Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৩ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (109 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০১-১৯-২০১৫

পিঁপড়া মেরে কোটিপতি!

মুহম্মদ খান


পিঁপড়া মেরে কোটিপতি!

'ছাত্রজীবনে নেশা ছিল গেইম খেলা। মা-বাবার কত বকুনিই না খেতে হয়েছে এ জন্য! ২০০৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষে সময় এলো চাকরিজীবনে পা রাখার। তখনই একদিন মাথায় এলো, জীবিকা হওয়া চাই মনের মতো। নেশাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেব বলে ঠিক করলাম। বাবার কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়ে ছোট্ট এক কামরার অফিসে শুরু করে দিলাম গেইম বানানো। কিন্তু শুধু গেইম বানালেই তো হবে না। সেগুলো বাজারজাত করার জন্য দরকার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। আর একা একা তো প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়। তাই সহকর্মী খোঁজা শুরু করলাম। পেয়েও গেলাম রফিকুজ্জামান আর ইকবাল হোসেনকে। যাত্রা শুরু হলো আমাদের প্রতিষ্ঠান রাইজ আপ ল্যাবস-এর।' এভাবেই শুরুর গল্প বলছিলেন এরশাদুল হক। যে রাইজ আপ ল্যাবসের তৈরি মোবাইল গেইম 'ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্টস' মাতিয়েছে গোটা বিশ্বকে।

এরশাদুল জানালেন, ছোট্ট এক কামরা থেকে রাইজ আপ ল্যাবের এখন উত্তরায় ১৬ হাজার বর্গফুটের অফিস। এখানে কাজ করেন ৬০ জন ডেভেলপার। তাঁদের তৈরি অ্যাপলিকেশনের সংখ্যা এখন শতাধিক। এগুলোর মধ্যে 'ট্যাপ ট্যাপ ট্যাপ মার্বেল', 'লাভার ফ্রগ', 'ঘোস্ট সুইপারফল রেইনি', 'আইওয়্যার হাউস', 'গ্লুবার', 'শুট দ্য মাংকি', 'ফ্রুইটিটো' ও 'বাবল অ্যাটাক' বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফেইসবুকের জন্য তৈরি হয় 'ফ্যাক্টরি প্রজেক্ট'।

তৈরি হলো ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্টস
একে একে বিভিন্ন প্রাণী আসতে থাকবে এবং আঙুল দিয়ে টিপে সেগুলো মারতে হবে-শুরুতে এমন কাহিনী নিয়ে 'ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্টস' তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও পরে শুধু পিঁপড়া নিয়ে গেইমটি তৈরি হয়। প্রথমে চারুকলার বন্ধুদের নিয়ে করা হয় পিঁপড়ার নকশা। এরপর কম্পিউটারে প্রোগ্রামিংয়ে একে গেইমের রূপ দেওয়া হয়। অনেক বিনিদ্র রাতের ফসল গেইমটি প্রথমে দেওয়া হয় অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরে। এরশাদুল জানালেন, 'ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্টস'-এর যাত্রার শুরুটা ছিল বেশ কষ্টের। সে সময় গেইমের আর্টিস্ট ও প্রোগ্রামার খুঁজতেই বেশি ভুগতে হয়েছে আমাদের। আমরা কাজ চালিয়ে গেছি পাঁচ-ছয়জন নিয়ে। প্রোগ্রামারদের কাজ শিখতেই অনেক সময় চলে যায়। তারা মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ নেয়। এর মধ্যেই গেইমের আর্টওয়ার্কগুলো তৈরি হয়ে যায়। গেইমটি সম্পূর্ণ করতে আমাদের প্রায় আড়াই মাস লেগে যায়। গেমটির মূল কনসেপ্টটি হলো, স্ক্রিনের নিচের অংশে কিছু খাবার থাকবে এবং অসংখ্য ক্ষুধার্ত পিঁপড়ার হাত থেকে খাবার রক্ষা করতে হবে। গেইমারকে স্ক্রিনে টাচ করে পিঁপড়াগুলোকে পিষে মারতে হবে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিঁপড়ার সংখ্যাও বাড়তে থাকে এবং গেইমটিকে আরো চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। গেইমটিতে বিভিন্ন রকমের পিঁপড়া রয়েছে, কোনোটি আস্তে চলে, কোনোটি দ্রুতগামী, আবার কোনোটির আকৃতি অন্য পিঁপড়াগুলোর তুলনায় এত বড় যে এক কামড়েই সম্পূর্ণ খাবার খেয়ে ফেলবে এবং গেইম ওভার হয়ে যাবে।

'ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্টস' গেইমটি তিনটি মোড নিয়ে যাত্রা শুরু করে-টাইম মোড, সারভাইভাল মোড ও কিড মোড। মোড তিনটির আছে তিন বিশেষত্ব; টাইম মোডে নির্দিষ্ট সময়ে যতটা সম্ভব বেশি পিঁপড়া মারতে ও স্কোর করতে হবে। সারভাইভাল মোডে গেইমারকে অফুরন্ত সময় দেওয়া হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না ক্ষুধার্ত পিঁপড়াগুলো সম্পূর্ণ খাবার খেয়ে ফেলে। আর কিড মোডটি মূলত শিশুদের জন্য তৈরি। এখানে পিঁপড়াগুলো হবে কার্টুন টাইপের, শিশুরা যেমনটা পছন্দ করে, ঠিক তেমনটি। গেইমটিতে গেইমারের হাতে গেইমের ব্যাকগ্রাউন্ড, সংগীত ও খাবারের ধরন পরিবর্তনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

এরশাদুল জানালেন, শুরুতে গেইমটির গ্রাফিকস খুব বেশি ভালো না থাকলেও কিছুদিন পর এর গ্রাফিকস আরো উন্নত করেন। এ ছাড়া গেইমটিকে আরো আকর্ষণীয় করতে পরবর্তী সময়ে গেইমটিতে আরো কয়েকটি মোড, ঋতু অনুযায়ী কিছু গেইম ব্যাকগ্রাউন্ড ও মিউজিক যোগ করেন। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। ফলে এখনো নতুন নতুন জিনিস সংযোজন করে যাচ্ছেন।

সাফল্যের শুরু
এরশাদুল জানান, ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্টস অ্যাপেল স্টোরে ছাড়ার প্রথম আট মাসে মোট ডাউনলোড হয় মাত্র এক হাজারবার। সে সময় মাথায় ছিল শুধু বিশ্ববাজারে কিভাবে এই পিঁপড়া গেইমটি আনা যায়। আর এই কাজকে বাস্তবে রূপ দিতেই তাঁরা খুঁজতে থাকেন বিভিন্ন রিভিউ সাইট, যেগুলোতে গেইম নিয়ে লেখা হয়। পেয়েও যান বেশ কিছু; তবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে অনেক সময় কেটে যায়। অ্যাপেল স্টোরে তখন ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্টস গেইমটির নবম মাস, সে সময় kotaku.com নামের একটি বিখ্যাত গেইম রিভিউ সাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা অমাবস্যার চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। সেই সাইটের মতে, গেইমটি খুবই মজার এবং ভার্চুয়াল পিঁপড়ার কনসেপ্ট, সাউন্ড ও গ্রাফিকস খুবই চমৎকার। মূলত এই সাইটের রিভিউ পড়েই অনেকের নজরে আশে গেইমটি। এরপর গেইমটি প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ হাজারবার ডাউনলোড হতে থাকে। এবং এটি ইউরোপ, আফ্রিকাসহ অনেক দেশে পরিচিতি পেতে থাকে। এরপর আরো কিছু বিখ্যাত রিভিউ সাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তারাও গেইমটি নিয়ে লিখতে রাজি হয়। তার পরই গেইমটি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, রাশিয়া, জার্মানি, জাপান, তুরস্ক, হংকং, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ব্রাজিল, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, সৌদি আরবসহ বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে অ্যাপল স্টোরের গেইমস সেকশনে শীর্ষস্থান দখল করে নেয়। ডাউনলোড হয় দেড় কোটিবারেরও বেশি! এখন পর্যন্ত অনেক দেশে গেইমটি শীর্ষস্থানে আছে। ২০ বছরের কম বয়সী গেইমারদের কাছে গেইমটি বেশ পছন্দনীয়।

যেভাবে আয়
গেমটির বিনা মূল্যের সংস্করণের পাশাপাশি এর আছে একটি 'এক্সক্লুসিভ' সংস্করণ। এ দুই সংস্করণ থেকেই দুইভাবে অর্থ উপার্জন করে থাকে রাইজ আপ ল্যাবস। বিনা মূল্যের সংস্করণে আয় আসে বিজ্ঞাপন থেকে। তবে এই সংস্করণের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এখানে গেইমারকে বিজ্ঞাপন দেখতেই হবে এবং আরো বিশেষ কিছু সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। পেইড সংস্করণে মূলত গেইমারকে কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই গেইমটি খেলার সুযোগ দেওয়া হয়; এ ছাড়া গেইমের বাড়তি কিছু সুবিধা তো থাকছেই।

এখন যেমন
আগে যে গেইমগুলো বানিয়েছেন, তার সবই শুধু অ্যাপল স্টোরের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। গত ডিসেম্বরে নতুন গেইম 'হাইওয়ে চেজ' বাজারে ছেড়েছেন। এটি অ্যাপল স্টোরের পাশাপাশি গুগল প্লে ও অ্যামাজন স্টোরেও পাওয়া যাচ্ছে। 'হাইওয়ে চেজ' একটি অ্যাকশনধর্মী শুটিং গেইম, যেখানে গেইমারের চরিত্রে রয়েছেন একজন স্নাইপার। গেইমারের মূল লক্ষ্য হলো, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে চোরের গাড়ি ধ্বংস করা। পাশাপাশি পথচারী ও সাধারণ গাড়িতে যেন আঘাত না লাগে, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে তাকে। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রাইজ আপ ল্যাবস বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মোবাইল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এ প্রতিযোগিতায় প্রায় সাত হাজার প্রতিযোগী অংশ নেয়।

এ ছাড়া 'হাইওয়ে চেজ' নিয়ে একটি অনলাইন গেইমিং প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে ২৯ ডিসেম্বর থেকে। মাসব্যাপী প্রতিযোগিতাটি চলবে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। এ প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীরা ঘরে বসেই অংশ নিতে পারছেন। নিয়মাবলি রয়েছে facebook.com/riseuplabs-এ।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিশ্বের উইন্ডোজ গেইমারদের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সম্প্রতি মাইক্রোসফটের সঙ্গে চুক্তি করেছে রাইজ আপ ল্যাবস। ফলে তাদের তৈরি গেইমগুলো ভবিষ্যতে অ্যাপল স্টোর, গুগল প্লে, অ্যামাজন স্টোরের পাশাপাশি পাওয়া যাবে উইন্ডোজেও। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে হতে যাওয়া 'ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড'-এ অবমুক্ত করা হবে নতুন গেইম 'রুফটপ ফ্রেঞ্জি'।

এর চেয়ে বড় খবর হলো, এ মাসেই আসবে 'ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্টস'-এর অ্যানড্রয়েড সংস্করণ।

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে