Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯ , ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (78 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-২৫-২০১৫

‘২৫শে মার্চ রাতে আমি ছিলাম প্রেসক্লাবে, একা’

ফয়েজ আহ্‌মদ


‘২৫শে মার্চ রাতে আমি ছিলাম প্রেসক্লাবে, একা’
ঢাকার রাস্তায় বেসামরিক লোকদের মারছে পাকিস্তানি সেনারা, ১৯৭১

২৫ শে মার্চ সকাল থেকেই আমরা অনুভব করেছিলাম যে পাকিস্তান বাহিনী হয়তো আজই আক্রমণ শুরু করতে পারে। আমরা ইয়াহিয়া খানকে তখন ঢাকায় পেয়েছিলাম, ভুট্টো ঢাকায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের লেফট সাইডের এবং মুসলিম লীগের বিখ্যাত, বিখ্যাত নেতারা তখন অনেকেই এই ক্রাইসিস পিরিয়ডে ঢাকা এসেছিলেন। ইয়াহিয়া খান প্রথম ভাব করেছিলেন যে তিনি কোন একটা মিমাংসামূলক প্রচেষ্টায় ঢাকায় আসছেন; অ্যাকচুয়ালি ব্যাপারটা তা নয়। তাদের আয়োজন—আক্রমণের ব্যবস্থা, সমস্ত কিছুর প্রযোজনে তারা আরো একটু সময় চেয়েছিল এবং আলোচনার উছিলা করে, সময় ক্ষেপণ করে, অস্ত্র আমদানি করা হচ্ছিল। এমন কি ভারত যখন নাকি ওভার-ফ্লাই করতে দিলো না পাকিস্তানকে অস্ত্র নিয়ে, ইস্ট পাকিস্তানে, তারা তখন চীন হয়ে আসার চেষ্টা করলো।

আমরা দুইজন পাইলটকে পেয়েছিলাম। আমি আর আমার এক বন্ধু—যে নাকি স্বরাজ পত্রিকায় আমাকে সাহায্য করেছে—এম আর আখতার মুকুল, আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আমাদের কাছে তার আগের দিন মানে ২৪ তারিখ দুইজন খুব স্মার্ট লোক এসে উপস্থিত, বিকালবেলা, সন্ধ্যার আগে এবং তারা এসে বললো–এই কাগজে প্রমাণ যে এটা চীন হয়ে এই প্লেন আসছে। দেখা গেলো এটা একটা লগ-বুকের দু’টি পাতা। প্লেন যারা চালায় সেই পাইলটদের লগ-বুক থাকে, সেই লগ-বুকে সমস্ত লেখা থাকে টাইমলি কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে, প্লেনের কী অবস্থা। সেই লগবুকের পাতা—দুটো তারা নিয়ে এসেছে এবং ঐ লগ-বুকটার ঐ পাতাতে এনডোর্স করা আছে—উড়ুমচি। উড়ুমচি হচ্ছে চীনের উত্তর অঞ্চলের প্রদেশের রাজধানী এবং উড়ুমচি হয়ে, ওরা ওখান থেকে তেল নেয়, পাকিস্তান থেকে উড়ুমচি আসে, উড়ুমচি থেকে ঢাকায় আসে।

তারা কয়েকদিন যাবৎ এইভাবে সোলজার এবং অস্ত্র আনছিল চায়না হয়ে ঘুরে, কারণ ভারতের উপর দিয়ে আসতে বাঁধা ছিল। তো এই উড়ুমচি ওখানে এনডোর্স করা ছিল, ঐ কাগজে—সেই পৃষ্ঠা দুটো আমাকে দেওয়া হয়। তো আমি আর মুকুল তখন দেখে তো অবাক—যে এই দুই পাইলট উপস্থিত এখানে—এরা দু’জন বাঙালী পাইলট। এরা আর্মির লোক। এখন এই দু’জনের এই কাগজটা নিয়ে আমি চলে গেলাম শেখের কাছে, গিয়ে তাকে দিয়ে বললাম—এই যে দেখেন প্রমাণ যে চায়নার মাধ্যমে সোলজার আসছে এবং অস্ত্র আসছে। সে পেয়ে খুব খুশি, কারণ সে সাহায্য পাইল। তো আমরা চলে এলাম, পাইলট দু’জনও চলে গেলো। শেখ সাহেব বিকাল বেলা এটা পেয়ে এটা নিয়ে সে ইয়াহিয়া খানকে দেখিয়েছে যে—তোমার সোলজাররা চীন হয়ে আসছে, এই যে প্রমাণ দেখো, এই লগ-বুকে দস্তখত করা আছে উড়ুমচি এয়ারপোর্ট; তোমাদের লোক এসেছে, এই প্লেনটাই ঢাকায় আসছে তার নাম্বার (…এত এত)।

এটা খুব বড় কাজ হয়েছে। আমি সেদিন রোজকার মতোই সন্ধ্যার পরে—আমরা জনা ১০/১২ জন রিপোর্টার প্রতিদিন শেখের বাড়িতে যেতাম। এটা রুটিন ওয়ার্ক ছিল, বিভিন্ন পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টাররা ছিল, কোন কোন সময় এডিটর ছিল, কেউ সাব এডিটর ছিল এবং রিপোর্টার ছাড়াও অন্য লেখক–তারা থাকতো এবং তারা—শেখের কথাবার্তা শোনার জন্য আমরা যেতাম; কী বলে—প্রতিদিন। সহজ কথা হইছে, তখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে এবং সরকারী সমস্ত অফিস—পাঁচ লক্ষ লোক তখন স্ট্রাইক করে, ধর্মঘট করে–সরকারী কর্মচারীরা কেউ অফিসে যায় না, সব—রুমগুলি তালা বন্ধ, সেক্রেটারিয়েটসহ! এই অবস্থায়—শেখ সাহেবের নির্দেশেই, তার বাড়ি থেকে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা চলতো তখন। তো এই অবস্থার মধ্যে আমরা ২৫ তারিখের সন্ধ্যার পরে, হঠাৎ শেখের বাড়িতে আসলো সীমান্ত গান্ধীর ছেলে এবং তাকে বলে গেলো যে এরা আক্রমণ করবে, তোমাদের এই অনুমানটাই কারেক্ট এবং আমিও তোমার সাথে শেষ দেখা করে গেলাম। সে আমাদের পক্ষের লোক ছিল।

সন্ধার আগে ঘটনা, আমরা রোজই ঐ সময় থাকি, এই কয়দিন যাবত। রাতে প্রায় ৯টার দিকে দেখলাম যে শেখ সাহেব কারো কথা মানতে রাজি না; উনি বলছে যে তোমরা চলে যাও, যার যার পথে। আমি আমার ব্যবস্থা করবো এবং কী ব্যবস্থা করবেন তা কিন্তু বলছেন না আমাদেরকে। তখন তাজউদ্দিন সাহেব শহীদ নজরুল ইসলাম—এরা সবাই একে একে আসলো এবং তারা তাকে বুঝালো যে আপনি এই জায়গাটা ছাড়েন, এই বাড়িটা ছাড়েন, এই বাড়িতে আক্রমণ হবে। তখন সে বললো যে আমি ব্যবস্থা করবো, কী করতে হবে না হবে আমি জানি, তোমরা আমাকে ছাড়ো এবং তিনি রয়ে গেলেন এবং তার অন্যান্য নেতারা সব চলে গেল। তখন আমি ঐ ১০ টার দিকে, আমি আমার অফিসে আসি এবং অন্যান্য রিপোর্টাররাও চলে আসে। তখন বুঝতে পারছি না যে শেখ সাহেব কী করবে—থাকবে, ধরা দিবে, নাকি পালাবে—কারো কাছে বলতে রাজি না তিনি। এই পরিস্থিতিতে শেখ সাহেবকে নিয়ে যখন এত চিন্তা এবং সবাই মিলে ভাবতে থাকি—তাকে রক্ষা করা যায় ক্যামনে, তখন শেখ সাহেব তার নিজের পথ অবলম্বন করলেন। আমরা চলে আসলাম।

আমি তখন স্বরাজ পত্রিকার এডিটর। তোপখানা রোডে একটা অফিস ছিল, দোতলায় অফিস, ওখানে আসলাম দৌড়াদৌড়ি করে। তখন সাড়ে দশটা-এগারোটা, লোকজন কমে গেছে, রাস্তায় লোক নাই, খুব কম লোক, গাড়িগুড়ি নাই, দুই-একটা গাড়ি সাঁই সাঁই করে আসে, যায়। আর রিক্সাও কমে গেছে। তখন আমি ওখানে, আমার অফিসে কাজকর্ম কালকে কী হবে না হবে সেইগুলি বন্দোবস্ত করে দিয়ে বেরিয়ে আসলাম। তখন এগারোটা বেজে গেছে, রাস্তায় দেখি—একটা কাকও নাই, সব খালি এবং একটা রিক্সাও নাই গাড়ি তো দূরের কথা। তখন আমি কোনো উপায় না পেয়ে–আমি যাবো আজিমপুরের দিকে আমার বাসা—কীভাবে যাবো? হাঁটা দিলাম, হাঁটা দিয়ে একটা রিক্সা পাইলাম রাস্তায়, রিক্সা দ্রুত চলে যাচ্ছে, তখন রিক্সাওয়ালাকে বললাম যে আমাকে একটু ধানমণ্ডিতে নামিয়ে দাও। আমার বাসায় যেতে হবে না, ঐ কাছাকাছি কোথাও নামিয়ে দাও। ধানমণ্ডির ঐ কোনায় আমি থাকি, মসজিদের কাছে আমাকে নামিয়ে দাও। তখন সে অনিচ্ছাসত্ত্বে আমাকে নিতে বাধ্য হইল। কিন্তু তাকে নিয়ে খুব দ্রুত যখন চলে আসছি তখন হাইকোর্টের মোরে এসে দেখি আর রিকশা যাবে না। রিকশাওয়ালা কয় এখন স্যার নামেন, আর তো রিক্সা যাবে না। আমি রিকশা রেখে চলে গেলাম, সে পাগলের মতো চিৎকার করছে, আমি আর সে এবং রাস্তায় আর কেউ নাই তো এবং আবদুল গণি রোডের মাথার ঐ মোড়টায়, ওই কোনাটায় আইসা দেখি বড় কতগুলি গাছ মুক্তিযোদ্ধারা কেটে রাস্তায় ফেলে রেখেছে এবং ঐ রাস্তার সমস্ত বড় বড় গাছই কাটা হয়ে গেছে, সন্ধ্যা থেকে এবং কোনো গাড়ি ওদিক থেকে যেতে পারে না। গাড়ি তো পারেই না, রিকশাও পারে না। ব্যারিকেড সৃষ্টি করেছে সাধারণ লোক, যে আক্রমণ হবে, আক্রমণ হলে যেন তারা আসতে না পারে। তো এই অবস্থার মধ্যে আমার রিকশাওয়ালা আমাকে বলছে—আপনি নেমে যান, না গেলে আমি রিকশাসহ রেখে রওনা দিলাম। আর আপনে যদি নামেন তাহলে আমি ঘুরে যাবো, অন্য দিক থেকে। তো আমি ওকে রিকোয়েস্ট করলাম যে তুমি পিছিয়ে আমাকে প্রেসক্লাবে নামিয়ে দাও। আমি ওখানে নেমে যাবো। তো প্রেসক্লাবে নেমে আমার পকেটে ১০/১২টা টাকা ছিল, ওকে দিলাম। প্রেসক্লাবে আমাদের ‘খয়ের’ বলে একজন পিয়ন ছিল, তখন সোয়া এগারোটা, আমি নামলাম এবং গিয়ে আমি তাকে বললাম যে—আমাকে আশ্রয় দাও। তখন সে আমাকে দোতলায় নিয়ে বাহির দিক থেকে তালা দিয়ে চলে গেল। খুব চালাক ছেলে, কিন্তু সে ভাবতে পারে নাই যে এখানে বিপদ হবে। এইটার উপর যে গুলি হবে, এই রুমে, এটা সে ভাবে নাই।

তো ঐখানে আমি ছিলাম। নিঝুম অবস্থা, হঠাৎ গুলির আওয়াজ সাড়ে এগারোটার দিকে। অনেক দূরে। আমি তখন ঐ ঘরে অন্ধকারের মধ্যে একা, সাড়ে এগারোটা থেকে। ১২টার দিকে হঠাৎ চারিদিক থেকে আগুন—কাছে—এবং গুলির আওয়াজ, চারিদিকে, ওল্ড টাউনের মুখে গুলি হচ্ছে—ঐ নবাবপুরে মুখে রেললাইন ছিল তখন, রেললাইনের গায়ে যে বস্তি ঐ বস্তিতে গুলি হচ্ছে, তাদের মাইরা ফালাইছে, বস্তির লোক সব মারা গেলো তো। রেললাইনের উপরে বস্তি ছিল, কয়েক হাজার লোক থাকত। তখন তো ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন ছিল। নারায়ণগঞ্জ থেকে যে রেললাইনটা আসলো, ঐ ফুলবাড়িয়ায় রেলস্টেশনে আসলো; তো ঐ রেলের লাইনের উপরে কয়েক হাজার লোক আশ্রয় নিয়েছিল। আগে থেকেই ওইখানে ঝুপড়ি করে থাকতো। ঐ বস্তিতে আগুন দিয়ে দেয়, গুলি করে সবাইকে মেরে ফেলে। একেবারে কাছে, আমার চারিদিকে গুলির আওয়াজ পাচ্ছি।

এই অবস্থায় প্রেসক্লাবের দোতলায় একটা রুমে আমি একা, আর সব রুম খালি, তখন এমনিই আমার ভয় করছিল। প্রেসক্লাব তখনো আক্রমণ করে নাই। আমি পরে জানলা–দু’টো অপারেশনাল রুট ছিল আর্মির, একটা অপারেশনাল রুট হচ্ছে ঢাকা ক্লাবের সামনে দিয়ে এসে ফরেন অফিস যেটা এখন, এই ফরেন অফিসটার ভিতরে তারা ১৫/২০টা ট্যাংক রেখেছিল। আরেকটা রুট হচ্ছে ঢাকা ক্লাবের পিছন দিক থেকে, শাহবাগের পিছন দিক থেকে রাস্তাটা এসে ঐ আউটার সার্কুলার রোড দিয়ে ওল্ড টাউনে ঢুকেছে।

তো বারোটার দিকে শুনি ধর-ধর, মার-মার, চিৎকার, গুলির শব্দ। রাজার বাগ পুলিশ লাইনে তারা আক্রমণ করেছে। তারপরে শুনি ঢাকা ইউনিভার্সিটির দিকে কোলাহল। পরে আরো দূরে, পশ্চিম দিকে গুলির শব্দ, ওইটা পিলখানায়। পিল অর্থ হাতি, মোগলদের হাতি থাকতো ওইখানে। সমস্ত জায়গায় শব্দ, আলো প্রেসক্লাবে বসে আমি পাচ্ছি। আমি অনুমান করতে পারছি কোনটা কোথায়, পরে দেখলাম আমি কারেক্ট। আমি একা, রুমে ছুটাছুটি করছি, কোন দিকে যাবো, কী করবো আমি তো জানি না, কিছুই জানি না। বাইর দিক থেকে তালা মারা, আমি তো বের হতে পারবো না।

রাত দু’টা পর্যন্ত চললো এই আওয়াজ, দু’টোর পরে ওল্ড টাউনে হঠাৎ শুনি আজানের আওয়াজ, আজান কেন? আজান হচ্ছে কারণ যারা গলিতে, বাড়িতে আছে তারা আজান দিয়ে বলছে—আমরা মুসলমান, তোমরা হিন্দু মারতে আসছো, অন্য জায়গায় হিন্দু, এই জায়গায় হিন্দু নাই। আজান দিয়া তারা প্রমাণ করলো।

এমন সময় হঠাৎ আমি দেখি—চামেলী হাউজ আছে প্রেসক্লাবের বাঁ দিকে, ১৯০৫-এ পার্টিশানের পরে এ বাড়িটি তৈরি করা হয়, অনেক বাড়ি তৈরি করা হয় ঢাকায়। এইটাও তৈরি করা হয়, সরকারি অফিসারের জন্য। তো ওই বাড়িতে হঠাৎ দেখি জানালার ফাঁক দিয়ে যে একটা ট্যাংক। কথাবার্তা শুনে আমি তাকাই। তখন আমি ক্লিয়ার হয়ে যাই যে এই ট্যাংকটাই প্রেসক্লাব আক্রমণ করবে। এবং ট্যাংকের কামানের নলটা প্রেসক্লাবের দিকে, পশ্চিম দিক থেকে, আর আমিও প্রেসক্লাবের পশ্চিম দিকের লাস্ট রুমে, আমার রুমেই আসতে হবে গুলি। উপায় নাই, তখন আমি অস্থির হয়ে গেলাম আরো—এখন তো আমি আক্রমণে পড়লাম! এই কথা ভাইবা যখন আমি রুমের এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছি তখন প্রথম গুলি আসে, কামানের গোলা আসলো। রুমের পশ্চিম দিকের যে দেওয়াল সেটা সম্পূর্ণটা ভেঙে, অনেকখানি জায়গা ভেঙে এসে আমার উপরে পড়লো। এই যে আমার উরুতে এসে লাগে প্রথম গুলিটাই। নিচের দিকে, একটু উপরের দিকে যদি পড়ে তাইলে তো আমি আর নাই। রক্ত পড়তেছে। আমার যদ্দূর মনে আছে, ট্যাংকের নাম হচ্ছে এম-২৪। ওদের ওইখানে তো আলো ছিলো, আমার এইখানে অন্ধকার, আমি সেই আলোতে দেখলাম। আমি জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, ছোট ট্যাংক—এম-২৪, গলি-গালিতে ঢুকতে পারে যেন। তো প্রথম গুলিতেই আমি পড়ে গেলাম, এইরকম তিনটা গোলা তারা ছাড়লো প্রেসক্লাবে। তিনটাই প্রেসক্লাবে আছে এখনো, খোসাগুলি আছে। তিনটার পরে তারা বন্ধ করলো, চিৎকার নাই, কোলাহল নাই। তারপর তারা ওই জায়গাটা ছাড়লো, দেখলাম শুয়ে শুয়ে। মাথা উঁচু করলেই তো দেখা যায়। তারপরে—কতক্ষণ পরে আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম। আমি অজ্ঞান হয়েই ছিলাম ঘণ্টা দুই-আড়াই। এবং ভোর প্রায় সাড়ে পাঁচটা-ছয়টার দিকে আমার জ্ঞান ফেরে। আমি মনে করছি আমি মইরা গেছি, জ্ঞান ফেরার পরে দেখলাম আমি জীবিত! তখন ব্যথা-ট্যথা কমছে, রক্ত পড়া কমে গেছে। তখন আমি বাথরুমের ভিতর দিয়া বের হইয়া, একটা গাছ ছিলো—পেয়ারা গাছ, সেই গাছ বেয়ে আমি নাইমা গেলাম। নিচে নাইমা প্রেসক্লাবের ডাইনিং রুমে আসলাম, শুইয়া রইলাম, ওইখানে রক্ত পড়লো অনেক। প্রেসক্লাবের গা দিয়া, উল্টা দিকে, সেক্রেটারিয়েটের পিছনে এখন যে বড় রাস্তাটা ওইটা তখন ছিল একটা পায়ে হাঁটা রাস্তা, পাশে খালের মতো ছিল, সাইডে ছিলো একটা বড় পুকুর, এখন ওগুলি নাই। আমি প্রেসক্লাব থেকেই দেখলাম ওইখানে অনেক লোক আশ্রয় নিছে। আমি জানি এই ট্যাকটিকটা যে যেখানে আক্রমণ হয় সেখানে পরে, ভোরের সময় সোলজাররা আবার আসে, দেখতে আসে কী করলো এবং কে কে জীবিত আছে, তাদের মারে। এইটা আমি পড়াশুনা কইরা জানি। সুতরাং আমি ওইদিকে উইঠা গেলাম, উইঠা ল্যাংড়াইয়া ল্যাংড়াইয়া খালের পাড়ে ওই লোকগুলার কাছে গেলাম। ওইখানে ৫০/৬০জন লোক ছিলো—দোকানদার, হকার, রিকশাওয়ালা—এরা। তারা বললো, স্যার, আমরা বুঝতে পারছি, রাতের বেলা গুলি হইছে, সেই গুলিতে আহত হইছেন আপনি। তারা চৌকির নিচে রাখলো আমাকে, দেখা যেন না যায়। কতক্ষণ পরে আইসা বললো—আমরা চইলা যাবো, আপনি কী করবেন? তখন নয়টা। আমি বললাম, আমাকে তোমরা সেক্রেটারিয়েটের ভিতরে নামাইয়া দাও। সেক্রেটারিয়েটের ভিতরে মসজিদ আছে, মসজিদটার গা দিয়া, বাইরের দিকে কয়েকটা বড় বড় গাছ আছে, আমাকে ওই গাছে উঠাইয়া দিল দুই-তিনটা ছেলে, আমি মসজিদে যাইয়া নামলাম। ওইখানে প্রায় ৫০/৬০ টা কনস্টেবল পুলিশ পাওয়া গেল, ওরা আমার সাথে কথা-বার্তা কইলো। আমি সব মিছা কথা কইলাম, আমি সাংবাদিক আর বলি নাই। বললে ঘটনা-রটনা হবে তাড়াতাড়ি। সেইজন্য বললাম যে আমার ভাই আছে হলে, তাকে দেখতে আইছিলাম, আইসা বিপদে পড়ছি।

তো তারা আমাকে সেক্রেটারিয়েটের প্রথম গেটের কাছে যে ১৩ তলা আছে, এইটায় নিয়া গেল। সমস্ত রুম বন্ধ, ১ তারিখ থেকে বন্ধ তো, অসহযোগ আন্দোলন। উঠতে উঠতে ছয়তলাতে একটা রুম খোলা পাওয়া গেল। ওই রুমটাতে ওরা আমাকে রাইখা দিল, খ্যাতা-ট্যাতা আইনা দিল, বালিশ দিল, ২৬ তারিখ সারাদিন আমি ওইখানে ছিলাম, রাতেও ওইখানেই ছিলাম। আহত অবস্থায়, না-খাওয়া। ২৫ তারিখ দুপুর বেলায় আমি খাইছি। ২৫ তারিখ তো সারারাত আর খাই নাই, ২৫ তারিখ তো গুলি খাইলাম, ২৬ তারিখ সকালে এইখানে আসলাম, এইখানে খাদ্য নাই। সুতরাং তারা আমাকে আদর-যত্ন কইরা রাখলো, কিন্তু খাইতে দিতে পারলো না। খাওয়ার নামই নিল না, আর নাই-ও। তারা কোত্থেকে দেবে, তারা তো এক বেলা খাবার নিয়া আইছিল। এরা হচ্ছে—প্রতিদিন রাতের বেলা এক্সট্রা ৫০ জন কনস্টেবল সেক্রেটারিয়েটে আসে, তাদের ডিউটি, তারা আবার ভোরে চইলা যায়। তো এই ২৬ তারিখ রাতের বেলা আমি ছাদের উপর উইঠা কোথায় কোথায় গুলি হইতেছে—তখন কার্ফ্যু চলতেছে, তুইলা নেয় নাই কিন্তু। ওরাও ছিলো, ওদের সাথে; ওরা আমাকে বললো—স্যার চিন্তা কইরেন না, আমাদের বন্দুকে যতক্ষণ গুলি আছে, আমরা গোলাগুলি কইরা—আমরা হত্যা কইরা তারপরে হত্যা হবো, আমরা গুলি করবোই, এই গেট ভাঙলেই আমরা গুলি কইরা দেবো। যুদ্ধ হবে, এই যে আমরা রেডি—দ্যাখেন।

২৭ তারিখ সকাল বেলা একটা ছেলে দৌড়াইয়া আইসা বললো, সানি তার নাম, কার্ফ্যু উইথড্র হইছে। ওই প্রথম খবরটা দেয়। মোতালেব কন্ট্রাক্টর বলে এক বিখ্যাত কন্ট্রাক্টর ছিল। সেক্রেটারিয়েটে তার কাজকর্ম হয় রেগুলার, ওইখানে তার জিনিসপত্র আছে, কাঠ আছে, টিন আছে, কর্মচারি আছে; সানি হইলো তার একটা কর্মচারি। তো ১০টার দিকে আমরা বের হইলাম, ১ নম্বর গেট দিয়া, পিছন দিকে, যেদিকে ওসমানী মিলনায়তন—ওই দিক দিয়া। বাইরাইয়া আইসা রাস্তার উপরে, এক রিকশাওয়ালা ঘুমাইতেছিল, ওই রিকশায় আমাকে তুইলা দেওয়া হয়। আমি আমার বন্ধুর বাড়িতে যাই, তোপখানা রোডে মুকুলের বাড়ি। ওইখান থেকে হলিডে’র এডিটর এনায়েতুল্লাহ খান আমাকে নিয়া যায় ধানমণ্ডিতে, এক ডাক্তারের কাছে। নিউ মার্কেটের উল্টা দিকে হকার্স মার্কেটের পিছনে পলি ক্লিনিক বলে একটা ক্লিনিক ছিল। এই ডাক্তারের নাম ডাক্তার আজিজ, ডাক্তার আজিজ জিয়া সরকারের মন্ত্রী হইছিলো। তার বউও ডাক্তার—ডাক্তার সুলাতানা। তারা আমার চিকিৎসা করে। আমার আহত পায়ের চিকিৎসার সময় ৫/৬ জন মেয়ে দাঁড়িয়েছিল পাশে, নার্সের পোশাকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম—এরা এইখানে কেন? ডাক্তার আজিজ বললো, কারণ আছে। ওই যে লম্বা মেয়েটা দেখছেন—উনি কাজী জাফরের বউ, বাকিরাও সবাই আশ্রিতা। আর্মির রেইড হলে যাতে ধরা না পড়ে সে কারণেই এই নার্সের পোশাকে রাখা।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে