া যায় ? চাকরি ? কোথায় চাকরি ?
বহু আলাপ আলোচনা চলল। খবর শুনে বড় দুলা ভাই এসেছেন। তিনিই পরামর্শ দিলেন, চল কুমিল্লা যাই। আমার চাচা উকিল। তিনি ঠিক বুদ্ধি দিতে পারবেন।
আমার মামা আছেন, জোর নেই। মামার বাড়ীর অনেকেই আছেন বড় চাকরি করেন। তাদের কাছ থেকে অনেক সাহায্য পাওয়ার কথা ছিল পাশের আগে। এখন খোজ নেই। অতীতে তারা কারও কোন উপকার করেনি। তাহলে দুবরাজ চাচার কাছে যাওয়া যায়। তিনি এখন কুমিল্লা শহরে নিজের বাড়ীতে। তাঁর দু ছেলে ঢাকায় ভাল চাকরিতে নিয়োজিত। তারা একটা ব্যবস্থা করে দেবেই ইত্যাদি অনেক আলোচনা হল।
পাশ করলেও যে এত ঝামেলা কে জানত! এখন বাড়ী ছেড়ে বিদেশ যেতে হবে! এ্যা! এই আজন্ম চেনা পরিচিত পরিবেশ আপনজন ছেড়ে পাড়ি দিতে হবে অন্য কোন খানে ? কুমিল্লা শহর কতদূর! সেই তো বিদেশ। চন্ডিদ্বার, কসবা আরও দুরের বাজার কুটি ছাড়িয়ে বহু বহুদূর কুমিল্লা শহর। এত দূরে যেতে হবে!

-২২-

কুমিল্লা নিয়ে গেলেন বড় দুলা ভাই তার চাচার ওখানে। চাচা তাঁর মহুরি শের আলীকে যখন জিজ্ঞেস করলেন, দেখ তো আমার এই ভাতিজার জন্য একটা লজিং এর ব্যবস্থা করা যায় কিনা তখন শের আলী আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষন। তারপর বললেন, আমার নিজের বাচ্চাদের জন্য এমন একজন ছোট্ট মাষ্টার খুজছিলাম। কিন্তু আমার এখানে থাকার জায়গা নেই। চাচা বললেন, কোন অসুবিধে নেই। আমার এখানে এসে রাতে থাকবে। সেভাবেই ব্যবস্থা হল।
শের আলির বাসা বাগিচাগাও।  সাত বছরের একটি মেয়ে আর নয় বছরের একটি ছেলেকে পড়াতে হবে। জীবনের মেরাথন চলল। গাংপাড় থেকে বাগিচাগাও। প্রতিদিন দুবার। পুলিশ লাইনের পাশ দিয়ে যখন সকালে যাই দেখি পুলিশ মার্চ করছে। আমিও করি। গাংপাড়-বাগিচাগা।
চাচা বুদ্ধি দিলেন। তাড়াতাড়ি চাকরি পেতে হলে টাইপ শিখতে হবে। মোগলটুলি টাইপরাইটার কলেজে ভর্তি করে দিলেন দুলাভাই নিজে। আর পরিচয় করিয়ে দিলেন দুলাভাইর মামাত ভাই মোতাহেরের সাথে। বাড়ী শালঘর। আমি টাইপ শিখছি। মোতাহের বিএ পড়ে। ভিক্টোরিয়া কলেজে।  থাকে নান্নারদিঘি। লজিং। দুজন বেয়াই। প্রতিদিন দেখা হয় কান্দিরপাড়ে। আড্ডা দেই তার চাচা এডভোকেট আমির হোসেনের বাড়ীতে। কোর্টের পশ্চিম দিকে।
উঠতে বসতে আমার ভুল। মোতাহের শুধরে দেয়। এভাবে কথা বলতে হয়, এভাবে হাটতে হয়, এটা করা যাবে না, ওটা দেখতে ভাল নয়। এভাবে কাপড় পড়তে হয়। এ ধরনের কাপড় চলে না। এখন এটা অচল, ওটা চলে। আমি যেন তার কাছে একটা পুতুল। একবারে গেয়ো। অজপাড়াগাঁ থেকে এসেছি। তার গ্রাম অনেক উন্নত। অনেক কিছু জানে। কলেজে পড়ে আরও শিখেছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে। আমি তার কাছে একটা অশিক্ষিত ক্ষেত। কিন্তু সে বিরক্ত হয় না। আমাকে ঢেলে সাজাচ্ছে যেন। যেখানে যায় সেখানে নিয়ে যায়। ছুটির দিনে চলে যায় কারও বাসায়। বেশির ভাগ মেয়েদের সাথে তার ভাব। আমি লাজুক, কথা বলতে সাহস পাই না। বিশেষ করে মেয়েদের সাথে তো মুখ খুলতেই পারি না। সে পরিচয় করিয়ে দেয়। মেয়েদের দিকে তাকাতেই পারি না। ওরা হাসে। কেউ বলে কোথা থেকে আমদানি করেছেন ? কোন কোন বাসায় কোন মেয়ের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়। আমার অসহ্য লাগে। ছটফট করি।
আমার মেরাথন গাংপাড় থেকে বাগিচাগাও নিয়ে মোতাহেরের অনেক ভাবনা। দুমাস পরেই সে আর একটা লজিং-এর ব্যবস্থা করে দিল। মোতাহেরের এক ছাত্রীর মাধ্যমে। জেলখানার উত্তর পাশে। ছাত্রীর বান্ধবীকে পড়াতে হবে। মোতাহার বলল, চল আমি সাথে নিয়ে যাই।
পৌঁছলাম লজিং বাড়ীতে। মোতাহেরকে এখানকার অনেকেই চিনে। পাশের বাড়ীতে লজিং ছিল অনেকদিন। নামতেই কয়েকজন এসে কুশলাদি জিজ্ঞেস করল। তারপর পরিচয়ের পালা। লজিং মাষ্টার বাড়ী ছিলেন না। তার স্ত্রী আপ্যায়ন করে বাড়ীর বাইরে একটা ঘরে জিনিষ রাখতে বললেন এবং আমাদেরকে বড় ঘরে আসতে বললেন। আমাদের গ্রামের বাড়ীর মতই বড় ঘর। বেশ বড়। মাঝখানে ঝাঁপ। মানে পার্টিশন। ওপাশে মেয়ে মহল। এপাশে পুরুষ। একটু পরেই কয়েক রকমের বিস্কুট সাজিয়ে ট্রে নিয়ে এলেন গৃহকর্তি নিজে। চেহারাটা দেখতে আমার মামানির মত। দেখলেই শ্রদ্ধা জাগে মনে। যেন ধীরস্থির। কঠিন কোমল। এক নজর তাকিয়েই মাথা নিচু করে বসে আছি।
মোতাহের বলল, আপনাদের মাষ্টার কিন্তু খুব লাজুক। ছেলে মানুষ। ছাত্র খুব তুখোর। পড়ায় ভাল।
এর মাঝে চা নিয়ে এল ছাত্রী নিজে। একটা ছোট্ট সেলাম দিয়ে টেবিলে চায়ের ট্রে রেখে এক পাশে দাঁড়িয়ে রইল। মহিলা  বললেন, এই আমার একমাত্র মেয়ে নাজমা। মেয়েটা একবারে অমনোযোগি। মাষ্টার তো কতই এল গেল। ক্লাশ ফাইভে দুবার ফেল করেছে। আজ দু বছর যাবত ক্লাশ এইটে। মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেল না। লেখাপড়ায় মন নেই। শুধু হৈ চৈ করে বেড়ায়। একবার মুখ না তোলে চোরা চাহনিতে দেখেই চমকে উঠলাম। আরে! এযে নায়িকা!  গায়ের রং উজ্জ্বল। দেখতে ইন্ডিয়ার কোন এক নায়িকার মত। বোধ হয় আমার চেয়ে ইঞ্চি খানেক লম্বা হবে। বয়স আমার কাছকাছিই হবে। শরীরখানা একবারে ঢলঢলে। একমাত্র সন্তান হলে যা হয়। খাইয়ে খাইয়ে শরীর তৈরি করেছে। মনে হয় শরীর থেকে ঘি মাখন এখনি ফোটায় ফোটায় ঝড়ে পড়বে। শরীরই সম্পদ। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল।
আমি একবারে মুসরে পড়েছি। এমন একজন ছাত্রিকে কি পড়াব? কেমন করে কথা বলব! বুক এখন থেকেই দুরু দুরু করছে! তাকাব কি করে!
কুমিল্লা শহরের মেয়েদের সুনাম আছে। আমার গ্রামের তিনজন মুরুব্বি এই শহরে পড়াশুনা করতে এসে কেউ একা ফেরৎ যাননি। পড়াশোনা গুল্লায়। সাথে একজন সাথী নিয়ে ফিরে গেছেন নিজধামে। ঘরের ছেলে ঘরে। আবুল বাসার ভুঞা পাশ করতে পারেননি বা পরিক্ষা দেননি। বিয়ের কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ করে গ্রামের ছেলে গ্রামে ফিরে গেছেন। রাজ্জাক মাষ্টার মেট্রিক পাশ করে কলেজে পড়ার মানসে এসে ফিরে গেছেন মেট্রিক নিয়েই। উপরি জীবন সাথী। শুধু কুদ্দুস মাষ্টার ফিরেছেন আইএ এবং সাথী নিয়ে। এবার কি আমার পালা ? 
একটা পান মুখে দিয়ে এক সময় মোতাহের চলে গেল। বলে গেল এবার তোমার দায়ীত্ব। দিয়ে গেলাম একখান জিনিসের হাতে। নিজে ঠিক থাকলে সব ঠিক। এবার দেখব তোমার লজ্জা যায় কোথায়!
মোতাহের চলে যেতেই নিজকে অসহায় মনে হল। আমি যেন বিপদগ্রস্থ। এতবড় ছাত্রী! এই একটু পরেই সন্ধ্যা হবে আর তিনি আমার কাছে পড়তে আসবেন। কি পড়াব ? আমার মুখ এখনি শুকিয়ে যাচ্ছে! কি করব! চলে যাব গোপনে! কোথায় যাব! যেখান থেকে চলে এসেছি সেখানে তো আর ফেরা যাবে না! এ যেন উল্টানো দুধ। একবার উল্টে গেলে আর ধরা যায় না। ফিরে যাওয়া যাবেনা। সাহস সঞ্চয় করতে হবে! যেন বিপদ এসে গেছে! বিপদের মোকাবেলা করেই জীবনে টিকে থাকতে হবে। যারা মোকাবেল করতে জানে না তারাই হারিয়ে যায়। আপদ বিপদ নিয়েই জীবন!
মাগবেরের আযান শেষ হয়েছে। নামাজ পড়ে সাহস সঞ্চয় করে বসে আছি নাজমার অপেক্ষায়। একটু পরেই নাজমা এল। এক গাদা বই বুকে জড়িয়ে। যেন আজই সব বই শেষ করতে হবে। এক রাত্রে। অদ্য শেষ রজনী। কয় ঘন্টা পড়বে কে জানে! ঘরে ঢুকেই ছোট্ট একটা সালাম দিয়ে সামনে রাখা চেয়ারে বসল। আমার বিছানার পাশে ছোট্ট একটা টেবিল, টেবিলের অপর পাশে একটা হাতলবিহীন চেয়ার। ওটা নাজমার জন্য। আমি বিছানায় বসে একটা বইএর পাতা উল্টাছিলাম। আমার উল্টোদিকে নাজমা, মাঝখানে টেবিল। মুখ না তুলেই সালামের উত্তর দিলাম। আমার ভেতরে ঝড় বইছে! ঝড়ের তান্ডব নৃত্য চলছে! কি কথা দিয়ে শুরু করব! বোধ হয় সুগন্ধি তেল ব্যবহার করে। নাকি কোন আতর! ঘরে ঢুকতেই সমস্ত ঘরটা ম ম করে উঠল! হালকা গোলাপের গন্ধ! চুল খোলা। কোমড় ছাড়িয়ে গেছে। সামান্য বাতাসে দুলছে। তার শরীরের ওজন এই পুরনো চেয়ারখানি বইতে চায়নি। তাই ককিয়ে উঠল। তাতে নাজমার ভ্রুক্ষেপ নেই। সে জানে চেয়ারটা তার ভার বইতে অভ্যস্থ। বইগুলো টেবিলের উপর রেখে আমার দিকে একটা বই বাড়িয়ে দিল।
কে কাকে পড়াবে! নাজমা আমাকে না আমি নাজমাকে। যেভাবে বইটা এগিয়ে দিল মনে হল যেন মৌলভী স্যার আরবীর বইটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলছে, পড়তো এই পৃষ্ঠাটা!
স্যার, ইংরেজি বুঝিনা। মনেও থাকে না। কালকের পড়া ৬২ পৃষ্ঠা। বলে বইর ভেতর রাখা আঙ্গুলটা সরিয়ে বইটা খুলে দিল।
এবার আমার পালা। তাকাতেই হবে। মুখ তুলতেই হল। খুব সাবধানে, যেন হাতে হাত স্পর্শ না করে, সম্মানজনক দূরত্ব রেখে বই হাতে নিলাম। নাজমা মিটি মিটি হাসছে। হাসছে কেন? আমাকে জব্দ করার জন্য! বইর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ছোট ছোট বাক্য, ইংরেজি কর। না, জব্দ করার মত কিছু নেই। নজর একবারে বইর ভেতর। বাক্যের সংযোজনে। নাজমার কথা ভুলে গিয়ে হঠাৎ মুখ দিয়ে বেড়িয়ে গেল, এগুলো একদম সোজা। আরে! আমার যে মুখ ফুটে গেছে! তাহলে কথা বলা যায়! মুখ কাপেনি একটুও। কঠিন বলতে কিছু নেই! তারপর একে একে বাক্য তৈরির কায়দা ইত্যাদি বুঝিয়ে দিতে লাগলাম। নাজমা আমার মুখের দিকে বোকার মত তাকিয়ে আছে। মনে হল আমি কি বলছি তার মাথায় ঢুকছেনা। ঘন্টা দুয়েক পর সেদিনের মত ছুটি।
সেদিন থেকে শিক্ষকতা চলল। সন্ধ্যা থেকে নয়টা পর্যন্ত। ঠিক সময়ে আসে এবং আগামি দিনের পড়া কি তা আমাকে দেখায়। সব দেখে আমি পড়ার আদেশ দেই। কতক্ষন পড়ে। তারপরই শুরু করে অন্য আলাপ। এমন ভাবে একটা গল্প শুরু করে তা শেষ করতে অনেকক্ষন চলে যায়। তারপর আর একটা শুরু করে। প্রথম প্রথম এ চালাকিটা বুঝতে পারিনি। এখানে গল্প শুনতে বা  বলতে বসিনি। আগের শিক্ষকদের কথা মনে হল। নিশ্চয়ই তারা গল্প খুব পছন্দ করতেন। দুএক দিন যেতেই এসব গল্প বন্ধ করে দিলাম। বললাম ছুটির পর গল্প শুনব। এখন পড়া আর পড়া।
নাজমাকে খুব বেজার দেখা গেল। দুতিন ঘন্টা সে বোধ হয় কোনদিন পড়েনি। 
আমি রুটিন করে দিলাম। আগামি কালের পড়া শেষ না করা পর্যন্ত ছুটি নেই। দেখা গেল প্রতিদিন আগামিকালের পড়া ছুটির আগেই শেষ হয়ে যায়। কে বলে নাজমা ছাত্রি ভাল নয়!

-২৩-

আট মাস কেটে গেল। টাইপ যা শিখেছি তাতে চাকরির চেষ্টা করা যায়। কুমিল্লা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নত ছিমছাম ছোট্ট শহর। অফিস  আদালত খুব কম। চাকরির সুযোগও কম। চাকরির স্থান হল রাজধানী। ওখানে চাকরির শেষ নেই। হাজার হাজার চাকরি খালি। সমস্ত সুযোগ ওখানে। কলেজের ইনস্ট্রাকটর মাঝে মাঝে এসব গল্প করেন। উপদেশ দেন। জীবন তৈরি করতে হলে রাজধানী ঢাকা উপযুক্ত স্থান।
কয়েকদিন পর তিনি একটা খবর নিয়ে এলেন। পোষ্ট অফিসে একজন টাইপিষ্ট নেবে। খোলা ইন্টারভিউ। তিনি তার কলেজের সবাইকে বললেন। চেষ্টা   করতে তো দোষ নেই। যারা ভাল টাইপ শিখেছে তাদের কয়েকজনের নাম বলে দিলেন। তার মাঝে আমিও একজন।
সকাল দশটায় আমরা ছয়জন গেলাম ইন্টারভিউ দিতে। সবাই ফরম পূরণ করছি আলাদা একটা লম্বা টেবিলে। জমা দিতে যাব এমন সময় ভেতর থেকে একজন এসে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি চাও ?
ইন্টারভিউ দিতে এসেছি।
তুমি কি মেট্রিক পাশ ? টাইপ জান ?
জি, মেট্রিক পাশ, টাইপ শিখেছি।
দেখি তোমার সার্টিফিকেট বা কপি।
মেট্রিকের সার্টিফিকেট বা তার কপি ছিল না। শশীবাবুর হাতে লেখা একখান চরিত্রগত সার্টিফিকেট ছিল। তাতে আমার সবকিছুই প্রায় উল্লেখ ছিল। ভদ্রলোক বয়সটা গুনে বললেন, তোমার তো বয়স হয়নি। এখানে আঠারর কমে ইন্টারভিউ নেয়া হয় না। তুমি যেতে পার।
উপায় নেই। আইন মানতে হবে। সবাই মানে। সরকারের আইন। আমান্যকারির শাস্তি হয়। আমাকেও মানতে হল।
আমাদের ইনষ্ট্রাক্টরের কথাই ঠিক। চাকরি পেতে হলে ঢাকা যেতে হবে। আমরা তিনজন ঠিক করলাম চলে যাব ঢাকা।
নাজমার পরিক্ষা শেষ। আমার ঢাকা যাওয়া প্রায় ঠিক। নাজমার পরিক্ষার ফল রেরোনু পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। ফল রেরিয়েছে। নাজমা ক্লাশে ২য় স্থান অধিকার করেছে। বাড়ীতে আনন্দের ঢেউ! এমন মাষ্টার আর কোথা মিলবে! এ শুধু মাষ্টারের কৃত্তিত্ব! স্কুলে এ নিয়ে অনেক কথা। এ কি করে সম্ভব! যে মেয়ে দু দবার ফেল করেছে সে কিভাবে ২য় স্থান অধিকার করে! এই এলাকাটা শহরতলি। অনেকটা গ্রামের মত। পাড়ার একে অপরের সাথে হৃদ্যতা। নাজমার ফলাফলের খবরটা পাড়ায় ছড়িয়ে গেল। কোন কোন অভিভাবক আমার সাথে দেখা করে জানতে চায় নাজমার এত উন্নতির কারন কি? আমি বললাম, এত একদম সোজা। পরের দিনের পড়াটা আগের দিন পড়ে নিলেই হয়। এই ব্যবস্থা চালু রাখলে ছাত্র ছাত্রি ভাল ফলাফল করবেই।
আমার ঢাকা যাবার কথাটা নাজমার মাকে বলেছি। সেদিন  তিনি খুব করে বললেন, ঢাকা না গেলে কেমন হয়? বললাম আমার একটা চাকরির প্রয়োজন। তাই ঢাকা যেতে হবে। রাতে নাজমার বাবা আমার কাছে এলেন। তিনি চাকরি করেন এডুকেশন বোর্ডে। আমার সাথে অনেক কথা বললেন। তার ফাকে আমার সবকিছু জেনে নিলেন। সবশেষে বললেন, আমি আমার উপরওয়ালার সাথে কথা বলব। তোমার একটা ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখি। চাকরির ব্যবস্থা হলেই তো আর ঢাকা যেতে হবে না।
আমি খুব খুশি হয়ে বললাম, অবশ্যই না।
নাজমা এখন নবম শ্রেনিতে। বইর লিষ্ট না পাওয়া পর্যন্ত ছুটি। পড়া নেই। কিন্তু সে আগের নিয়মেই আসে। এখন শুধু গল্প। স্যার, এখন তো আর বলতে পারবেন না আগে পড়া শেষ করতে হবে। এখন তো পড়া নাই। গল্প করতে মানা নাই বলে শুরু করে দেয় গল্প। তার কোন বা›ধবী শিক্ষকের সাথে ভাব করেছিল, তার ফলাফল, এখন কোন বান্ধবী কোথায় কার সাথে ভাব বিনিময় করছে এসব গল্প। আমি শুনে যাই। কোন মন্তব্য করিনা। জিজ্ঞেস করি পরিক্ষায় ভাল রেজাল্ট করে তুমি কি অনুভব করছ?
খুব মজা স্যার! পরিক্ষায় ভাল করলে যে এত মজা তা আগে বুঝিনি। আপনি খুব ভাল মানুষ স্যার। এ পাড়ার অনেকেই এখন আপনাকে তাদের ছেলেমেয়ের মাষ্টার করে নিতে চায়। আপনাকে এখানে রাখার জন্য আব্বা তো অনেক চেষ্টা করছে। আপনি চলে গেলে আমি আবার আগের মত হয়ে যাব। যেভাবেই হোক আপনি থেকে যান স্যার। 
পড়ার সময় গল্প বলা বন্ধ করলেই পরিক্ষায় ভাল করবে। আমার থাকা লাগবেনা।
কুমিল্লা আর ঢাকার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। নাজমার বাবা কোন ব্যবস্থা করতে পারবে? না হলে ঢাকা। ঢাকা কোথায় কে জানে? এমনি সব অদ্ভুদ চিন্তায় ঘুম আসছেনা। রাত গভীর। দরজায় ধাক্কা। কে ? জিজ্ঞেস করতেই নুরুল্লার গলা শোনা গেল। খুলেন।
নুরুল্লা দুটা বাড়ী পর একটা বাড়ীতে লজিং থাকে। সামনের মসিজেদের মোয়াজ্জেন। বয়স পঁচিশের কাছাকাছি। মুখে দাড়ি, মাথায় সব সময় টুপি থাকে। সাদা লম্বা কোর্তা পরে। মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েই তার সাথে আলাপ। সে নিজে থেকেই যেচে আলাপ করেছে। আলাপ থেকে বন্ধুত্ব। নামাজের পর অনেক আলাপ হয় আমাদের মাঝে। বেশির ভাগই হাদিস কোরানের কথা। মসজিদে মানুষ মানত পাঠায়। নুরুল্লা মাঝে মাঝে আমার জন্য তবারুক নিয়ে আসে।
দরজা খুলতেই নুরুল্লা ভেতরে এসে বলল, বাসায় হঠাৎ করে অনেক মেহমান এসে গেছে। আমার বিছানায়ও তিনজন। তাই চলে এলাম। আপনার সাথে রাতটা কাটিয়ে দিব।
আমার বিছানা একজনের। দুজন খুব কষ্ট করে থাকা যায়। এভাবে ঘুমের অভ্যেস আমার নেই। ছোটবেলা থেকে বাবার পাশে আলাদা ঘুমের অভ্যেস। ছোট্ট একটা খাট। না ওটাকে খাট বলা যাবে না। চওড়া আম কাঠের দুটো তক্ত দিয়ে বানানো। অবশ্য বড় চাচার বানানো  চারটা পায়া আছে। সেই আমার বিছানা। তারপর যেখানেই গেছি এক বিছানায় অন্যের সাথে কোনদিন ঘুমাইনি। ভাবলাম নুরুল্লা বিপদে পড়ে এসেছে। এত রাতে। না বলি কি করে। এক রাতের ব্যাপারইতো! বললাম, ঠিক আছে। আপনার যদিও কষ্ট হবে। এক রাত কোন রকমে কাটিয়ে দেয়া যাবে।
শুবার সাথে সাথেই নুরুল্লা ঘুমিয়ে পড়ল। আমার ঘুম কোথায় উদাও হয়ে গেছে। ঘুম আনার যত রকম চেষ্টা সব করে যাচ্ছি। সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে রাজকন্যা উদ্ধার করা থেকে রূপবান পর্যন্ত ভাবতে ভাবতে কখন চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমার গায়ের উপর নুরুল্লার একটা পা, একটা হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাছে টানছে। এমনিতেই মাঝখানে ফাঁকা জায়গা নেই, তারপর আরও কাছে টানার মানে কি ? মনে হল নুরুল্লা অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। কোন খেয়াল নেই। আমি আস্তে করে তার পা সরিয়ে দিলাম। হাতটা সরাতে গিয়ে মনে হল খুব শক্ত হয়ে আছে। জোড় করে সরিয়ে বিছানার একবার শেষ মাথায় নিজকে ঘুটিয়ে নিয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম।
আবার নুরুল্লার পা আমার কোমড়ে। চোখ খুলে দেখি তার লুঙ্গি উপরে। সে বিবস্ত্র। একটা হাত আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। এবার আমি উঠে বসলাম। ধাক্কা দিয়ে তার ঘুম ভাঙ্গাতে চেষ্টা করলাম। ভাঙ্গেনা। এমন গভীর ঘুমে সে অচেতন যে এত জোড়ে ধাক্কা দিয়েও ভাঙাতে পারছিনা। আরও জোড়ে ধাক্কা দিলে একটা গো গো আওয়াজ করে নীচে পড়ে গেল। আরে পড়েই গেলাম, ঘুম জড়িত কণ্ঠে বলতেই বললাম,এক্ষনি বেরিয়ে যাও বলছি! না হয় চিৎকার করে মানুষ জড়ো করব!
চোরের মন দুর্বল থাকে। কথা বের হয় না। তারা তখন কানে শোনেনা। বয়রা হয়ে যায়। আরও কয়েকটা গালি দিলাম। মনে হল তার কানে যায়নি।  নীরবে বেরিয়ে গেল।
নুরুল্লা মসজিদের খেদমত করে। সব সময় সাফ সুতরো রাখে। প্রতি ওয়াক্ত নামাজের সময় আজান দেয়। বড় হুজুরের অনুপস্থিতিতে সে মানুষকে উপদেশ দেয়। কত রকমের হাদিস, সুন্নত ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে! হঠাৎ তার কি হল! আজ রাতে কোন সুন্নত তার মাথায় এসেছে কে জানে!
তারপর থেকে নুরুল্লার সাথে দেখা হলে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। যেন আমাকে চেনেইনা। মসজিদে নামাজের পর সে বেরিয়ে আসত। বাইরে রাস্তায় এসে আমার সাথে অনেকক্ষন কথা বলত। এখন মসজিদের কাজে এমন ব্যস্ত থাকে যে সামান্য সময় নেই কোনদিকে তাকাবার। মসজিদের ধোয়া মুছার কাজ এখন বেড়ে গেছে। নুরুল্লা ব্যস্ত হয়ে গেছে।

-২৪-

নাজমার বাবা অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। তার হাতে কোন ক্ষমতা নেই। যাদের হাতে ক্ষমতা তারা সাধারন নন, অসাধারন। সব কিছুতেই তারা সাধারনের উর্ধে।
এখন উপায়! নাজমার বাবা তো কিছু করতে পারল না। আমাকে উন্নতি করতে হবে। আমাকে টাকা রোজগার করতে হবে। যেখানেই হোক, যেভাবেই হোক।  টাকাই উন্নতির মাপকাঠি।  যার যত টাকা সে তত উন্নত।
নাজমার মা'কে আমি খালাম্মা বলে ডাকি। 
সেদিন বললাম, খালাম্মা, আমি কাল চলে যাব। এখন বাড়ি যাব, তারপর ঢাকা যাব। আপনাদের এখানে অনেক দিন ছিলাম। আপনাদের ব্যবহারে আমি খুবই খুশি। আর হয়ত দেখা হবেনা।
শুনে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষন। তারপর বললেন,  আমরা তো তোমাকে আটকে রাখতে পারব না। রাখবও না, তোমার একটা ভবিষ্যত আছে। কালই কি যেতে হবে?
বললাম, ঠিক করেছি কালই যাব। যত তাড়াতাড়ি যাব ততই ভাল।
আচ্ছা যাও, থাকতে বলব না। শুধু নাজমাটার জন্য আমাদের যত ভাবনা। কোন মাষ্টারইতো তাকে পড়াতে পারেনি। কোনবারই কোন পরিক্ষায় সে ভাল ফল করেনি। তুমি যা করেছ তা তার জীবনকে বদলে দিয়েছে। নাজমা এখন নিজেই পড়ার প্রতি মন দিয়েছে। তা হয়েছে শুধু তোমার শিক্ষার নিয়মে। তুমি যে নিয়মে পড়িয়েছ এখন নাজমা নিজেই সে নিয়ম মেনে চলতে চেষ্টা করছে। তোমার গুনের কথা আমাদের পাড়ার সবাইর মুখে মুখে, ঘরে ঘরে। তুমি চলে গেলে জানিনা নাজমা তোমার নিয়ম মেনে চলবে কিনা। 
পরের দিন সকালে নাজমা বলল, স্যার নাস্তা দিয়েছি, আসুন। 
নাস্তার টেবিলে বসে আমি থ হয়ে গেলাম। অন্য দিনের মত ভাজি, ডাল, আটার রুটি বা পাউরুটি এসব কিছু নয়। টেবিল ভরে আছে অনেকগুলো বাটি। নাজমা সব ঢাকনা খুলে বলছে, এটা পরটা, এটা আলু ভাজি, এটা মুরগী বোনা, এটা পোলাও, আর এটা হল আপনার আদরের কবুতরের বাচ্চা। কোনটা আগে দিব?
বললাম, সকাল বেলায় এত কিছু খাওয়া যায়? এত আয়োজনের কি প্রয়োজন ছিল?
খালাম্মা ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, এমন কিছু করিনি বাবা, তোমাকে কোনদিন ভাল একটু খাবার দিতে পারিনি। ভেবেও দেখিনি। আজ তুমি চলে যাবে দেখে একটা হিসেব করলাম। দেখলাম আমি মায়ের কাজটুকু ঠিকভাবে পালন করিনি। আজ এই সামান্য খাবার প্রস্তুত করেছি। যা পার খাও।
নাজমা বলল, সবকিছু থেকেই খেতে হবে বলে চামচ হাতে দাড়িয়ে রইল।
বিদায়ের এমন আয়োজন! এ যেন নিজের ছেলে বিদেশ বিভুইএ যাবে, তাকে মনের মত করে খাওয়াতে হবে। খাওয়ার পাট শেষ করে একটা রিক্সা ডাকলাম। খালাম্মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সম্বল আমার তোষক আর বালিশটা রিক্সায় তোললাম। নাজমা আমার পাশে পাশেই ছিল। আমি রিক্সায় উঠে বললাম, বিদায়  নাজমা। মন দিয়ে লেখাপড়া করবে। যে নিয়ম শিখিয়েছি তা মেনে চলবে। 
কোন কথা না বলে নাজমা লাফ দিয়ে আমার পাশে রিক্সায় উঠে বসল। আমার গায়ের সাথে তার গা স্পর্শ করতেই আমি শিহরিত হয়ে উঠলাম। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি উঠছ কেন? বলল, আমি ষ্টেশন পর্যন্ত যাব। আপনাকে বিদায় দিয়ে বাসায় ফিরব। 
বললাম, না তোমার যেতে হবে না। আবার একা ফিরতে হবে তোমার। 
কেন, আমি তো একাই স্কুলে যাই। তখন তো কিছু বলেন নাই। আমি যাব।
খালাম্মা দরজায় দাড়িয়ে দেখছিলেন। বললেন, ও যেতে চায় যাক না বাবা। 
আমি চুপ করে গেলাম।
রিক্সা চলল। অনেক ক্ষন কেউ কোন কথা বলতে পারলাম না। এক সময় আমি বললাম, তুমি ত খুব বুদ্বিমতি। লেখাপড়ায় মন দিলে খুব ভাল করতে পার। পড়ার সময় গল্প না করে পড়ায় মন দিবে। তাহলেই ভাল করতে পার। এর প্রমান পেয়েছ। এবার তুমি ক্লাশে ২য় স্থান দখল করেছ। আগামীতে ১ম স্থান অধিকার করতে হবে এই প্রতিজ্ঞা কর। 
কয়েক মুহুর্ত চুপ করে থেকে হঠাত বলে উঠল, ‘করলাম’, বলে সে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল। আমি বোকা হয়ে গেলাম। কি হল! খারাপ কিছু বললাম নাকি! কান্না থামিয়ে নাজমা বলে উঠল, স্যার, পড়ার কথা শুনতে আর ভাল লাগেনা। অন্য কথা বলুন।  আমাকে চুপ থাকতে হল। অনেক ক্ষন চুপ করে থেকে এক সময় আমার অজান্তেই একটা হাত নাজমার হাতের উপর চলে গেল। বিদ্যুতপ্রবাহের মত একটা শিহরন অনুভব করলাম। একজন অনাতœীয় মহিলার হাতে হাত রাখা জীবনে এই প্রথম। কি বলে তাকে শান্ত্বনা দিব ভাষা খুজে পাচ্ছি না। নাজমা বলল, স্যার আপনি খুব ভাল মানুষ। আগের স্যারগুলির মত না। আপনার শয়তানি বুদ্বি নাই। ঢাকা গেলে কোথায় থাকবেন? আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখবেন। আম্মা আপনার খুব প্রসংসা করেন। যোগাযোগ রাখলে আম্মা খুব খুশি হবেন। মনে মনে বললাম আম্মা খুশি হবে, তুমি না।  রিক্সা স্টেশনের দরজায়  এসে থামল। আমি নেমে বললাম, তোমার নামতে হবেনা, ভিতরে তো যেতে পারবে না। বরং এই রিক্সাতেই ফিরে যাও।
নাজমা বলল, না, আমি আর একটা রিক্সা নিয়ে যাব। কোন চিন্তা করতে হবে না। বলে নেমে পড়ল। আমি ষ্টেশনের দরজায় দাড়ালাম। নাজমা আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি অন্যদিকে মুখ করে কিছুক্ষন দাড়িয়ে রইলাম। কোন ভাষা খুজে পাচ্ছিনা। কি বলে বিদায় ভাষন দিব! আমার জানা নেই। কিন্তু কিছু বলতে ইচ্ছে হয়। নাজমাও চুপ করে আছে। এক সময়  বললাম, আচ্ছা আসি। তোমাদের কথা মনে থাকবে। তুমি মন দিয়ে লেখাপড়া করবে। নিয়ম মেনে চলবে। তাহলেই পরিক্ষায় ভাল করবে।
নাজমা কাদো কাদো ভাবে বলল, স্যার, লেখাপড়া ছাড়া আপনার আর কোন কথা নাই? বলে তার উড়নাটা মুখে চেপে ধরল।
আমি ভেতরে যেতে যেতে বললাম, আছে। সে তো অনেক কথা! বলে ভেতরে চলে গেলাম।
গাড়ি চলছে। গাড়ির দরজায় দাড়িয়ে দেখলাম নাজমার একটা হাত নড়া চড়া করছে, মনে হল ওই হাতটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। 

-২৫-

ফিরে এলাম বাড়ী। ঢাকা যাবার প্রস্তুতি নেবার জন্য
ঢাকা গেলে কোথায় থাকব, কিভাবে যাব ? ট্রেনে ভাড়া লাগবে পাঁচশিকে। হাতে কিছু টাকা থাকা দরকার। মামাত বোন ছুফিয়া থাকে কাওরান বাজার।  তাদের কাপড়ের দোকান আছে। দুলাভাই ব্যবসায়ী। অনেক পরামর্শের পর স্থির হল ওখানেই গিয়ে আপাততঃ উঠব। আমার কিছু টাকার প্রয়োজন। টাকার দাম এখন কত! যোগার হচ্ছে না। স্কুলে সারদা বাবু প্রায়ই বলতেন, তোমার দাদার খাজনা দেবার জন্য আমাদের যেতে হত। তিনি জানতেন না তার কত সম্পত্তি আছে, খাজনা কত দিতে হবে। খাজনা দিতে গিয়ে অনেক জমি আবিস্কার হত। সেই দাদার সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগ। অনেক। এখন নেই। কর্ম করলেই ফল আসে। কর্মফলই মানুষকে মানুষ/অমানুষ করে তোলে। যাদের নিজেদের উপর আতœবিশ্বাস নেই তারা দুর্বল, অসহায়। আমার ভাইদের আতœবিশ্বাস নেই। কর্ম করেনি, ফল শূন্য। বাবার হিসেবে গড়মিল। এখন আধাঁর ঘরের বাতি আমি।
শেষ পর্যন্ত তিন টাকা নিয়ে রওয়ানা দিলাম। রাজধানী ঢাকা। সেখানে শুধু টাকা আর টাকা! কোন রকমে গিয়ে পৌঁছতে পারলেই হল। আকাশে বাতাসে টাকা। শুরু হল জীবনের অঙ্ক। তিন টাকার অঙ্ক। খরচ না করে কিভাবে যক্ষের মত বাঁচানো যায়। ঢাকার টিকেট এক টাকা চার আনা। থার্ড ক্লাশ। স্কুলে মাঝে মাঝে দল বেঁধে বেড়াতে যেতাম। টিকেট ছাড়া। সুলেমান ছিল লিডার। সে জানে কোন দিক দিয়ে গেলে টিকেট চেকারের সামনে পড়বেনা। সকলের কাছ থেকে পয়সা নিত টিকেটের কথা বলে। সে টাকা অবশ্য খরচ হত আমাদের জন্যই। হোটেলে খেয়ে।
সম্বল আমার তোষক আর বালিশটা নিয়ে মেঠো পথ দিয়ে চলছি। পথ সংক্ষেপ করার জন্য মালেকের মা’র বড়ই গাছের নীচে দিয়ে, আলীমদের বাড়ীর ভেতর দিয়ে, মনছুরের গোয়ালঘরের পেছন দিয়ে চলছি। গোয়াল ঘরে বেড়া নেই। সামনে গোবরের গাদা, মাছি ভন ভন করছে। ডানদিকে মাঠের পর স্কুল।। সব ছাড়িয়ে গ্রামের ভিতর দিয়ে গোপিনাথপুরের গোদারা পেরিয়ে ইমামবাড়ী স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। ঢাকার যাত্রী।
স্টেশনে দাঁড়িয়ে অঙ্ক করছি। টিকেট এক টাকা চার আনা। বাকী থাকবে এক টাকা বার আনা। যথেষ্ট। আবার পরিবর্তন। আচ্ছা সোলেমানের পথ ধরলে কেমন হয়! তাহলে পুরো টাকাই থেকে যায়। ঢাকা কোনদিন যাইনি। কোন দিক দিয়ে বের হতে হয় কিছুই জানিনা। ধরা পড়লে জরিমানা। নাহ, টিকেট ফাকি দেয়া যাবে না! কয়েকবার মত পরিবর্তন হল। একবার হ্যা,  একবার না। শেষ পর্যন্ত সোলেমানের জয়। চড়ে বসলাম গাড়ীতে। দেখা যাক কি হয়! দশটার ট্রেন। তখন বাজে বারটা। আমাকে যেতে হবে। উন্নতির জন্য, আরও দূরে।
বারটার ট্রেন তিনটায় এসে গেল। হুড়োহুড়ি করে উঠে পারলাম। 
ট্রেনটার একটা বিশেষত্ব আছে। একবারে নিরীহ গোছের। রহমতের বাবা রুছমত খার মত। ক্ষেতের আইল ধরে যখন হাটে তখন উল্টোদিক থেকে কেউ আসলে রুছমত খা পথ ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ায়। লোক চলে গেলে আবার হাটতে শুরু করে। এই ট্রেনটাও ঠিক তেমনি। অন্য ট্রেন আসলে পথ ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ায়। মনে হয় অনেক শ্রান্ত। সেই চট্টগ্রাম থেকে রওয়ানা দিয়েছে। প্রত্যেক ষ্ট্রেশনে থেমে থেমে।
এই দীর্ঘ পথের অভিজ্ঞতা কম নয়। প্রতিটি ষ্টেশনে কত ফেরিওয়ালা, কত ভিক্ষুক, ঔষধের বিক্রেতা আর সাহায্যের বাক্স হাতে মৌলভিরা। আখাউড়া ষ্টেশনে এক ভিক্ষুকের একজন সহকারি াাছে। সহকারির কাধে হাত রেখে চলছে,  সে অন্ধ। দুজনে সুর করে ভিক্ষার গান গাইছে। কেউ আসে গজল গাইতে গাইতে। কেউ দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে। কেউ যখন একটা পয়সা বাসনে ফেলে, ঝন করে আওয়াজ হতেই দোয়ার ভান্ডার খুলে যায়। আল্লাহ আপনার সব মকসুদ পুরা করুক, বান্দাকে যে সাহায্য করছে তারে আল্লা সাহায্য করুক। আমার মনে প্রশ্ন এল, যে ভিক্ষুক দোয়া করছে অন্যের জন্য, সে দোয়াটা সে নিজের জন্য করে না কেন ? তাহলেই তো তার আর ভিক্ষা করতে হয় না! সে দোয়া করে অন্যের জন্য, নিজে ভিক্ষা পাবার জন্য। সবকিছুই একটা দেয়া নেয়া আছে।
ভৈরব এসে গাড়িটা থেমে রইল প্রায় এক ঘন্টা। এখানে ভিক্ষুকের চেয়ে আলেম বেশি। একটু পর পর আসছে তারা। একজন এল জবরদস্ত আলেম। দেখলেই সমীহ করতে ইচ্ছে হয়। পায়ের পাতা পর্যন্ত লম্বা কোর্তা, সফেদ সাদা, চাপ দাড়ি, মাথায় সাদা টুপি। মনে হয় পৃথিবীর অন্য কাজ করার ইচ্ছে নেই। শুধু আল্লাহর কাজ। হাতে একটা বাক্স। তাতে তালা লাগানো। চুরের কি আখেরাতের কোন চিন্তা নেই! কারা চুরি করে, বাইরের লোক? বাক্সটা তো হুজুরের হাতেই আছে। তাহলে তালার প্রয়োজনটা কি ? হুজুরের হাত থেকে কে নেবে ? ছিনতাই তো হয় না! ছিনতাই হলে তো তালা রক্ষা করতে পারবে না।
হুজুর বলছেন, ঐ যে দেখুন মসজিদখানা অর্ধেক হয়ে পড়ে আছে। টাকার জন্য শেষ করা যাচ্ছে না। আপনাদের দানেই বাকী কাজ শেষ করতে হবে। যেদিকে আঙ্গুল গেল সেদিকে অনেকেই তাকাল। হ্যা, ষ্টেশনের দক্ষিন দিকে একটা দালানের কাজ চলছে দেখা যাচ্ছে। অনেক বাঁশ কাঠ লাগানো আছে। দেখলাম অনেকেই ছওয়াব কেনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দান বাক্সে সিকি আধুলি টাকা পড়তে লাগল। হুজুর সবার জন্য এমন সব দোয়া পড়লেন যে ভবিষ্যতে তাদের আর কোন চিন্তা নেই। দুনিয়াতে এবং আখেরাতে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। সে ছিল ১৯৬৩ সাল। প্রতি বছর কতবার বাড়ী আসি যাই তার ঠিক নেই। প্রতিবারই এই হুজুর বা তার সহকারির সাথে মোলাকাত হয়। একই বাক্য। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সে সমজিদ শেষ হয়নি। কবে শেষ হবে হুজুররা জানেন।
যাক ট্রেনের কথা বলছিলাম। এমনি করে বিশ্রাম নিয়ে, পথ ছেড়ে দিয়ে সন্ধ্যা সাতটায় গিয়ে পৌঁছল রাজধানী ঢাকা শহরে। এই দীর্ঘ সময়ে টিকেট চেকারের সাক্ষাৎ মেলেনি।
আমাকে নামতে হবে তেজগাঁ ষ্টেশনে। মামা বলে দিয়েছেন কয়েক মিনিট হাটলেই কাওরান বাজার। ২২৭ নং। কাপড়েরর দোকান।
তেজগাঁ ষ্টেশন আসতেই ভেতরটা কেপে উঠল। চোরের মন পুলিশ পুলিশ। এই বুঝি চেকার এসে গেল। গাড়ী থামতেই আমি নেমে পড়লাম। হাতে বেডিংটা। কোনদিকে বের হবার পথ ? একটু দাঁড়িয়ে চারদিকটা দেখে নিলাম। মেইন গেইট একটাই। উত্তর দিকেও কিছু মানুষ যাচ্ছে। একজন চেকার চেক করছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবছি কি করব! জিজ্ঞেস করলে বলব টিকেট নেই। তাহলে ফাইন করবে ? দিয়ে দেব। এমনি ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষন কেটে গেল। বেশ ফাঁকা হয়ে গেছে ষ্টেশন। আর  একটু অপেক্ষা করে দেখি। আস্তে আস্তে সব মানুষ চলে গেল। টিকেট চেকারও। একদম ফাঁকা। সোজা বেরিয়ে চলে এলাম। কোন ঝামেলাই হয়নি। বাইরে এসে হাফ ছাড়লাম। বেঁচে গেল একটা টাকা চার আনা। নেট প্রফিট।
এবার গন্তব্য স্থল। হাটতে হাটতে এক সময় কাপড়েরর দোকান পেয়ে গেলাম। দুলাভাই গদির উপর বসে আছেন। একজন কর্মচারি আছে। দুজন খদ্দের। লুঙ্গি দাম করছে। আমি সালাম দিতেই দুলাভাই মুখ তোলে তাকিয়ে ওয়ালাইকুম সালাম বললেন। কখন আইলা বলে আমার হাতে বেডিংটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি উত্তর দেবার আগেই আবার প্রশ্ন, তুমি কি এখন বাড়ী থাইকা আইলা ?
জি।
যাও, বেডিংটা পেছনে রাইখা আস। তারপর বাড়ীঘরের কথা, আÍীয়স্বজনের খবরাখবর নিলেন ক্রেতার সাথে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে। নয়টায় দোকান বন্ধ করে। আমি বসে আছি। কখন নয়টা বাজবে, দোকান বন্ধ হলে বাসায় যাব। নিজকে খুব শ্রান্ত মনে হচ্ছে। পেটে কিছুই নেই।
সাড়ে আটটা বাজতেই দুলাভাই বললেন, তোমার বোনের শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। বাসায় থাকার জায়গা নেই, আজ বোধ হয় রান্নাও হয় নাই। তুমি তো খুব ক্ষুধার্ত। এই পাশের হোটেল থেকে খেয়ে এস।
আচ্ছা, বলে উঠে দাঁড়ালাম। একটু অপেক্ষা করলাম। আর কিছু বলে কিনা, বা খাওয়ার জন্য টাকা দিয়ে দেয় কিনা। তিনি বোধ হয় আমার মনে ভাব আচ করতে পেরেছেন। বললেন, এই হোটেলে খুব ভাল খাওয়ায়, দাম সস্তা। যাও খেয়ে এস।
আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম হোটেলের দিকে। একটা দোকান পরেই হোটেল। গিয়ে খাবারের অর্ডার  দিলাম। কি খেয়েছিলাম মনে নেই। তবে বিল দেবার সময় চার আনা চলে গেল।
নয়টার সময় দোকানের ঝাপ ফেলে দুলাভাই বললেন, তুমি আজ রাতটা এই গদিতেই ঘুমাও। কাল সকালে মাতু মামার ওখানে পাঠিয়ে দেব। ঢাকা শহরের নিয়ম কানুন জানা নেই। হয়ত বা ভাল হবে বলেই এই ব্যবস্থা। তিনি চলে গেলেন। আমি বাধ্য ছেলের মত শুয়ে পড়লাম। সাথে সাথে অঘোর ঘুম।

-২৬-

সকালে ঘুম ভাঙল দুলাভাইর ডাকে। তিনি একটা রিক্সা ঠিক করে রেখেছেন। মিটফোর্ড রোড। হাসপাতালের সামনে, ওবাইদি ফার্মেসী। মাতু মামা সেখানে কাজ করেন। অনেক দিন। এখন বাজে আটটা। এত সকালে মাতু মামা কি দোকানে থাকবে ? দুলা ভাই বলল, ফার্মেসী আটটার সময় খোলে। কোন অসুবিধা হবে না। আর রিক্সাকে চার আনা দিয়ে দিও। রিক্সাকে বলে দিলেন সাবধানে চালাতে এবং ঠিক জায়গায় নামিয়ে দিতে।
রিক্সা চলছে ধীর গতিতে। বসন্তের ঝির ঝিরে হাওয়া। তাও আবার রাজধানী ঢাকা শহরের হাওয়া। যেখানে টাকা উড়ে, মানুষ উড়ে, পাখি উড়ে, আমিও যেন উড়ে চলেছি। মামার কাছে। অবশ্যই মামার কাছে যাবার ইচ্ছে ছিল পরে। কারণ মামা বড় চাকরি করেন না। তাছাড়া তিনি মায়ের আপন ভাইও নন। মায়ের ভাই একজনই। তিনি থাকেন গ্রামের বাড়ীতে। এখন মাতু মামাই যেন আপন মনে হচ্ছে। পথের দুপাশে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছি। সবকিছুই নতুন অদ্ভুদ। এখানেই জীবন শুরু করতে হবে আর উন্নতির শেষ ধাপে পৌঁছতে হবে। এখানেই জীবনের শেষ গন্তব্যস্থান। গেড়ে বসতে হবে। যেভাবেই হোক। রিক্সা থামল। বলল, এই যে সাব, এই ঠিকানা। উপরে সাইন বোর্ড, ওবায়েদি ফার্মেসী। আমি রিক্সা থেকে নেমে পকেট থেকে একটা সিকি বের করে দিলাম। বেডিংটা তোলতে যাব, ‘এত সকালে কইত্থে আইলা’ শুনেই মুখ তোলে দেখি মামা দাঁড়িয়ে।
কাওরান বাজার থেকে এলাম। কাল এসে পৌঁছেছি।
থাক, বেডিং নামাতে হবে না। তিনি রুস্তম বলে একজনকে ডাক দিতেই একটা লোক এসে হাজির। মামা বললেন, স্যার আইসা দেখলে খুব রাগ করবে। তার আগেই তুমি একে ইসলামপুরের লাইব্রেরীতে দিয়ে আস। রিক্সাওয়ালাকে বললেন, ৩০২ ইসলামপুর নিয়ে যাও। আমাকে বললেন, রিক্সাকে দুই আনা দিয়ে দিও।
আবার উঠে বসলাম রিক্সায়। এখন দুজন। রুস্তম এখানে কাজ করে। সব রকমের। যেখানে যাচ্ছি রুস্তম চিনে। এটা আলম সাহেবের লাইব্রেরী মানে বইর দোকান। আলম সাহেব পিএমজির সুপারিনটেন্ডেন্ট। অনেক মানুষের চাকরি দিয়েছে। তার নিজের আপনজনকে। মামার গ্রামের। সম্পর্কে মামাত ভাই। তাঁর কাছে যাব মামার চিঠি নিয়ে। কিন্তু এখন যেখানে যাচ্ছি সেখানে তো যাবার কথা নয়! দোকানে! কাওরানবাজারে বাসায় যেতে পারলাম না, বুবুর সাথে দেখা হল না! বুবু কি ভাববে! এখানে মাতু মামার ওখানে বসতে পারলামনা, যেখানে যাচ্ছি সেখানে কি দাঁড়াতে দেবে ? সবাই তো আমার আপন পরিচিতিজন! আমার পয়সা দিয়ে আমাকে সাহায্য করছে! একজনও আমাকে জিজ্ঞেস করলনা আমার কাছে পয়সা আছে কিনা! আমি কি একটা বিপদ! একটা কুফা ? এখনও কাটেনি! নাকি ঢাকা শহরের এইই নিয়ম! টনকি মামার বাড়ীতে গেলে এই লোকগুলোর মুখ দিয়ে তো মিষ্টি বের হয়! কত মিষ্টি! মেট্রিকটা পাশ করে নাও, চাকরির অসুবিধে হবে না! বজলু মামা কাননগো। তিনি তো কথা দিয়েই রেখেছেন। কিন্তু এখন নাকি চাকরি খালি নাই। খালি হলেই আমাকে ডাকবে। মাকে বলে দিয়েছে। কিছু একটা বলতে হয়, তাই বলা!
ইসলামপুর দোকানের ভেতর ঢুকে দেখি ইদন বসে আছে একটা চেয়ারে। তিনদিকে আলমারি ভর্তি বই। আমাকে দেখেই খুশি হয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, আরে তুমি ! এত সকালে কইত্থে আইলা ? রুস্তম বলল, স্যারে পাঠাইছে এইখানে থাকনের লাইগ্যা। বিকালে ব্যবস্থা করবে। এখন এইখানে থাকবে। ইদন বলল, ভালই অইল, বেডিংটা পেছনে রাইখা আস। পেছনে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। দোকানের পেছনে এমন ব্যবস্থা থাকে! বেশ বড় কামড়া। দুদিকে দুটা বিছানা। মনে হল এখানে কেউ রাতে ঘুমায়। আমার জায়গা হবে কি ? পেছনের দরজার বাইরে বেশ কিছু  খালি জায়গা। দুএকটা কি গাছ আছে। ফুল নেই। আমার বেডিং রেখে সামনে এসে একটা টুলে বসলাম। রুস্তম চলে গেছে। দেরী করা নিষেধ।
ইদন আমার চেয়ে বয়সে পাঁচ/ছয় বছরের বড়। টনকি মামার বাড়ীর পূর্ব পাড়ায় বাড়ী। খুব ভাল ডাংটেং খেলে। আমি, জসীম, আওয়াল, শাহ আলম সবাই মিলেও তাকে মাত করা যায় না। মনে হল একটা পরম বন্ধু পেয়ে গেছি।
ইদন বলল, তুমি সাহেবের সাথে দেখা করবানা ?  অফিসে দেখা করা নিষেধ। বাসায় দেখা করতে হলে আগে অনুমতি লাগে। সাব বলতে আলম সাহেবকে বুঝায়। টনকির সাব বাড়ী মানে আলম সাহেবের বাড়ী। এই দোকানের মালিক আলম সাহেব। ইদন বলল, তোমার তো চাকরির দরকার, দেখা কর। আর কয়েক মাস পরেই তো পিএমজিতে দরখাস্ত নেয়া শুরু হবে। বললাম, মামার একটা চিঠি আছে। নিয়ে দেখা খরব। সেই জন্য তো এসেছি।
পেছনে কারা থাকে জিজ্ঞেস করায় ইদন জানাল এখন এখানে টুনু ভাই থাকে। ছোট চাকরি করে বলে ভাড়ায় থাকতে পারে না। আর আমি থাকি। মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে মেহমান আসলে এখানে থাকে। যেসব মেহমান বাসায় থাকার বা খাওয়ার উপযুক্ত নয়, তাদেরকে এখানে থাকতে দেয়া হয়। তুমি নাস্তা করেছ ?
না এখনও কিছু খাইনি।
আমিও কিছু খাইনি। তুমি বস, আমি পাশের দোকান থেকে কয়েকটা ডালপুরী নিয়ে আসি। বলে সে বেরিয়ে গেল।
এখানে থাকার ব্যবস্থা আছে, খাওয়ার ব্যবস্থা নিজের। ডালপুরী খেয়ে ইদনের সাথে গল্প করে কাটল সকালটা। দুপুরে পাশের দোকান থেকে আবার চার আনা দিয়ে খেতে হল। অবশ্য ইদন চেয়েছিল পয়সাটা সে দেবে। এত পয়সা ইদনের দেবার ক্ষমতা নেই। সে যে কাজ করে তাতে তার খরচের পর খুব সামান্যই সঞ্চয় থাকে। তার মাকে পাঠাতে হয়।
বিকেলে মাতুমামা খবর পাঠাল দেখা করার জন্য। দোকানে গিয়ে পৌঁছতেই তিনি বললেন, ডাক্তার সাহেব যতক্ষন থাকে কারো সাথে কথা বলি না। তোমার একটা থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। এই পাশের ডাক্তার রশিদের ওখানে। একজন কম্পাউন্ডার দরকার। তার কম্পাউন্ডার দেশে গেছে আজ চার মাস। এক মাসের কথা বলে। বোধ হয় আর আসবেনা। তাই তার একজন কম্পাউন্ডার প্রয়োজন। তোমার কথা বলতেই তিনি রাজি হয়ে গেলেন। তোমার ভাগ্য ভাল। অতি সহজেই একটা ব্যবস্থা হয়ে গেল। এখনই তোমার বিছানাপত্র নিয়ে চল আস। তিনি তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
যাদের পকেট খালি তাদের কোন পছন্দ থাকে না। আমার এখন কিছু বলার নেই। আমার জীবনের উদ্দেশ্য কি ? কি করতে এসেছি এখানে ? এসব ভাববার সময় নেই। বিশেষ করে এ দুদিনে যা দেখেছি তাতে মনে হয় কোন আতœীয়ের কাছেই আমার স্থান হবে না। ছিলাম কুফা। এখন হয়েছি আপদ। সবাই আপদ দূর করতে চায়। মাতু মামা তার সাধ্যমত একটা ব্যবস্থা করেছে। হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। আপাতত দাঁড়াবার ব্যবস্থা হোক। তারপর দেখা যাবে কম্পাউন্ডারি জিনিষ কি! এর বাউন্ডারি কত ? হেরে গেলে চলবেনা। আমাকে কিছু একটা করতে হবে।
মামা সাথে নিয়ে গেলেন। বললেন, ডাক্তার সাহেব এই দিয়ে গেলাম। একটু শিখিয়ে নেবেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কম্পাউন্ডারের বিরাট ভবিষ্যত। মন দিয়ে  শিখলে বেশি দিন লাগে না।
ডাক্তার সাহেব আমার সাথে কথা বলে খুব খুশি হলেন। বিশেষ করে আমার দেহের সাইজ দেখে। বললেন, গ্রামের ছেলেরা তো এত কম বয়সে স্কুলে যায় না। তোমাকে তো বামন বলেও মনে হয় না। তাহলে কত বয়সে তুমি স্কুল শুরু করলে ? তারপর সব দেখিয়ে দিলেন। ফার্মেসির পেছনেই থাকার ব্যবস্থা। আগের কম্পাউন্ডার মুজাফফর এখানেই থাকত। দুটা বড় আকারের আলমারি মাঝামাঝি রেখে পেছনের দিকটা আলাদা করা হয়েছে। ঔষধ তৈরি করার জন্য একটা লম্বা টেবিল। একটা রেকে  অনেক রকমের ঔষধের শিশি বোতল। তারপর একটা কামড়া। এক পাশে ছোট একটা চৌকি। এখনও বিছানা আছে। কামড়া থেকে পেছন দিকে বের হবার দরজা। দরজার পাশেই বাথরুম। দরজা দিয়ে বের হলে ডান পাশে একটা সরকারি পানির কল। তারপর বেশ একটু জায়গা খোলা। লাগোয়া সব দালানের দরজা। দোতলার বাসিন্দারাও এই কল থেকে জল নেয়। সব বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, এখন বাসায় চল। তোমাকে পরিচয় করিয়ে দিই। খেয়েদেয়ে চলে আসবে।
আমার পরনে পায়জামা, গায়ে সার্ট। পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। এখানে সব বেমানান। বাসায় ঢুকেই তিনি ডাকলেন, কইগো এদিকে এসে দেখে যাও। মুজাফরের বদলে একজন পেয়েছি। সাথে সাথে এক মহিলা বের হয়ে আসলেন। যেন সিনেমার নায়িকা। ফিনফিনে শাড়ী পরনে। খোলা চুল। যেন এইমাত্র সাজঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। বোধ হয় বেড়াতে যাবেন বা বেড়িয়ে এলেন। ডাক্তার সাহেব বললেন, মাহতাবের ভাগিনা। মনে করোনা অশিক্ষিত।  মেট্রিক পাশ। মনে হল খুব বুদ্ধিমান। কাজটা তাড়াতাড়িই শিখতে পারবে।
এ মেট্রিক পাশ! বল কি! ওর বয়স কত ? ভালইতো হল। তিনি ডাকলেন তার ছেলেমেয়েদের। এই দেখ কে এসেছে ? আমাকে বলল এই হল আমার ছেলে শামিম, ক্লাশ সিক্সে। তার ছোট হল এই মেয়ে শাহিন, ক্লাশ ফোরে আর সবার ছোট নাহিন, ক্লাশ ওয়ানে। মনে হয় তোমার দলের লোক পেয়ে গেলে।
সবাই এক সাথে চেচিয়ে উঠল, আমাদেরকে পড়াবেন ?
না, দোকানে কাজ করবে। তোমাদের তো মাষ্টার আছেই।
রাতে সবাই এক টেবিলে বসে খাওয়াদাওয়া শেষ করে ফার্মেসীতে চলে এলাম। কথা হল প্রতিদিন দুপুরে আর রাতে এখানে এসে খেয়ে যাব। সকালে নাস্তা হয় না। নাস্তা নিজেই ব্যবস্থা করতে হবে। আমার বিখ্যাত তোষকটা মুজাফফরের বিছানার উপর বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। একটা বিছানা পাতার জায়গা হল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরের পেছনের কল থেকে এক বালতি পানি আনতে হবে। গোসল করার জন্য। ঘরে একটা বড় বালতি আছে। পানি আনতে দরজা খুলে দেখি বেশ বড় লাইন। এই পনের বিশটা দালানের সব বাসিন্দারা এখান থেকে পানি নেয়। লাইনে দাঁড়াতেই হল। প্রায় আধ ঘন্টা। পানি নিয়ে ঘরে আসতেই এল ঝাড়–দার। ঘর পরিষ্কার করে চলে যেতেই আমি গোসল শেষ করলাম।
দোকানটা ঠিক মিটফোর্ড  রোডের উপর নয়। একটা গলির ভেতর। নামটা মনে নেই। দোকানের ঠিক উল্টোদিকে একটা রেষ্টুরেন্ট। ওখানে থেকে এক আনা দিয়ে ডালপুরী খেলাম দুটা। তারপর দোকানের দরজা খুলে বসে রইলাম আদেশ মত।
ডাক্তার সাহেব এলেন বেলা দশটায়। শুরু হল প্রশিক্ষন। কিভাবে মিক্সায় তৈরি করতে হয়, কোন ঔষধ কোন খানে এসব দেখিয়ে  দিচ্ছেন। দরদ দিয়ে। নিজের প্রয়োজনে। সডি বাই কার্ব, টিঙ্কচার কাডকো, টিঙ্কচার ব্রোমাইড ইত্যাদি শিশিতে সাজিয়ে রাখা। এসব মাপার ছোট মেজারিং চামচ আছে। মিক্সার বানাতে একোয়া যোগ করতে হয়। পরিমান কত তা লেখা আছে প্রেসক্রিপশনে।  ওয়াটারকে যে একোয়া বলা হয় তা এই প্রথম জানলাম। প্রথম প্রেশক্রিপশনের মিক্সার তৈরি করে একশ তে একশ নাম্বার পেয়ে গেলাম। ডাক্তার সাহেব খুব খুশি। নিখুঁতভাবে শিশির দাগ কাটা দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তিনি তো জানেন না বাবা যখন রুগির মিক্সার তৈরি করত আমি মাঝে মাঝে পাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম। একবার যা দেখি তা চোখে আটকে থাকে।

-২৭-

ঢাকা এসেছি টাকার জন্য। আমার একটা চাকরির দরকার। এসব কম্পাউন্ডারির জন্য তো এখানে আসিনি। আমার বেশি উন্নতির প্রয়োজন নেই। এখন কি করব, আমার জীবনের উদ্দেশ্য  একটাই। একটা চাকরি। যা দিয়ে নিজের এবং পরিবারের ভরণপোষণ চলবে। কম্পাউন্ডারি করে তো পয়সা মিলবেনা।  যেভাবেই হোক দুবরাজ চাচার চিঠি নিয়ে চিফ কনজারভেটরের সাথে দেখা করতে হবে। আলম সাহেবের সাথে পরে দেখা করলেও চলবে। কারণ পিএমজিতে লোক নোবার আরও সময় আছে। প্রতি বছর খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়। একদিন ডাক্তার সাহেবকে বলে ছুটি নিয়ে যাব মতিঝিল এফআইডিসিতে।
দুদিন পর ডাক্তার সাহেব বললেন, সকাল আটটার দিকে বাসায় চলে এসো। বাজারে যেতে হবে।
কিসের বাজার! কোথায় বাজার! তারা যে গলিতে থাকে তা পুরোটাই তো বাজার! আবার বাজার কি! কথাটা ঠিক পরিষ্কার হল না আমার কাছে। সকাল আটটায় গিয়ে কড়া নাড়লাম। দরজা খুলে দিলেন ডাক্তার সাহেব নিজে। একটা কাগজ হাতে দিয়ে বললেন, এটাতে লেখা আছে কি কি আনতে হবে। কাঁচা বাজার হল এ গলি দিয়ে ডানদিকে গেলে বেচারাম দেউড়ি। ওখানেই বাজার। একটা বেগ এবং পাঁচ টাকা দিয়ে তিনি ভেতরে চলে গেলেন।
বেচারাম দেউরির বাজার খুজে পেতে কষ্ট হল না। অনেক ঘুরে লিষ্ট মিলিয়ে সব বাজার করলাম। বেগ অনেক ভারি হয়ে গেছে। মাছের বাজারে ঘুরে আমার পছন্দ হল চাপিলা মাছ। এত বড় চাপিলা খুব কম দেখেছি। বলা ছিল পছন্দমত মাছ।
বাজারের বেগ নিয়ে বাসায় পৌঁছলাম। বিবি সাহেব এতক্ষনে ঘুম থেকে উঠেছেন। বেগ নিয়ে গেল একটা কাজের মেয়ে। আমি ফিরে যাব,  দরজার কাছে যেতেই বিবি সাহেবের চিৎকার কানে এল, এসব কি মাছ এনেছে ? ছেলেমেয়েরাতো এসব মাছ খেতে পারবেনা! ওরা কি দিয়ে খাবে!
তাইত! ছেলেমেয়েদের কথা তো ভাবিনি আমি! আমার পছন্দ তো এখানে চলবেনা! ভুল হয়ে গেছে! মাছ তো ফেরতও দেয়া যাবে না!
এখন সাবধানে বাজার করি। ছেলেমেয়েদের কথা চিন্তা করে।
ডাক্তার সাহেবের বাসাটা দোকান থেকে দুটা গলি পরে ডারদিকে গলি তস্যগলির ভেতর। যখন খেতে যাই তখন ছেলেমেয়েগুলো এমন হৈ চৈ শুরু করে দেয় যে মনে হয় তাদের খেলার সাথি এসেছে। সবাই খুশিতে নাচতে থাকে। বই ফেলে  চলে আসে কাছে। ডাক্তার সাহেব এবং বিবিসাহেব এগুলো লক্ষ্য করেছেন। একদিন ডাক্তার সাহেব আমাকে বললেন, তুমি প্রতিদিন আটটায় বাসায় চলে যেও। সবাই তোমার কাছে পড়তে চায়। তাই তাদের মাষ্টারকে বিদায় করে দিয়েছি। পারবে তো ওদেরকে পড়াতে ?
হ্যা, পারব।
এখন আমার কাজ সকালে বাজার করা, রাতে ছেলেমেয়েদের পড়ান আর সারাদিন দোকানে কাজ করা। মতিঝিল যাব কবে!
মাসখানেক চলে গেছে। ডাক্তার সাহেবকে বললাম, আমাকে একদিন মতিঝিল যেতে হবে। ছুটি চাই। তিনি খুব বেজারমুখে বললেন, সেখানে কেন ?
একজন লোকের সাথে দেখা করতে হবে। অফিসে।
ঠিক আছে যাও!
আরমেনিটোলা থেকে একটা বাস সোজা মতিঝিলে যায়। পাশের বাড়ীর করিম বলেছে। সে এখানে অনেকদিন। ড্রাইভারি থেকে চাকরের কাজ সব করে। মালিক বড়লোক। বেতন ছাড়াও বকশিশ মিলে অনেক। এ ধরনের আরও কিছু লোকের সাথে পরিচয় হয়েছে। পাশের একতলায় থাকেন মসজিদের মোয়াজ্জেন। কলিমুল্লা। বাড়ী নোয়াখালি। তিনজনে মেস করে। চেহারা দেখলে মনে হয় স্যার সৈয়দ আহাম্মদ। কাচাপাকা দাড়ি। সব সময় পায়জামা পাঞ্জাবী পরে। মেসওয়াক করতে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। টিউবওয়েলের পাশে দাঁড়িয়ে। কাজের মেয়েরা আসে লাইন ধরে পানি নিতে। কলিমুল্লা মেসওয়াক করতেই থাকে। আমার নামের পেছনে মোল্লা দেখে তিনি খুব খুশি। সকালে পানি আনতে গেলে তার সাথে দেখা হয় প্রতিদিন। তার বোধ হয় বেশি পানির প্রয়োজন। মামার দোকানের রুস্তম আসে মাঝে মাঝে। ফাক ফেলেই। বশির থাকে তিনটা দরজা পরে। তার চাচার সাথে। কলেজে পড়ে। বেশ কয়েকজনের সাথে ভাব হয়ে গেছে আমার।
আরমেনিটোলা থেকে বাসে চড়ে মতিঝিল এসে নামলাম। এত বড় বড় দালান! চোখ ধাধিয়ে গেল! দালানের নাম্বার মিলিয়ে মিলিয়ে এগোচ্ছি আর অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছি। এখানেই সব টাকা! উড়ছে কোথায়! আমার পকেট প্রায় শূন্য। নাস্তা খেয়ে না খেয়ে  প্রায় শেষ করে ফেলেছি পুজি। আর মাত্র ছয় আনা আছে। তারপর ? ডাক্তার সাহেবের কাছ থকে চেয়ে নেব ? অনেকক্ষন হাটার পর ঠিকানা মিলেছে।  দক্ষিন পাশে ইপিআইডিসি বিল্ডিং। এ পাশে এফআইডিসি। চার তলায়। একজন লোক বসে আছে দরজার সামনে। লম্বা টেবিলে। সেলাম দিলে বললাম, আমি চিফ করজারভেটের চৌধুরি সাহেবেরে সাথে দেখা করতে চাই।
তিনি তো ছুটিতে। এই ত গতকাল গেছেন। আসবেন দেড় মাস পর। পরে আসেন।
দেড় মাস! কত লম্বা সময়! কবে শেষ হবে! এতদিন আমি কি করব! কম্পাউন্ডারি! উপায় নেই। সময় বসে থাকে না। কারও কাটেনা আবার কারও যেন দেখতে না দেখতে কেটে যায়!

-২৮-

ঢাকায় টাকা উড়ছে ! ধরতে পারছি না। আমার ট্রেনিং চলছে। বাজার করার ট্রেনিং শেষ। এখন আর নাম্বার কাটতে পারে না। মাষ্টারির নাম্বারও পাশ। চিফ কনজারভেটরের সাথে দেখা করা হয়নি। নিশ্চয়ই তিনি ফিরে এসেছেন। ছুটির কথা বললে ডাক্তার সাহেব মুখটা এমন একটা ভাব করে দেখলে মন বলে হয় এই কাজ ছেড়ে চলে যাও, নয় ছুটির কথা মুখে আনবেনা। এখন কম্পাউন্ডারির অনেক কিছু বাকি। ইনজেকশন পশু করা শুরু করেছি। ডাক্তার সাহেব দেখিয়ে দিচ্ছেন। সেদিন ডাক্তার সাহেব নতুন একটা ট্রেনিং দিলেন।
কেপসুলের দাম অনেক। মাঝে মাঝে কিছু গরীব রুগি আসে। কেপসুলের দাম দিতে পারে না। তখন কেপসুল খুলে ভেতর থেকে ঔষধের গুরো বের করে পুরিয়া তৈরি করে দেয়া হয়। খালি কেপসুলগুলো রেখে দিতে বললেন ডাক্তার সাহেব। ভেতরের জিনিষ বের করে তো পুরিয়া বানানো হয়েছে। এই খালি কেপসুল আবার কি কাজে লাগবে! পরের দিন বুঝতে পারলাম। আর এক রুগি এসেছে। তারও কেপসুল লাগবে। ডাক্তার আলমারির পেছনে এসে, যেখানে প্রেসক্রিপশনের ঔষধ তৈরি করা হয়, সেখানে এসে চুপি চুপি আমাকে বললেন, কালকের খালি কেপসুলগুলো কোথায় ? এমনভাবে জিজ্ঞেস করলেন যেন এখানে একটা খুন হয়ে গেছে। জানাজানি হলেই ফাঁসি। আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম এক পাশে রাখা। তিনি আরও গলা নামিয়ে বললেন, শিশি থেকে চারটা কেপসুল বের করে ভেতরের জিনিষ একটা কাগজে ঢাল। তারপর এই খালি কেপসুলের ভেতর ভরে আটটা বানাও। তার মানে চারটা কেপসুল  দিয়ে আটটা তৈরি হল। রুগীর কাছ থেকে আটটার পয়সা নেয়া হল। আমার নতুন ট্রেনিং হল। ঢাকায় টাকা উড়ছে! আমি এখন একটা ছকে বাধা জীবন কাটাচ্ছি। সকাল আটটায় বাজারে, ফিরে এসে দোকান খোলা, সারাদিন দোকানে, সন্ধ্যা আটটায় ছাত্র পড়ানো। টাকা দেখার কোন সুযোগ নেই।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বালতি হাতে দরজা খুলেছি দেখি অনেক মানুষের ভীড়। সবাই কথা বলছে। কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। মনে হল সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। একজন বলছে, মৌলভি মানুষ এমন কাজটা কেমনে করল! আরে গলায় জুতা বাইন্দা শহরে ঘুরাও! একটু দূরে একজন বলছে, আগে মাথা কামাও, তারপর আলকাতরা মেখে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরাও! এগুলোর শাস্তি খুব শক্ত করে করতে হবে। কাছে গিয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে ভাই ?
এ ঘরে যে মৌলভি থাকে তার কাজ! কাজের মেয়েকে জোর করে বলাৎকার করেছে! মাতারির চিৎকার পাশের ঘর থেকে এসে পৌঁছতে পৌঁছতে কাম শেষ!
আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। এ কেমন করে হয়! এমন পরহেজগার মানুষ! মসজিদের মোয়াজ্জেম! এমন সুন্দর কথা বলে! সব সময় মাথায় টুপি। এটা নিশ্চয়ই কোন কারসাজি! এমন মানুষ এ কাজ করতেই পারে না! আস্তে আস্তে ভীড় ঠেলে কলিমুল্লার দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। লোকে লোকারণ্য! দরজার কাছে গিয়ে দেখি কলিমুল্লার মাথা নীচু করে চুপচাপ বসে আছে। যার যা মুখে আসছে বলে যাচ্ছে। মনে হয় কলিমুল্লার বয়রা হয়ে গেছে হঠাৎ। পৃথিবীর কোন শব্দই তার কর্ণগোচর হচ্ছে না। এসব শব্দের ধার যে কত তার একটাও যদি তার কানে প্রবেশ করত তাহলে সে এতক্ষনে মরে যাবার কথা! ফাসি দিয়ে। তার চেহারা এবং অবস্থা দেখে মনে হয় কলিমুল্লা একটা কিছু করে ফেলেছে।
জনে জনে কথা বাড়ছে। লোক সমাগম বাড়ছে। নতুন নতুন শব্দ যোগ হচ্ছে। কলিমুল্লা আরও বয়রা হচ্ছে। ঘটনা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে। আবার বাজারে যাবার সময় হচ্ছে। আমাকে চলতে হবে।
বাজার করে ফিরে এসে দেখি ভীড় আরও বেড়েছে। তবে কথা কম হচ্ছে। মসজিদের ইমাম সাহেব এসে পৌঁছে গেছেন। তিনি একটা ফতোয়া জারি করবেন। সবাই তার ফতোয়ার অপেক্ষায় নীরব। বেলা এগারটার দিকে ইমাম সাহেব ফতোয়া দিলেন। এই ফতোয়া শুনার জন্য এসব মানুষ কাজকর্ম বাদ দিয়ে অপেক্ষা করছে। কাজের চেয়েও যেন এটা একটা কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফতোয়া দিলেন শাদি। কলিমুল্লার সাথে মাতারির শাদি ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই। বেলা একটার দিকে শাদি হয়ে গেলে দোয়া পড়ে সবাই যার যার কাজে গেল। এটা যেন তাদের কর্তব্য সমাধা হল।
তারপর কলিমুল্লাকে আর দেখি নাই।
-২৯-

মুজাফফর ফিরে এসেছে। ছয় মাস পর। একজন ছোটখাট মৌলানা। মুখে চাপ দাড়ি, পড়নে পায়জামা পাঞ্জাবী, মাথায় সাদা টুপি। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মনে হল এই মাত্র তিনি মসজিদে থেকে এলেন। ফরজ আদায় করে। আমাকে প্রথমেই তুমি দিয়ে কথা শুরু করল। আমি তো এইট পর্যন্ত পড়েছি। এটা আমার জন্য ঠিক আছে। আজ দশ বছর পর্যন্ত এই ডাক্তার সাহেবের সাথে আছি। তার আগে ছিলাম ডাক্তার সাহেবের শ্বশুরের সাথে। আমি এখন দেশে ফিরে গিয়ে নিজেই প্রাকটিস শুরু করতে পারি। কিন্তু যাব না। এখানেই সুবিধা। মুজাফফর সম সময় মৌলানার লেবাস পড়ে থাকে। আসলে একবেলাও নামাজ পড়ে না। আমি যখন নামাজ পড়ি তখন সে অন্য কাজে এমন ব্যস্ত থাকে যে কাজটা শেষ করেই নামাজ আদায় করবে। এখানে কেউ নামাজ পড়ে না! আমার কাছে কেমন অদ্ভুদ লাগে। কি জানি এখানে তার লেবাসেই কাজ হয়ে যায় কিনা। শুনেছি বাতেনি না কারা আছে তারা নামাজ না পড়লেও চলে। মোজাফফর সেই দলের কিনা কে জানে! সে তার নিজের কাজ নিজ হাতে বুঝে নিয়েছে। আমি এখন তার সহকারি। প্রমোশন।
ডাক্তার সাহেব পড়ে গেলেন একটা ঝামেলায়। এখন আমাকেও বাদ দেয়া যায় না আবার মুজাফফরকেও না বলতে পারে না। কায়দা করে তিনি আমার মাষ্টারির সময় বাড়িয়ে দিয়ে ব্যস্ত রাখলেন।
ডাক্তার সাহেবের এখানে কয়েকটা খবরের কাগজ আসে প্রতিদিন। মাঝে মাঝে পড়ি। একদিন দেখি একটা কাগজে বড় করে হেডিং, স্বাধীনতার সেনানি হাবিবুর রহমান চৌধুরির পরলোক গমন। আমার চোখগুলো বড় হয়ে গেল! আরে এযে দুবরাজ চাচার খবর! বিশদ খবর লিখেছে। তাঁর কলমের ধার বেশি ছিল না মুখের ধার তা নিয়ে দ্বিমত আছে। তিনি কলকাতার মেয়র পদে আসীন ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ডের একটা ধারনা। তিনি যে কত বড় মাপের নেতা ছিলেন আজ এই খবর পড়ে ধারনা হল। তাঁর সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না। খবরটা মোজাফফরকে দিলাম। তিনি আমার চাচা ছিলেন।
এ্যা, তোমার চাচা ? বল কি ? তাহলে তিনি কলকাতায় থাকতেন কেন ?
তিনি কুমিল্লায় নিজের বাড়ীতে মারা গেছেন।
ঐ যে কাগজে লিখেছে, তিনি কলকাতায় নিজের বাড়ীতে অফিস করেছেন ?
তার নীচে লেখেছে, তিনি বঙ্গভঙ্গ মেনে নেননি। তাই তাঁর সব বাংলা সমান। দুদিকেই তাঁর বাসস্থান রয়েছে।
বন্ধ করতে তো পারলনা। ভালই হল। তাহলে হিন্দুদের জ্বালায় টিকে থাকা কষ্ট হত।
এ কথার জবাব কি হবে জানি না বলে উত্তর দিলাম না।
মোজাফফরের সাথে ভাব হয়ে গেছে। যারা কোন কিছুর প্রতিবাদ করে না তারা সহজেই ভাব করতে পারে। আমি শুধু শ্রোতা, মুফাজজর বক্তা। তার অনেক বক্তব্য। মন দিয়ে শুনি। কাজের ফাঁকে, অবসরে। গ্রামের বাড়ীতে তার মা এবং এক ভাই আছে। ভাইটা জমিজমা দেখে। মা স্ত্রীকে দেখে। মোজাফফর ছুটিছাটায় বাড়ী যায়। এর মাঝে তার একটি মেয়ে এবং একটি ছেলে হয়েছে। ভালই চলছিল। মা ভাইর দেখাশুনা করে তার স্ত্রী আনন্দেই ছিল। হঠাৎ একদিন তার স্ত্রী নিখোজ। কয়েকদিন পর খোজ পাওয়া গেল। পাশের বাড়ীর নইমুদ্দির সাথে চলে গেছে। সেই থেকে ছেলে মেয়েকে তার মা দেখাশুনা করছে। এখনও সে আর বিয়ে করেনি। কারণ মেয়েদের উপর তার বিশ্বাস নেই।
কলিমুল্লার কথা শুনে মোজ্ফ্ফরের মন্তব্য ঃ তার চোখগুলি দেখলেই বুঝা যায় একটা বদমাইস। মেয়েদের দিকে পিট পিট করে তাকায়। এ কাজটা ভালই হয়েছে, বিয়ে দিয়ে। এর আগে আর একবার প্রায় ধরা পড়ে গিয়েও বেঁচে গেছে। এমনি অনেক গল্প। আমি শুনি।
একদিন শরীর কাঁপিয়ে আমার জ্বর এল। রাতে বিছানায় শুয়ে ছটফট করছি। পরের দিন ডাক্তার সাহেবকে বলার পর তিনি পরিক্ষা করে বললেন, তোমার পক্স হয়েছে। কে দেখাশুনা করবে। তিনি দশটা টাকা দিয়ে বললেন, আজ এখনই বাড়ি চলে যাও।
মাতু মামাকে খবর দেয়া হল। তিনিও একই উপদেশ দিলেন। আমি প্রস্তুত। সম্বল আমার তোষকখানাও হাতে নেবার ইচ্ছে হল না। বেরিয়ে পড়লাম। একটা রিক্সা নিয়ে ফুলবাড়িয়া রেল ষ্টেশনে পৌঁছলাম। বেলা তখন দুটা। আজ আর কোন ট্রেন নেই। তাহলে ? এখন কোথায় যাব ? আমার কে আছে এই শহরে এই রাতটুকু আশ্রয় দেবে ? না, কেউ নেই! এত আÍীয়স্বজন তারা এখন আমার কেউ নয়! আমি তাদের কেউ নই। আমি একটা সত্যিকার আপদ! ষ্টেশনের একটা বেঞ্চিতে বসে এলোমেলো অনেক চিন্তা করে একটা সিদ্ধান্তে পৌছলাম।
বাচ্চুর মামার একটা কাপড়ের দোকান আছে কাউরানবাজারে। সেখানে গেলে কেমন হয়! সে ত আমার আÍীয় নয়। এক রাতের জন্য অবশ্যই আশ্রয় দেবে। গিয়ে দেখি কি হয়!
আবার একটা রিক্সা নিয়ে কাউরান বাজার। বাচ্চুর মামাকে চিনি। তিনিও আমাকে ভাল করে চেনেন। বাচ্চুদের বাড়ীতে যখন বেড়াতে যান তখন অনেক মামলার রায় তাকেও দিতে হয়। আমাদের কুকর্মের নালিশ আসে। সকলের বাড়ীতে। তাই তিনি জানেন আমরা এক দলের। দুলাভাইর দোকান ছাড়িয়ে কয়েকটা দোকান পরেই পেয়ে গেলাম দোকান। বাচ্চুর মামা বসে আছেন দোকানে। এটা ঠিক দোকান নয়, একটা টং। শুধু লুুঙ্গি বিক্রি হয়। টংটা সাইজে একটু বড়। আমি সামনে গিয়ে সেলাম দিতেই তিনি আশ্চর্য হয়ে হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ভাইগনা কইত্থাকা আইলা ? বও বও,  এইদেিক চইলা আস। বলে ভেতরের দিকে দেখিয়ে দিলেন।
অনেক কথা। কবে আইলা বাড়ি থাইকা ? এ্যা, তুমি ঢাকায় থাক আর আমার সাথে দেখা কর নাই ? বল কি! তোমার মুখটা এত শুকনা কেন ? কিছু খাইছ ? তোমার বোধ হয় খুব খিধা। আমি ত দোকান  ছাইড়া যাইতে পারুম না। পাশেই একটা হোটেল আছে। যাও কিছু খাইয়া আস! বলে তিনি একটা টাকা বের করে দিলেন।
বললাম, আমার কাছে টাকা আছে। লাগবেনা! সারাদিন আসলেও কিছু খাওয়া হয়নি। সময় হয়নি। আমাকে যত তাড়াতাড়ি বিদেয় করা যায় তত ভাল। কেউ খাবার কথা বলেনি। সস্তা শ্রমিকের খাবার প্রয়োজন নেই। অসুখে উপবাস উপাদেয়। কিন্তু বাচ্চুর মামা বুঝে ফেলেছন। জোর করে তিনি আমার হাতে টাকাটা দিয়ে বললেন, আমার এখানে কেউ আইসা নিজের টাকা খরচ করে খায় না। দেই না খরচ করতে। তুমি বুঝি আমাকে এত গরীব ভাব ?
এক টাকা! অনেক। এমনিতে কেউ দেয়! ওই তো পাশের দোকানটা আমার দুলাভাইর। সে এক বেলাও আমাকে খেতে দেয়নি। বাসায় নিয়ে যায়নি! এক পয়সা খরচ করেনি! আর এই অনাতœীয় আমাকে একটা টাকা দিয়ে দিল! জোর করে! এতদিন মানুষের প্রতি মনে মনে একটা ঘৃণা পোষণ করছিলাম। হঠাৎ হালকা হয়ে গেল। আমার প্রতি তার কোন দায়ীত্ব নেই। তাই তিনি প্রাণ খুলে আপ্যায়ন করছেন। যাদের দায়ীত্ব আছে তারা ভয় পায়। দায়ীত্ব আপদ হয়ে দাড়ায়। যে কোনভাবে উপক্ষো করা চাই।
রাতে টং এ মামার সাথে শুয়ে পড়লাম। আমার এখন একশ'র উপর জ্বর। মামা আমার শরীরের তাপ অনুভব করে কপালে হাত দিলেন। আতকে উঠে বললেন, একি ভাগিনা! তোমার গা যে পুইরা যাইতাছে জ্বরে! তুমি আগে বল নাই কেন ?
মামু, আমার পক্স হইছে! তাই বাড়ী যাচ্ছি।
মামু টং এর ঝাপ খুলে বেরিয়ে গেলেন। কোথা থেকে এক বালতি পানি নিয়ে এসে গামছা ভিজিয়ে আমার মাথায় পট্টি দিয়ে বসে রইলেন। তোমার যদি কিছু অয় তাইলে আমি কি জওয়াব দেমু আমার বইনেরে! মামু বসে রইলেন। আমি এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে মামু ডেকে তোললেন। ভাগিনা, তোমার আটটার গাড়ীতেই যাইতে অইব! চল, আমি তোমাকে গাড়ীতে দিয়া আসি। বলে একটা রিক্সা ডাকলেন। কয়েক মিনিটের পথ তেজগাঁ ষ্টেশন। কিন্তু হেঁটে যেতে দিলেন না। ষ্টেশনে গিয়ে একটা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে বন রুটি এবং চা খাওয়ালেন। জোর করে একটা টাকা আমার হাতে দিয়ে ট্রেনে তোলে দিয়ে বিদায় নিলেন। বলে দিলেন, পথে ঠান্ডা জিনিস খাইবা। ডাব খাইবা বেশি।
বিকেলে এসে পৌঁছলাম কসবা ষ্টেশন। রিক্সা চন্ডিদ্বার বাজারের পর আর যায় না। পথে থেমে থেমে বাড়ী এসে পৌঁছলাম। সবাই আনন্দে হৈ চৈ করছে। আমাকে অসময়ে দেখে হয়ত খুশি নয়। চাকরি না নিয়ে এখন বাড়ী আসার কথা নয়। মা আমার চেহারা দেখে কিছু একটা আঁচ করে কপালে হাত রাখতেই চমকে উঠলেন। একি, এত জ্বর! কবে আইল ? কোন কথা না বলে সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

-৩০-

আমার কি হয়েছে তা জানার আগেই ছোট ভাই বলে ফেলল, বড় চাচা মইরা গেছে!
লাফ দিয়ে উঠে বসলাম! কি! কবে ? আমার শরীরে আর কোন রোগ নেই। আমি সুস্থ অথচ অবশ! একি কথা! কেন মরবে! আমি চাকরি না পাবার আগে! আমার বিচারের আদালত! এক চোখা আদালত! এখন আমার বিচার কি সত্যিকার আদালতে হবে ? আল্লাহর একি খেলা ! যাদের যাবার কথা তারা যায় না, যাদের প্রয়োজন তারা চলে যায়! কি লেখা কপালে! কতদিনের আয়ু ? যে শিশু কাল ভূমিষ্ট হল সেও কেন চলে যায়! এত কম আয়ু দিতে তাকে পৃথিবীর মুখ দেখানো কি প্রয়োজন ? একি খেলা! কেন এ খেলা! দর দর করে আমার চোখ দিয়ে অশ্র“ পড়ছে। ঘরে কোন শব্দ নেই! সবাই যেন এইমাত্র নতুন করে চাচার মরার খবরটা জানল।
নীরবতা ভঙ্গ করে মা বলল, দম যাওয়ার সময়ও তোমার জন্য হাত তুইল্লা দোয়া করছে। বারে বারে জিগাইছে, তোমার কিছু অইল কিনা! চাকরি হইছে কিনা ? দোয়া করতে করতে হাতটা নিচে পড়ল আর দমও গেল। তাইনে যে মইরা যাইব তা কেউ বুঝে নাই। একদিন সবাই যাইব। এই নিয়া আর কান্দাকাটি কইরনা।
আমার মনে হল আমি এতিম হয়ে গেছি। আমার পেছনে যে একটা শক্তি, ছোটবেলা থেকে অনুভব করে এসেছি তা উড়ে গেছে। আমি আর কোন কিছু করার সাহস রাখিনা। অন্যায় করলে কেউ ক্ষমা করবে না। আমি একা।
সেবাযতœ চলছে। চিকিৎসা চলছে। বাবার চিকিৎসা। মানু ভাই পীরছাব হুজুরের খবর নিয়েছে। তিনি আসছেন কিছুদিন পরই। আর কোন চিন্তা নাই। আর কোন রকম চিকিৎসার প্রয়োজন হবে না। তিনি এসে একবার পানি পড়া দিলেই সব সেরে যাবে। মহৌষধ। তিনি আসার আগ পর্যন্ত অন্য চিকিৎসাও চলল। বড় চাচীর কাছে একটা চিনামাটির বাসন আছে। বড় হুজুর ওটার মধ্যে মোটা কালি দিয়ে দোয়া লিখে দিয়েছেন অনেক আগে। এই দোয়ার মরতুবা হল, হুজুর যখন থাকবেন না তখন এই বাসন ধুয়ে পানি পান করলেই রুগ সেরে যাবে, বালামুসিবত দূর হবে। যে, যে নিয়তে পান করবে সেই মকসুদ পূর্ণ হবে। এই বাসনের অনেক গুন। আর কি কুদরুত, সব কালি পানি দিয়ে মুছে যায়, এই কালিটা যতবার ধুবে তত উজ্জল হবে। এ হল আল্লাহর কালাম! মুছবেনা! এ রকম বাসন প্রায় গ্রামেই কয়েকটা করে থাকে। আমাদের গ্রামেও বেশ কয়েক বাড়ীতে আছে। বিপদে আশ্রয়। (এই কালি কেমিকেল দিয়ে তৈরি, পানি দিয়ে ধুয়ে সেই পানি পান করা বিপজ্জনক)।
হুজুর যথাসময়ে এসে পৌঁছেছেন। তারা সময় ঠিক রাখেন। ওয়াদা করলে রক্ষা করেন। অবশ্য ওয়াদা কারও সাথে করেননি। তাদের রুটিন অনুযায়ী এসেছেন। দু এক মাস পর পর। আসার সাথে সাথে সেই কায়দা কানুন। কয়েকজন তাদের সব কাজ বন্ধ করে হুজুরের সাথে থাকে। চব্বিশ ঘন্টা। নোয়াজ আলী, মনসুর, মেজ চাচা, আদু ভাই আরও অনেকে। হুজুর এ বাড়ী থেকে সে বাড়ী যখন দাওয়াত কবুল করে রক্ষা করতে যান তখন তার পেছনে একদল মোসাহেব হাত কচলাতে কচলাতে চলতে থাকে।
হুজুর এখন আস্তানা গেড়েছেন মেজ চাচার ঘরে। সেখান থেকেই তিনি আমার জন্য পানি পাঠিয়ে দিয়েছেন। জিজ্ঞেস করলেন, কয়দিন হল ? তারপর দোয়া করে বলেছেন, কোন চিন্তা নেই। আর বাড়বেনা। সব সেরে যাবে। তিনি ভবিষ্যত বাণী করে গেছেন, অসুখ সারলেই আমার একটা কাজ হয়ে যাবে।
পক্স যা উঠার সব উঠে গেছে আমার। শরীরে আর স্থান নেই। কয়দিন পর্যন্ত এই পক্স উঠে তা হুজুরের জানা আছে। সেই হিসেব করে বুঝেছেন যে আর নতুন পক্স বের হবে না। সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখল আমার আর নতুন পক্স বের হয়নি। হুজুরের পানির কি আশ্চর্য ক্ষমতা! তিনি অমাকে সশরীরে দেখতে আসেননি।
বাবার ঔষধে হোক অথবা হুজুরের পানিতে হোক আমার পক্স কাল হয়ে শুকিয়ে উঠতে লাগল। এবার ফেরার পালা। ঢাকা। টাকার খেলায়। এবার গিয়ে উঠব কোথায় ? কার কাছে ? ডাকতার সাহেবের ওখানে আমার কোন ভবিষ্যত নেই তা বুঝতে পেরেছি। আমার কোন ইচ্ছাও নেই কম্পাউন্ডারি শেখার। পথ বের করতে হবে। পথ খুজলে পথ বের হবেই। হতেই হবে! আমার জন্য পৃথিবী খোলা! 
আবার সেই দশটার ট্রেন। বারটায়। মন্থর গতি। এবার পকেটে পনের টাকা। কোন একটা মেসে উঠব। জানিনা কোথায়। খুজে বের করতে হবে। তেজগাঁ নাখাল পাড়ায় আমাদের গ্রামের উত্তরপাড়ার দুজন থাকে। মেস করে। কোনিহনূর কেমিকেলে কাজ করে। ঠিকানা জানি না। বের করতে হবে। দেখা পেলে তাদের সাথে একটা কাজও মিলে যেতে পারে। কারণ বয়সের জন্য কেউ আমাকে চাকরি দেবে না। এখন সামনে যা পাই করতে হবে। তবে মাগনা নয়।
সন্ধ্যায় গিয়ে পৌঁছলাম নাখালপাড়ায়। এত মেস! আমার ধারনা ছিল দুএকটা বাড়ী হবে হয়ত। একটু খুজলেই বের করা যাবে। এযে দেখছি বিরাট এলাকা, অনেক মেস!  প্রায় সব মেসই টিনের ঘর। সামনে যে মেস পাচ্ছি সেখানেই জিজ্ঞেস করছি, কসবার কেউ এখানে থাকে ? এমনি কয়েকটা মেস পেরিয়ে আর একটায় জিজ্ঞেস করতেই একজন বলল, আমার বাড়ী কসবায়। 
জিজ্ঞেস করলাম, কোন গ্রাম?
ধরমপুর। আপনার ?
বাড়াই।
কাকে খুজছেন ?
একটা মেস খুজছি। একটু থাকার জায়গা। আপনার জানা আছে কোথায়ও ?
আসুন, ভেতরে আসুন। বাড়াই কোন বাড়ী ?
মোল্লা বাড়ী। 
মোল্লা বাড়ী বলতেই তিনি মিটি মিটি হাসছেন। বয়স পয়তিরিশের কোঠায়। চোখে চশমা। একটু তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। বললেন, রেহানমোল্লা আপনার কি লাগেন ?
আমার চাচা, মেজ চাচা।
তাহলে তো আপনাকে আমার এখানেই থাকতে দিতে হয়। না হয় আপনার চাচা শুনলে অখুশি হবেন। তিনি আমার চাচার পীর। যখন যা পরামর্শ দরকার চাচা সেখানে চলে যান। আপনার চাচাও মাঝে মাঝে আমাদের এখানে আসেন। আমরা সবাই চিনি। আমি এই ঘরে একা থাকি। আপনি আমার সাথেই থাকবেন।
কি অদৃশ্য যোগাযোগ! মানুষে মানুষে! এই যোগাযোগে হৃদতা আছে, কৃত্তিমতা নেই। প্রতিটি কাজে, কথায় দরদ!
কামড়ার ভাড়া দশ টাকা। তার নাম ওহাব। কাজ করে টিএন্ডটিতে। ছোটখাট কাজ বোধ হয়। ভাড়া এবং খাওয়া অর্ধেক অর্ধেক রফা হল। আমাকে সব রকমের সাহায্য করতে আগ্রহি। কোথায় গেলে কিভাবে আপাতত একটা ছোটখাট কাজ পাওয়া যেতে পারে এসব পরামর্শ হয়। তার নিজের অফিসে বড় সাহেবের সাথে কথা বলেছে। ভবিষ্যতের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু আমার এখনই প্রয়োজন। এই পনের টাকা শেষ হবার আগেই। কয়েকটা ফেক্টরিতে গেছি, কয়েকটা অফিসে। কেউ পাত্তা দেয়নি। দেহের সাইজ মানুষের আস্থা জন্মায়না। ফিরে আসি। আবার পরামর্শ হয়।

-৩১-

সয়দাবাদের জহির পাশ করে গেছে। সাপ্লীমেন্টারিতে। শেষ করুণার ফল। জহির এখন কলেজে পড়ে। এবার বাড়ী গিয়ে চন্ডিদ্বার বাজারে দেখা। কি সুখি ! বাবার টাকার শেষ নেই। যত ইচ্ছে খরচ কর, এখন যত ইচ্ছে পড়। যতবার ইচ্ছে ফেল কর। কেউ জিজ্ঞেস করার নেই। এখন শুধু নামের জন্য পড়া। ছেলেটা কলেজে পড়ে। ঢাকা কলেজে। নামকরা কলেজ। থাকে হোস্টেলে। সেখানে আলাউদ্দিন নামে এক সহপাটির সাথে তার বন্ধুত্ব হয়েছে। আমাকে নাম ঠিকানা দিয়ে বলে দিয়েছিল কোন প্রয়োজনে তার কাছে গেলে সাহায্য করতে পারে। তখন এ ঠিকানার কোন মূল্য দেইনি। এখন ভাবলাম একবার গিয়ে দেখি কিছু পথ পাওয়া যায় কিনা।
ঠিকানা মিলিয়ে বাসাবো আলাউদ্দিনের বাড়ীতে যখন পৌঁছলাম বেলা তখন ডুবে ডুবে। বাড়ীতে একজনকে পেয়ে জিজ্ঞেস করতে তিনি বলে দিলেন, মাঠে খোঁজ করুন, পাবেন।
কোন্ মাঠে ?
ওপাশে খেলার মাঠে।
খেলার মাঠে গিয়ে দেখি এলাহি কান্ড ! উত্তর পশ্চিম কোণে একটা আম গাছ। তার নীচে জটলা। কার কথা কে শুনে ! খেলা সাঙ্গ হয়েছে ! বেলা শেষ হলো, হয় নাই খেলা। কোথায় আলাউদ্দিন ? দেখতে কেমন ? প্রায় শ খানেক ছেলে। ইতিউতি করে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, আলাউদ্দিনকে খুঁজছি, আপনি চিনেন ?
ঐতো আলাউদ্দিন ভাই ! ঐ যে টুপি মাথায়।
যারা খেলেছে তারা তাকে ঘিরে আছে। একজনের পর একজন কথা বলে চলেছে। সকলের কথার উত্তর দিচ্ছে আলাউদ্দিন। মাথায় একটা সাদা টুপি। তবে মৌলানার টুপি নয়। এটা নেহেরু টুপি। পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর স্টাইলে বানানো। স্থূল দেহ। বয়স আর কত হবে ! পঁয়ত্রিশ। এই লোক কলেজে পড়ে ! আর আমি মনে মনে ভেবেছিলাম বোধ হয় ছাত্র মত। এযে একজন বয়স্ক লোক। এমন বয়সের ছাত্র তো আর দেখিনি ! তর্কাতর্কি শেষ হয় না। একটা গোল নিয়ে। আলাউদ্দিন রেফারি। গোল হবার আগেই অফসাইট ছিল। আলাউদ্দিন খেয়াল করেনি। তাই গোল নিয়ে গুল বেধেছে। নিজেদের মধ্যে খেলা। অনেক পরে মিটমাট হল। 
একটু ফাকা হতেই এগিয়ে গেলাম। বললাম, আমাকে জহির পাঠিয়েছে আপনার কাছে। একটু কথা ছিল।
ও হালায় অখন কই ? কলেজ তো ছাইড়া দিছে !
বাড়ীতে দেখা হয়েছিল। এখন বাড়ীতে।
তোর নাম কি ? কি দরকার এখানেই ক।
জহির বলছিল আপনি মানুষের অনেক কাজে লাগেন। তাই এসেছি কোন ব্যাপারে যদি সাহায্য করতে পারেন। বিশেষ করে একটা লজিং-এর ব্যবস্থা বা কোন কাজের ব্যবস্থা যদি হয় তাহলে উপকার হয়।
আয় আমার লগে। বলে চলতে লাগল। লেখাপড়া কদ্দুর করছস ?
মেট্রিক পাশ।
ছাত্র পড়াইতে পারবি ?
হ্যাঁ, পারব।
চল দেখি, ওরা মাস্টর রাখল কিনা দেইখ্যা আই।
বাসাবোতে বড় দালান প্রায় নেই। বেশিরভাগ কাচা বাড়ীঘর। হাটতে হাটতে রেল লাইন পেরিয়ে আমবাগান ছাড়িয়ে শাহজাহানপুরের দিকে চলছি। এখানে সেখানে ইটের গাদা। কাজ চলছে। অনেক দালান হবে এসব এলাকায়। রেলওয়ে কলোনি। সরকার এসব জায়গা একোয়ার করে নিয়েছে। যার যা দাম পরিশোধ করে দিয়েছে। এসব খবর দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, এখন থাকিস কোথায় ?
নাখালপাড়া।
চল দেখি মাষ্টর না রাইখা থাকলে কালকাই চইলা আয়।
বাজারের ভেতর গিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে বেশ একটু এগিয়ে বায়ে এক বাড়ীতে ঢুকল। আমাকে বাইরের ঘরে বসিয়ে দিয়ে ভেতরে গিয়ে ডাকাডাকি হৈচৈ শুরু করে দিল। চার ভিটায় চারটা টিনের ঘর। যেন গ্রামের বাড়ী। পূব ভিটেয় ওয়ালের উপর টিন। আলাউদ্দিনের কথা কানে আসছে। কাকে যেন জিজ্ঞেস করছে তোমরা মাষ্টর পাইছ নাকি ? আমি একটা মাষ্টর লইয়া আইছি। ঘরে বইসা রইছে। তাইলে কাউলকা আইতে কইয়া দেই ?
একটু পর এসে বলল, চল এখন যাই। কাউলকা তর জিনিষ পত্র নিয়া চইলা আয়। আপাতত এইখানে আয়, পরে দেখা যাবে কি করা যাইব !
এত সহজে ব্যবস্থা হয়ে যায় ! পৃথিবীটা এত কোমল ! মানুষ এত সহযোগিতাকারী ! যেন হাতে চাঁদ পেলাম। তাহলে আমার আর টাকা খরচ করতে হবে না ! এখনও দশ টাকা কত পয়সা আছে হাতে। এবার এসে একটা তোষক কিনতে হয়েছে আড়াই টাকা দিয়ে। আগের তোষক যেখানে আছে সেখানে যেতে ঘৃণাবোধ হল। তাই খরচ করতে হল।
কিভাবে কি বলে কৃতজ্ঞতা জানাব ভেবে পেলাম না। তার আন্তরিকতায় আমার মুখ দিয়ে কোন কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা বের হল না। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে এলাম ওহাবের কাছে।
খবর বলার পর ওহাব খুশি হল। তাহলে এখন নিশ্চিন্তে চাকরি খোজার একটা ব্যবস্থা হল।
পরের দিন এসে পৌঁছলাম লজিং বাড়ীতে। ঘরে ঢুকার পরই একটা ছেলে এসে সালাম দিল। আমার নাম নজরুল। ক্লাশ সিক্সে পড়ি। আপনের কি লাগবে আমাকে কইবেন শুধু। এই চৌকিতে আপনার বিছানা থাকবে, আর ঐ চৌকিতে রশিদ ভাই থাকে।
নজরুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। গায়ের রং আমার চেয়েও খাটি। শরীরখানা নাদুসনুদুস, ডলডলে। ওজন আমার চেয়ে দ্বিগুণ হবে। বেটে খাট। বয়স বার তের। ঢাকার স্থানীয় ভাষায় কথা বলে।
সন্ধ্যার পর আমার ছাত্ররা পড়তে এল। নজরুল আর তার বড় ভাইর একটা মেয়ে পারভীন, সাত বছরের, একটা ছেলে ছয় বছরের। নাম বাবলু। নজরুলরা সাত ভাই, দু বোন। বড় বোনের বিয়ে হলেও শ্বশুরবাড়ী যায় না। ছোট বোন কলেজে পড়ে। এক ভাই রশিদ জগন্নাথ কলেজে পড়ে। এবং এই ঘরেই পাশের বিছানায় থাকে। নজরুল সকলের ছোট। সবাইর আদরে গলে গলে পড়ে। পড়তে পড়তে গলে যায়। স্কুলে গেলেই হল। বই থাকলেই হল। অনেক মাষ্টার এসেছে, গেছে। কেউ টেকেনি। কেন থাকেনা নজরুল কিছু জানেনা।
আজ যা মুখস্থ করল কাল তা ভুলে যায়। নজরুল এবং পারভীন দুজনেই। পারভীনকে ধমক দিতেই সে হাউমাউ করে এমন চিৎকার শুরু করল আমি বোকা বনে গেলাম। পূবের ঘরে থাকে পারভীনের মা। ওখান থেকে নজরুলকে ডেকে জিজ্ঞেস করছে, মাষ্টরে মারল নাকি ! নজরুল ! মারবার না করবি ! এটা নজরুলকে নয়, আমাকে শুনিয়ে আমাকেই বলা। এখন বুঝলাম আগের মাষ্টাররা কেন টিকতে পারেনি। কিন্তু নজরুলকে বেত দিয়ে মারলেও সে কোন আওয়াজ করেনা। মনে হয় সে টেরই পায়নি। ভাবখানা এই, আরে দূর ! এমন কত মার খাইলাম ! পরিশ্রান্ত হয়ে শেষে আর মারবেই না !
রাত দশটার দিকে ঘরে এল একজন। বোধ হয় এর নামই রশিদ। বেশ লম্বা, ছিপছিপে। গায়ের রং নজরুলের চেয়েও পাকা। গাঢ়। খাড়া নাক। দেখলে মনে হবে আমার ভাই। চেহারার খুব মিল। কোন কথা না বলে তার টেবিলে গিয়ে একটা বই খুলে বসল। মনে হয় এ ঘরে আর কোন মানুষ নেই। থাকলেও তার সাথে কথা বলার উপযুক্ত নয়।
ঘণ্টাখানেক পর আমি শুয়ে পড়লাম।
কি নাম ?
মনে হল কেউ কাউকে নাম জিজ্ঞেস করছে। কান খাড়া করে রইলাম। এ ঘরে আর কোন লোক নেই। তাহলে কাকে জিজ্ঞেস করছে ! আবার আওয়াজ হল, কি অইল, নাম কি ?
আমাকে জিজ্ঞেস করছেন ?
তাইলে আর কারে ? এ ঘরে আর মানুষ আছে নাকি ?
নাম বললাম।
দাবা চলে নাকি ?
কি বলছেন বুঝতে পারছি না।
দাবা খেলতে পারেন নাকি ?
কুমিল্লায় মাঝে মাঝে খেলতাম। মোতাহার শিখিয়েছে। আমির হোসেন উঁকিলের বাসায়। ভাল খেলতে পারি না। বললাম, সামান্য। তাতেই চলবে। বলে সে তার দাবার ঘর সাজাতে লাগল।
রাত তিনটা পর্যন্ত চলল দাবা। তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম।
রশিদ বি কম পড়ে। জগন্নাথ কলেজে। প্রায়ই এখানে সেখানে নিয়ে যায়। বন্ধুদের সাথে পরিচয় হয়। কয়েকদিনেই বেশ কয়েজকজনের সাথে পরিচয় হল। এরা সকলেই অন্য মানুষ। সবাই কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। কিন্তু চালচলন গুন্ডাদের মত। যেখানে যায় সেখানেই ঝামেলা করে। দল বেঁধে। শহরের এ মাথা থেকে সে মাথা। সব জায়গাতেই তাদের দলের কেউ না কেউ আছে।
বেশিরভাগ সময় আড্ডা দেয় রুচিরা রেষ্টুরেন্টে। জগন্নাথ কলেজ থেকে বের হয়ে ওখানে একটা ষ্টপ। কিছু না খেলেও উকি দিয়ে দেখে যায় কারা আছে এখন। প্রথম যেদিন গেলাম লোকজন দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ওদের কাছে আমি যেন লিলিপুট। এদের সকলের শরীর যেন লোহা দিয়ে তৈরি। সব বডি বিল্ডার। সমানে খাওয়া চলছে। কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে। খাবার অর্ডার দিচ্ছে, বিল মিটাচ্ছে। গল্প চলছে। খবর নিচ্ছে, দিচ্ছে। এক এলাহি কান্ড।

-৩২-

বিকেলে প্রায়ই বাসাবো আলাউদ্দিনের কাছে চলে যাই। কিসের যেন একটা টান পড়ে গেছে তার প্রতি। এমন প্রাণখোলা মানুষ আর  দেখিনি। তার কাছে গেলে ভাল লাগে। চিন্তাভাবনা করার অবকাশ থাকে না। প্রতিটি কথা হাসির। সবাইর সাথে তার বন্ধুত্ব। ছোট বড় সব। মনে হয় সমস্ত বাসাবোর মানুষ তার আপন। সকল বাড়ীতেই তার অবারিত দ্বার। কেউ খালু, কেউ খালা, কেউ আপা, কেউ দুলাভাই এমনি সব আÍীয়তা তৈরি হয়ে গেছে। যার যখন কিছু প্রয়োজন হয়, আলাউদ্দিনকে ডাকলেই হল। সব সমাধান। এমন সুখি, নিশ্চিন্ত, যার কোনই পিছুটান নেই তেমন মানুষ কোথায় ! এরা ইচ্ছে করলে অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু তার কোন ইচ্ছে নেই। মেট্রিক, আইএ পাশ করতে কয় বছর লেগেছে সেই জানে। তবে বিএ ক্লাশে আছে আজ চার বছর। সে আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী। বাসাবো এলাকার। তার কিছু বন্ধুদের সাথে পরিচয় হয়েছে। প্রায় সবাই কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। আলাউদ্দিনের বন্ধুরা ভদ্র, মন দিয়ে লেখাপড়া করে, মানুষের উপকার করতে চেষ্টা করে। কোন ঝামেলায় থাকেনা। ওদিকে রশিদের বন্ধুরা সবাই যেন গুণ্ডা, গুন্ডার চেহারা। অনেকে গুণ্ডা না হয়েও চেহারায় হয়ে গেছে। লেখাপড়া না করেই পাশ করার ইচ্ছে। 
আমার একটা চাকরির দরকার। 
চাকরি পেতে হলে এমপ্লয়মেন্ট এক্সেচেঞ্জে নাম রেজিষ্ট্রি করতে হবে। সরকারি সব চাকরি এমপ্লয়মেন্ট একচেঞ্জে আসে। তারা ইন্টারভিউর জন্য বাছাই করে লোক পাঠায়। রেজিষ্ট্রি করার পর সব সময় খোজ রাখতে হয়। আমি নাম রেজিষ্ট্রি করলাম। হাতে কোন কাজ নেই। প্রায় প্রতিদিন যাই, খবর রাখি।
বেশ কিছুদিন চলে গেছে। ইন্টারভিউ দেবার সুযোগ পাইনা। একদিন গিয়ে দেখি বেশ কিছু লোক পাঠাচ্ছে ইন্টারভিউর জন্য। সি এন্ড বি ইলেকট্রিক ডিভিশনে কয়েকজন টাইপিষ্ট কাম ক্লার্ক নেবে। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্চ বাছাই করে পাঠাচ্ছে। 
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের হেড ক্লার্ক পরিচিত হয়ে গেছে। বললাম, আমাকে ইন্টারভিউতে পাঠান। তিনি সার্টিফিকেট দেখে বললেন, না তোমাকে পাঠাতে পারবনা। এটা সরকারি চাকরি। আঠার বছরের কম হলে হবে না। পাঠাতে পারবনা। আঠার পর্যন্ত অপেক্ষা কর। না হয় প্রাইভেট ফার্মে চেষ্টা কর।
লোক নেবে দশজন। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে প্রায় সব পাঠিয়ে দিয়েছে। শুধু আমি বাকি। আমার ফরম পূরণ করা আছে। বয়সের জন্য হচ্ছে না। তারপরও প্রতিদিন যাই। অনুরোধ করি। একবারে শেষ তারিখে গিয়ে বললাম, আমাকে একটা ইন্টারভিউ দেবার সুযোগ দিন অন্ততঃ চাকরি তো হবেনা জানি। ইন্টারভিউ দিতে অসুবিধা কোথায় ? শুধু ইন্টারভিউর অভিজ্ঞতার জন্য আমাকে পাঠান। অনেক কাকুতি মিনতির পর বলল, ঠিক আছে। যাও। ইন্টারভিউ কেমন দেখে আস।
ঠিকানা মিলিয়ে ইন্টারভিউর স্থানে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সকাল নয়টা। রমনা পার্কের দক্ষিণপূর্ব কোণে, হাইকোর্টের পূবদিকে রাস্তার পুব পাশে সি এন্ড বি অফিস। একতলা দালান। তিনদিকে। মাঝখানে বেশ খালি জায়গা। মানুষে গিজগিজ করছে। যেন ফকিরাপুলের বাজার। এত লোক এখানে কেন ! ইন্টারভিউর অফিস কোথায়। উত্তরদিকেই যেন মানুষ বেশি। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম। একটা দরজারর কাছে গিয়ে দাড়ালাম। একজন পিয়ন দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, ইন্টারভিউ কোথায় হচ্ছে জানেন কি ?
এইখানেই।
আমি ইন্টারভিউ দিতে এসেছি। কার সাথে কথা বলব ?
আপনি কি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থাইকা আইছেন, না খবরের কাগজ দেইখ্যা আইছেন ?
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে।
তাইলে ভিতরে বড়বাবুর কাছে স্লিপ জমা দিয়া বাইরে অপেক্ষা করেন। নাম ধইরা ডাকবে। এই সব লোক এন্টারভিউ দিতে আইছে।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। এত মানুষ ! সামনে খোলা জায়গাটা ভর্তি। দালানের পেছনেও লোক ভর্তি। সবাই ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। আমি এর মাঝে কি করব। হাজার মানুষের মাঝে। কতজনের সাথে আমি প্রতিযোগিতা করব। পারব না ! ধ্যাততরি। আমার দ্বারা হবে না। একেবারে থমকে গেলাম। ভাবলাম ফিরে যাই। কিন্তু ইন্টারভিউ জিনিষটা কি তা দেখার লোভ সামলাতে পারছিনা। আবার চোখ চলে গেল এই কাফেলার দিকে। নাহ্ হবে না। চলেই যাই। রওয়ানা দিয়ে ফিরে এলাম। এসেছি যখন ইন্টারভিউটা দিয়েই যাই।
কামড়ার ভেতরে তাকিয়ে দেখি এখানে বিরাট লাইন। রুমের ভেতর একেবেকে লাইন একবারে দরজার কাছে। সবাইর শেষে গিয়ে দাঁড়ালাম। যিনি স্লিপ নিচ্ছেন তিনিই বোধ হয় বড়বাবু। হুবুহু মাছিহাতার বড় পীরছাবের মত দেখতে। দাড়ি, টুপি, পড়নে লম্বা পাঞ্জাবী, গালের ভেতর পানের খিলি। একপাশে ফুলে আছে। তফাত শুধু বড়বাবুর কপালে নামাজ পড়ার দাগ আছে যা বড় পীরছাবের নেই। আধ ঘণ্টা পর স্লিপ জমা দিয়ে বাইরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এত লোকের ইন্টারভিউ কিভাবে নেবে ! কতক্ষণ লাগবে ! এইযে বাইরে এত লোক তারা কখন সিপ্ল জমা দিল ! একজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম সেই সকাল থেকে শুরু হয়েছে।
বেলা চারটার দিকে আমার ডাক পড়ল। একজন পিয়ন নাম ধরে ডাকে। পনর জন। প্রতি গ্র“পে ! টাইপ রাইটার মাত্র পনেরটা একটা বড় কামড়ায় রাখা আছে। দুজন বড়সাহেব একজন করে বসাচ্ছেন। টেবিলে একটা টাইপ করা কাগজ রাখা আছে। এটাই টাইপ করতে হবে। একজন সাহেব বললেন, আমি যখন ষ্টার্ট বলব আপনারা শুরু করবেন। যখন ষ্টপ বলব তখন বন্ধ করবেন।
আমার তো চাকরির কোন আশা নেই। বসেছি যখন যা পারি টাইপ করি। অন্তত অভিজ্ঞতা তো হল। সাহেব ষ্টার্ট বলতেই যেন একটা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। টাইপ রাইটারের যুদ্ধ। কে বেশি এগোবে। সাহেব যখন স্টপ বলল, তখন আমার টাইপও শেষ। এই হল ইন্টারভিউ। কোন কথাবার্তা নেই। জিজ্ঞাসাবাদ নেই।
তিন দিন পর দুপুরে খেয়ে শুয়ে আছি। অলস মস্তিকে অনেক ছবি ভেসে যেতে লাগল। লজিং দু মাস হয়ে গেল, চাকরি কবে হবে কে যানে! মনের ভেতর থেকে অনেকে ছবি বেরিয়ে আসতে লাগল। প্রথমেই এল ধলাই বিল। বিল এখন পরযায়ী পাখীর দখলে। কত রংয়ের, ছোট বড় কত পাখী! ভাবনা ছিন্ন হয়ে মুহুর্তে চলে গেল কুমিল্লা শহরে। নাজমার চেহারা ভেসে উঠল। নাজমার কথা মনে হতেই নিজকে অপরাধি মনে হল। অন্তত একটা টিঠি লিখা উচিত ছিল। খালাম্মা এত করে বলে দিয়েছিল। আমি এখন জীবনযুদ্বে লিপ্ত। একটা এনভেলাপের পয়সাও আমার কাছে এখন অনেক। এ কথা তো কাউকে বলা যায়না! তাছাড়া মনের যে অবস্থা, তাতে চিঠি লিখা যায় না। কান্না যায়। আলাউদ্দিনের সাথে দেখ হয় না কয়েকদিন হয়ে গেল। আজ একটু পরেই বেড়িয়ে যাব তার কাছে। এমন সময় একজন দরজার বাইরে জিজ্ঞেস করছে, এ নামে এই বাড়ীতে কেউ থাকেন নাকি?
গাবড়ে গেলাম। এ তো আমার নাম ধরেই বলছে! এমন কিছু তো করিনি যার জন্য ঘরে এসে কেউ খোঁজ করতে পারে। রশিদের সাথে যে দু'এক জায়গায় গেছি এমন কোন গন্ডগোল তো হয়নি। টিকাটুলির দেশবন্ধুতে একটা লোককে থাপ্পর দেয়া ছাড়া- তাও তো আমি ছিলাম অনেক পেছনে। আমি যে তাদের দলের ছিলাম সেটা তো বুঝার উপায় ছিল না। তাছাড়া আর কি হতে পারে। বললাম, হ্যাঁ, আমার নাম।
আমি সি এন্ড বি অফিস থাইকা আইছি। এই যে আপনার এপয়েন্টমেন্ট লেটার। বড়বাবু বললেন, তাড়াতাড়ি দরকার। তাই হাতে হাতে নিয়া আইছি। নেন, সই করেন। বলে একটা চিঠি হাতে দিয়ে ছোট একটা খাতা এগিয়ে দিল।
আমার হাত কাপছে ! বলে কি ! এপয়েন্টমেন্ট লেটার! আমি কি সত্যি সত্যি সই করছি, না কি স্বপ্ন দেখছি। এ যে অসম্ভব ! কি পরীক্ষা দিলাম যে আমাকে এপয়েন্টমেন্ট দিল। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছেনা। কাপা হাতে সই করে চিঠিটা নিলাম। পিয়ন কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে একটা সালাম দিয়ে ফিরে চলল।
আমার মাথাটা ঠিক নেই। সুখবর যারা বয়ে আনে তাদের খুশি করতে হয় বলতেন শশি বাবু। এ যে আমার সবচেয়ে বড় সুখবর। বয়ে আনল যে লোকটা তাকে কিছুই দিলাম না। সাথে সাথে দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম। তার হাতে একটা টাকা দিয়ে বললাম, অফিসে দেখা হবে। সে হাসিমুখে আর একটা সালাম দিয়ে চলে গেল।
খামটা খুলে পড়লাম। নিয়োগ পত্র। বেতন একশ দশ টাকা! এত টাকা! কোথায় খরচ করব! বাড়ীতে পঞ্চাশ টাকা দিলেই তো খুব আরামে চলতে পারবে। কারন এখন তো মাত্র পাঁচজন খানেওয়ালা। সব বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট দুটা ভাই। নাছির চতুর্থ শ্রেণীতে, আর রিয়াজ দ্বিতীয় শ্রেণীতে। মানু ভাই একা। স্ত্রী তালাক দিয়েছে অনেক আগেই। বনিবনা হয়নি। বোধ হয় হিসেবে মিলেনি। যৌতুকের হিসেব। আর বাবা মা। এখন আমার কর্তব্য ছোট দুটা ভাইকে মানুষ করা আর বাবা মাকে সুখ দেয়া। চাকরি পেয়ে গেছি! খবরটা বাড়ীতে পাঠাই কি করে! যত তাড়াতাড়ি পারা যায়!
শেষের দিকে লেখা, মেট্রিকের সার্টিফিকেট বা সত্যায়ীত কপি এবং টাইপিং স্কুলের প্রমাণপত্রসহ অত্র অপিসে যথা শীঘ্র যোগাযো করুন। একবার দুবার বারবার পড়লাম! তাহলে সত্যিই পেয়ে গেলাম!
স্কুলে ইংরেজি “রচনা পড়েছিলাম। এইম ইন লাইফ। মানে আমার জীবনের লক্ষ্য কি। আমার জীবনের লক্ষ তো একটা চাকরি। আর কি হতে পারে! এটা পেয়ে গেছি! জীবন পূর্ণ! আর কিছু চাওয়ার নেই! 
যারা সংকীর্ণ পরিবেশে জন্মগ্রহন করে সংকীর্নতায় বড় হয় তাদের মনও সংকীর্ণ থাকে। বড় কোন চিন্তা তাদের থাকে না। সাহস পায় না। সংকীর্ণতার গন্ডিতে আবদ্ধ থেকে জীবন কাটিয়ে দেয়। সামান্য পাওয়াতেই তারা খুশি থাকে। উপরের দিকে তাকাতে ভয় পায়।
আমি এখন সম্পূর্ণ সুখি। ঢাকা শহর! টাকার সন্ধান পেয়ে গেছি! রাত আর কাটেনা। কত রকমের হিসাব নিকাশ করছি! কার জন্য কি লাগবে, প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে কি কি করতে হবে। কি কি কেনার খুব দরকার, কার জন্য কি দরকার এসবের একটা লিষ্ট করলাম মনে মনে। ঘুম আসছেনা, সময় কাটছে না। কখন ভোর হবে, কখন গিয়ে অফিসে পৌঁছব! তর সইছেনা। কাগজপত্র যা চেয়েছে সব আছে। 
সকাল হতেই হাত মুখ ধুয়ে কিছু না খেয়েই নাচতে নাচতে রওয়ানা দিলাম। হেটে। আধা ঘন্টার পথ। আমার বিশ মিনিট লাগল।
অফিসে ঢুকে সামনেই বড় বাবুর টেবিল। আমি ধরে নিয়েছি বড়বাবুই বুঝি সব। কারণ ইন্টারভিউর সময় তার কাছেই স্লিপ জমা দিতে হয়েছিল। একটা সালাম দিয়ে লেটার এবং কাগজপত্র টেবিলে রাখলাম।
মাথার টুপিটা একটু ঠিক করে আমার দিকে না তাকিয়ে কাগজগুলো দেখতে লাগলেন। পান চিবোতে চিবোতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষন। পাশে রাখা একটা বাস্কেটে পানের পিক ফেলে বললেন, তোমাকে এখানে ইন্টারভিউ দিতে কে পাঠিয়েছিল ?
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেইঞ্জ।
তারা দেখে নাই তোমার বয়স কত ? ওরা পাঠাল কেমন করে ? আঠার হতে আরও সাত মাস বাকি। ওদেরকে তো সব ইনস্ট্রাকশন দেয়া আছে। তোমার ইন্টারভিউ নেয়াটাই ভুল হয়েছে এবং তার জন্য এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেইঞ্জ দায়ী! যাও, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেইঞ্জে যাও। সরকারি আইন, আমার করার কিছু নেই! চাকরি হবে না!
আমি বুঝাতে চেষ্টা করলাম যে আপনাদের কাজ হলেই তো হল, বয়স দিয়ে কি হবে ? তিনি কোন কথাই শুনতে চাইলেন না। যাও! বিরক্ত করোনা! আইনের বাইরে আমি যেতে পারি না!
আকাশ থেকে পড়লাম! স্বপ্ন ভঙ্গ! ভিক্ষুকের রাজা হবার স্বপ্ন! এক রাত্রের। কত প্ল্যান করে ফেলেছি! প্রথম মাসের বেতন পেয়ে বড় চাচার নামে খতম পড়াব, কার কি লাগবে সব কিনে দেব। বাবা মায়ের জন্য নতুন কাপড়, নাছির রেজুর জন্য সার্ট। আমার একটা পেন্ট। কত কি! সব হাওয়ায় মিলিয়ে গেল! এমনি কত স্বপ্ন মানুষের মুহুর্তে বাতাসে মিলিয়ে যায়!

-৩৩-

বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। কেউ হেসে হেসে কথা বলছে, কেউ বিড়ি টানছে, হাটছে, যাচ্ছে। সবাই ব্যস্ত। আমি যেন অপ্রকৃতস্থ। কিছুই দেখছিনা। এখন কি করব! হয়ে ও হলনা! কি এমন বিরাট আশা! সামান্য একটা চাকরি! আমার যোগ্যতা দিয়ে, কারও কাছে দয়া নয়, ভিক্ষা নয়! সরকারের আইনের উপর মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। সতের বছর করলে এমন কি ক্ষতি হত!
বারান্দায় এক পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি কি করব। উত্তর দিকে একটা দরজা আছে। মানুষ আসা যাওয়া করছে। আমিও এগিয়ে গেলাম। কয়েকজন পিয়ন মিলে বসে চা খাচ্ছে। এখান থেকে রমনা পার্ক দেখা যায়। একটা চায়ের দোকান। ইটের পর কেটলি বসিয়ে চা গরম হচ্ছে। একটা বালতিতে পানি। সেখানে কাপ ধুয়ে চা বিক্রি হচ্ছে। দুটা ইটের উপর একটা টিনের বয়ামে কুকিস বিস্কুট। দেখতে ইংরেজি অক্ষর এস-এর মত। বেলা দশটা। অফিসের কয়েকজন লোকও এক পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। দেখাদেখি আমিও এক কাপ চা আর একটা কুকিস বিস্কুট নিলাম। খাচ্ছি আর আকাশ পাতাল ভাবছি।
বড় বাবু নামাজ পড়তে পড়তে কপালে কড় পরে গেছে। আল্লাহভক্ত মানুষ। পীরছাবের মত চেহারা। নিশ্চয়ই দয়ালু। তাকে আবার বুঝিয়ে বললেই হবে।  কাল আবার এসে বুঝিয়ে বলব।
পরের দিন আবার অফিস। বড় বাবু। বড় বাবুর মেজাজ একই। উত্তর অপরিবর্তনীয়। সরকারি আইন অমান্য করা যায় না। ইটের চায়ের দোকানে চা খাচ্ছি। পেছনে থেকে সেই পিয়ন, যে এপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে গিয়েছিল, এসে সেলাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, স্যার আপনে এখনও জয়েন করেন নাই ?
তাকে দেখে আমি যেন একটা মনের মত মানুষ পেলাম। অন্তত মনের দুঃখটা বলতে পারব। যদিও টাকাটার কথা মনে হল। একবারে জলে গেল!
না, জয়েন করতে তো দিল না!
কি বলেন ? দিল না মানে ?
আমার বয়স হয়নি। সরকারি চাকরিতে আঠার হতে হয়। আমার আরও সাত মাস বাকি আঠার হতে।
বলেন কি ? বড়বাবুর সাথে আলাপ হইছে ?
তিনিই তো বললেন।
তাইলে আমি একবার আলাপ কইরা দেখি আপনে যদি রাজি হন।
আমি তো রাজি। একটু দেখুন না। বড়বাবুকে রাজি করানো যায় কিনা! বলবেন, আমার চাকরিটার খুব দরকার।
ঠিক আছে, আপনে কালকে একবার আসেন। এর মাঝে আমি কথা বলে দেখি। বলে অফিসের দিকে চলে গেল।
একটা আশার আলো। যদিও ক্ষীন যা নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে। ক্ষীন হোক আর তীব্র হোক এই আশাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষ বেঁচে থাকে।
পরের দিন এসে আর অফিসের ভেতরে যাইনা। কোন লাভ নেই। আজ পিয়নের অপেক্ষায় আছি। নাম কালামিয়া। কালামিয়া কখন আসবে, আমার জন্য আবার সুখবর নিয়ে আসবে। সে কাজ করে এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। বেশি ব্যস্ত থাকে। সময় পেলেই এখানে চলে আসবে। কাল কথা হয়েছে। অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
এক সময় এল। এসেই দোকানদারকে বলল, এই দু কাপ চা তাড়াতাড়ি দাও। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার খবর আছে। আমি বড় সাহেবকে চাটা দিয়ে আসি।
তাহলে কাজ হয়ে গেছে। বড়বাবুর দয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই রাজি হয়েছে। যাক, একটা উপায় হবে।
এর মাঝে কালামিয়া ফিরে এল। আমাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে বলল, বড়বাবুর সাথে কথা হয়েছে। দুইশ টাকা লাগবে। এর কম হবে না।
দুইশ টাকা মানে! কি করতে হবে ?
বড়বাবুকে দিতে হবে। তিনি একা খান না। ভাগ অনেক জায়গায় দিতে হয়। যদি হয় তাহলে বলেন আমি বাবুকে বলি।
বলে কি! এত টাকা ! বড়বাবুকে দিতে হবে! তাহলে চাকরি হবে! তার মানে ঘুষ! বড়বাবু ঘুষ খায় ? এমন পরহেজগার মানুষ ঘুষ খায় কি করে! নিশ্চয়ই এই কালামিয়ার কারসাজি! বড়বাবু ঘুষ খেতেই পারে না!
বললাম, না কালামিয়া। আমার এক পয়সা দেবার ক্ষমতা নেই। বড়বাবুকে বল, যদি পারে তাহলে আমার বেতন থেকে মাসে মাসে নিয়ে নিতে। কেশ টাকা দেবার মত আমার ক্ষমতা নেই। 
কালামিয়া বেজার হয়ে বলল, কেশ ছাড়া এসব কাজ হয় না। না পারলে আর কি করা যাবে। বলে সে অফিসের দিকে চলে গেল। কাকরাইল ধরে হাটছি আর ভাবছি টাকাটা কে নেবে ? কালামিয়া ? না বড়বাবু ? যদি বড়বাবু নেয় তাহলে আইন বদলাবে কি করে ? আইন কি বড়বাবুর হাতে ? যদি তাই হয় তাহলে কোথায়ও একটা পথ আছে যা খোলা যায়। কেউ খুলতে চায়না। স্বার্থ ছাড়া। সন্ধান করতে হবে। কালামিয়াকে দিয়েই।
এখন প্রতিদিন অফিসের পেছনে ইটালি রেস্টুরেন্টে চা খাই, ইটের উপর বসে থাকি। দু' একজনের সাথে কথা হয়। চা খেতে অনেকেই আসে। যখনই কালামিয়ার দেখা পাই তখনই বলি, একটা ব্যবস্থা করতে বলেন। কালামিয়া বলে, চেষ্টা তো করলাম। দেখি কি হয়।
প্রায় দু সপ্তাহ কেটে গেছে। একদিন একটা টুলের উপর বসে আকাশ পাতাল ভাবছি। কোন কিনারা নেই। একজন লোক এসে সামনে দাঁড়াল। লম্বা ছ' ফুটের কাছাকাছি। বয়স পঁচিশ/ছাব্বিশ। গায়ের রং আমার কাছাকাছি। পড়নে দামি পেন্টসার্ট। এই অফিসেই কাজ করে দেখেছি। বড়বাবুর রুমেই বসে। একটা বিরাট রুম। দশবারজন বসে। খুব কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা ভাই একটা কথা জিজ্ঞেস করি মনে কিছু নিবেন না। আপনাকে মাঝে মাঝে দেখি বড়বাবুর সাথে কথা বলেন, আবার কালামিয়ার সাথেও। আর প্রতিদিন দেখি এখানে বসে থাকেন। ব্যাপারটা কি ? আমাকে খুলে বলবেন কি ?
চাকুরির জন্য আসি বড়বাবুর কাছে।
কত টাকা দিয়েছেন ? কালামিয়া না বড়বাবুকে ?
কোন টাকা দেইনি।
তাহলে ?
আমি ইন্টারভিউ দিয়ে পাশ করেছি এবং এপয়েন্টমেন্ট লেটারও পেয়েছি। কিন্তু আমার বয়স আঠার হয়নি বলে জয়েন করতে দেয়না।
এই কথা। বাড়ী কোথায় ?
কসবা।
কসবা বাড়ী ? চাকরি হয় না ? বড়বাবু জয়েন করতে দেয় নাই ?
তাইত ! আজ দু সপ্তাহ হয়ে গেল। সরকারি আইন, তাই দিতে পারেনা।
ওর বাপ পারবে ? আমার সামনে তো প্রায়ই পড়েন। একটা কথাও বলেন নাই কেন? আমার বাড়ী কাইতলা। আমার নাম আব্দুর রহমান। জানেন এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার কে ? আমাদের সালেহ সাহেব। গুলখারের। কসবার দ’ুশ লোক পাবেন। সবাইর চাকরি উনি দিয়েছেন। এমন লোকও আছে যারা লেখাপাড়া কিছুই জানেনা। জমিতে ক্ষেত নিড়াইত, সেখান থেকে ধরে এনে চাকরি দিয়েছেন। সেই কসবার লোক আপনি ! চাকরি হবে না মানে। আমি যা বলব তা করতে পারবেন ?
পারবনা কেন ? আমি এখন সব করতে পারি।
তাহলে চলেন আমার সাথে।
জহিরের গ্রাম সয়দাবাদের উত্তরে গুলখার। তার সাথে কাইতলা। গ্রামের নাম জানি, চিনি। কিন্তু সালেহ নামক কারও নাম আমি শুনিনি। ভাবখানা এমন করলাম যেন চিনি। কভার দিতে হবে যে। কারণ কার যে কত ক্ষমতা তা বুঝতে পারিনা। কেউ পারেনা।
সে তার টেবিলে গিয়ে বসল। আমাকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল, বসেন। বলল, বড়বাবুর পেছনে একটা কামড়া আছে। ঐ যে পাশেই দরজা। এখন সালেহ সাহেব অফিসে আছেন। কাউকে কিছু না বলে সোজা চলে যান। সেলাম দিয়ে প্রথম যে কথাটা বলবেন তা হল, আমার বাড়ী কসবা। তাপর বলবেন এপয়েন্টমেন্ট কার্ড পেয়েছি, বড়বাবু জয়েন করতে দেয়না। বাস, আর কিছু বলতে হবে না।
যেভাবে বলা সেভাবে কাজ। ভেতরে গিয়ে সালাম দিয়ে বললাম। কসবা বলতেই মুখ তোলে তাকালেন। যখন বললাম বড়বাবু জয়েন করতে দেয়না, তখন বললেন, এই বাচ্চা বয়সে চাকরি করতে এসেছ কেন ? লেখাপড়া কর গিয়ে। যাও ! হবে না।
বিরস মুখে বেরিয়ে এলাম। এই ব্যাটা রহমান কি করল কাজটা। এখন তো বড়বাবুও ক্ষেপে গেল। একূল ওকূল দুকূলই গেল। বেরিয়ে আসতেই দেখি রহমান দাঁড়িয়ে আছে। আমার বেজার মুখটা দেখে সে হাসল। বলল, চলেন বাইরে যাই। চা খাই গিয়ে।
চা দোকানের সামনে গিয়ে দু কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে বলল, মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে আপনাকে ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছে। তাই মুখটা এমন বেজার।
অনেকটা তাই।
কোন চিন্তা নাই। একটু অপেক্ষা করুন। বড়বাবু এখনই লোক পাঠাবে আপনাকে খোঁজার জন্য। না হয় বড়বাবুর কপালে দুঃখ আছে।
রহমানের কথা ঠিক। চা শেষ। কালামিয়া আমার কাছে এসে হাজির। স্যার, বড়বাবু ডাকছেন।
রহমান বলল, বলছিলাম কিনা ? চলেন আমিও যাই।
বড়বাবুর সামনে যেতেই তিনি বসতে বললেন। এর আগে কোনদিন আমাকে বসতে বলেনি। তারপর কাগজকলম এগিয়ে দিয়ে বললেন, নিন জয়েনিং রিপোর্ট লিখুন। আপনি পাশের রুমে রফিক সাহেবের সাথে কাজ করবেন।
লিখলাম জয়েনিং রিপোর্ট। কি লিখতে হবে রহমান বলে দিল। তারপর বলল, কি বড়বাবু ! এখন আইন বদল করলেন কিভাবে ? এতদিন পারেন নাই কেন ? একে বলে ঠেলার নাম বাবাজি। আপনি তার এই দুই সপ্তাহের বেতন দিবেন ? এখন কিভাবে জয়েন করতে দিলেন সেটা বলুন তো।
বড় সাহেব লিখেছে। আঠার হবার আগে কাজ করলে সেটা ব্ল-বুকে যোগ হবে না। মানে তার চাকরির মেয়াদে যোগ হবে না। কাজ করতে পারবে।
এটা আপনি আগে জানতেন না ?
আমার খেয়াল ছিল না।
শুনলাম টাকা দিয়ে ওটা বদলানো যেত এমন কথা তাকে বলা হয়েছে। জানেন এ কে ? ও ছেলে মানুষ জানতনা সালেহ সাহেব এখন এই অফিসে। সালেহ সাহেবের বাড়ীর লোক। আপনি যা করলেন। সবকিছুতেই আপনার টাকা চাই।
রহমান সালেহ সাহেবের খালাত ভাই। কেরানীর চাকরি করেও সে অনেক ক্ষমতা রাখে। খুটির জোড়ে। অফিসে সবাই জানে। অনেক মানুষের চাকরি দিয়েছে। রহমান খবর নিয়ে জেনেছে ইন্টারভিউতে আমি দ্বিতীয় হয়েছিলাম। এখন এর কোন মূল্য নেই। তার কাছেই বড়বাবুর কেচ্ছাকাহিনী শুনলাম। এখানে টাকার খেলা। উড়ছে। আকাশে বাতাসে। পথে ঘাটে। শুধু ধরার কায়দা জানা চাই। বড়বাবু সব জানেন। কোন কন্ট্রাক্টর কোন কাজের জন্য কত ভাগ দেবে, কেন দেবে সব। চাকরি দেবে। কোন লোকের কাছ থেকে কত টাকা নিতে হবে তা তিনি ঠিক করে দেন। নামাজ কাজা করেন না। হজ্বে যাবার এরাধা করছেন। মোট কথা ঘুষ ছাড়া তিনি কথা বলেন না। তিনটা বাড়ী করেছেন। আরও জায়গা রেখেছেন। গ্রামের বাড়ীতে বড় একখানা বাড়ী, জমি জমা আছে। টাকার পাহাড়। এত টাকা জমেছে। কাজে লাগাতে হবে তো। হজ্বে গেলে দু কাজই হল। দুনিয়ার আখেরাতের।
জিজ্ঞেস করলাম আখেরাতে হবে বুঝলাম, দুনিয়ার হবে কি করে ?
হজ্ব করলেই তো তিনি আর একটা সার্টিফিকেট পেয়ে যাবেন। আলহাজ মৌলানা। তখন ঘুষ নিতে লাজলজ্বা আরও কমে যাবে। মানুষ তখন আরও হাদিয়া দেবে। ঘুষ নয়।

-৩৪-

রফিক সাহেব আমার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে বললেন, স্কুল থেকে সোজা চলে এসেছ মনে হয়। বয়স কত ? তোমার তো কলেজে পড়া উচিত। ঐ টেবিলে তুমি বসবে। কোন কাজ নেই। মাসে একটা ষ্টেটমেন্ট টাইপ করতে হয়। সারা মাস তুমি বসে বসে কাটাবে। তোমার সময় তুমি কাজে লাগাবে। বই নিয়ে আসবে। টেবিলে বসে বসে পড়বে। মনে হল শশি বাবু পড়ার জন্য আদেশ করছেন। এটা অফিস নয়। স্কুল। তারপর সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, কবসার একমাত্র লোক যে নাকি ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি পেয়েছে।
রফিক সাহেব যেন সিনেমার নায়ক। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। পোষাকে ব্যবহারে একবারে সাহেবি চালচলন। কথাবার্তায় মনে হয় আমার একজন হিতৈষী। অনেক দিনের চেনা। আপনজন। চাকরি বলতে যে কথাটা সর্বদা মনে আতঙ্ক জাগাত কার্যক্ষেত্রে তা কিছুই না। এই সামান্য কাজের জন্য এতদিন আমাকে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছে। পাবার আশায়। পেয়ে গেছি। কোন কাজ নেই। কিন্তু মাসের শেষে আমার বেতন মিলবে। সরকারের এই নিয়ম। খাতায় নাম লেখাতে পারলেই হল। নাম লেখাতেই যত ঝামেলা,  ছয়নয়ের ব্যাপার।
রফিক সাহেব বলেছেন বই নিয়ে যেতে হবে। কি বই ? বই কোথায় পাব ? নজরুলকে বললাম, তোমাদের ঘরে কোন উপন্যাস জাতীয় বই আছে ? সে তার বড় বোনের কাছ থেকে শরৎচন্দ্রের দেবদাস এনে দিল। তা নিয়ে অফিসে গেলাম। কোন কাজ নেই। বই পড়ছি। রফিক সাহেব এসে জিজ্ঞেস করলেন, কি বই পড়ছ ?
দেবদাস।
দেবদাস কেন পড়বে ? কলেজের বই আনবে। তুমি কলেজে পড়বে। এখন নাইট কলেজ অনেক হয়েছে। দুটার সময় অফিস শেষ। তারপর তোমার সময় কাটে কি করে ? ভর্তি হয়ে যাও। সময় কাজে লাগাও। দরকার হলে আমি তোমাকে আরও সময় করে দেব। তোমার কাজ এটা নয়। এগুতে হবে।
একবারে যেন শশিবাবু। ধমকও দিচ্ছেন। কলেজে পড়ব ! আমি কি লেখাপড়া জানি ! স্কুলেও তো তেমন পড়াশুনা করিনি। সময় পাইনি। কিভাবে যে মেট্রিক পাশ করলাম তা নিজেই জানিনা।  আমতা আমতা করে বললাম, আমিও ভাবছি কলেজে ভরতি হব। 
ভাবছি নয়, চাকরি যাবে না। তোমার এখন একটাই কাজ লেখাপড়া করা। আগামী দু বছরের মধ্যে আমি তোমাকে অন্য টেবিলে দেখতে চাই।
প্রথম বেতন পেয়ে প্রথম বাড়ী যাব। চাচার নামে খতম পড়াব। অনেকের জন্য অনেক কিছু কেনা হল। রফিক সাহেব একজন কন্ট্রাক্টরকে কি যেন বললেন। একটু পরে আমার হাতে পঁচিশ টাকা দিয়ে গেল। চা খাবেন।
টাকাটা হাতে নিয়ে বসে ভাবছি এটা কি ? কেন দিল ? কি করব এ টাকা দিয়ে ? রফিক সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, তুমি যে ষ্টেটমেন্ট তৈরী কর সেটা ওনাদের কাজ। তাই তোমাকে খুশি করেছেন। রেখে দাও।
রহমানকে জিজ্ঞেস করলাম। রহমান বলল, সবাই পায়, সবাই খায়। তুমি বাদ যাবে কেন ? এটাই এই অফিসের নিয়ম। এটা খাওয়ার জন্য যে  কত রকম রাস্তা বের করে নেয়। একটা অলিখিত নিয়ম।
এটা তাহলে ঘুষের চাকরি। হারাম। বাবা শুনলে হয়ত বলবেন, না এসব টাকা হাত দেবেনা। পীরছাব কি বলবেন ? না টাকাটা খরচ করা যাবে না। পীরছাব হুজুরকে জিজ্ঞেস না করে।
এই হারাম হালাল নিয়ে আমার ভেতর একটা দ্বন্দ আছে। ছন্দের তালে তালে যখন তখন নাচে। কোনটা হারাম আর কোনটা হালাল আমাকে জানতে হবে। পীরছাব যখন পানি পড়া আর তাবিজ দিয়ে টাকা নেন তখন ওটা হালাল। একটা কাজের বদলে হাদিয়া। কিথ—ু গাছের ফলমূল তরিতরকারি ক্ষেতের ফসল যখন নৌকা বুঝাই করে দিয়ে আসে সেটা কি ? তখন তো পানি পড়া বা তাবিজ দেননা। সেটা হালাল কিনা ? কিসের বিনিময়ে এসব জিনিষ গ্রহণ করেন ? জমিজমা যখন কেউ তাদের নামে লিখে দেন তখন ? সেটা কি আল–াহকে পাবার জন্য নাকি বেহেস্তে যাবার জন্য। এটা কি কোন ধরনের ঘুষের আওতায় পড়ে ? যাই হোক, পীরছাব হুজুর তো এমনিতেই দোয়া করতে পারেন। ধনদৌলতের বিনিময়ে কেন ? বাবাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম। উত্তর, আল–াহর কাজ যারা করেন তাদের তো চলতে হবে। আমরা না দিলে তারা চলবে কি করে ? আমার মনে আরও প্রশ্ন ছিল, আমাদের উপর নির্ভর করতে তাদের কে আদেশ করেছে ? কাজ করে খেতে পারে না ? বেয়াদপি হবে বলে মুখ দিয়ে আর কথা বের হয়নি। এই পঁচিশ টাকা নিয়ে বাবার হাতেই দেব। জিজ্ঞেস করব এখন ফতোয়া কি ? বাড়ীর সবাই কমবেশি ফতোয়া জানে। ইমাম চাচার স্থানে এখন মহিউদ্দিন ভাই। তাঁর ফতোয়া ফাইনাল। সন্দেহ দেখা দিলে পীরছাব।
কসবা ষ্টেশনে নেমে একটা রিক্সা নিলাম। আমার পকেটে আশি টাকা আর পঁচিশ টাকা। আমি যেন আকাশে উড়ছি। দিগি¦জয়ী বীর। ওয়াটারলু যুদ্ব জয় করে এসেছি। পকেটে টাকা হাতে অনেক জিনিষ। আর খালি হাতে নেই। পকেটে টাকা থাকলে পৃথিবীর রূপ বদলে যায়।
উত্তরের আকাশটা মেঘলা। হয়ত বৃষ্টি আসবে। মেঘগুলোকে মনে হচ্ছে শিল্পীর আঁকা ছবি। তাকিয়ে থাকলে অনেক কিছু খোঁজে বের করা যায়। মনে আনন্দ থাকলে। আনন্দে আমি ভাসছি।
বাড়ী পৌঁছার সাথে সাথে একটা হৈচৈ শুরু হল। আনন্দের। যখন সকলের জিনিষ বের করে দিলাম, তখন সবাই আনন্দে হতবাক। সামান্য জিনিষে মানুষ কত সুখি হয়। কত আনন্দ পায়। পৃথিবীর সকল আনন্দ এ বাড়ীতে জমা হয়েছে।
রাতে খেয়ে দেয়ে মায়ের হাতে আশি টাকা দিলাম। মা হাতে নিয়ে বলল, তোমার বাবার হাতে দাও। বাবা বললেন, না তোমার মায়ের হাতে দাও বলে হাসিমুখে বললেন, এইবার মানত আদায় করে দাও। একটা খাসি মানত আছে পীরছাবের বাড়ীতে। তোমার চাকরির জন্য।  আমার মানত ছিল। তাড়াতাড়ি আদায় করে দাও।
সমস্ত আনন্দ মাটি হয়ে গেল। মনে হল গজব। পাশ করাটা গজব, চাকরি পাওয়াটা গজব। এই বাড়ীটাতে গজব। ইচ্ছে হল সব ছেড়ে দেই।   একটা খাশি কমপক্ষে তিরিশ টাকা! আমার বেতন থেকে! পীরছাবের জন্য। বাবার মানত। আমার জন্মদাতা। তাদেরকে খুশি করতে হবে। আমার যত অসুবিধে হোক, কষ্ট হোক তাতে কিছু যায় আসেনা। এইসব ব্যবসার জন্যই তো আমার জন্ম। দুনিয়া আখেরাতের সুখ। আমার সব ব্যবস্থা করতে হবে। বাবার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত সুখ আনন্দ ওই খাসির ভেতর লুকিয়ে আছে। পীরকে দিলে বাবা সব আনন্দ লুটে নিবেন। বেহেস্তে যাবার রাস্তা পাকা হবে। রাগে আমি থর থর করে কাঁপছি। কি বলব। কার সাথে রাগ করব। আমার বাবা তো আর দশটা মানুষের মত অশিক্ষিত নন। কিথ—ু ওই কুসংস্কারের গন্ডি পেরিয়ে এখনও আসতে পারেননি। পারবেনওনা। আজন্ম বিশ্বাস যা বদ্বমূল হয়ে গেধে গেছে তা নিয়েই চলতে থাকবে। কোন কিছুতেই কিছু পরিবর্তন হবে না।
বললাম, কেন তুমি এসব মানত করতে গেলে ?
মানতের গুনেই তো তুমি চাকরিটা পেয়েছ। না হয় এত অল্প বয়সে কেউ চাকরি পায়? মানুষের ঈমানই সবকিছু। আল–াহর উপর ঈমান রাখবে, পীরকে খুশি করবে। পীরের দোয়ায় সবকিছুই সহজ হয়। বালামুছিবত দূর হয়।  মানত আদায় কর। তোমার আরও উন্নতি হবে।
শেষের কথায় আদেশের সুর। এই আদেশ শিরোধার্য করার জন্যই আমার জন্ম। পালন করতে হবে। আমার কোন মতামতের দাম নেই। থাকতে পারেনা। 
একটু শান্ত হবার পর সেই পঁচিশ টাকা। বাবার হাতে দিয়ে বললাম, এই টাকা একজন কন্ট্রাক্টর দিয়েছে। আমি চাইনি। এখন এই টাকা কি করব বলে দিন।
তুমি কি তাদের কাজ কর ?
না, আমি সরকারের কাজ করি, বেতন পাই।
তাহলে এই টাকা কন্ট্রাক্টর দেবে কেন ?
আমাকে খুশি করার জন্য।
তার মানে ঘুষ। এটা হারাম। ফেরত দিয়ে দাও। বলে আমার হাতে ফেরত দিলেন।
 মানু ভাই কাছেই ছিল। তিনি বললেন, মহিউদ্দিন ভাইকে জিজ্ঞেস করে দেখি কি বলে। আমাকে বললেন, টাকাটা আমার কাছে থাক এখন। আমি নিজে মহিউদ্দিন ভাইর কাছে যাব।
মহিউদ্দিন ভাই আরও সাংঘাতিক ফতোয়া দিলেন। এই টাকা ঘরে থাকাও গুনাহ। যতক্ষন পর্যন্ত এই টাকা আমার কাছে থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহর লানত বর্তাবে আমার উপর।
আমি বললাম, আমি তো টাকা চাইনি। জানিওনা কেন এ টাকা দিয়েছে। পরে শুনলাম খুশি হয়ে খুশি করার জন্য দিয়েছে। যেমন পীরছাবকে মানুষ খুশি হয়ে কিছু দেয়। তখন তো পীরছাব ফেরত দেন না বা মানা করেন না। ফেরত দিলে বান্দা অখুশি হয়। বান্দাকে খুশি করা মানে অল্লাহকে খুশি করা। তাই তিনি মানা করেন না। খুশি হয়ে খুশি করেন। আল্লাহও খুশি হয়। আিম যদি এ টাকাটা ফেরত দেই তাহলে কন্ট্রাক্টর অখুশি হবে। সেটা কি ঠিক হবে ? তাছাড়া আমাদের অফিসের সবই তো কম বেশি এ ধরনের টাকা নেয়। বড়বাবু একজন পরহেজগার মানুষ, জবরদস্ত মৌলানা। তিনি তো এসব টাকা দিয়েই কত কত সম্পত্তি করেছেন। এখন হজ্বে যাবার এরাদা করেছেন।
তিনি বললেন, এই সব লোক হাবিয়া দুজখে যাবে। এর কোন দুসরা ফতোয়া নাই। হজ্ব হবে না। সৎপথে রোজগার না করে হজ্ব করলে কবুল হবে না। তিনি যতবারই হজ্ব করেন না কেন! এমন কি হারাম রোজগার খেয়ে কোন এবাদত বন্দেগীও কবুল হবে না।
চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী। এই ফাও টাকাটা মানু ভাইর খুব দরকার। কিভাবে হালাল করা যায় সে চেষ্টায় আছে। মহিউদ্দিন ভাইর ফতোয়া শুনে হতাশ। এখন কি করা যায়। আমার চাকরি হওয়ার তার অনেক আনন্দ। আর একটা বিয়ে করতে হবে। তার হাতে একবার টাকা গেলে সেটা ফেরত আসে না। বিশেষ করে এই ফাও পঁচিশ টাকা। আমাকে বলল, পীরছাব হুজুরকে জিজ্ঞেস করতে হবে। দেখি উনি কি বলেন। সে নিজেও একটা ফতোয়া তৈরি করেছে। টিকবে কিনা সন্দেহ। তাই পীরছাবের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
সেই আশি টাকা থেকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে দুটো খাসি কিনে হুজুরের দরবারে পৌঁছানো হল। হুজুরের আসার ঠিক নেই। দেরি করা যাবে না। তাই বাবা এবং মানুভাই দুজনে মিলে নিয়ে গেলেন মাছিহাতায়। পীরছাবের সামনে খাসি রেখে বাবা করজোড়ে বললেন, হুজুর সামান্য মানত ছিল। একটা তার পাশ করার জন্য আর একটা চাকরির জন্য। দুটোই হয়ে গেল। তাই এই সামান্য মানত। তার জন্য একটু দোয়া করবেন। জীবনে যেন উন্নতি করে। হুজুর হাত তোলে আমার জন্য খাস দিলে দোয়া করলেন। সাথে আমার পূর্ব পুরুষ, আগামি পুরুষ চৌদ্দগোষ্ঠির জন্য। সবাই বেহেস্তে যাবে। উন্নতি করবে। আর কোন চিন্তা নেই।
হুজুর যখন একটা ছোটখাট উপদেশ শেষ করলেন মানুভাই সুযোগ বুঝে কথা বলল। বলল, হুজুর বাহারের অফিসের কন্ট্রাক্টর পঁচিশ টাকা দিয়েছে তাকে খুশি করার জন্য। নিজের থেকে।  বাহার চায়নি। এখন এই টাকাটা কি করা যাবে ?
হুজুর একটু চিন্তা করে বললেন, এসব টাকা সংসারে খরচ না করাই ভাল। সে যখন চেয়ে নেয়নি, যদি খুশি হয়ে নিজের ইচ্ছেয় দিয়ে থাকে তাহলে সে টাকাটা গরীব দুঃখিকে দান করতে পারে অথবা আমাদের বাড়ীর মাজারে দান করতে পারে।
দুমাস পর বাড়ী গিয়ে মানুভাইর কাছে এই ফতোয়া শুনলাম তখন সেই পঁচিশ টাকার কোন চিহ্ন নেই। মানু ভাই নিজেই গরীব হয়ে খরচ করে ফেলেছে। ফতোয়া অনুযায়ী। বলল, মহিউদ্দিন ভাইর ফতোয়া অনেক শক্ত!
-৩৫-

কয়েক দিন পর রহমান খবর দিল ফিসারিজ ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনে একজন লোক নেবে। রফিক সাহেবকে বলে ছুটি নিয়ে গেলাম ফিশারিজ অফিস ৪২ দিলকুশা। বড় সাহেব অনেকক্ষন অনেক বিষয়ে কথা বললেন। কোথায় কাজ করি, কত দিন। কবে এই কাজে যোগ দিতে পারব ইত্যাদি। বললাম, যে কোন দিন যোগদান করতে পারি।
তাহলে একটু বসুন। আপনার এপয়েন্টমেন্ট লেটারটা টাইপ করে দিয়ে দিচ্ছি। বলে তার সেক্রেটারিকে ডেকে তৈরি করতে বললেন।
আমার হাতে লেটার দিয়ে বললেন, যত তাড়াতাড়ি পারেন চলে আসুন। আমাদের তাড়াতাড়ি দরকার।
এখানে ঠিক চাকরি পাবার আশায় আসিনি। একটু দেখার ইচ্ছে ছিল। আশা না থাকলে আশা পূর্ণ হয় না। যখন পূর্ণ হয়েই যায় তখন আশা যেন ইচ্ছে হয়ে যায়। আমার তো আশাই ছিল না। পথে এসে চিঠি খুলে পড়লাম। বেতন ১৭৫ টাকা! একশ দশ টাকা থেকে ১৭৫ টাকা! উন্নতির এক ধাপ! মেট্রিক পাশের প্রমানপত্র চায়নি। আর কোন কিছু প্রয়োজন নেই। শুধু যত তাড়াতাড়ি যোগদান করা যায়! চাকরি পাওয়া এত সহজ!
অফিসে এসেই রফিক সাহেবকে খবরটা দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম এখন কি করব ?
কি আবার করবে ? কালই  যোগাদান কর! অনেক ভাল চাকরি! এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে !
এখানকার চাকরি ?
এখনই একটা রেজিগনেশান লিখে দাও। ব্যস, এখানকার ল্যাটা চুকে গেল। কোন পানা দেনা নেই। তবে মাঝে মাঝে আমার সাথে যোগাযোগ রাখবে। তোমার খবর জানলে আমি খুশি হব। তুমি অন্য জগতের ছেলে।
যোগদান করলাম ফিসারিজে। শুরু হল আর একটা জগত। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অফিস। ড্রেনের পঁচা গন্ধ নেই। কন্ট্রাক্টরের আনা গোনা নেই। এখানকার মানুষের পোষাক পরিচ্ছদও মনে হয় আলাদা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সবাই হাসি খুশি। অফিসের পরিবেশই আলাদা।  পরিবেশ মানুষকে বদলে দেয়।
আমার উপরওয়ালা শামসুল হক (বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর ডালিমের বাবা) সাহেব। লম্বা ছফুটের উপর। সাহেবি চাল চলন। কথা বলার আলাদা একটা ষ্টাইল আছে। যেন টেপ রেকর্ডার। দাড়ি কমার কোন ভুল নেই। যেখানে যেটা প্রয়োজন ঠিক সেখানেই বসিয়ে দেন। আমাকে আমার কাজ এবং টেবিল বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাজ চাই। পরিবর্তে আমার পূর্ণ সহযোগিতা এবং সুযোগ সুবিধা।
কিছুদিন যেতেই লক্ষ করলাম, হক সাহেব যখন তখন বাসায় চলে যান। মাঝে মাঝে অফিসের ইব্রাহিমকে বাসায় পাঠিয়ে খবর নেন। থাকেন বাসাবো ঝিলপাড়ে কলনিতে। ইব্রাহিম খবর বলে। ডালিম খুব ঝামেলা করে। পড়া শেষ না করেই খেলতে শুরু করে। কথা বললে কথা শুনে না ইত্যাদি।
ইব্রাহিম আমার পাশেই বসে। হক সাহেবের এক সময়ের ছাত্র। যখন গ্রামে ছিলেন। তারপর হক সাহেবের চাকরি হয়েছে। তিনি ইব্রাহিমকেও চাকরি দিয়েছেন। ইব্রাহিমের মুখ থেকেই সব শুনেছি। হক সাহেবের স্ত্রী নেই, ছেলে দুটা। ডালিম ক্লাশ নাইনে পড়ে। দুষ্টের এক শেষ। কোন কথাই শুনে না। এই জন্যই হক সাহেব যখন তখন বাসায় যান বা ইব্রাহিমকে যেতে হয়।
মানুষের জীবন নদীর মত। হঠাৎ হঠাৎ বাঁক নিয়ে ঘুরে যায়। কোথায় কখন বাঁক নেবে কেউ জানেনা।
রিফিক সাহেবের কথা বার বার মনে ধাক্কা দেয়। ঠিক করলাম কলেজে ভর্তি হব। জীবনে উন্নতি করতে হলে অর্থ এবং শিক্ষা দুইই চাই।
ধারে কাছে সিদ্বেশ্বরী কলেজ। টিএন্ডটি কলেজ তখনও শুরু হয়নি। ভর্তি হয়ে গেলাম। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যথ— ক্লাশ। আমার আমাকে সাজাতে হবে, তৈরি করতে হবে।
পরের দিন ক্লাশে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম! এরা সবাই ছাত্র! না শিক্ষক! কার বয়স কত! কয়েকজন তো পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে! আমার বয়সের কাছাকাছি আছে দু একজন। আর সবাই তিরিশের উপর। এরা সবাই চাকুরীজীবি। হয়ত তাদের পরিবারের একটা হিসাব ছিল। আমার মত। পাশ করার সাথে সাথেই সংসারের জোয়াল কাধে নিয়ে চলেছে। এমনি কত মেধা সুযোগের অভাবে তিলে তিলে শেষ হয়ে গেছে। সংসারের চাপে। সুযোগ পেলে হয়ত অনেকের জীবনের মোড় ঘুরে যেত! আজ এই বৃদ্ব বয়সে লেখাপড়ার সাধ জেগেছে অথবা বাধ্য হয়ে এসেছে। এদের কত ধৈর্য্য! কয়েকজন আছে একবারে মৌলানা। যেন হজ করে এইমাত্র ফিরে এলেন। কাচাপাকা দাড়ি, মাথায় টুপি, পড়নে লম্বা কোর্তা। সবাই বয়স্ক। এই লেবাসের একজন শুধু আছে আমার চেয়ে দু এক বছরের বড়। এদের কোন আশা ছিল কি! নাকি আমার মতই শুধু মেট্রিক পাশ করে একটা চাকরি চেয়েছিল! এই চাকরিকে মূলধন করে, ধাপে ধাপে এগিয় উপরে উঠবে, উন্নতির মাপকাঠি তৈরি হবে! আমার মত তাদেরও হয়ত পরিবারের দায়ীত্ব কাধে নিতে হয়েছে। না হয় মেট্রিক পাশের পর কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি কেন ? রাত এগারটায় ফিরলাম ঘরে। আমার খাবার ঢাকা আছে টেবিলে। খেয়ে শুয়ে পড়লাম। রশিদ ঘরে নেই। হয়ত আজ কোন একটা কিছু আছে কোথায়ও। এমনি মাঝে মাঝে উদাও হয়। কোনদিন জুয়ার আড্ডায়, কোনদিন ইউনিভার্সিটির হলে।
শুয়ে শুয়ে ভাবছি আমার এই ভাত খাওয়াটা যেন হালাল হল না। দেয়া নেয়ার হিসেবটা মিলাতে পারছিনা। আমি তো ছাত্র পড়াইনি। তাহলে কিসের বদলে আমি এই ভাত খেলাম! নতুন ঝামেলার সৃষ্টি। রাতে ক্লাশ করলে, সকালে অফিসে গেলে ছাত্র পড়াব কোন সময় ? আর আমিই বা পড়াশোনা করব কখন ? সিদ্বান্ত নিলাম মেসে চলে যাব।
আলাউদ্দিনকে বললাম। আর তো লজিং এ থাকা যাবে না। মাগনা বলে তো পৃথিবীতে কিছু নেই। দেবে আর নেবে। দিতে না পারলে নেবে কি করে। ছাত্র পড়াতে না পারলে তাদের বাড়ীতে থাকব কিসের বদলে আর খাব কোন অধিকারে। যে শুধুই নেয়, বদলে দেয় না কিছু সে ভিক্ষুক।

-৩৬-

আলাউদ্দিন বলল, আরে তুই বাসাবো চলে আয়। চল দেখি ‘ছাত্র নীড়'এ জায়গা আছে নাকি। বলে রওয়ানা দিল। মাঠের পশ্চিম দিকে একটা বাড়ী। ওয়ালের উপর টিন। দুপাশে দুটা একতলা ঘর। মাঝখানে একটা কুয়া। টিউবওয়েল নেই। কুয়ার পানি ব্যবহার করতে হয়। এটাই মেস। আকবর আলীর বাড়ী। বাড়ীওয়ালা থাকে পেছনে আর একটা ঘরে। সবই আলাউদ্দিনের বাড়ী ঘর যেন। বাড়ীতে ঢুকেই একটা হৈ চৈ শুরু করে দিল। কই তোমরা। খালুজি বাড়ী আছেন ? ডাকতেই একজন বেটে খাট লোক বেরিয়ে এল। আলাউদ্দিন বলল, খালুজি, ও মেসে থাকবে। আপনার এখানে কি রুম খালি আছে ?
হ, একটা রুম তো খালি আছে।
ভাড়া কত ?
তিরিশ টেকা। তিনজন থাকবার পারে এক রুমে।
আলাউদ্দিন জিজ্ঞেস করল, কি রে! পছন্দ হয় ?
মেসে ঢুকতেই ছোট একটা নেম প্লেটে লেখা আছে ‘ছাত্র নীড়' ২৭৭ বাসাবো। লেখাটা দেখে মন খুশি। এখানে তাহলে সব ছাত্র থাকে। ভালই হবে। একটা লেখাপড়ার পরিবেশ আছে। আমি সম্পুূর্ণ ছাত্র হতে চাই।
বললাম,হ্যা, পছন্দ হয়েছে। কালপরশু চলে আসতে চাই।
না, না এক তারিখে আয়। আরও দুজন খুজে দেখ। না হয় একা ভাড়া বেশি পড়বে। আরও দুজন নিয়ে বরং ধীরে সুস্থে আয়।
ক্লাশে দুএকজনের সাথে পরিচয় হয়েছে। বেশি বয়সের লোকগুলো খুব একটা কথাবার্তা বলে না। কম বয়সের ছাত্ররাই ক্লাশ মাতিয়ে রাখে। মতিনের বাড়ী কুমিল–া বাঞ্ছারামপুর। চাকরি করে ওয়াপদায়। নুরু ভাইর বয়সের। আমার সাথে খুব ভাব হয়ে গেছে। তাকে বললাম, মেসের জন্য দুজন লোক দরকার। সে সাথে সাথে বলে উঠল, আর আমিও তো মেস খুজছি। আমি থাকব আপনার সাথে। আমার এক সহকর্মী আছে, মালেক সেও আসবে। ব্যাস, হয়ে গেল।
রশিদকে বুঝাতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। অনেক ছয় নয় বলে, কলেজের কথা, লেখাপড়ার কথা। এখানে এখন আমার কর্তব্য পালন করতে পারবনা ইত্যাদি। বললাম, প্রতিদিন বিকেলে দেখা হবে। আগের মতই।
আগের মত আর কিছুই হয় না। মানুষ বদলায়, পরিবেশ, পরিস্থিতি বদলায়। মন বদলায়, মানসিকতা বদলায়। দিন বদলায়, যুগ বদলের সাথে তাল মিলিয় সব বদল হয়। আমি এখন সম্পুর্ণ ছাত্র হতে চাই। জীবনের উদ্দেশ্য স্থির করতে চাই। আমাকে কোথাও পৌঁছতে হবে। তার একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা টানা চাই। যা কোন দিন ছিল না। সেই গন্তব্য লেখাপড়া শেখা। সেইদিকেই এগিয়ে যেতে হবে।
মেসে এসে আর এক বদল। এখানে কোন ছাত্র নেই। যদিও “ছাত্র নীড়”। কবে কারা এখানে ছাত্র ছিল তারাই এর নাম দিয়েছিল ছাত্র নীড়। এখন এক রুমে আছে তিনজন সিলেটের। তারা চাকরি করে টিএন্ডটিতে। পাশের দুরুমে আছে সিলেটর তিনজন । সবাই চাকুরিজীবি। মনে হয় এটা সিলেটি মেস। আমরা তিনজন এখন কুমিল–ার। জলিল, জিয়া আর অহিদ থাকে পাশের রুমে। এই তিনজনের বাবুর্চি হাদি। আমরা ইচ্ছে করলে আলাদা বাবুর্চি রেখে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারি জিয়া বলল। আজ আমাদের সাথেই খাওয়া দাওয়া হোক। আপনারা ভেবে চিথে— ঠিক করুন।
তাই হল। ছয়জনের খাবার এক সাথে। হাদি বাবুর্চি। আর এক জগতে প্রবেশ।
দিন যায়। সময় যায়। মানুষের বয়স বাড়ে, অভিজ্ঞতা বাড়ে। বয়সের সাথে যৌবনের আগ্রহ বাড়ে। আমার বয়স এখন আঠার পেরিয়ে গেছে। চলাফেরার পথে সুন্দরি মেয়ে দেখলে নাজমার কথা মনে হয়। এতদিন হয়ে গেল কোন যোগাযোগই করলাম না। এখন আর করে লাভ কি! নাজমার হয়ত বিয়ে হয়ে গেছে। সুখে সংসার করছে। মাঝে মাঝে নাজমার কথা মনে করে আনমনা হয়ে যাই। মনের মাঝে একটা টান অনুভব করি যা কাউকে বলতে পারি না। 
অফিসে আমার সুনাম ছড়িয়ে গেল। সকলেই আমার উপর খুশি। এমন একজন লোকই তারা খুজছিল। আমাকে যে দায়ীত্ব দেয়া হয় আমি হাসিমুখে পালন করি এবং সঠিকভাবে। সামসুল হক সাহেব আমার উপর নতুন নতুন দায়ীত্ব দিয়ে আরও খুশি। সবই তো করতে পারে। আমাকে একটা বিভাগের দায়ীত্ব দেয়া হল। তাতে আমার কাজের পরিমান একজনের পক্ষে করা বেশি হয়ে গেল। বড় সাহেব বুঝতে পারলেন। আমার একজন সহকারি দেয়া হল। অফিসের কাজ কর্ম সঠিকভাবে চলল। 
দিনে কর্মজীবি, রাতে ছাত্র। এবার লেখাপড়া নিয়ে উন্নতি করতে হবে। হাতে একদম সময় নেই। 
আমার খরচ হাতে রেখে বাকি টাকা মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেই। মা কি করেন তা জিজ্ঞাস করি না। এখন বাড়ীতে অনেক খানেওয়ালা। নুরু ভাইর পাচ সন্তান, মানু ভাইর চার। জান দিচ্ছে আল্লাহ। মানুষ তো আর বন্ধ করতে পারেনা। লালন পালনের দায়ীত্ব আল্লাহ নেন কিনা জানি না। তবে একজনকে নিতে হবে। তাদের তো কোন কাজ নেই, রোজগার নেই। আমার আছে। কাজেই আমাকে নিতে হবে। বাড়ীতে এখন মোট সতের জন সদস্য। লালন পালনের দায়ীত্ব এক জনের। 

-৩৭-

এইচ এস সি পাশ করেছি। দ্বিতীয় বিভাগে। টি এন্ড টি কলেজে বি এ ভর্তি হয়েছি। খরচ বেড়ে গেছে। মানুষের আয় বাড়ার সাথে ব্যয় বেড়ে যায়। অথবা ব্যয় বাড়ার সাথে আয়ও বাড়ে। আরাম আয়েসের পথ খুজে নেয়। কর্ম না করে আরামে দিন কাটাতে পারলে কেই বা কাজ করে! বাড়ির কর্মক্ষম মানুষের রোগ বালাই দেখা দিল। প্রায় সকলের। কাজের কথা জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসে, শরীরটা একদম শেষ হয়ে গেছে। অনেক রোগের নাম শুনতে হয়। ডাক্তার ঔষধ নিয়ে ট্নাাটানি। খরচ আরও বেড়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের চালচলন বদলে গেল। মাসের শেষে টাকা তো আসেই, কাজ করার প্রয়োজন কি? সুযোগ পেলে এমনি হয়। একের রোজগারে অন্যের আরাম। 
জগত চলছে, আমি চলছি, আমার কাজ চলছে, লেখাপড়া চলছে। নামাজ রোজা চলছে। নামাজ রোজা ফরজ। জীবনের অবিচ্ছেদ অঙ্গ। জন্মের পর থেকেই এ শিক্ষা পেয়ে এসেছি। নামাজ কাজা হয়, কাজা নামাজ পড়ে ফেলি যখন সময় পাই।
বাসাবো মসজিদ মাঠের মাঝামাঝি পূর্ব পাশে। নামাজ পড়তে গেছি। ইমামকে দেখে আমি থ হয়ে গেছি! এযে কলিমুল–াহ! সে এখানে ইমামতি পেল কি করে! জামাত তখন দাঁড়িয়ে গেছে। নামাজ শেষ করার তর সইছেনা আমার। নামাজে দাঁড়িয়ে মনের মধ্যে আমার অনেশ প্রশ্ন এসে দেখা দিতে লাগল। সেই মাতারিটা কি এখনও তার স্ত্রী হিসেবে আছে ? তার আগের স্ত্রী কোথায় ? এখানে এই মসজিদে সে কিভাবে ইমামতি পেল ? এসব ভাবতে ভাবতে নামাজ শেষ হয়ে গেল। নামাজে দাঁড়িয়ে আমি আল–াহর কাছে নিজকে সম্পূর্ণ সমর্পন করতে পারিনি। মনে হল কলিমল্লার ধ্যানে আমি মজে গেছি। আল্লাহর ধ্যানে নয়।
মসজিদ ফাঁকা হতেই আমি কলিমুল্লার দিকে এগিয়ে গেলাম। সালাম দিতেই আমার দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে রইল। কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেই বলল, আপনাকে ত ঠিক চিনতে পারলাম না!
আরে আমি বাহার, মিটফোর্ড রোডে ডাক্তার রশিদের ওখানে কাজ করতাম। আপনি পাশে থাকতেন। আমাকে প্রতি জুম্মায় আপনার সাথে মসজিদে নিয়ে যেতেন। সেই আমি!
কলিমুল্লা যেন আকাশে থেকে পড়ল। বলেন কি! আমি তো মিটফোর্ডে ছিলাম না কোনিিদন! আপনি ভুল করছেন! আমার মত হয়ত অন্য কেউ হবে! যাক, মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। সবাই এক আল–াহ দুনিয়ায় জায়গার তো অভাব নেই! যে যেখানে পারে বাস করে! সুবিধামত। আপনি বুঝি এখানে নতুন এসেছেন ? আগে তো দেখিনি!
হ্যা, আমি এই কয়দিন হল এখানে এসেছি। ছাত্র নীড়ে থাকি। একদিন আসুন আমাদের ওখানে। বলে চলে এলাম।
আমার মাথাটা বোধ হয় ঠিক নেই! কলিমুল্লার সাথে এতদিনের পরিচয়! কতদিন এক সাথে নামাজ পড়তে গেলাম, কত রকমের ফরজ ছুন্নতের আলাপ হয়ছে। আমি ভুল করলাম! কলিমুল্লার কোন জমজ ভাই নেই তো! নিশ্চয়ই আমার কোথায়ও ভুল হচ্ছে।
কি ভুল হতে পারে! কলিমুল্লার দাড়ি, টুপি, মাথার চুল পেছনে এক জায়গায় এক গোছা পেকে সাদা, ঠিক তেমনি আছে। বাম গালে একটা কাটা দাগ, সেও আছে। আর কি প্রমানের প্রয়োজন ? স্থির করলাম, আগামি জুম্মায় তার সাথে অবাার কথা বলব, তার বাসার ঠিকানা নিয়ে বাসায় যাব। আমাকে খোঁজ নিতেই হবে।
পরের জুম্মায় গিয়ে দেখি অন্য একজন ইমাম। নামাজ শেষে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, কলিমুল্লা সাহেব কোথায় ? গত জুম্মায় যিনি ইমামতি করলেন ?
ও, কলিম হুজুর ? তার স্ত্রীর অসুখ। দেশের বাড়ীতে গেছেন। বলে গেছেন ওখানে একটা মসজিদে ইমামতি পাবার কথা আছে। যদি পেয়ে যান তাহলে আর আসবেন না।
তার স্ত্রী কি দেশের বাড়ীতে থাকে ?
হ্যা, তার পরিবারের সবাই দেশে থাকে।
এখানে কোন স্ত্রী নেই তার ?
না, না তিনি এক স্ত্রী নিয়েই আছেন। সে থাকে গ্রামের বাড়ীতে।
পাঁচ বছর বাসাবোতে থেকে আর কোন দিন কলিমুল্লার দেখা পাইনি।

-৩৮-

তার কিছুদিন পরই দেখা পেয়ে গেলাম। তবে কলিমুল্লার নয়, নাজমার।
মশারিটা একদিকে ছিড়ে গেছে। অফিস থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম বায়তুল মুকাররমে। মশারি এবং আরও কিছু টুকটাক জিনিষ কিনে রিক্সায় উঠতে যাব পেছন থেকে কে ডাক দিল, স্যার দাড়ান। ফিরে দেখি নাজমা। এই প্রথম আমি স্থির দৃষ্টিতে নাজমার দিকে তাকিয়ে রইলাম কয়েক মুহুর্ত। নাজমা আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে মনে হল তার প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খুশিতে টগবগ করছে। আরে তুমি কোথা থেকে? কেমন আছ? এখানে কি করে? আমার প্রশ্ন থামেই না। আরও করতে যাচ্ছিলাম। 
নাজমা বলল, আমি এখানে এসেছি কিছু কাপড় কিনতে। আব্বুর সাথে। ঐযে আব্বু। তাকিয়ে দেখলাম আমার লজিং মাষ্টার জনাব আকরাম সাহেব এদিকে আসছেন। কাছে আসতেই একটা সেলাম দিলাম। কেমন আছেন খালু?
আমি কেমন আছি তার কোন খোজ একবারও নাওনি। তুমি এমন কেন? আমরা আশা করেছিলাম তোমার কাছ থেকে একটা চিঠি পাব, জানতে পারব তুমি কোথায় কেমন আছ। সেই যে এলে আর কোন খবর দিলেনা নিলেও না। আমরা তোমার ঠিকানা জানি না। আমাদের সুখবর তোমাকে দেবার জন্যই তোমাকে খুজছিলাম। তোমার খালাম্মা তোমার ঠিকানার জন্য আমাকে প্রায় ঘরছাড়া করেছিল। আগে তোমাকে খুশির খবরটা দিয়ে নিই। পরে সব হবে। প্রথম খবর হল নাজমা  ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচ এস সি ২য় বিভাগে পাশ করে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছে। থাকে রোকেয়া হলে। নাজমার পরিক্ষার ফল জানার পর আমরা তোমার ঠিকানার জন্য উতলা হয়ে গেলাম। ফলাফলের আনন্দ আমরা সম্পুর্ন উপভোগ করতে পারিনি। আমাদের মনে হয়েছিল এ আনন্দ তোমার একা পাওনা। এ কৃতিত্ব তোমার। অসম্ভবকে তুমি সম্ভব করেছ। আমরা কল্পনাও  করিনি নাজমা পাশ করবে। তোমার আগে বেশ কয়জন মাষ্টার এসেছিল। কেউ কোন আশা দিতে পারেনি। আমরাও আশা ছেড়ে দিয়ে নাজমার একটা বিয়ে দেবার জন্যই স্কুলে রেখেছিলাম। বিয়ে হয়ে গেলেই স্কুল তথা লেখাপড়ার পাট শেষ। কিন্তু তুমি সব বদলে দিলে। আমাদের সবকিছু বদলে গেল। নাজমার ভবিষ্যত বদলে গেল। এ সব কিছুর কৃত্তিত্ব তোমার। তোমার দেখা পেয়েছি শুনলে তোমার খালাম্মা কত খুশি হবে তা বলে শেষ করা যাবে না। 
এখানে দাড়িয়ে কথা বলা যাবে না। চলুন একটা রেষ্টুন্টে বসি। এখানে কোন রেষ্টুরেন্ট নেই, চলুন ষ্টেডিয়ামের দিকে যাই।
একটা রেষ্টুরেন্টে বসে অনেকক্ষন অনেক খবরা খবর দেয়া নেয়া হল। এ যেন হারানো সন্তান। বহুকাল পর ফিরে পেয়েছে। নাজমাদের বাসায়  খালুর সাথে এমন কাছে বসে কোনদিন কোন কথা হয়নি। আজ সামনাসামনি বসে কথা শেষ হয়না। একটার পর একটা প্রশ্ন তিনি করেই যাচ্ছেন। আমি সব প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিচ্ছি। কোন নাম্বার কাটতে পারেনি। আমার দু:খের দিনগুলোর কথাও বাদ গেলনা। এতদিন কেন একবারও যোগাযোগ করতে পারিনি তার জবাবদিহি করতে হল। জীবন যুদ্ব কেমন কত প্রকার ও কি কি তার বিশদ ব্যাখ্যা দিতে হল।  আকরাম সাহেব বললেন তিনি মাসে দুএকবার ঢাকা আসেন। নাজমাকে দেখার জন্য। দু একদিন থাকেন। তার শালিকার বাসায়। মুহাম্মদপুরে। পরের বার যখন আসবেন তখন খালাম্মাকে নিয়ে আসবেন। শেষ কথা হল মাঝে মাঝে নয়, প্রতি সপ্তাহে নাজমার সাথে দেখা করতেই হবে। আমাকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে ছাড়ল বাপবেটি।

-৩৯-

এতদিন নাজমার চেহারাটা যখন তখন চকিতে ভেসে উঠত। দূরের জিনিষ কল্পনায় যখন মন ছুয়ে যায় তখন তার একটা আলাদা পুলক জাগে। আজ নাজমাকে দুচোখ ভরে দেখলাম। আমার লজ্জা কেটে গেছে। তাকিয়েই আছি।  কোন দিন তার দিকে ভাল করে তাকাইনি। তার দেহ খানা মাখনের মত তুলতুলে নেই। ছিপ ছিপে হয়েছে। মনে হয় আরও একটু  লম্বা হয়েছে। এখন আমি কাজের মাঝেও তার কথা ভাবি। যখন তখন তার চেহারা ভেসে উঠে। বুকের ভিতর একটা চিন চিনে ব্যাথা অনুভব করি। কিসের ব্যাথা? অনেক ভেবে দেখলাম ব্যাথা নয়, হৃদয়ের টান। কাছে পেতে ইচ্ছে করে, শিক্ষক-ছাত্্ির হিসেবে নয়, বন্ধু হিসেবে। 
অনেক দেরিতে এই শনিবারটা এল। আমার তর সইছে না। কতক্ষনে আমি নাজামার সাথে দেখা করব। এ যেন আমার একটা কর্তব্য হয়ে দাড়িয়েছে। সব কাজ বাদ দিয়ে নাজমার সাথে দেখা করতে হবে। আমি বিকেলে গিয়ে পৌছলাম রোকেয়া হলের গেইটে। নাজমা কাগজে লিখে দিয়েছিল কত নাম্বার রুম ইত্যাদি। খবর পাঠানোর কিছুক্ষন পরই নাজমা এসে হাজির। স্যার কেমন আছেন? কখন এলেন? মনে হল খুশিতে ডগমগ করছে। তার দেহে যেন খুশির জোয়ার বইছে। দুজনের চোখাচুখি হল। আমি চোখ নামাতে পারিনি। তার দিকে তাকিয়েই আছি। তার প্রশ্নের উত্তÍর দিতেও ভুলে গেছি। মনে মনে বললাম, এমন নিখুুত একটি চেহারা আমি এতদিন উপেক্ষা করে আসছি। আমি কত অথর্ব। যা আপনা থেকে হাতে আস তার দাম মিলেনা। যা দূরে চলে যায় তার পেছনে ছুটে মানুষ। তাকিয়ে দেখলাম আমাদের মত আরও ছেলেমেয়ে এখানে সেখানে দাড়িয়ে কথা বলছে। কেউ বাইরে চলে যাচ্ছে। আমি বললাম, এখানে দাড়িয়ে কতক্ষন কথা বলা যায়? চল কোথাও গিয়ে বসি, এক কাপ চা খাই।
ধারে কাছে কোথাও চা ষ্টল নেই। কোথায় বসবেন?
চল নিউ মার্কেটের দিকে যাই।
নিউ মার্কেটের একটা রেষ্টুরেন্টে বসলাম। 
স্যার, এতদিন আমাদের কথা কি একবারও কি মনে পড়েনি? 
হ্যা, মনে পড়েছে, অহরহ তোমাদের কথা মনে পড়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নাজমা বলল, আমি আশা করেছিলাম একটা চিঠি পাব। যখন কয়েক মাসেও পাইনি তখন আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আপনার কথা মনে হলে মাঝে মাঝে রাগ হত। ভাবতাম লোকটা কত পাষান!
আমি বললাম, তুমি আমাকে স্যার বলে ডাক কেন? আমি তো আর তোমার স্যার নই। 
তাহলে কি বলে ডাকব?
আমার একটা নাম আছে। নাম ধরে ডাকবে।
নাম ধরে আমি ডাকতে পারব না। বলে কথা ঘুরিয়ে বলল,আম্মা উঠতে বসতে আপনার কথা বলত। কথাবার্তায় মনে হত তার ছেলে হারিয়ে গেছে। খোজে বের করতে হবে। আর সে জ্বালাতন সহ্য করতে হয়েছে আব্বাকে। আপনার কথা শুনলে আম্মা চলে আসবে।
প্রায় এক ঘন্টা। খাওয়ার চেয়ে কথা বেশি হল। কথা শেষ হয়না। আমার দেখা পেয়ে নাজমার সাহস এসেছে। এতদিন মনে করত সে এই ঢাকা শহরে একা, এখন আর তা ভাবেনা। মনে করে  ঢাকা শহরে তার আপন কেউ আছে। যার সাথে মন খুলে কথা বলা যাবে, ঘুরে বেড়ানো যাবে। আর সবাইর আপন জন যেমন প্রতি সপ্তাহে আসে দেখা করতে তেমনি তারও আছে। এতদিন সে চোখ দিয়ে দেখত শুধু, এখন দেখতে হবে না। 
এক সময় জিজ্ঞেস করলাম, তোমার লেখপড়া কেমন চলছে?
নাজমা বেজার হয়ে গেল। বলল, লেখাপড়ার কথা শুনতে ভাল লাগেনা! আমি আগের মত আর গাধা নেই। নিজের লেখাপড়া নিজে বুঝতে শিখেছি। আর মাষ্টারি করতে হবে না। আমাকে আর লেখাপড়ার কথা জিজ্ঞেস করা যাবে না। আর কোন কথা নাই, শুধু লেখাপড়া! পড়ার কথা বাদ দিয়ে অন্য কথা বলুন!
আমি ভেবে দেখলাম নাজমার কথা ঠিক। এই দুর্লভ মুহুর্তগুলো রঙিন স্বপ্ন দিয়ে ভরে তোলতে হবে। এখানে লেখাপড়ার কথা তোলে রঙিন স্বপ্নগুলো বিষাক্ত করার কোন মানে হয়না। বললাম, ঠিক আছে আর জিজ্ঞেস করব না। শেষ পর্যন্ত আমাদের  রফা হল আগের মত পড়ার কথা আর জিজ্ঞেস করা যাবে না। লেখাপড়া এখন যার যার নিজের। সময় বেধে দিতে হবেনা। গল্প বললে বাধা দেয়া যাবে না। স্যার বলে আর ডাকা যাবে না। আপনি আপনি বলা যাবে না। এমনি অনেক কথা হল কিন্তু ”বাকি রয়ে গেল শুধু বলিতে”। হোস্টেলের দরজায় নেমে জিজ্ঞেস করল আবার কবে আসবেন?
ইচ্ছে তো হয় রোজ রোজ আসি। শনিবার নিশ্চয়।
আমি অপেক্ষা করব।
শুক্রবার। হাফ অফিস।  বাসায় ফিরেছি। আমার বিছানাটা রাস্তার দিকে। রাস্তায় দাড়িয়ে জানালার দিকে তাকালে প্রথমেই আমার বিছানা চোখে পড়ে।  আমার রিক্সা থামল। রিক্সা থেকে নেমে জানালার দিকে চোখ গেল। দেখি আামার বিছানায় কে যেন শুয়ে আছে। জগন্নাথ কলেজের জিন্নাহ মাঝে মাঝে আসে এবং খেয়ে আবার খাবারের আদেশ দিয়ে শুয়ে থাকে। ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম জিন্নাহ নয়। জিন্নাহ দেখতে হাতির মত। বিছানায় শুলে জানালা বন্ধ হবার মত। তাহলে এ কে? ঘরে ঢুকে দেখলাম আকরাম সাহেব। আমি ঘরে ঢুকতেই তিনি উঠে বসলেন। বললেন, তোমার বাসায় আসা তো একদম সোজা। রিক্সাও চিনে। এত সুন্দর জায়গায় থাক! জায়গাটা একটু ঘুরে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। তোমার জন্য বসে আছি। তুমি আসলে তোমার সাথেই বের হব ভাবছি। আমি এসেছি তোমাকে খবরটা দিতে। তোমার খালাম্মা এসেছে। এখন মুহাম্মদপুর তার বোনের বাসায় আছে। দুএকদিন থাকবে। তোমাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। আজই তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে। পরে আবার যাওয়া যাবে। এখন চল।
খালাম্মা এসেছেন! অনেকদিন হয়ে গেল দেখিনা। দেখা করার আমারও খুব ইচ্ছে। বললাম, হ্যা, যাব। আমার উচিত ছিল কুমিল্লা গিয়ে তার সাথে দেখা করা। এখন ঢাকায় এসেছেন, অবশ্যই আমি যাব। হাদিকে বললাম চা দিতে।
চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গুলিস্তান থেকে বাসে করে মুহাম্মদপুর এসে পৌছলাম। একটা দুতলা বাড়ি। খালারা নীচের তলায় থাকেন। ঘরে ঢুকেই খালু ডাক দিলেন, এইযে দেখ, তোমার মাষ্টার নিয়ে এসেছি। দু বোন সাথে সাথে এগিয়ে এল। খালাম্মা বললেন,  তুমি ত খুব শক্ত ছেলে। একবারও কি আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছে হয়নি? তার বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, এই হচ্ছে আমার বোন ঝর্না। আমি একটা সালাম দিলাম। তারপর চলল গল্প। গল্প নয় ঠিক, যেন ইন্টারভিউ। খালাম্মা প্রশ্ন করছে, আমি উত্তর দিচ্ছি। প্রশ্ন পত্রে ঝর্না খালাও কম যান না।  মনে হল আমি ব্যাংকে চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছি। বোর্ডের সামনে। বোর্ডের সবাই প্রশ্ন করছে। চাকুরিপ্রার্থি উত্তর দিচ্ছি। এ যেন বিশেষ কোন চাকরির ইন্টারভিউ। প্রায় ঘন্টাখানেক চলল। সব শেষে আমার মনে হল ইন্টারভিউ ভাল হয়েছে। হয়ত পাশ করেছি। 
এবার খাবারের পালা। আজ মনে হয় বিশেষ কোন উতসব। টেবিল একবারে ভর্তি। একটা প্লেট রাখার জায়গা নেই। ঝর্না খালা তদারকি করছে। আমরা তার অতিথি। আমার এক পাশে খালুজি আর এক পাশে খালাম্মা। সামনে নাজমা। ঝর্না খালা একটা একটা করে পরিবেশন করছে আর বলছে সব খেতে হবে, কোন কিছুই বাদ দেয়া যাবে না। 
অনেক সুখাদ্য খেয়ে রাত নয়টার পর রওয়ানা দিলাম। ঘরে এসে পৌছলাম রাত এগারটার দিকে।

-৪০-

প্রায় প্রতি সপ্তাহে চলল আমাদের সাক্ষাত আর সাক্ষাতকার। একজন আর এক জনের সাক্ষাতকার নেই। কে কার সাক্ষাতকার নিচ্ছে তা বুঝা মস্কিল। শিক্ষক যে কে তাও স্থির করা কঠিন। কারন নাজমা এখন বেশ চটপটে হয়েছে। তার সব প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিতে পারি না। দিলেও ধরা খেয়ে যাই। নাজমা বলল আপনি মনের কথা অকপটে বলতে পারেন না। আপনার সতসাহস নেই।
বললাম কথাটা ঠিক নয়। আমি মনের ভিতর কোন কথা রাখতে পারিনা। সব বলে ফেলি। আমার বন্ধু বান্ধব সবাই তা জানে। 
আপনার বন্ধুরা ঠিক জানে না। আমি জানি। যেদিন প্রথম আমাদের বাড়ি গেলেন সেদিন থেকে আপনার সব পরিক্ষা নিয়েছি, খেয়াল করেছি আপনার স্বভাব চরিত্র কেমন।  তখন থেকে সব জানি। আপনার ভেতর অনেক কথা আছে যা বলতে পারছেন না। আবার প্রয়োজনিয় কথা বা কাজ মনে থাকেনা।
তুমি কি করে জানলে কোন কাজ বা কথা মনে থাকে না? তুমি ত আমার কাছাকাছি ছিলেনা?
যতদিন ছিলাম তার মাঝেই জেনেছি আপনি খুব ভাল মানুষ তবে কোন কোন কথার সাথে কাজের মিল পাইনি।
কিসে মিল পাওনি, একটার উদাহরন দাওতো?
মনে করুন, চেষ্টা করে দেখুন এমন কিছু বলেছিলেন কিনা যা এখনও কাজে পরিণত করেননি?
আমি তো কিছুই মনে করতে পারছি না। কি এমন কথা বলেছিলাম যার কাজে মিল নেই।
আছে, মনে করতে চেষ্টা করুন, পেয়ে যাবেন।
না, আমি এমন কোন কথা বলিনি যা কাজে পরিণত করিনি।
হ্যা, বলেছিলেন। 
তাহলে মনে করিয়ে দাও। আমি ত মনে করতে পারছি না।
আপানি যেদিন আমাদের বাসা থেকে চলে আসেন সেদিন আপনাকে বিদায় দিতে ষ্টেশনে এসেছিলাম। ষ্টেশনে শেষ কথা কি বলেছিলেন?
আমি ত কিছুই মনে করতে পারছিনা।
কি বলেছিলেন মনে নেই?
কি বলেছিলাম? আমার তো কিছুই মনে নেই।
আপনি ভুলে যান, তাই কথার সাথে কাজ মিলাতে পারেন না। 
তুমি মনে করিয়ে দাও কি বলেছিলাম।
আপনি বলেছিলেন ’অনেক কথা আছে’। সে অনেক কথা তো এখনও বলেননি।
ওহ্! হ্যা, মনে পড়ছে। সে সব কথা তো এখন চলছে তুমি বুঝতে পারনা। বাকি সব বলব তুমি যেদিন আমাকে নাম ধরে তুমি করে কথা বলবে। আপনি আপনি বললে বন্ধুত্ব হয় না। মনের কথা বলা যায় না। 
স্যারকে নাম ধরে ডাকতে পারব না। তুমিটা না হয় কোন রকমে ডাকা যাবে।
তাহলে আমিও সব কথা বলব না। অর্ধেক বলব। 
অর্ধেকই বল। কি যেসব কথা এখনও বলা হয়নি!
যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম সেদিন চোখ তোলে দেখতে সাহস পাইনি। চোরা চাহনিতে দেখেছিলাম। তারপর সব সময় চোরা চাহনিতেই দেখেছি। সোজাসুজি তাকাতে সাহস পাইনি। চুরি করে আর কত টুকু দেখা যায়। স্বাদ মিটত না। ইচ্ছে হত অনন্তকাল তোমার মুখোমুখি বসে থাকি। তোমার রূপসুধা আকন্ঠ পান করি।  আমার মত একজন বেকার মানুষের পক্ষে শুধু কল্পনা করা, এর বেশি কিছু করা সম্ভব ছিলনা। সাহস ছিল না। এখন মনে জোর এসেছে, মনের পরিবর্তন এসেছে, দুর্বলতা অনেকটা কেটে গেছে। অপলক তাকিয়ে থাকলেও কেউ বাধা দেবেনা। তাই চোখ ফেরাতে পারি না।
অ, আসলে যেরকম সরল সোজা ভেবেছিলাম তা নয়। ভেতরে ভেতরে এত! শুধু মুখ ফুটত না। আমার অষ্টম শ্রেনীর ফল যেদিন বেরোল সেদিন বুঝেছিলাম কিছু বলতে চাও কিন্তু বলছ না। সেদিন আমার এত কাছাকাছি এসে দাড়িয়েছিলে মনে হয়েছিল এই বুঝি জড়িয়ে ধরবে। আমিও প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু তা হলনা। মনে করেছিলাম বিদায়ের দিন হয়ত কিছু বলবে, তাই আমি স্টেশনে এসেছিলাম বিদায় দিতে। আশা ছিল কিছু বলবে হয়ত। আমার আশা গুড়েবালি। তবে একটু ইঙ্গিত দিয়েছিলে ’অনেক কথা আছে’ বলে। সেসব কথা এখন শুনতে চাই।
ঢাকায় দেখা হবার পর যা বলছি সেসবই তো অনেক কথার অংশ। বুঝে নিতে হবে। একবারে এক সাথে বলা যায় না এত সব কথা। দিনে দিনে বলতে হবে এবং বুঝে নিতে হবে। এখন একটা কথা হল তোমাকে দুদিন না দেখলে মন চঞ্চল হয়ে থাকে। মনে হয় আমার কি যেন নেই, কিছু একটা বাকি আছে। মন দিয়ে কিছৃুই করতে পারি না। এটা সেসব কথার অংশ। 
এ্যা! ভিতরে এত কথা!
হ্যা, যারা ভেতরের কথা চেপে রাখে তাদের মুখ খুলে গেলে কথা চলতে থাকে, শেষ হয় না। আমারও শেষ হবে না।

-৪১-

বি এ পরিক্ষার ফল বেরিয়েছে। পাশ করেছি, এই সুখবরটা আগে বাবাকে দেবার কথা। কিন্তু আমার আগেই হয়ত বাবা জেনে গেছেন। পরিক্ষার ফলাফল জানার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে এমন আর কেউ নেই নাজমা ছাড়া। কাজেই নাজমাকে দিতে হবে। চলে গেলাম রোকেয়া হলের সামনে। খবর পাঠালাম। অসময়ে আসার কারন জানতে চাইলে খবরটা দিলাম। খবর শুনে নাজমা হাত তালি দিয়ে একবারে নেচে উঠল। মনে হল এই ফলাফলটা তার নিজের। আর কোন চিন্তা নাই। হলের গেইটে দাড়িয়ে কতক্ষন কথা বলে ফিরে আসব ভাবছি। নাজমাকে বললাম, এখন আসি। শনিবার আবার আসব। শুনে নাজমা বলল চলেন কোথাও গিয়ে বসি। ঠিক আছে চল বলে আজিজ সুপার মার্কেটের দিকে চললাম। 
একটা রেষ্টুরেন্ট বসে অনেক কিছু খেলাম, অনেক পরামর্শ করলাম। আমি ল পড়ব।  নাজমা  এম এ শেষ করে শিক্ষকতা করবে। ঢাকা শহরকে নাজমার খুব ভাল লাগে। এখানেই থাকবে। এম এ পাশ করার আগে বিয়ে করবে না। 
আমি বললাম, বিয়ের পরও তো লেখাপড়া করা যায়। 
বিয়ের পর লেখাপড়া হয় না। তার অনেক প্রমান আছে। নাজমা বলল।
অনেক বিতর্কের পর মাঝামাঝি একটা সিদ্বান্ত হল। বছরখানেক পর বিয়ে করা যায়। কিন্তু আমরা যে বিয়ে করব এমন কোন আলাপই হলনা।
পরিক্ষার ফলাফল নিয়ে বাড়ি গেলাম। গ্রামের পথ দিয়ে চলছি। বায়ে গেলে মসজিদ পরে, ডানে সোজা গেলে বাসার ভূয়ার বাডি। বাম দিকের পথ ধরে চললাম। মসজিদের কাছে যেতেই দেখি আমাদের গ্রামের সম্মানিত কয়েক জন মুুরুব্বি মসজিদের সামনে বসে গল্প করছে। আমি সেদিকটায় না গিয়ে অন্য পথ ধরে বাড়ির দিকে যাচ্চিলাম। বাসার ভাই ডাক দিলেন, তোমার জন্যই তো আমরা অপেক্ষা করছি। জানি তুমি এ পথেই বাড়ি যাবা। আস, এখানে আস। আমরা তোমাকে আর একবার দেখব। আমরা কোনদিন তোমাকে খুব কাছে থেকে দেখিনি। শুধু তোমার কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ আমরা কয়েকজন একত্রে বসেছি তোমাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য। বুঝলাম সবাই জেনে গেছে খবর। তাকিয়ে দেখলাম কুদ্দুস মাষ্টার, রেজেক মাষ্টার, কারি সাব, ডেঙ্গু ভুয়া বসে আছে। আমি কাছে যেতেই কুদ্দুস মাষ্টার আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কোলে তোলে নিলেন। বললেন, আমরা আমাদের গ্রাজোয়েট পেয়েছি। এ গ্রামের প্রথম গ্রাজোয়েট! তুমি এ গ্রামের কৃতি সন্তান। আমাদের মুখ উজ্জল করেছ। আমরা তোমার কাছ থেকে আরও কিছু আশা করি। আমরা দোয়া করি তোমার ভবিষ্যত আরও উজ্জল হোক। আমাদের বিশ্বাস তুমি আরও উন্নতি করতে পারবে। রেজেক মাষ্টার বলল, ও শুধু আমাদের গ্রামের গ্রাজোয়েট বলছেন কেন, এদিকে কয়েকটা গ্রামে কোন গ্রাজোয়েট নেই। এই কয়েক গ্রামের মুখ উজ্জল করেছে! সবাই আমার ভবিষ্যত ইচ্ছা কি ইত্যাদি জানতে চাইলেন। এসব নিয়ে আলোচন করলেন। সবাইর মুখে হাসি ফুটিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম।
বাড়ি পৌছতেই মা জড়িয়ে ধরে চুমোয় চুমোয় ভরে দিয়ে বললেন, বড় দুশ্চিন্তায় ছিলাম। তুমি বলেছিলে পরিক্ষা ভাল হয় নাই। আমার মন বলছিল তুমি পাশ করবে। কারন কোন দিন ফেল করনি। এ পরিক্ষা এমন কি যে তুমি পাশ করবে না। কিছুক্ষনের মাঝে পাড়ার অনেকে এসে দেখা করল। যেন আমি সেই আমি নই, নতুন কেউ। মনে হল আমি সকলের কাছে নতুন কেউ।
খাওয়া দাওয়ার পর রাতে সবাই বসে গল্প করছি। মা বললেন, আমরা তো তোমার জন্য একটু বউ খুজছি। কয়েকটা প্রস্তাবও আছে আমাদের হাতে। এখন বাকি কাজ এগিয়ে নেবার জন্য তোমার সাথে কথা বলার অপেক্ষা করছি। কয়েকটা প্রস্তাবের দেনা পাওনার একটা ফিরিস্তিও দিলেন মা। আবার মতামতও দিলেন, কোনখানে কি পাওয়া যাবে এ সব কিছুর একটা ফর্দ আছে মায়ের কাছে। তার মাঝে পীরছাব হুজুরের প্রস্তাবও আছে দুটা। হুজুরের প্রস্তাবগুলো আগে বিবেচনা করতে হবে, কারন হুজুরের মনে কষ্ট দেয়া ঠিক হবে না। প্রায় ঘন্টাখানেক এসব আলাপ চলল। সবাই এখানে উপস্থিত আছে। মানু ভাই বলল,সুলতানপুরের প্রস্তাবই  সব চেয়ে ভাল, কারন নগদ অনেক টাকা সাথে জমিজমা ইত্যাদি।
আমি সব শুনলাম।
এখন ল পড়ি।  যাদের বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে আছে তারা টাকার বস্তা নিয়ে ভাল পাত্র খুজে বেড়ায়। পাত্র হিসেবে আমি উত্তম। আমার বাড়ীর সকলে একটা হিসেব করছে। কোন খানে কি কি উপহার, বেশি নগদ টাকা ইত্যাদি পাওয়া যাবে। মনে হল কোথাও কোথাও দরাদরি হয়েছে। সকলের অনেক দিনের আশা। এখন পূরন হতে চলেছে। আমি মত দিলেই হল। সবাইর সব কথা শুনে মনে হল আমি একটা গরু। কিন্তু আমার কাছে মনে হল আমি বাজারের গরু নই। আমি মানুষ, মানুষ হিসেবে আমার বিয়ে আমি করব, আমার পছন্দে।
মাকে বললাম, মা আমি এখন বিয়ে করার জন্য প্রস্তত নই। এসব প্রস্তাব বাদ দাও। যখন সময় আসে তখন আমি নিজেই বলব।
আমার কথা শুনে মা একবারে হতাশ হয়ে গেলেন। এত এত সোনা দানা, টাকা পয়সা সব ফসকে যাবে! ওমুকের ছেলে বিয়ে করে কি কি পেল তা মায়ের জানা। পিয়নের চাকরি করে এমন পাত্রও মোটর সাইকেল, টু-ইন-ওয়ান সহ আরও কত কি পেয়েছে! আর আমি কিনা এত সব  পায়ে দলে দিলাম! আমি একদম বোকা! আমার দ্বারা কিছুই হবে না, কিছু আশা করা যায় না। বিদায়ের সময় মা অনেক অনুযোগ করলেন। যে টাকা দেই তাতে মায়ের খুব অসুবিধা হয়। টাকার অংক বাড়িয়ে দিতে হবে।আমি জানি এই চলতি বাজারে যে টাকা দেই তাতে খুব সচছন্দে চলা যায়। মা পারেন না তার কারন তার চাপাশে অকেজো, বেকার,বুখা মিছিল। মায়ের টাকা পৌছার সাথে সাথে চারপাশে ভীড় করে কান্নকাটি, অকাট্য যুক্তি ইত্যাদি দেখিয়ে টাকা ভাগ হয়ে যায়। মায়ের মন, না দিয়ে পারেনা। তাই মায়ের হাত শুন্য হয়ে যায়। সেই শুনূতাকে পুরন করতে হয় আমাকে। বিদায় বেলায় অন্যবারের মত বাড়ীর সকলে ছিলনা। মা ছাড়া কাউকে দেখলাম না। কারন আমার আর কোন দাম নেই।আমাকে আরও উন্নতি করতে হবে।সে চেষ্টায় আছি। আরও ভাল বেতন চাই। কোথায় উন্নতি! আবার খবরে কাগজ, চাকরির বিজ্ঞপ্তি, চাকরি খুজতে লাগলাম। কোথায় চাকরি! সেদিন নাজমা আমাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার মন খারাপ মনে হয়। কোন কিছু ঘটেছে কি না যার কারনে মন খারাপ।বললাম, আমার আরও বেশি বেতনের চাকরি চাই। চেষ্টা কর, মিলে যাবে। কয়েক মাস পর মিলে গেল। পেয়ে গেলাম একটা চাকরি। ষ্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান। বেতন একজন ম্যাজিস্ট্রেটের বেতনের মত। পাকিস্তানে যোগ্যতা এবং পদ অনুযায়ী এর বেশি বেতন কোথাও মিলবে না।
খবরটা আগে নাজমাকে দিতে হবে। বাড়ীতে চিঠি লিখে দিলেই চলবে।
খবরটা শুনে নাজমা খুশিতে নেচে উঠল। বলল, এমন একটা চাকরিই সে আশা করেছিল। মনে হল চাকারিটা তার নিজের হয়েছে। সেদিন খুব বেশি কথা বলা হয়নি। কাজ আরও বাকি।
যখন ফিসারিসে পদত্যাগ পত্র পেশ করলাম, তখন বড় সাহেব আমাকে একটা সুখবর দিলেন। তোমাকে আমরা তিনটি অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট দিলাম। তোমার ভাল কাজের জন্য উপহার। অন্য কোথায়ও যাবার প্রয়োজন নেই।
হিসাব করে দেখলাম কোথায় বেশি উন্নতি। দেখলাম ব্যাংক।
ব্যাংকে যোগদান করে খবরটা বাড়ীতে পাঠিয়ে দিলাম।
মায়ের খরচ আরও বেড়ে গেল। আয় বাড়ার সাথে সাথে সকলের জীবনযাপন উন্নত হয়ে গেল। অনেকের অনেক বিপদ শুরু হল। আরও টাকার প্রয়োজন। আরও উন্নতি চাই।

-৪২-

স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান! পাকিস্তানের রাষ্ট্রিয় ব্যাংক। আমাকে দেয়া হল অডিট বিভাগে। আমার বস সফিউল আলম মানে সফি একজন বিহারি। তিনি বাংলা জানেন, কিন্তু বলেন না। হয় ইংরেজি নয় উর্দুতে কথা বলেন। আমরা অধ:স্থন কর্মচারিরা তার কাছে যেন ছাগল ভেড়া। এমনি তার ব্যবহার। যখন তখন দমকের সুরে কথা বলেন। খেয়াল করে দেখলাম প্রায় প্রতি বিভাগের প্রধান বিহারি। বাঙালি খুব কম। বিহারি কোন কেরানি নেই। সবাই অফিসার। সেন্ট্রাল ডাইরেক্টরেট করাচীতে। সেখান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের হেড অফিস ক›েট্টাল করা হয়। সেখান থেকে যা আদেশ আসবে সে ভাবেই এখানে কাজ চলে। পদোন্নতি, বদলী ইত্যাদি সব কিছু। 
নতুন চাকরি। খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করছি। একটু গাফিলতি হলেই চাকরি শেষ। কারন ছয় মাসের মধ্যে কোন কারন দর্শানো ছাড়াই চাকরি চলে যেতে পারে। এই ছয় মাসকে খুব পোক্ত করে রাখতে হবে। তারপর চাকরি যাবার সাম্ভাবনা খুব কম। সফিউল আলম যা বলে জি হুজুর জি হুজুর করি। প্রয়োজনের বেশি ডাকাডাকি করে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে খুব ব্যস্ত রাখে। ছয় মাসের আর মাত্র দু মাস বাকি। পার্মানেন্ট হয়ে যাব। তারপর আর ভয় নাই। এই ভেবে তার সবকিছু সহ্য করি।  তার থেকে প্রায় দশ হাত দূরে আমার টেবিল। 
সেদিন আমার একজন বন্ধু এল অফিসে। তার সাথে কথা বলছি। এর মধ্যে সফিউল আলম আমাকে আঙুল ইশারা করে ডাকলেন। মধ্যমাঙূলটা এমন ভাবে বাকা করে ডাকলেন যেন আমি একটা রবোট। আমি না দেখার ভান করলাম। মেহমান চলে যাবার পর তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘ভবিষ্যতে আঙুল দিয়ে এভাবে ডাকবে না।’ সে তখন বলল, কেয় বুলা? কেয়া হুয়া? বুলায়েগা তো কে কারেগা?
‘আঙুল ভেঙ্গে দিব.....(এখানে ডাকাইয়া গালি),।
তুম গালিয়া দিয়া?
গালি দিলে তো ঠিকই বুঝিস..(এখানে আর একটা গালি)’। অন্য সময় তো বাংলা বুঝিস না!
সে তখন লাফ দিয়ে উঠে দাড়াল আমাকে আক্রমনের ভংগিতে। চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘হাম দেখ লেঙ্গে... তোমারা নকরি খতম কার দেঙ্গে, ...আভি লেখতা হো..
চাকরিই যদি শেষ করবি তবে কয়েকটা দিয়ে নিই বলে আমি চেয়ার ছুড়ে মারলাম। চেয়ার তার কাধে গিয়ে পড়ল, কান ফেটে গেল। তার সার্ট লাল হয়ে গেল রক্তে। পাশের বিভাগের লোকজন এসে দুজনকে দুদিকে সরিয়ে দিল। আমি আমার টেবিলে গিয়ে চুপ করে বসে একটা ফাইল হাতে নিয়ে কাজের ভান করলাম। দেখি কতক্ষনের মাঝেই অনেকে আসাযাওয়া করছে। মাঝে মাঝে একজন আর একজনকে আঙ্গূল আমার দিকে নির্দেশ করছে।  আমার বিভাগের লোক ছাড়া আমার সাথে তখনও কারও সাথে পরিচয় হয়নি। এখন যেন আমি একটা চিড়িয়খানার জীব। সমস্ত ব্যাংকে খবর হয়ে গেছে। বিহারী অফিসার সফিউলকে একজন বাঙালি চেয়ার ছুড়ে মেরেছে। তার চাকরি থাকবে না। কারন সে এখনও অস্থায়ী। অনেকে কাজ ফেলে কয়েক মিনিটের জন্য আসছে। এক নজর দেখার জন্য। ষ্টেট ব্যাংকের চাকরি পাওয়া সোজা কথা নয়! কেউ কেউ ভাবছে আহারে! বেচারার চাকরিটা যাবে! তবে বাঘের বাচ্চা বটে! এত বড় সাহস! বিহারি অফিসারকে মারা! ব্যাংকে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। যা আগে অনেকেই চেষ্টা করেও পারেনি। আজ হয়ে গেল! সবাই খুশি! সবাই যেন এমন একটা ঘটনার অপেক্ষায় ছিল! লোকাল অফিস ক্যাশ বিভাগ একদম নীচের তলায়। সেখানে আলোচনা চলছে। সবার একই কথা, তাহলে বিড়ালের গলায় ঘন্টা বেধে ফেলেছে! বেটা বাঘের বাচচা! চল, দেখে আসি। সমস্ত ব্যাংকে এটাই আলোচনার ব্যাপার! ঘন্টাখানেক পর তিন চার জন লোক এল। তাদের কাউকে চিনি না। একজন বলল, চলুন আমাদের সাথে। কথা আছে। না, আমরা আপনার শত্র“ নই, আপনাকে সাহায্য করব। এখন আপনার সাহায্য দরকার। চেহারা দেখে মনে হল আসলেই তারা বুঝি কোন সাহায্য করবে। আমি তাদের সাথে রওয়ানা দিলাম। তারা নিয়ে গেল ইউনিয়নের অফিসে। বলল, বসুন। তাদের পরিচয় দিল, আমি রহিম, ইউনিয়নের সেক্রেটারি। ছুটিতে ছিলাম। খবর পেয়ে আসতে হল। আর ইনি লতিফ সাহেব। সভাপতি। ঘটনা যা হয়েছে আমরা সব জানি। লতিফ সাহেব দূর থেকে সব দেখেছেন। 
এখন সফিউল আলম নোট লিখছে। চাকরি চলে যাবে। আমরা তা হতে দিব না। আপনি শক্ত এবং নিশ্চিন্ত থাকুন। যতরকম সাহায্য লাগে আমরা করব। ভয়ের কিছু নেই। 
একটু পর তারা সফিউল আলমের কাছে গেল। তখনও তার নোট লেখা শেষ হয়নি। লতিফ সাহেব বললেন, নোট লেখা বন্ধ কর সফিউল। তার চাকরি গেলে  তোমার কি হবে? জান সে কে? জগন্নাথের ছাত্র। গতকাল যে গোলাগুলি হয়েছে তাদের একজন সে। ( উল্লেখ্য, গতকাল আসলেই জগন্নাথ কলেজে গোলাগুলি হয়েছে তা আজকের  কাগজে ছাপা হয়েছে)। ও ব্যাচলর মানুষ। চাকরি গেলেই কি? তোমার কথা ভেবেছ? তোমার ছেলেমেয়ে আছে। একটা কিছু হয়ে গেলে তখন তো আর করার কিছু থাকবে না! যে এমন কাজ করতে পারল সে পারেনা এমন কোন কাজ নেই। তোমার ছেলেমেয়ের কথা ভেবে ঝামেলা আর বাড়তে দেয়া উচিত নয়। তুমি বরং একটা কাজ কর তাকে তোমার এখান থেকে ফেরত নিতে নোট লিখে দাও। তাতে সব ঝামেলার শেষ। ভেবে দেখ, আমাদের যা বলার বললাম। 
অনেক চিন্তা ভাবনা করে সফিউল নতুন করে নোট লিখল, তৎক্ষনাত অন্য বিভাগে স্থানান্তর করা হোক।
সেই থেকে আমি দাগি আসামি। চাকরি যায় নাই। 

-৪৩-

১৩ই নভেম্বর ১৯৭০ সাল।
পূর্ব পাকিস্তানের রেডিও টিভিতে খবর প্রকাশ গতকাল ১২ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্নিঝড় ও জলোচ্ছাস লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে পাটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, নোয়াখালি, লক্ষীপুর, সন্দ্বীপসহ দক্ষিন উপকুলের বিশাল জনপদ। ১৩ই নভেম্বর সমস্ত কাগজে খবর প্রকাশ: শতাব্দীর এই ভয়ংকর জলোচ্ছাসে উপকুলের প্রায় তিন লক্ষ মানুষের প্রানহানি ঘটেছে। অগনিত বাড়ীঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তার সাথে অগনিত লক্ষ লক্ষ গবাধিপশু ও অন্যান্য জীব জন্তু ।
এই তান্ডবলীলার ভয়াবহতা সচক্ষে না দেখলে অনুমান করা যায় না কেমন ছিল তার ভয়ঙ্কর রুপ। 
খবর দেখে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সমস্ত কর্মচারির দুদিনের বেতন নিয়ে একটা ফান্ড তৈরি করে দুর্গত উপকুলে রিলিফ পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ততই মঙ্গল। কারন তান্ডবের পর যারা বেঁচে আছে তাদের জন্য পাকিস্তান সরকার নীরব। ইয়াহিয়া সরকার কোন উচ্চবাচ্চ্য করেনি। দুর্গত এলাকা কেউ পরিদর্শন করতে যায়নি। একদম নীরব। যেন ওখানে কিছুই ঘটেনি। তাহলে বাংলার মানুষকেই মানুষের জন্য কিছু করতে হবে। অফিসে একটা নোটিশ দেয়া হল যারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে রিলিফ নিয়ে উপকূলে যেতে আগ্রহী তারা যেন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে। একটা বড় লঞ্চ ভাড়া করা হল। ভর্তি করা হল কাপড়চোপর আর হাড়িপাতিল দিয়ে। কিন্তু যাবে কে? দুদিন চলে গেছে কেউ যাবার আগ্রহ দেখায়নি। আমি ছিলাম ছুটিতে। কাজে যোগ দিয়েই শুনলাম কেউ যেতে রাজি নয়। সকলের ভয়, ওখানে এখন রোগের প্রাদুর্ভাব হবে। পানি বিষ হয়ে গেছে, কোন খাবার নেই ইত্যাদি অনেক কারন। আমি এগিয়ে গেলাম। বললাম, কেউ না গেলেও আমি একা যাব। এই দেখে এগিয়ে এল সাত্তার। এসে বলল, তুই গেলে আমিও যাব। এই সাত্তার নাটক করে, সিনেমাও করে। একজন প্রথম সারির অভিনেতা। পরে নিজে একটা সিনেমা করতে গিয়ে পথে বসেছে। নিজের বাড়ী বিক্রি করে এখন সেই বাড়ীতেই ভাড়া থাকে। তারপর এগিয়ে এল মুজিবর। সেও একজন ভাল অভিনেতা। বেশিরভাগ নাটকে তাকে দেখা যায়। এমনি করে দেখা গেল সাত জনের একটা টিম হয়ে গেছে। ভীরু, সরল স্বভাবের মাখনও যোগ দিল। যোগ দিল মাহমুদ আলী বেগ। টিমের প্রধান হলেন মনজুর রশিদ। তিনি একজন লেখকও। সহকারি টিম প্রধান হলেন বরিশালের মফিজ মিয়া। 
রওয়ানা দেবার আগে নাজমার সাথে দেখা করতে হবে। বিকেলে দেখা করে সব বললাম। শুনে সে আৎকে উঠল! বল কি! এ পরিস্থিতিতে মানুষ ওখানে যায়! খবর দেখেছ? সব এলাকায় মানুষের লাশ আর লাশ! কোন খাবার নেই, পানি বিষাক্ত। ওখানে যাবার দরকার নেই।
বল কি! তান্ডবের পর যারা বেঁচে আছে তাদের সাহায্য করতে হবে না? আমি না যাই, কাউকে না কাউকে তো যেতে হবে! এসব কাজে বাধা দিতে নেই। খুশি মনে যেতে বল। অনেক বক্তৃতা দেবার পর বলল, ঠিক আছে। যাবেই যখন যাও। খুব সাবধানে থাকবে, ওখানকার পানি খাওয়া যাবে না মনে রাখবে। 
হ্যা, আমরা পানি সাথে নিয়ে যাচ্ছি। ব্যাংক সব ব্যবস্থা করেছে।
১৫ই নভেম্বর সকাল সাতটায় আমরা রওয়ানা দিলাম বরিশালের উদ্দেশ্যে। সাথে নিলাম যথেষ্ট পরিমান পানীয় জল, শুকনো খেজুর আর নানারকম বিস্কুট। এই খেয়ে আমাদের কাটাতে হবে। দিনে তিনবার ভাত খেয়ে যার অভ্যেস তার দ্বারা ভাত না খেয়ে চলবে কিনা কে জানে। কিন্তু যেতে হবে। দুর্গত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যেতে হবে। সন্ধ্যার দিকে পৌছলাম বরিশাল শহরে। এখানে মানুষ দেখে বুঝার উপায় নেই কোথায়ও কিছু ঘটেছে। এখানে প্রলয়ের কোন ছাপ নেই। ভোরে রওয়ানা দিলাম প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিকে। আগুনের মত জ্বলজ্বলে সূর্যোদয় দেখলাম আগুনমুখী নদীতে। বিকেলে লঞ্চ থামল একটা গ্রাম্য বাজারের ঘাটে। নাম মনে নেই। ঘাটে থামতেই আমি আর সাত্তার নেমে পড়লাম। একটা খেতের আল ধরে এগিয়ে গেলাম। কোন ঘরবাড়ী চোখে পড়ল না। কতগুলো নারকেল গাছ দাড়িয়ে আছে। আর একটু যেতেই চোখে পড়ল একটা ছাউনি। বেড়া নেই। একটা লোক বসে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, ভাই এখানে কি কোন সাহায্য এসেছে? লোকটা বলল, সাহায্য আইছিল। মানুষ নাই, সাহায্য কারে দিব? তারপর আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ঐ দেখেন। দেখলাম পথের পাশে কবর আর কবর। কয়েক শ হবে। অনেক দূর পর্যন্ত। লোকটা বলল এখন আমার কামই অইল কবর দেয়া। রেড ক্রস আইছিল, চাউল ডাউল দিয়া গেছে কাল। যে খেতের আইল ধরে গিয়েছিলাম সে আইলে এসে আমার চোখ গেল খেতের দিকে। কাদা পানি একাকার হয়ে পানি আটকে আছে। তার মাঝে একটু দূরে দূরে যেন কেউ কিছু সাজিয়ে রেখেছে এমন কিছু কালো বস্তু পড়ে আছে। কৌতুহলবশত ভাল করে তাকালাম। জিনিষগুলো কি! আরো কাছে গিয়ে দেখলাম মানুষের চুল দেখা যায়। সাত্তারকে বললাম, তুই তাকিয়ে দেখ তো এগুলি কি? সে আরও একটু কাছে গিয়ে বলল, আরে এ যে মানুষের মাথা! বুঝলাম সবকটি কালো বস্তুু মানুষের মৃতদেহ। দেহটা পানি কাদার নীচে কিন্তু মাথাটা কিছু উপরে। আমরা ফিরে এলাম লঞ্চে।
মফিজ সাহেব বরিশালের মানুষ। এসব এলাকা সম্মন্ধে তার ভাল ধারনা আছে । তিনি স্দ্ধিান্ত দিলেন আমরা অফ সোরে মানে একবারে সমুদ্রের পাড়ের মানুষের কাছে যাব। লঞ্চ আবার রওয়ানা দিল। পরের দিন ১৭ তারিখ সকালে একটা নদীর পাড়ে নোঙ্গর করল আমাদের লঞ্চ। কাছাকাছি গ্রাম নেই। আধা মাইল দূরে দেখা যায় গ্রাম। আমরা চারজন নেমে পড়লাম চারদিকে। আদেশ রইল ফিরে আসতে হবে তিনটার মাঝে। তিন জন রইল লঞ্চে। তারা সরবরাহ করবে। আমরা গ্রামে গ্রামে প্রতিটি ঘরে গিয়ে দেখব কার কি প্রয়োজন। তারপর স্লিপ দিয়ে দিব। তারা এসে নিয়ে যাবে লঞ্চ থেকে। আমি গেলাম দক্ষিনে। সাত্তার উত্তরে, মজিবুর পূবে আর বেগ পশ্চিমে। সকাল থেকে তিনটা পর্যন্ত অনেক পথ হেটে, কত মাইল হেটেছি তা ভাবলে এখন আৎকে উঠি, অনেক ভীবৎস দৃশ্য দেখে, অনেক কাহিনী শুনে কাজ করে গেলাম। সেসব দৃশ্য আর কাহিনী বলতে গেলে একটা বড় উপাখ্যান হয়ে যাবে। সংক্ষেপে দুএকটা বিবৃত করব।
এখানে কিছু মানুষ এখনও জীবিত আছে। কারও চোখে জল নেই। হয়ত শুকিয়ে গেছে। যারা বেচে আছে তারা বাচতে চায়। চায় তাদের বেচে থাকার জন্য সামান্য আশ্রয় আর কিছু খাদ্য। প্রায় প্রতিটি পরিবারে কেউ না কেউ মারা গেছে। কোন কোন পরিবার নিশ্চহ্ন হয়ে গেছে। তার চিহ্ন দেখা যায় খালি ভিটে। ভিটের চারদিকে কলাগাছের চিহ্ন। ঝড়ে কলাগাছ মাটির উপর থেকে এমনভাবে উঠে গেছে দেখলে মনে হয় কেউ বুজি কাঁচি দিয়ে সমান  করে কেটে নিয়ে গেছে। সেই কলাগাছের গুড়ি থেকে নতুন পাতার কলি বেড়িয়েছে। একটি মেঠো পথ। বড় একটা গাছ পড়ে আছে। গাছের গুড়ি টপকাতে গিয়ে দেখি গাছের নীচে মানুষের মৃতদেহ পড়ে আছে। তার পাশে একটা মরা বক। একটু দূরে একটা মরা সাপ।(এই ছবিটা দৈনিক সংবাদে ছাপা হয়েছিল) এ যেন মহা মিলন। মরার পর। একটা ডুবার পাশ দিয়ে যাচ্ছি। ডুবার দিকে চোখ গেল। দেখি দুটি শিশুর মৃতদেহ ফুলে ডোল হয়ে আছে। পাশে একটা মহিষের মৃতদেহ। পথের দুধারে যেখানে সেখানে লাশ আর লাশ। মানুষের মৃতদেহ, গবাধিপশু আর পাখীর মৃতদেহ পড়ে আছে। মৃতদেহের সৎকার হয়নি। কারন যারা জীবিত আছে তারা নিজেদের আতœীয়স্বজনের মৃতদেহই কবর দিয়েছে। যারা অচেনা তাদের দেহ কবর দেবার কেউ নেই। তার মানে এসব মৃতদেহ অন্য কোন জায়গা থেকে এসেছে। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে দেখলাম একটা বাড়ীও অক্ষত নেই। যা আছে তা ভাংগা বাড়ীর ঘরের চালা দিয়ে মাথা গুজার ঠাই করেছে। কোন কোন বাড়ীতে সবাই মরে গেছে, অলৌকিকভাবে বেচে গেছে শিশু। সেই সব শিশুদের দেখার কেউ নেই। প্রতিবেশিরা স্বজন হারিয়ে কেউ কেউ সেই শিশুদের কোলে নিয়েছে। যারা বেচে আছে তারা অনেকেই আহত বা অসুস্থ। চিকীৎসার ব্যবস্থা নেই।  বাতাসে পচাঁ গন্ধ, পানিতে লাশের ছড়াছড়ি। সেই পানি থেকেও পচাঁ গন্ধ বেরিয়ে আসছে।
বিকালে লঞ্চ ছেড়ে দিল। অন্য এলাকায়। মফিজ সাহেব পরিচালনা করছে। মাঝরাতে লঞ্চ কোথাও থামল। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। এমন জায়গায় থামল যেখানে কোন দুর্গন্ধ নেই। ফজরের আগেই আবার রওয়ানা দিল। সকাল হবার পরই দেখলাম সামনে লোকালয়। এখানে সমুদ্র লোকালয়ের সাথে একটা চিত্র এঁকেছে। একটা অর্ধ চন্দ্র আকার ধারন করেছে। বিরাট এলাকা নিয়ে। তার পাড়ের কিছুদূর থেকেই গ্রামের শুরু। এখনও দুএকটা গাছ দেখা যায় দূর থেকে। লঞ্চ আর একটু এগুতেই দেখি সমুদ্রের বাঁকে শবদেহের পাহাড়! হাজার হাজার শবদেহ এসে জড়ো হয়েছে এই বাঁকে। সমুদ্রের ঢেউ সব জড়ো করেছে এখানে। মানুষ, গবাধিপশু, পাখি আর ভাঙ্গা বাড়ীঘরের অংশ। বেশিরভাগই মহিষের মৃতদেহ ফুলে ডুল হয়ে আছে। ঢেউএর সাথে সাথে শবদেহ দুলছে, শবদেহের পাহাড় দুলছে। অনেক দূর পর্যন্ত। প্রায় তিন মাইল। সাত্তার বলল, এখানে না হলেও  লাখের কম হবে না সব মিলিয়ে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কিছু বলতে পারলাম না। মৃতদেহের পাহাড়কে পাশ কাটিয়ে লঞ্চ চলল আরও সামনে। এক জায়গায় লঞ্চ থামল। আমরা নেমে পড়লাম। বেশ দূর হাটার পর গ্রাম পেলাম। এখানে পাতলা বাড়ীঘর ছিল। খালি ভিটা দেখলেই বুঝা যায়। খুব কম মানুষের দেখা পেলাম। গ্রামের শেষ মাথায় দেখি এক জায়গায় খেজুরের পাতা মাটির উপর গেথে বেড়া তৈরি করেছে। ভেড়ার ভিতর কোন ঘর নেই। তবে আরও কতগুলো পাতা দিয়ে একটা খুপরি মত করেছে। এগিয়ে গেলাম। ডাকলাম, কেউ আছেন কি এখানে?
উত্তর এল, হ আছি।
বুঝা গেল তিনি একজন মহিলা। আপনারা কয়জন আছেন। 
আমি একলাই। 
আপনার কি লাগবে? আমরা কিছু কাপরচোপড় নিয়ে এসেছি বলে আমি আরও কাছে যেতেই তিনি বললেন, ভিতরে আইয়েন না। আমার কাপড় নাই।
আমি থমকে গেলাম। তাইত! মহিলাকে এখন যদি স্লিপ দেই তাহলে তার জন্য আনবে কে? লঞ্চ বেশি দূরে নয়। আমি আবার ফিরে চললাম লঞ্চের দিকে। আমাকে দেখে মফিজ সাহেব বললেন, এখনই ফিরে এলে যে? তাকে সব বললাম। বললাম একজন মানুষের যা প্রাপ্য সব আমাকে দিন। একটা শাড়ি বেশি দিবেন। আমি নিজে নিয়ে পৌছে দিব। ফিরে গেলাম খেজুর বাড়ীতে। বেড়ার পাশে রেখে বললাম, আপনার জন্য এখানে রেখে গেলাম। নিয়ে নিবেন।
আবার চলতে লাগলাম। বেশ দূর যাবার পর দেখি একটা গাছের মাথায় এক মহিলার লাশ। গাছের কান্ড এবং ডালা আছে। কোন পাতা নেই। মনে হল একটা হাত একটা ডালে এখনও আকড়ে ধরে আছে। বেচেঁ থাকার আপ্রান চেষ্টার নমুনা। একটু দাড়ালাম। (এই ছবিটা শিল্পী গোলাম মুস্তফা নিজে এঁেকছিলেন এবং কোন এক দৈনিকে ছাপা হয়েছিল)। মনে হল কোন এক পিতার আদরের দুলালি। বয়স বড়জোর সতের আঠার হবে। আবার চলতে লাগলাম। একটা বাড়ীতে এক বৃদ্ধকে পেলাম। একটা ভাংগা ঘরের চালা দিয়ে কয়েকটা বাঁশের উপর খাড়া করে মাথা গুজার ঠাঁই করেছে। জিজ্ঞেস করলাম, চাচা আপনার কি লাগবে? বৃদ্ব বললেন, আর কোন প্রয়োজন নাই। সবই তো গেল। কার জন্য আর বেচেঁ থাকব। আমি মরলামনা কেন? এই যে দেখছেন সব ভিটা খালি। আমার এই চার ভিটায় চারটা বড় বড় ঘর ছিল। ছেলে মেয়ে বউ নাতি নাতনী নিয়ে বাড়ী সব সময় গম গম করত। আজ কেউ নাই। এমন কি তাদের লাশও পেলাম না কোথাও। বৃদ্বকে শান্তনা দেবার ভাষা আমার জানা নেই। শুধু বললাম সব আল্লাহর ইচ্ছা, চাচা। আর একটা গ্রামে গেলাম। এখানে মানুষ আরও কম। এক জায়গায় দেখলাম সাতটা গরু মরে পড়ে আছে। তখনও এক দড়িতে সব কয়টা বাধা। মনে হল কোন গোয়ালে এগুলো বাধা ছিল। আরও কয়েকটা গ্রাম ঘুরে ফিরে এলাম লঞ্চে। রাতে লঞ্চ ছেড়ে দিল। অন্য কোন খানে। ২১ তারিখে বারটার মধ্যেই আমাদের রসদ ফুরিয়ে গেল। আমাদের কাজ শেষ। আর সেই দিনই মজিবর খবর নিয়ে এল। প্রলয়ের কালে এক শিশুর জন্ম। সে গ্রামের নাম নিয়ে এসেছে এবং বাড়ীটাও চিনবে। গ্রামের নাম নেতাখালি। ফৈযুদ্দির বাড়ী। শুনে মনজুর রশিদ সাহেব বললেন, এ শিশুকে দেখতে যাব। চল দেখে আসি। সবাই গেলাম দেখতে। বাড়ীতে গিয়ে দেখলাম কয়েক টুকরা টিন দিয়ে একটা ছোট খুপড়ি করেছে। তার পেছনে বিরাট একটা গাব গাছ। সম্পুর্ন অক্ষত। ডাক দিতেই ফৈজুদ্দি বেরিয়ে এল। মনজুর রশিদ সাহেব বললেন, আমরা স্বেচ্চাসেবক দল। আপনার শিশুটিকে দেখতে এলাম। শিশুটি নিয়ে এল। দেখতে ফুটফুটে। মফিজ সাহেব বলল, দেখতে তো বাপের মতই হয়েছে। মনজুর রশিদ সাহেব যে উদ্দেশ্যে গেলেন তা আমি অনুমান করতে পারি। তিনি গেছেন শিশুটির জন্মকাহিনী জন্মদাতার মুখ থেকে শুনতে। হয়ত একটা গল্প লিখে ফেলবেন। তিনি ফৈজুদ্দিকে জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে এই শিশুর জন্ম হল? এবং কি ভারে রক্ষা করলেন? ফৈজুদ্দি বলল, যখন হঠাৎ ঢেউ আসল তার আগে থেকেই আমি আর আমার স্ত্রী ঐযে গাব গাছটা দেখছের তার নীচে কাজ করছিলাম। প্রথম ঢেউ আসার পরই বুঝলাম ঘরে গিয়ে বাচা যাবে না। আমরা জানি গাব গাছের ডালা খুব শক্ত। সহজে ভাঙ্গেনা। তখন আমার মাথায় বুদ্বি এল, গাব গাছে উঠে যাই। আমার স্ত্রী পোয়াতি। তাকেও গাছে উঠতে সাহায্য করলাম। আমরা গাছে উঠার সাথে সাথেই আর একটা খুব বড় ঢেউ সবকিছু তছনছ করে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। দেখলাম আমাদের ঘরগুলো কিভাবে উড়ে গেল। তার ভিতর আমার মা বাবা দুটা ছোট ভাই সবাই ছিল। ঘরের ভিতর ছিল। ঘরের সাথে তারাও মুহুর্তে ভেসে গেল। গাছ অর্ধেক পানিতে ডুবে গেল। তারপর পানি বাড়ে আমরা আরও উপরে উঠি। ঝরের গতি বাড়ছে। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, খুব শক্ত করে ডালা ধরে রাখতে। এক সময় আমার স্ত্রী বলল, তার ব্যাথা উঠেছে। বুঝলাম বাচ্চার জন্ম হবে। আমরা তখন গাছের মগডালে। আমার স্ত্রীকে ভাল করে বসতে সাহায্য করলাম। এক সময় বাচ্চা হল। আমি আমার লুঙ্গিতে বাচ্চা ধরলাম। সকালে ঝড় কিছু থামল। আমরা গাছ থেকে নেমে এলাম। কিন্তু যাব কোথায়! ঘরের তো চিহ্ন নাই। বাচ্চা রাখব কোথায়? আমরাই বা থাকব কোথায়? এইযে খুপরি দেখছেন তা আমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে থাকা টিন কাঠ দিয়ে তৈরি করেছি।  
সব শুনে আমরা আমাদের পকেট অনুযায়ী বাচ্চাকে উপহার দিলাম। মনজুর রশিদ সাহেব পকেটে হাত দিয়ে যা ছিল সবই দিয়ে দিলেন।
আমাদের কাজ শেষ। ফিরে চললাম। অনেক রাতে এসে পৌছলাম বরিশাল ঘাটে। সকালে ঢাকা রওয়ানার প্রস্তুতি চলল। লঞ্চ ছেড়ে দিচ্ছে এমন সময় রেড ক্রসের একটি বোট এসে থামল আমাদের লঞ্চের পাশে। একজন বিদেশি সাদা মানুষ উঠে এসে জিজ্ঞেস করল আমরা ঢাকা যাচ্ছি কিনা। মনজুর রশিদ সাহেব বললেন, হ্যা, ঢাকা যাচ্ছি। তখন ভদ্রলোক বললেন, তোমাদের সাথে দুজন দু:স্থ মানুষ নিয়ে যেতে হবে এবং ঢাকায় অবস্থিত রেড ক্রস অফিসে পৌছে দিতে হবে। 
মনজুর রশিদ সাহেব বললেন কোন অসুবিধা নেই, নিয়ে যেতে পারব।
কারা এ দুজন?
তারা স্বামীস্ত্রী। নাম আজাহার এবং ফাতেমা। তাদের বাড়ী সন্দীপ। প্রলয়ের রাতে বিশ ফুট উচু প্রথম ঢেউ তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ঢেউয়ের পর তাদের আর কিছু মনে নেই। দুদিন পর আজহার চোখ মেলে দেখল সে একটা কাঠের খুটি ধরে আছে। নীচে পানি আর পানি, উপরে আকাশ। চারদিক তাকিয়ে দেখল তীরের কোন চিহ্ন নেই। বুঝল সে এখন অথৈই জলের মাঝখানে। ভাবতে লাগল কিভাবে বাচা যায়। দিন গেল, রাত গেল। পরের দিন দেখল তার পাশ দিয়ে মহিষের মৃতদেহ ভেসে যাচ্ছে। ফুলে ডুল হয়ে আছ্।ে তার মাথায় বুদ্বি এল। দুটা মহিষকে এক সাথে বাধলে কেমন হয়। সে দুটা মহিষ টেনে এক সাথে করল। তার পরনে তখনও লুঙ্গিটা ছিল, গায়ে গেঞ্জি। লুঙ্গি ছিড়ে সে দুটি মহিষের পা এক সাথে বাধল। তারপর একটা কাঠ মহিষের উপর রাখল। তার উপর সে উঠে বসল। বেশ হয়েছে। অন্তত পানিতে ডুবে থাকতে হবে না। দুর্গন্ধ সহ্য করতে হবে। এভাবে কেটে গেল একদিন। পরের দিন সে দেখল একটু দূরে একটা বাঁশ ভেসে যাচ্ছে। বাঁেশর মাঝামাঝি কালোমত কি একটা জিনিষ। কালো জিনিষটা কি তা দেখার তার কৌতুহল হল। এর মাঝে সে এক টুকরা কাঠ যোগার করেছে। বৈঠা হিসেবে ব্যবহার করে। বৈঠা দিয়ে তার মহিষের নৌকা বেয়ে বাঁশের কাছাকাছি গেল। কালো জিনিষটা মনে হয় মানুষের চুল। আরও কাছে গিয়ে নিশ্চিন্ত হল, হা, এটা মানুষের মাথা। সে চুল ধরে টান দিয়ে উপরে উঠাল। আতকে উঠল! একি! এ যে তার স্ত্রী ফাতেমা! জীবিত আছে। কিন্তু অর্ধমৃত। মিলন। অলৌকিক মিলন! মহিষের উপর তোলে আজহার ব্যাকুল হয়ে পড়ল কিভাবে তার হুশ ফেরানো যায়। এখন দুপুর। আকাশে মেঘের ফাকে রোদের খেলা। বিকেলের দিকে ফাতেমা চোখ মেলে দেখে পাশে আজহার। সে তখনও বুঝতে পারেনি এখন কোথায় আছে। আজহারকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। তারপর সব বুঝল। এখন তাদের বাচতে হবে। কিন্তু কিভাবে। এখন তারা কোথায় কিছুই অনুমান করতে পারে না।
আজহার আবার বুদ্বি বের করল। সে তার গায়ের গেঞ্জি খুলে তার কাঠের টুকরো বৈঠার মাথায় বাধল। মহিষের উপর দাড়িয়ে এটা আকাশের দিকে নাড়তে লাগল। সারাদিন কোন ফলাফল হল না। রাত গেল। আজহার আশা ছাড়বে না। পরের দিন সকাল থেকেই সে তার ঝ্ন্ডা উড়াতে লাগল। এক সময় কাজ হল। একটা স্পীড বোট এসে কাছে দাড়াল। বলল, উঠে এস। এরা রেড ক্রসের লোক। তারা এখন এই যুগলকে আমাদের কাছে পৌছে দিল। আমরা ঢাকায় পৌছে দিলাম। ঢাকার রেড ক্রস পৌছে দেবে তাদের ঠিকানায়। মনজুর রশিদ সাহেবই সবকিছু করলেন। আমরা কাজে যোগদান করলাম। 

-৪৪-

সামনে নির্বাচন। যেখানে সেখানে সভা সমাবেশ। যখন সুযোগ পাই চলে যাই সেই সব সভায়। আমি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য নই বা কোন দলকে সমর্থন করি না। কিন্তু আমার নীতি এবং তিক্ত অভিজ্ঞতা নিজের অজান্তেই একটা রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুকে পড়ি। অনেক ভেবে দেখলাম দলটি বাঙালির জন্য কিছু করতে চায় এবং করবে বলে বিশ্বাস করি। যে কোন সভায় যাই দেখতে পাই এবং শুনতে পাই শেখ মুজিবের মুখের কথাই সবার কথা। দলমত নির্বিশেষে। দেখা গেল বাঙালি ঐক্যবদ্ব।

দেশ এখন অস্থির। এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে ১৯৬৬ সাল থেকে শেখ মুজিবের ৬দফা দাবীর পর থেকে। তখন থেকেই পশ্চিম পাকিস্থানীর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্থানকে কিভাবে দমিয়ে রাখা যায় তার আপ্রান চেষ্টা চলল সব কাজকর্মে। আয়ুব খান মনে করল পূর্ব পাকিস্থানকে স্বায়ত্ব শাসন দিলে পূর্ব পাকিস্থান আলাদা হয়ে যাবে। তাই শেখ মুজিবকে দমাতে হলে তাকে দেশোদ্রোহী আখ্যা দিতে হবে। শুরু হল আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে মিথ্যা মামলা। এই অন্যায় আর মিথ্যা মামলা জনগন বুঝতে পারল এবং শুরু হল আন্দোলন। ‘জেলের তালা ভাংগব, শেখ মুজিবকে আনব’ এই শ্লোগান দিয়ে ১৯৬৯ সালে শুরু হল গনঅভ্যুথ্যান। সেই আন্দোলনে আমিও সক্রিয় অংশ গ্রহন করেছি। 
আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হল আসাদ, মতিউর, ড: সামসুজ্জোহা। সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হয় কেন্টনমেন্টে বন্দী অবস্থায়। ছাত্রজনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান বাধ্য হল এই মামলার সকল আসামিকে মুক্ত করতে। মুক্ত হবার পর শেখ মুজিবকে ছাত্রজনতার পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভুষিত করা হয়। এখন বঙ্গবন্ধুই বাঙালি পথ নির্দেশক। 
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পরই বাঙালি তেতে আছে। এখন ঘি ঢালল দক্ষিনবঙ্গের জলোচ্ছাস, যেখানে তিন লক্ষাধিক মানুষ মারা গেল, লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন সেখানে পাকিস্থান সরকারের উদসীনতা বাঙালির মনে পাকিস্থানের প্রতি ঘৃনার সৃষ্টি করল। পাকিস্তান সরকার কোন সাহায্য তো করেইনি, দুর্গত এলাকা পরিদর্শনেও কেউ যায়নি। মনে হল দুর্গত এলাকা যেন পাকিস্তানের অংশই নয়। সরকারের উদাসীনতার প্রতিবাদে যেখানে সেখানে তীব্র ঘৃনা প্রকাশ করতে লাগল জনগন। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বললেন, ‘আসসালামুআলাইকুম, পাকিস্তান, আর নয় তোমাদের সাথে।’ এমন দুর্যোগের সময়'কোন দেশ তার অসহায় নাগরিকের খোজ খবর নিবেনা সে দেশের প্রতি ঘৃনা পোষন করি। তার প্রতিফলন পাওয়া গেল ডিসেম্বরের নির্বাচনে। আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা লাভ করে বিজয়ী হল। পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্টতা পেল জুলফিকার আলি ভুট্টোর পিপলস পার্টি। কিন্তু পাকিস্থানের কনষ্টিটিউশন অনুযায়ী দুই পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান। 
পশ্চিম পাকিস্তানিরা প্রমাদ গনল। বাঙালির হাতে ক্ষমতা দেয় যাবে না। শুরু হল তালবাহানা। ভুট্টো-মুজিব-ইয়াহিয় মিটিং পন্ড হল। বাঙালির হাতে ক্ষমতা কিছুতেই দেয়া যাবে না। ভুট্টোর পরামর্শে ইয়াহিয়া পরবর্তি সভাও বাতিল করে দিল। এখন ক্ষমতা হাতে পাবার কোন পথই খোলা রইল না। জনতা এখন পথে বেরিয়ে পরেছে। প্রতিকার চাই। বঙ্গবন্ধুর আদেশের অপেক্ষায় জনগন। আইন শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ছে। কখন কি হয় কিছুই অনুমান করা যায় না। সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানে থমথমে ভাব। শুধু আদেশের প্রতীক্ষায়।
৭ই মার্চ ১৯৭১। রেসকোর্স ময়দানে জনগনের প্রতীক্ষার অবসান ঘঠিয়ে বঙ্গ বন্ধুর বজ্র কন্ঠে ঘোষিত হল:
“ভায়েরা আমার,
আজ দু:খ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দু:খের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্রগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও যশোরের রাজপথ আমার ভাইএর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম?
নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পুর্নভাবে আমাকে ও আওয়ামীলীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরী করব এবং এদেশেকে আমরা গড়ে তুলব। এদেশের মানষ অর্থনীতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবেন। কিন্তু দু:খের বিষয়, আজ দু:খের সঙ্গে বলতে হয় তেইশ বছরের করুন ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। তেইশ বছরের ইতিহাস মুমুর্ষ নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস – এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খাঁ মার্শাল ল জারি করে ১০ বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৪ সালে ৬-দফা আন্দোলনের ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আয়ুব খাঁনের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়হিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেনএলেন। ইয়াহিয়া খান সাহেব বললেন দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন। গনতন্ত্র দেবেন - আমরা মেনে নিলাম। তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাঁকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্র“য়ারি তারিখে আপনি  জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দিন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে সভা হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা এসেম্বলিতে বসব। আমি বললাম, এসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করব - এমন কি আমি এ পর্যন্তও বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজনও  যদি সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।
ভুট্টো সাহেব এখানে ঢাকায় এসছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন, আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরো আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতৃবৃন্দ,তাদের সং্গে আলাপ করলাম -  আপনারা আসুন-বসুন আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরী করব। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসে তাহলে কসাইখানা হবে এসেম্বলি। তিনি বললেন, যারা যাবে, তাদের মেরে ফেলে দেয়া হবে। আর যদি কেউ এসম্বলিতে আসে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত সব জোর করে বন্ধ করে দেয়া হবে। আমি বললাম, এসেম্বলি চলবে। তারপরে হঠাৎ ১ তারিখে এসেম্বলি  বন্ধ করে দেওয়া হলো।
ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্ধ করে দেয়ার পরে এদেশের মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠলো।
আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করুন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগন সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগন রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো, তারা শান্তিপূর্নভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ব হলো। কি পেলাম আমরা? জামার পয়সা দিয়ে অস্্র কিনেছি বহি:শত্র“র আক্রমন থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দু:খি নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে - তার বুকের ওপর হচ্ছে গুলি।  আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু - আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। টেলিফোনে আমার সংগে তার কথা হয়। আমি তাকে বলেছিলাম জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। দেখে যান কিভাবে আমার গরিবের ওপর, আমার বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে। কিভাবে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। কী করে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন।  তিনি বললেন, আমি নাকি স্বীকার করেছি  ১০ তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স হবে। 
আমি তো অনেক  আগেই বলে দিয়েছি কীসের আরটিসি, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসবো? হঠাত আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘন্টা গোপন বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন সমস্ত দোষ তিনি আমার উপর দিয়েছেন, বাংলার মানুষের ওপর দিয়েছেন।

ভাইয়েরা আমার, ২৫ তারিখে এসেম্বলি ডেকেছেন। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছি যে ঐ শহীদের রক্তের উপর পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। এসেম্বলি কল করেছেন, আমার দাবী মানতে হবে। প্রথম, সামরিক আইন - মার্শাল-ল উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগনের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখব, আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারব কি পারব না। এর পূর্বে এসেম্বলিতে বসতে আমরা পারিনা। 
আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত, ফৌজদারি আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সে জন্য যে সমস্ত জিনিসগুলি আছে, সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়ি,  রেল চলবে। লঞ্চ চলবে - শুধু সেক্রেটারিয়েট ও সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্ট, জজ কোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা - কোনো কিছুই চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয় - তোমাদের কাছে উপর আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তা ঘাট যা যা আছে সব কিছু -  আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। তোমরা সৈন্যরা, তোমরা আমাদের ভাই। তোমরা ব্যারাকে থাকো, তোমাদের কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার মানুষের বুকের উপর তোমরা গুলি করবার চেষ্টা করো না। সাত কোঠি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে  পারবে না।
আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে,  আমরা আওয়ামীলীগ থেকে যদ্দুর পারি সাহায্য করতে চেষ্ট করব। যারা পারেন আমাদের রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা-পয়সা পৌছে দেবেন। আর এই সাতদিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌছে দেবেন।  সরকারি কর্মচারিদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো - কেউ দেবে না। শুনুন, মনে রাখবেন, শত্র“ বাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আতœকলহ সৃ্িষ্ট করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষা করার দায়ীত্ব আপনাদের উপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন, রেডিও টেলিভিশনের কর্মচারিরা যদি আমাদের কথা না শোনে, তাহলে কোনো বাঙালি রেডিও ষ্টেশনে যাবে না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, তাহলে কর্মচারীরা টেলিভিশনে যাবেন না। দুঘন্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মাইনাপত্র নিতে পারে। কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশের সংগে নিউজ পাঠাতে হলে আপনারা চালাবেন। কিন্তু যদি এদেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিনা বুঝেশুনে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল¬ায় আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুল। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল¬াহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”
জনগন প্রস্তুত হয়ে আছে। শুধু আদেশের অপেক্ষায়। স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি  সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সমস্ত হলগুলো খালি করার আদেশ হয়েছে। নাজমাকেও ছাড়তে হবে। ট্রেন চলাচল বন্ধ। বাসও চলেনা। বাড়ী যাওয়ার কোন যানবাহন মিলবে না। আমি সব কাজ বাদ দিয়ে নাজমার কাছে গিয়ে পৌছলাম। গিয়ে দেখি সে প্রস্তত হয়ে আছে। হোষ্টেলের সবাই যার যার গন্তব্যে যাচ্ছে। নাজমা ভাবছে এই অবস্থায় খালার বাসায় যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। রোকেয়া হল থেকে মুহাম্মদপুর একা যাবার সাহস করছেনা নাজমা। বললাম, চল আমি পৌছে দিয়ে আসি। তোমাকে একা যেতে দেয়া যায়না এখন। মানুষ এখন পথে, ঘরে নেই। তখনও দুএকটা বেবি টেক্সি চলাচল করে। একটা বেবি টেক্সি নিয়ে রওয়ানা দিলাম। রাস্তা লোকে লোকারন্য। যেখানে সেখানে জটলা পাকিয়ে মানুষ একটা ডাকের অপেক্ষা করছে। সব কাজকর্ম বন্ধ। মনে হয় সবাই প্রস্তুত। এত মানুষের ভিতর দিয়ে একে বেকে এক সময় টেক্সি ঝর্না খালার বাসায় পৌছল। হাফ ছেড়ে বাচলাম। বাসায় পৌছে খালাকে বললাম, শহরের অবস্থা ভাল নয়। অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নাজমা এখানেই থাকবে। কুমিল্লা যেতে পারবে না এখন। আমি পৌছে দিয়ে গেলাম। আমিও আবার আসতে পারব কবে জানি না। কারন যান বাহন চলাচল করছে না। মাঝে মাঝে দুএকটা বাস শহরে চলে কিন্তু তাতে দাড়াবার স্থান তো মিলে না এমন কি বাদুর ঝোলার স্থানও পাওয়া যাবেনা। কবে যে সব স্বাভাবিক হবে তা কে জানে! 
আমি এখন চলি খালা বলতেই খালা একবারে ধমকের সুরে বললেন তুমি না খেয়ে যাবে কি করে। কয়েক মিনিট বস। আমার দেরি হবে না। সামান্য কিছু করছি। 
খালার ধমকে বসতেই হল। মাছ ভাত খেয়ে  নাজমাকে বললাম সব ঠিক হয়ে যাবে। দেশের অবস্থা আবার আগের মত ফিরে আসবে। আমরা আবার আগের মত দেখা সাক্ষাত করব। আবার নিউ মার্কেট, আজিজ মার্কেট ঘুরব, রেষ্টুরেন্টে বসে খাব, গল্প করব। সবকিছু স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাক। এখন তো বাড়ী যেতে পারবেনা। কোন প্রয়োজন হলে আমাকে অফিসে খবর দিবে। একটা টেলিফোন থাকলে ভাল হত। কোন চিন্তা করোনা। খুব শীঘ্রির সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, বলে রওয়ানা দিতেই নাজমা জিজ্ঞেস করল, এখন যাবে কি করে?
হ্যা, তাইতো! সেটা তো ভেবে দেখিনি! চেষ্টা করব কিছু একটা পেয়ে যেতে, না পেলে এগার নাম্বার তো আছেই।
এগার নাম্বার মানে? কি সেটা?
এগার নাম্বার চিন না? চিন কি তাহলে? এটা তো সবাইর আছে, প্রয়োজনে কাজে লাগায়। আজ আমিও ব্যবহার করব। কোন চিন্তা নাই।
এগার নাম্বারটা কি বলনা!
ঝর্না খালা পেছন থেকে বলল, তোর খালুওতো এই কথা বলত মাঝে মাঝে। পরে জানতে পেরেছি এগার নাম্বার হল দুটা পা মানে পায়ে হেটে যাওয়া। 
এইটা এগার নাম্বার? বলে নাজমা হেসে উঠল। 
হ্যা, এটা হল এগার নাম্বার। এখন আমি এগার নাম্বারে বাসায় যাব।
এত দূর পথ! হেটে যাবে? আমার জন্য এটা হল। 
কোন অসুবিধা হবে না। চলে যাব। আরও ছোট থাকতে এ চেয়ে বেশি পথ হেটে নানা বাড়ি যেতাম। এটা আর এমন কি! মুহাম্মদপুর থেকে বাসাবো! বলে রওয়ানা দিলাম। খুব সাবধানে যাবে, যেখানে মানুষের ভীর সেখানে দাড়াবেনা। 
আচ্ছা দাড়াবনা বলে পা বাড়ালাম।
মুহাম্মদপুর থেকে বাসাবো কত দূর? কত গতিতে কত ঘন্টা লাগে? তা বের করতে স্কুলের সেই অংক কষতে হবে যা আমি কোনদিনই করতে পারিনি। নাজমা পারবে কিনা জানি না। তবে আমি চার ঘন্টা পর রাত বারটায় বাসায় পৌছলাম।
 
-৪৫-

২৩শে মার্চ ১৯৭১। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত আউটার স্টেডিয়ামের জনসভায় বঙ্গ বন্ধুর বজ্র কন্ঠে পূনরায় ঘোষিত হল, “কাল থেকে ব্যাংক চলবে না, অফিস আদালত চলবে না, গাড়ী চলবে না .. ..”। সভাশেষে দল বেধে বাসার পথে পদব্রজে চলছি। পথে তিল ধারনের স্থান নেই। চলতে চলতে ষ্টেট ব্যাংকের সামনে (বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক) এসেই ব্যাংক বিল্ডিংএর দিকে তাকালাম। ভাবলাম কাল অফিসে আসতে হবে না, আর বিহারি অফিসার মাছির (মশিউর রহমান, তার বন্ধুরা ডাকে মসি বলে, আমরা বাঙালিরা বলি মাছি) সাথে ঝগড়া করতে হবে না। 
 ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মিলিটারি পাহারাদার ঠিক পাহারা দিয়ে যাচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহ হল তাদের এখানে বসিয়েছে। তার আগে ব্যাংকের সিকিউরিটি পাহাড়া দিত। প্রত্যেক তলায়, প্রত্যেক গেইটে, বাইরে সব জায়গায় এখন মিলিটারি পাহাড়াদার। দেখলেই মনে একটা ভয়ের সঞ্চার হয়। 
তখন থাকি বাসাবো। কমলাপুরের পথ ধরে চলেছি। রেল ষ্টেশনের কাছে আসতেই মাথায় একটা বুদ্বি এসে গেল। আরে! কাল থেকে তো রেল চলবে না! অফিসেও যেতে হবে না! কি মজা! তাহলে বাড়ী চলে যাই না কেন! মা-কে দেখিনা দু মাস হল। এ সুযোগে ঘুরে আসি। ভাবতে ভাবতে ষ্টেশনের কাছে এসে দেখি মানুষের ভীড়, ঠেলাঠেলি হৈচৈ চিৎকার। সবাই যাত্রী। টিকেট কাউন্টার বন্ধ। রেল গাড়ী ছাড়ছে না। গাড়ীর ড্রাইভার বোধ হয় আমার চেয়েও বেশি ফাকিবাজ। আমি তো কাল থেকে সুযোগ নেব, আর এই রেলগাড়ীর ড্রাইভার এখন থেকেই নিচ্ছে। রেল বন্ধ। সবগুলো রেলগাড়ী পাথরের মত দাড়িয়ে আছে। আমার সাথে ছিল জিয়া। (সিলেটের জিয়াউদ্দিন, পরবর্তীতে ঢাকা মিউনিসিপালিটির প্রধান ব্যবস্থাপক। ) তাকে বললাম, জিয়া তুই হাদিকে বলে দিস, আমি বাড়ী চললাম। 
ষ্টেশনে আগত এই জনস্রোতের একটাই দাবী, এখন রেল চলতে হবে, বন্ধ হবে কাল থেকে। বঙ্গবন্ধু বলেছেন কাল থেকে রেল বন্ধ। তাহলে আজ রাতে চলবেনা কেন! এই ভীড়ের মাঝে দাড়িয়ে ব্যাপারটা বুঝলাম। তাইত! এখন বন্ধ করা মানে বঙ্গবন্ধুর আদেশ অমান্য করা। সেই সময় একটা সুবিধা ছিল। এ ধরনের জনস্রোতে যে কেউ সাহস করে দাড়িয়ে কথা বলতে পারলেই সে হয়ে যেত লিডার মানে নেতা। তার পেছনেই জনস্রোত চলতে থাকে নদীর জলের মত। এমন অনেক নজীর আছে, বর্তমানে বাংলাদেশে এমন বেশ কিছু মহা নেতা এখন রাজনীতির মাঠে আছে। আমার তখন মনে হল বাড়ী যাওয়া আমার খুব প্রয়োজন। এই ঘন্টাখানেক আগেও এমন তীব্র টান অনুভব করিনি। যেই ভাবলাম বাড়ী যাব তখনই এটা হয়ে গেল জরুরী। 
একটু দাঁড়িয়ে, দুএকজনের সাথে কথা বলে বুঝলাম ষ্টেশন মাষ্টার ইচ্ছে করলেই রেল চালাতে পারে। আমি বললাম, ভাইসব শুনুন .. । তখন ভাইসব কথাটার একটা বিশেষত্ব ছিল। সবাই কান খাড়া করে নেয় কিছু শোনার জন্য। বললাম, চলুন আমারা ষ্টেশন মাষ্টারের কাছে যাই। তাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। তিনি নিশ্চয়ই শুনবেন। আর যায় কোথায়! সবাই এক বাক্যে চলুন, চলুন বলে চিৎকার করে উঠল। আমি হয়ে গেলাম ক্ষনিকের নেতা। ষ্টেশন মাষ্টারের ঘরের দিকে চললাম। আমার পেছনে মানুষের স্রোত। পেছনের অনেকেই জানে না, কোথায়, কেন, কে যাচ্ছে। কিন্তু জনস্রোত চলছে।
ষ্টেশন মাষ্টারের রুমে ঢুকলাম। পেছনে জনস্রোত। ষ্টেশন মাষ্টার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন। তিনি হয়ত ভাবলেন আমি কোন ছাত্রনেতা। সেলাম দিয়ে বললাম, বাইরের এই হাজার হাজার মানুষের একটা দাবী, এখন একটা গাড়ী চলুক। তাছাড়া রেল তো কাল থেকে বন্ধ হবার কথা। এখন ঢাকা টু চিটাগাং একটা গাড়ী ছাড়ার ব্যবস্থা করুন। এসব হাজার হাজার মানুষের চিৎকার, গালাগালি বন্ধ করুন।
দেখলাম সহজেই কাজ হল। তিনি বললেন, দু নম্বর প্লাটফর্মের গাড়ীটা যাবে। আমি ব্যবস্থা করছি। শুনে এসব যাত্রীর মাঝে স্বস্তি ফিরে এল। হুর হুর করে সবাই আসন দখল করে নিল। আমিও এক কোনে একটু বসার জায়গা করে নিলাম। 
গাড়ীটা শেষ পর্যন্ত ছাড়ল রাত নয়টায়। সিট পেতে অসুবিধে হলনা। কয়েকজন অচেনা মানুষ আমার বসার ব্যবস্থা করে দিল। কারন বুঝলাম। এখন আমি নেতা। এই গাড়ীর। মুক্তিযুদ্ব শুরু হবার আগে এটাই শেষ গাড়ী। ঢাকা টু চিটাগাং। একটা বিশেষ গাড়ী। কোন টিকেটের বালাই ্েনই, টিকেট চেকার নেই। শুধু চালক। আমরা যাত্রীরা যেন সবাই ভিআইপি। সারাজীবন তো টিকেট নিলই, একটা গাড়ী না হয় টিকেট ছাড়া গেল তাতে এমন কি ক্ষতি!  ভিতরে বসে অনেক কথা মনের মাঝে উকি দিতে লাগল। নাজমার কথা বহুবার মনে হয়েছে। মনকে প্রবোদ দিয়েছি এই বলে যে, সব ঠিক হয়ে যাবে, অফিস আদালত আবার চলবে। বাংলার মানুষ সুখে থাকবে। নতুন করে দেশ তৈরি হবে। আমরা ঝামেলাবিহীন সুন্দর জীবন কাটাব। এসব ভাবতে ভাবতে টংগি এসে গেল। তখনও বুঝিনি গাড়ীর যাত্রী কত হতে পারে। টংগী ছাড়িয়ে গাড়ী বাঁক নিতেই দেখলাম ভিতরে যত যাত্রী, তার দ্বিগুন উপরে। এই বিশেষ গাড়ীটা তার বিশেষত্ব নিয়ে প্রত্যেক যাত্রীকে তাদের বাড়ীর সামনে নামিয়ে দিয়ে যেতে যেতে রাত চারটার সময় পৌছল ভৈরব ষ্টেশনে। কতবার কোন কোন জায়গায় চেন টানা হয়েছিল তা মনে রাখার মন ছিলনা তখন। একসময় কিছুক্ষন ঘুমিয়ে নিলাম। অবশ্য আমি ইচ্ছে করে ঘুমাইনি। চোখ নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। চোখ খুলে দেখি গাড়ী আখাউরা জংশনে থেমে আছে। আর মাত্র দুটা ষ্টেশন। তারপরই কসবা। আহ্, প্রায় এসে পড়েছি। তখন সকাল ছয়টা। 
গাড়ী আবার চলল। আমার বাড়ী ইমামবাড়ী আর কসবা ষ্টেশনের মাঝ বরাবর। বাড়ী বরাবর গিয়ে চেন টানলেই আমার জন্য সুবিধা। তাছাড়া এই ট্রেনটা তো আমাদের জন্যই। বাড়ী বাড়ী পৌছে দেবার জন্য। আমার বাড়ী বরাবর আসতেই চেন টানতে যাব তার আগেই ট্রেন থেমে গেছে। বাহ্, খুব মজা তো! তাড়াতাড়ি নেমে পড়লাম। গাড়ী চলে যাবার পর দেখলাম আমার আশেপাশের গ্রামের বেশ কয়েকজন। যে যার পথে যাচ্ছে। কেউ উত্তরে, কেউ দক্ষিনে, কেউ পশ্চিমে। আমি যাব পুবে। বর্ডারের দিকে।  পুবের কোন মানুষ দেখলাম না।
এটাই শেষ রেল গাড়ি ঢাকা থেকে ছেড়ে গেছে। এবং বোধ হয় এটাই প্রথম রেলগাড়ী হোম সার্ভিস দিল। সব যাত্রীকে তার বাড়ী বাড়ী পৌছে দিয়ে ২৩ তারিখে রওয়ানা দিয়ে ২৪ তারিখে সকাল সাতটায় পৌছলাম। কসবা পর্যন্ত পৌছতে লাগল দশ ঘন্টা। যেখানে ঢাকা থেকে কসবা পৌছতে লাগে তিন ঘন্টা। কসবা থেকে চিটাগাং পৌছতে কত সময় লেগেছিল আমার জানা নিই। আলী আকবরের পাটিগনিতের ফর্মুলা নিয়ে অংক কষলে হয়ত কেউ বের করতে পারবেন। 
ক্ষেতের আল ধরে সড়কে উঠলাম। বাড়ী পৌছলাম সকাল আটটার দিকে। 
এই অসময়ে আগমন দেখে বাড়ীতে একটা হৈ চৈ পড়ে গেল। বললাম, ফ্রি গাড়ীতে আসলে এমন অসময়েই আসতে হয়। মায়ের এসব জানার প্রয়োজন নেই, আমি এসেছি তাঁর কাছে এটাই বড় কথা।
খেয়েদেয়ে দিলাম ঘুম। ঘুম থেকে উঠলাম বিকেল পাঁচটায়। উঠেই রেডিওটা ছাড়লাম। ঢাকায় যে থম থমে ভাব দেখে এসেছি তার কোন খবর আছে কিনা। না, নতুন কোন খবর নেই। পাড়া ঘুরে এবাড়ী ওবাড়ী করে ফিরলাম নয়টার দিকে। খেয়ে ঘুময়ে পড়লাম।
পরের দিন সারাদিন কাটালাম গ্রামের বন্ধুদের সাথে। রাজনীতি নিয়ে তর্ক বিতর্ক হল সারাদিন। আজ পঁচিশে মার্চ। তখনও অনুমান করা যায়নি ঢাকায় কি ঘটতে যাচ্ছে। 
২৬শে মার্চ সকাল আটটার দিকে ঘুম থেকে উঠে দেখি মা ভাপা পিঠা প্রস্তুত করে রেখেছে। বলল, তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে আস। গরম গরম না খেলে মজা পাবে না। উঠানে তোমার চেয়ার দেয়া হয়েছে। 
ঘরে না দিয়ে উঠানে কেন? এটা আমার ছোটবেলা থেকে অভ্যাস হয়ে গেছে। শীতের দিনে রোদে বসে মুড়ি খেতাম। তারপর এটা শীতে বসন্তে বার মাসে দাড়াল। সকালে নাস্তা যাই হোক আমি উঠানে রোদে বসে খাই। এতে আমি কি মজা পাই তা নিজেই জানি না। মা জানে আমার নাস্তার জায়গাটা কোথায় হবে। তাই দুটা চেয়ার রাখা হয়েছে উঠানে। একটায় আমি বসব আর একটা টেবিল হিসাবে ব্যবহার করব। 
হাতমুখ ধুয়ে এসে বসলাম উঠানে। পিঠা খাচ্ছি আর উঠানের কোনে মান্দার গাছের দিকে তাকাচ্ছি। বেশ কতগুলো লাল ফুল ফুটে আছে। একটা হামিং বার্ড এসে মধু সংগ্রহ করছে ফুল থেকে। প্রকৃতির সৃষ্টি!  ফুলের উপর না বসেই, উড়ন্ত অবস্থায় মধু সংগ্রহ। 
আমাদের সবচেয়ে আদরের, পরিবারের সবচেয়ে ছোট ভাই রিয়াজ। বললাম রেডিওটা নিয়ে আয়। সে নিয়ে এল এবং চেয়ারের এক পাশে রাখল। অন করে প্রথমে ঢাকা ষ্টেশন ধরতে চেষ্টা করলাম। কোন শব্দ নেই। মনে করলাম বোধ হয় ইথারের স্বল্পতা। আকাশবানী ঘুরাতেই অতি পরিচিত দেবদুলালের কন্ঠে ভেসে এল, ”বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে.. ..” আমার হাতের পিঠা হাতেই রয়ে গেল। একি হল! তাহলে রুখে দাড়িয়েছে! আমার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। চেয়ার থেকে উঠে পায়াচারি করছি। কি হল! কি হল! তবে কি ষ্টেট ব্যাংকে আর্মি দেখে যা সন্দেহ করেছিলাম তই হল! কোথায় কোথায় কি হল, কি হচ্ছে! আকাশবানী বলছে রাজারবাগ পুলিশ লাইন প্রায় নিশ্চিহ্ন! কত লোক মারা গেল! 
এর মধ্যে মা আবার গরম পিঠা নিয়ে এল। এসে দেখল মাত্র একটা পিঠা খেয়ে আমি উঠে গেছি!  
মায়ের অনুযোগ, একি উঠে গেলে কেন? পিঠা ভাল হয় নাই? তাহলে মুরগী বুনা নিয়ে আসি। আমি তো মনে করলাম কচি লাউয়ের তরকারি পছন্দ করবে। বস, বাবা, আমি নিয়ে আসছি। 
না মা, তোমার পিঠা ভাল হয়েছে। এখন আর খেতে পারব না। পরে খাব। এসময় বাবা বেরিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আজকে কোন নতুন খবর আছে?
একটু চুপ করে থেকে বললাম, হা, আছে। ঢাকা এখন বধ্যভুমি।
বল কি! বাবা রেডিওতে খবর শুনতে বসে গেলেন। 

- ৪৬ -

আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে বৃটিশবিরোধি আন্দোলনে যোগ দিয়ে বঙ্গ  ভঙ্গ রোধে ব্যর্থ হয়ে স্বধীনতার পর নিঃস্ব হাতে বাড়ী এসেছেন। চাচা কোলকাতার বিখ্যাত আইনজীবি হাবিবুর রহমান চৌধুরী। বাবা এখনও রাজনৈতিকভাবে খুবই সচেতন। যখন তখন কংগ্রেসের ক্রিয়াকর্ম নিয়ে কথা বলেন। আকাশবানীর খবর বার বার দিচ্ছে। বাবা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। বললেন, তাহলে আর একটা স্বাধীনতা দেখে যাবার সৌভাগ্য হবে আমার। 
অনেকক্ষন অস্থিরভাবে পায়াচারি করে আবার চেয়ারে বসলাম। বসতে পারলাম না। মনে হল এখনি বোধ হয় আমার কোথাও যেতে হবে। কোথায় যেতে হবে তা জানি না। তবে বসে থাকতে পারছি না। কোথায় যাব! কোথায় যাব করে হঠাৎ মনে পড়ল নুরুর কথা। নুরু আমার সহপাঠি। ছাত্র ভাল ছিলনা বলে স্কুলে থাকতেই  চলে গেল বেঙ্গল রেজিমেন্টে। সে এখন ছুটিতে।  আমাদের পাশের গ্রামে তার বাড়ী। কিন্তু আড্ডা হয় আমাদের গ্রামে। 
গ্রামের দিকে বেরিয়ে পড়লাম। ভাইপো ফজলুকে পেলাম।(পরে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে ডালিমের সাথে ছিল)। আমি খবর দেবার আগেই সে বলল, চাচা, সব শেষ। রাজারবাগ পুলিশ লাইন শেষ! কত লোক যে মারা গেছে কে জানে। আমাদের আতœীয়স্বজন যারা থাকে তাদের খবর জানার জন্য কান্নাকাটি শুরু হয়েছে। তুমি আগেই চলে এসেছ ভাল করেছ। কথা বলতে বলতে আমরা চলে গেলাম স্কুলের মাঠে। ওখানেই আমাদের আড্ডা বসে। দেখতে দেখতে আরও অনেকেই এসে যোগ দিল। সবাই জেনে গেছে ঢাকার খবর। আলোচনা সমালোচনা চলল। বললাম, চল নুরুর কাছে যাই। দেখি সে কি বলে। দশ মিনিট হেটে নুরুর বাড়ীতে গেলাম। সে চলে গেছে চন্ডিদ্বার বাজারে। এই অবস্থায় আমাদের করনীয় কি হবে তা নিয়ে আলোচনা হল। আপাতত আমরা বাঁশ দিয়ে তীর ধনুক তৈরি করব। হাজি চাচা এই কাজে পারদর্শি। তাকে সবাই গিয়ে বললাম। তিনি রাজি হয়ে বাঁশ দিয়ে শুরু করলেন তীর ধনুক তৈরি। তীর ধনুক তৈরি হচ্ছে, আমরা তীর ধনুকের সৈনিকরা আলোচনা করছি কিভাবে এসব ব্যবহার করা হবে। এক সময় নুরু এসে হাজির। আমাদের কান্ড দেখে সে হাসল। বলল, তীর ধনুক দিয়ে কি করবি? অস্্েরর মুখে এসব কিছুই না। তোদের কোন ধারনা নাই অস্র কি জিনিষ, কত ভয়াবহ। বাদ দে এসব অদ্ভুত চিন্তা। এখন অপেক্ষা করতে হবে অবস্থা কোনদিক যাচ্ছে। ইপিআর ক্যাম্পটা কিভাবে দখল করা যায় সেই চিন্তা কর। গ্রামের মানুষের সাথে বসে এ ব্যাপারে কথা বলা দরকার। আমাদের এখন অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নাই।
আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, রাজারবাগ পুলিশ লাইন উডিয়ে দিয়েছে, মুহাম্মদপুরে কিছু হয়নি। নাজমার খালু খালা আছে, ওকে আগলে রাখবে। আমি অসহায়। কোন কাজেই লাগছিনা। অপেক্ষা করা ছাড়া কোন পথ নেই।
গ্রামে রাতের খাবার তাড়াতাড়িই হয়ে যায়। আটটার দিকে খাওয়া শেষ হতেই লবখা গ্রামের দুলাভাই এসে উপস্থিত। তিনি চাকরি করেন বেঙ্গল রেজিমেন্টে। দু সপ্তাহ হল ছুটিতে এসেছেন। ঢাকার খবর শুনে তিনি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। বললেন, নমুনা ভাল ঠেকছে না। একটা কিছু হবে। আমার মনে হয় আগরতলা গেলে আমরা একটা সব জানতে পারব। তাই আমি প্রস্তুত হয়েই এসেছি। চল কাল আগরতলা থেকে ঘুরে আসি।
বললাম, চলুন যাই। এর মাঝে হয়ত আরও কিছু খবর পাওয়া যাবে। অনেক আলোচনা, সমালোচনা করে অনেক রাতে ঘুমাতে গেলাম।
২৮ তারিখ সকালে ঘুম ভাংগল মায়ের ডাকে। নাস্তা ঠান্ডা হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে আস। তাগাদা দিয়ে চলে গেলেন। আমরা দুজন প্রস্তুত হয়ে উঠানে এলাম। দেখি ছোট একটা টেবিলে নাস্তা রেডি। আমরা দুজন খাওয়া শুরু করলাম।  রিয়াজ রেডিওটা এনে টেবিলে রেখে চলে গেল। 
আমি খাচ্ছি আর রেডিওর নব ঘুরাচ্ছি। দেখি নতুন কিছু কোথাও পাওয়া যায় কিনা। ঘুরাচ্ছি আর কান পেতে আছি। হঠাৎ একটা ক্ষিন আওয়াজ ভেসে এল, ’এন এ্যাপীল টু দা ওয়ার্ল্ড..  .. ”. রেডিওটা কানের কাছে নিলাম। এবার স্পষ্ট শুনতে পেলাম, এ্যান এ্যপীল টু দা ওয়ার্ল্ড, উই আর এট ওয়ার, প্লিজ হেলপ আস, দিস ইজ মেজর জিয়া, অন বিহাফ অব শেখ মজিবুর রহমান, পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ। ” সাথে সাথে বাংলায় বলছে, আমি মেজর জিয়া বলছি, বঙ্গ বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে.. ..” । খাওয়া বন্ধ করে দুলাভাই কান পেতে আছেন। আমি আনন্দে নেচে উঠলাম। পেয়ে গেছি দুলাভাই। শুরু হয়ে গেছে! এইযে ভাল করে শুনুন। এই স্টেশনটা কোথায়! স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র! যাক শুরু হয়ে গেছে তাহলে! কে এই মেজর জিয়া! কোনদিন নাম শুনিনি তো! আপনি নিশ্চয়ই জানেন?
না, আমিও শুনিনি। তবে নামে কি আসে যায়! যুদ্ব শুরু হয়েছে এই বড় কথা। আমি অনুমান করেছিলাম একটা বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। বলে দুলাভাই বললেন প্রস্তুত হয়ে নাও। 
আমি বললাম, আমি প্রস্তুত। এই জিয়া নামে মেজরকে মাথায় নিয়ে নাচতে ইচ্ছে করছে। বেটা বাঘের বাচ্চা!
দুলাভাই বললেন, চল এখনই আগরতলা রওয়ানা দেই। সেখানে গেলেই সব খবর পাওয়া যাবে। 
ইন্ডিয়ার বর্ডার আমাদের বাড়ী থেকে মাইল খানেক। আগরতলা আমার বাড়ী থেকে কোনাকোনি হেটে গেলে পাঁচ ছয় ঘন্টা লাগে। আর পূবদিকে সোজা গিয়ে ইন্ডিয়ার শেখেরকোট বাজার থেকে বাসে গেলে ঘন্টা দুএক লাগে। বাংলাদেশের যে কোন শহর থেকে আগরতলা আমাদের খুব কাছে। বৃটিশ আমলে আগরতলা ছিল এই এলাকার মানুষের প্রধান শহর। আমরা ছিলাম ত্রিপুরা রাজ্যের অধিনে। আমরা ছোট বেলায় আগরতলা যেতাম সিনেমা দেখতে। জীবনের প্রথম সিনেমা দেখেছি আগরতলায়। 
আমি বললাম,চলুন।  প্রয়োজন হলে রাখালদের বাড়ীতে থেকে যাব রাত। রাখাল আমাদের অনেকের বন্ধু। তাদের বাড়ী ছিল আমাদের পাশের গ্রামে নয়ামুড়া। বলখেলার মাঠ থেকেই পরিচয়। একদিন হঠাৎ তারা চলে গেল আগরতলা আর তাদের বাড়ীতে এল এক মুসলমান পরিবার আগরতলা থেকে। তারপরও রাখাল মাঝে মাঝে আসে বেড়াতে। গত বছরও এসেছিল গোসাইস্থলের মেলায়।
দুলাভাই জিজ্ঞেস করলেন, যাবে কোন্ দিক দিয়ে? কোনাকোনি গেলে তো অনেক পথ, তুমি এতটুকু হাটতে পারবে? আমার শরীরের সাইজখানা তখন হাটার মত নয়।  বললাম, দুলাভাই থাকতে আমি হেটে যাব কেন?
আমি তা বলছি না, জিজ্ঞেস করছি। তাহলে বাসেই চল।
আমরা প্রস্ততি নিচ্ছি। এমন সময় বাবা এসে বললেন, তোমরা কাল যাও। আজকে অপেক্ষা কর। নতুন কোন নির্দেশ আসে কিনা দেখ। একটা রেডিও স্টেশন যখন চালু হয়েছে তখন কোন নির্দেশ আসতে পারে। আমরাও ভাবলাম কথাটা ঠিক। আজকের দিনটা অপেক্ষা করাই ভাল। 
না, সারাদিন শুধু একই খবর শুনলাম। নতুন কিছু নাই। 
পরের দিন সকালে খেয়ে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি এমন সময় আমাদের গ্রামের হায়দার আলীর মেয়ে জামাই এসে উপস্থিত। সেও যাবে আমাদের সাথে। ঠিক আছে, চল। (এই জামাই স্বাধীনতার পর অ¯্র নিয়ে বামুটিয়ার রহমানের বাড়ীতে অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকাকালে খুন হয়। খুনি রহমান সব স্বীকার করে এখন যাবৎজীবন জেলে)।
সকাল এগারটার সময় পৌছলাম আগরতলা চৌমুহনীতে। কোথায় যাব, আমাদের লোকজন কোথায় আছে, কোন খবরই জানিনা। একটা চা ষ্টলে ঢুকলাম। তিনজন তিন কাপ চা খেতে খেতে দুএকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা এখানে বাংলাদেশের লোকজন কোথায় আছে কিছু খবর জানেন কি? 
একজন বলল, জয়বাংলার লোক আপনারা?
এই প্রথম শুনলাম একটা দেশের নাম হয়ে গেছে জয়বাংলা। যা ছিল একটা স্লোগান, যা বঙ্গবন্ধুর মুখেই বাঘের গর্জনে ভেসে যায় আকাশে বাতাসে। বললাম হ্যা, আমরা জয়বাংলার লোক। কার কার আতœীয় কখন এসে পৌছেছে সে তার কিছু খবর দিল। আমি বললাম, না সেসব খবর চাচ্ছিনা। চাচ্ছি এখানে জয়বাংলার কোন অফিস করেছে কিনা। একজন বলল, অফিস করেছে কিনা জানি না, তবে কংগ্রেস ভবনে কিছু জয়বাংলার লোক দেখেছি। অফিস কিনা জানি না। আপনারা সেখানে গিয়ে খবর নিতে পারেন।
বললাম, আমরা তো সেরকম খবরই চাচ্ছি। আমরা কংগ্রেস ভবনে পৌছলাম।
কংগ্রেস ভবনে ঢুকে দেখি লতিফ ভাই বসে আছেন। (আব্দুল লতিফ মিয়া, সে্েক্রটারি, ইষ্টার্ন জোন, গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, স্বাধীনাতার পর টি সি বি-তে কর্মরত।) তার সামনে এক ভদ্রলোক বসে আছেন। পাশের টেবিলে আর এক ভদ্রলোক টেবিলে মাথা রেখে পড়ে আছেন। আমাকে দেখেই লতিফ ভাই বললেন, এসে গেছ! তাঁর কথাতে মনে হল আমি যে আসব তিনি জানতেন। অথচ তাঁর সাথে আমার দেখা নেই গত কয়েক বছর। সামনের ভদ্রলোকর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, মেজর বাহার। পাশের টেবিলে যিনি ঘুমাচ্ছেন তার দিকে আঙ্গুল দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ইনি?
ইনি আব্দুল কুদ্দুস মাখন। দুদিন ঘুম নেই। এই কতক্ষন আগে এসে পৌছেছে।
জিজ্ঞেস করলাম এখন আমাদের করণীয় কি? আমার সাথে এখন দুজন এসেছে, তারা যুদ্ধে যেতে চায়। আমাদের এলাকার আরও লোকজন আছে, তাদের কি বলব?
একটু অপেক্ষা কর। এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি আমরা কিভাবে কি করব। আজ রাতের মধ্যেই স্দ্ধিান্ত হয়ে যাবে। যারা এসেছে তাদের নাম ধাম লিখে রাখ। আমাদের এখনও কোন খাতাপত্র নেই। তুমি রাস্তার পাশে একটা দোকান আছে সেখান থেকে একটা খাতা নিয়ে এস এবং তাদের নাম লিখে নাও।
আমি দু রুপি দিয়ে একটা খাতা কিনে আনলাম এবং নামগুলি লিখলাম। প্রথম নামটা আমার দুলাভাই আব্দুর রহমান, গ্রাম লবখা, কসবা, বাংলাদেশ। এই প্রথম খাতা যা দিয়ে শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধার নামের একটা তালিকা। করার মত কাজ আর এমন কিছুই নেই তখন। 
সন্ধ্যার দিকে বাড়ীর পথে রওয়ানা দিলাম। লতিফ ভাই জিজ্ঞেস করলেন, এখন কোথায় যাবে? থাকার জায়গা আছে?
না, এখানে থাকার জায়গা নেই। বাড়ীতেই চলে যাব।
মানে? তোমার বাড়ী কোথায়? 
এই তো এখান থেকে ঘন্টা দুয়েক লাগে। একদম বর্ডারে।
তাহলে তো ভালই হল। বাড়ী থেকেই আসতে পারবে। কিন্তু কদ্দিন পারবে সেটা হল কথা। 
দেখা যাক, যতদিন পারা যায় ততদিন চলবে। 
লতিফ ভাইর সাথে পরিচয় ঢাকা মিটফোর্ডে থাকা কালে। যখন আমি কম্পাউন্ডার ছিলাম। লতিফ ভাই ডাক্তারের ওখানে মাঝে মাঝে  টেলিফোন করতে আসতেন। সেই থেকে পরিচয়। তখন তিনি এম এ পড়েন আর পাড়ায় নেতাগিরি করেন। সে ১৯৬৪ সালের কথা।   আমাকে খুব স্নেহ করতেন। পরে শুনেছি তিনি আওয়ামীলীগের একজন নেতা। মাঝে মাঝে দেখা হত। অনেকদিন পর আজ আবার দেখা হল। শেখের কোটের বাজার থেকে পায়ে হেটে বাড়ী পৌছতে দু ঘন্টার বেশি সময় লাগল। বুঝতে পারলাম বাড়ী থেকে আগরতলা পৌছতে লাগবে দু ঘন্টার বেশি। কাজেই লতিফ ভাইর মত হোটেলে না থাকলেও চলবে। 
এখন আমি লতিফ ভাইর সহকারি। না, ঠিক সহকারি বলা যায় না। যেন পিয়ন, যখন যা আদেশ করেন তাই করি। তার ফাইলপত্র ঠিক করে রাখি, কোথায় কা'কে কি দিচ্ছেন তা ফাইলে লিখে রাখা ইত্যাদি ফাইফরমাস পালন করা। 
প্রতিদিন সকালে যাই রাতে ফিরি। প্রথমত করার মত এমন কিছুই ছিল না। দুএকদিনের মধ্যেই  শুরু হল জনস্রোত। নদীর স্রোতের মত মানুষ আসছে। যে যেভাবে পারে কোন রকমে বর্ডার পেরিয়ে এসে পৌছল ই্িন্ডয়ার মাটিতে। যেন তারা জানত এই মহাবিপদের দিনে ইন্ডিয়ার মাটিতে পৌছতে পারলেই বেঁচে যাবে। আমাদের কাজও বেড়ে গেল। কংগ্রেস ভবনের প্রায় প্রতিটি রুম জয় বাংলার অফিস হল। মে মাসের শেষের দিকে একটা রুম নির্দিষ্ট হল জহুর আহাম্মদ চৌধুরির জন্য। তিনি দুচারদিন পর পর আসেন। খরচপত্রের ভাউচার পাশ করেন। তখন আমার উপর পড়ল এই কাজের দায়ীত্ব। আমি এই ভাউচার খাতায় এন্ট্রি করতে গিয়ে অনেক কিছুই দেখলাম। দেখে মনে হল এখানে আমরা দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধে নামিনি। এসেছি দু পয়সা কামাই করতে। অদ্ভুদ ভাউচার আসে। এমন সব অদ্ভুদ ভাউচার সই করতে গিয়ে একদিন জহুর ভাই কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘দুর্নীতিতে আগে তো আমাদের আঙ্গুলটা দেখা যেত, এখন আর আঙ্গুলটাও দেখা যায় না।’ সেই আঙ্গুল ডুবার খেলা দেখলাম ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। 

- ৪৭-

এক সপ্তাহের মধ্যেই তৈরি হল হাজার হাজার শরণার্থী শিবির। ইন্ডিয়া বর্ডারের একটু ভেতরে সমস্ত বর্ডারব্যাপী লক্ষ লক্ষ শরণর্থীর মাথা গোজার ঠাঁই হল। রেশন পদ্দতি চালু হল। 
লক্ষ লক্ষ মানুষের হাজার হাজার শরণর্থী শিবিরে কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হল রোগের প্রাদুর্ভাব। ডায়রিয়া, গুটি বসন্ত ইত্যাদি রোগে অনেকেই আক্রান্ত হতে লাগল। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমানে চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে যে যেভাবে পারে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। 
মুক্তিবাহিনিতে যারা যোগ দিচ্ছে আগরতলা থেকে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে মেলাঘর বা অন্যান্য ট্রেনিং সেন্টারে। চলল যুদ্বের প্রশিক্ষন। ভাইপো ফজলু চলে গেল করিমগঞ্জ। আমার অনুজ রিয়াজ তখন তের বছরের বালক। সে গেল ভর্তি হতে। আমি তাকে ধমক দিয়ে বাড়ী পাঠিয়ে দিলাম। এত ছোট বাচ্চা যুদ্বে যাবে কি করে। সেদিন সে বাড়ী গেল ঠিকই। কিন্তু পরের দিন সে চলে গেল নুরুর কাছে। যুদ্ব শুরু হবার সাথে নুরু যোগ দিল মুক্তি বাহিনীতে এবং মেলাঘরে ইন্ডিয়ান আর্মির সাথে কর্মরত ছিল। রিয়াজ নুরুর কাছে গিয়ে বলল, ভাইয়া আমাকে পাঠিয়েছে আপনার কাছে। আমি যুদ্বে যাব সে ব্যবস্থা করতে বলেছে। নুরু বলল, তোমাকে নেয়া যাবে না। এত ছ্টো বাচ্চা নেবার চিন্তা এখনও করিনি। এখনও যথেষ্ট পরিমানে উপযুক্ত লোক যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত। সেগুলো শেষ হলে এবং উপযুক্ত না পাওয়া গেলে তোমাকে নেবার চিন্তা করা যাবে। অনেক আকুতি মিনতির পর নুরু রাজী হল। তবে সে রিয়াজকে খুব আগলে রেখেও শেষ রক্ষা হলনা। কসবার মন্দবাগে জুলাইর শেষে এক সম্মুখ যুদ্ধে তার হাতে গুলি লেগে গেল। তাকে নিয়ে এল আগরতলায়। ছুটে গেলাম দেখতে। ডাক্তার বলল, ভয়ের কিছু নেই। গুলি হাতের এফুরওফুর হয়ে চলে গেছে। ঘা সারতে যে কয়দিন লাগবে। এক মাস পর রিয়াজ আবার ফিরে গেল তার জায়গায় নুরুর সাথে।  নুরু পরে হয়ে গেল গোসাই।  দু নম্বর সেক্টরে নুরু বলতেই বুঝাত গোসাই। অনেক দিন চুল দাড়ি কাটেনি। তার চেহারা রাজপুত্রের মত। অনেক সময় কোন কোন মানুষকে লম্বা চুল দাড়ি খুব মানায়। তার চুল দাড়ি দেখে হিন্দুরা মনে করত সে গোসাই। গ্রামে বা বাজারের পথে যেতে অনেক সময় হিন্দুরা তাকে প্রণাম করত। তার অনেক বীরত্বের কাহিনী আছে। সে সব কাহিনী পরে মানুষ ভুলে গেছে। এখন ভুলে গেছে নুরুকেও।
মে মাস পর্যন্ত আমাদের এলাকা ছিল স্বাধীন। জল্লাদবাহিনী এবং রাজাকারমুক্ত। কসবা থেকে আখাউরা পর্যন্ত এবং সি এন্ড বি রোড থেকে ইন্ডিয়ার বর্ডার পর্যন্ত এই বিশাল এলাকা ছিল স্বাধীন। মানুষ মনে করত এখানে জল্লাদবাহিনী আসবে না। তারপরও সবাই প্রস্তুত ছিল কখন কি হয়। মে মাসের শেষের দিকে হঠাৎ একদিন গভীর রাতে আক্রমন হল এই স্বাধীন এলাকা। নির্বিচারে হত্যা করল যাকে পেয়েছে তাকেই। কত মানুষ মারা গিয়েছিল আজ সব মনে নেই। কিন্তু আপন যারা মারা গেল তাদের কথা ভুলিনি। রাজনগরের রশিদ ভাই, গানপুরের জমাদ্দার, বাড়াই গ্রামের আলফাজ, চন্ডিদ্বারের শেখর, লতুয়ামুরার কুদ্দুস আরও অনেকে। যারা বেচে রইল তারা কোন রকমে গিয়ে পৌছল বর্ডার পেরিয়ে ইন্ডিয়ার মাটিতে। এদের অনেকেই শরনার্থী শিরিরের কথা শুনেছে। সেখানে রোগ ব্যাধি তো আছেই, তার চেয়ে ভাবনার কথা হল পর্দা পুষিদা রক্ষা হয় না। তাই এই মানুষগুলো নিজেরাই বাঁশ ছন দিয়ে নিজেদের মত করে ঘর তৈরি করে নিল। তখন ভারতের মানুষগুলোও যেন বদলে গেল। কার বাঁশ কে নিচ্ছে, কার ছন কোথায় যাচ্ছে কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করছে না। এ যেন সকলের এজমালি সম্পত্তি। যার যত লাগে নিচ্ছে। শিবিরে একটা নিয়ম কানুনের ভিতর চলতে হয়, এখানে তারা সেদিক থেকে মুক্ত। শেষ পুর্যন্ত দেখা গেল এই পাহাড় জঙ্গল মানুষে গিজ গিজ করছে। 
আমার পরিবার আশ্রয় নিল বরচতলের পুবদিকে। একটি ছোট টিলার উপর আরও কয়েকটা পরিবার মিলে নিজেরা তৈরি করল তাদের যার যার কুড়েঘর। 
এখন আগরতলার পথ দেড় মাইল কমে গেল। সময় কম লাগে। তারপরও আগরতলায় থাকার ব্যবস্থা করিনি মায়ের কারনে। মা ভয় পেয়ে গেছেন। জল্লাদরা নির্বিচারে যেভাবে গুলাগুলি ছুড়েছে, মানুষ যেভাবে মারা গেছে তা দেখে এবং শুনে তিনি মনে করেন এ রকম ঘটনা আরও হতে পারে। তাই তিনি তার আদরের ধনকে অন্যত্র যেতে দিতে চান না। 
আমি লতিফ ভাইর ফাইফরমাস পালন করি। যেন একজন পিয়ন। যখন যা বলে তাই করি। একটা খাতায় লিখে রাখতে হয় তিনি কাকে কোথায় কি কাজ দিয়েছেন, জরুরী ভিত্তিতে কোথায় কি করতে হবে তার আদেশ পালন করা। এপ্রিলের শেষের দিকে জহুর আহাম্মদ চৌধুরি এলেন অফিসে। লতিফ ভাই খুব খুশি। একটা রুম দেখিয়ে বললেন জহুর ভাই এখন থেকে এই রুমে বসবেন। সেই থেকে জহুর ভাইর কেরানীর কাজটা আমার উপর দেয়া হল। কার কোথায় কি খরচ হল তা সব জহুর ভাই দেখবেন। আমার কাজ হল সেই সব ভাউচার একটা বড় খাতায় এন্ট্রি করা এবং অনুমোদনের জন্য জহুর ভাই টেবিলে পেশ করা। তিনি সাত দিন এখানে থাকতেন না। সপ্তাহে দুতিন দিন আসতেন। ভাউচার সেই অনুপাতে পেশ করা হত। 
গোপিনাথপুরের লোদন ভাই শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। আগরতলার চৌমুহনীতে দেখা। তিনি বললেন, একটা কিছু করতে হবে। কিন্তু কোথায় কি করবেন কার কাছে যেতে হবে কিছুই জানে না। বললাম চলুন আমার সাথে। লতিফ ভাইকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললাম, তিনি কিছু করতে চান। লতিফ ভাই বললেন, আমি একটু ভেবে নিই। কাল একবার আসুন। দেখি কি দেয়া যায়। পরের দিন বললেন, হাপানিয়া ইয়থ ক্যাম্পে আপাতত একটা কাজ আছে। সপ্তাহে তিন দিন। জিজ্ঞেস করলাম কাজটা কি? তিনি বললেন পলিটিকেল মোটিভেটর। ছেলেদেরকে মোটিভেট করতে হবে। লোদন ভাই পলিটিকেল মোটিভেটর হিসেবে কাজ করলেন জুলাই পর্যন্ত। তারপর এলেন অফিসে। 
আগষ্টের মাঝামাঝি একদিন অফিসের সামনে অনেক লোকের ভীড়। কোলাহল শুনে বাইরে তাকিয়ে দেখি একটা ট্রাক দাড়িয়ে আছে। সেখান থেকে নুরু নামছে, তারপর এক এক করে তিনজন পাকিস্তানি আর্মি নামছে। নুরুর সাথে রিয়াজ এবং আরও দুজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি কাছে গিয়ে দেখি একজন পাকিস্তানি আর্মির একটা হাত ডানা থেকে নেই। তার শরীরের অর্ধেকটা রক্তে লাল হয়ে আছে। কোথাও শুকিয়ে গেছে। এ পর্যন্ত দেখার পরই আমার অবস্থা কাহিল। প্রায় মাথাঘুরে পরে যাবার অবস্থা। একটা মানুষের হাত নেই! সে এখনও বেঁেচ আছে! 
নুরুর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলাম কোথা থেকে ধরলি?
নুরু বলল শালদানদীর ব্যাংকার থেকে । দুই ঘন্টা গোলাগুলির পর শালাদের গুলি শেষ। যখন দেখলাম আর গুলির শব্দ আসছেনা তখন বুঝলাম তাদের গুলি শেষ। তারপর কাছে গিয়ে গ্রেনেড চার্জ করলাম। গ্রেনেডে তার একটা হাত চলে গেছে। সে এই গ্র“পের কমান্ডার। হাত না গেলে ধরা খুব শক্ত হত। এখানে নিয়ে এসেছি মানুষ দেখুক। দেখলে মানুষের মনে সাহস বাড়বে। এখনই নিয়ে যাব ইন্ডিয়ান আর্মির অফিস মেলাঘরে। যুদ্ধ বন্দি হিসাবে তাদের জমা দিব।
এক কাপ চা আনল কে যেন। চা খেতে খেতে নুরু যার হাত নেই তাকে জিজ্ঞেস করল, এই খানের বাচ্চা, তোকে এখন ছেড়ে দিলে কি করবি?
সে সাথে সাথে উত্তর দিল, লেড়েগা।
নুরু বলল, তোর লেড়েগা বার করি। উঠ, বন্দিদের ট্রাকের পেছনে উঠতে বলল। একে একে সবাই উঠল। দাড়িয়ে রইল যার হাত নেই সে। নুরু জিজ্ঞেস করল, কি হল, উঠছনা কেন?
সে বলল, ম্যায় সিপাহী নিহি হো। পিছে নেহি বইঠেগা।
আরে শালা! এখনও তোর পদমর্যাদা! তোকে মারব না এখন। তুই তো মরেই আছিস, আয় সামনে আয় বলে সামনের একজনকে বলল পেছনে চলে যেতে। 

- ৪৮ -

যখন তখন নাজমার চেহারটা ভেসে উঠে। ভেতরে জ্বলতে থাকে। ধিকে ধিকে। আমি নিরুপায় কবে দেশ স্বাধীন হবে, নাজমার সাথে দেখা হবে সেই প্রতিক্ষায় দিন গুনছি   সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে একদিন অফিসের সামনে চেচামেচি হৈ চৈ শুনে বাইরে এসে দেখি নুরু বলছে, তোকে আমি গুলি করি নাই। করলে তোকে কে বাচাবে বেটা চোর কোথাকার। যাকে এ কথাগুলো বলছে তিনি আমাদের ব্রাহ্মনবাড়ীয়ার এম পি আজদু মিয়া। তিনি হাপানিয়া ইয়থ ক্যাম্পের ইন-চার্জ। ইয়থদের থাকা খাওয়ার তদারকি করা তার কাজ। তাকে কেন সে নিয়ে এল বুঝতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে রে নুরু?  আরে দেখ, পুলাপানগুলি না খেয়ে কয়েকদিন পর চলে যায়। সরকারি টাকা আসে তাদের খাবার জন্য আর সে টাকা সে চুরি করে। গিয়ে দেখ এখন ক্যাম্পে অর্ধেক পুলাপান নাই। কিন্তু সে বিল করে সবাইর জন্য। তার বিচার করার জন্য নিয়ে এসেছি। কি করবি কর।   দেখলাম আজদু মিয়ার সাথে তার বেশ কিছু চেলাও আছে। তারাও কিসব বলছে। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে জহুর ভাইকে বললাম। (চট্রগ্রামের জহুর আহাম্মদ চৌধুরী) জহুর ভাই নুরুকে খুব ভালবাসে। তার বীরত্বের কথা তিনি সব সময় বলেন। শুনে তিনি বললেন, পাগলাটা তাহলে একটা ঝামেলা বাধাল! আমি তো জানি সেখানে কি হচ্ছে। ইয়থ ক্যাম্পের বিলগুলি যখন সই করি তখন দেখি সে কতগুলো ইয়থের বিল জমা দেয়। আসলে সেগুলো কাল্পনিক। তবুও সই করতে হয়। এখন তো আমাদের বিচারের সময় নয়। ডাক পাগলটাকে। নুরু এলে তিনি বললেন, তুই এটা কি করেছিস? নিজেদের মাঝে একটা মারামারি লাগিয়ে দিতে চাস? সে কি  করে আমি সব জানি। যারা এসব করে তারা নিজেদের একটা দল হাতে রেখেই করে। তার নিজেরও বেশ কিছু লোক আছে। তার বিচার করতে গেলে দেখবি তার সমর্থকরা অন্যায়ভাবে তার পক্ষ নিবে। নিজেদের মাঝে একটা মারামারি হবে। এখন বিচারের সময় নয়। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য সফল করতে হবে, তারপর বিচার। জয় করেই বিষ ক্ষয় করতে হবে। যা, তাকে নিয়ে আর কোন কথা বলবি না। আগে যুদ্ধ জয় কর, তারপর সব বিচার হবে। নুরু সুবোধ ছেলের মত বেরিয়ে গেল। দরজার বাইরে গিয়ে আজদু মিয়াকে বলল, আজ তোরে ছেড়ে দিলাম শুধু দেশের স্বার্থে। তবে আমি তোকে ছাড়ব না। বলে সে চলে গেল। লোদন ভাই তখন জহুর ভাইকে জিজ্ঞেস করল, জহুর ভাই, আমরা এখন দুর্নীতির কোন্ পর্যায়ে আছি?        জহুর ভাই বললেন, আগে তো আমাদের আঙ্গুলটা দেখা যেত, এখন আঙ্গুলটাও ডুবে গেছে।
নুরু চলে গেলে আজদু মিয়া তার চেলাদের উদ্দেশ্যে ছোটখাটো একটা বক্তব্য রাখল এবং বলল, দেখলে তো তোমরা। সে ভুল বুঝে ভুল করে আমার সাথে এই ব্যবহারটা করল। যাও, তোমরা যার যার কাজে যাও।
ইয়থ ক্যাম্পের শুরুতেই আজদু মিয়া এই ক্যাম্পের ইনচার্জ। আমরা কেউ কোনদিন খেয়াল করিনি বা আমাদের খেয়াল করারও কথা নয়, সেখানে কি হচ্ছে। ইয়থ ক্যাম্পে যারা যুদ্ধে যাবে, এখনও ব্যবস্থা হয়নি তারাই ইয়থ ক্যাম্পে থাকে। তাদের থাকা খাওয়ার সব ব্যবস্থা করার জন্য আজদু মিয়া আছে। টাকা আসে ইন্ডিয়ান সরকারের কাছ থেকে। মাথাপিছু একটা নির্দিষ্ট অংক দেয়া হয় যা দিয়ে একজন মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করা যায়। বাংলাদেশ সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত জনাব জহুর আহাম্মদ চৌধুরির অনুমোদন নিয়ে এইসব বিল প্রদান করা হয়। 
হাপানিয়া ইয়থ ক্যাম্পের বিল কবে থেকে কি হচ্ছিল তা আমাদের জানার কথা নয়। কিন্তু জহুর ভাই সব জানেন। শুরুতে প্রায় তিন হাজার ইয়থ ছিল ক্যম্পে। প্রয়োজনীয় খাবার না পেয়ে ছেলেরা চলে গেছে যার যার পথে। কেউ গেছে শরণার্থী শিবিরে, কেউ গেছে নিজেদের পরিবার বা আতœীয়স্বজনের কাছে। দেখা গেছে কোন কোন সময় ইয়থের সংখ্যা কয়েক শ’ তে চলে এসেছে। ইয়থ কমে যাবার অনুপাতে খরচও সেই অনুপাতে কম থাকা উচিত। কিন্তু আজদু মিয়ার বিল আর কম হয় না। লোদন ভাই যখন সেখানে যেতেন তখনও দেখতেন কয়েক শ ছেলে আছে। কিন্তু আজদু মিয়ার বিল তিন হাজার বা তার কাছাকাছি। এভাবে সে প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা গায়েব করেছে। 
সেই সময় বেশিরভাগ নেতারা হোটেলে থাকতেন না। তারা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ী ভাড়া করে থাকতেন অনেক শান শৌকতে। তাদের কোন কিছুর অভাব ছিল না। দেশ যদি আরও পঞ্চাশ বছরেও স্বাধীন না হয় তাতে তাদের চিন্তার কোন কারন নেই। অনেকে এমন কামনাও করত। এখানে তারা মন্ত্রির চেয়েও বেশি সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। দেশ স্বাধীন হলে তারা হয়ত বাংলাদেশে এমন সুযোগ নাও পেতে পারে। তাই তারা এখানে যে যেভাবে পারে পয়সা বানিয়ে নিচ্ছে। স্বাধীনতা তাদের কাছে গৌণ। তাদের খাওয়া দাওয়া বাজার সদাই চালচলন দেখলে মনে করার কোন উপায় ছিলনা তারা ভিন দেশে শরণার্থী, স্বল্পকালের জন্য। তারা রিলিফ খাচ্ছে, রিলিফের টাকা মারছে, যার রেশ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও  চালু হল। এখনও চলছে। চলবে।
অক্টোবরের একদিন বাসাবোর আলাউদ্দিন (যার নামে এখন বাসাবো কলেজ) তার তিন সঙ্গি নিয়ে অফিসে এল। সে এতদিন কোথায় কোথায় ছিল তার একটা ফিরিস্তি দিয়ে বলল, সে চলে যাবে বাংলাদেশে এবং তার নিজের বাড়ী বাসাবোতে। সে বাসাবো আওয়ামীলীগের সেক্রেটারি। আলাউদ্দিনকে চিনে না বাসাবোতে এমন মানুষ নেই। বিশেষ করে বাসাবোর রিফিউজি কলোনির বিহারিরা। তার কথাবার্তায় মনে হল সে হতাশ হয়ে গেছে। এখানে তাকে কেউ কোন দাম দিচ্ছে না। সে চায় সব সময় ব্যস্ত থাকতে। কিন্তু তা পারছে না। আর এখানকার কাজকর্ম দেখে সে স্থির করেছে ফিরে যাবে বাড়ীতে।
তাকে অনেক বুঝাতে চেষ্টা করলাম। বললাম, এ সময় তুই বাড়ীতে গেলে বাসাবোর সব বিহারিরা তোকে ছাড়বে না। ওরা এখন সবাই রাজাকার। তোকে ভাল করে চিনে। তোর কষ্ট হচ্ছে জানি, সবাই তো এখানে কষ্ট করছে। সে তখন রেগে উঠল। বলল, কোথায় কষ্ট করছে? ওরা তো সবাই খুব ভাল আছে। কই নেতারা তো কোন কষ্ট করছে না! তাদের ছেলে মেয়েরা কেউ তো যুদ্ধে যায়নি! দেখলে মনে হয় তারা এখানে আরাম করতেই এসেছে। যুদ্ধ করছে অশিক্ষিত মানুষ। দেশপ্রেমিক যারা তারাই যুদ্ধ করছে, মরছে। আমাদের কোন নেতা বা তার সন্তান কেউ তো কোথায়ও আহত হতে শুনিনি। এসব দেখলে আমার সহ্য হয় না। আমার শরীরটা যদি যুদ্ধে যাবার উপযুক্ত হত তাহলে আমি সবার আগে অস্ত্র নিতাম। বলা বাহুল, আলাউদ্দিন এত মোটা যে সে নড়াচড়া করতে পারে না। 
কোন যুক্তিই সে মানল না। চলে গেল বাংলাদেশে। 
দেশে গিয়ে কোথায় কোথায় ছিল তা কিছুই জানি না। 

-৪৯-

নিয়াজি আতœসমর্পন করেছে। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এবার ফিরে যাবার পালা। আকাশে বাতাসে আনন্দের ঢেউ। মানুষ তাদের নিজগৃহে ফিরে যাবে, কর্মজীবিরা তাদের কাজে, আর নেতারা ফিরে যাবেন নেতাগিরি করতে। ক্ষমতা ভাগভাগি করতে। কার আগে কে যাবেন সেই প্রতিযোগিতা। ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো খুব ব্যস্ত, ছেড়ে দেবার কাজে। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ফিরে যাচ্ছে নিজের ঠিকানায়।
১৭ই ডিসেম্বর সকালে ভাবছি কি করব। লোদন ভাই বলল, চল অফিসে একবার যাই। আমাদের কোন আদেশ দেয়া হয় নাই এখন কি করব। অফিসে গেলে হয়ত তা কিছু একটা জানা যাবে। তাহলে চলুন, দেখি এখন আমাদের উপর কি আদেশ হয়।
সকাল এগারটার দিকে অফিসে পৌছলাম। দেখি কেউ নেই। এখন কি করব! দুজনে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে চায়ের অর্ডার দিলাম। আরও দুএকজন ছিল সেখানে। বাংলাদেশের কয়েকজন। একজন বলল, আজ সকালেই সব নেতারা চলে গেছে ঢাকায়। হেলিকপ্টারে। আপনারা চলে যাননা কেন?
তাইত! আমরা বোকার মত এখানে এসেছি কেন? লোদন ভাই, আমাদের এখানে আসা উচিত হয় নাই। এখন যে আগে ঢাকা যাবে সেই ক্ষমতার ভাগ পাবে। আমরা কিছুই না।
লোদন ভাই বললেন, আমাদের অবস্থাটা এমন হয়েছে যে, আমি কার খালুরে? আমরা এখন কোথায় তা তো নিজেরাই জানি না। চল ফিরে যাই।
রাস্তাঘাটে মানুষের কাফেলা। যার যা কিছু আছে তা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। একদিন এমনি ভাবে এসে আশ্রয় নিয়েছিল বর্ডার পেরিয়ে ভারতের মাটিতে। এখন ফিরে যাচ্ছে নিজেদের মাটিতে, স্বাধীন দেশে। 
আমরা ফিরে এলাম যার যার বাড়ীতে। সেখান থেকেই নেতাদের সাথে শুরু হল মুক্তিযোদ্ধাদের দূরত্ব।
চারদিকে ধ্বংসের চিহ্ন। সবকিছু বিধ্বস্থ। মানুষ তাদের ঘরবাড়ী গুছিয়ে নিচ্ছে। শরণার্থী শিবিরে খাবার মিলত, এখানে এই ধ্বংসের মাঝে কি মিলবে কেউ জানে না। তারপরও মানুষ খুশি। তারা নিজেদের ঘরে ফিরেছে। 
পরের দিন আমি আর লোদন ভাই রওয়ানা দিলাম ঢাকার পথে। কিভাবে যাব তা কিছুই জানি না। তিনলাখপীরের মোড়ে সি এন্ড বি সড়কের পুলের কাছে এসে  দাড়ালাম।  যুদ্ধের নয়মাস ব্রাহ্মনবাড়িয়া থেকে কোম্পানীগঞ্জ পর্যন্ত একমাত্র পথ ছিল এই তিনলাখপীড়ের পুল যার নীচে দিয়ে মুক্তিবাহিনী বা সাধারান মানুষ পাড়াপাড় হত। দেখি দুএকটা বাস চলে। কিন্তু মানুষের  ভীড় উপরে নীচে সমান। কলার গাধির মত দরজায় ঝুলে আছে মানুষ। কয়েকটা বাস চলে গেল। আমরা সাহস করতে পারলাম না। ঘন্টাখানেক চলে গেল। ভাবছি কি করব। লোদন ভাই বললেন, মনে হয় এভাবে উঠতে পারব না। তাহলে কি করবেন?
অন্য কিছু চিন্তা করতে হবে।
কি রকম? 
বাসের ড্রাইভারকে বলতে হবে আমাদের উঠার ব্যবস্থা করার জন্য। আমরা আমাদের পরিচয় দিতে হবে। কারন আমাদের হাতে তো অস্্র নেই। 
খুব ভাল চিন্তা। চলুন তাই করি। পরের বাস আসুক।
পরের বাসে ড্রাইভারকে বলতে হল না। বাসের ভিতর থেকে একজন চিৎকার  করে বলছে, এই ড্রাইভার  বাস রাখ। এই কন্ডাক্টার! নামাও এসব সামনের লোকগুলো। দুটা সিট খালি কর। ওনাদের বসার ব্যবস্থা কর। ডাক দিল, বাহার ভাই, উঠে আসুন।  কে ডাকল ভীড়ের মাঝে মুখ দেখা যাচ্ছে না। দেখলাম উঠার পথ হয়েছে। ভেতরে যেতেই জাকির জিজ্ঞেস করল, কতক্ষন দাড়িয়ে আছেন? অবস্থা যা দুদিন দাড়িয়ে থাকলেও আপনারা বাসে উঠতে পারবেন না। বসুন। ঢাকা যাবেন তো? তাহলে ভৈরব পর্যন্ত বাসে যাবেন। তারপর ট্রেন। বাসও যাবে  ভৈরব থেকে ট্রেনে গেলে সময় কম লাগবে। দেখলাম তার সাথে আরও দুজন সহযোদ্ধা। 
জাকিরের হাতে একটা এলএমজি। এটাই যেন কথা বলছে। সে যা বলছে তাই হচ্ছে। জাকির লতিফ ভাইর দূরসম্পর্কের আতœীয়। শুরুতে কয়েকদিন সে অফিসেই ছিল। টুকটাক কাজ করেছে। পরে চলে যায় ট্রেনিংএ। তারপর আর দেখা নেই। 
জিজ্ঞেস করলাম এতদিন তোমাকে দেখিনাই। কোথায় যুদ্ধ করেছ?
আমরা তো ভিতরে থেকেই যুদ্ধ করেছি। আমার এলাকা ছিল কুটি বাজার থেকে কোম্পানীগঞ্জ। ট্রেনিংশেষে কিছুদিন ছিলাম ইয়াকুবের গ্র“পে। তারপর চলে আসি ভিতরে। 
সামনের পুলটা ভাঙ্গা। সবাইকে নামতে হবে। দেখলাম ভাঙ্গা পুলের ইট সুড়কি দিয়ে রাস্তা হয়েছে কোন রকমে একটা গাড়ি যেতে পারে এমনভাবে। সেতু ভেঙ্গেছে আমাদের মুক্তিবাহিনী। জল্লাদ বাহিনীর চলাচলে বাধা দেবার জন্য।  পাক বাহিনীর চলাচলের জন্য তারা নিজেরাই এই রাস্তা জোড়াতালি দিয়েছে। এখন আমরা ব্যবহার করছি আমাদের প্রয়োজনে। আমাদের প্রয়োজনে আমরা ভেঙ্গেছি, এখন আমাদের প্রয়োজনে আমরাই গড়ব। এসব ভাঙ্গা পুলের পুলছেরাত পাড়ি দিয়ে পৌছলাম সবচেয়ে বড় সেতু ভৈরবের সেতু।
এই সেতুটা জোড়াতালি দিয়ে গাড়ী পারাপারের ব্যবস্থ করা যায়নি।  নদীর এপার থেকে ওপার বহুদূর। খরস্রোতা। তাই এখানে ফেরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই তো দুদিন আগেও ছিল এই ফেরি জল্লাদবাহিনীর দখলে, আজ সাধারন মানুষের হাতে। বাস, ট্রাক, কিছু গাড়ী লাইন ধরে আছে। সবাই ঢাকা যাবে। ফেরির ধারনক্ষমতা সীমিত। সেই লাইনে দাড়িয়ে বেলা তিনটার দিকে আমাদের বাস পৌছল ভৈরব রেল ষ্টেশনের কাছে। বাসের কন্ডাক্টর আমাদের কাছে ভাড়ার জন্য আসেনি। জাকির বলল, ভাড়া লাগবে না। আমি কন্ডাক্টরকে বলেছি। এখন ঠিক করুন বাসে যাবেন নাকি রেলে যাবেন। আমরা এখানে নেমে যাব। কিছু কাজ আছে। তারপর কখন যাব ঠিক নেই। 
বললাম, ট্রেনেই যাব। অন্তত মানুষের ধাক্কাধাক্কি কম হবে।
ঠিক আছে, সেভাবেই যান। আবার দেখা হবে বলে ওরা চলে গেল।
আমরা দুজনে ভৈরব প্লাটফরমে ঢুকলাম। দেখি টিকেট কাউন্টার খোলা আছে। তবে কোন মানুষ নেই। আমরা অনেকক্ষন পায়চারি করলাম। গাড়ী আসার কোন লক্ষন নেই। ষ্টেশন মাষ্টারের ঘরের দিকে গেলাম। তিনি আছেন। লোদন ভাই জিজ্ঞেস করল, ট্রেন কখন আসবে বলতে পারেন?
তিনি মুখ না তোলেই বললেন এর সঠিক উত্তর আমি দিতে পারব না। ট্রেন শুধু ভৈরব-ঢাকা আসাযাওয়া করে। কখন আসবে ঠিক বলতে পারব না। তবে কালিগঞ্জ আসলেই আমরা খবর পাই এবং টিকেট দেয়া শুরু করি।
শেষ পর্যন্ত ট্রেন এল সাতটায়। অনেক ভীড়। তারপরও উঠতে খুব অসুবিধা হল না। যাক একটু আরামেই যাওয়া যাবে। ঘোড়াশাল গাড়ী থামার পর দেখি অন্য রকম দৃশ্য। মানুষ আর মানুষ। এত মানুষ কোথায় উঠবে! হৈ চই করে ট্রেনের উপরে নীচে মিলে জায়গা হয়ে গেল। মানুষ গিজ গিজ করছে। শ্বাস ফেলতে পারছিনা। 
কালিগঞ্জ ট্রেন থামার সাথে সাথে বস্তা উঠতে লাগল, জানালা দিয়ে। কার উপর পড়ছে তা দেখার দায়ীত্ব যে ফেলছে তার নয়। যে ট্রেনের ভিতর আছে গা বাচাঁনো তার নিজের দায়ীত্ব। উপরে নীচে কোথাও তিল ধারনের স্থান নেই। প্রতিটি দরজায় মানুষ ঝুলছে। ঢাকার কাছাকাছি আসতেই বার বার ট্রেন থামছে। তখন মনে পড়ল ২৩শে ডিসেম্বরের শেষ ট্রেনটার কথা। 
লোদন ভাই নেমে গেল তেজগাঁ ষ্টেশনে। তিনি চাকরি করেন তেজগাঁ রাবার ইন্ডাষ্ট্রিতে। ম্যানেজার। নামার সময় বলে গেলেন কাল পরশু চলে আসিস আমার এখানে।
রাত নয়টায় এসে নামলাম কমলাপুর ষ্টেশনে। হাতে এমন কিছুই নেই। বাসাবো যেতে হলে রেল লাইন ধরে গেলে পনের বিশ মিনিট। ঠিক করলাম হেটেই যাব।
যেতে যেতে ভাবছি বন্ধুবান্ধব কে কোথায় আছে কে জানে! কে বেঁেচ আছে কে মরেছে কিছুই তো জানি না। 
মেস আছে কিনা তাও জানি না। বাসাবোর প্রতিটি বাড়ীই আমার খুব চেনা। মেস না থাকলে যে কোন বাড়ীতে উঠে পড়ব। কিন্তু উঠতে হল না। দেখি মেস ঠিক যেমন ছিল তেমনি আছে। আমাদের কাজের ছেলেটা আমাকে দেখেই দৌড়ে এল। আজ পাঁচ বছর যাবত সে এই মেসে কাজ করে। বাজার করা থেকে রান্নাবান্না সব। তাকে দেখে আমারও মনে হল সে বুঝি আমার পরিবারের কোন আপনজন। 
খবর পেয়ে সাদেক, জাহাঙ্গির, মিজান আরও অনেকে এল। জানলাম আমাদের বন্ধুমহলে শুধু আলাউদ্দিন ছাড়া আর সবাই জীবিত আছে। ১৪ই ডিসেম্বরে আলাউদ্দিনকে ধরে নিয়ে যায় রিফিউজি কলোনির রাজাকারেরা। বাসাবো এবং মাদারটেকের রাস্তায় তার দেহটা পড়েছিল দুদিন। তার চোখ দুটি তোলে নিয়ে গেছে।  হাত পা ভাঙ্গা, দেহে কোন কাপড় ছিল না। কেউ কেউ বলে দুদিন পর্যন্ত সে জীবিত ছিল। ভয়ে কেউ তার কোন সাহায্য করেনি। এখন তার নামে বাসাবো কলেজ হয়েছে।

-৫০-

পর দিন অফিসে পৌছার পর একটা ছুটাছুটি হৈ হৈ পড়ে গেল। সব সহকর্মি-বন্ধুরা ছুটে এল। বুকে নিয়ে কোলাকুলি, এক সময় বডি বিল্ডার রেজাউল তো মাথায় উঠিয়ে ফেলল। সবাই মিলে একটা ছোটখাটো আয়োজন করেছে আমাকে আপ্যায়ন করার জন্য। সেখানে বড় বড় রাগববোয়ালও ছিলেন। তাদের অনেকেই হয়ত প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন এই ভয়ে আছেন। 
আপ্যায়নশেষে শুরু হল এই নয় মাসের গল্প। অফিসের গল্প। ১৬ তারিখের পর কোন বিহারি অফিসে আসেনি। কলনিতে যারা থাকত রাতারাতি উদাও হয়ে গেছে। অফিসের কে কে মারা গেল, তার মাঝে আমাদের সকলের প্রিয় ব্যাংকের লেডি ডাক্তার পাক বাহিনীর হাতে খুন হয়েছেন। যারা মারা গেছে তারা সবাই অফিসের বাইরে পথে অথবা বাড়ীতে মারা গেছেন। ব্যাংকের লাইব্রেরিয়ান আসাফউদ্দৌলা আমার নাম শুনে পলাতক। তার বাড়ীতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। বাড়ী খালি। তিনি আমার শিক্ষক। যুদ্ধের সময় এবং তার আগে তার কথাবার্তায় সবাই ক্ষেপা। আমি আসলেই তাকে ধরা হবে। কিন্তু অফিসে না আসায় কয়েকজন তার বাসায় গিয়ে ধরতে পারেনি।
রেজাউল বলল, আমার কাছে একটা লিষ্ট আছে। তাতে তুই প্রথম হয়েছিস। 
কিসের লিষ্ট? আমি জিজ্ঞেস করলাম। 
ইউনিয়নের সভাপতি লতিফ বললেন, মানুষ মারার লিষ্ট। গভর্নরের পিএ বিহারি  ইসহাকের ড্রয়ার থেকে এই লিষ্টটা পেয়েছি। সে তো সব সময় আর্মির বড় বড় অফিসারদের সাথে যোগাযোগ রাখত। সে এই লিষ্টা তৈরি করেছিল। এতে সাত জনের নাম আছে। তার মধ্যে তোমার নামটা এক নম্বরে। তোমাকে একবার পেলেই হত। তার অনেক ক্ষমতা ছিল। রেজাউল বলল, দেখিস না রাতারাতি সব বিহারিদেরকে কিভাবে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেল।
তারপর আরও গল্প চলল। সেদিন অর্ধেক দিন অফিস হয়নি। সব শেষে আমি বললাম, এবার আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিধ্বস্থ দেশটাকে গড়তে হবে। কাজ করতে হবে দ্বিগুন।
বেলা দুটার দিকে অফিস থেকে সোজা চলে গেলাম মুহাম্মদপুর। খালার বাসায়। নাজমা ওখানেই থাকার কথা। বাসার সামনে এসে বুক দুরু দুরু করছে। ওরা আছে কি নেই কে জানে। এগিয়ে গেলাম। দরজা খোলা। ভেতরে গিয়ে দেখলাম কেউ নেই। ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রতিটি কামড়া দেখলাম, না কোন মানুষ নেই। গেল কোথায়! তাহলে কি কুমিল্লা চলে গেল!  মাথায় অনেক ভাবনা এসে উকি দিতে লাগল। এখন কি করব! কুমিল্লার খবর কি ভাবে নেয়া যায়! যেতে  হবে কুমিল্লা। হয়ত কোন ব্যবস্থা করে খালা খালুর সাথে আছে কোথায়ও।  ব্যর্থ মনে ফিরে এলাম মেসে। কিছুই করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আমি অস্থির। অফিসে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এখন অনেক কাজ। প্রথম কাজ হল নাজমাকে খুজে বের করা।
এখন কুমিল্লা যাবার প্রস্তুতি নিতে হবে। সব কাজ বাদ। ওখানে গেলেই খোজ মিলবে। 
কয়েকবার বাস বদল করে, কয়েকবার রিক্সা নিয়ে পৌছলাম কুমিল্লা। বুক দুরু দুরু করছে। ওখানে গিয়ে কি খবর শুনব কে জানে!
কুমিল্লা জেলখানার পেছনে গিয়ে পৌছলাম। আমি যে ঘরে থাকতাম তা ঠিক তেমনি আছে। ভেতরে বড় ঘরের দিকে তাকালাম। ঠিক আগের মতই আছে। বড় ঘরের দরজা ধাক্কা দিলাম। বন্ধ। ভেতরে কেউ আছে বলে মনে হলনা। অনেকক্ষন দরজায় দাড়িয়ে ভাবছি কি করব। এখন খোজ পাব কি করে! ওদের গ্রামের বাড়ি হোমনা শুনেছিলাম। কিন্তু গ্রামের নাম জানি না।  পাশের বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম। দরজা জানালা বন্ধ। মানুষজন চোখে পড়ছে না। এখন কি করব কোথায় যাব। এদিক সেদিক অনেকক্ষন হাটাহাটি করলাম। কারও দেখা পেলাম না। মনে হল পাড়ার সব বাড়ি শুন্য। কেউ নেই। ঘন্টাখানেক পর ফিরে আসব এমন সময় দেখি পাশের বাড়ীর কাশেম সাহেব। আমার সাথে ভাল পরিচয় ছিল।বাড়ীর ভেতর ঢুকছে। দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম নাজমাদের কোন খবর জানে কিনা। উত্তরে তিনি বললেন, না তিনি কারও খবর জানেন না। তিনি এইমাত্র গ্রামের বাড়ি থেকে এলেন। আমি বললাম, তারা বাড়িতে এলেই আমাকে খবর দিতে বলবেন। আমি খুব চিন্তায় আছি বলে চলে এলাম ষ্টেশনে। কয়েক বার বাস বদল করে শেষ পর্যন্ত রাত দুটার দিকে  ফিরে এলাম ঢাকায়।
পরদিন অফিসে একটু দেরিতে এলাম। এসে দেখি আকরাম সাহেব মানে খালুজি বসে আছেন। চেয়ারে বসে আছেন, কিন্তু দৃষ্টি তার নিজের পায়ের দিকে। দেখলে মনে হয় গভীর চিন্তায় মগ্ন। আমি কাছে যেতেই হাউ মাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মুহাম্মদপুরে তো কেউ নেই বাবা! ওদের ঘরের জিনিষপত্রও নেই। সব এলোমেলো! এখন কি হবে! কোথায় খুজব! খালুজির কান্নার সাথে সাথে আমারও চোখের পাতা ভিজে গেল। আমি বললাম যে আমিও মুহাম্মদপুর গিয়েছিলাম, না পেয়ে কাল কুমিল্লা গিয়েছিলাম আপনাদের খোজে। কালই ফিরে এসেছি। মনে মনে ভাবলাম যা সন্দেহ করেছিলাম তাই ঘটল কি?  মুখে বললাম, খালুজি ভেঙ্গে পড়বেন না। আছে কোথাও। খালা খালু যেখানে আছে সেখানেই নাজমা আছে সহি সালামতে। কোন চিন্তা করবেন না। নাজমা খালুর গ্রামের বাড়িতে খবর নিন। নিশ্চয়ই আছে কোথাও। এসব মিথ্যা বাক্য দিয়ে কান্না থামানো গেল, কিন্তু মনের জ্বলুনি থামানো যায়নি। আমি জানি খালুকে যা দিয়ে প্রবোধ দিলাম তা সব মিথ্যা! জানি না কতদিন কত জায়গায় এই মিথ্যা বলে যেতে হবে।
খালুজিকে প্রবোধ দিয়ে বিদায় করলাম ঠিকই, কিন্তু আমাকে আমি প্রবোধ দিতে পারিনি। মন বলছে নাজমা আছে কোথাও। বের করতে হবে। অফিসের কাজে মন দিতে পারিনা। বীরাঙ্গনা পুনর্বাস কেন্দ্র কোথায়? দুএকটা জায়গার নাম শুনে ছুটে গিয়েছি। না, এ নাম কোথাও দেখা যায়নি। ঝর্না খালা খালুর কি হল? ওরা কোথায়!  তাহলে কি সবাই শেষ, সবই শেষ! 

-৫১-

দেশ শত্র“মুক্ত হয়েছে, আমরা স্বাধীন। স্বাধীনতার স্বাদ ঘরে ঘরে পৌছে দিতে হবে। আমরা গ্রহন করব। দেখা গেল স্বাধ পৌছে দিতে হয়নি। কারও কারও ঘরে পৌছে গেছে। যার তার হাতে এখন অস্ত্র। রাজধানীতে অগনিত মুক্তিযোদ্ধা। পাড়ার ছেলে যারা ঢাকার বাইরে যায়নি তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। তারাও মুক্তিযোদ্ধা। ১৬ই ডিসেম্বরে পাক বাহিনী আতœসমর্পনের পর রাজাকার আলবদর তাদের অস্ত্র রাস্তায় ফেলে দিয়ে সাধারন মানুষের সাথে মিশে গেছে। আর এই সুযোগে যে যা পেয়েছে কুড়িয়ে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে তাদের দৌরাতœ বেশি।  ১৬ই ডিসেম্বর বা তার পর যারা অস্ত্র কুড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা দাবী করে তাদের বলা হয় ১৬ ডিভিশন। এই ১৬ ডিভিশন রাজনৈতিক নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে অপরাধ করে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধার নামে কলঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক নেতা, পাতি নেতারাও নিজেদের স্বার্থে এই ডিভিশনকে ব্যবহার করছে। যেখানে সেখানে দোকান পাট জায়গা জমি দখল করছে। সকলেই আরো সুযোগের সন্ধানে আছে।
আমি কোন সুযোগ খুজে বেড়াই না। আমি আছি নাজমার খোজে। যেখানে একটু আলো দেখতে পাই সেখানে ছুটে যাই। 
নিজাম সাহেব একজন পরহেজগার মানুষ। বয়স চল্লিশের উপর। সব সময় পায়জামা পাঞ্জাবী পড়ে।  মুখে চাপ দাড়ি। দাড়ি চুল একদম সাদা। নামাজ পড়ে কপালে দাগ পড়ে গেছে। দেখলেই মনে শ্রদ্ধা জাগে। একদম নরম স্বভাবের মানুষ। ব্যাংকের লোকাল অফিসে কাজ করেন। ব্যাংকে এত লোকের মাঝে একমাত্র এই লোকটাকে আমি  শ্রদ্ধা করি। কোন পরামর্শের দরকার হলে তার কাছে চলে যাই। 
সেদিন লাঞ্চের পর তার কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বললাম। আমি আমার সব চেষ্টা বিফল হয়েছি। এখন আর কোন উপায় আছে কিনা। নাজমার খালা খালুরও কোন খবর নেই। সব শুনে তিনি বললেন কাল অফিসের পর আপনাকে কয়েক জায়গায় নিয়ে যাব, দেখুন পাওয়া যায় কিনা। শুনে আমি একটা ক্ষীন আশার আলো দেখতে পেলাম। 
পরদিন অফিসের পর নিজাম সাহেবের সাথে চললাম। তিনি প্রথমে নিয়ে গেলেন ফকিরাপোলের একটি বাসায়। একতলা বাড়ি। নিজাম সাহেব দরজায় কয়েকটা টোকা দিতেই দরজা খোলে গেল। একজন বৃদ্ব লোক দরজা খোলে দিয়ে সালাম দিলেন। লোকটা পরনে লুঙ্গি, মাথায় টুপি, মুখে কাচাপাকা চাপ দাড়ি। আমাদেরকে বসতে বলে লোকটা ভিতরে চলে গেল। একটু পর একজন মহিলা এসে বলল, কি হল নিজাম সাহেব। আপনার দেখা নাই অনেক দিন। কি খবর আপনার?
নিজাম সাহেব বললেন, এক দম সময় পাই না। জমি জমা নিয়ে ব্যস্ত     আছি। কই আপনার মেয়েদের ডাকুন। আমার বন্ধু নিয়ে এসেছি। 
ঠিক আছে বসুন বলে মহিলা ভিতরে চলে গেল। একটু পর সাথে নিয়ে এল তিন জন যুবতি। সবাইর পরনে ছিমছাম পোষাক, এমন ভাবে সাজ গোজ করেছে যেন এইমাত্র বাইরে থেকে বেড়িয়ে এল অথবা বেড়াতে যাবে। নিজাম সাহেব জিজ্ঞেস করল এখানে আছে আপনার মানুষ?
বললাম না।
চলুন আর এক জায়গায় যাই বলে বেরিয়ে এলাম।
বাইরে এসে নিজাম সাহেব একটা রিক্সা ডাকল মগবাজার। 
মগবাজারের একটি বাড়ির সামনে রিক্সা থামল। অনেক বড় তিন তলা বাড়ির দুতলায় নিজাম সাহেব দরজায় কয়েকটা টোকা দিলে একজন মাঝ বয়সি মহিলা দরজা খোলে দিলেন।  আমরা ভিতরে ঢুকতেই তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে বসতে বললেন। নিজাম সাহেব বললেন, না বসব না। সবাইকে একটু ডাক। ইনি ব্যাংকে চাকরি করেন, সবাইকে একটু দেখবে। মহিলা ভেতরে চলে গেল। একটু পর পাচ জন মহিলা এসে দাড়াল। সবাইর পরনে বিচিত্র দামি পোষাক, পরিপাটি বেশভুষা, দেখলে মনে হয় তারা সবাই সুখি মানুষ। একজনের চেয়ে একজন সুশ্রী। নিজাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, এদের মাঝে কেউ আছে?
বললাম, না এদের মাঝে নেই।
তাহলে চলুন আর এক জায়গায় যাই বলে বেরিয়ে এলাম।
এবার রিক্সা নিলেন ধানমন্ডি। 
ধানমন্ডি! ধনী লোকের বাসস্থান! এখানে কোন বাসায় কোনদিন আসিনি। নিজাম সাহেবের পিছু পিছু চলছি। রিক্সাটা এক বাসার সামনে থামল। বাসার গেইটে দাড়োয়ান লাঠি হাতে দাড়িয়ে আছে। নিজাম সাহেব কিছু বলার আগেই গেইট খুলে গেল। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। বিরাট একটা রুমে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষরে মধ্যেই একজন মহিলা এসে নিজাম সাহেবকে একটু ধমকের সুরে বললেন, আপনার খবর নাই অনেক দিন। হঠাত কোথা থেকে উদয় হলেন?
নিজাম সাহেব বললেন, আমারও তো কাজ থাকে। কই আপনার মেয়েরা কোথায়? একটু ডাকুন। 
ডাকুন বললেই ডাকা যায়? ওরা এখন ঘরে নেই। বাজারে গেছে। একটু বসুন। এখনি এসে পড়বে। গেছে অনেকক্ষন হল। 
আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার বন্ধু এসেছে আপনাদেরকে দেখতে। দেখতে চাইলে অপেক্ষা তো করতেই হবে বলে আমরা বসলাম।
হঠাত করে নিজাম সাহেব ভেতরে চলে গেলেন আমাকে বলে গেলেন একটু বসুন।
বেশ কিছুক্ষন পর নিজাম সাহেব বেরিয়ে এলেন। বললেন মহিলার স্বামী অসুস্থ তাই এতক্ষন কথা বলছিলাম। তার কিছক্ষুন পর ঘরের দরজায় একটা গাড়ী এসে থামল। একে একে তিনটি মেয়ে যেন একেকটা হলদে পাখী গাড়ী থেকে বেরিয়ে এল। মনে হয় সবাই কলেজ ইউনিভার্সিতে লেখাপড়া করে। আমাদের সামনে দিয়ে ভেতরে যাচ্ছে এমন সময় মহিলা বললেন একটু দাড়াও সকলে। নিজাম সাহেবকে বললেন, এই আমার মেয়েরা। কথা বলুন। নিজাম সাহেব একে একে সকলের নাম জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর সবাই ভিতরে  চলে গেল। 
মেয়েরা চলে যেতেই নিজাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন এদের মাঝে আপনার মানুষ আছে?
বললাম না, এদের মাঝে নেই।
তাহলে চলুন যাই। 
আবার একটা রিক্সা নিলাম। নিউমার্কেট এসে নিজাম সাহেব নেমে গেলেন। আমাকে বললেন কাল অফিসে কথা হবে।
পরদিন লাঞ্চের পর নিজাম সাহেব আমার কাছে এলেন। চেয়ারটা টেনে খুব কাছে এসে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কি সাহেব একজনও কি পছন্দ হয় নাই? এর চেয়ে ভাল জিনিষ কোথাও পাবেন না।
তার দিকে তাকিয়ে আমি থ হয়ে রইলাম। মনে মনে বললাম আমি তো কাউকে পছন্দ করতে যাইনি। মুখে বললাম, কিসের পছন্দের কথা বলছেন?
এই যে কাল কয়েক জায়গায় নিয়ে গেলাম। তাদের কাউকেই কি পছন্দ হয়নি?
আমি তো আমার মানুষকে খুজছি, কাউকে পছন্দ করতে যাইনি। 
আরে সাহেব, আপনার এই বয়স। এতগুলি সুন্দরি দেখে মন কি একটুও দুর্বল হয়নি। কাউকে পেতে ইচ্ছা হয়নি? 
বলেন কি! আমি চাইলেই পাব? ধানমন্ডিও?
তবে কি? আপনাকে নিয়ে গেলাম কেন? আপনি কি ভেবেছেন আপনার মনের মানুষকে খুজতে গিয়েছি? তাকে কি আপনি আর পাবেন? মিরপুর মুহাম্মদপুরে কোন বাঙালি জীবিত নেই। থাকলেও তাদেরকে খুজে পাবেন না। যা হারিয়ে গেছে তার পেছনে ছুটে কি লাভ? ভুলে যান আপনার মনের মানুষের কথা। জায়গা চিনিয়ে দিয়েছি, এখন ইচ্ছে করলে আনন্দ ফুর্তি করতে পারেন। যখন ইচ্ছে যেতে পারেন। 
নিজাম সাহেবের কথায় নিজকে হারিয়ে ফেললাম। আমার শ্রদ্ধার পাত্র! আর এক জগতের মানুষ! কে বিশ্বাস করবে তার কাজকর্ম!! এবাদত করতে করতে তার কপালে দাগ পড়ে গেছে! এই মানুষ কি এই কাজ করতে পারে? আমার অংকে এতবড় ভুল! নাজমার কথা ভুলে যেতে হবে! উপায় কি!
আমার দ্বিতীয় কাজ হল ছোট ভাই রিয়াজকে মুক্তি বাহিনী থেকে ফেরত নিয়ে আসা। আমার ইচ্ছা তাকে লেখাপড়া করাব। লেখাপড়া করে সে অনেক নাম করবে। রিয়াজ তখন মিরপুর মুক্তিবাহিনী কেম্পে কেপ্টেন হারুনের সাথে। (এই কেপ্টেন হারুনুর রশিদ পরবর্তিতে লে: জেনারেল এবং সেনা প্রধান হিসেবে অবসর নেন।) সেদিন অফিস থেকে বের হয়ে সোজা চলে গেলাম মুক্তিবাহিনী কেম্পে। কেপ্টেন হারুন আমাকে দেখেই হেসে উঠলেন। বললেন, ওকে নিতে এসেছ, কিন্তু ওর তো লেখাপড়া হবে না। আমি ওকে তোমার চেয়ে বেশি চিনি। নিয়ে লাভ নেই। বরং এখানেই থাকতে দাও। 
তাঁর কথা শুনে মনে অনেকটা দু:খ পেলাম। মুখে বললাম, ও তো মাত্র তের পেরিয়েছে, লেখাপড়া হবে না কেন? আমার হাতে লেখাপড়া হবে না অমন চিন্তা আসে কি করে?
তুমি জান না, ও তোমাকে ছাড়িয়ে গেছে কোন কোন দিক দিয়ে। আর্মিতে থাকলেই সে ভাল করবে। চিন্তা করে দেখ। এখন তোমার ইচ্ছা। 
আমার ইচ্ছা। নিয়ে এলাম রিয়াজকে। ভর্তি করে দিলাম বাসার কাছে খিলগাও হাই স্কুলে।

-৫২-

সেদিন লাঞ্চের পর অফিসে বসতেই খালুজি এসে উপস্থিত। এসেই একবারে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, না মিলেনি। সাম্ভাব্য সব জায়গাতেই তিনি খুঝেছেন। এখন আশা ছেড়ে দিয়েছেন। দেখলাম এই কয় মাসে খালুজি একদম বুড়িয়ে গেছেন। শরীর শুকিয়ে হাড্ডিসার হয়েছে। খালাম্মার কথা জিজ্ঞেস করতেই  হাউমাউ করে কেদে উঠলেন। বললেন, ও এখন হাসপাতালে। বোধ হয় বাচবে না।
কোন হাসাপাতালে?
ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে
পরদিন হাসপাতালে গেলাম। খালাম্মা চোখ বুঝে পড়ে আছেন। আমি কানের কাছে মুখ নিয়ে ডাকলাম কয়েকবার। কোন সাড়া নেই। রাত নটা পর্যন্ত বসে রইলাম। চোখ খুলেননি। ডাক্তারের সাথে আলাপ করলাম। ডাক্তার বলল মানসিক আঘাতজনিত কারনে হার্ট দুর্বল হয়ে পড়েছে।  দুএকদিন না গেলে কিছুই বলা যাবে না। 
এখন দেশটা গড়তে হবে। কাজ করতে হবে দ্বিগুন। কে করবে? সবাই স্বাধীনতার স্বাদ চায়, ভাগ চায়। পাকিস্তান থেকে লক্ষ লক্ষ বাঙালি ফেরত এসেছে। যে যে বিভাগে কাজ করত বাংলাদেশে এসে সেই বিভাগে যোগদান করল। তারাও স্বাধীনতার ভাগ চায়। পাকিস্তানে কাজ করে বঞ্চিত হয়েছে পদোন্নতি থেকে, সুযোগ সুবিধা থেকে। এখন দেশ স্বাধীন হয়েছে। সবকিছু পুষিয়ে নিতে চায়। সরকারি বেসরকারি প্রায় প্রতিটি অফিসে চলছে দাবী আদায়ের অরাজকতা। মানুষের অগনিত দাবী। দাবী আদায়ের জন্য সৃষ্টি হল শত শত সংগঠন। পাকিস্তান থেকে যারা ফেরত এসেছে তাদের বলা হল রিটার্নি। রিটার্নিরা বাংলাদেশে এসে এখানকার কর্মরত কর্মচারিদের সাথে একাতœ হতে পারেনি। কারন তাদের দাবী অযৌক্তিক। স্থানীয় কর্মচারিরা মেনে নেয়নি। কর্মচারিদের মাঝে ভাগ হল। একদল স্থানীয় আর এক দল রিটার্নী। এই রিটার্নীরা শুরু করল ঘেরাও কর্মসূচি। প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে ঘেরাও করে দাবী আদায় করা। প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই চলল এই ঘেরাও অভিযান। অযৌক্তিক দাবী আদায়। শত শত ইউনিয়নের জন্ম হল। একা দাবী আদায় করা যায় না। তাই ইউনিয়ন। ইউনিয়নের মাধ্যমে অনেক কিছু করা যায়। অফিসারস ইউনিয়ন থেকে রিক্সাওয়লা পর্যন্ত ইউনিয়ন। এমন কি যারা বাসা থেকে অফিসে লাঞ্চ নিয়ে যায় তারাও এখন ইউনিয়নের মাধ্যমে দর কষাকষি করে দাবী আদায়ে সোচ্চার। চারদিকে শুধু দাবী আর দাবী। সবাই স্বাধীনতার ভাগ পেতে চায়, স্বাদ পেতে চায়। কিছুদিনের মধ্যে এইসব দাবী জেলাভিত্তিক দাবীতে রুপান্তরিত হল। কে কোন্ জেলার লোক, সেই জেলার বড় সাহেব কে, বা কতজন। জেলা বড়সাহেবরাও নিজের জেলার মানুষকে স্বাদ পাইয়ে দিতে ব্যস্ত। কোথায় দেশটাকে গড়ে তুলবে তা না করে সবাই যার যার স্বার্থ নিয়ে ছুটাছুটি করছে।  মনে হয় সবাই এখন জেলাভিত্তিক স্বাধীনতা চায়।
পাকিস্তানপ্রেমিরা তাদের  বোল পাল্টে অনেকে ঘাপটি মেরে আছে। প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই ওরা আছে। এই সুযোগটা অনেকেই কাজে লাগাতে ব্যস্থ হয়ে পড়ল। একদিকে কিছু কর্মচারিকে উসকে দেয়, আর অন্যদিকে নিজেদের উদ্দেশ্য সমাধা করার কাজ হাতে নেয়। 
বাংলাদেশ ব্যাংকটা দুটা ভাগ হয়ে গেল। প্রথমে শুরু হয়েছিল রিটার্নি নিয়ে। শত শত রিটার্নি এসে ব্যাংকে যোগদান করল এবং তাদের সিনিওরিটি দাবী করল। স্থানীয় কর্মচারিরা তার বিরোধিতা করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল যেন আমরা আবার পাকিস্তানির সাথে দর কষাকষি করছি। তাদের কাজকর্মে মনে হল তারা যেন বাঙালি নয়, পাকিস্তানি। অনেকের এখনও পাকিস্তানপ্রীতির রেশ কাটেনি। তাদের গায়ে এখনও বিহারী বিহারী গন্ধ। এই রিটার্নীরা সব সময় যুদ্ধংদেহি মনোভাব নিয়ে কাজ করে। তাদের আলাদা ইউনিয়ন গঠন করে দাবী আদায়ের স্মারক পেশ করে। দেখা গেল এই রির্টানিরা ৯০ ভাগ একটা বিশেষ জেলার মানুষ আর সেই জেলার মানুষ ডিপুটি গভর্নর নুরুল মতিন নিজেও রিটার্নী। সারাজীবনই তিনি করাচীতে কাজ করেছেন। তিনি ব্যাংকিংএ একমাত্র গোল্ড মেডালিষ্ট। ডিপুটি গবর্নর হিসেবে নিজ জেলার মানুষকে তিনি খুব ভালবাসেন এবং তাদের অযৌক্তিক দাবীকে ন্যয্য বলে মেনে নিতে চেষ্টাও করলেন। কিন্তু ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী তা হতে পারে না বলে গভর্নর অনুমোদন দেননি। 
ফেব্রুয়ারিতে (১৯৭২) গভর্নর গেলেন আই এম এফ অধিবেশনে তিন মাসের জন্য। তখন নুরুল মতিন সাহেব হলেন গভর্নর-ইন-চার্জ। গভর্নরের সব কাজের দায়ীত্ব এখন তার হাতে। দায়ীত্ব হাতে পেয়েই তিনি শুরু করলেন তার কাজ। কয়েক সপ্তাহের মাধ্যে হেড অফিস অফিস থেকে অনেক বড় বড় অফিসার এবং বিভাগীয় প্রধানকে বিভিন্ন জেলায় বদলি করে দিলেন এবং তাঁর নিজের পছন্দের মানুষকে হেড অফিসে নিয়ে এলেন। ব্যাংকের প্রায় সব বিভাগের প্রধান করা হল তাঁর নিজের লোক। দেখা গেল এখন ব্যাংক চলবে সেই জেলার মানুষ দিয়ে। তার নিজের দলকে খুশি করার জন্য রাতারাতি তিরিশটা কাউন্টার খুলে তাদের দলকে পদোন্নতি দিলেন। রিটার্নি সবাইকে তিনি সিনিওরিটি দিলেন। তার মানে হল যারা পাকিস্তানে বহুদিন চাকরি করেছেন অথচ তাদের কোন প্রমোশন হয়নি তারা এখন এখানে সিনিওর। একটা পদ খালি হলেই নাম আসবে রিটার্নীদের। আর বাংলাদেশে যারা এতদিন চাকরি করেছে তারা আগামী দুএক বছরের মাঝে পদোন্নতির আশা করতে পারে না।  ইউনিয়ন তার প্রতিবাদ করল। রিটার্নী ইউনিয়নও বসে নেই। তারা তাদের কাজ বাদ দিয়ে সারাদিন বসে থাকে গভর্নরের অফিস ঘিরে আর একটার পর একটা কাজ করিয়ে নিচ্ছে। এক পর্যায়ে দেখা গেল কর্মচারির বেতন বন্ধ হয়ে গেছে। নুরুল মতিনের অযৌক্তিক কাজের প্রতিবাদে ক্যাশ বিভাগ কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন আমরা বাংলাদেশের কর্মচারিরা ফরিয়াদ জানাব কার কাছে? যার কাছে ফরিয়াদ করব তিনি নিজেই তো এসব করে যাচ্ছেন বা করাচ্ছেন। এখন উপায় কি? গভর্নর ফিরে আসা পর্যন্ত বেতন না পেলে মানুষ চলবে কিভাবে? অতএব অপেক্ষা করা যায় না। 
আমি আমার সাথে দুজন নিয়ে নুরুল মতিনের চেম্বারে ঢুকলাম। যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্যার, অফিসে যে এতসব ঝামেলা হচ্ছে, কেউ কাজ করছেনা, সবাই আপনার অফিসের সামনে বসে থাকে, কর্মচারির বেতন দেয়া হয়নি, ইলেভেটর বন্ধ করে দিচ্ছে, এসব অনিয়মের কি ব্যবস্থা করছেন?’
তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমার করার কিছু নেই’। 
কিন্তু আপনি তো অনেক কিছু করছেন, এই যেমন রিটার্নীদের সিনিওরিটি দিয়েছেন, তিরিশটা কাউন্টার খুলে তাদের প্রমোশন দিয়েছেন,  যারা অনেক বছর নিজেরা বাড়ী করে পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে সংসার করছে, তাদের ছেলেমেয়ে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে, হঠাৎ করে তাদের বদলী করে দিয়েছেন, একবারও ভাবলেন না তাদের কোন অসুবিধা হবে কিনা। অথচ এই অনিয়মগুলো ঠিক করার জন্য আপনার করার কিছু নেই। তাহলে আমরা যাব কার কাছে?
গভর্নর সাহেব ফিরে আসুক, তারপর দেখা যাবে।
তাহলে আপনার এখানে প্রয়োজন নেই, আপনি পদত্যাগ করুন, বেরিয়ে যান অফিস থেকে! গভর্নর সাহেব ফিরে আসলেই অফিসে আসবেন। 
তিনি এমন একটা প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকিয়ে রইলেন। 
আপনি গাড়ীও পাবেন না। গভর্নর সাহেব আসলেই গাড়ী পাবেন। আমি ড্রাইভারকে বলে দিয়েছি সে আর আপনার গাড়ী চালাবেনা। 
কয়েক সেকেন্ড তিনি ভাবলেন। মাথা নিচু করে উঠে দাড়ালেন। আস্তে আস্তে দরজার বাইরে এসে তাকালেন বিরাট ওয়েটিং রুমের দিকে। তিরিশ চল্লিশজন লোক বসে আছে। সবাই তার তোষামোদকারি, রিটার্নী। যেন তাঁর দেহরক্ষি। অফিসের কাজ বাদ দিয়ে এখানে বসে আড্ডা দেয়, তাঁকে দিয়ে কাজ করায়। আমি মতিন সাহেবের পেছনে। আমার এক পকেটে একটা হাত।  পেছনে আমার দুজন সাথি। মতিন সাহেব হয়ত তার তোষামোধকারিদের কাছ থেকে কিছু আশা করেছিলেন। সবাই একবার তাকাল। আমার পকেটে হাত দেখে কেউ টু শব্দটি করল না। হলওয়ে দিয়ে মতিন সাহেবকে অফিসের বাইরে নিয়ে বললাম, যান রিক্সা নিয়ে বাসায় যান। আপনাকে শ্রদ্ধা করতে পালামনা, কারন আপনি অন্যায় কাজ করেছেন। শাসক যখন অন্যায় করে তখন তার প্রতিবাদ এমনিভাবেই করতে হয়। আমাদের আর কোন উপায় ছিল না। 
তিনি রিক্সা নিয়ে সোজা চলে গেলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। তিনি বঙ্গবন্ধুর সহপাঠি তা জানা ছিল না। বুদ্ধিজীবিরা বুদ্ধি খাটিয়েই কথা বলে। বঙ্গবন্ধুকে কি সব বললেন তিনিই জানেন। বঙ্গবন্ধু তৎক্ষনাত তাঁর স্পেশাল ব্রাঞ্চকে ডেকে আদেশ দিলেন। মৌখিক। কি আদেশ দিলেন তা তিনিই জানেন আর জানে স্পেশাল ব্রাঞ্চ।
স্পেশাল ব্রাঞ্চ মতিন সাহেবের পিএ-এর সাথে যোগাযোগ করে আমার সব বৃত্তান্ত সংগ্রহ করল। বলা বাহুল্য, মতিন সাহেবের পিএ ও একজন রিটার্নী এবং একই  জেলার মানুষ। তিনি আমার খবরা খবর দেবার সময় কিছু দাড়ি-কমা যোগ বিয়োগ করে, কিছু শব্দ এদিক সেদিক করে যা দিলেন তাতে আমি একজন সন্ত্রাসী ছাড়া কিছুই নই। আমার হাতে অস্ত্র আছে তা নিশ্চিত। সেই মতে স্পেশাল ব্রাঞ্চ তাদের অভিযান শুরু করে দিল।
রাতে আমার খোজে সাতটা বাড়ীতে হানা দিল পুলিশ। আমি তখন বাসাবো থাকি। আমার বাসা, পাশের বাসা, আতœীয়ের বাসা, আমার কয়েকজন বন্ধুর বাসা সব মিলে সাতটা বাসায় হানা দিল পুলিশ। আমি তখন টাঙ্গাইলের একটি গ্রামে আমার বন্ধু রহমানের বাড়ীতে। ঘটনার পর সবাই বলল, তুই ঢাকার বাইরে চলে যা। কাছেই ছিল রহমান। সে বলল, আমাদের বাড়ীতে চলে যা। তুই তো চিনিস। দেরি করিস না। সেদিন বিকেলেই চলে গেলাম। 
পরের দিন বিকেলে রহমান আসল তার বাড়ীতে। হাতে অনেকগুলো খবরের কাগজ। প্রথম পাতায় লেখা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে সন্ত্রাসীর হামলা, ডিপুটি গভর্নর আহত, কোনটায় লিখেছে বাংলাদেশ ব্যাংকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, গভর্নর বহিস্কৃত ইত্যাদি। খবর পড়ে হাসলাম। রহমান বলল, কাল এখান থেকে চলে যা অন্য কোথাও। কারন এক জায়গায় বেশিদিন থাকা ঠিক নয়। ধরতে পারলে তো উত্তম মধ্যম কিছু না কিছু জুটবেই। তাই সাবধানে থাকা ভাল।
আমার নামে কোন মামলা নেই। কারন কোন থানায় কোন ডাইরি নেই। যা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মৌখিক আদেশে। এ মামলার রায় শুধু বঙ্গবন্ধুই দিতে পারেন। আমাকে ধরার জন্য আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু রায় দেননি। 
পরের সপ্তাহে দৈনিক ইত্তেফাকে একটা উপসম্পাদকীয় বের হল। লিখেছেন আবেদ খান। তিনি ব্যাংকে সরজমিনে খোজ খবর নিয়ে এই লেখাটি লিখেছেন। অন্যন্য পত্রিকায় যেসব খবর ছাপা হয়েছে তার প্রতিবাদ অনেকটা। তাঁর লেখায় পরিষ্কার হল যে আমি সন্ত্রাসী নই, একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার সাথে তিনি ব্যাংকের অনেক অনিয়মের কথাও তোলে ধরলেন। এই লেখার পর বাতাসটা আমার দিকে ঘুরে গেল। সন্ত্রাসী খেতাবটা কাটা গেল। 
২৭ দিন এখানে সেখানে পালিয়ে বেড়ালাম। তারপর তোফায়েল আহাম্মদের সাহায্যে একটা তারিখ ঠিক হল। আমাকে বঙ্গবন্ধুর সামনে যাবার সুযোগ দেয়া হবে।
তোফায়েল ভাই বললেন, দেখ আমি কিন্তু কিছু বলতে পারবনা। আমার কাজ শুধু সামনে যাবার সুযোগ করে দেয়া। বাকি যা করার বা বলার তুইই বলবি।
আমি তাতেই রাজি। 
রাজি তো হলাম কিন্তু চিন্তায় ঘুম আসে না। আমি বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি দাড়াব! কি বলব! কিভাবে কথা বলব! চোখের দিকে তাকাতে পারব! তিন দিন পরই সেই তারিখ। এই তিন দিন কত রকমের কথা মনে মনে আওড়ালাম। কি প্রশ্ন করবেন? কি উত্তর দিতে হবে? কিভাবে কথা বলতে হবে!  শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম সব কথার উত্তর খুব নরম সুরে দিতে হবে। চোখের দিকে তাকানো যাবেনা। হাত পা শক্ত রাখতে হবে। কাঁপতে দেয়া যাবেনা। 

-৫৩-

তোফায়েল ভাই এক সময় আমাকে সাথে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর চেম্বারে ঢুকে বললেন, এই আপনার আসামী হাজির। একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার নিজেরও কিছু কথা আছে, বলতে চায়। বলে বেরিয়ে গেল।
আমি ফাঁসির আসামীর মত মাথা নিচ করে দাঁড়িয়ে আছি। আমি টের পাচ্ছি বাঘের দৃষ্টি আমার দিকে। কয়েক মুহূর্ত। একটা গম্ভীর আওয়াজ ভেসে এল, তুই বুড়া লোকটাকে মারলি কেন?
আমি তো মারিনি! (মনে মনে কতবার নরম সুর মুখস্ত করলাম। কিন্তু বলার সময় আমার সেই চিরাচরিত রুক্ষ স্বরই বেরিয়ে এল। )
আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে রয়েল বেঙ্গলের গর্জন - তুই জানিস কার সাথে কথা বলছিস?
আমাকে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে, সঠিক নরম সুরে উত্তর দিতে হবে! অবশ হয়ে গেলে চলবে না। আমার কথা বলতে হবে! কাপড় ভিজিয়ে দিলে চলবে না। উত্তর একটা এসে গেল। সাহস সঞ্চয় হয়ে গেছে। বলে ফেললাম, আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলছি, জাতির পিতার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তা আমি শিখি নাই।
মতিন কি মিথ্যা বলেছে?
তা জানি না। তিনি ইজম করেছেন! তাই অফিসে এত গন্ডগোল।
কী! ইজম করেছে? যা প্রমান নিয়ে আয়!
নিয়ে এসেছি, বলে আমার হাতে এক গাদা ফাইল বাড়িয়ে দিলাম।
এগুলো কি?
তিনি যে ইজম করেছেন তার প্রমান। একটা নয়, কয়েক ডজন। আর আপনি বলেছেন যুদ্ধে আমাদের তিরিশ লক্ষ লোক মারা গেছে। তাহলে আমাদের কাউন্টার বাড়বে না কমবে? তিনি রাতারাতি তার দলকে খুশি করার জন্য তিরিশটা কাউন্টার তৈরি করেছেন। তাতে আমাদের তিরিশ লক্ষ টাকা অপচয় হচ্ছে। 
আর একবার গম্ভীর আওয়াজ। তোফায়েল!
তোফায়েল ভাই এসে হাজির। 
ও কী বলে?
ও নিজের কথা বলে। আপনি তো তার কথা শুনেননি। এক পক্ষ শুনেছেন।
কয়েক মুহূর্ত চুপ। তারপর বললেন, যা আমাকে ইনকোয়ারি করতে দে।
তখন যে এত সাহস কোথা থেকে এল জানি না। বললাম, এখন আমি যাব কোথায়? গেলেই তো এ্যারেষ্ট করবে!
এ্যারেষ্ট করলে কি হয়? আমি জেল খাটি নাই? যা কয়দিন পালিয়ে থাক গিয়ে। আমাকে ইনকোয়ারি করতে দে।
মাথা নত করে খুশিমনে বেরিয়ে এলাম। এবার সুবিচার পাব।
বেরিয়ে এসে তোফায়েল ভাই বললেন, তোর তো সাহস কম না! কি উত্তর দিবে বলে বলে নাকি কান্না করছিলি, কিন্তু কথা বলার সময় তো খুব সাহসের সাথে বলেছিস।  যা সাবধানে থাক গিয়ে। ইকোয়ারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত লুকিয়ে থাক। পুলিশের হাতে গেলে অনেক ঝামেলা। 
পরদিন ২৭ জনের একটা টীম বাংলাদেশ ব্যাংকে গেল। প্রথম ইনকোয়ারিতেই নুরুল মতিনকে বদলি করা হল আইডিবি-তে।  ব্যাংকে একটা হৈ চৈ পড়ে গেল। অনেক গল্পও তৈরি হল। আমার কত ক্ষমতা! আমি মুজিব বাহিনীর লোক। আমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। ইনস্পেকশন টীমকে আমরা অনেক তথ্য সরবরাহ করলাম। তৃতীয় ইনকোয়ারিতে নুরুল মতিন সাসপেন্ডেড। অনেকগুলো অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। অনেক জাজল্যমান প্রমান। 
আমার চাকুরি আরও মজবুত হল। এখন অফিসে আমি একজন বিশেষ ব্যক্তি। অনেকে ভয় করে। অফিসে কোথাও কোন ঝামেলা হলে আমার কাছে আসে। আমি মিটিয়ে দিই। বিশেষ জেলার মানুষগুলি মনে মনে আমাকে ঘৃণা করে, মুখে মুখে খুব প্রসংসা করে।  
সেদিন অফিসে এসে দেখি খালুজি বসে আছেন। আমাকে দেখে আজকে আর কেদে উঠলেন না। মনে হল কাদবার শক্তিটুকু আর নেই। এত দুর্বল হয়ে গেছেন আমার সাথে কথা বলার সময় মনে হয় হাপাচ্ছেন। বললেন, তোমাকে খবর দেবার জন্য কয়েকদিন এসেছিলাম অফিসে, বাসায়ও গিয়েছিলাম কয়েকদিন। মানুষের কাছে জানতে পারলাম তোমার বিরুদ্ধে মামলা, পুলিশ তোমাকে খুজছে। কবে কোথায় তোমার দেখা মিলবে কেউ বলতে পারেনি।
ভাল কোন খবরের আশায় আমি খুশিতে তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলাম, খবরটা কি খালুজি? 
বলব, সব বলব। একটা একটা করে। তোমার কাছে বলতেই এসেছি।
বলুন, একটা একটা করে সব বলুন।
প্রথম খবর হল তোমার খালাম্মা আর নেই। তোমার সাথে শেষ দেখার দু সপ্তাহ পর মারা গেছে। দ্বিতীয় খবর হল নাজমার আশা ছেড়ে দিয়েছি। সব জায়গায় খবর নিয়েছি। আমার ভায়রার গ্রামের বাড়িও গিয়েছি। গিয়ে খবর শুনলাম ওদের বাসায় বিহারি রাজাকার ঢুকে সবাইকে হত্যা করে তাদের জিনিষপত্র লুট করেছে। তখন নাজমাও সেখানে ছিল। মৃত্যুর দোয়ার থেকে বেচে যাওয়া একজনের কাছ মুখে এসব খবর জেনেছি। এসব শোনার পর  আশা ছেড়ে দিয়েছি, কান্না বন্ধ করেছি।  
সব কথা শুনে খালুকে নিয়ে ব্যাংকের সামনে একটা রেষ্টুরেন্টে গেলাম। দুজনের খাবারের অর্ডার দিলাম। খালুজির খাওয়া দেখে মনে হল অনেকদিন তিনি খান না। খাওয়া শেষে জিজ্ঞেস করলাম, এখন কোথায় যাবেন?
কোথায় যাব বাবা? আমার আর কি আছে? কে আছে? কার কাছে যাব? বাড়ীতে ফিরে যাব কার কাছে? সমস্ত দেশটাই তো এখন আমার বাড়ি। বাড়ি গিয়েছিলাম। থাকতে পারিনি। একা বাড়ীতে আমার ভয় করে। অনেক কিছু মনে আসে। ঠিক থাকতে পারি না। বেরিয়ে যাই। অনেক ঘুরাঘুরি করে আবার ফিরে আসি। আবার বেরিয়ে পড়ি। এবার এসেছি তোমার কাছে, দুটি মনের কথা বলার জন্য। 
আমি বললাম খালুজি এখন আপনি ঠিক করবেন কোথায় থাকবেন। মানুষের সংস্পর্শে আপনার থাকা দরকার। গ্রামের বাড়িতে আপনার কে আছে? সেখানে থাকতে পারেন কিনা ভেবে দেখুন। আমি কোথায় থাকি, কি খাই তার ঠিক নাই  । না হয় আমার সাথেই থাকতে বলতাম। 
খালুজি বললেন, না বাবা গ্রামের বাড়িতে থাকা যাবে না। একটা ভাইপো আছে তার সাথে থাকা যাবে না।
তাহলে আপনাকে কুমিল্লাতেই ফিরে যেতে হবে। কথা বলার মত কাউকে খুজে নিতে হবে। ভেবে দেখুন কি করা যায়।
আমার মাথায় কিছুই আসছে না কি করব। দেখি চিন্তা করে নেই।
চলুন আপনাকে রেল ষ্টেশনে পৌছে দেই বলে একটা রিক্সা ডাকলাম। ষ্টেশনে পৌছে দিয়ে বললাম,অতীতকে ভুলে যেতে চেষ্টা করুন, বর্তমান আর ভবিষ্যতকে নিয়ে বেচে থাকতে চেষ্টা করুন। এ অবস্থা আজ অনেকের, শুধু আপনার নয়। কিছু পেতে হলে কিছু ত্যাগ করতে হয়। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীন। বলে চলে এলাম।
প্রবোধ দিলাম। রিক্সায় বসে ভাবতে লাগলাম খালুজি কোথায় যাবে! স্বাধীনতার স্বাদ কতটুকু ভোগ করেছে! তার এখন কি আছে, কে আছে! পথে পথে ঘুরবে। ঘুরতে ঘুরতে একদিন শেষ হয়ে যাবে! স্বাধীনতার স্বাদ কি তা বুঝার আগেই।

-৫৪-

একদিন সবই গল্প হয়ে যায়। গল্পের চরিত্রগুলো আমাদের সমাজেই বিচরন করে। এসব চরিত্রের ক্রিয়াকর্মগুলো আমাদের প্রভাবিত করে। আমরা কখনও খুশি হই, কখনও উত্তেজিত হই আবার কখনও হিংসায় জ্বলে মরি। কোন কোন চরিত্রের অপকর্মের জন্য সমাজ তথা জাতিকে মাসুল দিতে হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে একটা নতুন দেশের জন্ম হয়েছে – বাংলাদেশ। এখন একটা ধ্বংসস্তুুপ। দেশটাকে গড়তে হবে। বঙ্গবন্ধুর অমর বানী কোন কাজে লাগেনি।  স্বাধীনতার স্বাদ পৌছে দেবার ক্ষমতা যাদের হাতে ছিল তারা এই আকুতির কোন তোয়াক্কা করেনি। যে যেদিকে যে সুযোগ পেয়েছে সেখানেই লুট করা শুরু করে স্বাধীনতার স্বাদ নিজেরাই গ্রহন করতে লাগল। দেশের মঙ্গলের জন্য তাদের মাথাব্যাথা নেই। তারা নিজেদের, নিজের আতœীয়স্বজন আর চামচাদের লুট করার সুযোগ করে দিয়ে দেশটাকে একটা দুর্ভীক্ষের দিকে ঠেলে দিল।
অস্ত্র জমা হয়ে গেছে। রাজনৈতিক নেতাদের মুখের বুলি পাল্টে গেছে। গলার স্বর বদলে গেছে। এতদিন মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলার সময় একটা সমীহ ভাব নিয়ে কথা বলত, এখন নেতাসুলভ কথা বার্তা। দেশটা নেতারা স্বাধীন করেছে, স্বাধীনতার স্বাদ তারাই গ্রহন করবে। তারাই দেশের ভবিষ্যত হর্তাকর্তা। যা কিছু করার তারা এই নেতা পাতি নেতা তস্যু নেতারাই করবে এবং তারাই শুধু তারাই। কোথায় কোন মার্কেটে বিহারির দোকানপাট ব্যবসা আছে, কোথায় কোনখানে বিহারির বাড়ী, জমি জমা ছিল এসব খুজে বের করা এখন নেতাদের কাজ। তাদের হাতে ১৬ ডিভিশন আছে, দখল করা একদম সোজা। কার কোন আতœীয়কে কি দিতে হবে, কার চাকরি কোথায় হবে সব করবে এই নেতারা। সরকারি কোন্ অফিসে কি সুযোগ আছে সে সুযোগ পাবে এই নেতারা, তাদের চামচা আর আ্তœীয়স্বজন। ন্যায় অন্যায়ের কোন বালাই নেই। তাদের চাই কড়ি আর সম্পদ। দেশ রসাতলে যাক, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। চুরি আর চুরি। যে যেখানে পারে সেখাইে সিধ কাটছে। এখন আসল মুক্তিযোদ্ধার হাতে অস্ত্র নেই অতএব ধমক দিলেও কিছু করার নেই। মুক্তিযোদ্ধারা যেন এক অসহায় জীব। যদি কোন মুক্তিযোদ্ধা এই নেতাদের দুর্নীতির সামান্যতম উচ্চবাচ্চ করে তাহলে দুদিন পর তার লাশটা পাওয়া যাবে খালের পাড়। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন, ’আমার চারপাশে চোর আর চোর।’
এমনি এক নেতার সাথে আমাদের বন্ধুত্ব। তিনি হলেন তেজগা এরিয়ার এমপি অধ্যাপক শামীম মিসির। সত্তরের নির্বচনী জোয়ারে তিনি এমপি হয়েছেন। আসলে তিনি আমাদের বন্ধু ছিলেন না। আমাদের বন্ধু ইঞ্জিনিয়ার বাচ্চুর চাচা। তাস খেলতে খেলতেই কখন যে তিনি আমাদের বন্ধু হয়ে গেলেন কেউ খেয়াল করিনি। কিন্তু একটা ফারাক থেকে গেল। আমরা তার অনেক জুনিয়র বলে তিনি আমাদেরকে তুমি সম্মোধন করতেন, আর আমরা আপনি বলতাম। সত্তরের নির্বাচনে আমরা তার কাজ করেছি। স্বাধীনতার পর দেখলাম তিনি আমার পিছু ছাড়ছেন না। যখন তখন তিনি গাড়ী পাঠিয়ে দেন, আমার কি লাগবে সব সময় ব্যস্থ থাকেন। অফিস ছুটির সময় প্রায়ই তিনি ব্যাংকের গেইটে গাড়ী নিয়ে অপেক্ষা করেন। তাস খেলা হয় তার বাসায়। আরও দুএকজন নিয়ে আড্ডা হয়। খাওয়াদাওয়া চলে। এক সময় বললেন, তুমি বাসা ভাড়া করে থাক কেন? আমার বাড়ি তো সবটাই খালি। ওই সামনের রুমটা তোমাকে সাজিয়ে দিচ্ছি। তোমার ইচ্ছেমত তুমি থাক। একটা কাজের লোকও থাকবে। কোন অসুবিধা হবে না। একই কথা প্রতিদিন বলে আমাকে সে কথায় নিয়ে এল। তাছাড়া তাস খেলার নেশাটাও কম নয়। আমাকে দুর্বল করে দিল। আমি এক সময় তার বাংলোয় গিয়ে উঠলাম। 
তার বাড়ীটা হল খিলগাও চৌরাস্তায়। যেদিন উঠলাম সেদিনই পাড়ার বেশ কয়েকজনকে সে দাওয়াত করে ছোটখাটো একটা টি পার্টির ব্যবস্থা করল। সবাইকে বলল, এখন থেকে বাহার এখানেই থাকবে। ওকে এই রুমটা দিয়ে দিয়েছি। সে চাইলে বাড়ি দিয়ে দিব। মিসিরের সেবা যতœ দেখে আমি অনেকটা কাবু হয়ে গেলাম। দুদিন যেতে না যেতেই খেয়াল করলাম স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা তার সাথে যোগযোগ রাখছে না। যখন জানতে পেলাম যুদ্ধকালিন সময়ে মিসির তার গুন্ডাবাহিনী দিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে খুন করিয়েছে, যার প্রতিশোধ নেবার জন্য কেউ কেউ এখন ওৎ পেতে আছে তখনই বুঝলাম আমাকে এখানে আনার মানে কি। যেদিন এই কাহিনী শুনলাম সেদিনই মিসিরের বাড়ী ছেড়ে দিলাম। কিন্তু মিসিরের উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেছে। যারা প্রতিশোদ নেবে তারা আমাকে চিনে। আমি নাকি মিসির আলির ডান হাত। অতএব ..
মিসিরের বাসা ছেড়েছি কিন্তু তাতে আমাদের তাস খেলা বন্ধ হয়নি। যেখানে সুবিধা, যখন সুবিধা সেখানেই বসে পড়ি। গাড়ী নিয়ে মিসির সব সময় প্রস্তুত থাকে, কখন কোথায় যেতে হবে। আমার বাহন এখন মিসিরের গাড়ী। সদা প্রস্তুত। আমার যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেদিকে মিসিরের সদা ব্যস্ততা।
একদিন মিসির অফিসে এল লাঞ্চের আগে। বলল আজ তিনি লাঞ্চ করাবেন। নিয়ে গেলেন ষ্টেডিয়ামে। লাঞ্চ শেষে আবার অফিসে রওয়ানা দিলাম। গাড়ীটা এসে থামল টিকাটুলির মোড়ে। মিসির বলল, আস তো তোমাদের তাইজুদ্দিন সাবের সাথে দেখা করে আসি। 
তাইজুদ্দিন সাব বাংলাদেশ ব্যংক রেজিষ্ট্রেশন ইউনিটের প্রধান। একবারে সাদাসিধে অমায়িক মানুষ। তবলীগ করেন। আমাকে খুবি সমীহ করেন। ব্যাংক ভবনে স্থান সংকুলান না হওয়ায় এখানে ভাড়া নিয়ে অফিস চলছে। এখান থেকে যত রকমের ব্যবসার লাইসেন্স দেয়া হয়। ইম্পোর্ট, এক্সপোর্ট ইত্যাদি। আমি অতশত কিছু  ভাবিনি। ভাবলাম তাইজুদ্দিন সাবের সাথে দেখাটা করেই আসি। মিসিরের সাথে গিয়ে উপস্থিত হলাম অফিসে। আমাকে দেখেই তাইজুদ্দিন সাহেব দাড়িঁয়ে গেলেন। অথচ ব্যাংকের পদ অনুযায়ী তিনি আমার অনেক অনেক উপরে। আমাকে দেখে তাঁর দাড়িয়ে যাবার কথা নয়। মিসিরকে বললেল, উনাকে আবার কষ্ট দিতে গেলেন কেন? আপনি কাল পরশু একবার আসেন। বলে তিনি পিয়নকে ডেকে চায়ের আদেশ দিলেন।  চা খাবার সময় আমাদের নেই বলে চলে এলাম।
তিন বছর পর একদিন তাইজুদ্দিন সাহেবের সাথে দেখা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কয়টা নিয়েছিলেন?
আমি থ হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি?
ওই যে  দশটা ইম্পোর্ট এক্সপোর্ট লাইসেন্স দিলাম! সেগুলো!
তাই নাকি! কখন, কাকে দিলেন?
মিসির আলীকে নিয়ে আমার অফিসে এসেছিলেন একবার, মনে নাই?
আমার মনে পড়ে গেল মিসির আলি একদিন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল তাজুদ্দিন সাহেবের অফিসে। বললাম, আমি ত লাইসেন্স সম্বন্ধে কিছুই জানি না। কি কারনে মিসির আপনার অফিসে গিয়েছিল তাও জানি না। এখন বুঝলাম একটা উদ্দেশ্য ছিল।
সাহেব আপনি তো খুব বোকা মানুষ! আপনার কথা বলাতেই তো এতগুলো লাইসেন্স দিলাম!
এখন শামিম মিসির হজ করে হাজি সাব হিসেবে বেশ ভাল আছেন। জীবনে একবারই এমপিএ হয়েছেন, আর কোনদিন রাজনীতি করারও ইচ্ছে নেই। এখন সম্পদ দেখাশোনা নিয়ে ব্যস্থ। তার সম্পদের পাহাড় কত তা আমার জানার কথা নয় কারন তিনি নিজেই জানেন না। তার সেক্রেটারি জানে।

-৫৫-

আমি ভোগ্যপণ্য সমবায়  সমিতির সাধারন সম্পাদক। তিনজন লোক নিয়োগ করব। চাকুরিপ্রার্থি হাজার খানেক। আজ ইন্টারভিউ। যোগ্য ব্যক্তিকে বাছাই করে নিয়োগ দিতে হবে। আমি একজন নীতিবান মানুষ। কোন অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতি আমার কাছে স্থান নেই। আমি সঠিক প্রার্থিকে নিয়োগ দিব সকলের এই বিশ্বাস আছে।
একটা ইন্টারভিউ বোর্ড গঠন করা হল। পাঁচ জনের বোর্ড। আমি বোর্ডের প্রধান। ইন্টারভিউ শুরু হবার ঘন্টাখানেক আগে আমি অফিসে ঢুকছি। দেখি অফিসের বারান্দায় একজন সুন্দরি মহিলা খোলা আকাশের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই বারান্দা দিয়ে লোজজনের আসা যাওয়া। কারও দিকে তার নজর নেই। মনে হয় সে অন্য কোন জগতে হারিয়ে গেছে। দূর থেকে মনে হল নাজমা দাড়িয়ে আছে। সম্পর্ন মুখটা দেখা যাচ্ছে না। এক সাইট থেকে যা দেখা যায় কোমড় পর্যন্ত ছাড়িয়ে যাওয়া ঠিক নাজমার মত। মুখের আদল ঠিক যেন নাজমার আদল। কাছে গিয়ে আমার চলা মন্থর হয়ে গেল। ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম। ঠিক নাজমার মত নয় তবে চেহারা খুব আকর্ষনীয়।  এই চেহারায় একটা বিষন্নতার ছাপ স্পষ্ট। দেখলেই বোঝা যায়। এক নজর তাকিয়ে অফিসে চলে গেলাম। অফিসে গিয়ে দেখি বন্ধু অরুন বসে আছে। আমাকে দেখে অরুন বলে উঠল, কি রে তোর কি কোন ধরা বাধা সময় নেই? অফিসের সময় কয়টায়, এখন কয়টা বাজে? তোর চাকরি থাকে কি করে? কতক্ষন বসে আছি। মনে হয় যেন গভর্নর, যখন ইচ্ছে আসে, যখন ইচ্ছে যায়। 
কি ব্যাপার এই সকাল বেলা তুই অফিসে কেন? 
এসেছি একটা অনুরোধ নিয়ে। রাখতে হবে। 
কি অনুরোধ?
তুই তো তিনজন লোক নিবি শুনেছি। আমার একজন লোক মানে আমার ভাগ্নিকে নিতে হবে। আমার দুলাভাই হঠাত হৃদরোগে মারা যাওয়ায় পরিবারটা দু:সহ অবস্থায় পড়ে গেছে। ভাগ্নিটাই একমাত্র উপার্জনক্ষম। লেটারসহ মেট্রিক ফার্ষ্ট ডিভিশন। তোদের কাজ চলে যাবে। পরিবারটাকে সাহায্য কর, একটা চাকরি দিয়ে দে। তুই তো মানুষের উপকার করে বেড়াস। এই উপকারটুকু কর। 
আরও সব শুনে একটা ভাবনায় পড়ে গেলাম। মেট্রিক পাশ হলেই আমাদের চলে। আমাদের চাওয়ার চেয়ে বেশি যোগ্যতা থাকলে তো আরও ভাল। এমন একজনকে নিয়োগ দিলে কি দুর্নীতিতে পড়বে? জিজ্ঞেস করলাম তোর ভাগ্নি কি দরখাস্ত করেছে?
হ্যা, দরখাস্ত করেছে, ইন্টারভিউ কার্ডও পেয়েছে। ওইতো ও বারান্দায় দাড়িয়ে আছে। ইন্টারভিউর প্রস্তুতি নিয়ে  এসেছে। 
বুঝলাম বারান্দায় যে সুন্দরিকে দেখে এলাম সেই তার ভাগ্নি। অরুনকে বললাম, আগে ইন্টারভিউ হোক তারপর দেখা যাবে। 
ইন্টারভিউ হল। লিখিত পরিক্ষায় সামান্য প্রশ্নে ভাগ্নি ফেল করল। প্রশ্নোত্তর পত্র আমি হাতে নিয়ে নিলাম। মৌখিক পরিক্ষায় তাকে বেশি নাম্বার দিয়ে লিখিত পত্র লুকিয়ে আবার লিখতে দিলাম। না হয় চাকরি দেয়া যাবে না। আমি নীতিবান ব্যক্তি। দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করে আসছি! এ কি স্বজনপ্রীতি হলনা? দুর্নীতি হলনা? ক্ষমতার অপব্যবহার হলনা? মনের সাথে এক হতে পারছি না। আমি এ কি করলাম! এত বড় স্বজনপ্রীতি! মন বলছে না, স্বজনপ্রীতি করনি। যার জন্য করেছ সে ত তোমার স্বজন নয়। তাছাড়া সে যোগ্য ব্যক্তি, নিয়োগ পেতে পারে। 
তার মত আরও তো যোগ্য ব্যক্তি ছিল যারা ভুল করেনি। তাদের কেউ নিয়োগ পেতে পারে।
এমন এলোমেলো ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বাসায় ফিরেও মনটা স্থির হলনা। প্রবোদ দিতে পারছি না। এখন কি করব। আরও কয়েক জন প্রার্থি আছে যারা কোন ভুল করেনি। রাতে অরুন বাসায় এসে মাথাটা আরও গুলিয়ে দিল। অরুন তার বোনের পরিবারের একটা চিত্র তোলে ধরে বলল এবার তোর ইচেছ। পারলে কিছু কর। এর বেশি কিছু বলতে চাই না।
রাতে শুয়ে ঘুম আসছে না। মাথার মাঝে অরুন, তার বোনের পরিবার সর্বপোরি তার ভাগিনির চেহারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘুরে ঘুরে বিষাদে ছাওয়া সেই মুখটা ভেসে আসছে। মনের সাথে যুদ্ধ চলছে। আমি এতবড় অন্যায় কাজটা করব! ক্ষমতার অপব্যবহার করব! ওই সুন্দর চেহারার কাছে হেরে যাব!
মন: তারা কেউ পিতৃহারা হয়েছে বলে তো জানি না। তাছাড়া একটা অসহায় পরিবারকে সাহায্য করা ফরজ কাজ।
আমি: কয়টা পরিবারকে সাহায্য করবে? দেশে এখন অসহায় পরিবার কত? তাদের দায়িত্ব তুমি নিবে কি করে?
মন: অমন সুন্দর মুখে এমন বিষাদের ছাপ কোথাও দেখিনি।
আমি: বিষাদের ছাপ তুমি কি করবে?
মন: মুছে দিয়ে সে মুখে হাসি ফোটাব। চাকরিটা দিলে সেখানে হাসি ফুটবে। 
আমি: হাসি ফুটলে তোমার কি লাভ?
মন: আমি বোধ হয় এমন একটা মুখের খোজেই ছিলাম এতদিন। সে মুখে হাসি দেখতে চাই।
আমি: তাহলে প্রথম দেখাতেই তুমি দুর্বল হয়ে পড়েছ?
মন: হ্যা, দুর্বল হবার মতই সে মুখ খানি।
মনের জয়! পরদিন নিয়োগ দিলাম ভাগিনিকে। নাম বিন্দু।

-৫৬-

গোড়ান বাজারে সাবেদের রেষ্টুরেন্ট। এখানে ভাল চা হয়। প্রায়ই সেখানে চা খেতে যাই। দুএকজনের সাথে আড্ডা হয়। এই রেষ্টুরেন্টে একদিন বজলূ হক পরিচয় করিয়ে দিল একজন ভদ্রলোকের সাথে। তার আগে বজলুর একটু পরিচয় প্রয়োজন। লেখাপড়া জানে না। কোন কাজ নেই। বাজারে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। আগ বাড়িয়ে সবাইর সাথে কথা বলে। বাজারে রেশন দোকানের সামনে বেশিরভাগ সময় কাটায়। যখন তখন রেষ্টুরেন্টে দেখা মিলে। গোড়ানের কোথায় থাকে তা জানি না। আমার সাথে পরিচয় মানিকের মাধ্যমে। এই রেষ্টুরেন্টেই। বজলু যার সাথে পরিচয় করাল তার নাম রেজাউল হক। বজলু বলল, উনি  ফুড ডিপার্টমেন্টে আছেন। আমাকে পরিচয় করাবার সময় বজলু বলল, বঙ্গবন্ধুর নিজের লোক। গভর্নরও কিছু করতে পারে নাই, ইত্যাদি অনেক বানানো গল্প। তারপর থেকে যতবারই রেজাউলের সাথে দেখা হয়েছে ততবারই সে আমাকে কোন বিল পরিশোধ করার সুযোগ দেয় নাই। আগ বাড়িয়ে বিল দিয়েছে, যা খেতে চাইনি তাও সামনে এনে হাজির করেছে। আমি খেলে সে খুব খুশি হয়। দেখলাম ভদ্রলোক খুব অমায়িক। কথাবার্তা ব্যবহারে আমি আকৃষ্ট হয়ে গেলাম। দুজনের খুব ভাব হয়ে গেল।  
দেশে তখন হাহাকার। খাদ্য বস্ত্র ঔষধের আকাল। যাকে বলে দুর্ভিক্ষ। রেশনের উপর মানুষ নির্ভর করছে। যাদের রেশন কার্ড আছে তারা অন্তত না খেয়ে মরছে না। একটা রেশন কার্ডের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। যাদের কার্ডের প্রয়োজন, যাদের প্রাপ্য তারা পাচ্ছে না। চলছে ঘুষ বাণিজ্য। যারা ঘুষ দিতে পারছে তারাই পাচ্ছে রেশন কার্ড। একটার জায়গায় দশটা বিশটা। তখন একটা রেশন কার্ডের মূল্য কত হতে পারে আজকে কেউ চিন্তাও করতে পারবে না। রেশনে পাওয়া দশ পনের টাকার চাল ডাল বাজারে বিক্রি হত দেড় দু’শ। ধরা যাক মাসে একটা রেশন কার্ড থেকে পাঁচ ছয় শ টাকা। যার হাতে দশটা কার্ড আছে তার আয় কত? আর তখন দশ হাজার টাকা দিয়ে এক বিঘা জমি পাওয়া যেত এই শহর তলিতে আজ যার মূল্য কোটি টাকা। এমনও নেতা পাতি নেতা ছিল যাদের শত শত রেশন কার্ড ছিল। রেশন দোকানের সাথে তাদের একটা রফা ছিল। তাতে রেশন দোকানের মালিকও ভাগ পেত। যাদের একটা রেশন দোকান ছিল তারা বড়লোক। কোন কোন পাতি নেতার কয়েকটা রেশন দোকান ছিল। তারাই আজকে বাংলাদেশের ধনীদের একজন। আমার জানামতে শাহজাহানপুরের এক বন্ধুর রেশন দোকানের ওজনদার কাপাসিয়ায় নিজের বাড়ী যেত একা লঞ্চ ভাড়া করে। রেশন দোকানের মালিক বন্ধুটি বলছিল, আমার এলাকার লোক এই ওজনদার। তাকে সাহায্য করার জন্য এই কাজটা দিয়েছিলাম। এখন আমি দেশে গেলে মানুষ শুধু কাসেম সাহেবের নামই বলে। আমাকে কেউ কেউ বলে কাসেম সাহেব তো বিঘার পর বিঘা জমি কিনেছে। আপনারা কি করলেন? এখন শুনি লঞ্চ কিনবে। আর ভাড়া করে যেতে হবেনা। যাক রেজাউলের কথা বলছিলাম। এক সময় লক্ষ করলাম যখনই রেজাউলের সাথে দেখা হয় সে যেন কিছু বলতে চায়। বেশিরভাগ সময় রেষ্টুরেন্টেই দেখা হয়। বলতে গিয়েও কি যেন বলছে না। আমিও জিজ্ঞেস করিনি কিছু বলবে কি না। তারপর নিজের বেঁচে থাকার তাগিদে আস্তে আস্তে  সবেদের রেষ্টুরেন্টে যাওয়া কমে গেল, এক সময় গোড়ান ছেড়ে দিলাম। রেজাউল বা বজলুর সাথে দেখা হয় না। 
 একদিন ব্যাংকের কেশ ডিপার্টমেন্টে গেলাম কি একটা কাজে। আমরা হেড অফিসে। কেশ বিভাগে আমাদের যাবার প্রয়োজন পড়ে না। সেখানে যেতেই মাখন বলল, তোর জ্বালায় আর পারি না। তোর কতগুলি বন্ধু আছে রেশন দোকানদার? 
রেশন দোকানদার আমার বন্ধু?
হ্যা, তোর বন্ধ্।ু একটা না, ডজন খানেক তো হবেই। এই দেখ আজকেও তিনটা চালান নিয়ে এসেছে। বলে সে তিনটা চালানের কাগজ দেখাল। 
কি বলিস তুই? কিসের চালান? কার চালান?
রেশন দোকানের চালান। এই দেখ, একটা গোড়ান বাজারের ঠিকানা, আর দুটো শাহজাহানপুরের ঠিকানা। এরা তো এসে বলে তুই পাঠিয়েছিস। তাই লাইনে দাড়াতে হয় না। আমি করে দিই। 
চালান কথাটা একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। সরকারের ঘরে যত রকম টাকা জমা হয় তা একটা চালানের মাধ্যমে দিতে হয়। বিশেষ করে ফুড ডিপার্টমেন্টে যেসব টাকা জমা হয় তার বেশিরভাগই জমা দেয় রেশন দোকানদার। তারা ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে চালানের কপি ফুড ডিপার্টমেন্টে জমা দিলে রেশনের মালামাল পেয়ে যায়। আর তা করতে হয় প্রতি সপ্তাহে। এই চালান জমা দেবার জন্য লাইন দিতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে। লাইনে কয়েক হাজার মানুষ হয়। সকালে লাইনে দাড়ালে বিকেলে হয়ত লাইন আসে। না হয় পরের দিন আবার লাইন। এই লাইন নিয়ে তখন ব্যবসা চলছে। অনেকেই লাইনে দাড়িয়ে সারাদিন নষ্ট করতে চায় না। তাই একটা বেকার লোক নিয়োগ করে। সারাদিনের জন্য তাকে টাকা দেয়। তারও একটা রেট ছিল। সেই লাইন বাচাবার জন্য কারা এই কাজটা করছে ঠিক বুঝতে না পেরে মাখনকে জিজ্ঞেস করলাম, যারা আসে তাদের তুই চিনিস?
চিনবনা কেন? অনেক দিন থেকে প্রতি সপ্তাহে আসে। এই তো আগামী সপ্তাহে আসবে।
তুই এদের কারও নাম জানিস? 
একজন আসে তার নাম বজলু। 
এর পর আসলে পুলিশে দিয়ে দিবি।
তার মানে তুই চিনিস না? আবার আসুক, দেখাব মজা!
মাখন কোন মজা দেখিয়েছিল কিনা জানি না, কারন মাখন আর কোনদিন এ নিয়ে কথা বলেনি। আমার মনে হয়েছে মাখনের সাথে বজলুর ভাব হয়ে গিয়েছিল।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার পদোন্নতির জন্য কাজ চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ কাজগুলো মিনিষ্ট্রি অব ফাইনেন্সের অনুমোদন লাগে। আমার পদোন্নতির ফাইল গেল মিনিষ্টি অব ফাইনেন্সে। ফাইলটা পৌছার পর ফাইল নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং চলল। আমার অতীত বর্তমান সবকিছুর তালিকা হল। 
ফাইনেন্স সেক্রেটারি তখন ছিলেন কফিলউদ্দিন মাহমুদ। তিনি নুরুল মতিনের দূর সম্পর্কের আতœীয় এবং একই জেলার মানুষ। কফিলউদ্দিন মাহমুদ তখন নুরুল মতিনের ফাইল নিয়েও কাজ করছে। কিছুদিনের মাঝে নুরুল মতিনের সাসপেনশন তোলে নেয়া হল এবং তাকে ব্যাংকিং ট্রেনিং সেন্টারে পোষ্টিং দেয়া হল। তাতে তার পদাবনতি হল। চাকরি বাচিয়ে রাখার জন্য তিনিও তা মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লেন। তাঁর অধস্তন কর্মচারির অধিনে অনেক দিন কাজ করার পর, অবনতির শেষ ধাপে পৌছে নিজকে আর সামাল দিতে পারেননি। ১৯৮৭ সালে তিনি আতœহত্যা করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মচারির বেতন ছিল সবচেয়ে বেশি। যোগ্যতার মাপকাঠিও ছিল বেশি। চাকরির সুযোগ সুবিধা ছিল অনেক। তখন কে ভেবেছিল পেস্কেল হয়ে যাবে তেলে পানিতে একাকার। 
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পদোন্নতির নিয়ম ছিল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একটা পদোন্নতি। আমি তখন ব্যাংকে সিনিওরিটি হিসেবে পদোন্নতির প্রথম সারিতে। সিনিওর হিসেবে আমার পদোন্নতি হবার পর যদি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পদোন্নতি হয় তাহলেই আমার কিছু প্রাপ্তি হয়। মিনিষ্ট্রি অব ফাইনেন্স এই সুযোগটা ব্যবহার করল। অবশ্য তার সাথে ব্যাংকে নুরুল মতিনের কিছু প্রেতাতœাও মনে প্রানে কাজ করে সিনিওরিটির প্রমোশনের আগেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমোশন দিয়ে দিল। ফলে পরবর্তি প্রমোশনের জন্য সিনিওরিটি লিষ্টে আমি এখন সর্বকণিষ্ঠ। তার মানে পরবর্তি প্রমোশন কয়েক বছর লাগবে। দেখা গেল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার এই প্রমোশন হল ঠিকই, কিন্তু কোন কাজেই লাগল না। এদিকে বিসিএস পরীক্ষার তারিখও শেষ হয়ে গেল। পরবর্তি বিসিএসএর জন্য আমার বয়স পেরিয়ে যাবে। এখন উপায়! মনটা বিষিয়ে গেল। কাজ করার উৎসাহ হারিয়ে গেল। দিন রাত ভাবতে লাগলাম এখন কি করব! বিন্দুর চাকরি এক বছর পেরিয়ে গেছে। এই এক বছর তার গতিবিধি চাল চলন সব পরিক্ষা করেছি। অফিসে কাজের ফাকে দুএকবার কৌতুক বলেছি। কোনভাবেই বিন্দুর মুখে এক বিন্দু হাসি ফোটাতে পারিনি। ভাবলাম তার মনে অন্য কোন কষ্ট যা আমি বুঝতে পারি না। কিন্তু আমাকে জানতে হবে কি সেই কারন। জানতে হলে তাদের বাসায় যেতে হবে। একদিন তার বাসায় গেলাম।
তার অনেকগুলো ভাইবোন। পরিবারের জেষ্ঠ সন্তান বিন্দু। একমাত্র উপার্জনক্ষম। তাকে যে বেতন দেয়া হয় তাতে এই পরিবারের কয়দিন চলবে কে জানে। কিন্তু বেতন বাড়ানোর ক্ষমতা আমার হাতে নেই। তাহলে বোর্ড মিটিং ডাকতে হবে। অনুমোদন নিতে হবে। অনেক ঝামেলা।
অফিসে বিন্দুকে দেখলেই নাজমার কথা মনে পড়ে যায়। মনে মনে একটা তুলনা করি। নাজমা এখন মৃত কি জীবিত কিছুই জানি না। তারপরও ভুলতে পারিনা।
নাজমা এখন কল্পনায় আর বিন্দু বাস্তবে। বা¯তবকে নিয়েই জীবন। এই বাস্তব  নিয়ে আমি ভাবনায় পড়ে গেছি। বিন্দুর কি হবে! তার এই বেতনে সংসার চলেনা। কি করা যায়! ভাবতে ভাবতে আরও একটা বছর কেটে গেল।
একদিন মাকে বললাম, মা তোমার আশা পূরন হচ্ছে। বউ খুজে পেয়েছি।
শুনে মা খুব খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় বাবা? কে দিল খবর?
কেউ খবর দেয়নি, নিজেই খুজে বের করেছি। তুমি চিন। একদিন আপ্যায়নও করেছ। তুমি বলেছিলে তাদেরকে সাহায্য করতে। তাই স্থির করেছি সাহায্য করব। বিন্দুকে বিয়ে করব।
শুনে মায়ের মুখটা বেজার হয়ে গেল। বিন্দুকে বিয়ে করবে? তাদের তো কিচ্ছু নেই। কিছুই দিতে পারবে না। এত সব সম্মন্দ বাদ দিয়ে এখানে কেন?
মা, তুমি তো বউ চেয়েছিলে, আর কিছু নয়। কিছু দিতে পারার কথা আসছে কেন? আর গরীবের মেয়েদের কি বিয়ে হয় না?
নুরপুরের প্রস্তাব বাদ দিলে কেন? বউ তো খুব সুন্দর সুশ্রী। টাকা পয়সা জমি জমা কত কিছু দিতে প্রস্তুত ছিল। এখন ও তো আছে। তুমি একবার হা বললেই হয়। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। 
না মা, আমি তো বউ বিয়ে করব, টাকা পয়সা ধন দৌলত নয়। ধন দৌলত নিয়ে বিয়ে করলে সারা জীবন ছোট হয়ে থাকতে হয়। যাদের লাজ লজ্বা নেই তারাই শুধু টাকা পয়সা পেয়ে বিয়ে করে। আমি তা করব না। কারও কোন কথার নীচে থাকতে চাই না। কোন কিছু পাবার বিনিময়ে আমি বিয়ে করব না।
সবাই তো তা করে। আমাদের গ্রামের দু একজনের নাম বলে উদাহরন দিয়ে বললেন তুমি তাদের চেয়ে কম কিসে? তারা এত কিছু পেয়েছে, তুমি পাবে না কেন? বউ আসবে, তার সাথে সোনাদানা টাকা পয়সা আসবে। এমন একটা গরীব পরিবার, সারা জীবন তাদের টানতে হবে। এমন ঘরে তোমার বিয়ের মতামত দিতে পারি না। আমাদের কথা না শুনলে তোমার যা ইচ্ছা তাই কর। আমাদেরকে গ্রামের বাড়ী পাঠিয়ে দাও। এখানে আর থাকব না। 
অনেক যুক্তি দিয়েও মাকে বশে আনতে ব্যর্থ হলাম। আমার সেকেলের মা, যা নিজে বুঝে তাই ঠিক। আর মা যা বলে বাবা তাতেই সায় দেন। মার ইচ্ছে টাকা পয়সা সোনাদানা আসবে আর মা দু হাতে বিলাবে। বিশেষ করে তার নুরু মানুকে ধনী করতে হবে। তাদের চলার মত আর কোন উপায় নেই। এই সুযোগ, কাজে লাগাতে হবে। প্রতিবাদে প্রথমত খাওয়া বন্ধ করে দিলেন, তারপর আমার সাথে কথা বন্ধ। কোন কিছুতেই আমার পরিবর্তন না হওয়ায় পরের সপ্তাহে গ্রামের বাড়ি চলে গেলেন। ধমকের সুরে বলে গেলেন আমার মাসের টাকা যেন ঠিক সময়ে পৌছে।
খবরটা রটে গেছে। আমি মাবাবার অমতে বিয়ে করতে যাচ্ছি বলে মা গ্রামে চলে গেছে। শুধু তাই নয় আমার মাথার ঠিক নেই, এত এত টাকা পয়সা ধন সম্পদ পায়ে ঠেলে একটা গরীব পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছি। সেই মেয়ে আমার মাথাটা খারাপ করে দিয়েছে। আমি কারও কোন কথা শুনছি না।  তাবিজ করে আমার মাথাটা খারাপ করে দিয়েছে। এই মেয়ের নাম শুনলেই আমি পাগল হয়ে যাই, যা ইচ্ছে তাই করি। যা ইচ্ছে তাই বলি। আমার কাছে আর কোন আশা করা যায় না। আমার দ্বারা আর কিছু হবে না।
ব্যাপারটা পরিক্ষা করার জন্য দুএকজন গন্যমান্য আতœীয় বাসায় এলেন। অনেক যুক্তি দিয়ে আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। আকর্ষনিয় আরও কয়েকটা প্রস্তাব দিলেন।  ব্যর্থ হয়ে তারা ফিরে গিয়ে এলান করে দিলেন ঘটনা সত্য। আমার মাথা নষ্ট। শুধু তাই নয় তিলকে তাল করে গল্প তৈরি হল। সে সব গল্প খুব সুখকর নয়।
আমার আতœীয়স্বজন কেউ আর আসেনা। আমি পাগল, কারও কথা রাখিনা। আমার যা ইচ্ছা তাই করি। আমার ধারে কাছে আসার দরকার নেই। মা চিঠি লিখে পাঠালেন মাসের টাকা দ্বিগুন করে পাঠাতে হবে। এ টাকায় চলছে না।
আমি ভাবতে লাগলাম বিয়ে করব আমি, বউ হবে আমার, যৌতুক পেলে পাব আমি, আমার মা বাপ ভাইবোন আতœীয়স্বজনের তাতে কি লাভ? আমার মাথা খারাপ, এর উত্তর খুজে পাইনি। 
একদিন বিন্দুর মাকে বললাম আমরা বিয়ে করব। বিন্দুর মা আগেই প্রস্তুত ছিলেন এমন একটা কথার জন্য। তিনি বললেন, তোমার মা বাবাকে একবার আসতে বল। আমি বললাম, না তারা আসবে না। তিনি বললেন তাহলে তো আমি একটা দুর্নামে পড়ে যাব। এভাবে কাজটা সুন্দর হয় না। তা হলে আমি তোমাদের মাঝে থাকব না। তোমরা যা ভাল মনে কর তাই কর। আমাকে এর মাঝে না টানলেই ভাল। 
কাউকে টানিনি। একদিন বকুলের মালা দিয়ে বিন্দুকে আমার ঘরে নিয়ে এলাম। মায়ের কাছে খবর পাঠালাম, আমরা বিয়ে করেছি। কোন উত্তর আসেনি। বিন্দুকে নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য বাড়ি গেলাম। 
আমার সেই বাড়ি যেখানে আমি যাওয়ার সাথে সাথে একটা হৈ চৈ পড়ে যায়, মা ভাই বোন এসে জড়িয়ে ধরে, আমার কুশলাদি জানার জন্য সকলে অধির হয়ে পড়ে। আজ এখানে কোন সাড়া শব্দ নেই। যে যেমন ছিল তেমনি আছে, আমি এসেছি, আমার সাথে নতুন একজন মানুষ এসেছে তাতে কারো কিছু যায় আসে না। যেন তারা জানত বিন্দু আসবে। আর আসলে কিছু নিয়ে আসবে না। বাড়ি গেলে আমার খাওয়া দাওয়া নিয়ে মায়ের কি ছুটাছুটি! এটা খাও, ওটা আর একটু নাও, এটা খেতে হবে এমনি কত অনুযোগ! এখন আমার খাওয়া নিয়ে মায়ের কোন অনুযোগ নেই। সামনে যা আছে তা খেয়ে নাও। এক সপ্তাহে অনেক কিছু দেখলাম। অনেক কানাঘুষা শুনলাম। বিন্দু মন্ত্র জানে, তাবিজের জোড়ে আমাকে বশ করে ফেলেছে। আমি এখন বিন্দু ছাড়া আর কিছু বুঝি না। এমন কি বাড়ির ছোট ছোট ছেলে মেয়েরাও এসব বলাবলি করে।

-৫৭-
রাজা ছিলাম। বিয়ের পর রাজত্ব হারিয়ে আমি এখন দুই রাজ্যের প্রজা। এক রাজ্যের অধিষ্ঠাত্রি আমার জন্মদাত্রী মা, অন্য রাজ্যের রানী আমার অর্ধাঙ্গিনী বিন্দু। দুই রাজ্যে দুটি ভুখা মিছিল। মা জননী যখন তখন আদেশ করেন। নুরুর মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, দশ হাজার পাঠাও। মানুর জন্য একটা দোকান রাখতে হবে বিশ হাজার দিতে হবে। সকলে এখন মায়ের পরামর্শদাতা। তাদের প্রয়োজন মায়ের মাধ্যমে পেশ করা। আদেশের ভাষায় মনে হয় আমি বিরাট অন্যায় করে ফেলেছি তার মাশুল দিতে হবে। আমার বেতন কত তা জানার প্রয়োজন নেই। কারন আমি সব টাকা এখন বিন্দু এবং তার পরিবারের নীচে খরচ করি। বিন্দুর পরিবারের জন্য যাতে কোন খরচ করতে না পারি তার জন্যই এই আদেশ। আমার হাত খালি রাখতে পারলেই বিন্দু কিছু পাবে না। প্রতি মাসে নতুন নতুন দাবী। যৌতুক নিয়ে বিয়ে করলে তাদের এতসব জিনিষ প্রাপ্য ছিল। এখন আমার কাছে থেকে আদায় করতে হবে। অন্যদিকে বিন্দু নীরব। তার কোন দাবী নেই। কিন্তু তার না-বলা দাবী বড় পীড়াদায়ক। আমি এখন কোন কুল রাখি! আমাকে দুকুলই রাখতে হবে। অথচ বেতন আমি যা পাই তা দিয়ে দুকুল রক্ষা করা সম্ভব নয়। মায়ের ভুখা মিছিল প্রাকৃতিক নিয়মে দিন দিন বাড়ছে। এখন উপায়! আমাকে আরও উন্নতি করতে হবে। কিভাবে, কোথায় সে উন্নতি! কত উন্নতি করলে দুকুল রক্ষা হবে! কোন কুল কিনারা দেখছি না!
আমি আরও উন্নতি চাই, আরও টাকা চাই। টাকা পাওয়ার অনেক পথ খোলা আছে আমার হাতে। আমি বাংলাদেশ ব্যাংক মুক্তিযোদ্ধা কল্যান সমিতির প্রেসিডেন্ট, ভোগ্যপন্য সমবায় সমিতির জেনারেল সেক্রেটারি। আমার হাত দিয়ে কত লক্ষ  টাকার আদান প্রদান হচ্ছে। আমার একটা সই লক্ষ লক্ষ টাকা এনে দেয়। আমি ইচ্ছে করলে কি না করতে পারি। চারদিকে কত রকম পারমিটের খেলা চলছে। গেলেই হল। মনে প্রশ্ন আসে, কেন? এই টাকা তো সতপথে রোজগার নয়। এ আমার পাওনা নয়। আমার পাওনা থাকলে হাতে আসবে।
কিন্তু বাংলাদেশে তা হয় না। পাওনাও না চাইলে হাতে আসে না। হাতের কাছে যা আছে তাও না। ধরে আনতে হয়। তার প্রমান আমার একমাত্র সন্তান ছয় মাসের দুধের শিশুর দুধ নিয়ে।
লন্ডন থেকে ন্যায্যমূল্যের একটা কনসাইনমেন্ট এসেছে ঢাকা ডিসির কাছে। তাতে আছে বাচ্চাদের গরম কাপড়, গুড়ো দুধ, বড়দের জন্য সার্ট, পেন্ট, চাদর ইত্যাদি অনেক মূল্যবান বস্তুু। নিয়ম অনুযায়ী ডিসি এই  কনসাইনমেন্ট হস্তান্তর করবেন বাংলাদেশ সরকারের ন্যয্যমূল্য বিতরন কেন্দ্রে। ডিসির পিএ আমার বন্ধু। তার মাধ্যমে এই কনসাইনমেন্ট আমি নিয়ে আসি আমাদের সমিতির জন্য। নামমাত্র মূল্যে এইসব জিনিষ সদস্যদের মাঝে বিতরন করা হয়। যেদিন আড়াই হাজার দুধের কৌটো বিতরন করা হল সেদিন বিন্দু সারাদিন আশায় বসে রইল আমি আজ বাচ্চার জন্য দুধ নিয়ে আসব। সন্ধ্য্য়া আমি ফিরলাম খালি হাতে। আমার হাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, দুধ কই?
বললাম, আনি নাই।
কেন? এ পাড়ায় অনেকেই তো দুধ পেয়েছে। কেউ কেউ সকালেই নিয়ে এসেছে। যারা ব্যাংকে চাকরি করে না তারাও পেয়েছে শুনলাম। তুমি আন নাই কেন?
আমার হাতে তো কেউ তোলে দেয়নি। আর আমি নিজে আনতে গেলে কথা হবে। তাই।
তোমার ভাগে তো একটা ছিল? সেটা কই? আমি সারাদিন বাচ্চাকে কিছুই দেই নাই, দুধ আনবে এই আশায়! এখন কি দিব?
আমি চুপ করে রইলাম। 
তারপর কাজের ছেলেটাকে দোকানে পাঠাল সুজি আনতে। সুজি জাল দিতে গিয়ে দেখে তাতে পোকা। তারপর বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে চুপ করে বসে রইল। তার চোখ ভিজে গিয়েছিল কিনা জানি না। এক সপ্তাহ আমার সাথে কথা বলেনি।
বাজারে শিশু খাদ্য উদাও। যা আছে তা স্বর্নের দামে বিক্রি হয়। পরে শুনলাম এই দুধ নিয়ে অনেকে ব্যবসা করেছে। যাদের বাচ্চা নেই তারাও দুধ নিয়েছে এবং চড়া দামে বিক্রি করেছে। তারই কিছু আমাদের পাড়াতেও এসেছে।

-৫৮-

১৯৭৬ সালে আবার ব্যাংকে ঝামেলা হল। উত্তেজিত কর্মচারিরা গভর্নর নাজির উদ্দিনকে অপদস্থ করে বের করে দিল। মামলা হল ২৭ জনের বিরুদ্ধে। দেখা গেল আমার নামটা প্রথম। অথচ আমি সেদিন অফিসেই ছিলাম না। খোজ খবর নিয়ে জানলাম নুরুল মতিনের প্রেতাত্বার কাজ। আমাকে ফাসাতেই হবে। তাই এখানে আমার নামটা প্রথম। মামলা স্থানান্তরিত করা হল মার্শাল ল কোর্টে। জিয়াউর রহমানের মার্শাল ল কোর্টে স্থানান্তরিত করার উদ্দেশ্য হল মুক্তিযোদ্ধার শাস্তি অবধারিত। কোর্টে আতœসমর্পন করার পর জামিন দেয়া হয়নি। মামলা চলল তিন মাস। শেষ পর্যন্ত রায় হল “সসম্মানে বেকসুর খালাস”।
প্রতি পাড়ায়/মহল্লায় দুএকজন সাধারন মানুষের ঘরে স্বাধীনতার স্বাদ এমন ভাবে পৌছে গেল যা মানুষকে অধ:পাতের দিকে ঠেলে দিল। তারা রাতারাতি ব্যবসা, বাড়ী গাড়ীর মালিক হয়ে গেল। অথচ দুদিন আগেও যারা ছিল অতি সাধারন বা তারও নীচে। রাতারাতি তাদের চালচলন বদলে গেল। তা দেখে সাধারন মানুষের মনে হিংসার উদ্রেগ হল। স্বাধীনতার ভাগ পেতে সবাই মরিয়া হয়ে উঠল। স্বাধীনতার ভাগ চাই! নৈতিকতার কোন বালাই নেই। ভাগ চাই। সবাই সুযোগের সন্ধানে আছে। নেতা পাতিনেতা আর চামচারা উঠে গেল উপরের কাতারে। গ্যাড়াকলে আটকা পড়ল মধ্যবিত্ত শ্রেনী। তারা না পারল উপরের কাতারে উঠতে না পারল নীচে নামতে। ১৯৭৪ সালে দুর্ভীক্ষ প্রকট আকার ধারন করলে মধ্যবিত্তরা অতিষ্ট হয়ে পড়ে। দায়ী করে আওয়ামিলীগ সরকারকে। আওয়ামীলীগের উপর মানুষের ঘৃণা এসে যায়। সবাই চায় নতুন কোন রাজনৈতিক দল যারা সকলের জন্য কিছু করবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অস্ত্র হাতে যে  দলের সৃষ্টি হল তারাও আর একবার দেশটাকে লুট করল। জিয়াউর রহমার তার দলকে তুষ্ট করার জন্য ব্যবসা বানিজ্য ভাগ করে দিল তার আর্মির হাতে। রিটায়ারড আর্মিদের এমন সব জায়গায় বসিযে দিল যেখানে শুধু ঘুষ বানিজ্য চলে। বেশিরভাগ ব্যবসা চলে গেল  রিটায়ারড আর্মির হাতে। রাজাকার পূনর্বাসন করে দেশটাকে আর একবার অবনতির শেষ ধাপে পৌছে দিল। এই সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধা নীতি বিসর্জন দিয়ে যোগ দিল জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দলে বিশেষ সুযোগ সুবিধা পেয়ে। 
আতœীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সকলের বাক্যবান আর সহ্য হয়না। আগে থেকেই এসব প্রশ্ন শুনতে শুনতে কানে তালা দিয়েছি।  সকলের একই প্রশ্ন , ওমক এত কিছু করে ফেলল, তুমি কি করলে? অমুক নেতার কাছে গেলেই তো তুমি অনেক কিছু করতে পার, যাচ্ছনা কেন? আগে নিজের জন্য কিছু কর তারপর সততা। নতুন করে এইসব শুনতে শুনতে আরও হতাশ হয়ে গেলাম। কোন কোন পরিচিত মানুষকে দেখে আমার নিজেরও খুব খারাপ লাগে। কতভাবে তারা স্বাধীনতা ভোগ করছে। অথচ তাদের ইতিহাস আমি জানি। নিজকে মনে হল আমি কত অসহায়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম ব্যাংক ছেড়ে দেব।
ব্যাংক ছেড়ে যাব কোথায়! বিদেশ! কিন্তু টাকা কোথা পাব! কোন্ দেশে যাব! তিনটা দেশের কথা মনে মনে আওড়ালাম। আমেরিকা, লন্ডন অথবা মধ্যপ্রাচ্য। তখন পেট্্েরারিয়ালের যুগ। বাঙালিরা বেশিরভাগই সেদিকে ছুটছে। সেখানে যাওয়াটা তখন অনেকটা সহজ।
বাংলাদেশে তখনও সৌদি আরবের কোন দূতাবাস নেই। ভিসা পেতে হলে অন্য দেশে যেতে হবে।  হয়ত পাকিস্তান নয়ত ইন্ডিয়া অথবা ধারে কাছে অন্য কোন দেশে।
ব্যাংকের ডিপুটি গভর্নর জনাব আলী কবীর সাহেব আমাকে খুব স্নেহ করেন। একদিন তিনি বললেন, তুমি ব্যাংক ছেড়ে দাও। অন্য কোথাও চাকরি দেখ অথবা বিদেশ চলে যাও। আমি তোমাকে সাহায্য করব।
বললাম, আমি নিজেও একথাই ভাবছি। বিদেশ যেতে হলে টাকার প্রয়োজন। আমার এমন টাকা নেই যে বিদেশ যাব। 
কত টাকা লাগে বিদেশ যেতে?
ভাবছি সৌদি আরব যাব। সেখানে গেলে হাজার দশেক টাকা হলেই চলে।
তুমি চেষ্টা করলেই এই টাকার ব্যবস্থা করতে পার। ব্যবস্থা না হলে আমার কাছে এসো।
আমি কি চেষ্টা করব! ভাবলাম ভাগিনা মিন্টুর কথা। তার এক কাকা আছে রুপালী ব্যাংকে। অনেক ক্ষমতাবান।
একদিন মিন্টুর সাথে আলাপ করলাম। মিন্টু খুব খুশিমনে বলল, এখনই আমি কাকার কাছে যাব। আপনার জন্য কিছু করতে পারলে নিজকে আমি ধন্য মনে করব। 
মিন্টু রাতেই ফিরল। এসে বলল, ব্যবস্থা হবে। তবে একটা কাজ করতে হবে। সেটা হল, আপনার একটা জায়গা আছে। তার দলিলটা জমা রাখতে হবে। তার বদলেই আপনি টাকা পেয়ে যাবেন।
টাকার চিন্তা করতে করতে কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। এত সহজে ব্যবস্থা হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। খুশিতে মনে মনে আকাশে উড়তে লাগলাম। দলিল জমা দিয়ে এক সপ্তাহের মাঝে টাকা হাতে পেয়ে গেলাম।

-৫৯-

দিল্লী যাব। থাই এয়াওয়েজে টিকেট কিনে ফেললাম। ৩রা মার্চ ১৯৭৭ তারিখের জন্য। আর মাত্র এক দিন হাতে আছে। টুকটাক সব কাজ শেষ করতে হবে। একবার ইচ্ছে হল লতিফ ভাইর সাথে দেখা করে যাই। অন্তত তাঁকে বলে যাই আমার অবস্থা এবং কেন দেশটা ছেড়ে যাচ্ছি। এই ভেবে একদিন তাঁর অফিসে গেলাম। তিনি তখন অনেক বড় পদে আসীন। আমাকে দেখেই বললেন, বস। অনেকেই আসে, কিন্তু তোমাকে দেখলাম না। এখন তো সব পারমিট বন্ধ হয়ে গেছে।
মনের ভেতর একটা ঝাকুনি অনুভব করলাম। এটা কি রাগ দু:খ ব্যাথা না আঘাত সেটা বুঝতে পারলাম না। আমি এসেছি উনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করতে, আর শুনতে হল পারমিট দেয়া বন্ধ হয়ে গেছে! তাহলে উনার কাছে যারাই এসেছে পারমিটের জন্যই এসেছে! আমি যদি পারমিটের জন্য এসেও থাকি তাহলে বাহাত্তর থেকে সাতাত্তর এই পাঁচ বছরে আসিনি কেন? তিনি চায়ের অর্ডার দিলেন। বললাম, না চা আমি খাইনা, আর পারমিটের জন্য আমি আসিনি। আপনার সাথে অনেক দিন দেখা হয়না, খুব ইচ্ছে করছিল আপনার সাথে দেখা করি, তাই এসেছি। আপনার ভাই রঙ্গু এখন কোথায়? কি করে?
আমি জানি রঙ্গু এখন দামী গাড়ী, পোষাক পড়া ড্রাইভার নিয়ে চলে। একদিন ব্যাংকে দেখা হয়েছিল। এসেছিল বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনে। বলছিল কি সব বড় বড় ব্যবসা করে। কয়েক দিন পর পরই বিদেশে যায় ইত্যাদি। এই রঙ্গু আগরতলায় হোটেলে থেকে রাজনৈতিক মর্যাদা নিয়ে দিন কাটিয়েছে। 
লতিফ ভাই বললেন রঙ্গু তো এখন ব্যবসা করে। তোমার চাকরি কেমন চলছে? 
ভাল। আচ্ছা চলি, আবার আসব বলে চলে এলাম। যা বলতে গিয়েছিলাম তা আর বলা হলনা।
ভারাক্রান্ত মনে লতিফ ভাইর অফিস থেকে বের হয়ে রিক্সার জন্য দাড়িয়ে আছি। একটা গাড়ী এসে থামল পাশে। বের হয়ে এল রেজাউল। সেই ফুড ডিপার্টমেন্টের রেজাউল। কেমন আছেন বাহার ভাই?  কোথায় যাবেন? চলুন আপনাকে পৌছে দিব বলে দরজা খুলে দাড়িয়ে রইল।
আমি অনেকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকিয়ে রইলাম। রেজাউলের বেশভূষা সব বদলে গেছে। পরনে দামি সুট। গাড়ী-ড্রাইভার। আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রেজাউল আবার বলল, উঠুন! প্লিজ! আমি যন্ত্রচালিতের মত গাড়ীতে উঠলাম। একথা সে কথার পর জানলাম রেজাউল চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করে। পার্টনার একজন নেতা। যখন বললাম, কাল আমি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি তখন রেজাউল যেন আৎকে উঠল। আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, দেশ স্বাধীন করে দেশ ছেড়ে চলে যাবেন! কি কারনে  যাবেন?
বললাম, এদেশে আর চলতে পারছি না। 
আমরা গাড়ীর পেছনে পাশাপাশি বসেছিলাম। রেজাউল সামনের দিকে তার মুখটা সোজাসুজি এনে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, বলেন কী! আমি যে আপনাকে তিরিশটা রেশন কার্ড দিলাম সেগুলো কোথায়? এখন দেশে দশটা রেশন কার্ড থাকলেই তো বড়লোক। আপনি পাননি সেগুলি? আশ্চর্য! তাহলে বজলু মেরে দিয়েছে! তাইত!
বললাম, আপনি আমার জন্য কিছু করেছিলেন। তার জন্য অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমি জানলেও নিতাম কিনা ভেবে দেখার বিষয়। কারন আমি কারও দয়া বা সাহায্য এখনও নেইনি। যাক এখন আর ওসব কথা বলে লাভ নেই। আমার বাসার সামনে আসতেই বললাম এখানেই নামব। গাড়ী থামতেই তাড়াতাড়ি রেজাউলও নেমে পড়ল গাড়ী থেকে। দরজা খুলে দাড়িয়ে হাতে হাত মিলিয়ে বলল, তাহলে আপনার সাথে আর দেখা হবে না! 
বেঁচে থাকলে দেখা হতেও পারে বলে আমি বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে দেখলাম রেজাউল তেমনি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কি ভাবছে সে!  হয়ত ভাবছে আমি একটা অপদার্থ! বোকা!  পরাজিত সৈনিক! নাকি পলাতক!
আমি ভাবছি আমাকে আরও উন্নতি করতে হবে, সৎপথে । কোথায় সে পথ! প্রয়োজনে যেতে হবে দূরে, বহদুরে - দিগন্তের শেষ প্রান্তে। 

উপন্যাস

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে