Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-০২-২০১২

তিস্তা এখন কোনো নদী নয়, শুধুই বালুচর

তিস্তা এখন কোনো নদী নয়, শুধুই বালুচর
তিস্তাকে এখন আর নদী বলা যাবে না। সে এক রূপ কথার গল্পে পরিণত হয়েছে। এটা এখন কোনো নদী নয়, বালুচর। এককালের স্রোতশ্বিনী তিস্তার যতদূর চোখ যায় শুধু বালু আর বালু। কোথাও পানির দেখা নেই।
 প্রকৃতির কোলে সৃষ্টি এককালের স্রোতশ্বিনী পাহাড়ের সুন্দরী কন্যা তিস্তাকে মানুষ গলাটিপে হত্যা করেছে।
 
ভারতের গজলডোবা নামক স্থানে প্রবেশ মুখে ও নীলফামারীর দোয়ানিতে ব্যারেজ নির্মাণ করে এ নদীর উচ্ছ্বল দুর্বার গতিকে সভ্যসমাজের ‘সভ্য মানুষরা’ রোধ করে দিয়েছে।
 
বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে তিস্তার স্রোত ঘুরিয়ে দিয়ে তার বুক থেকে তুলে নেয়া হয়েছে পানি নামের জীবন। মরে গেছে তিস্তা। এই নদীর পারে দাঁড়ালে এখন বাতাসে শুনতে পাওয়া যায় ক্ষীণকায় তিস্তার দীর্ঘশ্বাস, আর গুঁমড়ে ওঠা কান্নার শব্দ।
 
গত সোমবার তিস্তা রেল তুর ওপর দাঁড়িয়ে দু’দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস নেয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
 
রংপুরের সাংবাদিক সালেক বললেন, “ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ট্রেনে চড়ে তিস্তা নদী পারি দেয়ার সময় নীচের দিকে তাকালেই বুক ধরপর করে উঠতো। ট্রেনের জানালা দিয়ে তিস্তার পানির স্রোতের দিকে তাকানো যেতো না। ভয়ে বুক কাঁপতো। সেই তিস্তা এখন শুধুই বালুচর। তিস্তার এই দশা দেখে মনের মধ্যে রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু কিছুই করার নেই। এতো ভারতের পানি আগ্রাসনেরই ফল।”
 
উজান থেকে ভাটিতে যেখানে এসে তিস্তা ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলেছে, এই তিনশ’ কিলোমিটার নদীকে ঘিরে দু’পাড়ের যেসব মানুষ গড়ে তুলেছিল বসতি ও জীবিকা, প্রকৃতি এঁকেছিল জলরঙে সবুজের ছবি, এখন তা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। বিপন্ন হয়ে পড়ছে পরিবেশ। মরুকরণ প্রক্রিয়া দ্রুততর হওয়ায় মরে যাচ্ছে বড় বড় গাছপালা। হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র।
 
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, তিস্তার পানি প্রবাহ এযাবতকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে যেখানে প্রয়োজন চার হাজার কিউসেক পানি, সেখানে শুধু ব্যারেজ এলাকায় পানি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২শ’ কিউসেক। ভাটিতে এই প্রবাহ একেবারেই কমে যাওয়ায় এর প্রভাবে তিস্তা ব্যারাজ থেকে দেড়শ’ কিলোমিটার পর্যন্ত নদী এখন মরা গাঙে পরিণত হয়েছে।
 
হিমালয়ের চো লামু লেক থেকে তিস্তার উৎপত্তি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭ হাজার ৫শ ফিট উচ্চতায় এ নদীর উৎস হওয়ায় উজানে তিস্তার গতি ছিল উচ্ছ্বল ও দুর্বার। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজের উজানে গজলডোবা নামক স্থানে একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে তিস্তার এই দুর্বার গতিকে থামিয়ে দেয় ভারত। তিস্তার মূল স্রোতধারাকে ব্যারেজের বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে ঘুরিয়ে তারা তাদের উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর  জেলায় বিভিন্ন সেচ কাজে লাগায়। গজলডোবা ব্যারেজ থেকে শুষ্ক  মৌসুমে যে পরিমাণ পানি ভাটিতে বাংলাদেশকে দেয়া হয় ওই পরিমাণ পানি প্রায় ৭০ কিলোমিটার অতিক্রম করে তিস্তা ব্যারেজে এসে পৌঁছে। তখন নদীর স্রোতধারা ক্ষীণ হয়ে সরু ফিতার আকার ধারণ করে।
 
নীলফামারী জেলার ছাতনাই গ্রাম। যেখান থেকে তিস্তা বাংলাদেশ অংশে প্রবেশ করেছে, সেখান থেকে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর পর্যন্ত, যেখানে ব্রহ্মপুত্রে এসে মিলিত হয়েছে- এই দীর্ঘ দেড়শ’ কিলোমিটারে তিস্তা তার নাব্যতা হারিয়ে শীর্ণ, কঙ্কালসার।
 
কুড়িগ্রামের সাংবাদিক উমর ফারুক বললেন, “এই তিস্তা একসময় বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি সরবরাহ করতো । পানির অভাবে সেই তিস্তা নিজেই এখন পিপাসার্ত।”
 
লালমনিরহাট জেলার বাসিন্দা  মোশাররফ হোসেন বললেন, “তিস্তার উজানে ভারত ব্যারাজ নির্মাণ করে বাংলাদেশ অংশে নির্মিত তিস্তা ব্যারাজের কার্যকারিতা নষ্ট করে দিয়েছে। এখন এই ব্যারাজ রাখার অর্থই হলো তিস্তা নদীর টুটি চেপে ধরে তাকে মেরে ফেলা।”
 
এক সময়ের প্রমত্তা তিস্তার এ মুমূর্ষু অবস্থার প্রভাব পড়েছে লালমনিরহাটের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট-বড় অর্ধশতাধিক নদ-নদীর ওপর। এগুলো এখন মরা গাঙে পরিণত হয়েছে।
 
এদিকে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে দেশের সর্ববৃহৎ  সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা ব্যারাজ’ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সেখানকার ৪৪টি স্লুইস গেটের মধ্যে মাত্র একটিতে সামান্য পানির প্রবাহ রয়েছে। ব্যারাজের উজানে বর্তমানে রয়েছে এক থেকে দেড় হাজার কিউসেক পানির প্রবাহ।
 
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা। তিস্তার পানিবণ্টনে বেশ খানিকটা অগ্রগতিও হয় সম্প্রতি। কিন্তু বাধ সাধেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তার নেতিবাচক ভূমিকায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ তিস্তা পাড়ের লাখ লাখ মানুষ।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে