Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ , ১৩ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.5/5 (40 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১০-১২-২০১৪

শিক্ষিকা থেকে আইএসআইএস জঙ্গি হয়ে ওঠা এক তরুণীর গল্প

রাজিউল হাসান


শিক্ষিকা থেকে আইএসআইএস জঙ্গি হয়ে ওঠা এক তরুণীর গল্প

দামেস্ক, ১২ অক্টোবর- খুব ধীরে সে তার নেকাব তুলল, তারুণ্যে ভরা কোমল এক মুখাবয়ব অনাবৃত হল। তার বড় বড় বাদামী সুন্দর চোখজোড়ায় ছিল অপরাধবোধ আর অশান্তি। স্কুলশিক্ষিকা থেকে আইএসআইএস জঙ্গি বনে যাওয়া একজনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে এমনভাবেই তাকে উপস্থাপন করেছেন সিএনএন-এর আরওয়া ড্যামন এবং গুল টুইসুয।

সে নিজেকে ‘খাদিজা’ বলে পরিচয় দেয়। এটা তার প্রকৃত নাম নয়। এই ছদ্মনাম ধারণের কারণ সে আইএসআইএস-এর একজন চিহ্নিত নারীসদস্য। সিএনএন-এর সাথে সাক্ষাৎকারে ২৫ বছর বয়সী এই নারী তার জীবনের সেই সব গল্পই বলেছেন, যা এর আগে কারোরই জানা ছিল না।

সিরিয়ায় বেড়ে ওঠা খাদিজার পরিবার তার শিক্ষা নিশ্চিত করেছিল। সে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে স্কুলশিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে। তার পরিবার মাত্রাতিরিক্ত রক্ষণশীলও ছিল না কখনো।

খাদিজা জানায়, সাড়ে তিনবছর আগে সিরিয়াবাসী যখন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে জেগে উঠতে শুরু করল, সেও তখন সেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে যোগ দেয়।

সে বলে, আমরা আন্দোলনে যেতাম, নিরাপত্তারক্ষীরা আমাদের ধাওয়া করত। পরিবর্তনের জন্য আমরা দেয়ালে লিখতাম। সেইসব দিনগুলো ছিল সত্যিই অন্যরকম!

কিন্তু যখন সিরিয়াবাসীর আন্দোলন গোলযোগ এবং সহিংসতায় রূপ নিল আমি তখন আমার আত্মা এবং মানবতাকে হারাতে শুরু করলাম, বলেন খাদিজা।

সে বলে, আমাদের চারপাশে ছিল শুধুই গোলযোগ। মুক্ত সিরিয়ান সেনা, বোমা, অবরোধ, হতাহত, ক্লিনিক, রক্ত- এসবই যে কাউকে অন্যকিছু খুঁজতে তাড়িত করতে বাধ্য। আমার সমস্যা হল- আমি তাড়িত হয়েছিলাম আরো খারাপ কিছুর সন্ধানে।

অনলাইনে এমন সময় খাদিজার পরিচয় হয় তিউনিশিয়ান এক বাগ্মীর সাথে। ধীরে ধীরে তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করে সে। এই বাগ্মীই একটা সময়ে কথার বাগ্মীতায় খাদিজাকে আইএসআইএস-এর সাথে সংশ্লিষ্ট করে তোলে। লোকটা তাকে নিশ্চিত করে, ইসলামিক স্টেট কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন নয়, এটি তা নয় যা মানুষ মনে করে।

খাদিজা জানায়, লোকটা বলত, আমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় কাজ করছি। বর্তমানে আমরা এক রাষ্ট্রীয় যুদ্ধের মাঝে আছি। আমরা এখন এমন অবস্থায় আছি, যে অবস্থায় প্রথমে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আমাদের হাতে নিতে হবে। কাজেই আমাদেরকে এখন একটু কঠোর হতেই হবে।

সেই বাগ্মী খাদিজাকে সিরিয়ার রাক্কা শহরে স্থানান্তর হতে বলেছিল যাতে তারা বিয়ে করতে পারে।

খাদিজা বলে, এরপর আমার সাথে আমার চাচাত বোনের যোগাযোগ ঘটে। সে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলে, তুমি চাইলে খানশা-এ ব্রিগেডে যোগ দিতে পারো। আমার সেই বোনও রাক্কায় বাস করতো। তার স্বামীও ইসলামিক স্টেটের সাথে সম্পৃক্ত ছিল।

এই খানশা-এ ব্রিগেড ইসলামিক স্টেটের সকল নারী সংগঠনগুলোর মাঝে সবচেয়ে ভয়ংকর ব্রিগেড।

খাদিজা তার পরিবারকে রাক্কায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেয় এই বলে যে, তাহলে ছোট ভাইবোনগুলোর স্কুলে ভর্তি করানো সহজ হবে এবং তারা আত্মীয়দের কাছ থেকে সহায়তাও পাবে। তার পরিবার খুব সহজে মেনেও নিয়েছিল এই পরামর্শ।

রাক্কায় স্থানান্তর হওয়া মাত্র খাদিজার জন্য খানশা-এ ব্রিগেডের দরজা খুলে যায়। এই ব্রিগেডটা ২৫ থেকে ৩০ জন নারীসদস্যের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছিল। এই সদস্যদের দায়িত্ব ছিল রাক্কার পথেঘাটে টহল দেওয়া এবং নারীরা আইএসআইএস-এর নির্দেশনা অনুযায়ী পোশাক পরছে কি না, তা তদারকি করা। নারীদের চোখ দেখানো পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছিল ইসলামিক স্টেট।

যেসকল নারী আইএসআইএস-এর নিয়ম ভাঙতো, তাদের বিরুদ্ধে উম হামযা ব্যবস্থা নিত। উম হামযাকে প্রথম দেখার পর খাদিজা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল।

খাদিজা বলে, সে কোনো সাধারণ নারী ছিল না। সে অনেক বড়। তার সাথে ছিল একটি একে-৪৭, একটি পিস্তল, একটি চাবুক, একটি বড় ছোরা এবং সে নেকাব পরতো।

খাদিজা বলে, ব্রিগেডের কমান্ডার উম রায়ান আমার ভয়কে বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি আমার কাছে আসলেন এবং একটি কথা বললেন, যা আমি কোনোদিন ভুলবো না। তিনি বললেন, আমরা অবিশ্বাসীদের জন্য কঠোর কিন্তু নিজেদের জন্য ক্ষমাশীল।

খাদিজাকে পরিচ্ছন্ন করা, গুলি চালানো এবং বোমা বিস্ফোরণের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। প্রতিমাসে তাকে ২শ’ মার্কিন ডলার পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। সেই সাথে খাদ্য রেশনও দেওয়া হতো।

যে পর্যায়ে গিয়ে খাদিজার পরিবার সব বুঝতে পারলো, তখন আর কিছু করার ছিল না। তার মা তবুও তাকে সাবধান করেন। খাদিজা বলে, মা সবসময় বলতেন, জাগো। নিজের খেয়াল কর। তুমি হাঁটছ কিন্তু তুমি জানো না কোথায় যাচ্ছ।

প্রথমদিকে খাদিজা তার মায়ের কথায় কর্ণপাত করেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে সে নিজেকে প্রশ্ন করা শুরু করে। নিজের পথচলা, ইসলামিক স্টেটের উদ্দেশ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার ভেতর প্রশ্ন তৈরি হয়।

খাদিজা বলে, প্রথমদিকে আমি আমার কাজ নিয়ে সুখী ছিলাম। আমি অনুভব করলাম, রাস্তায় আমার অধিকার আছে। কিন্তু এরপরই আমি ভয় পেতে শুরু করলাম। নিজের অবস্থান সম্পর্কে ভীত হয়ে পড়লাম। আমি নিজেকেও ভয় পেতে শুরু করলাম।

সে ভাবতে শুরু করল, আমি তো এমন না! আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে। আমার এমন হওয়া উচিত হয়নি। আমার কী হল? আমার মনের কী হয়ে গেল, যা আমাকে এই অবস্থায় টেনে নিয়ে আসলো?

এরপরই তার ভেতর আইএসআইএস সম্পর্কে ধারণা পাল্টে যেতে শুরু করে। খাদিজা বলে, সবচেয়ে খারাপ যে বিষয়টা আমি দেখেছি, আমার সামনে একজন মানুষের শিরোশ্ছেদ হচ্ছে।

সে বলে, একজন লোক ছিল, যে খানশা-এ ব্রিগেড থেকে নারীসদস্যদের বেছে স্থানীয় এবং বিদেশী আইএসআইএস যোদ্ধাদের সাথে বিয়ে দেয়ার কাজটা করতো। লোকটা খুবই খারাপ ছিল।

খাদিজা বলে, বিদেশি যোদ্ধারা নারীদের সাথে ছিল খুবই নিষ্ঠুর। এমনকি তারা তাদের স্ত্রীদেরকেও সম্মান করতো না। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে, যৌননির্যাতনের কারণে নারীদেরকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়েছে।

খাদিজা জানায়, যখন তার কমান্ডার তাকে বিয়ে করতে চাপ দিতে থাকে, তখনই প্রথম সে ব্রিগেড ত্যাগের কথা চিন্তা করতে শুরু করে। চিন্তার পরপরই যৌথ বিমানহামলা শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে খাদিজা আইএসআইএস ত্যাগ করে, ত্যাগ করে সিরিয়া। কিন্তু তার পরিবার রয়ে যায় সেখানেই।

খাদিজা এখনো নেকাব পরে, তবে তা নিজের পরিচয় ঢেকে রাখতে নয়, ইসলামিক স্টেটের বাইরে নতুন এক জীবন শুরু করতে।

সাক্ষাৎকারের শেষদিকে কী করে আইএসআইএস সিরিয়ায় প্রবেশ করল- এমন এক প্রশ্নের জবাবে খাদিজা বলে, আমরা কী করে তাদের প্রবেশ করতে দিলাম? আমরা কী করে তাদেরকে আমাদের শাসন করার অধিকার দিলাম? কারণ আমাদের দুর্বলতা ছিল।

একদম শেষে শঙ্কা এবং আবেগ নিয়ে খাদিজ বলে, আমি চাই না, আর কারোর জীবন আমার মতো করে নষ্ট হয়ে যাক।

খাদিজা প্রচণ্ডভাবে তার অতীতে ফিরে যেতে চায়। সে চায়, পূর্বে সে যেমন প্রাঞ্জল-উচ্ছ্বল তরুণী ছিল, তেমনই স্বপ্নপ্রবণ এক তরুণী হয়ে উঠতে।

মধ্যপ্রাচ্য

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে