Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ , ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (95 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৩-২০১২

সিলেটি উপভাষা ও নাগরী লিপি। লিখেছেন- সুমনকুমার দাশ জলভূমিব্লগ থেকে

সিলেটি উপভাষা ও নাগরী লিপি। লিখেছেন- সুমনকুমার দাশ জলভূমিব্লগ থেকে
প্রাচীনকাল হতে সিলেট অঞ্চলের রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নিসর্গ ও অর্থনীতি-প্রতিটি ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের প্রাতস্বিকতা অনস্বীকার্য। হাওর-বাঁওড়, পাহাড়-টিলা আর চা-বাগান অধ্যুষিত এ জনপদ প্রকৃতিগত কারণেই পেয়েছে স্বকীয়তা। জাতীয় অর্থনীতিতে রয়েছে প্রবাসী সিলেটিদের ব্যাপক অবদান। এ অঞ্চলের প্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে মুগ্ধ হয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পণ্ডিত সরোজিনী নাইডু, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, পর্যটক ইবনে বতুতাসহ অনেকেই।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিমুগ্ধ হয়ে এক কবিতায় সিলেটকে অভিহিত করেছিলেন ‘সুন্দরী শ্রীভূমি’ বলে আর পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর উক্তি : ‘sylhet is bengal with a difference.’ এ রকম অসংখ্য মনীষী সিলেট সম্পর্কে অকুণ্ঠচিত্তে উচ্ছ্বসিত মূল্যায়ন করেছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এ অঞ্চলের ভাষার বৈচিত্র্য, স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চলের তুলনায় ভিন্নতর।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত সিলেট অঞ্চলে আদিবাসী ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠী সুদীর্ঘকাল ধরে বসবাস করছে। এদের যেমন পৃথক বর্ণ, গোত্র ও দৈহিক গড়ন, তেমনি রয়েছে পৃথক মৌখিক ভাষাও। তবে এ ভাষা তাদের নিজেদের সমাজ ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই কেবল প্রচলিত। যখন পুরো অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করতে হয় তখন আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে তারা সিলেটি উপভাষাকেই বেছে নেন। বলা বাহুল্য, সিলেটি উপভাষা কোনো আলাদা ভাষা নয়-বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের বাংলা ভাষারই একটি আঞ্চলিক রূপমাত্র।
বৃহত্তর সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতীরবর্তী হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার এবং সুনামগঞ্জ-এই চারটি জেলার মানুষ ছাড়াও ভারতের বরাক নদীতীরবর্তী আসামের কাছাড় ও করিমগঞ্জ অঞ্চলের প্রায় দেড় কোটি মানুষ তাদের প্রাত্যহিক জীবনে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। যদিও নিজেদের এলাকার বাইরে তারা সচরাচর শুদ্ধ প্রমিত বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকে।
শুধু কথা বলা ও জীবনযাপনের মধ্যেই সিলেটি ভাষা চর্চার বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রেও সিলেটি আঞ্চলিক ভাষার প্রচলন আমরা প্রাচীনকাল হতে দেখে আসছি। এ অঞ্চলের মরমী ও লোককবি, বাউল-ফকির থেকে শুরু করে সামপ্রতিককালের সাহিত্যসেবীরা পর্যন্ত সিলেটি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করছেন। আরও অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, পবিত্র কোরান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় রূপান্তরিত হচ্ছে। কোরান শরিফের সুরা নাস-এর সিলেটি ভাষায় তরজমা করা হয়েছে এভাবে : ‘(১) তুমি কও আমি আশ্রয় নিলাম মানুষর রবর। (২) মানুষর মালিকর। (৩) মানুষর মাবুদর। (৪) তার ক্ষেতি থাকি যে কুমন্ত্রণা দেয় আর লুকাইয়া থাকে। (৫) যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষর দিলো। (৬) জিন্নাতর মাঝ থাকি আর মানুষর মাঝ থাকি।’
সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় এ ধরনের রূপান্তর এখন গ্রামের অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন স্বল্পশিক্ষিত মানুষের কাছে বহুলপঠিত ও নন্দিত। এছাড়া সিলেটি ভাষায় রচিত হিন্দু ও মুসলিম ধর্মীয় আখ্যানমূলক বিভিন্ন কাহিনী এখনও গ্রামে গ্রামে গল্পের আসরে শ্রোতাদের বিনোদনের খোরাক জুগিয়ে আসছে। শুধু ভাষাগত চর্চার দিক থেকে নয়, বরং এ অঞ্চলের বৃহত্ জনগোষ্ঠী আন্তরিকতা ও ভালোবাসাসহ নিজেদের উচ্চারণগত স্বাতন্ত্র্য ও উপভাষা লালন করে আসছে। এ সম্পর্কে আলাদা করে আর কিছুই বলার নেই।
বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। ভাষার তারতম্যের কারণেই বলা হয়, ‘এক দেশের বুলি অন্য দেশের গালি।’ প্রসঙ্গক্রমে সিলেট অঞ্চলের প্রচলিত একটি কৌতুকের কথা মনে পড়ছে। এটি হচ্ছে : চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে এক ভদ্রলোক সিলেটে চাকরিসূত্রে প্রথমবারের মতো এসেছেন। তিনি রেলস্টেশনে নেমে পাশের একটি রেস্তোরাঁয় মিষ্টি খাওয়ার উদ্দেশ্যে ঢুকলেন। দোকানিকে ডেকে মিষ্টির অর্ডার দিলেন। এ সময় দোকানি বললেন, ‘কোনগু দিমু? লালগু না সাদাগু?’
ব্যস, শুরু হয়ে গেল ওই আগন্তুক আর দোকানির মধ্যে বাক-বিতণ্ডা। এ পর্যায়ে আশপাশের লোকজন এসে পুরো বিষয়ের বর্ণনা শুনে ওই আগন্তুককে বোঝাতে সক্ষম হন যে দোকানি ‘গু’ বলতে ‘টা’ বুঝিয়েছেন। লাল মিষ্টি না সাদা মিষ্টি, কোনটা দেবেন সেটাই আগন্তুকের কাছে দোকানি জানতে চেয়েছেন।
এটা একটা বিচ্ছিন্ন উদাহরণ মাত্র। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার সহজাত প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ফলে অন্য অঞ্চলের মানুষ ভাষাগত তারতম্যের কারণে প্রথমবারের মতো সিলেটে এসে ভাবের আদান-প্রদানে সাময়িক সমস্যায় পড়ে থাকেন বটে, তবে এটাও ঠিক-কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সিলেট অঞ্চলের শিক্ষিত মানুষজন প্রমিত বাংলা ভাষায় দক্ষতার সঙ্গে কথা বলে থাকেন।

মানুষের ভাবের আদান-প্রদানের জন্য সারা বিশ্বে অসংখ্য ভাষা রয়েছে, সেই ভাষা ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের মধ্যে আবার কোথাও কোথাও উপভাষার প্রচলন রয়েছে। পৃথিবীতে এমন অনেক ভাষা আছে, যার কোনো নিজস্ব বর্ণমালা নেই। তবে লিপি আছে অথচ ভাষা নেই-সারা বিশ্বে এমন ব্যতিক্রম বোধহয় শুধু সিলেটি নাগরী লিপির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আরবি ও ফারসি ভাষার সঙ্গে সিলেটি স্থানীয় ভাষার সংমিশ্রণে নাগরী ভাষার লিপির উদ্ভব হয়।
সিলেটি নাগরী লিপির জন্মসাল নিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে, তারপরও প্রায় সাতশ’ বছর আগে সিলেট অঞ্চলে এ লিপির প্রচলন শুরু হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা। তবে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘চতুদর্শ শতাব্দীতে হজরত শাহজালালের আবির্ভাবের পর এই লিপির উত্পত্তি ও বিকাশ ঘটেছে।’ তবে এ নিয়ে কারও মতদ্বৈধ নেই যে নাগরী লিপি সিলেটে আবিষ্কৃত হয়ে পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল এবং আসামের কাছাড় ও করিমগঞ্জেও এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছিল।
লিপি উদ্ভবের পর থেকে গত একশ’ বছর আগ পর্যন্ত লোকজীবন ঘেঁষা পীর, ফকির ও মরমী গায়কেরাই নাগরী লিপিতে বিভিন্ন গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি সেগুলো যত্ন সহকারে লালন করে আসছিলেন। নাগরী লিপি বিষয়ক গবেষক মোহাম্মদ সাদিক তার সিলেটি নাগরী : ফকিরি ধারার ফসল গ্রন্থে জানিয়েছেন, ‘কয়েক শতাব্দীর প্রথাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতির বাইরে এই লিপির উত্স ও বিকাশ সম্পন্ন হয়েছে। নির্জনে নিভৃত সাধক ফকির-দরবেশরা করেছেন এর পরিচর্যা। শিষ্য পরম্পরায় সম্পন্ন হয়েছে এর শিক্ষাদান পদ্ধতি। লোকচক্ষুর আড়ালে সিলেটের মাটিতে একটি নিবিড় নিভৃত ফকিরি প্রবাহ সিলেটি নাগরী লিপিকে তার ভাব-ভাষা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন।’
সাদিক আরও জানান যে, ‘প্রধানত ফকির-দরবেশ, তাদের শিষ্য-প্রশিষ্য ও খাদেমদের দ্বারা এই লিপির পরিচর্যা সম্পন্ন হয়েছে। সিলেটের মুসলমান সমপ্রদায়ের একটি বড় অংশ এই লিপিতে রচিত সাহিত্যের মনোযোগী পাঠক, শ্রোতা ও ব্যবহারকারী ছিলেন। অন্তঃপুরবাসিনীদের মধ্যে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ফকির-দরবেশ-বাউল শ্রেণীর ভক্তিবাদী ও মরমী গায়কেরা এসবের চর্চা ও পরিচর্যা করেছেন। [...] বর্তমানে যে কটি মৌলিক কারণে সিলেটি নাগরী লিপির ওপর গবেষকদের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছে, তা হল : লিপিতাত্ত্বিক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, সাহিত্যমূল্য, ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব, ধর্মীয় অনুষঙ্গ এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দলিল প্রসঙ্গ।’
সিলেটি নাগরী লিপির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—এটির মোট বর্ণ ৩৩টি। এর মধ্যে হরফসংখ্যা ৩২ এবং একটি অনুস্বার রয়েছে। এই বর্ণের মধ্যে ৫টি স্বর এবং ২৮টি ব্যঞ্জন। এই বর্ণগুলোতে বাংলা, গুজরাটি, কাইথি, আফগান ও দেবনাগরীর লিপিগুলোর সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। এই লিপিতে কম যুক্তাক্ষরে শব্দগঠন এবং একটি বর্ণ একটি ধ্বনির জন্য ব্যবহূত হয়ে থাকে।
সামপ্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে নাগরী লিপিতে রচিত বহু পাণ্ডুলিপি সংগৃহীত হয়েছে। তবে আরও অনেক পাণ্ডুলিপি এখনও লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে। আশার কথা হচ্ছে-সেসব পাণ্ডুলিপি সংগৃহ করে বাংলা ও সিলেটি ভাষায় লিপ্যন্তর করে বই আকারেও প্রকাশ করছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। নৈতিকতা ও মূল্যবোধে কাজে আসে কিংবা বিনোদনের জন্য রচিত পুথিগুলো মুদ্রণের ব্যাপারে আপত্তি না থাকলেও ফকিরি ধারার নানান গুপ্ত বিষয়-আশয় নিয়ে রচিত পুথিগুলো প্রকাশ করে জনসমক্ষে নিয়ে আসাটা একেবারেই অনুচিত বলে ইতোমধ্যে অনেক পণ্ডিত মতামত ব্যক্ত করেছেন।
সিলেটি নাগরী লিপি চর্চাও নেহায়েত কম হয়নি। এক্ষেত্রে পণ্ডিত জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন, বি. সি. অ্যালেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, যোগেশচন্দ্র ঘোষ, সুকুমার সেন, নগেন্দ্রকুমার বসু, পদ্মনাথ ভট্টাচার্য, আহমদ হাসান দানী, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, চৌধুরী গোলাম আকবর, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, এস এম গোলাম কাদির, মুহম্মদ আসাদ্দর আলী, মোহাম্মদ সাদিকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এঁদের সবাই নাগরী লিপি নিয়ে গবেষণা করেছেন।
সিলেটি নাগরী লিপিতে রচিত
অসংখ্য পুথি ও গ্রন্থে মূলত ফকিরি তথা বাতেনি বিষয়-আশয় ছাড়াও ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন আখ্যান, কারবালার করুণ কাহিনী, ইউসুফ-জোলেখার প্রেমকাহিনী, রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা, চিকিত্সাশাস্ত্র ও জাদুবিদ্যা সম্পর্কিত তথ্যসহ বিভিন্ন ‘রাগ’ অর্থাত্ গান স্থান পেয়েছে। গানগুলো সৃষ্টিতত্ত্ব, অধ্যাত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব ও ফকিরি বিষয় নিয়ে রচিত।
গবেষক সৈয়দ মুর্তাজা আলীর অভিমত, ‘এই লিপির ব্যবহার সিলেটের মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। হিন্দুরা এই লিপির সহিত মোটেই পরিচিত ছিল না।  নাগরী পুঁথির কতকগুলি ইসলাম প্রচার, কতকগুলি পীর আউলিয়ার জীবনী, কতকগুলি সমাজ-সংস্কার, রোমান্টিক কাহিনী, প্রেমপ্রীতিমূলক। এ সকল পুথি পল্লীজীবন সরস করে পল্লীবাসীদের সাহিত্যধারা অক্ষুণ্ন রেখেছে। অভিজাত বংশীয়দের বাদ দিলে পল্লীবাসীর জনচিত্ত এই লিপিতে লিখিত সাহিত্যকে অবলম্বন করে বিকাল লাভ করে।’
নাগরী লিপিতে প্রণীত কালজয়ী গ্রন্থ হালাতুননবী, জঙ্গনামা, মহব্বতনামা, শহীদ এমাম, নূর নছিহত, সাত কন্যার বাখান, তালিব হুছন, নূর পরিচয়, ছয়ফুল বেদাত, মুশকিল তরান, ভেদশার, সিলেটি নাগরি পহেলা কিতাব, রাগনামা, মুজমা রাগহরিবংশ, শহরচরিত, সোনাভানের পুথি, হকিকতে সিতারা-এর নাম এখন সারা দেশের বোদ্ধামহলে কমবেশি পরিচিত। এসব রচিত গ্রন্থের মধ্যে কেতাব হালাতুননবী ও জঙ্গনামা সিলেট অঞ্চলে বহুল প্রচলিত। এখনও সিলেট জেলার বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় মহররমের মাসে জঙ্গনামা গ্রন্থ থেকে মহররমের জারি হিসেবে সুর করে গ্রন্থের পয়ারগুলো পঠিত হয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ওই পাঠে অংশ নেন।
এছাড়া হালে অসংখ্য জনপ্রিয় গান রয়েছে যেগুলো নাগরী লিপিতে লেখা হয়েছিল। যেমন-সৈয়দ শাহনুরের (১৭৩০-১৮৫৫) ‘অরিন জংগলার মাঝে বানাইলাম ঘর/ভাই নাই, বান্ধব নাই, কে লইব খবর’ কিংবা শিতালং শাহের (১৮০০-১৮৮৯) ‘অজ্ঞান মন, খুয়াইলায় মহাজনের ধন’সহ এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়।
নাগরী লিপিতে লিখিত পুথি আর গানগুলো ক্রমশই বিলুপ্ত হতে চলেছে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা এবং সংরক্ষণের অভাবে এ প্রজন্মের কাছে বাংলাসাহিত্যের সমৃদ্ধ এই ভাণ্ডারটি অনেকটা অজানাই থেকে যাচ্ছে। অত্যাধুনিকতার ছোঁয়ায় সিলেট অঞ্চলের গ্রামেগঞ্জেও রেডিও-টেলিভিশন-মোবাইলসহ নানা ধরনের প্রযুক্তি ঢুকে পড়েছে। ফলে অনেকেই নাগরি পুথি পাঠের আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই বহু ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী বিচিত্রমুখী এসব পুথি চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। আশার কথা, ইদানীং নাগরী লিপিতে লিখিত বইয়ের পুনমুদ্রণের প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে ঐতিহ্য-সন্ধানী কারও কারও মধ্যে। তবে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ রাখার স্বার্থে সিলেটি নাগরী লিপিকে বিলুপ্তের হাত থেকে বাঁচাতে এখনই প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে