Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ , ৩০ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-১৯-২০১২

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ভয়াবহ ধস

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ভয়াবহ ধস
সুদের হার বাড়ানো হলেও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ভয়াবহ ধস নেমেছে। গত সাত মাসে এ খাতে বিনিয়োগ কমেছে ৯৫ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে প্রায় ২ হাজার ১৮৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। গত ২০১০-১১ অর্থবছরের (জুলাই-জানুয়ারি) সময়ে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৯৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের একই সময়ে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে বিনিয়োগ কমেছে ৯৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। গত বছর জুলাই জানুয়ারিতে বিনিয়োগ কমেছিল ৬৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের শুরুতে সুদের হার বাড়ানোয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছিল। প্রথম মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩১১ কোটি তিন লাখ টাকা। পরের মাস থেকেই ধস নামতে শুরু করে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে। জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তর সূত্র জানায়, গত ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর ধার্য করা হয়। ফলে সে বছর সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গিয়েছিল। গত অর্থবছরে সাত হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা নিট বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও দুই হাজার ৫৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছিল। সঞ্চয়পত্র থেকে টাকা তুলে অনেকেই সেই সময়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন সাধারণ মধ্যবিত্তরা। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে এবং জনগণের কাছ থেকে বেশি অর্থ ধার করার পরিকল্পনায় সরকার চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে উৎসে করের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করে। তবে এবার গত বছরের থেকেও কম পরিমাণ বিনিয়োগ হচ্ছে সঞ্চয়পত্র থেকে। চলতি ২০১১-১২ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মাত্র ১১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ বছর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কারণ হিসেবে তারা জানান, অন্য খাতে বিনিয়োগে যে আয় হয়, তা সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি। আর মূল্যস্ফীতির হার অধিক থাকায় বছর শেষে সঞ্চয়পত্রে খুব বেশি লাভ থাকে না। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রের সুদের হার এবং উৎসে কর নিয়ে নানা ভোগান্তি এবং অস্পষ্টতায় অনেকেই সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। চলতি অর্থবছরের শুরুতে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। প্রজ্ঞাপন অনুসারে, পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ, পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ, ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ, ছয় বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ মুনাফা দেয়া হচ্ছে। যদিও সব ধরনের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তন করা হচ্ছে। জাতীয় সঞ্চয়পত্র পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (পরিসংখ্যান) আবু তালহা যায়যায়দিনকে বলেন, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে না। এই হারে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হলে হয়তো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। তিনি আরো বলেন, নানা কারণে মানুষ সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এদিকে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকার সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বৃদ্ধি করেছে। নতুন মুনাফার হার পহেলা মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের বর্ধিত মুনাফার হার পহেলা মার্চ থেকে কার্যকর হলেও পুরনোরা এই সুবিধা পাচ্ছেন না। পহেলা মার্চ থেকে যারা সঞ্চয়পত্র ক্রয় করবেন তাঁরাই বর্ধিত মুনাফা হারের সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। তবে কেউ ইচ্ছে করলে পুরনো সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে নতুনভাবে ক্রয় করতে পারবেন। এ প্রসঙ্গে জাতীয় সঞ্চয়পত্র পরিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যায়যায়দিনকে এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইচ্ছে করলে পুরনোরা সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে নতুনভাবে সরকারের সঞ্চয়পত্র ক্রয় করতে পারবেন। তবে পহেলা মার্চ থেকে সরকারের সঙ্গে চুক্তি করা সঞ্চয়পত্রধারী এই সুবিধা ভোগ করবেন। ওই কর্মকর্তার মতে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বৃদ্ধির কারণে নতুন করে বিক্রি বাড়বে। এতে সরকারের আর্থিক সংস্থান হবে। মুনাফা বৃদ্ধির ফলে পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ, পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ হয়েছে। এছাড়া ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক সাধারণ হিসাবপত্রের মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে নতুন মুনাফা বৃদ্ধির সঙ্গে অন্যান্য কর্তন ঠিক থাকবে। সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে উৎসে আয়কর কর্তন করা হবে ৫ শতাংশ। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা প্রিমিয়াম হিসাবে পরিবার সঞ্চয়পত্রে ১ দশমিক ০৭ শতাংশ, পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ, ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ ও ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ যোগ হবে। ফলে নতুন মুনাফার হার নির্ধারণ করায় উৎসে আয়কর কর্তন ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রিমিয়াম যোগ করার পর পরিবার সঞ্চয়পত্রে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতিমাসে মুনাফা পাবেন এক হাজার ১২০ টাকা, পেনশন সঞ্চয়পত্রে মুনাফা এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তিন মাস অন্তর মুনাফা পাওয়া যাবে ৩ হাজার ২৯৭.৫০ টাকা ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে মুনাফা গ্রহণ করতে পারবেন ৩ হাজার ১৪৭.৫০ টাকা। জানা গেছে, সমপ্রতি ব্যাংক সুদের ওপর থেকে ক্যাপ তুলে নেয়া হয়। এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ইচ্ছামতো সুদ বাড়িয়ে আমানত সংগ্রহ করছে। প্রতিটি ব্যাংক আমানতের সুদের হার প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ করে দিচ্ছে। ব্যাংকের সুদের হার বাড়িয়ে দেয়ায় অনেকে সঞ্চয়পত্র ভেঙে ব্যাংকে ডিপোজিট করছেন। ফলে আশঙ্কাজনক হারে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে। সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে মোট সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৬ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, আশঙ্কাজনকহারে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছে। এই হ্রাস পাওয়ার জন্য তিনি দায়ী করেন ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার বৃদ্ধিকে। তিনি আরো বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার আরো অনেক আগে বৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল। সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর সূত্রে, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর আমানতে সুদের হারের সঙ্গে মিল রেখেই জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠায়। ওই প্রস্তাবের আলোকে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। অবশ্য সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে আয়করও কাটা হবে। তবে এবার বিভিন্ন বন্ডের হিসাব আলাদা করা হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের সঙ্গে বন্ডের মুনাফার হার বৃদ্ধি করা হয়নি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, সুদের হার কমিয়ে দেয়ার কারণে মূলত বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তারা বিকল্প হিসেবে সে সময় শেয়ারবাজারকে বেছে নিয়েছেন। সরকারের এ সিদ্ধান্তের কারণে সঞ্চয়পত্রে হিতে বিপরীত হয়েছে। তিনি বলেন, এখন অর্থনীতির যে পরিস্থিতি তাতে করে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়িয়েছে এটা ইতিবাচক সূচনা। তবে ব্যাংকের আমানতের সুদ হার এখনো ১৪-১৫ শতাংশ রয়েছে, যা সঞ্চয়পত্রের সুদের হার থেকে বেশি। তারল্য প্রবাহের কারণে ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে দিয়ে আমানত সংগ্রহের চেষ্টা করছে। বাস্তব কারণে এর চেয়ে কম সুদে কেউ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করবে না। অন্যদিকে পুঁজিবাজার এখন বড় একটি জটিল অবস্থায় রয়েছে। এ সময় ব্যালেন্স ও বিনিয়োগবান্ধব সুদ হার গ্রহণ করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। সাবেক এ গভর্নর আরো বলেন, সাধারণত নির্দিষ্ট আয় ও অবসরপ্রাপ্তরা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে সঞ্চয়পত্রে সুদ হার ও উৎসে আয়কর কর্তনের বিধান নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। সে সময়ে কর কর্তন একই সঙ্গে সুদ হার কমানোর ফলে মানুষ বিকল্প পথে বিনিয়োগ করেছে। পরে সুদ বাড়ানো ও কর কর্তনের হার কমানো হলেও সাধারণ মানুষের কাছে তা পরিষ্কার নয়। এসব কারণে গত বছর অনেকেই এখান থেকে টাকা তুলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। দরপতনের ফলে বেশিরভাগই সেখান থেকে বের হতে পারছেন না। সালেহ উদ্দিন বলেন, মূল্যস্ফীতি বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষ সংসার চালিয়ে এখন আর সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের মতো টাকা পাচ্ছেন না। যাদের হাতে বিনিয়োগের মতো টাকা আছে ব্যাংকের সুদ বেশি থাকায় সে দিকে যাচ্ছে। এসব কারণে বিক্রি কমছে বলে তিনি মনে করেন। এদিকে সরকার আরো দুটি নতুন সঞ্চয়পত্র চালুর চিন্তাভাবনা করছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রতিবন্ধীদের জন্য, অপরটি স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য। এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে এসব বিষয় চিন্তা করা হচ্ছে। নতুন সঞ্চয়পত্র চালু করা হলে কি ধরনের লাভক্ষতি হতে পারে তার হিসাবনিকাশ চলছে।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে