Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯ , ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-২২-২০১২

এর শেষ কোথায়

মীজান রহমান


এর শেষ কোথায়

এক

দেশ থেকে সুসংবাদ খুব একটা আসছে না আজকাল। চুরিডাকাতি, লুঠতরাজ, ধর্ষণ গণধর্ষণ, সন্ত্রাস, ঠগবাজি, জালিয়াতি, সীমাহীন দুর্নীতি, দুঃসহ জানজট, ঘন ঘন সড়ক দুর্ঘটনা----একের পর এক লেগেই আছে। খারাপ খবরই যেন একমাত্র খবর দেশের। সকালবেলা ইন্টারনেট খুলে দেশের খবর পড়া মানেই সারাটি দিন মাটি হয়ে যাওয়া। বিদেশের নিরাপদ বাসগৃহের কোমল কেদারাতে বসে আমরা মহাজ্ঞানী মহাজনদের মত ঘোষণা করে দিই, সবই সরকারের দোষ। চোরচোট্টায় ভরে গেছে দেশ। নেতারা চোর, তাদের চেলাচামুণ্ডারা চোর, উকিল-মোক্তার-হাকিম-ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-প্রফেসার-ছাত্র-পুলিশ-প্রকৌশলী সব চোর (কেবল আমরাই তুলসিধোয়া সাধুসজ্জন খাঁটি দেশপ্রেমিক। আমরা যদি দেশে থাকতাম তাহলে কি এই শোচনীয় অবস্থাতে পৌঁছায় আমাদের মা জননী।)সুতরাং সরকার বদলাতে হবে। তাই আমরা সরকার বদলাই। নতুন সরকার এসে পুরনোদের চাইতে দ্বিগুণ বিক্রমে অরাজকতা সৃষ্টি করে দেয়। তখন আমরা আবার সরকার বদলাই---সরকার বদলানোর আগে একটা ‘তত্বাবধ্বায়ক সরকার’ নামক অদ্ভুত জীব তৈরি করে জটিল অবস্থাটিতে শক্ত জট লাগানোর ব্যবস্থা করি অতি নৈপুন্যের সাথে। এভাবেই আমাদের এই ‘আল্লার রাজত্বটিতে’ মহান আল্লার সুশাসন বলবৎ থেকেছে পুরো ৪০ বছর। এর শেষ কোথায়?
  এর যে শেষ কোথায় সেটা কোনদিনই জানা হবে না আমাদের যতক্ষণ না মূল সমস্যাগুলো শনাক্ত করতে পারছি। এই যে দেশটি এমন দ্রুতবেগে ধ্বংসের দিকে ধাবমান হচ্ছে, তার মূল কারণটা কি। জানি কি বলবেন---দারিদ্র্য, অসম আর্থসম্পদ বন্টন, অযোগ্য সরকার, সামাজিক অচলাবস্থা, সাম্রাজ্যবাদ, ইত্যাদি। অনেকে ‘সব দোষ নন্দ ঘোষ’ খোঁজার প্রচেষ্টায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের শরণাপন্ন হবেন (‘৭১এ যেমন হয়েছিলাম, সম্পূর্ণ আক্ষরিক অর্থেই)। কট্টর পুঁজিবাদবিরোধীরা দুষবেন কট্টর পুঁজিবাদকে, ধার্মিকরা দুষবেন বিধর্মীদের, ধর্মবিরোধীরা দুষবেন ধর্মান্ধদের। একটা জিনিস প্রায় কেউই করবেন না, এবং ওই জিনিসটা করতে পারলে অনেক সমস্যারই অন্তত আংশিক সমাধান হয়ে যেতে পারত, সেটি হল অন্যকে দোষারূপ করার আগে নিজের চেহারাটি একটু আয়নায় দেখে নেওয়া, স্বীকার করতে প্রস্তুত হওয়া যে এতে হয়ত আমার নিজেরও খানিক ভূমিকা আছে। যেমন ধরুন, আমরা যে সবাই ট্যাক্স ফাঁকি দিতে ভীষণ ভালোবাসি, দু’পয়সা উপরি রোজগার সবাই পছন্দ করি, নিজের সম্পত্তির এক কানাকড়িও কারো জন্যে ছেড়ে দিতে রাজি নই, মসজিদ ফাণ্ড ছাড়া অন্য কোন জনকল্যানমূলক সংস্থাতে একপয়সা দান করতে চাই না----এগুলোও একটু একটু করে সেই সর্বগ্রাসী জাতীয় সমস্যাগুলোকে চরমাস্থায় দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
 কিন্তু আমার মনে হয় কি জানেন? আমার মনে হয় এসব সমস্যার তলায় ভাল করে শাবল দিয়ে খুঁড়তে গেলে দেখা যাবে অতল গভীরে বৃহত্তর একটি সমস্যা আছে, যার মূল থেকে সার সংগ্রহ করে যাচ্ছে বাহ্যত দৃশ্যমান অন্যান্য সমস্যাগুলো। অর্থাৎ এই সমস্যাটিই হল ‘মাদার অব অল প্রব্লেমন্স’। এই সমস্যাটির নাম জনস্ফীতি। আমাদের মান্যগণ্য নেতৃবর্গ তাঁদের ভাষণ-বক্তৃতাতে, লেখালেখিতে, প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করেন এটিকে, কিন্তু দারুণ কোনও প্রত্যয়ের সাথে করেন বলে মনে হয়না। এ থেকেই যে সব সমস্যার উৎপত্তি, এপর্যন্ত যেতে যেন কেউই প্রস্তুত নন, বা যেতে সাহস পান না। সাহস না পাওয়ার কারণ যে একেবারে নেই তা নয়। আমাদের এই জাতিটির মত ধর্মগতপ্রাণ জাতি সংসারে আছে কিনা জানিনা, পাকিস্তান ব্যতিরেকে অবশ্য। জনসংখ্যার ব্যাপারে আমাদের মুরুব্বিদের তো সবসময়ই সেই গতানুগতিক মনোভাব---আল্লার মাল আল্লা দেয়, আল্লা নেয়, তুমি-আমি তাতে বাধ সাধবার কে। সেই মনোভাব একশ’ বছর আগে যেমন ছিল, এখনও হয়ত তেমনই আছে, অন্তত গ্রামাঞ্চলের মোল্লাঅধ্যুষিত জনপদগুলোতে।
  অর্থাৎ চূড়ান্ত বিপদের মুহূর্তেও আমরা ধ্বংসের শঙ্খবানীতে কর্ণপাত করতে চাচ্ছিনা। বিপদটি কোনমাত্রায় পৌঁছে গেছে তার একটু আভাস দেওয়ার চেষ্টা করব এই নাতিদীর্ঘ নিবন্ধটিতে।
 
দুই

  জনসংখ্যা নামক একটা সমস্যা যে আছে বর্তমান পৃথিবীতে সেটা হয়ত কেউ অস্বীকার করছেন না, কিন্তু মতভেদ দাঁড়াচ্ছে এর গুরুত্ব কতখানি তা নিয়ে। আধুনিক নগরজীবনের কিছু কিছু লোমহর্ষক দৃশ্য স্বচক্ষে দেখেছেন, বা ইউটিউবে, হোমভিডিওতে বা মুভিতে, তারা এর কৌতুকরস এবং ভীমরস দুটোই লক্ষ করে থাকবেন। ক’দিন আগে এক বন্ধু একটা ছবি পাঠালেন ইউটিউব থেকে নেওয়া, যাতে দেখা যায় একটি যাত্রীবাহী ট্রেন মন্থরগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে একটা জনবহুল বস্তীর ভেতর দিয়ে। জনবহুল বললে কম বলা হয়---লোকে গিজগিজ করছে, তিলধারণের জায়গা ছিল না। এবং দৈত্যাকার রেলগাড়িটি সেই বস্তীর বুকের ওপর দিয়ে হুস হুস করে এগুচ্ছে---ঠাট্টা করছি না, বুকের ওপর দিয়েই, একেবারে আক্ষরিক অর্থে। বলতে পারেন ওদের উঠোনের ওপর দিয়ে, যদিও সেসব বস্তীতে কারো ‘উঠোন’ থাকাটাও কেমন ইয়ার্কি মনে হয়---সেখানে উঠান তো রীতিমত বিলাসিতা। যাই হোক, দেখলাম, রেললাইনের দুপাশে ওরা দোকান সাজিয়েছে, যাতে শুধু কেনাকাটার দ্রব্যাদি মজুত হয়েছে তাই নয়, চাঁদোয়া টাঙ্গানো হয়েছে রৌদ্রতাপের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে। এই চাঁদোয়াগুলোকে তারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গুটিয়ে ফেলে ট্রেনের আওয়াজ শোনামাত্র। কয়েকজনকে দেখা গেল পাশ দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়াকালে গা বাঁচানোর জন্যে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল একটা কাঠের দেয়াল ঘেঁষে। কিছু কিছু সওদা ট্রেনসড়কের গা-ঘেঁষা একেবারে----জ্যান্ত হাঁসমুরগিসহ! দৃশ্যটি যে কোন অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের হতে পারত---বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ভারত-চীন-তাইওয়ান-লাউস-থাইল্যাণ্ড, সব এক।
  বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেনীর কাউকে আমি গাড়ি ছাড়া দেখিনি। এবং তাঁদের জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন নগরজীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা কি--- যানজট। এক মাইল পথ অতিক্রম করতে কমপক্ষে এক থেকে দেড়ঘন্টা সয় ‘নষ্ট’ করতে হয় তাঁদের এর চেয়ে বড় দুঃখের কথা আর কি হতে পারে। সত্যি তো, আর কি হতে পারে! তাঁরা এটুকু ভেবে দেখেন না যে ওই দেশে যে গাড়ি চালানোর জায়গা আদৌ আছে সেটাই এক পরমাশ্চর্য। যেখানে পায়ে হেঁটে চলাটাও বিপজ্জনক (কারণ তাতে কোন-না-কোনকিছুর নিচে চাপা পড়ে মরা বা গুরুতর আহত হবার সমূহ সম্ভাবনা---হয় চার চাকার গাড়ি বা ট্রাক বা ঠেলাগাড়ি, কিংবা তিনচাকার রিক্সা, বেবিট্যাক্সি, অথবা দুই চাকার সাইকেল, আর তাহলে জনতার পায়ের নিচেও হতে পারে), সেখানে একঘন্টায় একমাইল রাস্তা তো রীতিমত হাইস্পীড।
  গত মাসে, অর্থাৎ ’১১ সালের অক্টোবরে, পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে ৬৪ লক্ষ---জন্মের সংখ্যা থেকে মৃত্যুর সংখ্যা বিয়োগ করার পর যে সংখ্যাটি দাঁড়ায়। এবং গত মাসেরই শেষ সপ্তাহের কোনও একদিন পৃথিবীর কোন এক জায়গায় জন্মগ্রহণ করেছে বিশ্বের ৭০০ কোটিতম শিশু।(আসলে জাতিসঙ্ঘের এক সাম্প্রতিক ঘোষণাপত্র অনুযায়ী এই শিশুটি জন্মগ্রহণ করে ৩১শে অক্টোবর, ফিলিপিনের ম্যানিলাতে, এবং তার নাম ডানিকা মে কামাচো।)এই বিপুল সংখ্যাটির সাথে মানবেতিহাসের পুরো সময়টাই মেলানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। আজ থেকে প্রায় ১১,০০০ বছর আগে পৃথিবীর সর্বশেষ তুষারযুগটি পুরোপুরি বিদায় হয়ে যায়---যার অর্থ ভূপৃষ্ঠের শতকরা ৯০ ভাগ স্থলভাগই সম্পূর্ণভাবে তুষারমুক্ত হয়। দীর্ঘ তুষারাবৃত সময়ের ধাক্কাতে আমাদের এই মানবজাতিটির বড়ই শোচনীয় অবস্থা দাঁড়িয়েছিল----আমরা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিলাম, অনেকটা বর্তমান সময়কার উরাঙ্গুটান প্রজাতিটার মত (বোর্নিও আর সুমাত্রার গভীর বনজঙ্গল ছাড়া অন্য কোথাও একেবারেই দেখা যায় না তাদের)। সেসময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল এক পর্যায়ে যে মানুষ নামক প্রজাতিটির সংখ্যা কয়েক লক্ষের বেশি ছিল না। চলাফেরা করার বিস্তর জায়গা ছিল তখন, সন্দেহ নেই----একেকজন মানুষের জন্যে খালি জায়গার পরিমাণ ছিল আমাদের অটোয়া শহরটির মত, অর্থাৎ প্রায় ১,০৭৩ বর্গমাইল। তার সঙ্গে আজকের ছবিটা মিলিয়ে দেখুন---আজকে সারা পৃথিবীতে মাথাপ্রতি জায়গার পরিমাণ ১২,৮০০ বর্গগজ। এই সংখ্যাটি যে একেক দেশে একেক রকম সেটা তো বলাই বাহুল্য। রাশিয়া আর ক্যানাডার সঙ্গে কি ভারত-পাকিস্তানের তুলনা চলে? আমাদের অভাগা দেশটির স্থান কোথায় জানতে চাচ্ছেন? সহজ পাটিগণিতের অঙ্ক কষেই অনায়াসে বের করে ফেলতে পারবেন। ধরা যাক আমাদের বর্তমান লোকসংখ্যা ১৬ কোটি। এবং আমাদের দেশটির মোট আয়তন কমবেশি ৫৬,০০০ বর্গমাইল---অর্থাৎ ১৭৩,৬৪৫,৬০০,০০০ বর্গগজ। দ্বিতীয় সংখ্যাটিকে প্রথমটি দিয়ে ভাগ করলে দাঁড়ায় ১,০৮৪ বর্গ গজ। এ থেকেই বাইরের বিশ্বের তুলনায় আমাদের জনঘনত্ব ব্যাপারটির কিঞ্চিৎ ধারণা পাওয়া যায়। আমার মতে আমাদের জাতীয় সমস্যার অনেকগুলোরই মূল এখানে। ঘনবসতির কারণেই চাকরিবাকরিতে প্রতিযোগিতার হিংস্রতা মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে----একটা চাকরির জন্যে হয়ত শ’পাঁচেক লোক লাইন করে দাঁড়িয়ে গেল। সেখানে ঘুষ-তদবির-মারামারি-কাটাকাটি তো হবেই। আগামী বিশ ত্রিশ বছরে কি অবস্থা দাঁড়াবে সেটা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। দেশের আয়তন বাড়ছে না, বাড়ছে কেবল জনসংখ্যা, এবং দ্রুতহারে। বৃদ্ধির হার হয়ত কিছুটা কমে যাবে, প্রধানত অর্থনৈতিক কারণে, কিন্তু মোট জনসংখ্যা তো আর কমছে না। সে সময়টি হয়ত বেশি দূরে নয়, যখন বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই কীটপতঙ্গদের মত একে অন্যের দেহাশ্রয়ী হয়ে জীবনযাপন করতে বাধ্য হবে। আমরা আইনশৃংখলার কথা ভেবে হতাশ হচ্ছি এখন, ত্রিশ বছর পর মনে হবে এযুগটাই ছিল স্বর্ণযুগ।
  যুগে যুগে জনসংখ্যা কিভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তার একটা আভাস দিই। ১,৮১০ সালে পৃথিবীতে ১০০ কোটি মানুষ ছিল। তার ১২০ বছর পর, অর্থাৎ ১,৯৩০ সালে, সংখ্যাটি দাঁড়ায় ২০০ কোটিতে। এরপর হঠাৎ করেই হুহু করে বাড়তে লাগল সংখ্যা। ১,৯৭৫ সালে হল ৪০০ কোটি----মাত্র ৪৫ বছরে ২০০ কোটি বাড়তি মানুষ! সেখান থেকে ৭০০তে পৌঁছাতে ক’বছর লাগল? সর্বকুল্যে ৩৬ বছর। একে বিস্ফোরণ না বলে আর কি বলা যায়? এই অভূতপূর্ব জনস্ফীতির কারণ আছে অবশ্য। আগে জন্মহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলত মৃত্যুহার। আগে মানুষের আয়ু ছিল, গড়ে ৪০-৫০, এখন হয়েছে ৬০-৭০, পশ্চিমের সমৃদ্ধ দেশগুলোতে সেটা আশির কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে প্রায়। পুরনো আর নতুন যুগের মাঝে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা এসেছে আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যানে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী সময়টিতে জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতিটি শাখাতে যে অসাধারণ প্রসার ও বিকাশ ঘটেছে, ইতিহাসে তার নজির নেই। ’৪০ সালে কলেরা-বসন্ত-টায়ফয়েড আর ম্যালেরিয়াতেই মরে যেত আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ---বিশেষ করে গ্রামগঞ্জের চাষবাস করা লোকজন। তখন এসব রোগের কোনও চিকিৎসা ছিল না। এখন আছে। দুরারোগ্য ব্যাধিতেও আজকাল মানুষ আরোগ্যলাভ করে, তারপর নতুন জীবন শুরু করে। পশ্চিমের তো কথাই নেই---সেখানে জীবনযাত্রার সাধারণ মানই আমাদের চাইতে শতগুণে উন্নত ছিল বরাবরই। ভালো খাওয়াদাওয়া, ভালো পরিবেশ, ভালো শরীরচর্চা, এসবই বর্তমান যুগে আগেকার চাইতে অনেকটাই উন্নত। ’৪০ দশকের আগে বাজারে পেনিসিলিন ছিল না, এন্টিবায়োটিক ছিল না, ডায়বেটিসের জন্যে ছিল না যথেষ্ঠ ইন্সুলিন। আজকে মানুষের সবই আছে। সুতরাং যমদূত যে একটু দূরত্ব বজায় রাখবেন তাতে আর আশ্চর্যের কি আছে। আজকে গড়ে ১টি মৃত্যুর বিপরীতে ৩টি জন্ম। অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশগুলোতে ১টি মৃত্যুতে ৩.৩টি জন্ম। অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশগুলোতে সংখ্যা হল ১টি মৃত্যু, আর ১.৬ জন্ম। সুতরাং সম্পদবন্টনের অসমতার সঙ্গে সংখ্যাবন্টনেও অসমতা সৃষ্টি হতে পারে---চিরকালই তা হয়েছে।
 একদিকে তৃতীয় বিশ্বের অসংযত ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত জনস্ফীতি, অপরদিকে অত্যুন্নত বিশ্বের অসংযত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত বিলাসপ্রিয়তা----দুয়ের সম্মিলিত প্রভাব এবং প্রতিফলে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা মা ধরিত্রীর। ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা পরিবেশের, প্রকৃতির। আজকে আমাদের মেরুঅঞ্চলগুলো কি শোচনীয় অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, এবং সে-অবস্থাটি আমাদের পরিচিত পরিবেশকে কিভাবে, কি আশঙ্কাজনকভাবে, প্রভাবিত করতে শুরু করেছে, তার ইঙ্গিত অনেকদিন থেকেই উচ্চারিত হয়ে যাচ্ছে সুধীজনদের বিবিধ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণমূলক নিবন্ধাদিতে। আজকে যে হারে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার চেয়ে দ্বিগুণ হারে বাড়ছে মেরুর তাপমাত্রা। পরিবেশবিজ্ঞানীরা নিত্যই আমাদের চোখের সামনে পরিবেশন করে যাচ্ছেন মেরু অঞ্চলে বিপুল তুষারধ্বসের দৃশ্য। বিশাল বিশাল পাহাড়ের মত দেখতে বরফের স্তূপ্প গলে গলে গড়িয়ে যাচ্ছে উষ্ণতর সামুদ্রিক এলাকাতে। বছরের পর বছর এভাবে বরফ গড়াতে গড়াতে শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছুবে এই অবিশ্রান্ত ধারা তা সহজেই অনুমেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন সহ-প্রেসিডেন্ট আল গোরের প্রযোজনা ও উদ্যোগে নির্মিত ভিডিও ‘Inconvenient Truth’ যারা দেখেছেন তারা প্রকটভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন এর ভয়াবহ রূপ। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হল যে এতসব প্রত্যক্ষ প্রমাণ চোখের সামনে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রভাবপ্রতিপত্তিশীল শিক্ষিত গুণিজন পরম অবলীলায় অস্বীকার করে যাচ্ছেন ভবিষ্যতের অশুভ সম্ভাবনাগুলোকে---তাঁদের মতে আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান হল ত্রাসসৃষ্টিকারীদের একরকমের ষড়যন্ত্র, মানুষকে অনর্থক ভয় দেখিয়ে কোন একটা উদ্দেশ্য সাধন করার চেষ্টা! এই সন্দেহপ্রবণ বিজ্ঞানবিরোধীরা যা’ই বলুন না কেন, মানবজাতির ভবিষ্যৎ যে বেশ বিপন্ন অবস্থাতে দাঁড়িয়ে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। ৭০০ কোটি মানুষের অন্নসংস্থান ও অন্যান্য চাহিদা মেটানোর ক্ষমতা দিনদিনই হ্রাস পাচ্ছে আমাদের এই সর্বদায়ী, সর্বকল্যানময়ী সুন্দর ভুবনটির। আজকে আমাদের বনসপম্পদ দ্রুত ক্ষীয়মান, জলসম্পদ বিপন্ন (একশ বছর আগে যত মৎসসম্পদ ছিল আমাদের সমুদ্রগুলোতে তার ৯০ ভাগই চাষ হয়ে গেছে।।)।ত্রিশ চল্লিশ বছর পর যে প্রজন্ম আসবে তারা কি সামুদ্রিক মাছ কাকে বলে জানবে? তারা কি বর্শিছিপ নিয়ে নদীনালা আর বিলপুকুরে গিয়ে মাছ ধরার কথা কল্পনা করতে পারবে? মনে হয়না। আমার নিজের জীবনেই তো দেখলাম এই বিরাট বিবর্তন। আমার বাল্যকালে রোজ দুবেলা মাছ খাওয়া ছিল মধ্য আর নিম্নবিত্ত বাঙ্গালিদের পারিবারিক জীবনের দৈনন্দিন নিয়ম। গরিবদের প্রধান খাদ্যই ছিল তরিতরকারি আর টাটকা মাছ। আজকে সেই মাছই হয়েছে দুষ্প্রাপ্য, এবং অত্যন্ত দুর্মূল্য। আজকে বাংলাদেশে মাছ খাওয়ার সামর্থ আছে কেবল বড়লোকদের। অচিরে হয়ত তারাও মাছ পাবে না---পাবে কেবল প্রবাসী বাঙ্গালিরা, কারণ কেবল তারাই নগদ ডলার-পাউণ্ড-ইউরো দিয়ে মাছ কিনতে পারবে। এসবের সবকিছুর গোড়াতেই আছে অতিরিক্ত মানুষ, যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে অর্থবন্টনের চূড়ান্ত অসমতা, এবং এই পরিশেষে সৃষ্টি করে চরম দুর্দশা গোটা সমাজের। আমাদের দেশের বর্তমান দুরবস্থা, ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশা, তরুণদের ভাগ্যের সন্ধানে দেশ ছেড়ে বের হয়ে যাওয়ার প্রবণতা, এর সবকিছুর পেছনে প্রায় একই মূল কারণ বলে আমি মনে করি।
  ছোটবেলার বইপুস্তকে পড়েছি, আমাদের এই করুণাময়ী ভুবনে সীমাহীন সম্পদ, বিশ্ববিধাতা তাঁর সৃষ্টির ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে রেখেছেন চিরকালের জন্যে। সেই শিক্ষা কি আজকের শিক্ষার্থীদের জন্যে প্রযোজ্য? আগের মত সত্যিকার জোর দিয়ে কি আমরা দাবি করতে পারি যে এখানে জীবনরক্ষার অফুরন্ত সহায় সম্পদ এখনো অক্ষুন্ন ঠিক সেকালেরই মত?
  মনুষ্যজাতির ভবিষ্যৎ যদি বিপন্ন হয়ে থাকে তাহলে জীবজগতের কথা ভাবুন একবার। মেরুর ঋক্ষজাতির কথা তো বললামই একটু আগে। মৎসকুলের কথাও উল্লেখিত হয়েছে। তেমনি করে বিপন্ন আজকের আরণ্যক প্রাণীরা। ভারত উপমহাদেশে, বিশেষ করে আমাদের প্রাণপ্রিয় দেশ বাংলাদেশে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার এক বিরাট সম্পদ। এককালে দেশবিদেশ থেকে সখের শিকারীরা সুন্দরবনে যেতেন বাঘ শিকারের জন্যে। বাঘের অভাব ছিল না এতটুকু। সেই রাজসিক ব্যাঘ্র আজকে ‘বিপন্ন’ প্রজাতির তালিকায় স্থান পাবার যোগাড়। বিপন্ন অবস্থার কারণঃ সুন্দরবনে এখন মানুষ থাকবে না বাঘ থাকবে সেই হয়েছে প্রশ্ন। কার দাবি বেশি---মানুষ না চতুষ্পদী জীব, যতই হোক না কেন তার ঐতিহাসিক মূল্য, বা তার চিত্তাকর্ষক মূর্তি। ভারত উপমহাদেশের সর্বত্র আজ ব্যাঘ্রজাতির অসহায় অবস্থা। সারা সুন্দরবন জুড়ে মাত্র তিনটে সরকার-সংরক্ষিত বন-এলাকা যেখানে ৩০০-৪৫০ বাঘের বাস। এবং সংখ্যাটি প্রতিবছরই কমে যাচ্ছে দ্রুত। বাঘের শত্রু কেবল জনপদ নয়, মানুষের কুসংস্কারও। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কোন কোন অঞ্চলের লোকেদের বিশ্বাস, বাঘের যৌন প্রত্যঙ্গ দিয়ে এমন দাওয়াই তৈরি হয় যা তাদের নিজেদের ক্ষয়িষ্ণু যৌনশক্তি বর্ধনের জন্যে অব্যর্থ, অনেকটা পশ্চিমের ভায়াগ্রার মত । সেকারণে মৃত ব্যাঘ্রও অত্যন্ত মহার্ঘ সেসব দেশে। আফ্রিকার বেশ কিছু বৃহদাকার জীব বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় স্থান পাবার অবস্থায় দাঁড়িয়ে গেছে। তার মধ্যে গণ্ডারের অবস্থাই বোধ হয় সবচেয়ে আশংকাজনক। অবৈধ শিকারীরা মোটা মুনাফার লোভে বিরাট বিরাট গণ্ডারকে পাকড়াও করে করাত দিয়ে তার শিংখানা কেটে নিয়ে পালিয়ে যায়---একবারও ভেবে দেখে না যে এই অসহায় প্রাণীটি নিশ্চিত মৃত্যুর অপেক্ষায় কি অসহ্য যন্ত্রনাতে তিল তিল করে ভুগছে নিঃসঙ্গ বনের নিশ্চল স্তব্ধতায়। ওদিকে দেখুন জাপানের উপকূল অঞ্চলে তিমি আর টুনা শিকারের হিড়িক। টুনা তো বেশ অনেকদিন ধরেই ‘বিপন্ন’ প্রানীর তালিকায়। কিন্তু তাই বলে কি জেলেদের জীবিকায় আঘাত করা সম্ভব? কিংবা টলানো সম্ভব সরকারের  বিবেক? এবার শুনছি সমুদ্রের হাঙ্গর জাতিও বিলুপ্ত হবার যোগাড়। সেই একই কারণে----অতিরিক্ত মানুষ, অতিরিক্ত মানুষের হাতে অতিরিক্ত পয়সা, সুতরাং অতিরিক্ত চাহিদা পণ্যের জন্যে। বিশেষ করে বিরল পণ্য, এবং সম্ভব হলে নিষিদ্ধ পণ্য!

তিন

  পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন বেশ একটি হতাশার ছবি দাঁড় করালাম এযাবত। কোন আশাই কি নেই তাহলে মানবজাতির? আমরাও কি একসময় এই বিপন্ন প্রাণীগুলোর মতই ধীরে ধীরে অবলুপ্তির পথে অগ্রসর হব?
  না, হয়ত না। আশা করি, না। অন্তত অচিরেই না।
  ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা চিন্তাভাবনা করেন তাঁদের মাঝে নৈরাশ্যবাদী যেমন আছেন, আশাবাদীও তেমনি আছেন অনেক। ব্রিটেনের বিশিষ্ট সাংবাদিক-লেখক-চিন্তাবিদ উইলিয়াম গডউইল (১৭৫৬-১৮৩৬) এবং ফ্রান্সের মার্কি দ্য কণ্ডর্সেট (১৭৪৩-১৭৯৪) বেশ আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন তাঁদের লেখালেখিতে। দুজনের কথায় ছিল  প্রায় একই আশার সুর। তাঁদের বক্তব্যের সারমর্ম ছিল এই যে মানুষ মূলত চির উচ্চাকাক্ষ্ণী জাতি---চির উর্ধগামী, অতএব তাদের অগ্রযাত্রা চিরকালই অব্যাহত থাকবে, অব্যাহত হারে বৃদ্ধি পাবে তাদের সংখ্যা এবং তাদের প্রভাবপ্রতিপত্তি থাকবে নিত্য অপ্রিতহত। প্রচণ্ড্রকম আশাবাদ সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটা কি কেবল স্বপ্ন, না, বাস্তবতার সঙ্গে কোন সম্পর্ক আছে তার? তাঁদের অনাবিল আশাবাণীতে কিঞ্চিৎ ছন্দপতন ঘটিয়েছিলেন রবার্ট ম্যালথাস (১৭৬০-১৮৩৪) নামক আরেক ব্রিটিশ চিন্তাবিদ-অর্থনীতিবিদ-লেখক, তাঁর ১৭৯৮ সালে লিখিত এক নিবন্ধে। তাঁর বক্তব্য ছিল এইঃ হ্যাঁ, অগ্রগতি হবে ঠিকই, তবে মানুষের সংখ্যা অব্যাহত হারে বৃদ্ধি পাবে অনন্তকাল, সেটা সম্ভব নয়---একটা সময় আসবে যখন প্রকৃতিই তার লাগাম টেনে ধরবে। প্রধানত দুর্ভিক্ষ এবং মহামারির সাহায্যে। পরবর্তীকালের ঘটনাসমূহতে ম্যালথাসের ভবিষ্যদবাণীই বরং বেশি বাস্তবানুগ বলে মনে হয়েছে। ১৯১৮-১৯২০ সালে সমগ্র ইউরোপের সেই সর্বগ্রাসী মহামারি, স্প্যানিশ ফ্লু, যাতে কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ কোটি লোক মারা গিয়েছিল( অর্থাৎ তখনকার মোট জনসংখ্যা, ১৮৬ কোটি, তার প্রায় শতকরা ৩ ভাগ)। যারা মারা যায়নি, কিন্তু আক্রান্ত হয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল আরো পঞ্চাশ কোটি।
  তারপর ছিল কতগুলো বড় বড় দুর্ভিক্ষ। আয়ার্ল্যাণ্ডের ইতিহাসে দুটি প্রকাণ্ড দুর্ভিক্ষ---প্রথমটি (১৭৪০-১৭৪১) ছিল আবহাওয়া জনিত কারণে, হয় প্রচণ্ড খরাতে সবকিছু পুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়া, নতুবা অবিরাম বৃষ্টিবাদলাতে জনপদ ভেসে যাওয়া। দ্বিতীয়টি (১৮৪৫-১৮৫২) ছিল আরো ভয়াবহ---- ওতে মারা যায় প্রায় দশ লক্ষ লোক। এর পরই তো আয়ার্ল্যাণ্ড থেকে ব্যাপক হারে আইরিশরা উত্তর আমেরিকাতে অভিবাস নিয়ে চলে আসতে থাকে। ইতিহাসে সেই দুর্ভিক্ষটি ‘আলুর দুর্ভিক্ষ’ নামে খ্যাত। আলুর উৎপাদন তুমুলভাবে ব্যাহত হয়ে যাওয়ার ফলেই প্রচণ্ড খাদ্যাভাব সৃষ্টি হয়েছিল সারা দেশব্যাপী।
  ম্যালথাসের দুর্ভিক্ষ-মহামারির সঙ্গে হয়ত আরো ক’টি উপাদান জুড়ে দেওয়া যায়।  ধরুণ, ভূমিকম্প, সুনামি (২০০৪ সালের থ্যাঙ্কসগিভিং ডে’তে সামুদ্রিক ভূকম্পজনিত কারণে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াব্যাপী সেই যে অবিশ্বাস্যরকম  জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল, তাতে মারা গিয়েছিল কমপক্ষে ২৩,০০০ মানুষ), ২০০৫ সালে আমেরিকার নিউ অর্লিয়েন্সের সেই ভয়াবহ ক্যাট্রিনার স্মৃতি কি কারুর ভোলার উপায় আছে। তারপর ছিল ২০০৯ সালে হাইটির ভূমিকম্প, ২০১০ সালে জাপানের সুনামি---এগুলোর প্রত্যেকটিতেই অসম্ভবরকম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে জনজীবনের, হাজার হাজার লোক মারা গেছে, আরো বহু সহস্র হয়েছে আহত বা নিখোঁজ। সুতরাং জনসংখ্যার মাত্রাছাড়ানো বৃদ্ধিকে দমিয়ে রাখার মত উপাদান যে প্রকৃতির মাঝেই বিদ্যমান তাতে সন্দেহ নেই। এবং একটা সময় পর্যন্ত সেই উপাদানগুলোরই প্রাধান্য ছিল অনেকাংশে, আর সেকারণেই ১৮১০ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত সময়টাতে জনসংখ্যা অসম্ভব দ্রুতহারে বৃদ্ধি পাবার সুযোগ পায়নি।
 কিন্তু আগেকার চিন্তাবিদ বা ভবিষ্যৎদ্রষ্টারা হয়ত কল্পনাই করতে পারেননি যে ১৯৩০ দশকের গোড়ার দিক থেকে হঠাৎ করেই বিজ্ঞান তার সমস্ত শাখাপ্রশাখায় অভাবনীয় গতিতে বিস্তারিত হতে শুরু করবে। এবং সেই স্ফীতির গতিটা উন্মত্তগতিতে তরাণ্বিত হতে থাকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়টাতে---১৯৩৯-১৯৪৫ তে। চিকিৎসা, অণুবিজ্ঞান, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, প্রযৌক্তিক জ্ঞান, গণিত, অর্থনীতি, পদার্থবিদ্যা, প্রাণীবিজ্ঞান---প্রতিটি ক্ষেত্রেই জ্ঞানের নতুন দিগন্ত সৃষ্টি হতে থাকে, হতে থাকে চিন্তা ও বুদ্ধির অভুতপূর্ব বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি। মানুষের সৃষ্টিশীলতা সকল বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবনধারায় প্রবাহিত হতে থাকে ইতিহাসের পাতায়। গড়ে উঠতে থাকে আধুনিক প্রযৌক্তিক জীবনের সুদৃঢ় ভিত্তি। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান দ্রুত উন্নতির পথে এগুতে শুরু করে। তার প্রাত্যহিক জীবনের সংগ্রাম আগের মত কষ্টকর অবস্থাতে রুদ্ধ না থেকে তার মনে আধুনিক নগরকেন্দ্রিক নান্দনিকতার পিপাসা সৃষ্টি করে। ফলে তার সাধারণ থাকা-খাওয়ার মান, তার লেখাপড়া-শিখে-গাড়িঘোড়া চড়ার আকাঙ্খা অদম্য হয়ে ওঠে। সর্বোপরি যেটা হয় অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে, সেটা হল স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাশাস্ত্রের অভূতপূর্ব উৎকর্ষসাধন। পেনিসিলিন, এন্টিবায়োটিক, ইন্সুলিন, ম্যালিয়ার চিকিৎসা, কলেরা-বসন্ত-টায়ফয়েড ইত্যাদি মারাত্মক রোগগুলোকে আয়ত্ত করে ফেলা---এ সবই বলতে গেলে উত্তর ’৪০ এর ঘটনা। তার ফলাফলটা স্বভাবতই হল অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত, অকল্পিত। আজকে লোকের আয়ু বেড়ে কোথায় উঠেছে সেটা তো একটু আগেই উল্লেখ করলাম। এখন কোন কোন বিশেষজ্ঞ এমনও বলতে শুরু করেছেন যে দুএকশ’ বছরের মধ্যে এই আয়ু ৫০০ তে ঠেকতে পারে! এবার বুঝুন। আজকে আমরা যাদের আদর করে বলি ৮০ বছরের তরুণ, সেসময় হয়ত লোকে বলতে শুরু করবে ৫০০ বছরের তরুণ!
  এসব দেখেশুনে মনে হতে পারে যে অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই আশাবাদী ভবিষ্যদবানীগুলোই হয়ত বেশি বিশ্বাসযোগ্য ছিল। শেষ পর্যন্ত হয়ত তাঁদের বর্ণিত ‘অব্যাহত উন্নয়ন’ই সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। মানুষের জয়জয়াকার চিরকালই চলতে থাকবে অপ্রতিহত গতিতে। তাঁদের কল্পিত ‘আদর্শ পৃথিবী’ সত্যি সত্যি সৃষ্টি করে ফেলবে ভবিষ্যতের মানুষ।
 কিন্তু তাই কি? বর্তমান বিশ্ব কোন্দিকে এগুচ্ছে তার একটা মোটামুটি ধারণা তো হলই আমাদের। এর পরিপ্রেক্ষিতে সত্যি কি মনে হয় যে, জনসংখ্যা যতই বেড়ে থাকুক, মানবজাতির জয়যাত্রা একটুকুও দমে যাবে না তাতে? আমাদের বিজয়পতাকা চির উড্ডীন থাকবে পাঁচশ’ বছর আগে যেমন ছিল ঠিক সেভাবেই? আমার মনে হয়না।
  আসলে মানবজাতির প্রাণশক্তি যেমন দুর্দমনীয়, যেমন তার ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া, প্রতি মুহূর্তে উর্ধমুখি তাকিয়ে থাকা যেমন তার স্বাভাবিক প্রকৃতি, তেমনি কি সে আপন মানবিক প্রবৃত্তি আর দুর্বলতার কাছে চিরবন্দী হয়ে নেই? সভ্যতার ইতিহাসে একটা জিনিস প্রায় সবসময়ই অপরিবর্তিত থেকেছে---সেটা হল যে আমরা কখনোই ভারসাম্য রক্ষা করতে পারিনা। যখন ওপরে উঠি তখন নিচের দিকে তাকাতে ভুলে যাই, আবার যখন নিম্নগামী হই তখন নিজের দোষত্রুটিগুলো পরীক্ষা করে সেগুলো শুধরাবার চিন্তাটিকে প্রশ্র দিই না। বরং নিজের ত্রুটির দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করি। পৃথিবীর বড় বড় সভ্যতাগুলোর আকৃতিপ্রকৃতি স্বতন্ত্র হলেও একটা বিষয়ে তারা ছিল একেবারে অভিন্ন। তারা গৌরবের শীর্ষে আরোহণ করেছিল প্রায় একই কারণে, আবার পাতাল গহ্বরে পতিতও হয়েছিল প্রায় একই কারণে। ওপরে উঠেছে প্রধানত তাদের চারিত্রিক উৎকর্ষের কারণে, অবতরণ করেছে চারিত্রিক স্খলনের কারণে। মূল বস্তু হলঃ চরিত্র। সেটি, আমার মতে, প্রকৃতির অন্যতম সার্বজনীন সত্য। চরিত্র মানুষকে উর্ধগামী করে যেমন, অধোমুখিও করে তেমন।
  বর্তমান যুগ হাজারগুণ বেশি উন্নত আগের তুলনায়। আমরা চন্দ্রগহে আরোহন করেছি, মহাশূন্যের বিপুল রহস্যাদি উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। আজকে বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে শিশু উৎপাদনের কথা বলতে শুরু করেছেন, হয়ত আগামী দশ বিশ বছরের ভেতরে তারা সত্যি সত্যি করেও ফেলবেন। কিন্তু তারপর? তারপর কোথায় গন্তব্য আমাদের? আমাদের হাতে আজকে অজস্র যন্ত্র---ঘরে ঘরে ইলেক্ট্রনিক দ্রব্যের সমাহার। আজকে গাড়ি স্টার্ট দিতেও চালককে গাড়ির ভেতরে ঢুকতে হয়না কম্পিউটারে বোতাম টিপলে আপনি নিজের বাড়ির পুরো মানচিত্রটি দেখতে পাবেন স্ক্রীনে। ফেইসবুকের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোন দেশের যেকোন জায়গায় যেকোন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে পারবেন। নিজেদের অজান্তে আজকের মানুষ একটা বিকল্প বশ্যতার বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে---সে বশ্যতাটি হল যন্ত্রের কাছে, প্রযুক্তির কাছে। নিজেদের অজ্ঞাতে আমরা আত্মসমর্পণ করে ফেলেছি প্রযুক্তির কুশীলবদের কাছে। আধুনিক মানুষ একাধারে মুক্ত মানুষ, ও বন্দী মানুষ। প্রাচীন যুগের মানুষ শেকল পরত পেটের দায়ে, অনিচ্ছায়। আমরা শেকল পরেছি প্রাচুর্যের পরিবেশে, স্বেচ্ছায়, সানন্দে।
  তাহলে কি কোনও আশা নেই আমাদের? না, আছে। মানবজাতির এ আরেক বৈশিষ্ট্য। যখন পিঠ ঠেকে যায় দেয়ালে তখন মানুষ কি অলৌকিক শক্তিবলে আবার  সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চিন্তা করতে শেখে। তার নেশার ঘোর কেটে যায়। তখন সে পরিচিত পথের চিহ্ন খুঁজে পায় মানচিত্রে। আমাদের পিঠ এখনও ঠিক দেয়াল স্পর্শ করেনি। কিন্তু করবে, অচিরেই হয়ত করবে----নিজেদেরই সেই মূঢ় নেশার কারণে। তারপর ঠিক আগেরই মত, প্রকৃতিরই আপন নিয়ম অনুসারে, আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারব। প্রযুক্তির সাথে সমাসনে স্থান দিতে পারব জীবনদর্শনকে, আত্মনিরীক্ষণকে।

অটোয়া

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে