Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ , ৫ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.4/5 (28 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৬-২০১২

স্বজনদের চোখে পানি, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ

স্বজনদের চোখে পানি, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ
'দেখো, তোমার সাবরিনকে নিয়ে এসেছি। তোমার আদর পাওয়ার আশায় ও বছরের পর বছর ধরে বুক বেঁধে আছে। ওকে একটু আদর করে দাও। বাবা বলে ওকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ দাও।' শহীদ মেজর মোমিনুল সরকারের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী সোনিয়া সরকার। মায়ের কান্না দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে তিন বছরের সন্তান সাদাকাত সাবরিন বীন মোমিন। মায়ের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে বাবার কবরের গায়ে গজিয়ে ওঠা ঘাসে কচি হাতের পরশ বুলিয়ে দেয়। এর কিছুটা অদূরেই মেজর কাজী মোসাদ্দেক হোসেনের কবরের পাশে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন তার স্ত্রী কোহিনূর হোসেন ও কিশোরী মেয়ে লাইকা। বিড়বিড় করে কোহিনূর বলছিলেন, 'দেখে যাও, তোমাকে ছাড়া আমি কিভাবে বেঁচে আছি! তোমার মেয়ে লাইকা কেমন আছে। ওর ছোট্ট বুকে কত কষ্ট জমে আছে।' কর্নেল কুদরত ইলাহী রহমান শফিকের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে সাকিব রহমান ছল ছল চোখে বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে, তার হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা। তার সারিতে স্বজনহারা শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের মা-বাবা-ভাই-বোন অনেকেই। এভাবেই শোকে, শ্রদ্ধায়, স্মরণে, ভালোবাসায়, আর ফুলে ফুলে ভরে যায় বনানীর সামরিক কবরস্থান। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানার সেই নারকীয় ঘটনায় যেসব সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছিলেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল সকাল থেকেই কবরস্থানে জড়ো হয়েছিলেন স্বজনরা। শ্রদ্ধা জানাতে আসেন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকও। তিন বছর আগে বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের যারা চোখের পানিতে বিদায় জানিয়েছিলেন, কাল তারাই বনানীর সামরিক কবরস্থানে এসেছিলেন প্রিয়জনের চিরবিদায়ের বছরপূর্তিতে। শোকাহত এ স্বজনদের অনেকেরই চোখে ছিল শঙ্কা-উৎকণ্ঠা আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে? পিলখানা হত্যাযজ্ঞের বিচার কবে শেষ হবে? বিচার কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে? কবর জিয়ারত শেষে কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আসা স্বজনদের ভিড়ে এমন শত প্রশ্নের ভিড়ে কর্নেল কুদরত ইলাহীর ছেলে সাকিব রহমান প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন- বিচার যা-ই হোক, যেদিনই শেষ হোক, আমি তো আমার বাবাকে ফিরে পাব না। কথিত বিডিআর বিদ্রোহের নামে নৃশংস এ হত্যাযজ্ঞে আমরা যারা স্বজন হারিয়েছি কেউ তো আর কোনোদিন তাদের আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কেউ কেউ কবরস্থানে এসে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিদ্রোহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কর্মকা-ের সমালোচনা করেন তারা। এক কর্মকর্তার স্ত্রী বলেন, সময় ক্ষেপণ করে কর্মকর্তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। আরেকজন বলেন, এটা চক্রান্ত। এক শহীদ সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী বলেন, মরার অনেক আগেই ওরা মৃত্যুর ডাক শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু বীরের মতো ওরা যুদ্ধ করে মরতে পারেনি। ওদের সে সুযোগ দেয়া হয়নি। ওদের হাত-পা বাঁধা বন্দির মতো মরতে হয়েছে। অথচ ওরা তো কেউ কাপুরুষ নন। ওরা বীর, বীরের মৃত্যুই ছিল ওদের কাম্য। কিন্তু সে সুযোগ ওদের দেয়নি....। মেজর মোমিনুল সরকারের স্ত্রী সোনিয়া জানান, পিলখানা হত্যাযজ্ঞের এগারো দিন পর তার ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করে। মোমিনুলের ইচ্ছানুযায়ী তার নাম রাখা হয় সাদাকাত সাবরিন বীন মোমিন। অথচ প্রিয় সন্তানের নাম ধরে সে একবার ডাকতে পারেনি। স্মৃতি হাতড়ে সোনিয়া বলেন, নানা ধর্মীয় গ্রন্থ ঘেটে অনাগত সন্তানের নাম ঠিক করেছিল মোমিন। সন্তানকে কীভাবে কেমন করে মানুষ করবে এ নিয়েও ছিল ওর নানা জল্পনা-কল্পনা। কিন্তু আজ ওর সন্তান কিভাবে মানুষ হচ্ছে সে খবর ও রাখতে পারছে না। এর চেয়ে কষ্টের আর কী আছে? পিলখানায় নিহত ৫৭ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে ৫০ জনের দাফন হয়েছে বনানীর সামরিক কবরস্থানে। অন্যদের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। সারিবদ্ধ কবরের প্রথম দুটি বিডিআরের মহাপরিচালক শাকিল আহমেদ ও তার স্ত্রীর। কবরগুলো সারি করে বাঁধানো, সিরামিকের ছোট দেয়াল আর স্টিলে ঘেরা। মাঝে কালো সিরামিক লাগানো স্মৃতিস্তম্ভ। তাতে তিন সারিতে নিহত সব কর্মকর্তা ও সদস্যদের নাম লেখা। এই নামফলকের বেদিতেই সকাল থেকে সবাই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এর আগে শনিবার সকাল ১০টায় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পিলখানা হত্যাকা-ে নিহত সেনা কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের নিহত সদস্যদের স্মরণ করা হয়। বনানীর সামরিক কবরস্থানে সকাল ১০টায় রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কাজী ফকরুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সহকারী সামরিক সচিব লে. কর্নেল মনির, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনুদ্দিন খন্দকার নিহতদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মুবীন, নৌবাহিনী প্রধান ভাইস এডমিরাল জহির উদ্দিন আহমেদ, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল শাহ মো. জিয়াউর রহমান এবং বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান দলের সভাপতিম-লীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। এ সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম হানিফ, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবিএম তাজুল ইসলামসহ মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা শহীদদের উদ্দেশ্যে স্যালুট প্রদান করেন। এরপর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া চাওয়া হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর সাংবাদিকদের বলেন, আজকের দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করা হোক। তিনি পিলখানা হত্যাকা-ের প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের দাবি জানান। এদিকে দীর্ঘ তিন বছরেও এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিচার না হওয়ায় নিহতদের স্বজনরা অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা এ দিবসটিকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণার পাশাপাশি পিলখানার দরবার হলটিকে জাদুঘর করার দাবি জানান। অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের মতো পিলখানা হত্যাযজ্ঞে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের সম্মাননা দেয়ার দাবি তোলেন। চাকরি ক্ষেত্রে তাদের সন্তানদের জন্যও নির্ধারিত কোটার দাবি তোলা হয়। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের সময় ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, তাদের পরিবারের দুইজন, একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও একজন সৈনিকসহ মোট ৭৫ জন নিহত হন। এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পক্ষ থেকেও শোকাবহ দিবসটি মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হয়। বাদ ফজর থেকে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। দুপুর সাড়ে ১২টায় পিলখানার মাল্টিপারপাস ট্রেনিং শেডে দোয়া ও মিলাত মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। পিলখানা ছাড়াও বিজিবির সব সেক্টর, প্রতিষ্ঠান, ইউনিটের প্রধান মসজিদ এবং বিওপি পর্যায়ে বাদ জোহর দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। পিলখানায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনুদ্দিন খন্দকার, বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আনোয়ার হোসেনসহ পিলখানায় কর্মরত সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও বিজিবির সদস্যরা।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে