Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২০ , ৮ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.3/5 (107 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-১১-২০১২

নবী-রাসুলের ভাষা ব্যবহারে শুদ্ধতা ও আজকের আবেদন

হাবীবুল্লাহ মুহাম্মাদ


নবী-রাসুলের ভাষা ব্যবহারে শুদ্ধতা ও আজকের আবেদন
ভাষা-সাহিত্যের শক্তি আজ পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বরং আমরা তো বলতে পারি, পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে ভাষা-সাহিত্যের শক্তি বহুগুণে বেশি। পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে শত-কোটি জনপদ গুঁড়িয়ে দেয়া যায়, কিন্তু মানুষের মন-মননকে গুঁড়িয়ে দেয়া যায় না।

অথচ ভাষা-সাহিত্যের শক্তি দিয়ে মানুষের মন-মননকে ঘুরিয়ে দেয়া যায়, গুঁড়িয়ে দেয়া যায়। যুগে যুগে এই শক্তিকে মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাস ও সভ্যতা-সংস্কৃতি নিধনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভাষার বাঁকে বাঁকে, ভাষ্যের মর্মে মর্মে তারা পুরে দিয়েছে আকিদাবিধ্বংসী বিষ। ফলে সততার স্মারক ও কল্যাণকামিতার ধারক সাহিত্য, যাকে হওয়ার ছিল মানবকল্যাণের জাদু-যন্ত্র, আজ তা পরিণত হয়েছে মানবতাবিধ্বংসী ষড়যন্ত্রে। যা হতে পারত জীবনাস্ত্র, তা পরিণত হয়েছে ‘মরণাস্ত্রে’।

ভাষা ও ভাষাবৈচিত্র্য আল্লাহর কুদরত ও নেয়ামতগুলোর অন্যতম। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণবৈচিত্র্য।’ (সূরা রুম : ২২)

যে কোনো দেশে ও পরিবেশে, যে কোনো সমাজে ও রাষ্ট্রে দীনের দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালিত করার জন্য এবং তার প্রভাব সর্বস্তরের মানুষের মাঝে বিস্তার করার জন্য সেই দেশ, পরিবেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শিতা ও পূর্ণ রুচিশীলতা পূর্বশর্ত। ভাষা যদি জীবন্ত ও আবেদনময়ী, বর্ণনা যদি হয় শিল্পোন্নত ও মর্মস্পর্শী, রচনা ও রসনায় যদি থাকে মধুরতা ও প্রকাশের মসৃণ পেলবতা, তা হলেই দাওয়াতি কর্মসূচি হবে প্রাণবন্ত-কার্যকর ও যুগান্তকর। এজন্যই আল্লাহপাক প্রত্যেক নবী-রাসুলকে তাদের দাওয়াতি কার্যক্রমকে সচল ও সফল করে তোলার জন্য ভাষার বিভূতি ও ব্যুৎপত্তি, বর্ণনার দক্ষতা ও বিশুদ্ধতা দান করেছেন। কারণ, নানা জটিল বিষয় নিয়ে তাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রাজ্ঞ প্রতিপক্ষের।

আল্লাহর একত্ববাদ, রাসুলের রেসালত, আখেরাতের অদেখা-অকল্পনীয় বিষয়াদির ভিত্তি-বিশ্বাস, জাগতিক জীবনের বিপুল-বিচিত্র সমস্যার সমাধান ইত্যাকার বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত তাদের আলোচনা-পর্যালোচনা করতে হয়েছে। দাঁড়াতে হয়েছে যুগের বড়-বড় ভাষাজ্ঞ বিদগ্ধ পণ্ডিতবর্গের সামনে। যুগে-যুগে নবী-রাসুলরা বক্তব্য ও মন্তব্য পেশ করে বিজ্ঞ প্রতিপক্ষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন হৃদয়স্পর্শী ও রোমাঞ্চকর বর্ণনাশৈলীর মাধ্যমে। বিষয় যতই গতি ও গুরুত্বের দাবি রাখুক না কেন, ভাষার সৌন্দর্য-মাধুর্য ও বর্ণনার শৈলী-সৌকর্য যদি না থাকে, তা হলে তা শোতৃবর্গের মনে-মননে, মগজে ও মেজাজে যথার্থভাবে দাগ কাটতে সক্ষম হয় না। ছায়াপাত করে না তাদের হৃদয়ে।

একজন বক্তা বিষয় ও বক্তব্যের গতি-পুষ্টি, বিষয়োচিত বাক্যগঠন, লাগসই শব্দচয়ন, গাঁথুনির গতিশীলতা ও শিল্পসম্মত বর্ণনাশৈলীর মাধ্যমে বিদ্যুৎগতি সৃষ্টি করতে পারেন শোতাদের অন্তরে, জোয়ার বইয়ে দিতে পারেন অন্তরের অতলান্ত সাগরে। তাদের মনীষায়, মননের মণিকোঠায় মুদ্রিত করতে পারেন বক্তার মনোভাব। এই শাশ্বত ও চিরায়ত সত্যকে উদ্ভাসিত করার জন্য আল্লাহপাক কোরআনে কারিমে বলিষ্ঠভাবে ঘোষণা করেছেন ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকে স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের (আল্লাহর বাণী) স্বচ্ছ-সুন্দর পদ্ধতিতে বোঝাতে পারেন।’ (সূরা ইবরাহিম : ৪)

এই আয়াতের ‘যাতে স্বচ্ছ-সুন্দর পদ্ধতিতে বোঝাতে পারেন’ -এ বাক্যাংশে রয়েছে সাগরসম অর্থবিশালতা। তাফসিরবিদরা এই বাক্যাংশ থেকে প্রমাণ করেছেন, একজন রাসুল বলতেই তাঁর দক্ষ হাত ছিল স্বজাতির ভাষায়, দৃপ্ত পদচারণা ছিল বিশুদ্ধ বর্ণনায়।

হজরত মুসা (আ.) ছিলেন বিশিষ্ট নবীদের অন্যতম। তাঁর কথা কোরআনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। ভাষার দক্ষতা ও বর্ণনার সক্ষমতা সত্ত্বেও তাঁর মুখে হালকা জড়তা ছিল। কথা বলতে গেলে মাঝে-মধ্যে হৃদয় অপ্রসন্ন ও কথা অসাবলীল হয়ে পড়ত। কিন্তু এটুকু বাক-জড়তাও ছিল একজন নবীর জন্য কাক্সিক্ষত কাজের প্রতিবন্ধক। তাই তিনি আল্লাহর কাছে মুখের জড়তা দূরীকরণ এবং নিজের ভাই হারুনকে ভাষা-সহযোগী ও নবী মনোনয়নের জন্য আবেদন করে বললেন, (ক) ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি আশঙ্কা করছি যে, তারা (স্বজাতির কাফেররা) আমার প্রতি মিথ্যারোপ করবে এবং (এ কারণে) আমার হৃদয় অপ্রসন্ন হয়ে পড়বে এবং আমার কথা সাবলীল হবে না।

’ (সূরা শু’আরা : ১৩-১৪), (খ) ‘তিনি বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রসন্ন করে দাও, আমার কাজ সহজ করে দাও এবং আমার জিহ্বার জড়তা খুলে দাও, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। আর আমার ভাই হারুনকে আমার পরিবার থেকে আমার সহযোগী নির্ধারণ কর।’ (সূরা তাহা : ২৫-৩০), (গ) ‘আর আমার ভাই হারুন, সে আমার চেয়ে অধিক সাবলীলভাষী। অতএব, তাকে আমার সহযোগী হিসেবে প্রেরণ কর। সে আমাকে সমর্থন করবে। আল্লাহ বললেন, আমি তোমার বাহুকে তোমার ভাই দ্বারা শক্তিশালী করে দেব।’ (সূরা কসাস : ৩৪-৩৫)।

উদ্ধৃত আয়াতগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, মুসা (আ.) ভাষার ওপর সম্যক ধারণা ও দক্ষতা রাখা সত্ত্বেও মুখের সামান্য জড়তার কারণে আল্লাহর কাছে সেই জড়তা দূরীকরণ এবং ছোট ভাই হারুন তাঁর চেয়ে সাবলীলভাষী হওয়ার কারণে তাকে নিজের সহযোগী নবী হিসেবে মনোনীত করার আবেদন করলেন এবং আল্লাহপাক সেই আবেদন অনতিবিলম্বে মঞ্জুরও করে নিলেন। প্রশ্ন হয় কেন? তার সহজ উত্তর, যাতে জিহ্বার জড়তা ও বলার চলন-স্বল্পতার কারণে আল্লাহর মহান ঐশীবাণীর প্রামাণ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।

আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভাষা-সৌন্দর্য ও বর্ণনা-মাধুর্যের কথা তো বলাই বাহুল্য। আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশীগ্রন্থ কোরআনে কারিম হলো নবী (সা.)-এর প্রধান-অকাট্য মুজিজা, যার সাহিত্য-সৌন্দর্য, বর্ণনা-নৈপুণ্য, বিন্যাস-বিশিষ্টতা ও প্রকাশ-পেলবতা দেখে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকরা চমকিত ও বিস্মিত হয়েছিলেন। অভিভূত ও পরাভূত হয়েছিলেন। অপরদিকে কোরআন ছিল তখনকার সাহিত্যগর্বীদের দম্ভ দীর্ণকারী চ্যালেঞ্জ। সমকালীন সাহিত্যনায়করা অকুণ্ঠে স্বীকার করেছিলেন, ‘এ কোরআন কিছুতেই মানবরচিত হতে পারে না।’ সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবই শুধু একথা দৃপ্তকণ্ঠে দাবি করতে পেরেছিলেন যে, ‘আমি আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী।’

আমাদের বাংলা ভাষা অন্যান্য দেশ ও জাতির ভাষা থেকে বহুদিক দিয়ে ভিন্ন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনন্য। আমাদের ভাষা ত্যাগ, আÍত্যাগ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ। বড় দুঃখের বিষয় যে, ভাষা-সাহিত্যের বিশ্বায়নের যুগে লেখক-সাহিত্যিকরা এক দুর্দান্ত প্রতিযোগিতায় মদমত্ত। পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুসারীদের সাহিত্য-সৃষ্টির বিজলি-বাতিতে বিশ্বাবাসী প্রভাবিত। সাহিত্যের শব্দ ও শব্দসাধনার মাধ্যমে তাদের কালি ও কলমকে শাণিত করতে সক্ষম হয়েছে। তাই সত্যপিপাসু মানুষ আজ স্থলিত তাদের প্ররোচনায়।

প্ররোচনার এহেন দুর্দমনীয় দুর্যোগে ভাষা-সাহিত্যের শুচিতা রক্ষা করা সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তি ও জাতির একান্ত নৈতিক দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। আমাদের হতে হবে অতলসন্ধানী পাঠক-গবেষক, প্রভাব সৃষ্টিকারী লেখক-সাহিত্যিক ও বাগ্মীবক্তা। ভাষা-সাহিত্যের সব শাখায়, বর্ণনা-শিল্পের প্রতিযোগিতায় আমাদের স্থান হতে হবে প্রথম ও প্রধান। মনে রাখতে হবে, গর্বগৌরব, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই রক্তার্জিত ভাষা শুধু দুনিয়াতে রেখে যাওয়ার জন্য নয়, বরং এর ফল-ফসল ফলাতে হবে আখেরাতের জন্যও। দুনিয়া ও আখেরাত দুইয়ের কাজে ও কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে এই ভাষা। সর্বোপরি আমাদের কলমের লেখায় ও চিন্তার রেখায় ফুটে উঠতে হবে নবী-রাসূলের ঐতিহ্যময় উত্তরাধিকার।

ইসলাম

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে