Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (37 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-১৯-২০১৫

রাজাও নেই, মুকুটও নেই

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়


রাজাও নেই, মুকুটও নেই

ঢাকার আশেপাশে কোথায় বেড়াতে যাবো?

কেউ বললেন, বালিয়াহাটি। কেউ বললেন, ময়নামতি। কেউ আবার আরেক পা এগিয়ে বললেন, বিরিশিরি!

বিরিশিরি কেমন করে ঢাকার আশেপাশে হল, সে নিয়ে নিয়ে গবেষণা করতে পারেন। আমি তখন গবেষণা করার মুডে ঠিক নেই। বৌ-ছেলেকে নিয়ে বেড়াতে যেতে হবে; গর্দানের ওপর যা টিমটিম করে একটা কিছু ঝুলছে, তা নিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার উপায় নেই। ফলে গবেষণা নয়, আমার সিদ্ধান্ত চাই।

এক সখা বললেন, ‘নুহাশপল্লী যাও।’

নুহাশপল্লী!

নুহাশপল্লী তো চিড়িয়াখানাও না, জাদুঘরও না; টেনেটুনে বোটনিক্যাল গার্ডেন বলা যেতে পারে। আমি নুহাশপল্লীর নাম জানি হুমায়ুন আহমেদের বাগানবাড়ি হিসেবে। একজন কিংবদন্তী ছোটগল্পকার হিসেবে, একজন অসীম শক্তিশালী স্রষ্টা হিসেবে হুমায়ুন আহমেদের প্রতি আমার ভক্তির শেষ নেই। কিন্তু হুমায়ুন আহমেদের বাগানবাড়ি ব্যাপারটা কী দ্রষ্টব্য ব্যাপার? খুব সন্দেহ হল। সন্দেহের চেয়েও আশঙ্কা বেশী ছিল–লোকেরা শুনলে বলবে কী? এতো জায়গা রেখে সেই হোতাপাড়ার নুহাশপল্লী যাচ্ছি বেড়াতে! আমি ছাড়া আর কী কেউ যায় ওখানে?

এইসব সন্দেহ আর আশঙ্কার জবাব পাওয়া এক বিস্ফোরণের মুখোমুখি হলাম নুহাশপল্লীর গেট ঠেলে ঢুকতেই। সহস্রকণ্ঠের এক ‘বিগ ব্যাং’ শুনে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো। সম্বিত ফিরে পেয়ে চোখ মেলে দেখ–

রথযাত্রা লোকারণ্য,
মহা ধুমধাম,
ভক্তরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম!

ভক্তরা ঠিক লুটায়ে পড়ে প্রণাম না করলেও নুহাশপল্লীতে যে দৃশ্য’র মুখোমুখি হলাম, তাতে রথযাত্রা নয়, একেবারে কুম্ভমেলা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়!

আমি এই ঢাকা জীবনে বাণিজ্যমেলার ভীড় দেখেছি, বইমেলা উপলক্ষে কোলাহল দেখেছি, এমনকি পহেলা বৈশাখের মার মার কাট কাট অবস্থাও দেখেছি; কিন্তু গুণমানে নুহাশপল্লীর এই ভীড়ের কাছে কেউ কিছু না। বাণিজ্যমেলায় লোকেরা বাণিজ্য করতে চায়, বই মেলায় ফুচকা খেতে যায়, পহেলা বৈশাখে প্রেম বা কিছু করতে যায়; মানে, সবটাতেই উপলক্ষ থাকে। কিন্তু একেবারে বিনা উপলক্ষে মানুষ যে কোথাও এমন পালে পালে এক হতে পারে, এ আমি আগে বুঝতে পারিনি।

ঢাকা থেকে নুহাশপল্লী যাওয়াটাই বিরাট এক ভেজালের ব্যাপার। শুনেছি, আগে নাকি আরও ভেজাল ছিল–তখন হোতাপাড়া থেকে প্রায় ১৫-১৬ কিলোমিটার পাকা রাস্তাও ছিল না। এখন পাকা রাস্তা হয়েছে, সে রাস্তা ধরে সেকেলে বিলেতি সিনেমার গাড়ির মতো রিকশা আর সাই সাই করে পাজেরো চলে। কিন্তু এই হোতাপাড়া পৌঁছাতেই জীবন একেবারে কণ্ঠনালীতে পৌঁছে যায়–বিশাল বিশাল গর্ত, ভাঙা, ধানের ভুঁইয়ের মতো ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক ধরে চলার ধাক্কায় সারা শরীরে বাতের ব্যথা হয়ে যায়।

সে যাকগে। বাতের ব্যথা, দু’চারটে ধাক্কা না হয় হজম করে নেওয়া গেল। বিশেষ করে সহধর্মিনী বারবার বলছেন, ‘ওষুধি গাছের বাগান আর লীলাবতি দীঘিটা দেখলে মন ভালো হয়ে যাবে।’

আমার মন তার আগেই ভালো হয়ে গেল। যদিও পকেট থেকে জনপ্রতি কড়কড়ে দু’শ টাকার করে টিকিট কিনতে গিয়ে একটু ধাক্কামতো খেয়েছিলাম। আমার ছোট ভাই, একটা হিসেবও সঙ্গে সঙ্গে কষে ফেলার চেষ্টা করলো–প্রতি জন দু’শ টাকা করে, ধরা যাক দৈনিক লোক পাঁচ হাজার; তাহলে দিনে আয়…। আয়টা অনুমান করে আরেকটা ধাক্কা খেতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ঢুকেই যে কুম্ভমেলা দেখলাম, তাতে টাকার ধাক্কা কাটিয়ে পয়সা নগদে উসুল হয়ে গেল।

অবশ্য কুম্ভমেলা বলুন আর বাণিজ্যমেলা; কোথাও এর পরের দৃশ্যটা আপনি দেখতে পাবেন না।

কাতারে কাতারে লোকজন ঢুকলো; মহা উৎসাহে, মহা উল্লাসে, মহা গতিতে ঢুকলো। তারপরই হঠাৎ লোকজনের উৎসাহ পড়ে গেল। সাঁই সাঁই করে লোকগুলো হেটে বৃষ্টিবিলাস নামের বাড়িটার সামনে চলে এলো। তারপর? কেমন যেন একটা প্রোগ্রামিং এলোমেলো হয়ে যাওয়া রোবটের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে এই হাজার হাজার মানুষ পরষ্পরের দিকে চেয়ে রইলো–ঢুকলাম তো, এখন কী?

আসলেই তো, এখন কী? কী করবো আমরা? বাঘ নেই যে হালুম ডাক শুনবো, টিপুর তলোয়ার নেই যে ‘আহা উহু’ করবো; কিছুই তো করার নেই!

এই বিহ্বলতা অবশ্য খুব বেশী সময়ের জন্য নয়। বাঙালি অল্পেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারে। এই হাজারো পর্যটকও কিছুক্ষণের মাঝেই করণীয় খুঁজে পেলেন। করণীয়টা হল, হাতে-কলমে নুহাশপল্লীকে পরীক্ষা করে দেখা। প্রথম ধাক্কাটা গেল বৃষ্টিবিলাস বাড়ির সামনের দুটো ‘ট্রি হাউস’-এর ওপর দিয়ে। এই ধরনের বাড়ি হুমায়ুন আহমেদের সঙ্গে খুব যায়। ছোটরা সেটা সবার আগে বুঝতে পেরে চোখের পলকে দুই বাড়ি দখলে নিয়ে নিলো। একটু পর দেখি কয়েক জন বুড়োও এই বাড়িগুলোতে চড়ে বসেছেন; সংসার আর টানছে না।

এরপর ওষুধি গাছের বাগান। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার বটে। একটা মানুষের বাগানবাড়িতে কর্পুর কিংবা পেস্তা বাদামের গাছ!

কেউ কেউ খুটে দেখার চেষ্টা করছেন যে, কর্পুর গাছ থেকে কর্পুর বের হয় কি না। কেউ আবার সর্পগন্ধা গাছের পাতা ডলে নাকের কাছে নিয়ে নামকরণের সার্থকতা বোঝার চেষ্টা করছেন। আরেক দল আবার ভাঙা গ্রীন হাউসের কাছে দাড়িয়ে কাঁচের ঘরের অস্থায়ী জগত নিয়ে ভাবনায় মেতেছেন; সে গ্রীন হাউসের চাল, দেয়াল ধ্বসে পড়েছে অনেক আগেই। সবচেয়ে মুগ্ধ হওয়ার ব্যাপার হল, দুই ভদ্রলোককে দেখলাম রক্তকরবী গাছ থেকে আদৌ রক্ত বের করা যায় কি না, সে নিয়ে গবেষণা করছেন। কে বলে, বাঙালির বিজ্ঞানে মন নেই!

অবশ্য সবাই যে এমন বিজ্ঞানমনস্ক তা নন। কেউ কেউ খুবই সাহিত্যপ্রাণ। যেমন লীলাবতি দীঘির পাড়ে বসে জনা তিনেক ভদ্রমহিলা শুনলাম আলোচনা করছেন, লীলাবতি কার নাম এ নিয়ে। অবশ্য তারা এ বিষয়ে একমত হতে পারলেন না। একজন বললেন, এটা শরৎচন্দ্রের একটা উপন্যাসের নাম। একজন বললেন, হুমায়ুন আহমেদেরই এ রকম নামের একটা নাটক আছে। আর শেষ জন সিদ্ধান্ত দিলেন, এটা জি-বাংলার একটা সিরিয়ালের নায়িকার নাম। বেশ বেশ!

এইসব অতিজাগতিক লোকদের ভীড়ে নজর কাড়লেন জাগতিক লোকেরা। তাদের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। বৃষ্টি বিলাস বাড়িটা মূলত এই জাগতিকেরাই দখল নিয়ে নিয়েছেন। ব্যাগ ভরে দুপুরের খাবার, আমার সন্দেহ কেউ কেউ রাতের খাবার বা বিছানা-বালিশও নিয়ে এসেছেন। বাইরের কয়েকটা সোফায় রীতিমতো পা এলিয়ে, শরীর মেলে দিয়েছেন পুরুষরা। মহিলারা যার যার ছেলেটি বা মেয়েটিকে খাওয়াচ্ছেন, গোসল করাচ্ছেন; নিজেরাও করছেন। বারান্দা ছাড়িয়ে অন্দরমহলে পাশাপাশি কয়েকটা ঘর। ওগুলো আলাদা করে ভাড়া দেওয়া হয় কি না, কে জানে। কয়েকটা পরিবার দেখলাম, দিব্যি ঘরগুলোকে নিজের সাত জনমের বাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। অনেকে ওর মধ্যে আবার জমি-জিরেতের হিসেবও শুরু করেছেন বৃষ্টি বিলাসে বসে।

এর মধ্যে একটা পরিবার বড়ই বিপদে পড়েছে।

পরিবারের ছেলেটি সম্ভবত ঢাকায় থাকে। ছুটি না পাওয়া বা অন্য কোনো কারণে বাড়ি যেতে না পারায়। বাবা-মা, ভাই-ভাবী এবং তস্য তস্য আত্মীয়দের ঢাকায় এনেছেন। ঢাকায় দ্রষ্টব্য, আধা দ্রষ্টব্য সব শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্কে। সেখানে সুবিধে করতে না পেরে নুহাশপল্লী এসেছেন। এখন সমস্যা হল পরিবারের বয়স্ক মতো যে ভদ্রলোক তিনি ছেলেকে ডেকে বলছেন, ‘বাবা রে, গাড়িতে করে বাঘ দেহাবি কলি, কই এহানে তো বাঘ-ভালুক নাই। এ কেমন চিড়িয়াখানা?’

অবশ্য এটা ওনাদের দেখার চোখের অভাব। বাঘ-ভালুক না থাকলেও ডাইনোসর-জলপরী তো আছেই। দীঘির একেবারে পাড়েই গোটা কয়েক ডাইনোসরের মূর্তি। আর পাশে একটা ছোট পদ্মপুকুরে এক মৎসকন্যার মূর্তি। মৎসকন্যা জলে থাকায় রেহাই পেয়ে গের। কিন্তু ডাইনোসরদের আজ বড়ই দুর্দিন। এক একটা ডাইনোসর, রাইনোসেরাসের পিঠে ডজন দুই করে বালক-বালিকা চেপে বসেছে। এমন অসহায় অবস্থায় এদের দেখলে স্পিলবার্গ কিছুতেই ‘জুরাসিক পার্ক’ বানানোর কথা ভাবতেন না।

তা ডাইনোসর বলুন, আর কর্পুর গাছ; পুরো নুহাশপল্লী জুড়ে দুপুর হতে না হতে এই নির্বাক প্রাণী ও অপ্রাণীদের আর্তনাদের শব্দ শোনা যেতে থাকলো। স্রেফ বাক্যক্ষমতা নেই বলে সে আর্তনাদ তাদের হয়ে করে দিচ্ছিলো পর্যটকরা নিজেরাই। একদিকে নিজেদের হাত-পায়ে এদের ওপর অত্যাচার, অন্যদিকে নিজেরাই মুখে ও সাউন্ড সিস্টেমে আর্তনাদের আওয়াজ তৈরি করে নুহাশপল্লীকে আক্ষরিক অর্থেই মেলার মাঠ বানিয়ে ফেলেছে লোকেরা।

এর মাঝে কয়েকটি ছেলে একটা মাটির ঘরের সামনে নির্বাক হয়ে বসে আছে।

ছেলেগুলোকে দেখে দিব্যি বোঝা যায়, এরা হিমুশ্রেণীর হবে। এদেরই নুহাশপল্লীতে এসে সবচেয়ে আনন্দে থাকার কথা। কিন্তু বিস্ময়করভাবে বিমর্ষ হয়ে বসে আছে তারা শুটিংয়ের জন্য বানানো মাটির বাড়িটার সামনে। এগিয়ে বিষণ্নতার কারণ জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু মুখ খোলার আগেই একটি ছেলে নিজে থেকে বললো, ‘কী আর বলবেন ভাই? স্যারই নেই!’

মনে হল, হুমায়ুন নিজে এদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন এখানে আসার জন্য। কিন্তু আজ যখন তারা সত্যিই এসেছে, তখন দাওয়াত করে বাড়ি থাকার ভদ্রতাটুকু দেখালেন না লেখক। হুমায়ুন আহমেদের এই ‘প্রতারণা’য় সম্ভবত শোকগ্রস্থ হয়ে পড়েছে ছেলেগুলো।

এরা সবাই জানে, এখানে কেউ নেই, এখানে হুমাযুন আহমেদ নেই। তারপরও ঢোকার আগ পর্যন্ত এক ধরনের ঘোর মনে হয় কাজ করছিল–গেলে হুমায়ুন আহমেদকে দেখা যাবে; কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে, হতাশার সঙ্গে সবাই দেখলেন নুহাশপল্লীতে হুমায়ুন নেই!

কোনো কাব্যিক অর্থে নয়, কোনো আত্মিক অর্থে নয়; সত্যিই মনে হল, এরা হুমায়ুনকে আশা করেছিলেন নুহাশপল্লীতে। কিন্তু বাস্তবতা হল, নুহাশপল্লীতে এখন জীবিত বা মৃত কোনো হুমায়ুন আহমেদই আর নেই।

মুকুটটা হয়তো অনেক কষ্ট করে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, রাজা কিছুতেই নেই।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে