Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (94 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৩-২৬-২০১৫

স্বাধীনতা তোমাকে পাওয়ার জন্য

রানা টাইগেরিনা, টরন্টো, (কানাডা) থেকে


স্বাধীনতা তোমাকে পাওয়ার জন্য

১৯৭১ সালে প্রশিক্ষণরত একদল মুক্তিযোদ্ধা। ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত১৯৭১ এর মে মাসের ১৬ তারিখ গোলবানুর জীবনের এক বেদনাবিধুর দিন। ওই দিন সন্ধ্যারাতে গোলবানুর কাছ থেকে তইজুদ্দিনের শেষ বিদায় নে​ওয়া। তার প্রিয় মানুষটিকে বিদায় দিতে কিছুতেই মনটা চাইছে না। রাতের আঁধারে তইজুদ্দিন রওনা হবে, অনেক দূরের পথ। বহু দূরের পথ পাড়ি দিতে হবে তার। তইজুদ্দিন যাচ্ছে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে। এ ছাড়া বিকল্প কিছুই নেই আর তার সামনে।

দেশের অবস্থা ভালো না। ২৫ মার্চে ঢাকায় অতর্কিতে আক্রমণ করার পর মিলিটারিরা সারা দেশ অভিমুখে ছড়িয়ে পড়ছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সান্তাহার পর্যন্ত আর্মিরা এসে গেলে স্থানীয় অবাঙালি বিহারিরা আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়ে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়তায় সান্তাহার রেলস্টেশনের আশপাশে তাণ্ডবলীলা শুরু করে। সেখানকার অবস্থা মোটেও ভালো নয়। বাঙালি রেল কর্মচারীদের খুন করছে, লুটপাট করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে স্টেশনের আশপাশের গ্রামের বাড়িঘর।
জয়পুরহাট বসে এসব খবর পান তইজুদ্দিনরা। সঙ্গে এ-ও জানতে পারেন, সেনাবাহিনী রেলপথ ধরে এগিয়ে আসছে জয়পুরহাটের দিকে, হিলি বর্ডারে বড় ধরনের ঘাঁটি বানাবে বলে।
জয়পুরহাটে ডিসি অফিসে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তার অফিস সহকারী তইজুদ্দিনের বাবা মিলিটারির ভয়ে ওদের নিয়ে জামালগঞ্জ স্টেশন থেকে দুই মাইল পশ্চিমে জগদীশপুর গ্রামে আশ্রয় নিলেন আজিজ সাহেবের গ্রামের বাড়িতে। গোলবানুর চাচা আজিজুল ইসলাম জয়পুরহাটের নামকরা একজন উকিল। উনিই আগেভাগে তইজুদ্দিনের বাবাকে বলে রেখেছিলেন, যেকোনো বিপদের সময়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার জন্য।
শহরের স্কুলে লেখাপড়া করা ও একটা চাকরিজীবী পরিবারে মানুষ হওয়া তইজুদ্দিনের চালচলন, সুন্দর বাচনভঙ্গি ও মনখোলা কথাবার্তায় গোলবানু এক-দুই দিনের মধ্যে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ল। অন্যদিকে অজ পাড়াগাঁয়ে এসে একা ঘুরতে ভালো না লাগায় গ্রাম্য স্কুলের এক সপ্তম শ্রেণির গোলবানুর সাহচর্য পেতে আগ্রহী হয়ে উঠল তইজুদ্দিন। সেই থেকে গোলবানুর সঙ্গেই ঘুরে বেড়াতে লাগল বিলের ধারে, পুকুর পারে আর আম-কাঁঠালের বনে। ত্রয়োদশী গোলবানুর মনের প্রায় পুরো অংশই দখল করে ফেলল সরলপ্রাণ, দিলদরিয়া ও স্পষ্টভাষী শহুরে বাবু তইজুদ্দিন। অব্যক্ত এক উদার ভালোবাসার পাখা মেলতে শুরু করল গোলবানুর মনে। তইজুদ্দিনও বিমুগ্ধ হলো সারল্যতায় ভরা গ্রাম্য বালিকার অদ্ভুত আতিথেয়তা।
রেলপথে এসে জামালগঞ্জ স্টেশনে ছোট একটা ক্যাম্প বানাল পাকিস্তানি আর্মিরা। লোকাল মুসলিম লীগ আর জামায়াতে ইসলামীর পাতিনেতা ও লোকদের নিয়ে সৃষ্টি করল শান্তি কমিটি।
একদিন আজিজ সাহেবের সঙ্গে তইজুদ্দিন গেল সেই শান্তি কমিটির প্রধান রইচ মিয়ার বাড়িতে। আজিজ সাহেবের চেনাজানা বিধায় সৌজন্যসাক্ষাৎ​ ও দেশের হালহকিকত জানতে গেলেন তিনি। তা ছাড়া বাড়িতে জয়পুরহাট থেকে আগত মেহমান রয়েছে, পাছে কোনো বিপদ আপদে না পড়তে হয়, সেই উদ্দেশ্যও ছিল আজিজ সাহেবের।
রইচ মিয়া জিজ্ঞাসা করল, কী পড়?
ভদ্রভাবে জবাব দিল তইজুদ্দিন, ‘ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ার, জয়পুরহাট কলেজে।’
তুমি কি বন্দুক চালাতে জানো? আবারও প্রশ্ন করে রইচ মিয়া।
‘না, মাথা নাড়াল তইজুদ্দিন। তবে এয়ারগানে পাখি শিকার করতে পারি।’
শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিরাপত্তার খাতিরে পাওয়া একটা রাইফেল ওর হাতে দিয়ে রইচ মিয়া বলল, ‘ওটা তোমাকে চালান শিখাব। আরেক দিন আসো।’
‘ঠিক আছে, রাইফেলটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে উত্তর দিল তইজুদ্দিন, সময় করে আসা যাবে।’
চা খাওয়ার পর রইচ মিয়া একটা রাইফেলের বুলেট দিল তইজুদ্দিনের হাতে।
বলল, ‘ছোট্ট একটা উপহার তোমাকে দিলাম।’
আজিজ চাচার চোখের দিকে তাকিয়ে সেটা হাতে নিল কিন্তু ভয় পেল তইজুদ্দিন। বুলেট আবার কী ধরনের উপহার হতে পারে।
জীবনে এই প্রথম রাইফেল ও বুলেট এত কাছ থেকে দেখল তইজুদ্দিন। আজিজ চাচার কাছে পরে জানল সেটা থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল আর বুলেটটা হচ্ছে সেই থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের।
ঘরে ফিরে বুলেটটা খুব গোপনে গোলবানুকে দেখাল।
তারপর দুজনে মিলে গোয়ালঘরের দেয়ালের মাটির এক ফোকরে সেটাকে লুকিয়ে রাখল।
পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে নিরীহ মানুষদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে অযথা নির্যাতন চালাতে লাগল। সাধারণ সব গোবেচারা গ্রামের কৃষক ও দিনমজুরদের ধরে নিয়ে পেটাতে পেটাতে বলতে লাগল,
‘অ্যাই জলদি বাতাও, মুক্তি কাহা হ্যায়, মুক্তি। হিন্দু সব কিধার গিয়া?’
পরে শান্তি কমিটির দালাল ও রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে সেনারা গ্রামে গ্রামে চষতে লাগল আর খুঁজতে লাগল স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের বগুড়া শাখা থেকে লুট করা রুপির বান্ডিল। লুট করা রুপি জিপে করে ইন্ডিয়া পাচার করার সময় জামালগঞ্জে গ্রামবাসী কর্তৃক জিপটি পুনর্বার লুট হয়।
একদিন রইচ মিয়ার শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের সঙ্গে মিলিটারির দল জগদীশ গ্রাম টহল দিতে এল। গ্রামের পুরুষ ও নারীরা যে যার মতো আত্মগোপন করল। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও বাচ্চারা শুধু সামনে থাকল।
ভয়ে তইজুদ্দিনের বড় বোন গোলবানুর সঙ্গে আখখেতে লুকিয়ে রইল।
তইজুদ্দিন দূরে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে এই প্রথম সে জালে মোড়ান জলপাই রঙের হেলমেট পরা চাইনিজ রাইফেল ঘাড়ে পাকিস্তানি হানাদারকে চাক্ষুষ দেখল।
পরে জানল জিজ্ঞাসাবাদের নামে কিছু নিরীহ খেটে খাওয়া দিনমজুরকে তারা ধরে নিয়ে গেছে।
কলেজ পড়ুয়া টগবগে তরুণ তইজুদ্দিন এসব দেখে কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না। শুধুই তার মনে হচ্ছিল, কিছু একটা করা দরকার।
জগদীশপুর গ্রামের এক বয়োজ্যেষ্ঠ ভাই, একই কলেজের বিএ ক্লাসে পড়তেন নাম মোশাররফ। তার সঙ্গে আলাপ হলো একদিন। শুনেটুনে সিদ্ধান্ত নিল তার সঙ্গে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখাবে।
তইজুদ্দিনের মা ও বোন সাহস জোগাল এবং উৎসাহিত করল কিন্তু বাবা রাজি হচ্ছিলেন না।
সর্বোপরি গোলবানুরও সায় ছিল না মুক্তিবাহিনীতে যাওয়ার। কারণ ইতিমধ্যে গোলবানু শয়নে স্বপনে তইজুদ্দিনের সঙ্গে ঘর বাঁধার এক দিবাস্বপ্ন দেখা আরম্ভ করেছে। মনে মনে বিনা রংতুলিতে কল্পনার ছোঁয়ায় সংসার ছেলে-মেয়েদের এক অস্পষ্ট প্রতিকৃতি আঁকতে শুরু করে দিয়েছে।
সে ভাবতে শুরু করেছে, দেশের গন্ডগোল শেষ হলে দেশ যখন স্বাধীন হবে, তখন তাদের বিয়ে হবে। নববধূ সেজে শহরে যাবে সে ঘরসংসার করতে।
তইজুদ্দিনের মা ও বোনকে গোলবানুর খুব ভালো লাগে। তাদের কী সুন্দর ব্যবহার! দেখে ও মুগ্ধ হয়। খেয়াল করে দেখে তারা কথা বলেন কত গুছিয়ে। শহরের মানুষজন বড়ই সুন্দর হয়।
তাই গোলবানু সব সময় চেষ্টা করে শহর থেকে আসা এই মানুষ কয়টির খেদমত করতে। বিশেষভাবে চেষ্টা করে তইজুদ্দিনের মা ও বোনের মন জোগাতে। সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখে গ্রামের পরিবেশে তাঁদের যেন কোনো কষ্ট না হয়।
শুধু তইজুদ্দিনের বাবার রাশভারি গুরুগম্ভীর চেহারা দেখে ভয় পায় গোলবানু।
মে মাসের ১৬ তারিখ রাতের খাওয়া সেরে মোশাররফ ভাইয়ের সঙ্গে রওনা হয় তইজুদ্দিন। সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়।
সে মুহূর্তে গোলবানুর কলিজাটা বুক চিরে বের হয়ে আসতে চায়।
এ কেমন ভালো লাগা আর ভালোবাসা। এক অচেনা বেগানা পুরুষের জন্য এ কী মায়া? কেন হৃদয়ের তানপুরার তার ছিঁড়ে ছ্যাড়াব্যাড়া হয়ে যায়। কিছুতেই সে বিদায় দিতে পারে না।
তইজুদ্দিন এতসব ভাবে না। তার এখন চিন্তা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে পাকিস্তানি হায়েনাদেরকে বিতাড়িত করে দেশকে হায়েনামুক্ত করা।

দুই.
১৬ মে তারিখের পর থেকে রাতে গোলবানুর চোখে ঘুম আসে না। প্রতিটি রাত নির্ঘুম কাটে।
সারা রাত দুঃস্বপ্নের ঘোরে কেটে যায়।
একদিন তন্দ্রায় স্বপ্নের মতো গোলবানু দেখে তইজুদ্দিন ওকে ডাকছে।
‘গোলবানু, এই গোলবানু! এত ঘুমাও কেন? ওঠো দেখ, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে আমরা এখন মুক্ত।’
গোলবানুর তন্দ্রাচ্ছন্নতা কেটে যায়। দেখে পূর্ব আকাশ ফরসা হয়ে গেছে। পাড়ার মসজিদ হতে সুমধুর আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
গোলবানু ভাবে ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। তাহলে সত্যিই কি একদিন দেশ স্বাধীন হবে।
সত্যিই কি ও শহরে যেতে পারবে নিজের একটা সুখের ঘর বাঁধতে।
তইজুদ্দিন চলে যাওয়ার প্রায় মাস দুয়েক পরে হঠাৎ একদিন গোলবানু লোক মারফত একটা চিরকুট পায়। তাতে জানতে পারে তইজুদ্দিন ভালো আছে। মুক্তির ট্রেনিং শেষ হয়ে গেছে। খুব শিগগির একটা বড় ধরনের অপারেশনে যাবে তার দল।
রইচ মিয়ার ওখানে পরে এক সময় তইজুদ্দিনের যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তার দেখা আর না পাওয়ায় রইচ মিয়ার মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। আজিজ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলে উনি বলেছিলেন সে তো তাদের দেশের বাড়ি ফরিদপুরে চলে গেছে অসুস্থ দাদাজানকে দেখতে।
কিন্তু শয়তান রইচ মিয়া বিশ্বাস করে না তাই একদিন রাজাকার দলপতিকে লাগিয়ে দেয় তইজুদ্দিনের বাবাকে ধরে নিয়ে আসতে। হঠাৎ একদিন রাতের আঁধারে সেই রাজাকার দুই সঙ্গী সঙ্গে নিয়ে এসে তইজুদ্দিনের বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। তইজুদ্দিনের মা অনেক অনুনয় ও অনুরোধ করা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হয় না।
রইচ মিয়া তইজুদ্দিনের বাবাকে পাকিস্তানি আর্মির হাতে তুলে দেয়।
এই বলে যে, ‘ইয়ে আদমি মুক্তি কা বাপ।’
জামালগঞ্জ রেলস্টেশনের ক্যাম্পের টর্চার সেলে তইজুদ্দিনের বাবার ঠাঁই হয়। আজিজ সাহেব বহু চেষ্টা ও দেন দরবার করেও হায়েনাদের হাত থেকে উনাকে ছাড়াতে ব্যর্থ হন।
শুরু হয় সকাল-সন্ধ্যা অমানুষিক নির্যাতন।
মিলিটারিরা জিজ্ঞাসা করে, ‘বোল, তেরা লাড়কা কিধার হ্যায়? বোলাও লাড়কা কো, বারনা জানছে মার ডালুঙ্গা।’
তইজুদ্দিন জানতেও পারে না ওর বাবা টর্চার সেলে আটকা পড়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
আগস্ট মাসের মাঝামাঝি এক মধ্যরাতে গোলবানু শুনতে পায় প্রচণ্ড গোলাগুলির আওয়াজ। মনে মনে ভাবে, এই বুঝি তইজুদ্দিন এসে পড়েছে।
জগদীশপুর গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিমে পাহাড়পুর এলাকা হতে পূর্বে জামালগঞ্জ বাজার পর্যন্ত গুলির মুহুর্মুহু শব্দে আশপাশের গ্রামবাসীর ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় সেই রাতে। সবাই আল্লাহকে ডাকতে থাকেন।
তাৎক্ষণিক কোনো খবর পাওয়া যায় না।
কেউ সংবাদ আনতে পারে না, কিসের এত গোলাগুলি। তবে গ্রামবাসীর অনেকেই অনুমান করে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর বিচ্ছুর কামড় পড়েছে। গুলির শব্দ ও ধরন দেখে দুটি পক্ষের মধ্যে তা বিনিময় হচ্ছে বলে গ্রামবাসী ধারণা করতে লাগে।
রাতের অন্ধকারে কেউ কেউ দেখতেও পায় ফুল্কি দিয়ে আগুনের বুলেট ছুটছে একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ভোর অবধি চলে সেই বুলেটের ছোটাছুটি।
সকালে জানা গেল, মুক্তিবাহিনীরা ঝটিকা আক্রমণ করেছিল পাকিস্তানি ফৌজদের ক্যাম্পে। তাতে দুজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে আর বেশ কয়েকজন হয়েছে আহত। প্রকৃতপক্ষে আরও বেশিসংখ্যক ফৌজ ঘায়েল হয়েছিল কিন্তু খানসেনারা তা প্রকাশ করেনি।
ওদিকে দুঃসাহসিক সেই সম্মুখযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর একজনও নিহত না হলেও রইচ মিয়ার সাগরেদ রাজাকারদের সহায়তায় তইজুদ্দিনসহ কয়েকজন মুক্তি ধরা পড়ে ভোরবেলায় ফিরে যাওয়ার পথে।
রইচ মিয়া রাক্ষুসে ৩২ দাঁত বের করে হাসতে থাকে আর ধরা পড়া বাংলার বীর সেনানীদের তুলে দেয় হানাদারদের হাতে।
এই দুঃসংবাদ আসে তইজুদ্দিনের মা ও বোনের কানে। একদিকে স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল এরপর ছেলের খবরে অসহায় মা বারবার মূর্ছা যেতে লাগলেন।
গোলবানুও জানতে পারে বিষয়টা। তার বুকটা কুঁকড়ে ওঠে অসহ্য ব্যথায়।
পাকিস্তানি বাহিনীরা জলজ্যান্ত সদ্য ধৃত তাজা মুক্তিবাহিনী পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। জামালগঞ্জ থেকে তাঁদের স্থানান্তর করে জয়পুরহাটের বড় ক্যাম্পে। সেখানে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় তাঁদের একটা আর্মির লরিতে উঠানো হয়। এরপর শহরের রাস্তায় রাস্তায় পরিভ্রমণ করে শহরবাসীকে দেখানো হয় বীরদর্পে মাথা উঁচু করে থাকা মুক্তিযোদ্ধা কয়টিকে। সেই লরির পেছনে পেছনে কুত্তার মতো হাঁটতে থাকে কুখ্যাত রাজাকারের দল। তারা আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছুড়ে উন্মত্ততা প্রকাশ করতে থাকে।
এরপর লরিটিকে নেওয়া হয় জয়পুরহাট কলেজ ময়দানে। সেখানে স্থানীয় পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতা যিনি শান্তিবাহিনী ও রাজাকারপ্রধান, তিনি কলেজের ছাত্রদের উদ্দেশ করে বললেন, ‘যারা মুক্তিবাহিনীতে যাবে বা নাম লেখাবে, তাদের সবার অবস্থা এ রকমই হবে।’

তিন.
স্বাধীনতা তোমাকে পাওয়ার জন্য তইজুদ্দিন ও তাঁর বাবা হারিয়ে গেল লাখো-কোটি তারকারাজির ভিড়ে ছায়াপথস্থিত উজ্জ্বল নক্ষত্রমণ্ডলীতে। বনে গেল নক্ষত্রবৎ উজ্জ্বল তারকার তারা।
মিটমিট করে জ্বলতে লাগল সারা পৃথিবীর আকাশটায়।
স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে ওই সব মহাপাতকী রাজাকার কুত্তার দল সক্রিয় সুপ্তাবস্থায় অবস্থান নিল।
আর সেই সব পাকিস্তানি হায়েনার দল মানবতাবিরোধী অপরাধ করেও বিনা বিচারে সাধারণ ক্ষমায় মাফ পেয়ে গেল। জঘন্য অপরাধ করেও পার পেয়ে গেল।
ফিরে গেল নিজ দেশে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার সান্নিধ্যে।
সেনা চাকরি হারিয়ে কেউ কেউ তাদের পরিবার নিয়ে পাড়ি জমাল আমেরিকায়-কানাডায়।
এখনো নিউইয়র্ক সিটির কোনো পথে-প্রান্তে কিংবা টরন্টোর রাস্তায় বা কুইবেকের কোনো কর্মক্ষেত্রে সেই সব দন্ত নখরবিহীন পাকিস্তানি হায়েনাদের দেখা গেলে রি রি করে ওঠে গা।
শীতকালে যখন সেসব স্থানে পেঁজা পেঁজা তুষার ঝরে, মনে হয় নভোমণ্ডল থেকে সেই সব তারকাযোদ্ধারা ঘৃণায় খাবলা খাবলা থুতু ছিটাচ্ছে ওই সব হায়েনার মুখে।

চার.
ওদিকে গোলবানুর শহরে যাওয়ার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল।
নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মুক্তিযোদ্ধা ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হলো। তাদের প্রথম সন্তান হলো ফুটফুটে একটা মেয়ে, যার নাম রাখল ‘মুক্তি’।
বছরান্তে গোলবানু জগদীশপুর গ্রামে বাপের বাড়ি যখন আসে, তখন সে একান্ত চুপিসারে গোয়ালঘরে দেয়ালের ফোকরে তইজুদ্দিনের রাখা সেই থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের বুলেটটি দেখে। আর হাত বুলিয়ে স্পর্শ করে আবারও রেখে দেয় সেখানটায়।

(লেখক কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসেসে কর্মরত। ই-মেইল: [email protected])

 

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে