Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২০ , ৭ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.2/5 (36 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-০৪-২০১২

উৎপত্তি বাংলাদেশে হলেও মিথ্যাচার করছে ভারত

উৎপত্তি বাংলাদেশে হলেও মিথ্যাচার করছে ভারত
ফেনী নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশে। অথচ ভারত নদীটির উৎপত্তিস্থল তাদের দেশে দাবি করছে। দীর্ঘ সময় ধরে নদীর মিরসরাইয়ের মুহুরী প্রকল্প থেকে খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার আচালং এলাকার ভগবান টিলা (বি টিলা) পর্যন্ত অনুসন্ধান করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বলা হতো, ‘‘ফেনী নদী আন্তর্জাতিক। বাংলাদেশ ও ভারতকে বিভক্তকারী এই নদীর উৎপত্তি ত্রিপুরা রাজ্যে।’’ অথচ অনুসন্ধানে প্রমাণ হয়, এটি বাংলাদেশের সম্পদ। এর উৎপত্তি মাটিরাঙ্গার ভগবানটিলায়। নদীর ১০৮ কিলোমিটারের কোনো অংশ ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেনি।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, মিরসরাইয়ের আমলীঘাট সীমান্ত এলাকায় গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নদীর পারে ব্লক তৈরি করছে ভারত। এই সীমান্তে পাইপ বসিয়ে ভারতের উপেন্দ্রনগরের জন্য পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। রামগড়ের অদূরে সাবরুম শহরের পানির সংকট মেটাতে ১৭টি পাইপ বসিয়ে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে অনবরত। এছাড়া আচালং মৌজায় ১৭০০ একর জমি ভারত বেদখল করে রেখেছে।

 

ফেনী নদী সর্ম্পকে জানতে যাওয়া হয় ফরিদপুরে বাংলাদেশের একমাত্র পানি গবেষণা ইন্সটিটিউটে। আশানুরূপ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নদীর মুহুরী প্রকল্প থেকে ধুমঘাট-আমলীঘাট, রামগড়, পিলাক নদীর পার, মাটিরাঙ্গা আচালং, তাইন্দং এবং সবশেষ ভগবান টিলায় গিয়ে নদীর উৎপত্তিস্থল পাওয়া যায়।

 

এ বিষয়ে মিরসরাই পানি ব্যবস্থাপনা ফোরামের সদস্য শাহ আলম বলেন, ‘‘আমরা কেবল সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি- ফেনী নদী আমাদের, ভারত আমাদের ওপর অবিচার করছে। আমাদের সম্পদ তারা কেড়ে নিতে চাইছে, নিচ্ছেও।’’

 

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া থেকে শুরু করে একাধিক ভূচিত্রাবলীতে এই নদী নিয়ে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এর দূরত্ব নিয়েও নানা রকমের গরমিল রয়েছে এসব গ্রন্থে।

 

বাংলাদেশের অনেক উপ-নদী, খাল-ছড়ি মিলিত হয়েছে ফেনী নদীতে। সেদিক দিয়েও ভারত পিছিয়ে। ফেনী নদীর পানির বেশিরভাগ উৎস বাংলাদেশ। অথচ এই সময়ে আচালং থেকে আমলীঘাট পর্যন্ত প্রায় ৮৬ কিলোমিটারের কোথাও বাংলাদেশীরা নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছে না। একমাত্র ‘নোম্যানসল্যান্ড’ আখ্যা দিয়ে বিএসএফ বাহিনী তটস্থ করে রেখেছে আমাদের সীমান্তরক্ষী থেকে শুরু করে সাধারণ বাসিন্দাদের। তারা দিব্যি দিনের আলোতেই পানি ‘চুরি’ করে নিচ্ছে। ফেনী নদীর ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। অনেকে মনে করেন, ভারতীয় আগ্রাসন বন্ধ না হলে কিংবা প্রস্তাবিত চুক্তি আলোর মুখ দেখলে লাখো মানুষের ভাগ্যাকাশ অমানিশায় ঢেকে যাবে।

 

মিরসরাইয়ের মুহুরী প্রকল্প থেকে বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতিরা বলছে ফেনী নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশে। তারা বলেছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় শ্রেণী নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটিরাঙা ও পানছড়ি উপজেলার মধ্যবর্তী ভগবানটিলা নামের একটি পাহাড় থেকেই এ নদীর যাত্রা শুরু। পাহাড়ের ছড়া থেকে উৎপত্তির পরপরই নদীটি বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে ভারতের ইজেরা গ্রামে প্রবেশ করে। ইজেরা গ্রাম থেকেই নদীটি ফেনী নদী নামে পরিচিত। দুই দেশের সীমান্ত ঘেঁষে বেশ কিছুটা অগ্রসর হওয়ার পর নদীটি মিরসরাইয়ের আমলীঘাট এক নম্বর করেরহাট ইউনিয়ন দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী উপজেলা ছুঁয়ে মিলিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরে।

 

জানা গেছে, ভারত এ নদীর উৎপত্তি ত্রিপুরা রাজ্যের পর্বত শ্রেণী থেকে হয়েছে বলে দাবি করছে। উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ ত্রিপুরা থেকে উৎপত্তি হওয়ার পর ফেনী নদী ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম হয়ে বংলাদেশে ঢুকেছে। এমনকি বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়, ফেনী নদী ত্রিপুরার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে প্রবাহিত হয়ে আলীগঞ্জ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে সীমান্তরেখা তৈরি করেছে। এরপর সমতলে নেমে এসে নদীটি চট্টগ্রাম থেকে নোয়াখালীকে আলাদা করে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ফেনী নদীর প্রবাহপথ চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের আমলীঘাট থেকে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলার তাইন্দং ইউনিয়নের আচালং সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় স্থানীয় লোকজন জানায়, ‘‘নদীটির উৎস প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে।’’

 

ফেনী নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত বিরোধ দীর্ঘদিনের। ভারত নদীটির পানি প্রত্যাহার করে ত্রিপুরায় সেচকাজে ব্যবহারের বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিলেও বাংলাদেশের আপত্তিতে সে উদ্যোগ অনেকটাই আটকে আছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য দ্য আসাম ট্রিবিউনে গত ৪ সেপ্টেম্বর ‘ত্রিপুরা হোপস ফর সলিউশন টু রিভার ডিসপুটস উইথ বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘ফেনী নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ১৯৩৪ সাল থেকেই বিরোধ চলছে। এ নদীর মোট আয়তন ১১৪৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ৫৩৫ বর্গকিলোমিটার ভারতের মধ্যে রয়েছে। নদীর বাকি অংশ বাংলাদেশ অংশে।’’

 

দ্য আসাম ট্রিবিউন লিখেছে, ‘‘বিভিন্ন কারিগরি জটিলতায় ফেনী নদীর পানির পরিমাণ এখন পর্যন্ত নির্ধারণ করা যায়নি। সে জন্য পানির ভাগাভাগি নিয়েও বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি।’’

 

ফেনী নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সম্প্রতি আয়োজিত সংবাদ সম্মলেনে দাবি করা হয়, ‘‘ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল পার্বত্য চট্টগ্রামে। ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় শ্রেণীতে এর উৎপত্তির তথ্য সঠিক নয়। খাগড়াছড়ির রামগড় এলাকায় এ নদী দুই দেশকে কেবল বিভক্ত করেছে। এর আর কোনো অংশই ভারতের দাবি করা উচিত হবে না।’’

 

অভিযোগ রয়েছে, সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের নাগরিকরা ফেনী নদীর পানি ছুঁতে গেলেও বাধা দেয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ আখ্যা দিয়ে বিএসএফ বাংলাদেশিদের এ নদীর পানি ব্যবহার করতে বাধা দিচ্ছে। অথচ ভারতীয়রা দিবিব ব্যবহার করছে ফেনী নদীর পানি। ভাঙন রোধে বাংলাদেশিদের ব্লক বসাতে বিএসএফ বাধা দিলেও নদীর অপর পারে ব্লক বসিয়েছে ভারত।

 

খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন দাবি করেন, ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই। মাটিরাঙা সদর থেকে ৫৫ কিলোমিটার পূর্বে আচালং তাইন্দং এলাকার কাছাকাছি  থেকে নদীর যাত্রা শুরু হয়েছে।’’ রামগড় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল কাদেরসহ, অনেকে  জানান, ফেনী নদীর উৎপত্তি মাটিরাঙা-পানছড়ির মধ্যবর্তী ভগবানটিলায়।

 

ফেনী নাগরিক সমাজের আহবায়ক গোলাম নবী বলেন, ‘‘আমরা অনুসন্ধানে জেনেছি, ফেনী নদীর উৎপত্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে। সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে নদীটি রামগড়, মিরসরাই, সোনাগাজী ছুঁয়ে মিলেছে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে।’’ তিনি বলেন, ‘‘ফেনী নদীর উৎসসহ বেশির ভাগ অংশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হওয়ায় এর পানি এ দেশের উন্নয়নেই ব্যবহার করা উচিত।  ভারতকে ফেনী নদীর পানি দেয়া হলে দেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম সেচ প্রকল্প মিরসরাইয়ের ‘মুহুরী প্রকল্প’ একদিন পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে।’’

 

মিরসরাই পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. জামসেদ আলম বলেন, ‘‘আমরা অনুসন্ধানে গিয়ে দেখেছি এ নদীর উৎপত্তি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে। ভারত তাদের দেশে নদীর উৎপত্তি বলে চরম মিথ্যাচার করছে। তাই আমি সরকারের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি ফেনী নদী আমাদের দেশের সম্পদ। নদীকে ভারতের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে হবে।’’

 

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে