Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৭ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.2/5 (78 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৩-২০১২

একুশের ষাট বছর: শুদ্ধ বাংলা হোক সবার প্রথম ভাষা। লিখেছেন-ভাষ্যকার অন্তরনামা ব্লগ থেকে

একুশের ষাট বছর: শুদ্ধ বাংলা হোক সবার প্রথম ভাষা। লিখেছেন-ভাষ্যকার অন্তরনামা ব্লগ থেকে
বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মিডিয়ায় বিশেষ করে এফএম রেডিও এবং কয়েকটি টিভি চ্যানেলে অদ্ভুত রকমের উচ্চারণ নিয়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে অনেক দিন থেকেই। বিষয়টি নিয়ে আড়ালে-আবডালে অনেক আলচনা হয়েছিল কিন্তু কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি কখনোই। কিন্তু কিছুদিন আগে মহামান্য হাইকোর্ট যে বেতার ও দূরদর্শনে (টিভি) বাংলা ভাষাকে ব্যঙ্গ করে বা বিকৃত উচ্চারণে প্রচার করা যাবে না- মর্মে একটি রুল জারি হয়। এটা ইতিবাচক একটি বিষয় বলে আমরা মনে করি।

বাংলা ভাষার বিকৃতি নিয়ে কিছু রেডিও ও টিভি চ্যানেলের অতিব্যবহার নিঃসন্দেহে খারাপ একটি উদাহরণ। মিডিয়ার মধ্যে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অবস্থান সব সময়ই খুব শক্তিশালী। এই মাধ্যমে যদি বিকৃতভাবে বাংলা ভাষাকে উপস্থাপন করা হয় তাহলে একটা প্রজন্ম এভাবেই শিখবে। যার কারণে আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবসের ষাট বছর হলেও বাংলাকে সম্মানের আসনে আসীন করার পথে অন্তরায় হয়ে যাবে।

অনেকেই ভাবতে পারেন বাংলা এখনো বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রে প্রথম ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি তাই এমন সিদ্ধান্ত কতটা ফল দেবে। তবে আমি মনে করি যেহেতু কোন একটা জায়গা থেকে শুরু করতে হবে বিধায় আমাদের প্রথমে শুদ্ধ বাংলার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম ভাগে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে অনুচ্ছেদ ৩ এ বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা৷ সংবিধানের ১৫৩/৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাইবে।’ ১৯৮৭ সালে প্রণীত ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’-এর তৃতীয় ধারায় বলা হয়েছে-’এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনগত কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে।’ ওই আইনের ২(১) উপধারায় বলা হয়েছে, কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহলে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। এটা হলো বাংলাদেশের সংবিধান এবং আইনের কথা। কিন্তু এর প্রয়োগ নিয়ে কে কতখানি সচেতন তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান।

দেশ স্বাধীন হয়েছে ৩৯ বছর আগে এবং বাঙালী ভাষার জন্যে রক্ত দিয়েছে তার বয়স হয়ে গেছে ৬০ বছর। ইতিমধ্যে বাংলা ভাষা জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিজস্ব গৌরবে গরিয়ান হয়ে উঠেছে। তাই আজকের এই দিনটি পৃথিবীর সব ভাষাভাষি মানুষেরই। কিন্তু যাই হোক অন্যরা এর মর্যাদা এবং অর্জনের পেছনের ঘটনা এবং পরবর্তী কার্যবিধি না জানলেও চলবে। কিন্তু বাংলা ভাষাভাষী বাঙালীদের তাদের নিজস্ব এই ভাষা ব্যবহারে কতটুকু সচেতন তা নিয়ে আলোচনা দাবী রাখে।
বাংলা ভাষাকে তাচ্ছিল্যের প্রাথমিক এবং আনুষ্ঠানিক ধাপ শুরু হয় ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় থেকেই। দেশ ভাগের পরে পাকিস্থান রাষ্ট্র ঘটিত হলে সর্বপ্রথমই বাংলা ভাষার উপর খড়্গ নেমে আসে। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিয়াউদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সর্বপ্রথম প্রস্তাব করেন। যার রাজনৈতিক রূপ দেন জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে- Urdu and Urdu alone must be the state language of Pakistan ঘোষনার মাধ্যমে। তারপরের ইতিহাস রক্তের মাধ্যমে ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা। খাজা নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমীনের দমননীতি এবং বিশ্বাসঘাতকতার বিপরীতে সালাম, বরকত, জব্বারদের আত্মাহুতি এবং বাংলা ভাষার দাবীর প্রতিষ্ঠা।

ভাষার দাবী প্রতিষ্ঠা এবং ত‍্যাগের এত বছর পরেও বাংলা সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ভাষা হয়ে উঠেনি তার কারণ অনুসন্ধানে দেখা যাবে যে, ভারত বিজয়ের পর থেকেই বাংলাকে রাষ্টীয়ভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়নি। প্রথমাবস্থায় দেশের সবকিছুই হতো ফার্সীতে যখন মুসলমানেরা ভারত জয় করেছিলো। সেখান থেকেই আসলে বাংলাকে তাচ্ছিল্য করার প্রবণতা দেখা দেয়। ইংরেজ আমলে ইংরেজীকে গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। বাঙালী মুসলমানেরা ইংরেজির প্রতি অনাসক্তি দেখানোর কারনে তাদেরকে সামাজিকভাবে ক্ষুদ্র করে রাখা হত রাষ্ট্রীয়ভাবে। ইংরেজ গেলো, পাকিস্থানীরা গেলো কিন্তু তাদের ভূত আসলে রয়ে গেছে সবখানেই। তাই বাংলাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদার আসনে পাকাপোক্ত করে তোলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা এখন পর্যন্তই!

বর্তমানে বাংলাদেশের অফিস-আদালতের প্রাথমিক ভাষা হিসেবে বাংলা অন্তর্ভুক্ত নাই। এর বদলে স্থান দখল করে আছে ইংরেজী ভাষা। ইংরেজী ভাষার প্রতি আমাদের কোন বিদ্বেষ নাই এবং থাকার কোন যৌক্তিক কারণও নাই। কিন্তু বাংলার বদলে ইংরেজির এই দৌরাত্ম্য আসলে মনোকষ্ঠের কারণ অনেকক্ষেত্রেই। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এগিয়ে আসা উচিত। অফিসে যোগদানের প্রাথমিক শর্ত হিসেবে ধরা হয় ইংরেজিতে পারদরশিতা। এটা অনেক ক্ষেত্রে ঠিক আছে তবে অফিসিয়াল মনোভাব সরাসরি বাংলা ভাষার প্রতি সরাসরি তাচ্ছিল্যসূচক। যা অনাকাঙ্খিত। দেশের টিভি-চ্যানেল এবং রেডিওতে যেভাবে বাংলাকে ব্যবহৃত হচ্ছে তাতে করে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় থাকেনা।

বাংলাদেশের আদালতব্যবস্থায় বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করা হচ্ছেনা কোনভাবেই। যা সরাসরি বাংলা ভাষাকে সরাসরি অবজ্ঞাপ্রদর্শন। এর শুরু রাষ্ট্রই করেছে। ১৯৭৮ সালে সংবিধানের পাঠ-জটিলতা সম্পর্কিত দ্বিতীয় ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছেসংবিধানের যেকোনো ধরনের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন, অর্থগত অসংগতি ইত্যাদির ক্ষেত্রে ‘ইংরেজি ভাষা প্রাধান্য পাইবে’।
আরেকটা নজির দেখেন, বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহারের জন্য ১৯৭৮ সালের ২৮ ডিসেম্বরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত লেখা হয়েছিল ইংরেজিতে এবং সর্বত্র পরিপত্র জারি করা হয়েছিল ইংরেজি ভাষায়। কী আশ্চর্যের ব্যাপার বাংলাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার হবে কিন্তু যে পরিপত্র লেখা হলো তা হচ্ছে ইংরেজিতে! এরচেয়ে হাস্যকর আর কি হতে পারে! সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি থাকলেও সাংবিধানিকভাবে বাংলার অবমূল্যায়নের ফলে জাতীয় জীবনে বাংলা ভাষার প্রভাব ক্রমশ কমতে থাকে। এ গেলো সাংবিধানিকভাবে বাংলাভাষাকে অবমূল্যায়নের নজির। এবার দেখুন বাংলাদেশের আদালতে কিভাবে বাংলার ব্যবহার হচ্ছেঃ নিম্ন আদালতে সাক্ষ্য, জেরা, আদেশ বাংলায় নেয়া এবং দেয়া হচ্ছে ঠিকই কিন্তু উচ্চ আদালতে গেলে তার খোলস পাল্টে যায়। উচ্চ আদালতের সর্বক্ষেত্রে ইংরেজিই অন্যতম ভাষা। এমনকি কোন নিম্ন আদালতের বিচারক উচ্চ আদালতে বিচারিক পদে যোগ দিতে তার এডিশনাল যোগ্যতা হিসেবে অন্তত তিনটি রায় ইংরেজিতে দেয়া লাগবে বলে বিধান রয়েছে।

হতে পারে ডাক্তার অথবা বিচারকেরা ইংরেজিতে লেখাপড়া করে এসেছেন বলে তারা ইংরেজিতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবেনা তাদের প্রাথমিক যোগ্যতার আরেকটা নিদর্শন হতে পারে বাংলা ভাষায় সমান পারদর্শীতা। কিছু শব্দ রয়েছে যা আসলে মানুষের ঠোটস্থ হয়ে গেছে তার পরিবর্তন না এনে পুরো বিষয়টিকে বাংলা ভাষার মাধ্যমে ব্যবহার করা শুরু করলে হয়তো ভাষার প্রতি আমাদের সম্মান জানানো সম্ভত হতো।

আমার এ লেখার উদ্দেশ্য কোন বিশেষ ভাষাকে হেয় অথবা বিরোধিতা নয়। আমি নিজেও আমার কর্মক্ষেত্রে ইংরেজিকেই গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ এছাড়া সম্ভব নয়। রাষ্ট্রই পারে আমাদের সবার জন্যে বাংলা ভাষার সর্বোত্তম ব্যবহারের পথ প্রশস্থ করতে।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে