Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২০ , ১৫ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (58 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-২২-২০১২

আমি বিচার চাই  তাসরীনা শিখা

আমি বিচার চাই 

তাসরীনা শিখা

আমি মিতালী। আমি বাংলাদেশের মেয়ে। বাংলাদেশের আলো বাতাসে আমি বড় হয়েছি। আমার দিদি দীপালী আর দাদা অজয়। আমরা তিন ভাইবোন আর বাবা মা । পাঁচজনের সুখের সংসার ছিল আমাদের। আমার বন্ধুরা আনোয়ারা, সুফিয়া,পারুল ওদের সাথে কত সকাল, কত বিকেল কাটিয়েছি। হাডুডু, গোল্লাছুট খেলায় মাতিয়ে রেখেছি পাড়ার খেলার মাঠটি। দাদার বন্ধুরা কামাল, মাসুদ ওরা সব আমাদেরও দাদার মত ছিলেন। কত না ভালোবাসতো ওরা আমাদের। ঈদ এলে আনোয়ারা, সুফিয়া পারুল সবাই নতুন জামা বানাতো, আমরাও মাকে বায়না ধরতাম ,আমাদেরও নতুন কাপড় চাই। ওরা ঈদ করবে আমরা কেন করবো না?  মা আমাদেরও নতুন জামা করে দিতেন। আমরা সবাই মিলে আনন্দ করে ঈদ করতাম। পূঁজোর সময়ও একই ব্যাপার ঘটতো। আমার বন্ধুরা, দিদির বন্ধুরা, দাদার বন্ধুরা সবাই আসতো আমাদের বাড়ীতে। সবাই মিলে কত না আনন্দ করতাম পূজোতে। সময় কেটে যাচ্ছিল এভাবেই। এলো ১৯৭১। ২৫ শে মার্চেও কাল রাত্রির পর থেকে একে একে চুড়মার হয়ে ভেঙে গেল আমাদের সুখের সংসার, যা কোন দিন আর জোরা লাগলো না।

২৫শে মার্চের পর আতœীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব সবাই যার যার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ছিটকে গেল। দাদা, কামাল ভাই ,মাসুদ ভাই ও কয়েকজন মিলে একদিন রাতের অন্ধকারে চলে গেলেন ভারতে মুক্তি যুদ্ধ করার জন্য। দাদা যাবার আগে বাবাকে বলে গেলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাবা যেন আমাদের নিয়ে চলে আসেন। দাদা ব্যবস্থা করে রাখবেন আমাদের জন্য। আমরাও মোটামুটি প্রস্তুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য। সেদিন ছিল ৩রা এপ্রিল । একদিন পরই আমরা রওয়ানা হব। দাদার বন্ধু আনোয়ার ভাই আমাদের সাথে থাকবেন ,দাদা সেরকম ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। গভীর রাতে দরজায় ধুম ধুম করে ধাক্কা, দত্তবাবু দরজা খুলুন। বাবা ভেতর থেকে জবাব দিলেন, কে আপনি? দরজার ওপার থেকে জবাব এলো ,আগে দরজাটা খুলুন দত্ত বাবু আমার মহা বিপদ। মা বাবাকে পেছন থেকে টেনে ধরলেন দরজা না খোলার জন্য। বাবা মাকে চোখের ঈশারায় জানালেন কিছু হবে না। দিদি মার পেছনে মাকে জরিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকলো। আর আমি কাপড় বোঝাই আলনার পেছনে লুকিয়ে বসে থাকলাম। বাবা দরজা খুললেন। দরজা খোলার সাথে সাথে কয়েকজন পাকিস্থানী সৈন্য বাবাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঘরে ঢুকে পরে। সাথে সে লোকটিও যে বাবাকে বিপদের কথা বলে দরজা খোলালো । একজন সৈন্য বাবাকে দাদার কথা জিজ্ঞেস করলো। আর বাকীরা  সারা বাড়ীটা তছনচ করলো দাদ্রা খোঁেজ। কিনÍু তারা আলনার পেছনটা দেখলো না। আমি মুক্তি পেলাম হানাদারদের হাত থেকে। কিন্তু দিদির মুক্তি ঘটলো না । দাদাকে খুঁজে না পেয়ে ওরা দিদিকে টেনে আনলো মার পেছন থেকে। বাবার দিকে তাঁকিয়ে উর্দূতে বললো তোমার ছেলেকে যখন পেলাম না তোমার মেয়েকেই নিয়ে যাই। বাবা মা চিৎকার করে দিদিকে জরিয়ে ধরলেন , মা বললেন না না আমার মেয়েকে নিও না, আমাকে নিয়ে যাও। বাবা ওদের পা জরিয়ে ধরলেন হাউ মাউ করে কেঁেদ বললেন তোমরা আমাকে গুলি করে মেরে ফেল কিন্তু আমার মেয়েকে নিও না। ওরা বাবার কথা শুনলো। লাথি মেরে বাবার পা ছাড়িয়ে বাবাকে গুলি করলো কয়েকবার  কিন্তু দিদিকে রেখে গেল না। মার দিদির আতœ চিৎকারে সারা এলাকার বাতাস ভারী হয়ে গেল। একজন যুবক বয়ষের সৈন্য বেড়িয়ে যাবার সময় আমার মাঝ বয়ষী মাকে লাঞ্ছিত করে গেল।  ্একটি মানুষও ভয়ে সেদিন বের হয়নি বাড়ী থেকে। ঈশ্বরও মনে হয় সেদিন মুখ লুকিয়ে ছিলেন। আর আমি চৌদ্দ বছরের একজন কিশোরী ঘেমে চুপচুপ হয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ভয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে সব ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে রইলাম।

দিদিকে নিয়ে গাড়ীর শব্দ মিলিয়ে গেলে আমি আলনার পেছন থেকে বেড়িয়ে এলাম। মা অজ্ঞানের মত পড়ে আছেন। আমি একছুটে বাড়ী থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। আমাদের পাশের বাড়ীর বশীর চাচার দরজায় স্বজোরে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করতে লাগলাম, চাচা দরজা খুলুন , দরজা খুলুন। কিন্তু দরজা খোলার আগেই আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন বশীর চাচা চাচীকে আমার পাশে দেখতে পেলাম। বশীর চাচা ছিলেন নিঃসন্তান । আমাদের এলাকার প্রতাপশালী ব্যক্তি। চাচা লোকজন ডেকে বাবার শেষ কাজের ব্যবস্থা করলেন। নিরাপত্তার কারনে রীতি অনুযায়ী কিছু করা সম্ভব হলো না । আমার বাবার মৃত দেহ শ্বশানে গেল না।
বাবার রক্তের দাগ মেঝে থেকে ঘসে ঘসে উঠানো হলো। আমাদের বাড়ীর সামনের দরজায় তালা ঝুলিয়ে আমাদের নিয়ে উঠালেন চাচা  তাঁর বাড়ীতে। চাচা চাচী মাকে অনেক বুঝালেন ভারতে চলে যাবার জন্য ্ বশীর চাচা বললেন তিনিই যাবার ব্যবস্থা করে দিবেন ্ কিন্তু মা যেতে রাজী হলেন না। মার বিশ্বাস দিদি ফিরে আসবে। বাবা রয়ে গেছেন এখানকার মাটিতে কাজেই মা কিছুতেই যাবেন না। আমরা মোটা মুটি নয় মাস বশীর চাচার বাড়ীতেই থাকলাম। বশীর চাচা আমাদের আগলে রেখেছিলেন নয়টি মাস। মা কখনো হাউমাউ করে কাঁদেন ,কখনো নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকেন । সারা রাত ঘরময় হেঁটে বেড়ান । আমিও মার পিছে পিছে হাঁটি। মা তাকিয়ে থাকেন আমাদের বাড়ীটির দিকে যদি দিদিকে তারা ফিরিয়ে দিয়ে যায় সে ভেবে। মার বিশ্বাস বাস্তবে পরিনত হলো। সেদিন ছিল দশই ডিসেম্বর । সবাই বুঝে নিয়েছে মুক্তি আসন্ন। রাত ভোর হয় হয়, আবার সেই মিলিটারী জিপের শব্দ। গাড়ীটি আমাদের বাড়ীর সামনে এসে থেমে গেল। মিনিট পাঁচেক পরে আবার চলেও গেল । মাতো সারা রাত জেগে আমাদের বাড়ীর দিকে তাঁকিয়ে থাকেন দিদির অপেক্ষায়। মা বললেন ওরা কি যেন রেখে গেল ।্ মা তক্ষুনি বেড়িয়ে দেখতে চাইলেন কি রেখে গেল ওরা। আমরা মাকে ধরে রাখলাম ভোর হোক তখন দেখা যাবে। ভোরের আলো ফোটার আগেই মার অস্থিরতায় আমরা গেলাম আমাদের বাড়ীতে। । দেখলাম দিদি পরে আছে বারান্দায়্ । আমার মনে হলো-- না এতো আমার দিদি না। এ যে কংকালশার একটি মেয়ে যার শরীরে হাড় আর চামড়া ছাড়া কিছু নেই। ময়লা একটা শাড়ী গায়ে জড়ানো। এলো মেলো চুল । হাড় চামড়ার শরীরটাতে টিল টিলে একটা পেট জেগে আছে । দিদি অন্তস্বর্তা। ওরা দিদিকে রেখে গেছে। অসুস্থÍ দিদিকে তাদের দরকার নেই। মা, চাচী মিলে দিদিকে গোসল করালেন। পরিষ্কার কাপড় পরালেন। আমার দিদি একটি কথাও বললো না। কারো প্রশ্নের কোন জবাব দিল না। ফিরে আসার তিন দিন পর দিদি ফ্যানে ঝুলে আতœহত্যা করলো।
১৬ই ডিসেম্বর। বিজয়ের আনন্দে সবাই আতœহারা। আমরা কোন আনন্দ অনুভব করলাম না। বিজয় আমাদের মাঝে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলো না। বিজয়ের জন্য আমরা  সব হারিয়েছি। দাদা ফিরে এলেন বিজয়ীর বেশে। কিন্তু আনন্দ ফিরে এলো না আর আমাদের সংসারে। দাদা শোকে কাতর হয়ে থাকলেন বহুদিন। তারপর আবার জীবন শুরু । জীবনতো থেমে থাকার নাম না। আর আমি একজন কিশোরী শোকের বোঝা কাঁধে নিয়ে পথ চলা শুরু করলাম। দাদা সংসারী হলেন। আমি পারলাম না। যে ফুলেফুলে ভরা সংসার আমার সামনে ভেংগে চু’রমার হয়ে গেল, আমার আর ইচ্ছে হলো না নতুন করে সংসার করার । আমার বয়ষ এখন ৫৪। আমি চাকুরী করি ্ আমার জীবনে সকাল আসে আবার রাত হয়। বেঁচে  থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন আমি ততটুকুই করি। বৈশাখের অনুষ্ঠানে গেলে আমার চোখে ভেসে উঠে আমার বাবার ঝোপ ঝোপ লাল রক্ত। বসন্তের উৎসবে মনে পরে আমার দিদির কথা যে দিদি বাসন্তি রং শাড়ী পরে এলো চুলে গাইতেন,“আজি এ বসন্তে”--- সে দিদির ফ্যানে ঝুলে থাকা মৃত দেহ আমার চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়্ । স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে আমার চোখে ভাসে আমার মার লাঞ্ছিত হওয়ার দৃশ্য। এই চল্লিশ বছর যাবৎ আমি কোন আনন্দ করতে পারিনি । চল্লিশ বছর যাবৎ অপেক্ষায় আছি কবে আমি আমার দিদি আমার বাবা আমার মা যিনি অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় ইহকাল ত্যাগ করেছেন, তাদের বলতে পারবো দেখ তোমাদের হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। আর কতদিন আমার মত হাজারো পরিবার অপরাধীদের বিচারের অপেক্ষায় থাকবে? এই চল্লিশ বছর যাবৎ আমাদের বুকে যে আগুন জ্বলছে তাতে একটু শীতল হাওয়া পাওয়ার অধিকার কি আমাদের নেই? হাজারো যুদ্ধ অপরাধী মুক্তি পেয়ে গেছে কিন্তু যারা আছে সাজার অপেক্ষায় তাদের সাজা কবে হবে ? আর কত সাক্ষী প্রমান দরকার? আমার মত শত শত মিতালী, রহিমা যারা বেঁচে আছি তাদের সাক্ষী প্রমানই কি যথেষ্ট নয়?

 

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে