Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯ , ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (76 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৩-২১-২০১৫

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নবযাত্রা

ইকবাল হোসাইন চৌধুরী


মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নবযাত্রা

হঠাৎ বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে চারপাশ। আমগাছের পাতায় তখনো আটকে আছে বৃষ্টির ফোঁটা। জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর চোখও কি খানিকটা ঝাপসা হয়ে এল?

জাদুঘরের পেছনের এক চিলতে উঠোন। সেখানটায় বসে তারিক আলী ফিরে গেছেন বছর বিশেক আগে। এমনই এক বৃষ্টিভেজা দিনে যাত্রা শুরু করেছিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সেই জাদুঘরের নবযাত্রার কাছাকাছি এসে জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি ও সদস্যসচিব আবেগে ভারাক্রান্ত হবেন এই তো স্বাভাবিক। আর আমাদের আবেগ ফুটিয়ে তোলার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে বড় আশ্রয় হতে পারে না। তারিক আলীও তাই স্মরণ নিলেন রবীন্দ্রনাথের। আপন মনে আওড়ালেন সেই বিখ্যাত কবিতার খানিকটা
‘কত অজানারে জানাইলে তুমি,
কত ঘরে দিলে ঠাঁই...
পুরনো আবাস ছেড়ে যাই যবে
মনে ভেবে মরি কী জানি কী হবে,
নূতনের মাঝে তুমি পুরাতন
সে কথা যে ভুলে যাই।’

আবেগাক্রান্ত হওয়ার মতোই ব্যাপার তো বটেই। আজ কত স্মৃতি এসে কড়া নাড়ছে মনের দরজায়। গত ১৮ মার্চ বিকেলের আলাপে বসে তারিক আলী বলছিলেন ‘ আমরা নতুন জায়গায় যাব তার একটা উচ্ছ্বাস আছে। কিন্তু পুরোনো জায়গা ছেড়ে যাচ্ছি মনটা ভারাক্রান্ত। এখানে একটা সময় ছিল প্রিন্টিং প্রেস। সেটা প্রায় বছর বিশেক আগের কথা। বহু সাধনার পর আমরা এই বাড়িটা পেয়েছিলাম।’

সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছিল এভাবেই। কিন্তু কোথা থেকে আসবে অর্থের জোগান? জবাব মিলতে পারে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আরেক ট্রাস্টি রবিউল হুসাইনের একটি লেখায়। যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘মনে পড়ে সেই রাতের কথা, যেখানে আমার গুলশানের বাড়িতে মফিদুল হক, আক্কু চৌধুরী, সারওয়ার আলী, আলী যাকের, সারা যাকের, আসাদুজ্জামান নূরসহ আমি উপস্থিত ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কথাটা উত্থাপন করেন সারওয়ার আলী। আমরা তখন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো সহসা সবাই উত্তেজনায় শিহরিত হয়ে উঠি। আমাদের ভাবনায় ছিল না কে জায়গা দেবে, কোথায় পাওয়া যাবে অর্থকড়ি, কেমন করে সংগৃহীত হবে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ব্যবহৃত মুক্তিযোদ্ধাদের দ্রব্যসামগ্রী।’

কিন্তু মহৎ এ উদ্যোগের পথে এসব সংশয় আর শঙ্কা কোনো বাধা হতে পারেনি।
আবার বলতে শুরু করেন জিয়াউদ্দিন তারিক আলী, ‘ইতিমধ্যে আমরা আক্কু চৌধুরীর ছোট বোনের সেগুনবাগিচার দোতলা এ বাড়িটি পেয়ে যাই। এরপর আমরা কয়েক মাস দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছি। প্রথমে আমরা শুধু বধ্যভূমি থেকে মাটি সংগ্রহ করতাম। পরে শুরু করি মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত স্মৃতিস্মারক সংগ্রহের কাজ।’
১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ। আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ঢাকার সেগুনবাগিচায় অবস্থিত আজকের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। তারপর বাড়তে থাকল কার্যক্রম। এগিয়ে এলেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেউ দিয়েছেন কোটি টাকা, কেউবা আবার টিফিনের লোভ সংবরণ করে বহু ব্যবহারে মলিন হয়ে যাওয়া দুই টাকার নোট তুলে দিয়েছেন জাদুঘরের জন্য।

ভবনটির প্রতিটি কক্ষে যোগ হলো বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংগ্রামী জীবনের কাব্য। তিলে তিলে সেই সংগ্রহ গড়ে তোলার কাজটাও সহজ ছিল না।
বিশ্বাস আর ভালোবাসা থেকেই মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো মানুষ তাঁদের প্রিয়জনের স্মৃতিচিহ্ন তুলে দিয়েছিলেন জাদুঘরের কাছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সেসব অমূল্য স্মৃতিচিহ্ন প্রায় ১৯টি বছর ধারণ করে এসেছে পরম মমতায়।

সেই জাদুঘর এবার যাচ্ছে নতুন ঠিকানায়। কেমন হবে সেই ঠিকানা? সেই আলাপের আগে চলুন আরেকবার ঘুরে আসি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পুরনো সংগ্রহশালা থেকে।

গৌরবের ঘরে আরেকবার
দোতলা ভবনের ছয়টি কক্ষ নিয়ে মূল জাদুঘর। নিচতলা থেকে নির্দেশনা মেনে দ্বিতীয় তলার ষষ্ঠ কক্ষে যেতে যেতে আপনার চেতনার ক্যানভাসে রং ছড়াবে বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস। প্রথম কক্ষে পরিচয় হবে বাঙালির প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে। নির্দেশনা অনুসরণ করে কয়েক ধাপ এগিয়ে আপনি পৌঁছে যাবেন ইংরেজ শাসনামলে। মাস্টার দা সূর্যসেন, প্রীতিলতা আর ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগ আপনাকে জানাবে ইংরেজ শাসকদের নিপীড়নগাথা। শুরু হলো পাকিস্তানি আমল। কিন্তু গণতন্ত্র ও অধিকারের দাবিতে বাঙালির সংগ্রাম চলতে থাকল। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলে এল ১৯৭১। শোনা যাবে বঙ্গবন্ধুর বজ্র কন্ঠ। আপনি তখন পৌঁছে গেছেন তৃতীয় কক্ষে। এখানে জানা যাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব, দায়িত্ব গ্রহণ, অস্থায়ী সরকার গঠন ইত্যাদি সম্পর্কে। সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় ওঠার সময় চোখে পড়বে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশিত পোস্টারগুলো। চতুর্থ কক্ষ ঘুরতে ঘুরতে আপনার হাত হয়তো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসবে নিজের অজান্তে। দেখা যাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মারক আর আরও অনেক কিছু। দোতলার চতুর্থ কক্ষ থেকে বের হয়ে পঞ্চম কক্ষে যাওয়ার সময় আছে মুক্তিযুদ্ধে ভারত, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশের ভূমিকার কথা।

পঞ্চম কক্ষে তুলে ধরা হয়েছে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ, রণকৌশল, যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র ও গোলা।
ষষ্ঠ কক্ষে ঢোকার মুখে জায়গা পেয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সুলতান সালাউদ্দিনের নিজের হাতে তৈরি করা সাইক্লোস্টাইল মেশিনটি। এটি দিয়ে ছাপা হতো প্রচারণাপত্র। দোতলার শেষ ঘরটায় গেলে পাকিস্তানি বাহিনীর নারী নির্যাতন ও গণহত্যার নির্মমতার চিত্র দেখে যে কেউ শিউরে উঠবেন। গ্যালারির বাক্সটা ভর্তি শহীদদের হাড়গোড় আর মাথার খুলিতে! বাক্সের গায়ে লেখা, ‘মিরপুর মুসলিমবাজার ও জল্লাদখানা বধ্যভূমি থেকে উদ্ধার করা শহীদদের কঙ্কাল ও মাথার খুলি’।
পাকিস্তানি নরপিশাচদের নির্মমতার সাক্ষী যেন এই গ্যালারি। দেখে আপনার চোখের কোনা বেয়ে অশ্রু গড়াবে অজান্তে। অতঃপর ঝাপসা চোখে দেখতে পাবেন বিজয়পর্ব। স্বাধীন বাংলাদেশ! বিজয় উল্লাস!

মূল জাদুঘর ভবন ছাড়াও রয়েছে সামনে শিখা অনির্বাণ, ছোট হলঘর, প্রশাসনিক ভবন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক স্মারক ও বই বিক্রয়কেন্দ্র, ক্যাফেটেরিয়া এবং আঙিনার এক কোনায় মুক্তমঞ্চ। ১৪ মার্চ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর দেখতে এসেছেন প্রায় ৫ লাখ ৬৩ হাজার দর্শনার্থী।
জাদুঘরে প্রবেশ ফি পাঁচ টাকা। সপ্তাহে প্রতি রোববার ও সরকারি ছুটির দিন বাদে সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে। তবে শীতকালে খোলা রাখা হয় বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।

আরও যত উদ্যোগ
জাতীয় দিবসগুলোতে সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি স্বাধীনতাযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে নানা কর্মসূচি রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের। স্কুলভিত্তিক কর্মসূচিতে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র, পোস্টার নিয়ে প্রায় ১১ লাখ শিক্ষার্থীর সামনে হাজির হয়েছে ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর। জিয়াউদ্দিন তারিক আলী বলছিেলন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের আমরা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে গল্প শুনে লিখে পাঠাতে বলি। এ পর্যন্ত প্রায় ২৪ হাজার সাক্ষাৎকার আমাদের হাতে এসেছে। এটি খুবই অনুপ্রেরণামূলক একটি কাজ।
এ ছাড়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে সারা দেশের স্কুলগুলোতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন “নেটওয়ার্ক শিক্ষক” নির্বাচন করা হয়েছে। তাঁরা স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতেও সহায়তা করেন। ’ ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরের দুটি বাস দেশের ৫৫টি জেলার সব উপজেলায় তুলে ধরেছে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাংবাদিকতার জন্য বজলুর রহমান স্মৃতিপদক প্রবর্তন করা হয়েছে ২০০৮ সাল থেকে। প্রকাশনা বিভাগ থেকে বেরিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ওপর গবেষণাধর্মী ১২টি বই।

মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি আয়োজন ছিল ২০১৩ সালের ৪-৫ জুলাই জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড দি ইস্যু অব জাসটিস’ সম্মেলনটি।

এ ছাড়া জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অঙ্গনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
এবারেও ১৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন করছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ২২ থেকে ২৮ মার্চ প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে শুরু হবে আয়োজন। তবে ২৬ মার্চ অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল নয়টা থেকে।

নতুন ঠাঁই
মিউজিয়াম সায়েন্স বা জাদুঘর বিজ্ঞানের নবতর ভাবনার স্পর্শে তৈরি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবন। সরকারি সহযোগিতায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে ভবনটি। নির্মাণশৈলী সম্পর্কে প্রধান স্থপতি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে