Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২০ , ২৫ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.7/5 (16 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-০৬-২০১৫

আইএসের নেতৃত্বে সাদ্দামের জেনারেলরা!

আইএসের নেতৃত্বে সাদ্দামের জেনারেলরা!

দামাস্কাস, ০৬ এপ্রিল- ইরাক ভিত্তিক ইসলামি জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর বেশিরভাগ সামরিক নেতা সাদ্দাম হোসেন আমলের ইরাকি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। দ্য হাফিংটন পোস্ট এর এক প্রতিবেদককে এমনটাই জানিয়েছেন জঙ্গি সংগঠনটি থেকে বেরিয়ে আসা সিরিয়ার এক সাবেক বিদ্রোহী আবু হামজা। তিনি জানান আইএস এর উৎকাল্পনিক ইসলামি সমাজ (ইসলামিক ইউটোপিয়া) বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বুঝতে পেরেই তিনি এ থেকে বেরিয়ে আসেন। অথচ এই ইউটোপিয়ার মোহই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার জিহাদিকে আইএস এ যোগদানে প্রেরণা যুগিয়েছে।

আবু হামজা জানান আইএস এ যোগ দেয়ার পর এক ইরাকি আমিরের অধীনে ছিলেন তিনি। আর সিরিয়ার যুদ্ধের ময়দানে ছদ্মবেশে প্রবেশকারী ইরাকিরা তাকে বিভিন্ন আদেশ সরবরাহ করতো। বিষয়টি নিয়ে তার সন্দেহ জাগলে গত বছর আইএস এর একটি বৈঠকে তিনি ভিন্ন মত পোষণ করেন। এতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের আদেশ দেন বৈঠকে বসে থাকা এক ইরাকি মুখোশধারী। ওই মুখোশধারী প্রতিটি বৈঠকেই উপস্থিত থাকতো। সে প্রতিটি বৈঠক মনোযোগ দিয়ে শুনতো এবং নোট টুকে নিতো।

সিরিয়ায় আইএস এর দখলকৃত একটি কমিউনিটির শাসকের দায়িত্বে থাকা আবু হামজা জানান, তিনি কখনোই ইরাকিদের পরিচয় জানতে পারেন নি। এদের সকলেই সাদ্দাম আমলের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন বলে জানান আবু হামজা। আর প্রতিটি বৈঠকে মুখোশপরে বসে থাকা ওই ইরাকি সাদ্দাম আমলের সরকারি গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি বর্তমানে আইএসআইএস এর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করছেন। তার এই বিবরণ থেকেই এটা স্পষ্ট হয় যে, সাদ্দামের সেক্যুলার বাথপন্থী সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা আইএস নামক ইরাক ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনটির মূল সামরিক খুঁটি হিসেবে কাজ করছে!

আইএস এর প্রায় সব নেতাই সাবেক ইরাকি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। সংগঠনটির গোপন সামরিক ও নিরাপত্তা কমিটিগুলোর সদস্য এবং নেতৃস্থানীয় আমির ও প্রিন্সদের বেশিরভাগই সাদ্দামের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। স্থানীয় ইরাকি, সিরিয়ান ও আইএস নিয়ে গবেষণাকারী বিশ্লেষকদেরও একই মত। তারাই সংগঠনটির সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলেছে। পাশাপাশি তারা সংগঠনটিতে সেক্যুলার বাথ পার্টির কিছু এজেন্ডাও ঢুকিয়ে দিয়েছে।

আবু হামজা আরো জানান, আইএস এ যোগদানকারী সিরিয়ার স্থানীয় আমিরদের প্রত্যেকেই একজন ইরাকি প্রতিনিধির অধীনে থাকেন। আর ওই ইরাকি প্রতিনিধিই মূল সিদ্ধান্তগুলো নেন।

উল্লেখ্য, উৎকাল্পনিক ইসলামি সমাজের (ইসলামিক ইউটোপিয়া) মোহ ভঙ্গের পর গত বছরের গৃষ্মেই আবু হামজা তুরস্কে পালিয়ে যান। এবং বর্তমানে সেখানেই ছদ্মনামে (আবু হামজা) বসবাস করছেন।

আবু হামজা বলেন, ‘আইএস এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সকলেই ইরাকি নাগরিক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা। তারা শুধু আদেশ, কৌশল নির্ধারণ ও যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরিতে কাজ করে। কিন্তু তারা কখোনোই নিজেরা যুদ্ধ ময়দানে নামে না। বরং বিদেশি জিহাদিদেরকে সামনে রেখে পেছন থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন তারা!’

দুবাই ভিত্তিক গবেষক এবং ‘আইএসআইএস: ইনসাইড দ্য আর্মি অফ টেরর’ বইয়ের সহ-লেখক হাসান হাসান বলেন, ‘সাদ্দাম হোসেনের বাথপন্থী সরকারের নির্মম নিষ্ঠুরতা, ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পর পুরোনো সেনাবাহিনী ভেঙ্গে দেয়া, এরপরের সুন্নী বিদ্রোহ এবং পরবর্তী শিয়া অধ্যুষিত পুতুল সরকার কর্তৃক সুন্নীদের উপর নীপিড়ন এই সবগুলো বিষয়ই আইএসএর দ্রুত উত্থানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।’

হাসান বলেন, ‘অনেকেই আইএসকে শুধুমাত্র একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেই দেখে থাকেন। কিন্তু এটা ঠিক নয়। আইএস শুধুই একটি সন্ত্রাসী সংগঠন নয়। এটি বরং স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা একটি ইরাকি বিদ্রোহ।’

২০০৩ সালে ইরাকের মার্কিন শাসক লে. পল ব্রেমার সাদ্দাম আমলের বাথপন্থীদেরকে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সকল দায়িত্ব থেকে বিতাড়নের জন্য একটি আইন প্রনয়ন করেন। প্রথম দফায়ই সাদ্দামের পরাজিত সেনাবাহিনীর ৪ লাখ সেনাকে সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় এমনকি তাদেরকে পেনশন থেকেও বঞ্চিত করা হয়। কিন্তু তাদের হাতে থাকা অস্ত্র কেড়ে নিতে পারেনি মার্কিনিরা। এরপরই মূলত সাদ্দামের সেনা কর্মকর্তাদের একটি বিশাল অংশ আল কায়েদার ইরাকি শাখায় যোগ দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির সিনিয়র গবেষক কর্নেল জোয়েল রেবার্ন, যিনি ইরাকে শীর্ষ মার্কিন জেনারেলদের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন, তিনি বলেন, ‘চাকরিচ্যুত বাথপন্থী সেনা কর্মকর্তারা যে আল কায়েদার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রথমদিকে তা বুঝতে পারেনি। তারা বরং বিদেশি জিহাদিদের উপরই দোষ চাপাতে থাকে।’ কর্নেল জোয়েল তার বই, ‘ইরাক আফটার আমেরিকা’তে বাথপন্থী ও ইসলামিক স্টেট এর যোগসূত্র নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

জোয়েল বলেন, ‘মার্কিন সেনাবাহিনী এটা সবসময়ই জানতো যে, সাবেক বাথপন্থী সেনা কর্মকর্তারা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগ দিয়েছে এবং আল কায়েদার ইরাকি শাখাকে কৌশলগত সমর্থন দিচ্ছে। কিন্তু তারা এটা ধারণা করতে পারেনি যে, সেক্যুলার বাথপন্থী সেনা কর্মকর্তারাই এক সময় শুধু আল কায়েদাকে সমর্থনই নয় বরং জিহাদি সংগঠনগুলোর মূল খুঁটিতে পরিণত হবেন!’

ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর স্বঘোষিত খলিফা আবু বকর আল বাগদাদির সময়ে সাবেক বাথপন্থী সেনা কর্মকর্তারা আরো বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেন। মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে পরাস্ত ইরাকি বিদ্রোহীদেরকে আইএস এর নেতৃত্বে পুনর্জাগরিত করার মূল ভুমিকাও পালন করেন ওই সেনা কর্মকর্তারাই। এর আগে যাদের সঙ্গে দু দু’বার যুদ্ধ করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী এখন আবার তাদেরকে দমনেই বিমান বহর নিয়ে ইরাকে ফিরে এসেছে মার্কিনিরা।

কিন্তু প্রশ্ন হল- সেক্যুলার বাথপন্থীরা কীকরে আইএস এর সঙ্গে যোগ দিতে পারে? আসলে মার্কিন আগ্রাসনের পর আল কায়েদা বা আইএস এর প্রতি ইরাকের স্থানীয় সুন্নী জনগোষ্ঠীর বিশাল আনুগত্য দেখেই বাথপন্থীরা এতে যোগ দেয়। আর তাছাড়া বাথপন্থীরাও নিজেদেরকে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন মনে করতো। আরব বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশেই বাথপন্থীদের শাখা সংগঠন ছিল।

এমনকি সাদ্দামও তার শাসনকালের শেষদিকে ইসলামি ভাবাদর্শের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। ১৯৯৪ সাল থেকেই সাদ্দাম ইসলামি ভাবাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েন বলে জানান সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আহমদ এস হাশিম। আইএস নিয়ে গবেষণারত হাশিম জানান সাদ্দামও আল কায়েদার মতো ইসলামের সবচেয়ে রক্ষণশীল ও কট্টর মতাদর্শ সালাফি ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। আল কায়েদা বা আইএস এ যোগ দেননি এমন অনেক বাথপন্থী সেনা কর্মকর্তারাও তাদের সহকর্মীদের হঠাৎ করেই অতি ধার্মিক বনে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। এদের বেশিরভাগই আবু মুসাব আল জারকাবির নেতৃত্বাধীন আল কায়েদায় যোগ দেয়। এছাড়া আরো বিভিন্ন স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোতেও বাথপন্থীরাই প্রধান ভুমিকা পালন করে। সবগুলো বিদ্রোহী গোষ্ঠীই মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে পরাস্ত হয়। কিন্তু ২০১১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ছেড়ে যাওয়ার পর থেকেই আইএস এর অধীনে প্রায় সবগুলো সুন্নী বিদ্রোহী গোষ্ঠী পুনরায় সংগঠিত হতে থাকে।

২০১১ সালে নুরী আল মালিকির সরকার দ্বিতীয় দফায় সাদ্দাম আমলের কর্মকর্তাদেরকে সরকারি চাকরি থেকে বিতাড়নের পর বাথপন্থীরা আরো বেশি করে আল কায়েদা ও অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। আর এর ফলেই আইএস এর মতো দুর্ধর্ষ একটি জঙ্গি সংগঠনের উত্থান সম্ভব হয়।

মধ্যপ্রাচ্য

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে