Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৯ , ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৮-২০১২

চার ব্যাংকের পরিত্যক্ত লকারে শত শত কোটি টাকার সম্পদ

চার ব্যাংকের পরিত্যক্ত লকারে শত শত কোটি টাকার সম্পদ
গত ৪০ বছর ধরে ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের মালিকবিহীন পরিত্যক্ত লকারে শত শত কোটি টাকার সম্পদ পড়ে আছে। এসব সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্বিগ্ন। এজন্য তারা এসব সম্পদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে বার বার তাগাদা দিচ্ছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো এতদিন এতে সাড়া দেয়নি। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের চরমপত্র দিয়েছে। জানা গেছে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৩(ঘ) ধারা অনুযায়ী, টানা ১০ বছর কোনো লকারের মালিক পাওয়া না গেলে সেই লকারের সম্পদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হয়। এ বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংককে তিনবার চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি এসব সম্পদ ২৯ মার্চের মধ্যে ফেরত দিতে ব্যাংকগুলোকে কড়া ভাষায় চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ। এই বিভাগের সাবেক মহাব্যবস্থাপক হুমায়ূন কবির যায়যায়দিনকে জানান, তারা মালিকবিহীন লকারের সম্পদ ফেরত দেয়ার জন্য আগে তিনবার ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে চিঠি দিয়েছেন। নানা রকম আইনি জটিলতার দোহাই নিয়ে তারা এসব সম্পদ ফেরত দিচ্ছে না। তাই আইনি জটিলতা নিরসন করে ২৯ মার্চের মধ্যে সম্পদ ফেরত দিতে বলা হয়েছে। এবার নির্দেশ অমান্য করলে তাদের আর্থিক জরিমানা করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, লকার ভাঙা ও খোলা এবং সম্পদ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমাদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে অনুসরণ করে ২৯ মার্চের মধ্যে লকারগুলোতে রক্ষিত সব সম্পদ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমাদানের পরামর্শ দেয়া হলো। ওই তারিখের মধ্যে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলে কোনো পত্র প্রদান ছাড়াই ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১-এর সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, লকারের সম্পদগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে জমাদানের ক্ষেত্রে এর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরিবহন খরচ সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বহন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুলিশ ফোর্স নিয়োগ কিংবা ভিন্ন কোনো উৎস থেকে পরিবহন খরচ প্রদানের কোনো সুযোগ নেই। জানা গেছে, প্রায় ৪০ বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ৪টি ব্যাংকের লকারে শত শত কোটি টাকার সোনা-গহনাসহ মূল্যবান সম্পদ পড়ে আছে। কিন্তু এসব সম্পদের কোনো মালিক নেই, নেই দাবিদার। ফলে যে কোনো সময় এসব সম্পদ খোয়া যাওয়ার আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকটি লকার ভেঙে বাদশাহি আমলের বড় মোহর (প্রতিটি ১ ভরি ওজনের স্বর্ণমুদ্রা) ১৪টি, মাঝারি ১৫১টি, ১৯ ভরি ওজনের গলার হাঁসুলি, ৫৩ ভরি ওজনের ২টি স্বর্ণবার, ৯ ভরি ওজনের ২টি সোনার বালা, ২৩ ভরি ওজনের ২টি ব্রেসলেট,১ ২২ ভরি ওজনের ১৬টি চুড়ি এবং ১১ ভরি ওজনের ৩টি স্বর্ণের চেইন পাওয়া যায়। এছাড়া বেশ কিছু লকারে দামি পাথর বসানো বাদশাহি আমলের গহনা পাওয়া যায়। একজন লাইসেন্সধারী স্বর্ণকারের মাধ্যমে এসব সম্পদের পরিমাপ করা হয়। অগ্রণী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, তাদের আরো অনেক শাখায় অকেজো এবং অপরিচালিত লকার রয়েছে, যা এখনো ভাঙা হয়নি। এর মধ্যে ঢাকার গ্রিন রোড শাখা, রমনা কর্পোরেট শাখা, নিউ মার্কেট শাখা, পল্লবী শাখা ও মৌলভীবাজার শাখা এবং চট্টগ্রামের রাউজান ও আগ্রাবাদ শাখা অন্যতম। জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি পুরনো লকার আছে ঢাকার মিটফোর্ড রোডের অগ্রণী ব্যাংকের মৌলভীবাজার শাখায়। সেখানে লকার আছে ৪৪৮টি। পাকিস্তান আমলে এটা ছিল হাবিব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। পাকিস্তান আমলে হাবিব ব্যাংকের এই প্রধান শাখায় ঢাকার বণিক ও জমিদারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার জোতদার, তালুকদার বা ব্যবসায়ীরা সম্পদ গচ্ছিত রাখতেন বলে কথিত আছে। জানা গেছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংক এবং কমার্স ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত হয় অগ্রণী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের লকার ভাড়া নিয়ে অনেকে মূল্যবান সম্পদ জমা রাখেন। স্বাধীনতার পর লকারগুলোর মালিকদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। এসব সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে বিপাকে রয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তাদের আশঙ্কা, যথাযথ নিরাপত্তা না থাকায় সম্পদগুলো যে কোনো সময় খোয়া বা চুরি হয়ে যেতে পারে। এ ব্যাপারে অগ্রণী ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর একেএম মুজিবুর রহমান যায়যায়দিনকে জানান, মালিকবিহীন লকারে যেসব সম্পদ রয়েছে, তার মালিক সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি তারা পেয়েছেন। চিঠির সময়সীমা অনুযায়ী সম্পদ ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। মার্চের মধ্যে লকারের মালিক খোঁজার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হবে। এর মধ্যে লকারের দাবিদার পাওয়া না গেলে লকার ভেঙে সব সম্পদ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়া হবে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগ শাখায় ভল্ট, লকার ও ক্যাশ কাউন্টারের নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। যে কোনো সময় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংকগুলোর পক্ষে তা মোকাবেলা করার সক্ষমতা নেই। তাই ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন শাখার ভল্ট, লকার ও ক্যাশ কাউন্টারের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক লকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর জন্য কয়েকটি ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে। জানা গেছে, গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দল রাজধানীর সোনালী, রূপালী, যমুনা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, ন্যাশনাল এবং ব্র্যাকসহ ২৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভল্ট, লকার ও ক্যাশ কাউন্টার পরিদর্শন করে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থায় অসন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, তারা ঝুঁকির মধ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকের লকারের নিরাপত্তার জন্য ভল্টের মতো ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু বেশিরভাগ ব্যাংকে সেই ব্যবস্থা নেই। গ্রাহকরা নিরাপত্তার জন্য মূল্যবান সম্পদ ব্যাংকের লকারে জমা রাখে। কয়েক বছর আগে রাজধানীর ব্র্যাক ব্যাংকের লকার ভেঙে মোটা অঙ্কের সম্পদ লুট করা হয়। এরপর থেকেই ব্যাংক লকার পরিচালনার জন্য আলাদা নীতিমালা করে। তবে নীতিমালা এখন পর্যন্ত অনেক ব্যাংকে বাস্তবায়ন করা হয়নি। এদিকে শিল্পকলার গবেষক ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা জানান, আগেকার দিনে জমিদার ও মহাজনরা দেব-দেবীর উপাসনার জন্য ভারী গহনা তৈরি করতেন। গহনায় থাকত দামি পাথর। এসব গহনা শুধু মূল্যবান নয়, এর ঐতিহাসিক মূল্যও রয়েছে। আর বাদশাহি আমলের মোহরের প্রত্নমূল্য অপরিসীম। এ ব্যাপারে গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ জানান, প্রত্নসম্পদ যে স্বর্ণ বা হীরার চেয়েও বেশি মূল্যবান, সেই সম্পর্কে শিক্ষিত জনগণেরও একটি বড় অংশের ধারণা নেই। যে কোনো ধনী দেশ চাইলেই কয়েক টন স্বর্ণ কিনতে পারে। কিন্তু প্রত্নসম্পদ পাওয়া যে কারো জন্যই দুঃসাধ্য। অর্থমূল্য দিয়ে প্রত্নসম্পদ যাচাই করা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে এগুলো অমূল্য। প্রত্নতাত্তি্বক ও গবেষক অধ্যাপক ড. শাহ সুফী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ব্যাংকের লকারে প্রত্নসম্পদ থাকা অসম্ভব কিছু নয়। প্রাচীন আমলের স্বর্ণের হার বা ধাতব সামগ্রীর সবই প্রত্নতাত্তি্বক সম্পদ। সেগুলোর নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে